প্রচেত গুপ্ত

আমি রালু, আমার প্রিয় বন্ধু সালু। আমাদের একসঙ্গে দেখলেই সবাই বলে, 'ওই রালু-সালু যাচ্ছে।'
কেউ আবার চিৎকার করে বলে, 'কীরে রালু, তোর না সালুর সঙ্গে ঝগড়া? আজ আবার একসঙ্গে বেরিয়েছিস যে বড়!'
আমি হাত নেড়ে চিৎকার করে বলি, 'ঝগড়া মিটে গেছে। আমরা বাজারে ফুচকা খেতে যাচ্ছি।'
ওরা হেসে ওঠে। বলে, 'বলিস কী! তোর সালু ফুচকা খায়!'
আমি বলি, 'খায় বইকি। তোরা জানিস না।'
কথাটা সত্যি। সালু আমার সঙ্গে ফুচকা খায়, পেয়ারা খায়, টোপা কুল খায়। হজমিও খায়। মোদ্দা কথা, বাড়ির বাইরে গিয়ে আমি যা খাই সালুও তাই খায়। এই ব্যাপারে সবার সন্দেহ। ভাবে, সালু আবার খাবে কী করে! বিশ্বাস করতে পারে না। সে সন্দেহ করুক। তাতে আমার কিছু এসে যায় না। আমার বন্ধুর ব্যাপার আমি জানি। দুজনে বনবন করে ঘুরে বেড়াই।
এবার আমাদের পরিচয়টা দিই।
আমার পুরো নাম রাহুল। ডাকনাম রালু। রাহুল থেকে রালু। আমি পড়ি ক্লাস এইটে। এইটে না বলে বলা উচিত সাড়ে এইটে। ক্লাস এইটের অর্ধেক বছর কাটিয়ে এসেছি। তাই সাড়ে এইট। আমার বয়সি সব ছেলেমেয়েরই অনেক বন্ধু থাকে। আমারও আছে। আমি থাকি একটা ছোট মফসসল শহরে। নাম রতনপুর। ভারি সুন্দর জায়গা। মফসসল শহর বললে কী হবে রতনপুর এখনও গ্রামের মতো। বাড়িঘর ছেড়ে বড় রাস্তা দিয়ে খানিকটা এগোলেই মাঠ, খেত, গাছপালা। দক্ষিণ দিকে একটা টিলার মতো আছে। টিলার নাম 'বনটিলা'। টিলার নিচে একটু জঙ্গলের মতো আছে বলে নাম হয়েছে 'বনটিলা'। এখানে শীতের সময় সবাই পিকনিক করতে যায়। রতনপুরে বেশ কয়েকটা দিঘিও আছে। সেখানে সাঁতার কম্পিটিশন, মাছ ধরা, বাইচ দৌড়ও হয়। আমি যে স্কুলে পড়ি তার নাম রতনপুর উচ্চবিদ্যালয়। ছেলেমেয়েরা এক সঙ্গে পড়ি। একসঙ্গে পড়বার কারণে আমরা বুঝতে পেরেছি ছেলে মেয়েতে কোনও তফাত নেই। দু'পক্ষই সমান। বরং মেয়েরা একটু বেশি। ওরা অনেকে আমাদের থেকে লেখাপড়াতে ভালো আবার অনেকে মারপিটেও ভালো। লেখাপড়ার একটা উদাহরণ দিই? নাকি মারপিটের দেব? আচ্ছা, দুটোই দিচ্ছি।
আমাদের ক্লাসে একবার ফার্স্ট হয় সুমন, একবার ফার্স্ট হয় শ্রমণা। দুজনের হেভি হাড্ডাহাড্ডি ফাইট। এ একবার এগোয় তো ও আরেকবার। নম্বরেও খুব কাছাকাছি থাকে। একবারে যাকে বলে ফটো ফিনিশ। এমনও হয়েছে দু'জনেই অঙ্কতে নিরানব্বই করে নম্বর পেয়ে গেল। দেখা গেল, শ্রমণা একটা পাটিগণিত তিনরকম ভাবে করেছে। তিনবারই উত্তর মিলেছে। এই জন্য মুগ্ধ হয়ে অঙ্কস্যার ওকে এক নম্বর বেশি দিয়ে ফেললেন। শ্রমণা মুচকি হেসে বলল,'আমি জানতাম, সুমন অঙ্কগুলো হাসতে হাসতে করে ফেলবে। আমাদের নম্বরও এক হবে। তাই একটা অঙ্ক নিয়ে একটু কায়দা দেখিয়ে দিলাম। স্যারও খুশি হয়ে গেলেন।'
এই মেয়েকে কী বলব? ছেলেদের থেকে বেশি না? অবশ্যই বেশি।
এবার আসি মারপিটের কথায়। ক্লাস সেভেনের অহনা শান্তশিষ্ট, ভালোমানুষ। নিজের মতো চুপচাপ থাকে। টিফিনের সময় টিফিন খেয়ে ক্লাসে বসে পরের ক্লাসের লেখাপড়া করে। এই কারণে ছেলেমেয়েরা অনেকেই খেপায়। একদিন একইরকম ভাবে ক্লাসে বসে পড়ছিল। বন্ধুরা যথারীতি টিপ্পনি কাটছিল। অহনা কানই দিচ্ছিল না। তাতেও ছেলেরা থামছিল না। তখন শান্ত পায়ে উঠে গিয়ে সুশান্তর ডান হাতের কনুইতে আর নন্দনের পেটে এমন চিমটি দিল যে তারা 'বাপরে গেলাম গেলাম' বলে লাফিয়ে উঠল। অহনা আবার শান্ত পায়ে নিজের জায়গায় ফিরে এসে বই খুলে পড়তে বসে গেল।
বোঝা গেল তো আমাদের মেয়েরা মারপিটেও কেমন ওস্তাদ?
যাই হোক, রতনপুরের স্কুল, মাঠ,গাছপালা, টিলা, দিঘি, মেঠো পথ আর বন্ধুদের নিয়ে আমি দারুণ আছি। রতনপুরের যে কত গল্প আছে তার শেষ নেই! যদি কখনও সময় সুযোগ হয় এক এক করে শোনানো যাবে। কোনওটা দমফাটা হাসির, কোনওটা গা ছমছমে ভয়ের।
আজ বরং সালু আর আমার গল্পটা বলি।
সকলের প্রিয় বন্ধু থাকে। আমারও আছে। আমার প্রিয় বন্ধু হল সালু। নিশ্চয় জানতে ইচ্ছে করছে সালু কে? সালু আমার সাইকেল। সালু তার ডাকনাম। ভালো নাম শ্রীমান সাইকেল।
আমি রালু, আমার সাইকেল সালু। সুযোগ পেলে দুজনে মিলে টই টই করে ঘুরে বেড়াই। সালুর বয়স আমার থেকে দু'বছর কম। একসময়ে তাকে নিয়ে ঘুরত আমার ছোটকাকা। ছোটকাকা বদলি নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়ার সময় ওকে আমার হাতে তুলে দিয়ে গেছে। সেই থেকে সে আমার সঙ্গী। আমি যেখানেই যাই সালুকে নিয়ে যাই। সে স্কুলেই হোক, টিউশনেই হোক, ফুটবল ম্যাচ খেলতেই হোক, আবার গরমে ছুটির বিকেলে, শীতের দুপুরে শুধুমুধু চক্কর দিতেই হোক। মোদ্দা কথা হল, আমি যেখানে সালু সেখানে। মফসসলে আমার বয়সি ছেলে-মেয়েদের কাছে সাইকেল যেমন জরুরি, তেমন প্রিয়। তবে আমার সালু একেবারে আমার বন্ধু। তার সঙ্গে বেড়াতে আমার খুব ভালো লাগে। সত্যি আমি ফুচকা, পেয়ারা, হজমি খেলে তার হ্যাণ্ডেলে ঠেকিয়ে নিই। সালুর সঙ্গে আমি বকবকও করি। সে কথা বলে না তো কী হয়েছে? অযান্ত্রিক নামে একটা গল্প আছে। সেখানে গাড়ির সঙ্গে গাড়ির চালক কথা বলত। আমার অবস্থা অনেকটা যেন সেরকম। তবে আমাদের মধ্যে ঝগড়াও হয়। সালু রেগে গেলে পথের মাঝখানে টায়ার ফাটিয়ে বসে থাকে। শুনে নিশ্চয় তোমাদের অবাক লাগছে। সাইকেলের আবার রাগ কী রে বাবা! অবশ্যই আছে। সালুকে নিয়ে দুদিন না বেরোলেই ওর যেন গাল ফুলে যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে।
ওসব রাগারাগির কথা বাদ দাও, আমি আর সালু নানা মজার কাণ্ড করে বেড়াই।
তবে এখন যে কাজটা করতে বেরিয়েছি, সেটা মোটে মজার নয়। সিরিয়াস কাজ। এখন 'সন্ধে হব হব' সময়। আমি সবে খেলাধুলো করে বাড়ি ফিরছি। বড় রাস্তার মুখে দেখি ভোম্বলের মা দাঁড়িয়ে।
আমি বললাম, 'কী হয়েছে কাকিমা ?'
কাকিমা কাঁদো কাঁদো মুখে বললেন, 'ভোম্বল এখনও বাড়ি ফেরেনি।'
আমি বললাম, 'সেকি! এত সন্ধে হয়ে গেল! ও কি খেলতে গেছে।'
কাকিমা বললেন, 'ন'পাড়ায় নাকি ফুটবল ম্যাচ রয়েছে।'
ভোম্বল আমাদের এই রতনপুরের একজন ভালো গোলকিপার। ক্লাস সেভেনে পড়ে। তাকে বিভিন্ন পাড়ার ক্লাব তাদের হয়ে খেলাতে নিয়ে যায়। এই সব ম্যাচ খেলে ভোম্বল অনেকগুলো প্রাইজ পেয়েছে। মেডেলও আছে। সেই লোভে ও দূরে খেলতেও যায়। আজও তেমন গেছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, 'ন'পাড়া তো বেশ অনেকটা দূরে। বনটিলা যাওয়ার পথে। এখনও ফিরল না!'
ভোম্বলের মা এবার কেঁদেই ফেলল, 'সেই জন্যই তো চিন্তায় মরে যাচ্ছি।'
ভোম্বলরা আমাদের পাড়াতেই থাকে। আমি বললাম, 'চিন্তা কোরো না কাকিমা। আমি দেখছি। তুমি বরং আমার বাড়িতে বলে দাও।'
সালুর হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আমি রওনা দিলাম বনটিলার পথে। খুব জোরে প্যাডেল চালালাম। মজার কথা হল, আমি যতটা না জোরে প্যাডেল চালালাম, সালু যেন নিজের প্যাডেলদুটো তার থেকে দ্বিগুণ জোরে ঘোরাতে লাগল! এই জন্যই বলি, সালু আমার বন্ধু। ভোম্বলের জন্য আমার ভিতরে যে দুশ্চিন্তা কাজ করছে সেটা ও জানে।
মেঠো রাস্তা দিয়ে বন-বন করে ছুটছি। অন্ধকার নামছে। হঠাৎ এক কান্ড হল! হড়বড়িয়ে রাস্তা থেকে সালু গড়িয়ে নামতে লাগল! এ কোথায় যাছি! আমি ব্রেক চেপে ধরলাম। ব্রেক কাজ করল না! সরসরিয়ে নেমে যেতে থাকল সালু। আমি প্যাডেল থেকে পা তুলে দিলাম। সালু গড়াতে লাগল সড়সড়িয়ে। যেন ইচ্ছে মতো পথে চলেছে সে! আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। এভাবে কতটা পথ সালু গড়াল আমার জানা নেই। মনে হয়, পাঁচ মিনিট, দশ মিনিটের পথ। একসময়ে ইটে ঠোক্কর খেয়ে থমকে গেল। আমিও টাল সামলে নেমে পড়লাম। আর তখনই শুনলান গোঙানির আওয়াজ। কে গোঙাছে! ভোম্বল না? সালুকে মাঠের মধ্যে শুইয়ে ছুটে গেলাম পাশের ঝোপের দিকে।
হ্যাঁ, ওই তো ভোম্বল! ওই তো শুয়ে কাতরাচ্ছে! কী হয়েছে ওর?
ভোম্বলের মুখ থেকেই শুনলাম। খেলার সময় পায়ে চোট লেগেছিল জোর। অত পাত্তা দেয়নি। বাড়ি ফেরবার সময় বুঝতে পারে চোট বড়। পা ক্রমশ ফুলে যায়। সাইকেল তো চালাতে পারছিলই না, হাঁটতেও পারছিল না। তাড়াতাড়ি ফিরতে গিয়ে মাঠের মধ্যে নেমে পড়ে। তাতে অন্ধকারে আরও বিপদ হয়। হোঁচট খেয়ে পড়ে। এবার আর উঠতে পারছিল না। নির্জন পথে সাহায্য করবার মতো কেউ ছিল না।
সালুর সাইকেলের সামনে বসিয়ে নিলাম ভোম্বলকে, আর এক হাতে ওর সাইকেল ধরে খুব ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরলাম। তখন দেখি গলির মুখে পাড়ার সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
ভোম্বলকে ওদের বাড়িতে নামিয়ে দিলাম। আর সালুকে মনে মনে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। ও যদি ব্রেক ফেল করিয়ে বড় রাস্তা থেকে মাঠে না নামিয়ে নিত, ভোম্বলকে আজ খুঁজেই পেতাম না।
পরদিন সালুকে নিয়ে দোকানে গেলাম ব্রেক সারাতে। মেকানিককাকু দেখে বলল, 'ব্রেক তো ঠিকই আছে! কোনও কারণে ব্রেক আটকে গিয়েছিল।'
এই সালুকে বন্ধু বলে ভুল করেছি?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন