প্রচেত গুপ্ত

রূপপুরে একই সঙ্গে দু-দুটো গোলমাল হল। যাকে বলে ডবল গোলমাল। ঘটনা দুটো সত্যি হলেও রূপকথার মতোই শুনতে লাগে। প্রথম গোলমাল ঘটেছে সকাল ছ'টা বেজে তিন মিনিট এগারো সেকেন্ডে। দ্বিতীয় ঘটনার সময়, বেলা দশটা বেজে সতেরো মিনিট। এতো নির্দিষ্ট করে সময় জানবার পিছনে কারণ আছে। সেই কারণ মজার আর রোমহর্ষক।
গোড়াতে রূপপুরে অনেকেই এই ডবল ঘটনার কথা শুনে ভেবেছিলেন, নিশ্চয় কেউ গল্প বানিয়েছে। এমন হতেই পারে না। এতদিন ধরে একরকম চলেছে, আজ বলা নেই, কওয়া নেই, দুম করে পালটে গেল! একটা পালটাল না, পালটাল একেবারে দু-দুটো! এতে যে কত বিপত্তি ঘটতে পারে তার ঠিক আছে? সবকিছুরই নিয়ম থাকে। নিয়মের নড়চড় হলে গোলমাল বাঁধে। কে আর সাধ করে গোলমাল পাকাতে চাইবে? সুতরাং এ ঘটনা বানানো ছাড়া কিছুই নয়।
কিন্তু এমন অদ্ভুত গল্প বানিয়েছে কে? অনেকেরই সন্দেহ পড়ল ননার ওপর। নিশ্চয় এই কীর্তি ননার। ননাকে কেন সন্দেহ হয়েছে সে কথা বলবার আগে রূপপুরের বর্ণনা দেওয়া যাক। বার বার এই জায়গার নাম আসবে, তাই জায়গাটা কেমন জানা উচিত।
রূপপুর কলকাতা থেকে 'এক রাত—হাফ বেলা' দূর। এ কথার মানে হল, এক রাত ট্রেনে যেতে হবে, তারপর ঘণ্টা তিনেকের বাস বা গাড়ির পথ। কলকাতা থেকে রওনা হওয়া ট্রেন কাকভোরে গিয়ে পৌঁছোয় 'ঝিমুনি জংশন'। 'ঝিমুনি জংশন' স্টেশনের ভালো নাম নয়, ডাকনাম। ভালো নাম আলাদা। সেই নাম রেল কোম্পানির দেওয়া। যদিও সেই নাম লোকে ভুলতে বসেছে। যারা এই পথে যাতায়াত করে তারা নিজের মতো করে ডাকনাম দিয়ে নিয়েছে। সেই নামেই চলছে।
নামের পিছনে রোমাঞ্চকর ঘটনা রয়েছে। এখানে কলকাতার ট্রেন পৌঁছোবার সময় হল একবারে কাকভোরে। কথা হল, একটু আলো—একটু অন্ধকার, অল্প ঠান্ডা বাতাস, পাখির ডাক, গরম চায়ের ভাঁড়ের মধ্যে স্টেশনে ট্রেন ঢুকবে। যে-কোনও জায়গাতেই ট্রেন স্টেশনে পৌঁছোয় হয় ঠিক সময়ে, নয়তো দেরি করে। দেরি করবার নানা সত্যি কারণ, মিথ্যে কারণ থাকে। কখনও সিগন্যাল পায় না, কখনও মালগাড়ি পথ আটকে থাকে, কখনও আবার গোটা পথ এমন ঢিকিস ঢিকিস করে চলে যে শেষে আর সামলাতে পারে না। 'ঝিমুনি জংশন'—এর ব্যাপার উলটো। ভোরের ট্রেনেরা এখানে রেল কোম্পানির ঠিক করে দেওয়া সময়ের আগেই পৌঁছে যায়। কত আগে পৌঁছোবে তার ঠিক নেই। ট্রেনগুলো যেন সব আগে পৌঁছোবার কম্পিটিশন করে। তাই যাত্রীরা শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে, বেঞ্চে পাতা বিছানা গুছিয়ে, বাক্সপেঁটরা হাতের কাছে জড়ো করে জেগে বসে থাকতে হয়। সবাই ভাবে, ট্রেন যদি সময়ের আগে স্টেশনে পৌঁছোতে পারে, সেখান থেকে সময়ের আগে ছেড়ে দিলেও অবাক হবার কিছু নেই। কেউ যদি ঘুমিয়ে থাকে তাকে নিয়েই যে ফের দুড়দাড় ছুটতে শুরু করবে না তার কী গ্যারান্টি? তার থেকে বাপু আগে জেগে বসে থাকা ভালো। ফলে শেষরাতে ঠিক মতো ঘুম হয় না। যাত্রীরা এই জংশনে ট্রেন থেকে নামে ঝিমোতে ঝিমোতে। তাই স্টেশনের নাম হয়ে গিয়েছে 'ঝিমুনি জংশন'।
'ঝিমুনি জংশন' নেমে আগে এক ভাঁড় ধোঁয়া ওঠা গরম চা খেয়ে নিতে হয়। তারপর বাস বা গাড়িতে ওঠা। পথে গরম কচুরি জিলিপি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারবার সময় মেলে। বাস, গাড়ি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। খাওয়া হলে আবার ছোটা। সব মিলিয়ে ঘণ্টা তিনেকের পথ। দুপুরেই রূপপুর। তারপর ভালো করে দিঘিতে স্নান সেরে, কই মাছের ঝাল বা দিশি মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে এক ঘুম। রাতে ট্রেনে চাপলে পরদিন বিকেল পর্যন্ত মাথার মধ্যে ট্রেনের দুলুনি থাকে। তখনও মনে হয়, ট্রেনে চেপে আছি। ভালো ঘুম হয়।
রূপপুর জায়গাটা নামের মতোই ভালো। ছোট মফস্বল শহর। কিন্তু এখনও একটা 'গ্রাম গ্রাম' ব্যাপার রয়েছে। ব্যাঙ্ক, পোস্টাপিস, পুলিশ থানা, স্কুল, অফিস-কাছারি যেমন রয়েছে, তেমন গাছপালা, দিঘি, বড় খেলার মাঠ রয়েছে। লোকালয় শেষ হলেই ছড়ানো ধানখেত। সেই ধানখেতের আল ধরে হাঁটলে সত্যিকারের গ্রামে পৌঁছে যাওয়া যাবে।
মাটির বাড়ি, ঝুড়ি নামানো আড়াইশো বছরের পুরোনো বটগাছ, গা ছমছমে বাঁশ বন। শহরের বাড়িগুলোও ছোটখাটো। একতলা, দোতলা। সামনে একটুকরো করে বাগান রয়েছে। পথে চলাচলের সময় ঘাড়ের ওপর গাড়ি এসে পড়ে না। ধোঁয়া, হর্নের আওয়াজে অতিষ্ট হতে হয় না। শুধু দেখতে সুন্দর নয়, রূপপুরের জলহাওয়াও শরীরের জন্য ভালো। খিদে চনমন করে বাড়ে। যেসব ছেলেমেয়েদের মামা বা মাসির বাড়ি রূপপুর তাদের খুব ডাঁট। স্কুলের গরম, পুজো বা শীতের ছুটিতে একবার তারা রূপপুরে আসবেই আসবে। ফিরে গিয়ে এমন করে দিঘির জলে দাপাদাপি, গাছে চড়া, স্টেজ বেঁধে থিয়েটার করা, ফুটবল ম্যাচ নিয়ে গল্প বলবে যে হিংসেতে কলকাতার বন্ধুদের গা একেবারে চিড়বিড় করবে।
রূপপুরের মানুষের একটা মস্ত গুণ আছে। তারা অতিথিদের খুব পছন্দ করে। তাদের যেন কোনও অসুবিধে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখে। রূপপুর এমনিতেই শান্তশিষ্ট একটা জায়গা।
যাক, এই হল রূপপুর, আর এই রূপপুরেই থাকে ননা।
সব এলাকাতেই একজন করে গল্প বলে বেড়ানোর লোক থাকে। সেই গল্প কখনও সত্যি হয়, কখনও হয় মিথ্যে। কখনও আবার হয় সত্যি-মিথ্যে মেশানো। কোনটা কেমন চট করে ধরা মুশকিল হয়। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ করে না। কেউ আবার এমন ভান করে যেন গল্প শুনতে চাইছে না। আসলে কান খাড়া করে শোনে।
যারা এরকম গল্প বলে বেড়ায় তাদের বলা হয় 'গোপ্পে'। রূপপুরে 'গোপ্পে' হল ননা। চেহারা দেখে 'গোপ্পে ননা'র বয়স বোঝবার উপায় নেই। তিরিশ-বত্রিশ হতে পারে, আবার চল্লিশ-বিয়াল্লিশও হতে পারে। রোগা প্যাংলা, একমাথা ঝাকড়া চুল। চোখদুটো বড় বড়। মুখ সবসময় হাসি হাসি। পেশায় সে কাঠের মিস্ত্রি। চেয়ার, টেবিল, খাট, আলমারি বানায়, জানলা দরজা মেরামত করে। আবার কোথাও স্ক্রু, নাটবল্টু, কব্জা ঢিলে হলে টাইট মেরে দিয়ে যায়। তবে কাজের সময় এমন গল্প ফেঁদে বসে যে প্রায়ই কাজে একটা না একটা গোলমাল হয়ে যায়। এই তো সেদিন রাখাল দত্তর বাড়িতে চেয়ার বানাতে গিয়ে এক কেলেঙ্কারি হল। কাজে বসে ননা যথারীতি গল্প শুরু করেছিল। সেদিন তার গল্পের বিষয় ছিল 'সিংহাসন'।
'জানেন স্যার, আমার একশো সতেরোতম ঠাকুরদাও আমার মতো ফার্নিচার বানাতেন। মনে হয়, আমি সেই ঠাকুর্দার থেকেই ফার্নিচার বানানোর ধাত পেয়েছি। একশো সতেরোতম মানে কী বুঝতে পারছেন তো স্যার? মানে হল, আমার ঠাকুরদার, ঠাকুরদার, ঠাকুরদার...এই ভাবে পিছোতে পিছোতে একশো সতেরোবার পিছোলেই তাঁকে পাওয়া যাবে। সেই ঠাকুরদা ছিলেন সিংহাসন স্পেশালিস্ট।'
বাড়িতে ননা আসবার আগে থেকেই রাখাল দত্ত ভেবে রেখেছিলেন, কিছুতেই ওর গল্পের পাল্লায় পড়বেন না। এতে কাজের ক্ষতি হয়। তাই গল্প শুরু করলেই থামিয়ে দেবেন। কিন্তু এমন গল্প শুনে থামানো যায়? তিনি চোখ বড় করে বললেন, 'সিংহাসন স্পেশালিস্ট! সে আবার কী হে?'
কাঠের গায়ে রেঁদা ঘষতে ঘষতে 'গোপ্পে ননা' একগাল হেসে বলল, 'সিংহাসন স্পেশালিস্ট মানে, সিংহাসন বানানোয় ওস্তাদ। বিরাট ডিমান্ড ছিল তাঁর। রাজা-রাজরা তো ঠাকুরদাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করতেন। ইনি পাইক বরকন্দাজ পাঠিয়ে ডেকে পাঠান তো, উনি সটান হাতি পাঠিয়ে দেন বাড়িতে। ইনি কোমোরে তলোয়ার গোঁজা সেনাপতিকে পাঠান তো, উনি ঝলমলে কাপড়ে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে মন্ত্রীমশাইকে পাঠান। ব্যাপার কী না এখনই যেতে হবে। পুরোনো সিংহাসন রাজামশাইয়ের আর পছন্দ হচ্ছে না, একঘেয়ে লাগছে। মনে হচ্ছে, তেমন জেল্লা নেই। সিংহাসনে বসলে আগের মতো আর দাপট আসে না। সুতরাং নতুন চাই। এখনই গিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।'
রাখালবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'বল কী ননা!'
ননা গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, 'তা আর বলি কী স্যার, সেই আমলে সিংহাসন নিয়ে রাজাদের মধ্যে ছিল বিরাট রেষারেষি। যার যত মজুবত, সাজানো গোছানো সিংহাসন তার তত নামডাক। আমার ঠাকুরদাও ছিলেন তেমন। রাজামশাই ডেকেছেন বলেই যে পড়িমড়ি করে ছুটতে হবে তার কোনও মানে নেই। তিনি কাউকে তিন মাস, কাউকে ছ'মাস, কাউকে এক বছর পরে অ্যাপয়েনমেন্ট দিতেন।'
রাখালবাবু বললেন, 'রাজামশাইদের অ্যাপয়েনমেন্ট! বলছ কী ননা!'
ননা বলে, 'তা আর বলছি কী স্যার। আমরা কী যে সে বংশের লোক? সেদিক থেকে বলতে গেলে আমরা হলাম, সিংহাসন বংশ।'
ননা চেয়ারের হাতলে পালিশ লাগাতে লাগাতে জমিয়ে গল্প চালাতে লাগল, রাখালবাবুও হাঁ হয়ে শুনতে লাগলেন।
রাখাল দত্ত তখন সদ্য চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। হাতে অঢেল সময়। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পাড়ার ক্লাবে তাস খেলে, সকাল বিকেল পার্কে হাঁটাহাটি করে, বিশুর চায়ের দোকানে বসে বাসি খবরের কাগজ পড়ে আর সন্ধেবেলা টিভি দেখে এই অঢেল সময় নষ্ট করবেন না। তাহলে কী করবেন? ঘরের ভিতর বসে থাকবেন? তাও হবে না। ঘরের ভিতর থাকা মানেই গিন্নির সঙ্গে খিটিরমিটির ঝগড়া। তাঁর গিন্নি আবার রাগি মহিলা। ইতিমধ্যেই শাসিয়ে রেখেছেন।
'রিটায়ার করেছ বলে ভেবো না, চব্বিশ ঘণ্টা চোখের সামনে ঘুরঘুর করবে আর বকবক করবে। চোখের আড়ালে থাকবার একটা ব্যবস্থা করো।'
রাখালবাবু পড়লেন ঝামেলায়। রাগি গিন্নির চোখের আড়ালে থাকতে গিয়ে রোদ, ঝড়-বৃষ্টিতে তো পথে পথে ঘোরা যায় না। তাহলে কোথায় যাবেন? কার বাড়িতে? কারও বাড়িতে গেলে তারাই বা সহ্য করবে কেন? শেষ পর্যন্ত বিস্তর মাথা খাটিয়ে একটা পরিকল্পনা করলেন। এই পরিকল্পনায় বাড়িতে থাকা হবে, আবার বাড়িতে থাকাও হবে না। থাকা হবে বারান্দায়। বারান্দায় থেকে এক গবেষণাকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন। গবেষণার বিষয় হবে 'দুনিয়ার রং বদল'। সারাদিন বারান্দায় বসে সবদিকে নজর রাখবেন। হাতে থাকবে নোটবুক আর পেনসিল। সাধারণ পেনসিলের সঙ্গে রং-পেনসিলও থাকবে। ক্ষণে ক্ষণে বাইরের রং দেখবেন আর নোট রাখবেন। যেখানে পারবেন, নোটের পাশে রং-পেনশিল দিয়ে রঙের শেড দেবেন। এতে পরে বুঝতে সুবিধে হবে। আকাশের রং, বাগানের রং, রোদের রং, দিনের রং, সন্ধেবেলার রং, রাতের রং, গাছপালার রং, বাড়ির রং, ছায়ার রং, এমনকী মানুষের রংকিছুই বাদ দেবেন না। যা চোখে পড়বে সব টুকে রাখা হবে। রাখালবাবুর ধারণা, এই দুনিয়া হল গিরগিটি মতো। গিরগিটি হল বহুরূপী, ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়, দুনিয়াও তাই। এই রং বদলের ঘটনা ধরে রাখতে পারলে একটা 'বড় কাজ' হবে। ভবিষ্যতের মানুষ বুঝতে পারবে, কেমন ছিল এখনকার রং বদলের দুনিয়া।
রাখালবাবু অতি উৎসাহে গিন্নিকে গবেষণার কথা বলতে গেলেন। গিন্নি সন্দেহে ভুরু কোঁচকালেন।
'যা ইচ্ছে করো, বাড়িঘরে রং লাগিয়ে নোংরা করবে না। এই বলে রাখলাম।'
রাখালবাবু 'হাঁ-হাঁ' করে উঠলেন, 'আরে এ রং সে রং নয়। এ হল তোমার দুনিয়ার রং।'
গিন্নি এত কথা বুঝতে পারলেন না, বুঝতে চাইলেনও না। আরও কড়া গলায় বললেন, 'বললাম তো অতশত বুঝিনে বাপু। রং লাগিয়ে ঘর যদি নোংরা করো বিপদ আছে। যা করবে সাবধানে।'
রাখালবাবু বুঝলেন, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তিনি নিজের পরিকল্পনায় মন দিলেন। ভেবে দেখলেন, নোটবুক, পেনসিল ছাড়াও তার গবেষণায় অতি জরুরি হল একটি চেয়ার। পাকাপোক্ত চেয়ার। সেই চেয়ারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। ঘরে যেসব চেয়ার আছে সেগুলো হালকা পলকা। ওতে বসে এই ধরনের জবরদস্ত গবেষণার কাজ করা অসম্ভব। তাছাড়া সারাদিনের জন্য ঘরের চেয়ার বারান্দায় আটকে রাখা গিন্নি মোটে ভালো চোখে দেখবেন না। তার থেকে একটা নতুন চেয়ার বানিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের। সেই কারণেই ননাকে ডাকা।
ছাদে বসে ননা কাজও শুরু করল। সেই সঙ্গে শুরু করল তার গল্প।
'ওই যে বললাম, আমার ঠাকুরদার বানানো সিংহাসন ছিল অতি বিখ্যাত। কত সিংহাসন যে ঠাকুরদা তৈরি করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। উঁচু, নীচু, বেঁটে, মোটা। যেমন যেমন অর্ডার হতো। কাঠ, পাথর, সোনা, মনিমুক্তো কিছুই বাদ থাকত না। একবার হল কী স্যার, ঠাকুরদা এমন সুন্দর একটা সিংহাসন বানালেন যে রাজামশাইয়ের চক্ষু চড়কগাছ। ঠাকুরদাকে বললেন, হে সিংহাসনের মিস্ত্রি, তোমাকে আমি সম্মান জানাতে চাই। সবার আগে তুমি এই সিংহাসনে বসবে। সিংহাসনের শুভ উদ্বোধন করবে, তারপর বসব আমি। যাও বসে পড়ো। আমার একশো ছাব্বিশতম ঠাকুরদা তো ভয়ে কাঁপতে শুরু করলেন। রাজসিংহাসনে বসবে কিনা সামান্য একজন কাঠের মিস্ত্রি! রাজামশাই এখন বলছেন বটে, পরে যখন নিজের ভুল বুঝতে পারবেন তার তো গর্দান যাবে।'
রাখালবাবু মোড়ায় বসে কাজের তাদরকি করছিলেন। বললেন, 'একশো ছাব্বিশ! এই যে বললে একশো সতেরো!'
ননা পালিশ থামিয়ে জিব কেটে, কানে হাত দিয়ে বলল, 'একশো সতেরো বলেছিলাম নাকি স্যার? ইস, মিসটেক হয়ে গেছে।'
রাখালবাবুকে তখন গল্প শোনবার নেশায় পেয়ে গেছে। বললেন, 'ও যাক গে। যাহা সতোরো তাহাই ছাব্বিশ। এ তো তোমার হাফইয়ারলি পরীক্ষার খাতা নয়, আর আমিও অঙ্কের স্যার নই যে হিসেবে ভুল ধরব। তুমি গল্পটা শেষ কর ননা।'
ননা গল্প যেমন শেষ করল, চেয়ার বানানোও শেষ করল। খেয়াল করল না চেয়ারের একটা পায়া বেশি কাটা হয়ে গেছে। সেই খুঁত খেয়াল করলেন রাখাল দত্ত স্বয়ং। বারান্দায় নতুন চেয়ার নিয়ে জমিয়ে বসবার পর। নোটবুক, পেনসিল বাগিয়ে বসতেই তিনি দুলে উঠলেন। প্রথমে চমকে উঠে ভাবলেন, ভূমিকম্প। আরও দুবার দুললে বুঝলেন, না, ভূমিকম্প নয়, চেয়ারকম্প। চেয়ার কাঁপছে। খটাখট আওয়াজ তুলে সে একবার সামনে ঝোঁকে, একবার পিছনে হেলে। রাখালবাবু পড়িমড়ি করে নেমে পড়লেন। লাফই দিলেন বলা যায়। তারপর চেয়ারের চারপাশে ঘুরলেন, ওপর থেকে দেখলেন, ফিতে এনে নিচ থেকে মাপলেন। না কোনও খুঁত নেই। তবে হলটা কী? শেষ পর্যন্ত তলায় হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে তদন্ত করলেন রাখালবাবু। দেখলেন পিছনের বাঁ-দিকের পায়াতে গড়বড়। অন্যদের থেকে সে মাপে ছোট। তাই এই দোলাদুলি। দুনিয়ার রং বদল দেখবেন বলে ঠিক করেছিলেন রাখালবাবু, এবার নিজেরই মুখের রং বদলে গেল। যাকে বলে রাগে টকটকে লাল। নোটবুক, পেনসিল ফেলে বেরিয়ে পড়লেন 'গোপ্পে ননা'কে পাকাড়াও করতে। গোটা রূপপুর ঘুরে তাকে খুঁজে বেরও করলেন। ঘাড় ধরে নিয়ে এলেন বাড়িতে। ননা মুখ শুকনো করে খুটখাট করল বটে, কাজের কাজ কিছু হল না। পায়া হল এমন জিনিস যে একবার গড়বড় হলে তাকে কিছুতেই বাগে আনা যায় না। সে হয়ে যায় বেপরোয়া। কোনও নিয়ন্ত্রণ মানে না। নিজের মতো হেলতে-দুলতে থাকে।
নড়বড়ে চেয়ারে বসে আর যাই হোক গবেষণার কাজ চলে না। রাখালবাবুর গবেষণা শুরুতেই গেল বন্ধ হয়ে। ননার গপ্পের কারণে রূপপুরে এরকম বহু গোলমাল হয়েছে। এটা শুধু যে ননার দোষ এমন নয়। যারা শোনে তারাও দায়ী। কিন্তু গল্প না শুনে উপায়ও নেই যে। ননা যে গল্প বলায় ওস্তাদ।
এই দুই ঘটনাও কি ননার বানানো গল্প?
না, বানানো গল্প নয়। অবিশ্বাস্য হলেও দুটি ঘটনাই সত্যি।
প্রথম ঘটনার অকুস্থল রূপপুর স্কুলের মাঠ। এই মাঠের আরেক নাম 'রূপপুর ফুটবল গ্রাউন্ড'। রূপপুর বয়েজস্কুলের গেমটিচার অবনী বসু তখন ক্লাস নাইনের ছেলেদের ড্রিল করাচ্ছিলেন। তার হাতে ছিল তার প্রিয় স্টপওয়াচ। ভারি সুন্দর দেখতে। হলুদ রঙের, গোল। মাথার দু-পাশে ছোট দুটো শিং-এর মতো খুদে অ্যান্টেনা। অ্যান্টেনা দুটোর কী কাজ কেউ জানে না।
এই স্টপওয়াচ সবসময়েই অবনীস্যারের সঙ্গে থাকে, কখনও হাতছাড়া করেন না। তিনি সময়ের বিষয়ে ভীষণ খুঁতখুঁতে। তাই স্টপওয়াচ সবসময় ব্যাগে। ছেলেদের নিয়ে মাঠে গেলে তো থাকেই, অন্যসময়েও থাকে। সে তিনি মুখেভাতের নেমন্তন্নেই যান আর বাজারে ঝিঙে-পটল কিনতেই যান। থিয়েটার দেখতে গেলেও থাকে, আবার রেশন দোকানে লাইন দিলেও থাকে। ইচ্ছে হলে বের করে টুক করে একটু সময় হিসেব করে নেন। তবে জিনিসটা হাতে থাকে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলো, শরীরচর্চার সময়। স্টপওয়াচ বের করে সময় দেখতে থাকেন অবনীমাস্টার। ভুল, ঠিক সব মিনিটে, সেকেন্ডে ধরা পড়ে। ড্রিল বা খেলা শেষে সময় ধরে ধরে রেজাল্ট ঘোষণা করেন।
'এই যে পার্থ, তুই দুই মিনিট তিন সেকেন্ডের মাথায় একটা বিচ্ছিরি ভুল করেছিলি। বাঁ-হাত তোলার কথা ছিল, তুলেছিলি ডান হাত।'
'আবির, এক মিনিট দশ সেকেন্ডে তুমি যে শটটা মেরেছ সেটা অতি চমৎকার। আর একটু হলেই গোলে বল ঢুকে যেত। ওটা পারলে আরও দেড় সেকেন্ড আগে গোল হতো। যাক, আমি খুশি।'
'অরিত্র, এই কী তোর ডন দেওয়া! ইস, এ তো হাঁচোর-পাঁচোর! তেরো সেকেন্ড ধরে তুই যা করলি তা যদি ডন—বৈঠক আবিষ্কর্তা দেখতেন লজ্জায় মুখে লুকোতে পারতেন না।'
'সৌরীশ, সবই ভালো করছিলে, কিন্তু কবাডি খেলবার সময় দম ধরে রাখাটাই আসল। বিপক্ষের কোর্টে ঢুকে উনিশ সেকেন্ডের মাথায় দম ফেল করেছ। আরও এক সেকেন্ড ধরে রাখলে তুমি বেরিয়ে আসতে পারতে। যাক পরেরবার ওই উনিশ সেকেন্ডের কথাটা মাথায় রাখবে।'
'ঋদ্ধিমান, স্কিপিং তোমার ভালোই হচ্ছিল, তেরো সেকেন্ডে একটু টলে গিয়েছিলে। বাকি তিন মিনিট সতেরো সেকেন্ড অলরাইট।'
ছেলেরা এতে খুবই উৎসাহ পায়। পাবারই কথা। ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক ভুল ধরিয়ে দেওয়াটা তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। ওরা 'স্যার'-এর সঙ্গে মজা করে।
'স্যার, সবথেকে সুবিধে হতো, যদি ফুটবল ম্যাচের সময় পকেটে একটা করে স্টপওয়াচ রাখতাম। পাঁচ মিনিট তিন সেকেন্ডে মারতাম কিক, সতেরো মিনিট আড়াই সেকেন্ডে দিতাম ব্যাকভলি, পাঁচ সেকেন্ড অন্তর দিতাম পাশ।'
ছাত্রদের এই রসিকতায় অবনীমাস্টার মোটেও রাগ করেন না। হেসে বলেন, 'ভালো বলেছিস। তবে কী জানিস, খেলোয়াড়দের মাথার মধ্যেই একটা অদৃশ্য স্টপওয়াচ থাকে। সেটা নিজে থেকেই সময় বলে দেয়।'
অবনী বসুর এটাই মস্ত গুণ। 'গেমটিচার' মানে এমনিতেই হওয়া উচিত খেলাধুলো, আনন্দের মাস্টারমশাই। অবনীমাস্টার তার থেকেও বেশি। তিনি শুধু ছাত্রদের মাস্টারমশাই নন, একজন হাসিখুশি, মজার মানুষও বটে। ছোটদের বন্ধুর মতো। সবসময় মুখে হাসি। শরীরচর্চা, খেলাধুলো যে একটা আনন্দের ব্যাপার এটা তাকে দেখলেই বোঝা যায়। তার এই চমৎকার স্বভাবের জন্য রূপপুরে খেলাধুলোয় একেবার জোয়ার এসেছে। উনি বয়েজ স্কুলের মাস্টারমশাই হলে কী হবে, উনি অন্য ছেলেমেয়েদেরও খেলা শেখান। নিজের আনন্দেই শেখান। কখনও কোনও ক্লাবে গিয়ে খানিকটা ব্যায়াম করিয়ে আসেন।
'ভুজঙ্গাসনে ভুল করলে চলবে না। দেখ, করবি এইভাবে।'
কখনও দিঘির ধারে যেতে যেতে জলে দাপিদাপি দেখে থমকে দাঁড়ান। ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে কয়েক পা নেমে চিৎকার করে ওঠেন।
'অ্যাই ছেলে, ওরকম এলোপাথাড়ি হাত-পা ছুঁড়লে হবে না। ফ্রি স্টাইলের তো একটা ছন্দ আছে বাপু। একটু চেষ্টা করে দেখ ঠিক পারবি। বাঙালি হল মাছের মতো, সাঁতার পারবে না তো কে পারবে?'
কখনও আবার মেয়েদের ব্যাডমিন্টন খেলা দেখে থমকে দাঁড়ান। হাততালি দিয়ে বলেন, 'চমৎকার! একেই বলে খেলা! আহা! সার্ভটা যা করলি, মনে হল আকাশে পাখি উড়িয়ে দিলি। তোদের মেডেল দেওয়া উচিত।'
এরকম মানুষকে সবার ভালো না বেসে উপায় আছে? শুধু ছোটরা নয়, রূপপুরের বড়রাও মাস্টারমশাইকে পছন্দ করে। এমন পছন্দ যে একবার তাকে রূপপুরের স্কুল থেকে বদলি করবার কথা উঠতে ছোটবড় সবাই মিলে বিরাট হইচই শুরু করে দিয়েছিল। বিডিও অফিসে গিয়ে আবেদন জমা দিল। রূপপুরে পোস্টার পড়ল। পোস্টারে কোনও কথা নেই, শুধু হাতে আঁকা ছবি। কোনওটায় ফুটবলের ছবি, কোনওটায় হকি স্টিকের ছবি, কোনওটায় সাঁতার কাটার ছবি, কোনওটায় ব্যায়ামের ছবি। ছেলেরা ছড়াও লিখে ফেলেছিল, 'বড় ভালো আমাদের খেলার টিচার রূপপুর ছেড়ে যাওয়া চলবে না তাঁর।'
এত হইচইতে অবনীমাস্টারের বদলি গিয়েছিল আটকে। তাঁর আরও গুণ রয়েছে। দুটো ঘটনা বললেই সেই গুণের কথা বোঝা যাবে।
ক্লাস এইটের শুভম চিরকালের ঘরকুনো। বাড়ি থেকে মোটে বেরোতে চায় না। যেটুকু স্কুলে না গেলে নয়, বাকি সময়ে বাড়িতে পড়ার বইতে মুখ গুঁজে বসে থাকে। এত করেও তার পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হয়। অতিরিক্ত পড়বার কারণে মাথার ভিতরে সব গুলিয়ে থাকে। ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান সব খিচুড়ি পাকিয়ে যায়। ওর বাড়ির সামনে দিয়ে গেলেই শোনা যায় শুভম 'বিনবিন' করে পড়ছে। একই লাইন বারবার বলে মুখস্থ করতে চাইছে। শুধু উত্তর নয়, এমনকী প্রশ্নও মুখস্থ করছে।
'ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু চারটি বাক্যে লেখো...ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু চারটি বাক্যে লেখো...ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু চারটি বাক্যে লেখো...।'
এই নিয়ে সবাই বেজায় হাসাহাসি করে। গেমটিচার খবর পেয়ে একদিন বিকেলে শুভমের বাড়িতে গিয়ে হাজির। শুভম তো ঘাবড়ে টাবড়ে গিয়ে একাকার।
'স্যার, আপনি! আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন!'
অবনীমাস্টার হেসে বললেন, 'হ্যাঁ, আমি এসেছি। চিনতে পারছিস না?'
শুভম লজ্জা পেয়ে বলল, 'কী যে বলেন স্যার, আপনাকে চিনতে পারব না?'
অবনীমাস্টার বললেন, 'এখন পারছিস, কদিন পরে আর পারবি না। মানুষজন, গাছপালা, খেলার মাঠ সব ভুলে যাবি। যা দেখবি, মনে হবে বইয়ের অক্ষর তাড়া করে আসছে।'
শুভম মাথা নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল, 'এখনই সেরকম হয় স্যার। সেদিন মা গরম ভাতের সঙ্গে আলু সিদ্ধ, ডিম সিদ্ধ খেতে দিয়েছিল, আমি দেখলাম, মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ।'
অবনীমাস্টার আঁতকে উঠে বললে, 'অ্যাঁ! বলিস কী! আলু সিদ্ধতে মুঘল সাম্রাজ্য পেলি কোথা থেকে!'
শুভম কাঁচুমাচু গলায় বলল, 'জানি না স্যার, আমি সব কিছুতেই বইয়ের পড়া দেখতে পাই। ঘরের পর্দায় আফ্রিকার ম্যাপ দেখি, ফুলকো লুচিতে জ্যামিতির বৃত্ত দেখি, বালতির জলে নদ-নদীর গতিপথ খুঁজে পাই।'
অবনীমাস্টার গম্ভীর হয়ে বললেন, 'হুম, তোর অবস্থা দেখছি খুবই গোলমেলে হয়ে উঠেছে।'
শুভম প্রায় কেঁদে ফেলে বলল, 'কী হবে স্যার? সব কিছুতে স্কুলের পড়া দেখতে পাই, কিন্তু পরীক্ষার খাতা হাতে পেলেই মাথা ফাঁকা হয়ে যায়, একেবারে শূন্য। কিছু মনে পড়ে না।'
অবনীমাস্টার শুভমের পিঠে হাত রেখে নরম গলায় বললেন, 'চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর এই অসুখের ওষুধ আমার জানা আছে। আমার ওপর ভরসা আছে?'
শুভম বলল, 'আছে স্যার।'
অবনীমাস্টার ভুরু কুঁচকে বললেন, 'আমি যা বলব করবি?'
শুভম বলল, 'করব স্যার, তবে আপনি নিশ্চয় আরও লেখাপড়া করতে বলবেন। বাড়িতে বাবা, ছোটকা তাই বলে। বলে, যা পড়ি তার ডবল সময় পড়লে পড়া মাথায় ঢুকতে পারে। তার কমে হবে না। কিন্তু ডবল সময় পাব কোথায় স্যার? সবসময়েই তো পড়ি। সবসময়ের কি ডবল হয়?'
অবনীমাস্টার বললেন, 'একেবারে উলটো। তোকে কম পড়তে হবে। যাক, আজ ঠিক বিকেল চারটের সময় স্কুলের মাঠে চলে আসবি।'
শুভম আঁতকে উঠে বলল, 'মাঠ! আমার তো ঘর থেকেই বেরোনোর সময়ই নেই। সব পড়া বাকি রয়েছে মনে হয়।'
অবনীমাস্টার হেসে বললেন, 'পড়া বাকি থাকবেই তো, ফুটবল খেলিস না যে। গোল দেওয়ার মজা আর গোল খাওয়ার দুঃখ না জানলে স্কুলের পড়া শেষ করবি কী করে? তার জন্য তো মাঠে যেতে হবে। আজ মাঠে আসবি, ফুটবল খেলবি। তারপর দেখ না কী হয়। আমার ওপর বিশ্বাস রাখ।'
শুভম খুবই অনিচ্ছে নিয়ে সেদিন মাঠে হাজির হল। গেমটিচার অন্য ছেলেদের বলে রেখেছিলেন।
'আজ রূপপুরের ছেলেদের খেলার সঙ্গে আরেকটা খেলা খেলতে হবে।'
ছেলেরা বলল, 'সে আবার কী স্যার! খেলার সঙ্গে আরেকটা খেলা কাকে বলে?'
অবনীমাস্টার মাথা নেড়ে বললেন, 'যে খেলতে চায় না, তার ভিতরে খেলার আনন্দকে জাগিয়ে তোলবার খেলা। এতে দেখবি দারুণ মজা।'
এই কথায় ছেলেরা হইহই করে শুভমকে টেনে নিল। খেলা শুরু হল। প্রথমে কিছুই পারছিল না শুভম। না পারছিল বল রিসিভ করতে, না পারছিল পাস দিতে। পারবে কী করে? কতদিন পর সে মাঠে নেমেছে তার ঠিক আছে? নিজেই বলতে পারবে না। কিন্তু মাঠের বাইরে থেকে গেমটিচারের উৎসাহে কোনও ভাঁটা পড়ল না। বরং শুভম যত পারছে না, উনি তত উৎসাহ বাড়াতে থাকলেন।
'দারুণ হচ্ছে শুভম...এবার কিক কর...হেড দে...ভেরি গুড অ্যাটেম্পট...দৌড়ে গিয়ে বলটা ধর...কাটিয়ে যা...পড়ে গিয়েছিস তো কী হয়েছে? উঠে দাঁড়া...।'
ধীরে ধীরে শুভম খেলায় মেতে উঠল। দলের অন্য খেলোয়াড়রাও ওকে নানা ভাবে খেলার ভিতর জড়িয়ে নিতে থাকে। একটু সুযোগ হলেই ওর পায়ে বল এগিয়ে দিল। গেমটিচার তো আজ বলেই দিয়েছেন, 'খেলার মজাই হল, সবাইকে নিয়ে চলা। যে দুর্বল তার দিকে সবার যেন নজর থাকে। দেখবি, একটা সময়ে সে ঠিক পারবে।'
ঘটলও তাই। হাফটাইমের পাঁচ মিনিট আগে বাবুলালের পাস দেওয়া বল রিসিভ করে, বিপক্ষ দলের অর্ক, সৌম্যকে ড্রিবল করে একবারে গোলের মুখে চলে গেল শুভম। তারপর সপাটে কিক। মাঠ জুড়ে চিৎকার উঠল।
'গোওওওল।'
ফুটবল খেলায় গোল হলে, যে দল গোল দেয় আনন্দে চিৎকার করে তারা। সেদিন হয়েছিল অন্যরকম। শুভমের দল তো চিৎকার করলই, যারা গোল খেল তারাও চিৎকার করে উঠল। শুভম প্রথমদিন খেলতে নেমেই গোলে বল ঢুকিয়ে দিয়েছে এই কারণে তাদেরও আনন্দ হচ্ছে। সবাই ছুটে গিয়ে তার পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল। শুভম লজ্জায় কী করবে বুঝতে পারল না।
খেলা শেষে অবনীমাস্টার শুভমের কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'যা বাড়িতে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বস। মনে রাখবি, এই গোলটা তোকে পরীক্ষার খাতাতেও দিতে হবে। খারাপ নম্বরকে গোল দিয়ে হারাতে হবে। শক্ত প্রশ্নকে ড্রিবল করবি, ভুলে যাওয়া প্রশ্নকে হেড মারবি, ধেয়ে আসা প্রশ্নকে রিসিভ করবি, তারপর গোলের সামনে পৌঁছে একবারে কিক। দেখবি জিতে গিয়েছিস। যা এখন। কাল আবার বিকেলে আসবি।'
আবার উলটো ঘটনাও আছে। এই তো কয়েকমাস আগে ক্লাস নাইনের স্বর্ণাভর বাবা স্যারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ঘটনা কী না স্বর্ণাভর লেখাপড়ায় কোনও মন নেই। সারাদিন ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকে। বাইরে তো খেলছেই, বাড়িতে থাকলেও এক কাণ্ড। হয় বল নিয়ে লোফালুফি, নয় ব্যাট হাতে শ্যাডো প্র্যাকটিশ। টিভি খুলে দেশ-বিদেশের ম্যাচ দেখা তো আছে। ইদানিং রাতে ব্যাট পাশে নিয়ে শুতে পর্যন্ত শুরু করেছে। স্যারকে এর একটা বিহিত করতে হবে। স্বর্ণাভর মন যেন লেখাপড়ায় ফেরে।
অবনীমাস্টার একদিন স্বর্ণাভকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, 'তোর জন্য একটা সুখবর রয়েছে।'
স্বর্ণাভ উৎসাহ নিয়ে বলল, 'কী সুখবর স্যার? আমি কি স্কুল টিমে চান্স পেয়েছি? সামার ক্রিকেটে খেলতে পারব?'
অবনীমাস্টার বললেন, 'তার থেকেও ভালো খবর। এবার থেকে তুই চব্বিশঘণ্টা ক্রিকেটের সঙ্গে থাকতে পারবি।'
স্বর্ণাভ তো লাফিয়ে উঠল। বলল, 'বলেন কী স্যার! সে তো দারুণ হবে। আমি যে তাই চাই, বাড়িতে বাবা-মা রাজি হন না। খালি বলে, ক্রিকেট ছেড়ে একটু লেখাপড়া কর। কী করে এমনটা হবে স্যার?'
অবনীমাস্টার বললেন, 'ওসব চিন্তা করতে হবে না। আমি তোর বাবা—মায়ের সঙ্গে কথা বলে নেব। কলকাতায় আমার এক চেনাজানা ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্প আছে। সেখানে তোকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দেব।'
স্বর্ণাভর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বলল, 'সত্যি স্যার?'
অবনীমাস্টার মুচকি হেসে বললেন, 'অবশ্যই সত্যি। ওই কোচিং ক্যাম্পের মজা হল, একেবারে ভোরবেলা থেকে খেলা শুরু হয়। মাঝে খাওয়া-দাওয়ার বিরতি, একটু রেস্ট, আবার খেলা। যতক্ষণ আলো ততক্ষণ খেলা। দরকার হলে রাতে আলো জ্বেলে খেলা।'
স্বর্ণাভ হাততালি দিয়ে বলল, 'উফ স্যার! আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।'
অবনীমাস্টার হাসিহাসি মুখে বললেন, 'তুই তাহলে রেডি হয়ে নে। এই শনিবার বিকেলের ট্রেনেই আমরা কলকাতা রওনা হব।'
স্বর্ণাভ এবার একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, 'একেবারে এই শনিবার?'
অবনীমাস্টার ভুরু কুঁচকে বললেন, 'কেন? তোর সমস্যা কী? ট্রেনের টিকিটও তো কেটে ফেলেছি।'
স্বর্ণাভ মাথা চুলকে বলল, 'না মানে স্যার, রবিবার আমার বোনের জন্মদিন কিনা। সন্ধেবেলা হইচই হবে। একটা দিন বাদ দিলে হয় না? ভালো খাওয়া-দাওয়া আছে।'
অবনীমাস্টার মাথা নেড়ে বললেন, 'উহু, তা তো হবে না। এবার থেকে ওসব বাদ দিতে হবে। জন্মদিন, বিয়েবাড়ি ভুলতে হবে। ভাইবোনকে নিয়ে হইচই করবার সময় নেই।'
স্বর্ণাভ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, 'সেকী! স্যার, তাহলে কি রবিবার করে বাড়ি আসব?'
অবনীমাস্টার চোখ কপালে তুলে বলল, 'বাড়ি! না, না, বাড়ি-টাড়ি আসবার কোনও ব্যাপার নেই বাপু। নো ছুটি, নো বাড়ি?'
স্বর্ণাভ কাঁচুমাচু হয়ে বলল, 'স্কুল? ওখানে স্কুলে ভর্তি হব না?'
অবনীমাস্টার বললে, 'স্কুল! তোর কি মাথায় গোলমাল হল স্বর্ণাভ? কলকাতায় গিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় কোথায় তোর? সারদিনই তো খেলতে হবে।'
স্বর্নাভ এবার প্রায় কেঁদে ফেলবার মতো অবস্থা। বলল, 'বন্ধুদের কী হবে? পিন্টু, বিল্টু, গণেশদের সঙ্গে দেখা হবে না? গাছে ওঠা, দিঘিতে সাঁতারের কী হবে?'
'বন্ধু! বন্ধু আবার কী? তুমি একটা ঘরে থাকবে। সেখানে শুধু ব্যাট বল আর উইকেট থাকবে। যেমন তুমি চাও।'
স্বর্নাভ এবার আর্তনাদ করে উঠল।
'না, না, এমনটা চাই না স্যার। মোটেও এমনটা চাই না। শুধু ব্যাট বল আর উইকেট নিয়ে থাকতে পারব না।'
অবনীমাস্টার হেসে, স্বর্ণাভর পিঠে হাত দিয়ে বললেন, 'তাহলে তো ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি একটা সময় পর্যন্ত স্কুলে যেতে হবে, মন দিয়ে লেখাপড়া করতে হবে যে। তবেই না বাবা—মা, ভাই, বোন, বন্ধু সবার সঙ্গে থাকতে পারবে। ক্রিকেটের সঙ্গে তো লেখাপড়ার কোনও ঝগড়া নেই বাপু। বিশ্বের বহু বড় বড় ক্রিকেটার অনেক লেখাপড়া করেছেন। লেখাপড়া না জানলে খেলাধুলোর খুঁটিনাটি জানবে কী করে? বলের গতি, ব্যাটের জোর, ফিল্ডের জ্যামিতি জানতে তো লেখাপড়া করতে হবে।'
এইটুকু কথাতেই কাজ হল। এরপর থেকে স্বর্ণাভ ক্রিকেটের সঙ্গে লেখাপড়াতেও মন দিল।
এই হাসিখুশি, সবার প্রিয় অবনীমাস্টারের জীবনে অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটে সকাল ছ'টা বেজে তিন মিনিট এগারো সেকেন্ডে। সেই মুহূর্তে তাঁর চরিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেল! হাতে তাঁর অতি প্রিয় স্টপওয়াচটা ছিল বলে এত নির্দিষ্ট করে সময় জানা গেছে। ঘটনাটা ঘটল এরকম অবনীমাস্টার একেক দিন একেক ক্লাসের ছেলেদের ভোরবেলা মাঠে আসতে বলেন। সেদিন এসেছিল ক্লাস নাইন। চলছিল পিটি। এক, দুই, তিনের সঙ্গে দু-হাত তোলা নামানোর কসরত। সেই সঙ্গে পায়ের লাফ। অতি সোজা কসরত, মজারও বটে। অবনীমাস্টারের মুখে ছিল বাঁশি। 'পিঁ পিঁ' করে তালে তালে বাজাচ্ছিলেন আর ছেলেরা লাফ দিচ্ছিল। হঠাৎই সৈকতের লাফে তাল কাটল। একের লাফ এসে পড়ল দুইয়ের ঘাড়ে, দুইযের হাত ছোঁড়া গিয়ে পড়ল তিনের ওপর। এরকম ভুল একটু-আধটু হয়েই থাকেন। অবনীমাস্টার এসব ধরেনই না। সেদিন ধরলেন। বিরাট হুংকার দিয়ে উঠলেন।
সৈকত, এটা কী হল! ড্রিল নিয়ে ঠাট্টা হচ্ছে? গাঁট্টা মেরে ঠাট্টা বের করে দেব। একের পিঠে দুই? তোমার পিঠে ক'টা দেব?'
ছেলেরা তো অবাক। গেমটিচারের হল কী! সামান্য ভুলে এত খাপ্পা! বড় ভুলেও তো উনি কখনও বকাঝকা করেন না। হাসতে হাসতে ভুল ধরিয়ে দেন। বলেন, 'ছাত্রদের ভুল মানে মাস্টারের গোলমাল। শেখানোর খামতি রয়ে গিয়েছে।' আজ সেই স্যারের এত রাগ! শরীর-টরীর খারাপ হল নাকি? নাকি সৈকতের ওপর কোনও কারণে রেগে রয়েছেন?
না, সৈকতের একার ব্যাপার নয়। অবনীমাস্টার সারাদিনটাই একেবারে তেড়েফুঁড়ে রইলেন। সকালের ড্রিল থেকে দুপুরের ক্লাস এইটের পিটি ক্লাস, বিকেলের ক্লাস টেন আর নাইনের ফুটবল ম্যাচ পর্যন্ত রেগে রইলেন। সামান্য ভুলে ধমক ধামক তো চললই, এমনকী গাঁট্টা, কানমলাও বাদ গেল না।
রূপপুরের অবনী বসু একবারে পালটে গিয়েছেন। হাসিখুশি মানুষটা এখন খিটখিটে, বদমেজাজি।
রূপপুর পুলিশ থানা।
বড়বাবুর ঘরের দেওয়ালে ঝুলছে মস্ত ঘড়ি। সেই ঘড়ি সময় বলছে, বেলা দশটা বেজে সতেরো মিনিট।
ঘড়ি প্রাচীন আমলের। লম্বাটে কাঠের বাক্সের ভিতর গোল ডায়াল। নীচে পেন্ডুলাম। কাচের জানলা দিয়ে দেখা যায়, দুলছে। লোকে বলে, এ ঘড়ির বয়স নাকি একশো তিন বছর। থানার বড়বাবুকে জিগ্যেস করলে তিনি গম্ভীর হয়ে যান। বলেন, 'আর একটু বেশিই হবে। এই ধরুন একশো চার—সাড়ে চার।'
এই তথ্যের কোনো প্রমাণ নেই। পুলিশের কাছে কেউ প্রমাণ চাইতেও পারে না। সে সাহস কার আছে? তাই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে ঘড়ির বয়স শুনে সবাই খুশি হয়। রূপপুরে এমন প্রাচীন জিনিস রয়েছে সেটাই একটা গর্বের বিষয়। বয়স একশো তিনই হোক, আর চারই হোক।
ঘড়ির গায়ে কোম্পানির নাম ছিল, কিন্তু জায়গাটায় রং গেছে চটে। ফলে নাম পড়া যায় না। তবে 'মেইড ইন ইংল্যান্ড' কথাটা বোঝা যায়। ঘড়ির কাচে ছয় আর সাত অঙ্কের মধ্যে এক টুকরো সেলোটেপ সাঁটা। কাচের চিড় ঢাকতে সেলোটেপ। কেন ঘড়ির কাচে চিড় পড়ল সে বিষয়েও গল্প রয়েছে। গল্প অতি জমজমাট। রূপপুরের মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। আত্মীয়স্বজন বাইরে থেকে এলে শোনানো হয়। পুলিশ থানার ঘড়ির গল্প। ব্যবস্থা করতে পারলে, ঘড়িটা দেখিয়েও আনে কেউ কেউ। টুরিস্ট স্পটে গেলে আশেপাশের দ্রষ্টব্য হিসেবে ঝরনা, দূর্গ, নদী দেখা যায়। একে বলে 'সাইট সিন'। রূপপুরের 'সাইট সিন' হল থানার ঘড়ি। তবে ঘড়ি যেহেতু খোদ বড়বাবুর ঘরের দেওয়ালে রয়েছে, চট করে দেখবার সুযোগ হয় না। উনি ছুটিছাটায় থাকলে হাবিলদারকে ধরে করে ব্যবস্থা করতে হয়।
সেই ঘড়ির গল্প শুনলে মনে মনে উত্তেজনা হয়। গর্বে বুক ভরে ওঠে।
সেই সময় দেশে চলছিল ব্রিটিশদের শাসন। থানার দারোগোবাবুরাও সব ইংরেজ। লালমুখো, তাগড়াই চেহারা। ঢোলা হাফ প্যান্ট, কোমোর চওড়া বেল্ট, ঘোড়ায় চেপে টহল দিয়ে বেড়ান। রূপপুরের 'সাহেব দারোগা'র ছিল বিরাট দাপট। দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করতেন তাদের ওপর ছিল উনি ছিলেন বেজায় খাপ্পা। সুযোগ পেলেই ধরে এনে ফাটকে পুরতেন। তাই রূপপুরের বিপ্লবীরা অতি সাবধানে কাজ করতেন। ছদ্মবেশ নিতেন, নাম বদলে ফেলতেন, গোপন আস্তানায় গা ঢাকা দিয়ে থাকতেন। দারোগাবাবুরাও ছিলেন অতি চতুর। তাঁদের চর থাকত। থানায় এসে চুপিচুপি খবর দিয়ে যেত কোথায় কে লুকিয়ে রয়েছে। রাতে সেইসব আস্তানায় গিয়ে হাজির হতো ইংরেজের পুলিশ। হাতের কাছে যাকে পেত পাকড়াও করে আনত। একবার এক সাহেব দারোগা এক দুঁদে স্বাধীনতা সংগ্রামীকে ধরে ফেললেন। সাহেব ঠেঙানোর ব্যাপারে সেই বিপ্লবীর খুবই নামডাক ছিল। একে পাকড়াও করতে ইংরেজ সরকার একেবারে উঠে পড়ে লেগেছিল। কিছুতেই বাগে পাচ্ছিল না। উনি এমন সব ছদ্মবেশে নিতেন যে চেনাই যেত না। কোনও কোনও সময় কোট প্যান্ট টুপি পরে সাহেব সেজে দিব্যি পুলিশের সামনে ঘুরে বেড়াতেন। রূপপুরের সাহেব দারোগা তাকে ধরতে পেরে তো বেজায় খুশি। ধরেই নিলেন, এবার বিলেত থেকে মেডেল আসবে। সেই মেডেল গলায় ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াবেন। তিনি তো আটক করা বিপ্লবীকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন। জেরা হবে। বাকি দলবলের হদিশ জানতে হবে। বলা যায় না আরও কাউকে ধরতে পারলে হয়তো ব্রিটিশ গর্ভমেন্ট আরও একটা মেডেল পাঠিয়ে দেবে। সাহেব দারোগা জবরদস্ত জেরার জন্য মনে মনে তৈরি, কিন্তু আসামীকে দেখে হতাশ হলেন। এত নামকরা স্বাধীনতা সংগ্রামীর একী হাল! নিরীহ চেহারার একজন ছাপোষা বাঙালি। রোগা প্যাংলা, এক মাথা চুল। খাটো ধুতির ওপর কলার দেওয়া হাফ হাতা জামা। দেখলে মনে হচ্ছে, এক্ষুনি বুঝি কেঁদে ফেলবে। দারোগা ভাবলেন, ধ্যুস, একে আর জবরদস্ত জেরা করে কী লাভ? এক ধমকেই সুড়সুড় করে গোপন কথা সব বলে ফেলবে। শুরু হল জেরা। বিপ্লবীও জবাব দিতে লাগলেন। গলার আওয়াজ খুবই মিনমিনে। এটা সেটা বলবার পর সাহেব দারোগা অতি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বিপ্লবীদের নামে গাল দিতে শুরু করলেন। সেই গাল ছিল ইংরেজি আর ভাঙা বাংলা মেশানো।
'ওহে ছোকরা, তোমার গলার আওয়াজ শুনলেই তোমার দেশের মুরোদ বোঝা যায়। তোমার গলার মতোই মিনমিনে। তোমরা দেশকে স্বাধীন করবে? তাহলেই হয়েছে। ছোঃ। আগে গায়ে জোর আনো, গলায় শক্তি আনো তারপর ইংরেজদের সঙ্গে লড়তে এসো।'
বিপ্লবী নীচু গলায় বললেন, 'সাহেব, আমাকে যা খুশি বলুন, আমার দেশকে গাল দেবেন না।'
দারোগা বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বললেন, 'একশোবার দেব, হাজারবার দেব। তোমার চেহারা দেখলেই তোমার দেশ কেমন বোঝা যায়। রোগা প্যাংলা, দুর্বল।'
বিপ্লবী নাকি এই সময়ে মাথা তুলে চাপা গলায় বলেছিলেন, 'সাহেব, দেখবেন কেমন দুর্বল? প্রমাণ চাই? আমাদের শক্তি বাইরের নয়, ভিতরের। দেশকে ভালোবাসবার শক্তি।'
সাহেব দারোগা চেয়ারে হেলান দিয়ে, ঠোঁটের কোণে হেসে বললেন, 'ফুঃ দিলে ওই শক্তি উড়ে যাবে। তুমি কী প্রমাণ দেবে হে?'
রোগা প্যাংলা চেহারার সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী এবার দিলেন এক হুংকার। এমনি হুংকার নয়, একেবারে বাঘের হুংকার।
'চোপ! একদম চোপ!'
এই রোগা প্যাংলা চেহারা থেকে অমন ভয়ংকর হুংকারের কথা কেউ ভাবতেই পারেনি। থানাটাই কেঁপে উঠল। সাহেব দারোগা থতমত খেয়ে চেয়ার থেকে কাত হয়ে একেবারে মাটিতে ধরাশায়ী হলেন। চেয়ার উলটে পড়ল তাঁর ভুড়ির ওপর। আর সবথেকে আশ্চর্যের ঘটনাটা হল, সামনের দেওয়ালে ঝোলানো বিলেত থেকে আনা ঘড়িটা খসে পড়ল টুপ করে। একেবার গাছের ফলের মতো। তবে বড় কোনও ক্ষতি হল না। সে থামলও না মোটে। শুধু ছয় আর সাতের মাঝখানে একটু চিড় ধরল। সেপাই-টেপাই যে যেখানে ছিল, হড়বড়িয়ে ছুটে এল। মাটিতে চেয়ার চাপা হয়ে থাকা তাগড়াই চেহারার সাহেব তখন নাকি 'কুঁই-কুঁই' আওয়াজ করছিলেন আর বিড়বিড় করে বলছিলেন, 'সেভ মি, প্লিজ সেভ মি'। সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আর সেই স্বাধীনতা সংগ্রামীর কী হল?
শোনা যায়, এই ফাঁকতালে তিনি খোলা জানলা টপকে চম্পট দিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরেই বিলেত থেকে অর্ডার এল, কাজে ফেল করবার জন্য সাহেব দারোগাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি তল্পিতল্পা গুটিয়ে বিলেতে ফিরবেন বলে জাহাজে উঠলেন।
এই ঘড়ি নিয়ে রূপপুরের মানুষের গর্ব হবে না তো কী নিয়ে হবে? আর সেই ঘড়ির সময় অনুযায়ী বেলা দশটা বেজে সতেরো মিনিটে ঘটেছে রূপপুরের দ্বিতীয় অবিশ্বাস্য ঘটনাটি।
থানার বড়বাবু নিবারণ নায়েক পড়েছেন বেজায় দুশ্চিন্তায়।
থানায় বড়বাবু হওয়ার জন্য কী কী গুণ লাগে?
লেখাপড়া তো লাগবেই, তার সঙ্গে লাফাতে, ঝাঁপাতে, দৌড়োতে হবে। সাঁতারকাটা, গাছে চড়া, পাঁচিল টপকানো জরুরি। জানতে হবে রিভলভার চালানো। পাহাড়ে, জঙ্গলে ডাকাতদের সঙ্গে লড়তে কোনও কোনও সময় বন্দুকও ধরতে হবে। আর জানা চাই ছদ্মবেশ নেবার কায়দা।
রূপপুর থানার বড়বাবু নিবারণ নায়েক ছদ্মবেশ নিতে বিরাট ওস্তাদ। তিনি এমন ছদ্মবেশ নিতে পারেন যে চোর-ডাকাত তো দূরের কথা, থানার পুলিশরাই তাদের 'স্যার'-কে চিনতে পারে না। রেলস্টেশনের কুলি থেকে, ফুটবল ম্যাচের রেফারি, ফুচকাওলা থেকে টিয়াপাখি নিয়ে হাত দেখার জ্যোতিষীসবরকম সাজতে পারেন। এই বড়বাবুই গতমাসে ছদ্মবেশ নিয়ে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড করে বসেছিলেন। দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে, মাথায় গামছা বেঁধে চোর সেজে চোরের দলে ঢুকে পড়েছিলেন। গভীর রাতে এক বাড়িতে সিঁদও কাটতে শুরু করলেন। পরিকল্পনা ছিল, চুরির পরপরই গোটা দলটাকে একেবারে হাতেনাতে পাকড়াও করবেন। এদিকে সেই সময়ে পথে টহল দিতে বেরিয়েছিল পুলিশের গাড়ি। গাড়ির হেডলাইট গিয়ে পড়ে মাঠের পাশের এক বাড়ির গায়ে। কে যেন উবু হয়ে বসে শাবল দিয়ে কী যেন করছে। হাবিলদাররা গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামে। ছুটে গিয়ে জাপটে ধরে লোকটাকে। বড়বাবু দেখলেন এ তো বিরাট বিপদ হল! রাস্তায় তো ছদ্মবেশ খোলা যায় না। আর পাঁচটা লোক জেনে যাবে। পরে ছদ্মবেশে আর কাজ করা যাবে না।
তাই নিবারণবাবু চাপা গলায় বললেন, 'অ্যাই, কী করছ? ছাড়ো তোমরা। আমি কে জানো? চিনতে পারো?'
হাবিলদাররা আরও জোরে চেপে ধরে বলল, 'কেন চিনব না? চোরকে চিনব না তো এই মাঝরাতে কাকে চিনব?'
বড়বাবু নিচু গলায় বললেন, 'আমি চোর নই।'
হাবিলদাররা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, 'ধরা পড়বার পর সব চোরই বলে, আমি চোর নই। রূপপুরে চুরি করে বেড়ানোর ঠেলা এবার বুঝবে। আমাদের বড়বাবুকে তো চেনো না।'
নিবারণ নায়েক এবার খুব বিরক্ত হলেন। বললেন, 'আরে আমাকে চিনতে পারছ না! আমিও পুলিশ।'
হাবিলদাররা কটমট চোখে বলল, 'ধরা পড়লে চোরেরা এরকম কত পরিচয় দেয়। নিজেকে পুলিশও বলে। পুলিশ সেজে লোক ঠকানোর ঘটনা কী আমরা কম দেখেছি? বেশি কথা না বলে, মানে মানে ভ্যানে উঠে পড়ো দেখি বাপু।'
নিবারণবাবু এবার রেগে গেলেন। বললেন, 'আমি তোমাদের থানার বড়বাবু। আমি কিন্তু অ্যাকশন নেব।'
হাবিলদাররা হেসে বাঁচে না। চোর বলে কী!
'একবারে নিজেকে বড়বাবু বানিয়ে ফেললে হে! থানায় একবার চল হে চোরবাবু, মিথ্যে কথা বলবার মজা বুঝবে।'
শেষ পর্যন্ত রাস্তার মাঝেই নকল দাঁড়ি-গোফ খুলতে বাধ্য হলেন নিবারণবাবু। হাবিলদাররা তো এবার তাদের 'স্যার'-কে দেখে পালাতে পারলে বাঁচে।
থানার বড়বাবু জন্য এতরকম গুণ থাকবার পরেও নিবারণ নায়েকের একটা অতিরিক্ত গুণ রয়েছে। সেটা হল 'রাগ'। চোর, ডাকাত, গুন্ডা দেখলেই তার রাগ হয়। সেই রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকে। চোখ বড় আর লাল হয়ে যায়। মাথা হয় গরম। গা চিড়বিড় করে, শরীরে হাঁসফাঁস লাগে। যতক্ষণ না রাগ বেরোয়, এই সমস্যা চলতেই থাকে। মাঝপথে আটকে যাওয়া হাঁচির মতো। তখন তিনি ধমক দেন। এমন ধমক যে ভয়ে চোর-ডাকাতদের হাত-পা পেটের ভিতর সিধিঁয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। শুধু ধমক দিয়ে তিনি কত পাজি লোককে যে শায়েস্তা করেছেন তার ঠিক নেই। রূপপুর জায়গাটা যে এত শান্তশিষ্ট, চুরিচামারি কম তার অন্যতম কারণে নিবারণ নায়েকের ধমক। তাকে আড়ালে অনেকে 'ধমকবাবু' বলেও ডাকে। ওর স্টকে নাকি নানা ধরনের রাগ আর বিভিন্ন ধরনের ধমক জমা থাকে। যখন যেমন দরকার হয় তখন তেমন ব্যবহার করেন। সবসময় যে গলা চড়িয়ে রাগ দেখান এমন নয়, নীচু গলাতেও ধমক দিতে জানেন। মুখে বলেন, 'শুধু বাঘের গর্জনই ভয়ের নয়, সাপের হিসহিসানিতে হাড় হিম করে দেয়।'
একবার এক ডাকাত দলের পাণ্ডাকে ফিসফিস করে এমন ধমক দিয়েছিলেন যে সে হড়বড় করে সব বলে ফেলেছিল। দলের বাকি ডাকাতদের নাম, কোথায় ডাকাতির মালপত্র লুকিয়ে রাখা আছে, আগামী দিনে কোন কোন বাড়িতে আর দোকানে ডাকাতি করবার প্ল্যান ছিল সব ফাঁস করেছে। থানার বাকিরা তো অবাক। ডাকাতদের পেটের কথা বের করতে বিরাট ঝক্কি পোয়াতে হয়। তারা খুব শক্ত মনের হয়ে থাকে। পণ করে বসে থাকে, ভাঙব তবু মচকাব না। নিবারণ নায়েক ফিসফিস করেই পারলেন! ফিসফিসানি ধমকে উনি কী বলেছিলেন? নিবারণবাবুকে চেপে ধরতে উনি মুচকি হেসে বললেন, 'বললাম, আমার জোর ধমকের গল্প শুনেছ কি? যদি না শুনে থাকো, আমার কাছে শোনো। একবার তোমার মতো এক ডাকাতকে ধমক দিয়ে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ধমকের কত জোর থাকলে নিজের ধমকে মানুষ নিজেই ভয় পায় একবার ভেবে দেখো বাছাধন। তাই এখন ফিসফিস করে ধমক দিচ্ছি। বাপু সব কথা বলে ফেলো দেখি। রাগ বাড়ছে। আর বাড়তে দিও না। ধমক জোরে হয়ে যাবে। ব্যস, এতেই কাজ হল।'
সেই নিবারণ নায়েকের একী কাণ্ড হল!
ধরা পড়েছে পাঁচিল। পাঁচিল হল রূপপুরের ছিঁচকে চোর। পাঁচিল তার আসল নাম নয়, তবে আসল নাম কেউ জানে না। এই নামের পিছনে কারণও রয়েছে। এই ছেলে পাঁচিল নিয়ে নানারকম কসরত জানে। পাঁচিল টপকানো তার কাছে কোনও ব্যাপার নয়। লম্বা, বেঁটে, ভাঙা, আস্ত সবই তার কাছে জলভাত। পাঁচিল যেমন টপকাতে পারে, তেমন পাঁচিলের ওপর দিয়ে ছুটতেও জানে। ছোটে তো না, যেন উড়ে যায়। তাড়া করেও ধরা যায় না। আর পারে পাঁচিলের আড়ালে গা ঢাকা দিতে। মনে হয় যেন মিশে গেছে। এই চোরের নাম 'পাঁচিল' হবে না তো কী হবে?
এই প্রথম নয়, 'পাঁচিল' আগেও একবার ধরা পড়েছে। থানার বড়বাবুর ধমক শুনে কাঁপতে কাঁপতে নাক—কান মুলে প্রতিজ্ঞা করেছে, আর কখনও চুরি করবে না। নিবারণ নায়েক রাগি হলেও মন অতি নরম। পাঁচিলকে তিনি ক্ষমাও করে দিয়েছিলেন।
'যা এবারের মতো ছেড়ে দিলাম, আর কোনদিনও যদি শুনি চুরি করেছিস, তোর কপালে বিরাট দুঃখ। ধরে এনে এমন ধমক দেব যে সাতদিন হেঁচকি থামবে না।'
পাঁচিল হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'বাপরে হেঁচকিতে আমার খুব ভয় স্যার। ছোটবেলায় কুল খেতে দিয়ে এমন হেচকি শুরু হল যে...।'
বড়বাবু ধমক দিলেন, 'চোপ! যা ভাগ এখান থেকে।'
সেই ধমকে পাঁচিল এক দৌড়ে থানা থেকে বেরিয়ে একেবারে পগাড় পার হতে গিয়ে ভুল করে গেট দিয়ে না বেরিয়ে পাঁচিল টপকে ফেলল। সে ভেবেছিল আর চুরিচামারির মধ্যে থাকবে না। এত ভালো যখন পাঁচিলের ওপর দিয়ে ছুটতে পারে, সার্কাসে কাজ নেবে। দড়ির ওপর ছোটাছুটির খেলা দেখাবে। কিন্তু প্রতিজ্ঞা বেশিদিন রাখতে পারল না। অভ্যেসের বশে কদিন পর ফের চুরি শুরু করে বসল। খবর কানে এল থানায়। বড়বাবু তো রেগে আগুন। এই বিশ্বাসঘাতকতা তিনি মেনে নিতে পারলেন না। এই ছেলেকে ক্ষমা করা হল, তারপরেও একই কাজ! তক্কে তক্কে রইলেন। এবার ধরতে পারলে আর রক্ষে নেই। দুবার চেষ্টাও চালালেন। ধরা গেল না। নিবারণবাবুর রাগ আরও বাড়ল।
ক'দিন পর এক সকালে রূপপুর বাজার থেকে একাট নধর মাপের গোল লাউ চুরি করতে গিয়ে পাঁচিল খেল তাড়া। অতবড় একটা লাউ যে চট করে কোথাও লুকিয়ে ফেলবে তারও তো উপায় নেই। ফেলে পালাতেও মন সায় দিল না। পাঁচিল লাউ হাতেই দিল ছুট। এ-পাড়া সে-পাড়া পেরিয়ে, দিঘির পাশ দিয়ে, মাঠ শর্টকাট করে হাজির হল একেবারে বয়েজ স্কুলের পিছনে। হাতে তখনও লাউ। ভাবল, স্কুলে লুকোতে পারলে এই যাত্রায় বেঁচে যাবে। কেউ সন্দেহ করতে পারবে না। পাঁচিল টপকে ঢুকেও পড়ল সে। কিন্তু লুকোবে কোথায়? ক্লাসরুমে? নাকি লাইব্রেরিতে? ছাদে লুকোলে কেমন হয়? নানা, স্কুলের ভিতর ঢুকে কাজ নেই, ছেলেপিলেরা দেখে ফেললে মুশকিল। হইচই লাগাবে। তার থেকে বাইরেটাই ভালো। এই ভেবে স্কুলের লম্বা পাঁচিলে একবারে মিশে গিয়ে ঘাপটি দিয়ে বসে রইল।
নিবারণবাবুর কাছে খবর ঠিক পৌঁছোল। খবর জোগাড় করবার জন্য তার চর রয়েছে। সে এসে বলল, 'স্যার, পাঁচিল স্কুলে ঢুকেছে।'
নিবারণবাবু চাপা গলায় বললেন, 'হাতে কী রয়েছে? কোনও অস্ত্র?'
চর বলল, 'না স্যার। হাতে রয়েছে লাউ।'
নিবারণবাবু আঁতকে উঠে বললেন, 'লাউ! লাউ কোথা থেকে এল?'
চর বলল, 'স্যার, পাঁচিল বাজার থেকে চুরি করে পালাচ্ছিল।'
নিবারণবাবু একটু ভাবলেন। এই ছেলে অতি চালাক। সুতরাং একে ধরতে হবে বুদ্ধি করে। নিতে হবে ছদ্মবেশ। কীসের ছদ্মবেশে বেটা জব্দ হবে?
থানার বড়বাবু অঙ্কের মাস্টারমশাই সাজলেন। ধুতি-পাঞ্জাবি, গলায় মাফলার, পায়ে পাম্পসু, চোখে গোল চশমা। হাতে চক ডাস্টার আর পাটিগণিতের বই। স্কুলে ঢুকে সোজা চলে এলেন পিছনে। পাঁচিল দেখতে পেলেও ভাবতে পারেনি অঙ্কের মাস্টারমশাই আসলে অঙ্কের মাস্টারমশাই নন। হাতে পাটিগণিতের বই রয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই বইয়ের আড়ালে রয়েছে রিভলভার। বড়বাবু একটু এদিক-ওদিক হাঁটাচলা করেই সোজা হাজির হলেন পাঁচিলের পাশে। একটা ঝোপের আড়াল থেকে রিভলভার তাক করতেই পাঁচিল হাত তুলে সুড়সুড় করে এগিয়ে এল। দুটো হাত তুলতে পারল না। এক হাতে যে নধর লাউটা ধরা আছে।
গোলমাল হল এরপরই।
নিবারণবাবু নিজের ঘরে বসে হাবিলদারকে বললেন, 'নিয়ে এসো ছোকরাকে। ধমক কাকে বলে আজ হাড়ে হাড়ে বুঝবে। জন্মের মতো ওর পাঁচিলগিরি বের করে ছাড়ব।'
পাঁচিল তো কাঁপতে কাঁপতে এসে সামনে দাঁড়াল। বড়বাবুও মনে মনে ধমকের জন্য তৈরি হলেন। কিন্তু ধমক দেবেন কীভাবে? রাগই যে হচ্ছে না! ভুরু কুঁচকে, নাকের পাটা ফুলিয়ে, কান টান টান করে রাগবার চেষ্টা করলেন। লাভ হল না। পাঁচিলের বিশ্বাসঘাতকতার কথা ভাবলেন। বেশি করে ভাবলেন। ফল হল না। মনের ভিতর হাতাড়ি পাতাড়ি করে রাগ খুঁজতে লাগলেন। হায়রে! কোথায় গেল তার বিখ্যাত রাগ? সামনের দেয়ালে টাঙানো সাহেবদের রেখে যাওয়া সেই ঘড়ির দিকে মুখ তুলে তাকালেন। সময় দেখলেন। বেলা দশটা বেজে সতেরো মিনিটে। এই মুহূর্তে একী হল তার! শরীর থেকে রাগ উধাও হয়ে গেল!
পাঁচিল টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল আর মনে মনে ধমকের দেবতাকে ডাকছিল। সে ধরেই নিয়েছে, এত দেবতা থাকলে, 'ধমকের দেবতা'ও নিশ্চয় রয়েছেন।
'হে ধমকের ঠাকুর, আমাকে রক্ষা করো। বড়বাবুর ধমকের জোর কমিয়ে দাও। এই বার যদি মাপ করে দাও আর এ পথে কোনওদিন আসব না। সামনের শীতেই সার্কাসে ঢুকে যাব। আমার বড়মামা সার্কাসে চেনাজানা আছে। তিনি কি ভাগ্নের জন্য এইটুকু করবেন না? অবশ্যই করবেন ঠাকুর।'
কিন্তু কোথায় বড়বাবুর ধমক? এক মিনিট, দু-মিনিট, তিন মিনিট চলে গেল। ধমক শুনতে না পেয়ে চোখ খুলল পাঁচিল।
বড়বাবু থম মেরে বসে রয়েছেন। অসহায় চোখে তাকিয়ে রয়েছেন। পাঁচিল মাথা চুলকে বলল, 'স্যার, আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?'
বড়বাবু এ কথার জবাব না দিয়ে, হাবিলদারকে ডেকে শান্তভাবে বললেন, 'পাঁচিলকে ছেড়ে দাও। ওকে এবারও ক্ষমা করে দিলাম। শেষ সুযোগ।'
থানা থেকে বেরিয়ে 'ভ্যাঁ' করে কেঁদে ফেলল পাঁচিল। হাবিলদার বিরক্ত হয়ে কটমট চোখে বলল, 'অ্যাই গাধা, তুই কাঁদিস কেন? তোকে কেউ মারধোর করেনি। ফাটকেও পোরেনি।'
পাঁচিল চোখ মুছে মেজাজ দেখিয়ে বলল, 'বড়বাবুর এই অবস্থা দেখে কাঁদব না? উনি রাগতে পারছেন না, ধমক দিতে পারছেন না। ওকে এমনটা মানায়? চোর বলে কি পাঁচিল এতই নিষ্ঠুর? এই নিয়ে দু-দুবার ক্ষমা করলেন আমায়, ওর জন্য আমি কাঁদব না তো কে কাঁদবে? তুমি? হাঁদারাম কোথাকার।'
এবার হাবিলদারও কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 'বড়বাবুর নিশ্চয় বড় অসুখ করেছে। নইলে এমন হয়? আহারে, অমন সুন্দর ধমক!'
ঘরের ভিতর বসে নিবারণবাবু নার্ভাস। তারও মনে হচ্ছে কোনও গোলমাল হচ্ছে। গোলমালটা কী? শরীর খারাপ? অসুখ হল কোনও? সেই অসুখ রাগ ভুলিয়ে দিল? হতে পারে। অসুখ-বিসুখের তো অন্ত নেই। অনেকে তো বলে, রাগ একটা অসুখ। তাহলে 'রাগ ভুলে যাওয়া'টা অসুখ হতে অসুবিধে কোথায়? কিন্তু এই অসুখ কতক্ষণের? এক ঘণ্টা? নাকি একদিন?
এক ঘণ্টাও নয়, এক দিনেরও নয়। সাতদিন কেটে গেল রূপপুর থানার বড়বাবুর রাগ ফিরল না। এই ক'দিনে একজন করে পকেটমার, চোর, ডাকাত ধরাও পড়ল, কিন্তু ধমক খেল না। তারা খুবই অবাক হল। অন্য পুলিশদেরও মন খারাপ। বড়বাবুর ধমক শুধু রূপপুরের চোর-ডাকাতদের জব্দ করেনি, থানার প্রেস্টিজও বাড়িয়েছে। এখন কী হবে?
রূপপুর জুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ল, অসম্ভব ঘটনা ঘটেছে। থানার বড়বাবু রাগতে ভুলে গিয়েছেন।
অবনী বসু হাসি মজা ভুলে খিটখিটে তো হয়েছেনই, আজকাল তিনি ছেলেদের বেকায়দায় ফেলবার জন্য নানা ধরনের পরিকল্পনা করেন। সেদিন ক্লাস সেভেনের অভ্রকে ডেকে পাঠালেন। অভ্রর তো মুখ শুকিয়ে আমসি। আগে অবনীমাস্টার ডাকলে মন 'খুশি খুশি' হয়ে যেত। এখন হয়েছে উলটো। অভ্র দুরু দুরু বুকে স্যারের কাছে গেল।
'বল তো তোদের কোন ড্রিলটা সহজ লাগে?'
অভ্র কী বলবে প্রথমটায় বুঝতে পারল না। অনেক মাথা চুলকে, ঢোঁক গিলে বলল, 'মনে হয় ডন বৈঠক...নানা, হপ জাম্পটাই সহজ...তাও ঠিক নয়...শুধু দৌড়টাই সহজ মনে হয় স্যার...মাঠ ঘিরে দৌড়...নানা সেটাও নয়...।'
অবনীমাস্টার দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, 'ঠিক করে বল। একবার এটা, একবার সেটা বলছিস কেন?'
অভ্রর তো প্রায় কেঁদে ফেলবার মতো অবস্থা। বলল, 'কোনটা সোজা মনে পড়ছে না স্যার।'
অবনীমাস্টার ওপর নীচে মাথা দুলিয়ে বললেন, 'আজ ড্রিল পিরিয়ডেই বাছাধনেরা বুঝতে পারবে কোনটা সোজা আর কোনটা কঠিন।'
ফোর্থ পিরিয়ডে ড্রিলের জন্য মাঠে যেতে ছেলেরা আবার বুঝতে পারল তাদের ড্রিলমাস্টার কতটা বদলে গিয়েছেন। তিনি সবক'টা সহজ ড্রিলকে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে কঠিন বানিয়ে ফেলছেন। তিনটে ডন দিয়েই মাঠ ঘিরে একপাক দৌড়, তারপরেই পাঁচটা করে বৈঠক। বৈঠক শেষ হলেই দুটো করে হপ জাম্প, তারপরেই ফের এক পাক দৌড়।
এই ড্রিল একবার করতেই ছেলেদের অবস্থা কাহিল। ঘেমেনেয়ে, হাঁপিয়ে, জিব বেরিয়ে একসা কাণ্ড। বসে পড়লেই অবনীমাস্টার ফড়ফড় করে হুইশল দিতে লাগলেন।
'নেভার, বসা চলবে না। ড্রিল করতে গেলে নো বিশ্রাম। শরীরকে কষ্ট দিতে হবে।'
ধীমান মনে সাহস এনে বলল, 'স্যার, আগে তো আপনি অন্য কথা বলতেন। বলতেন, ড্রিল, এক্সারসাইজ শরীরকে মজবুত করবার জন্য। কষ্ট দেবার জন্য নয়।'
অবনী বসু অবাক হয়ে বললেন, 'এমন কথা বলতাম নাকি! ছি-ছি। খুবই ভুল করেছি। তোমরা ভুল শিখেছ। এখন তোমরা ডবল পরিশ্রম করে সেই ভুল সংশোধন করো। নাও, শুরু করো। চিন্তা করো না, আমার কাছে স্টপওয়াচ রয়েছে। সময় মিলিয়ে নেব।'
ছেলেদের তো ভিমড়ি খাওয়ার অবস্থা। মানুষটা একই তো? নাকি বদলে গিয়েছে? গেমটিচারের চেহারায় স্কুলে অন্য কেউ এসে হাজির হননি তো? যেমন রূপকথার গল্পে থাকে। বাইরেটা একই, ভিতরটা বদলে গেছে।
শুধু স্কুলে নয়, স্কুলের বাইরেও অবনীমাস্টার তার পালটে যাওয়া রূপ দেখালেন। সেদিন ছিল 'বালক সংঘ' আর 'আমার খেলব' ক্লাবের ক্রিকেট ম্যাচ। দুটোই জবরদস্ত টিম।
খেলা ভালোই চলছিল। রূপপুরের বহু মানুষ মাঠের পাশে ভিড় করে খেলা দেখছেন। তাদের মধ্যে অবনী বসুও ছিলেন। তিনি বিশেষ কোনও ক্লাবের সমর্থক নন। দু-দলের প্লেয়ারের ভুল দেখলেই নিজের মনে রাগ দেখাচ্ছিলেন। রাগ দেখানোর ভঙ্গিমাও নানারকম। কখনও বাঁ-হাতের তালুতে ডান হাতের ঘুসি। কখনও দু-হাতে মুঠো করে আস্ফালন, কখনও বাউন্ডারি লাইনের বাইরে বিরক্ত হয়ে পায়চারি। সেইসঙ্গে নিজের মনে গজগজানি।
'উফ! এটা একটা ম্যাচ হচ্ছে নাকি? ছি-ছি। ক্রিকেট না ডাংগুলি? দুটো দলই সমান অপদার্থ। না পারছে বল, না পারছে ব্যাট। ফিল্ডিং তো অতি নিম্নমানের। মনে হচ্ছে, জলে মাছ ধরছে। আমার হাতে যদি ক্ষমতা থাকত, রূপপুরে ক্রিকেট খেলাই বন্ধ করে দিতাম।'
দর্শকরা অনেকেই অবনীমাস্টারের এই গজগজানি শুনতে পাচ্ছিল। তারা তো অবাক। হাসিখুশি মানুষটার এমন বদমেজাজি হয়ে গেলেন কী করে! খেলায় তো ঠিক ভুল থাকেই, তাই নিয়ে এত চটামটির কী হয়েছে?
শুধু মুখে রাগ—বিরক্তি নয়, একটু পরে বড় ঘটনাও ঘটিয়ে ফেললেন অবনীমাস্টার।
'আমার খেলব' ক্লাবের ব্যাটসম্যান বিজয়নাথের তোলা একটা ক্যাচ 'বালক সংঘ'-এর উইকেটকিপার চন্দন হাত ফসকে ফেলে দিল। ব্যস, অবনীমাস্টার মাঠের পাশ থেকে একটা কঞ্চি নিয়ে নেমে পড়লেন মাঠে। সেই কঞ্চি মাথার ওপর তুলে তরবারির মতো ঘোরাতে ঘোরাতে তেড়ে গেলেন উইকেটকিপারের দিকে। সঙ্গে হুংকার।
'তোকে আজ কী করি দেখ। এমন সহজ ক্যাচ ফেলেছিল তুই! তোর একটা হাড়ও আস্ত রাখব না। তুই ক্রিকেট খেলার কলঙ্ক।'
এই দৃশ্য দেখে চন্দন তো দিল ছুট। অবনীমাস্টারও ছাড়বেন না। তিনিও পিছু নিলেন। মাঠ জুড়ে গোল হয়ে দুজনে ছুটতে লাগল।
রূপপুরের মতো শান্ত জায়গা এমন ঘটনা আগে কখনও দেখেনি। খেলা পণ্ড হয়ে গেল।
ঘটনা আরও ঘটল। শনিবার বিকেলে ফুটবল মাঠের একপাশে রূপপুরের স্কুলের মেয়েরা ক্যারাটে শেখে। মাঝেমধ্যে তাদের উৎসাহ দিতে সেখানে যেতেন অবনীমাস্টার। ব্লক, পাঞ্চ, কিক দেখে হাততালি দিতেন। কখনও কখনও চকোলেট, বিস্কুট, বাদামও নিয়ে যেতেন। ভালো করবার প্রাইজ। মেয়েরা তো খুব খুশি হত। তাদের সঙ্গে কথা বলতেন অবনীমাস্টার।
'ক্যারাটে একটা চমৎকার খেলা। মজাও আছে আবার পাজি লোকদের সাজাও আছে। পাজি লোকদের শায়েস্তা করতে পুলিশের লাঠি-বন্দুক কত কী লাগে, তোদের ওসব কিছু লাগবে না।'
মেয়েরা বলত, 'আমরা তো এখনও ভালো পারি না।'
অবনীমাস্টার হেসে বলতেন, 'একদিনে কী সব পারা যায় নাকি? মন দিয়ে শেখ, এক সময়ে দেখবি সব পারছিস।'
সেই অবনীমাস্টার গত শনিবার ক্যারাটে শেখার মাঠে গিয়ে বিরাট হম্বিতম্বি শুরু করলেন।
'ব্যাপারটা কী? বলি ব্যাপারটা কী? ক্যারাটেতে ছাইভস্ম আছেটা কী? সামান্য হাত-পা ছোঁড়া, বেশি তো নয়। এতদিন হয়ে গেল এই সামান্যটুকু শিখতে পারলি না? আর এক সপ্তাহ সময় দেব, যদি না পারিস, ক্যারাটে শেখা বন্ধ।'
মেয়েরা তো ভয়ে কাঁটা। 'ভালোমানুষ'টার কী হয়েছে!
বাকাবকি, রাগারাগি করে গেমটিচার অবস্থা এমন করে ফেলেছেন যে রূপপুরের ছেলেরা খেলার নাম শুনলে ভয় পাচ্ছে। মাথা চুলকে বলছে, 'থাক, ফুটবল খেলে কাজ নেই, তার থেকে বরং খান দশেক পাটিগণিত কষি। চৌবাচ্চায় জল বেরোনো আর জল ঢোকার হিসেবটা কিছুতেই মিলছে না। সামনে পরীক্ষা আসছে কিনা।'
আসলে পরীক্ষা-টরীক্ষা কিছুই ছিল না। অবনীমাস্টারের ধারে-কাছে না যাওয়ার মতলব। অবনীমাস্টারও তেমন। তিনি হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
'শরীরচর্চা, খেলাধুলোয় যে ফাঁকি দেবে তার বিপদ আছে। পরীক্ষার সময় সব সাবজেক্ট থেকে নম্বর কাটবার ব্যবস্থা হবে।'
রূপপুর ভালো নেই।
তিন মাস কেটে গেল থানার বড়বাবু রাগ ভুলে রয়েছেন তো রয়েইছেন। স্কুলের গেমটিচারেরও অবস্থা তাই। তাঁর মুখে হাসি আজও ফেরেনি। বিরক্তি আর রাগ নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ছেলেমেয়েদের বকাঝকা দিচ্ছেন।
উলটে পালটে যাওয়ার এই খবর রূপপুরের কারও আর জানতে বাকি নেই। এখন সবাই জানে, যতই রূপকথার মতো শোনাক না কেন, এ কাহিনি 'গোপ্পে ননা'-র বানানো গল্প নয়। একবারে সত্যি।
কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। এতে শুধু নিবারণ নায়েক আর অবনী বসুর চরিত্র বদলায়নি, গোটা রূপপুরটাই যে বদলে গিয়েছে। চুরি-ডাকাতি বেড়েছে। বাড়বেই তো। যেখানে পুলিশের বড়বাবু রাগতে পারেন না, সেখানে চোর-ডাকাতরা ভয় পাবে কেন? গত মাসে তো একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছে। অপমানের ঘটনা। ঠকবাজ পটাই দুজন বাইরের লোককে ঠকিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। থানায় ধরে আনা হল।
বড়বাবু বললেন, 'কীরে পটাই কী করেছিস?'
পটাই বলল, 'বেশি কিছু করিনি বড়বাবু, হাতে ব্যাগ নিয়ে দুজনে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মনে হল, কলকাতা থেকে এসেছেন। এখানকার পথঘাট তেমন চেনেন না। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, ব্যাগদুটো আমায় দিন। আপনারা রূপপুরের অতিথি, আপনারা কেন ব্যাগ বইবেন? ওরা ব্যাগ দিলেন। আমি খানিকটা পথ গিয়ে বললাম, একটু দাঁড়ান, ওই সামনের গলিতে আমার বাড়ি। সাইকেলটা নিয়ে আসি। ব্যাগদুটো সাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে যাব। ওরা রাজি হলেন। আমিও ব্যাগ নিয়ে গলির ভিতর ঢুকে চম্পট দিলাম।'
বড়বাবু শান্ত ভাবে বললেন, 'এটা কি ঠিক হল? বাইরের মানুষের কাছে রূপপুরের সুনাম নষ্ট হল না?'
পটাই হাত কচলে বলল, 'তা আর কী করা যাবে? যেখানকার থানার বড়বাবু আমার মতো সামান্য ঠকবাজের সামনে ভেবলা হয়ে বসে থাকেন, সেখানকার সুনাম তো একটু নষ্ট হবেই।'
বড়বাবু বুঝলেন, এবার তার রাগা উচিত এবং পটাইকে এমন ধমক দেওয়া উচিত যাতে সে গোটাদিন ধরে চোখে সর্ষেফুল দেখে। কিছুতেই রাগ এল না। এত অপমানিত হয়েও তিনি চুপ করে রইলেন।
রূপপুরের স্কুলের ছেলেমেয়েদের মুখ পাকাপাকি ভাবে শুকিয়ে গিয়েছে। শুকোবে তো নিশ্চয়। খেলাধুলো যখন বিভীষিকা হয়ে যায় তখন মুখ শুকনো করা ছাড়া উপায় কী? শুধু ড্রিল, ফুটবল, ক্রিকেট, ক্যারাটে নয়, অবনীমাস্টার গাছে চড়া, সাঁতার কাটা এমনকী লুকোচুরি খেলাতে পর্যন্ত শাসন শুরু করে দিয়েছেন। এক রবিবার রূপপুরের পুরোনো কেল্লার পাশে কয়েকজন লুকোচুরি খেলছিল। জায়গাটা শহরের মাঝখানে হলেও একটু যেন আড়ালে। গাছপালায় ঢাকা। সাইকেল চেপে যাচ্ছিলেন অবনী বসু। ব্রেক কষে দাঁড়ালেন। গাছের আড়াল থেকে নজর করে দেখলেন। তারপর এগিয়ে এসে শুরু করলেন বকুনি।
'এই তোদের লুকোচুরি খেলা! দেখলেও লজ্জা করে। তোদের বয়েসে আমরা কত মজা করেই না এসব খেলেছি। এরকম বোকার মতো লুকোলে হয়? দেখেই বুঝেছি, কোনও প্র্যাকটিশ নেই। তোরা লুকোচুরি খেলার কলঙ্ক। যা ভাগ।'
ছেলেমেয়েরা খেলা বন্ধ করে পালাল।
যে জায়গায় ছোটদের মনে আনন্দ নেই, সেই জায়গা ভালো থাকবে কী করে? রূপপুরের কিছু মানুষ ডাক্তার মাধব সামন্তর সঙ্গে কথা বলতে গেলেন। অনেকেই মনে করছেন, থানার বড়বাবু এবং গেমটিচারের এই চরিত্র বদল আসলে কোনও অসুখ। ডাক্তার যদি ওযুধ দিতে পারেন এবং সে ওষুধ যদি কোনওরকমে দুজনকে খাওয়ানো যায় তাহলে সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে। সেই কারণেই ডাক্তার সামন্তর কাছে যাওয়া।
এই দলে অন্যদের সঙ্গে রাখাল দত্ত ছিলেন। তার হাতে কোনও কাজ নেই। চেয়ারে গোলমাল হওয়ার পর তার 'রং বদল' প্রজেক্ট ভেস্তে গিয়েছে। তা বলে তো আর বাড়িতে বসে থাকা যায় না। তাই তিনি এখন 'চরিত্র বদল'—এর কিনারা করতে নেমে পড়েছেন। আর ভিড়ে মিশেছিল ননা। রূপপুরের 'গোপ্পে ননা'। এই মওকায় যদি কোনও গল্প পাওয়া যায় এই আশায় সে দলে ঢুকে পড়েছে।
ডাক্তার সামন্ত রূপপুরের একজন বিশিষ্ট মানুষ। অতি উপকারী। তিনি সবাইকে ঘরে বসালেন।
'ডাক্তারবাবু, আপনিও তো এখানকার বাসিন্দা। সবই তো জানেন। কিছু কি করা যাবে?'
ডাক্তারবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, 'আমি অনেক ভেবেছি। হাসিকে রাগ আর রাগকে হাসিতে উলটে দিতে পারে এমন ওষুধের কথা আমার জানা নেই। সবথেকে বড় কথা হল, এই চরিত্র বদল আদৌ কি কোনও অসুখ?'
অন্যরা বলল, 'তবে কী?'
ডাক্তারবাবু হতাশ গলায় বললেন, 'সেটাই তো বুঝতে পারছি না।'
সবাই বলল, 'তাহলে উপায় কী ডাক্তারবাবু? রূপপুরের অবস্থা যে দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। চুরি-ডাকাতির ভয়ে লোকে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে না। ছোটদের মন খারাপের জন্য বাইরে থেকে আত্মীয়স্বজন আসতে চায় না।'
ডাক্তারবাবু খানিকক্ষণ ভাবলেন। তারপর খানিকটা নিজের মনেই বললেন, 'একটাই পথ। যদি দুজনে কোনও ধাক্কা খায়...এমন কোনও ঘটনা যেটা ওদের মনে আঘাত করবে...হয়তো পুরোনো চরিত্র ফিরে পাবেন...এছাড়া তো কোনও উপায় দেখছি না।'
সবাই বলল, 'ডাক্তারবাবু, ধাক্কাটা কী? আর সেটা দেবেই বা কে?'
ডাক্তারবাবু আবার হতাশ গলায় বললেন, 'সেটাও তো জানি না। দেখুন সবাই মিলে ভেবে।'
বাড়ি ফেরবার পথে ননা রাখাল দত্তর পাশে হাঁটতে লাগল।
'চলুন স্যার, একটু ফুটবল মাঠে যাই।'
রাখাল দত্ত অবাক হয়ে বললেন, 'ফুটবল মাঠে যাব! এই বুড়ো বয়েসে?'
ননা মুচকি হেসে বলল, 'মাঠে যাবার আবার বয়স কী স্যার? এই সন্ধের ফুরফুরে বাতাসে সবুজ মাঠে খানিকটা বসলে অতি মনোরম লাগবে।'
রাখালবাবু ভাবলেন, হাতে কাজ যখন নেই এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে কী হবে? ননার কথায় রাজি হয়ে গেলেন। মাঠে এসে একপাশে বসা হল। ননা এক ঠোঙা গরম বাদাম কিনে এনেছে। খুবই ভালো লাগল রাখালবাবুর। আহা! কতদিন পর মাঠে এসে বসেছেন। সূর্য ডোবার পরেও আকাশে নরম আলো রয়ে গিয়েছে। সবুজ মাঠে সেই আলো পড়ে মায়া তৈরি করছে যেন। রাখালবাবু বুক ভরে শ্বাস নিলেন।
ননা বাদাম মুখে ফেলে বলল, 'স্যার, আমার একটা গল্প মনে পড়ছে।'
রাখালবাবু বললেন, 'আবার গল্প! তোমার কি এই অভ্যেস যাবে না?'
ননা গলা নামিয়ে বলল, 'গল্পটা আগে শুনুন না স্যার। আমাদের রূপপুর থানায় বড়বাবুর ঘরে একটা ঘড়ি রয়েছে...'
রাখালবাবু কড়া গলায় বললেন, 'ওই ঘড়ির গল্প আমার জানা আছে। তোমার মতলবটা বলো তো ননা।'
ননা রাখালবাবুর হাতে ক'টা বাদাম ধরিয়ে বলল, 'স্যার, ধাক্কা দেওয়ার জন্য মাথায় পরিকল্পনা এসেছে।'
রাখালবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'কাকে ধাক্কা?'
নন বলল, 'ওই যে ডাক্তারবাবু বললেন। দুজনকেই ধাক্কা দিতে হবে। হাত গুটিয়ে না বসে দেখি না এবার নিজেই একটা গল্প বানাতে পারি কিনা। সত্যি গল্প।'
রাখালবাবু তেমন কিছু বুঝতে পারলেন না। শুধু বুঝলেন, ননা রূপপুরের ভালো চাইছে। তিনি গলা নামিয়ে বললেন, 'আমাকে যদি কাজে লাগে জানাতে লজ্জা পেও না ননা। হাতে আমার অঢেল সময়। সেই সময় ফালতু কাজে নষ্ট না করে রূপপুরের জন্য যদি কাজে লাগতে পারি...।'
ননা খানিকটা ঝাল নুন মুখে দিয়ে বলল, 'অবশ্যই লাগবে স্যার। আপনাকে লাগবে, পাঁচিলকেও লাগবে। আপনি দেখবেন ড্রিল স্যারের ব্যাপারটা। আমি দেখব বড়বাবুকে।'
রাখালবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। একটা জরুরি কাজে লাগবার উত্তেজনা। বললেন, 'পাঁচিল! মানে ওই ছিঁচকে চোর?'
ননা হাসিমুখে বলল, 'হ্যাঁ স্যার। চোর হলে কী হবে, পাঁচিল ছেলেটা আর পাঁচজনের মতো নয়। থানার বড়বাবুকে সে বড়োই ভালোবাসে। সেদিন আমাকে বলল, বড়বাবুর এই বদলে তার খুবই মন খারাপ। ওই মানুষটা নাকি তাকে দু-দুবার ক্ষমা করে দিয়েছেন। বড়বাবুর জন্য সে সবকিছু করতে পারে।'
রাখালবাবু বললেন, 'ননা, আবার গল্প বানাচ্ছ না তো?'
ননা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'এবার বানাব স্যার। থানার হাবিলদারদের একটু হাত করতে হবে। অসুবিধে হবে না। থানার কাঠের কাজ তো সব আমিই করি।' এরপর ঝুঁকে পড়ে রাখালবাবুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, 'স্যার, বয়েজ স্কুলের কোনও ছাত্রকে চেনেন নাকি?'
রাখালবাবু উৎসাহ নিয়ে বললেন, 'চিনি বই কী। পার্থ, ক্লাস নাইনের পার্থ তো আমাদের বাড়ির পাশেই থাকে। মাঝেমধ্যে আমার কাছে অ্যালজেব্রা দেখাতে আসে।'
ননা উজ্বল মুখে বলল, 'খুব ভালো স্যার। পার্থকে একটা কাজ করতে হবে। আপনি রাজি করাবেন।'
এরপরের গল্পটা বড় নয়, ছোট। তবে ছোট হলে কী হবে, রূপকথার থেকে কম জমজমাট নয়।
গতকাল রূপপুরে পরপর দুটো ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটা ঘটেছে সকাল সাতটা বেজে দশ মিনিট সতেরো সেকেন্ডে আর দ্বিতীয় ঘটনার সময়, বেলা এগারোটা বেজে তেরো মিনিটে।
রূপপুর স্কুলের মাঠে বয়েজ স্কুলের গেমটিচার অবনী বসু ক্লাস নাইনের ছেলেদের ফুটবল দিয়ে হেড প্র্যাকটিশ করাচ্ছিলেন। ফুটবলে হেড দেওয়ায় খুব মজা, কিন্তু অবনীমাস্টার তাকে করে তুলেছেন কঠিন। তিনি ঘোষণা করেছেন, একবারে সময় মেনে, মিনিট সেকেন্ড ধরে হেড দিতে হবে। মিস করলে হাফ ইয়ারলির পরীক্ষার ভূগোল আর ইতিহাস খাতা থেকে পাঁচ নম্বর করে কাটা। কী ভয়ংকর! কোথায় ফুটবল আর কোথায় ইতিহাস, ভূগোল!
প্র্যাকটিশ শুরুর আগে অবনীমাস্টার ব্যাগ থেকে স্টপওয়াচটা বের করতে গিয়ে থমকে গেলেন। স্টপওয়াচ কোথায়? অবনীমাস্টার ব্যস্ত হয়ে ব্যাগ হাতড়ালেন, ব্যাগ ঝাড়লেন। না, নেই। কোথাও যে ফেলে আসবেন এমন নয়। এ জিনিস তার ব্যাগেই থাকে। বাড়িতে জানলার পাশের টেবিলে রাখা থাকে ব্যাগ। ব্যাগ থেকে বই খাতা, পেন, ছাতা, টিফিনের বাক্স সবই রোজ বের করেন, স্টপওয়াচ বের করেন না। অবনীমাস্টার অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি ঘামতে থাকলেন। মাথার ভিতর সব যেন গোল পাকিয়ে গেল। স্টপওয়াচ ছাড়া তার যে এক মুহূর্ত চলে না। জিনিসটা এমন নয় যে চট করে রূপপুরের কোনও দোকানে গিয়ে একটা কিনে ফেলবেন। পেলেও পছন্দ মতো হবে না। কলকাতা থেকে অনেক খুঁজে এটা কিনেছিলেন। হাতে ঠিক মতো ধরা যায়, রংটাও সুন্দর। তবে কি আবার কলকাতায় যেতে হবে? 'এক রাত, এক বেলা'-র ব্যাপার। সে মস্ত ঝামেলা। ঝামেলা করেও কি এমন সুন্দর জিনিস আর পাওয়া যাবে? দ্রুত ভেঙে পড়লেন অবনীমাস্টার। মাথায় হাত দিয়ে বসেই পড়লেন ধপ করে। রাগ, বিরক্তি, ফুটবলের হেড, পরীক্ষার খাতার নম্বর কাটা সব ভুলে গেলেন।
এই সময় পার্থ এগিয়ে এল গুটিগুটি।
'স্যার, চিন্তা করবেন না। আমরা খুঁজে দিচ্ছি।'
অবনীমাস্টার মুখ তুলে বললেন, 'খুঁজে দিবি? তোরা কোথায় পাবি?'
পার্থ বলল, 'দেখি না চেষ্টা করে। মনে হয় এই মাঠেই কোথাও পড়ে গিয়েছে। আপনি শান্ত হন।'
অবনীমাস্টারের মন ভরে গেল। এইটুকু ছেলের মনে এত দরদ! স্টপওয়াচ না পাওয়া যাক, তার ছাত্ররা যে তাকে এত ভালো সেটাও তো জানা গেল। নাকি আগেও জানতেন? ভুলে গিয়েছিলেন নাকি? আবার মনে পড়ছে? যা খুশি হোক, তাঁর মন ভরে গেছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, 'আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখ।'
ক্লাস নাইনের ছেলেরা ড্রিলের ক্লাসে শেখা নানা ধরনের কসরত করে স্টপওয়াচ খোঁজা শুরু করল। দৌড় ঝাপ, হামাগুড়ি, বূকে হাঁটা কিছুই বাকি থাকল না। শেষ পর্যন্ত পার্থ মাঠের পাশে এক ঝোপের আড়াল থেকে জিনিসটা উদ্ধারও করল। স্টপওয়াচটা তখন বলছে সময় সাতটা বেজে দশ মিনিট সতেরো সেকেন্ড।
অবনীমাস্টার ছেলেদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। একগাল হেসে বললেন, 'খুব আনন্দ হচ্ছে। স্টপওয়াচ ফিরে পাওয়ার আনন্দে নয়, তোদের মতো একদল চমৎকার ছাত্র পাওয়ার আনন্দে। তোদের কত বকাঝকা করে ফেলেছি, তারপরেও আমার জন্য তোরা কত পরিশ্রমই না করলি!'
পার্থ বলল, 'স্যার, শুধু স্টপওয়াচ নয়, আপনার মুখে হাসিও ফিরে এসেছে।'
সবাই হাততালি দিয়ে উঠল।
গার্লস স্কুলের মেয়েরা মাঠের পাশ দিয়ে সাইকেলে করে স্কুল যাচ্ছিল। অবনী বসুর মুখে হাসি দেখে তারাও থমকে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে শুরু করল। রাখালবাবু আর পার্থ ছাড়া কেউ জানতেও পারল না আসল ঘটনা। আগের দিন রাতে পাঁচিল অবনীমাস্টারের ঘরের জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ব্যাগ খুলেছে। স্টপওয়াচটা নিয়ে নেয়। আজ ভোরে এসে লুকিয়ে রেখে গিয়েছিল ঝোপের ভিতর। পার্থকে রাখালবাবু সব শিখিয়ে দেন।
আর রূপপুর থানায় কী হল?
বড়বাবু অফিসে ঢুকেছিলেন একটু দেরি করে। গতকাল রাতে ঠিক মতো ঘুম হয়নি। তাই থানায় আসতে এগারোটা বেজে গেছে। কাগজপত্র গোছাতে গোছাতে রোজকার মতো একবার মুখে তুলে দেওয়ালের দিকে তাকালেন। চমকে উঠলেন।
একী! ঘড়ি কই! ব্রিটিশ আমলের সেই গর্বের ঘড়ির জায়গায় একটা নতুন চকচকে গোল ঘড়ি ঝুলছে! কাচে কোনও সেলোটেপ নেই।
মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল নিবারণ নায়েকের। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার দিলেন। ছুটে এল হাবিলদার।
'ঘড়ি কোথায়?'
হাবিলদার মাথা নামিয়ে চুপ করে উঠল। বড়বাবু চিৎকার করে উঠলেন, 'চুপ করে আছ কেন? জবাব দাও ঘড়ি কোথায়?'
হাবিলদার মিনমিনে গলায় বলল, 'খানিক আগে কাঠের মিস্ত্রি ননা এসে নিয়ে গিয়েছে স্যার।'
বড়বাবু বললেন, 'নিয়ে গিয়েছে! নিয়ে গিয়েছে মানে?'
হাবিলদার বলল, 'ননা এসেছিল গরাদের ছিটকিনি ঠিক করতে। তখনই বলল, আপনার ঘরে কাচে চিড় খাওয়া ঘড়ি মানায় না। তাই একটা নতুন ঘড়ি দিয়ে গেল। এমন গল্প ফাঁদল...।'
বড়বাবুর চোখ বড় আর লাল হয়ে উঠল। মাথা হয়ে গেল উনুনের মতো গরম। গা চিড়বিড়ি করছে। তিনি বুঝতে পারলেন, শরীরে রাগ ফিরে এসেছে। তিনি দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, 'গল্প ফাঁদল আর তোমরা ঘড়িটা দিয়ে দিলে!'
হাবিলদার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, 'কী করব স্যার? বলল, কবে কোন পুলিশ থানায় নাকি কাচে চিড় খাওয়া ঘড়ি নিয়ে বিচ্ছিরি এক কাণ্ড হয়েছিল...।'
বড়বাবু টেবিলে ঘুসি মেরে বললেন, 'চুপ করো। গোপ্পে ননার বানানো গল্প আমাকে শোনাতে এসো না। ধরে আনো ওকে। এখনই পাকড়াও করে আনো। ও ঘড়ির আস্ত ভাঙা বোঝে কী? বেটা আস্ত গবেট। কোটি টাকা দিলেও ওই ঘড়ি পাওয়া যাবে? পাওয়া যাবে না। স্বাধীনতা সংগ্রামীর ধমক খাওয়া ঘড়ি কি যে সে জিনিস। অমন জিনিস কেউ দেখেছে কখনও? রূপপুরের গর্ব। ননা আজ বুঝবে, বড়বাবুর ধমক কাকে বলে। নিশ্চয় ও ঘড়ি নিয়ে সটকেছে।'
থানার বড়বাবুর ধমকে ভয় পাওয়ার কথা। হাবিলদারের হাসি পেল। সে ছুটল। সবাইকে খবর দিতে হবে বড়বাবুর অসুখ সেরে গিয়েছে, রাগ ফিরে এসেছে। ননাকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে। আর ওই বিখ্যাত ঘড়ি তো থানার গারদে লুকিয়ে রাখা আছে। ছিটকিনি খুলে বের করলেই হবে। চোর-ডাকাত ধরা হয় না বলে গারদ তো এখনও ফাঁকা।
এই ঘটনা যখন ঘটছে বড়বাবুর ঘরের ঘড়িতে তখন সময় বেলা এগারোটা বেজে তেরো মিনিট।
এবারের শীতে রূপপুরে অনেকে বেড়াতে আসছে। যে-কোনওদিন ভোরে 'ঝিমুনি জংশন'—এ গেলেই দেখা যাবে, স্টেশন জমজমাট।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন