পলাশডাঙার পিসিমা

প্রচেত গুপ্ত

এতক্ষণ পিছনের সিটে বসে মাঝবয়সি কন্ডাক্টর ঝিমোচ্ছিলেন। এবার ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় হাঁক পাড়লেন, 'পলাশডাঙার কেউ আছে...কেউ আছে নাকি পলাশডাঙার?'

কন্ডাক্টরের গলা ফ্যাঁসফ্যাঁসে হওয়ার কারণ মাফলার। একটা মোটা মাফলার দিয়ে তিনি মাথা, নাক, গলায় প্যাঁচ মেরে রেখেছেন। হাঁক ডাককে মাফলারের সেই প্যাঁচ ডিঙিয়ে বাইরে আসতে হচ্ছে। তাই হয়ে যাচ্ছে ফ্যাঁসফ্যাঁসে।

কন্ডাক্টর ফের হাঁক দিলেন। এবার আরও জোরে।

'পলাশডাঙার পেসেঞ্জার আছে কেউ...পরে বলতে পারবেন না কিন্তু...পলাশডাঙা...পলাশডাঙা...।'

মাধব রায় নড়চড়ে বসলেন। পলাশডাঙা এসে গেল? এই ভাবে ট্রেনে—বাসে চেপে পলাশডাঙায় এসেছেন সেই ছোটবেলায়। বাবার সঙ্গে। বড় হয়ে গাড়িতেই যাতায়াত করেছেন। ফলে ট্রেনে-বাসে কত সময় লাগে আর মনে নেই। আজ হাওড়া থেকে ট্রেন দু-ঘণ্টার একটু বেশি সময় নিল। আর স্টেশন থেকে এই বাসে উঠেছেন তা প্রায় এক ঘণ্টা দশ—পনেরো মিনিট তো হবেই। মাধব রায় মনে মনে হিসেব করে দেখলেন, পৌছে যাবার সময় হয়েছে।

মাধব রায় ডাক্তার। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই। হাসিমুখের, ছোটখাটো চেহারার মানুষ। থাকেন কলকাতায়। পাড়ায় সবাই ডাকে, 'মাধবডাক্তার'। অতি ভালোমানুষ। ফিস সামান্য, কিন্তু চিকিৎসা করেন অসামান্য। অনেকটা সময় ধরে রোগীর নাড়ি টিপে, বুকে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে, মুখের ভিতর টর্চের আলো ফেলে, পেট টিপে রোগ বোঝবার চেষ্টা করেন। এর সঙ্গে রয়েছে কথা। মানুষটা মুখের কথাতেই যেন অর্ধেক অসুখ চম্পট দেয়। যতই পেট কনকন, মাথা ঝনঝন, বুক ধড়ফড় থাকুক না কেন, তাঁর ভরসার কথা শুনলে রোগীর মুখে হাসি ফুটবেই। না হাসলে বিপদ আছে। ডাক্তারবাবুর ধমক খেতে হবে।

'কী হে, মুখ অমন গোমড়া করে রেখেছো কেন? ভয় করছে? ভয় দিয়ে কি তোমার অসুখ সারাবে? যদি সারত ভয়ের পাউডার পুরে বড় বড় ক্যাপসুল তৈরি করা হতো। তারপর সকালে একটা, বিকেলে একটা খাইয়ে তোমার রোগ সারানো হতো। তা তো আর হবে না। সুতরাং ভয় পেয়েও লাভ নেই বাপু। বরং ক্ষতি। রোগ হাঁটুতে থাকলে পেটে চেপে বসবে। বুকে থাকলে গলা টিপে ধরবে। একটু হাসো। দেখি, না হাসলে ওযুধ দেব না।'

এই মানুষকে ভালো না বেসে উপায় কী?

এই ভালোমানুষ মাধবডাক্তার এখন চলেছেন পলাশডাঙা। পলাশডাঙাতে থাকেন তাঁর পিসিমা। নিজের পিসিমা নন, দূর সম্পর্কের পিসিমা। মাধবডাক্তারের বাবা হিসেব-টিসেব করে বলেতেন, 'উনি হলেন গিয়ে তোর পিসতুতো পিসিমা।' মাধবডাক্তার অবাক হয়ে বলতেন, 'পিসতুতো পিসিমা আবার কী! পিসতুতো ভাই-বোন হয়, পিসিমাও হয়ও নাকি!'

বাবা বলতেন, 'আলবাত হয়। আমার পিসতুতো বোন তোর পিসতুতো পিসিমাই তো হলেন।'

সম্পর্ক যা-ই হোক না কেন, পলাশডাঙার পিসিমা মাধবডাক্তারকে ছোটবেলা থেকেই খুব স্নেহ করেন। তিনিও তাঁর ভাইপোর মতো ভালো। এখন বয়স পঁচাশি পেরিয়ে ছিয়াশি হল। মাথার চুলগুলো সব সাদা। একটু কুঁজোও হয়েছেন। মাঝেমধ্যে হাতে একটা লাঠি নেন। বাতের ব্যথা, চোখের ছানিকে পিসিমা পাত্তাই দেন না। মনের জোর খুব। সাহসও বিরাট। আশপাশের দশটা গ্রামের চোর-ডাকাতও এই সাহসের খবর রাখে। তারা পারতপক্ষে পিসিমার বাড়ির দিকে ঘেঁষে না।

পিসেমশাই মারা যাবার পর থেকে পিসিমাই বাড়ির চাষবাস, পুকুরের মাছ, গোয়ালের গরু, হাঁস-মুরগি, বাগানের গাছপালা দেখাশোনা করেন। বয়স বাড়লেও দাপট কমেনি। তবে বছর কয়েক একজন ম্যানেজার রেখেছেন। নাম দুলাল। আগে একা ঘুরতেন, এখন তাকে সঙ্গে নিয়ে পিসিমা ঘুরে বেড়ান।

দুলাল সাহসী, কিন্তু পিসিমাকে খুব ভয় পায়। চাষের জমি ঠিক মতো তৈরি হয়েছে কিনা, পুকুরে কবে জাল ফেলা হবে, দুধ বাজারে পাঠানো হল তো, হাঁস-মুরগির ডিমের কী খবর, গরমে আম কেমন হয়েছে, শীতে খেজুরগাছে রসের হাঁড়ি ঠিক মতো বাঁধা হয়েছে কিনা সব দিকে পিসিমার নজর। কাজ ঠিকমতো না হলে গোল চশমার ওপর দিয়ে এমন কটমট চোখে তাকান যে সবাই ভয়ে পেয়ে ঘামতে থাকে। পিসিমার বাড়ি চাল, মাছ, দুধ, আমের ভাগ তাঁর কর্মচারী তো পায়ই, পলাশডাঙা গ্রামের সবাই পায়।

স্কুলে পড়বার সময়ে গরম আর শীতের ছুটিতে পিসিমার বাড়িতে যেতেন মাধবডাক্তার। পিসিমাদের যেমন খান দশ আমগাছ আছে, তেমন বেশ কয়েকটা খেজুরগাছও আছে। পিসিমা বালক মাধবডাক্তারকে গাছের তলায় মাদুর পেতে বসিয়ে দিতেন। গাছে উঠে বসে থাকত একজন। ছেলেমানুষ মাধবডাক্তার হাত দিয়ে দেখিয়ে দিতেন কোন আমটা তার চাই। গাছে যে থাকত সে ওই আমটাই পেড়ে দিত। মাধবডাক্তার গাছের তলাতে বসে খেতেন। এছাড়া আমের সরবত, আমের চাটনি, আমের জেলি, আমের মোরব্বা তো ছিলই। শীতকালে খেজুর গাছ থেকে রস নামিয়ে, বড় বড় মাটির জালায় জাল দিয়ে বাড়িতেই গুড় বানানো হতো। গোটা বাড়ি গন্ধে ম'-ম' করত। খই আর সেই গুড় নিজের হাতে মোয়া বানাতেন পিসিমা। সেই মোয়া শুধু খাওয়া নয়, হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যেও ছিল বিরাট আনন্দ। তার সঙ্গে ছিল ফুলকপির শিঙাড়া। খেত থেকে বড় বড় ফুলকপি চলে আসত। সারা দুপুর ধরে পিসিমা পুর বানিয়ে, ময়দা মেখে লম্বা নাকের শিঙাড়া গড়তেন। বিকেলে হতো ভাজা। আহা! সেই শিঙাড়ার স্বাদ আজও মাধবডাক্তারের মুখে লেগে রয়েছে। বাড়ির ফেরার সময় পথে খাবার জন্য দিতেন পিঠে।

পিসিমার বাড়ি যাওয়ার যে কত আনন্দ ছিল তা নিশ্চয় আর বলে বোঝাতে হবে না। কিন্তু বড় হবার পর ছোটবেলার অনেক আনন্দই হারিয়ে যায়। মাধবডাক্তারেরও তাই হল। প্রথমে দু-বছরে একবার, তারপর তিন বছরে একবার পলাশডাঙা যেতেন। তারপরে একসময়ে তো যাওয়া বন্ধই হয়ে গেল। অথচ দূর বেশি নয়। কলকাতা থেকে গাড়িতে তিনঘণ্টার পথ।

শীতের সময় গ্রামের পথ অতি মনোরম। সকালে বের হলে দুপুরের আগে পৌঁছে যাওয়া যায়। সন্ধে নামবার মুখে রওনা দিলে আবার রাত ন'টার আগেই কলকাতা। পিসিমার বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার মতো দূরে একটা নদীও রয়েছে। নাম 'ঝিরি'। ঝিরিঝিরি করে জল বয়ে যায় বলে 'ঝিরি' নাম। পিসিমার বাড়ি গেলেও ওই নদীর ধারেও একটা চক্কর দিয়ে আসা হয়। সুন্দর লাগে। একটা ছোটখাটো বেড়ানো হয়ে যায়। অনেকদিন সেই বেড়ানো বাদ পড়ে গেছে। টানা পাঁচ বছর। বেশ কয়েকবার যাবার পরিকল্পনা করেও বাধা পড়েছে। নানা কাজে আটকে গিয়েছেন মাধবডাক্তার। নিজের রোগী দেখা, স্ত্রীর কলেজে পড়ানো, ছেলের কাজ, মেয়ের ফাইনাল পরীক্ষাকিছু না কিছু ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। পিসিমাও আর কিছু বলেন না। চুপ করে গিয়েছেন। হঠাৎ সেদিন মাধবডাক্তারের চেম্বারে একটা পোস্টকার্ড এল। পিসিমা কাঁপা কাঁপা হাতে লিখেছেন। তিনি পুরোনো দিনের মানুষ পোস্টকার্ডে চিঠি লিখতেই পছন্দ করেন। চিঠি অভিমানে ভরা।

'মাধু, মনে হয় না আর তোর সঙ্গে দেখা হবে। দেখা হলেও মনে হয় না, আর তোকে নিজের হাতে বানানো মোয়া, ফুলকপির শিঙাড়া, আমের আচার খাওয়াতে পারব। তোর পিসিমা যে বেঁচে রয়েছেন সেটাও কি তোর মনে রয়েছে? মনে হয় নেই। চিঠি লিখে মনে করিয়ে দিলাম। যাতে অবিশ্বাস না হয়, নিজের হাতে লিখলাম। এই পৌষ মাসের এগারো তারিখ তোর পিসিমার বয়স যে পঁচাশি পেরিয়ে ছিয়াশি হবে সেকথা কি তোর জানা আছে? নিশ্চয় নেই। এই বয়েসে মোয়ায় পাক দেওয়া যায় না আমের আচারের জন্য খুন্তি নাড়ানো সম্ভব? কবজিতে কি সেই জোর রয়েছে? হাত কাঁপে। ফুলকপির শিঙাড়া বানাতে গেলেও গোলমাল হবে। নাক ভেঙে যাবে। নাক ভাঙা শিঙাড়ার স্বাদ অতি খারাপ। তারপরেও ইচ্ছে, এই শীতে শেষবারের মতো তোকে মোয়া বানিয়ে খাওয়াই, তোর জন্য শিঙাড়ার নাক তুলি। আমার মন বলছে, এবার বিদায় নেবার সময় হয়েছে। আর বেশিদিন বাঁচব না। তুই নাকি মস্ত ডাক্তার? তোর ওই গলায় ঝোলানো স্টেথোস্কোপ কি স্নেহ বুঝতে পারে? ব্লাড প্রেসারের যন্তর কি আদর মাপতে পারে? ঘোড়ার ডিম পারে। ভালো থাকিস।'

পিসিমার অভিমান আর ধমক মেশানো চিঠি পড়ে মাধবডাক্তারের মনটা হু-হু করে উঠল। নিজের ওপর রাগ হল খুব। ছি-ছি এতদিনে একবার যাওয়ার সময় হল না! এত আদর করে কে ডাকবে? পৌষ মাসের এগারো তারিখ কবে? মাধবডাক্তার হিসেব করে দেখলেন সামনের শনিবার। তিনি গাড়ির ড্রাইভারকে ডাকলেন।

'বিশু শনিবার সকালেই পলাশডাঙা যাব। খুব ভোরে রওনা। পথ মনে আছে?'

বিশু হেসে বলল, 'রেডি হয়ে চলে আসব স্যার। পাঁচ বছর আগে গিয়েছিলাম, কিন্তু পথ আমার মনে আছে স্যার।'

দুলালকে ফোন করলেন মাধবডাক্তার।

'দুলাল, শনিবার সকালে তোমাদের ওখানে যাব। পিসিমাকে ফোনটা দাও, কথা বলব।'

দুলাল বলল, 'আচ্ছা, একটু ধরুন দিচ্ছি।'

দুলাল মিনিট খানেক পরে আমতা আমতা করে বলল, 'ডাক্তারবাবু, পিসিমা বললেন...পিসিমা বললেন...বললেন উনি আপনার ফোন ধরবেন না। আপনার সঙ্গে কথাও বলবেন না। আপনাকে পরশুদিন আসতে হবে না।' দুলাল একটু থেমে গলা নামিয়ে বলল, 'কিছু মনে করবেন না ডাক্তারবাবু। পিসিমার বয়স হয়েছে, মাঝেমধ্যে ছেলেমানুষের মতো আচরণ করেন। আপনার ওপর খুব রেগে আছেন মনে হয়।'

মাধবডাক্তার হেসে ফেললেন। বললেন, 'ঠিক আছে ফোনে কথা বলতে হবে না। তুমি ওকে বলে দাও, আমি শনিবার যাচ্ছি। পিসিমা যেন গুড়ের মোয়া বানিয়ে রাখে। ফুলকপির শিঙাড়াও চাই। নাক লম্বা শিঙাড়া।'

ফোন রেখে দিয়ে মাধবডাক্তার নিজের মনেই বললেন, 'পিসিমা, দেখে নিও এবার আর কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। এই সময়ে তো আর ঝড়-জল হবে না, তবে ঠান্ডা খুব। যদি কলকাতায় বরফও পড়ে আমি শনিবার যাবই যাব। গিয়ে তোমাকে হ্যাপি বার্থ ডে জানাব। চেম্বারও ছুটি দিয়ে দিয়েছি।'

কলকাতায় বরফ পড়ল না, কিন্তু সকালে এসে বিশু গাড়ি চালু করতে গিয়ে দেখল, ইঞ্জিনে গোলমাল। গাড়ি একটু এগিয়েই থমকে যাচ্ছে। যেন হোঁচট খেয়ে চলছে। মাধবডাক্তার বললেন, 'বিশু গাড়ি যে করেই হোক সারাতে হবে। আজ আমি পলাশডাঙা যাবই।'

বিশু গাড়ি নিয়ে মেকানিকের কাছে ছুটল। দুপুরবেলা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে জানাল, 'স্যার, গাড়ির গোলমাল জটিল। সারাতে একদিন লাগবে। আপনি বরং কাল চলুন।'

মাধবডাক্তার শান্ত গলায় বললেন, 'না, আমাকে আজই যেতে হবে। আমি পিসিমাকে কথা দিয়েছি। মুখে দিইনি, মনে মনে দিয়েছি। মুখের থেকে মনের কথার দাম অনেক বেশি।'

বহুবার চেষ্টা করেও দুলালকে ফোনে পেলেন না মাধবডাক্তার। মোবাইল ফোনের গোলমাল। 'কুঁ-কুঁ' আওয়াজ করে কেটে যাচ্ছে। যেতে দেরি হবেএই খবরটা দেওয়া হল না। গাড়ি ভাড়া দেয় এমন কয়েকটা সংস্থাকে ফোন করলেন মাধবডাক্তার। একজন বলল, এত বেলায় গাড়ি পাওয়া যাবে না। আর একজন বলল, তাদের ড্রাইভারের পা মচকে গিয়েছে। মাধবডাক্তার আর দেরি না করে ছুটলেন স্টেশন। যত দেরিই হোক তাঁকে আজ পলাশডাঙা পৌঁছোতেই হবে। ব্যাগে এক রাতের মতো জামাকাপড় গুছিয়ে নিলেন। পিসিমার বিরাট বাড়ি। অনেক ঘর। থাকবার লোক নেই। এক রাত চমৎকার থাকা যাবে।

স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনের টিকিট কাটলেন মাধবডাক্তার। আধঘণ্টা পরেই ট্রেন। যাক, সন্ধে নাগাদ পৌঁছে যাওয়া যাবে। ট্রেন আসবার দশ মিনিট আগে ঘোষণা হল, বর্ধমানের কাছে কোন স্টেশনে সিগন্যালে গোলমাল হয়েছে। ট্রেন লেট। মাধবডাক্তার দুলালকে আবার ফোনে ধরবার চেষ্টা করলেন। ফোন পেলেন, কিন্তু দুলালের কথা শোনা গেল না। শুধু 'হ্যালো, হ্যালো' শোনা গেল।

ট্রেন এলও সন্ধে পার করে। ছাড়ল আরও দু-ঘণ্টা পরে। মাধবডাক্তার ধৈর্য ধরে বসে রইলেন। ভাগ্যিস সঙ্গে একটা বই ছিল। সেটা পড়েই সময় কাটালেন। ট্রেন থেকে নেমে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে আবার ধাক্কা। খুব ঠান্ডা বলে পলাশডাঙার শেষ বাস আগেই ছেড়ে দিয়েছে। বাস আবার কাল সকালে। শক্ত মনের মাধবডাক্তারও ভেঙে পড়লেন। তাহলে সত্যি আজও পিসিমার সঙ্গে দেখা হল না। কলকাতার ফেরবার ট্রেন কি রাতে আর পাওয়া যাবে? মনমরা মাধবডাক্তার ঠিক করলেন, ট্রেন পেলেও ফিরবেন না। স্টেশনেই কোথাও রাত কাটাবেন। যতই হাঁড় কাঁপানো ঠান্ডা হোক। কাল সকালে পলাশডাঙার প্রথম বাস ধরবেন।

স্টেশনে থাকবার জায়গার খোঁজ করতে গিয়ে খবর পেলেন, একটা বাস ওদিকে যাচ্ছে। তবে সেই বাস পলাশডাঙা যাবে না, পাশ দিয়ে যাবে। ঝিরি নদীর ব্রিজ থেকে বাঁদিকে বেঁকে যাবে। মাধবডাক্তার এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। ঝিরি নদীর ব্রিজ থেকে পিসিমার বাড়ি এক কিলোমিটার। হাঁটলে কতক্ষণ লাগবে? হাঁটলে তো ঠান্ডা গায়ে লাগবেই না। আর যদি লাগে তো লাগবে। পৌষ মাসের এগারো তারিখ পিসিমার কাছে তো যাওয়া হবে। মাধবডাক্তার বাসে চেপে বসলেন। যাত্রী মোটে সাত জন। সব জানলা এঁটে, কনকনে ঠান্ডা আর ফটফটে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে বাস ছুটতে লাগল। দু-পাশে ধানখেত, মাঠ আর নিঝুম মাটির বাড়ি।

সেই বাস এখন পলাশডাঙা এসে পৌঁছেছে। আর কন্ডাক্টর হাঁক পেড়ে ভয় দেখাচ্ছেন, 'পরে বলতে পারবেন না কিন্তু...পলাশডাঙা...পলাশডাঙা...।'

এ কথার মানে কী? পলাশডাঙা টপকে গেলে বাস দাঁড়াবে না? তাই আগে থেকে শাসানি? এত ক্লান্তির পরও মাধবডাক্তার মনে মনে হেসে ফেললেন। কন্ডাক্টর মানুষটি তো বেশ মজার। নিজে কলকাতায় থাকলেও, শহরের তুলনায় পাড়া গাঁ বেশি পছন্দ করেন। পাড়াগাঁয়ের নাকি নানা গুণ। বিশুদ্ধ আলো বাতাস, গাছপালা তো রয়েছেই, মানুষজনও সহজ সরল। তাদের রসবোধও রয়েছে।

মাধবডাক্তার বাস থেকে নামবার জন্য তৈরি হলেন।

ঝিরি নদীর ব্রিজের সামনে, নিকষ অন্ধকারের মাঝখানে, পলাশডাঙার একমাত্র যাত্রীটিকে নামিয়ে দিয়ে বাস 'গোঁ-গোঁ' করে অন্য পথে বাঁক নিল। প্রথমটায় বুঝতে না পারলেও, এক মুহূর্ত যেতেই মাধবডাক্তার বুঝতে পারলেন, গ্রামের ঠান্ডা কাকে বলে। তার ওপর আবার নদীর ধার। সোয়েটার, মোটা কোট, মাফলার, টুপি, দস্তানা, জুতো মোজা ভেদ করে বরফের কুচি মাখা হাওয়া লাগছে গায়ে। হাত ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখলেন। রাত কত? দশটা বেজে ছ'মিনিট। অন্ধকারে চারপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সবই আবছা। কুয়াশার সাদা চাদর গায়ে সামনে শুয়ে রয়েছে নদীর ব্রিজ। এই ব্রিজ দিয়ে অনেকবার যাতায়াত করেছেন। কিন্তু এখন চিনতেই পারছেন না! পিসিমার বাড়ি যাবার পথও কি চিনতে পারবেন?

মাধবডাক্তার ব্যাগ কাঁধে হাঁটতে শুরু করলেন। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলেন। কাজটা কি ভুল হল? গোয়ার্তুমি? এই ভাবে, এত বাধা টপকে চলে আসাটা উচিত হয়নি? গাড়িটা সারিয়ে কদিন বাদে আসা যেত না? পাঁচ বছর যেখানে আসা হয়নি, সেখানে আরও দুটো দিন অপেক্ষা করলে কী ক্ষতি হতো? পিসিমা তো আর ছেলেমানুষ নয় যে জন্মদিন না করলে কাঁদবে।

পরক্ষণে নিজেকেই নিজে জবাব দিলেন মাধবডাক্তার। না, ভুল হয়নি মোটেই। ভালোবাসা, স্নেহ, আদরের কাছে গাড়ি খারাপ, ট্রেন লেট, বাস থেকে মাঝপথে নেমে যাওয়া, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা তুচ্ছ।

মাধবডাক্তার হাসি মুখে জোরে জোরে পা চালালেন, আর তখনই একটা কাণ্ড ঘটল।

দুটো হেডলাইটের তীব্র আলো সামনে থেকে চোখে এসে পড়ল। তারপরেই যেমন মাটি ফুঁড়ে একটা ঝরঝরে ভ্যানগাড়ি এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল একবারে গায়ের ওপর। গাড়ি থেকে লম্বা ঝুলের কোট আর মাথায় বাঁদুড়ে টুপি পরা রোগা, লম্বা একটা লোক তড়াক করে লাফ দিয়ে নামল! সাহসী মাধবডাক্তারও চমকে উঠলেন। এটা কে? ভুত-টুত নাকি রে বাবা? নাকি ডাকাত? মাধবডাক্তারকে ফট করে প্রণাম করে বসল লোকটা। তারপর বলল, 'গাড়িতে উঠে পড়ুন ডাক্তারবাবু।'

ডাক্তারবাবু! তার মানে এই লোক তাকে চেনে। মাধবডাক্তার কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন। পথে যেতে যেতে সেই লোক শুরু করল বকবক। একটানা বলে যেতে লাগল।

'ডাক্তারবাবু, আমি দুলাল। টাওয়ারের জন্য মোবাইল ফোনটা কাজ করছে না। এটা আমাদের বাজারে শাকসবজি, ডিম, দুধ নিয়ে যাওয়ার গাড়ি। সকালে আপনি না আসায়, পিসিমা আমাকে বললেন, যাও দুলাল, বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াও। আমি বললাম,পিসিমা, ডাক্তারবাবু আজ আসবেন না। পিসিমা আমাকে দিলেন ধমক। বললেন, আমাকে মাধুকে চিনিও না। আজ ও আসবেই আসবে। আমার ওই চিঠি পাওয়ার পর আমাকে না দেখে থাকতেই পারবে না। তাছাড়া আজ এগারোই পৌষ। আমি বললাম, এগারোই পৌষ কি পিসিমা? পিসিমা আবার দিলেন ধমক। তোমাকে জানতে হবে না। কী আর করি, বড়রাস্তায় গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আপনার গাড়ি এলও না। আমি বাড়ি ফিরে পিসিমাকে বললাম। পিসিমা বলল, আমার মনে হয়, পথে গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছে। মাধু ট্রেনে-বাসে করে আসছে। যাও দুলাল, বাসের জন্য অপেক্ষা করো। আমি আবার গিয়ে দাঁড়ালাম। লাস্ট বাসও চলে গেল। আমি বাড়ি ফিরে গেলাম। পিসিমা বললেন, হতেই পারে না। মাধু আজ আসবেই। তুমি একটা কাজ করো দেখি, ঝিরি নদীর ব্রিজের কাছে গাড়ি নিয়ে যাও। শুনেছি বেশি রাতেও ওই পথে বাস যাতায়াত করে। আমি খুবই বিরক্ত হলাম ডাক্তারবাবু। এই ঠান্ডায় পথে পথে ঘুরতে কার ভালো লাগে? পিসিমাকে বোঝাতে গেলাম, উনি ফের দিলেন ধমক। বললেন, মাধু আজ আসবে। দরকার পড়লে সে হেঁটে আসবে। আমি ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এখন আপনাকে দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। পিসিমার কথাই ঠিক হল। আপনি আজ এসেই ছাড়লেন। আপনি কি সেই কলকাতা থেকে হাঁটছেন?' এতটা একদমে বলে দুলাল একটু থামল। তারপর চোখ বড় করে, মাথা চুলকে বলল, 'আপনি সত্যি ডাক্তারবাবু তো?'

তাকে নিয়ে পিসিমার এত জোর! এতদিন আসেননি তারপরেও! এত বড় বয়েসেও মাধবডাক্তারের চোখে জল চলে এল। জল না মুছে মাধবডাক্তার হেসে বললেন, 'না, আমি ডাক্তারবাবু নই, আমি ভূত।'

এরপরের ঘটনা ছোট। রাতে পিসিমার নিজের হাতে ভাজা গরম লুচি নলেন গুড়ের পায়েস দিয়ে জন্মদিনের পার্টি হল। লম্বা ঘুম দিলেন মাধবডাক্তার। পরদিন সকালে ব্যাগ থেকে স্টেথোস্কোপ আর ব্লাডপ্রেসারের যন্ত্র বের করে বললেন, 'এসো পিসিমা তোমার স্নেহ আর আদরটা মেপে দেখি।'

পিসিমা হেসে বললেন, 'দরকার নেই। কাল রাতে তুই যেভাবে পলাশডাঙায় এসেছিস তাতেই ওই দুই জিনিসের মাপ হয়ে গিয়েছে। এবার মোয়া বানাব।'

বিকেলে পিসিমার ফুলকপির শিঙাড়া খাওয়া শেষ করতেই বাড়ির বাইরে গাড়ির হর্ন। গাড়ি সারিয়ে কলকাতা থেকে বিশু চলে এসেছে। মাধবডাক্তার বললেন, 'ব্যস, আর চিন্তা নেই। পিসিমা ব্যাগ গোছাও। ক'দিন কলকাতায় আমার সঙ্গে থাকবে। এই ক'দিন দুলাল তোমার চাষবাস, মাছ, বাগান দেখুক। তোমাকে আমি ভালো করে পরীক্ষা করব। যেখানে যতটুকু অসুখবিসুখ হয়েছে সব সারিয়ে আবার এখানে ফেরত দিয়ে যাব। দেখব আমি কেমন ঘোড়ার ডিমের ডাক্তার।'

পিসিমা ভাইপোর কথা শুনে গোল চশমার ওপর দিয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে বললেন, 'যদি না যাই?'

মাধবডাক্তার বললেন, 'তাহলে বুঝব, এত কষ্ট করে আমার এখানে আসা ব্যর্থ। সত্যি আমি ঘোড়ার ডিম।'

পিসিমা গম্ভীর ভাবে বললেন, 'আচ্ছা, চল তাহলে। কদিন তোর কাছে থেকে আসি।'

ঝিরি নদীর ব্রিজে পিসিমাকে নিয়ে নামলেন মাধবডাক্তার। সন্ধে নামছে। নদীর জলে গোলাপি আলো যেন ঝিঁঝি করে বয়ে চলেছে। বিশু মোবাইল ফোনে ফোটো তুলতে থাকল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%