প্রচেত গুপ্ত

সফাস...ফিসফাস...।
চাপা আওয়াজ করে মাথার ওপর দিয়ে একটা বাদুড় উড়ে গেল।
এই দুপুরবেলা বাদুড়! তারওপর আবার এত বড়! বাদুড় তো রাতে বের হয়। এখন কোথা থেকে এল? গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল আমার। ভয়ে? নাকি ঠান্ডায়? উত্তর দিক থেকে বাতাস বইছে। শীত আসতে দেরি নেই। আমি দু-হাত দিয়ে সালুর কাঁধ চেপে ধরলাম।
ফিসফিস করে বললাম, 'সালু, ভয় করছে?'
সালু একটু নড়ে উঠল। যেন বলল, 'তা একটু করছে। তবে চিন্তা করিস না রালু। আমি তো রয়েছি। ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বিপদের কিছু দেখলে আমাকে শুধু চেপে ধরে থাকবি। তারপর একেবারে সাঁই করে ছুট দেব।'
আমরা দুজনে মস্ত একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ঝোপঝাড়, জঙ্গলে ঘেরা ভাঙাচোরা বাড়ি। দোতলা, কিন্তু দুপাশে অনেকটা ছড়ানো। রং নেই, পলেস্তারা খসে গেছে, ইট-পাথর দাঁত বের করে রয়েছে। যেন চোখ কটমট করে আমাদের দেখছে। এক্ষুনি কথা বলে উঠবে।
'কীরে রালু-সালু, এখানে কী করছিস? তোদের তো খুব সাহস দেখছি। এদিকে তো কেউ চট করে আসেই না। পেঁচা-বাদুড়, সাপখোপ আছে। অনেকে বলে, আমার এখানে ভূতও থাকে। তোরা তো এসব জানিস। নাকি জানিস না? তারপরেও এসেছিস কোন সাহসে?'
বাড়ির গা থেকে বড় বড় বট-অশ্বথ গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। চারশো বছরের পুরোনো বাড়ি। আর একটু বেশিও হতে পারে। চারশো বছর আগে তো ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার ছিল না, মুখে মুখে হিসেব হত। তাই হিসেবে একটু-আধটু ভুল হতেই পারে। ওই নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। এ তো আমাদের অঙ্কের সুশীলস্যার নয় যে যোগ বিয়োগে গোলমাল হলেই তেরে কেটে তাক হবে। আমাদের স্কুলের কোড রয়েছে। তবলার বোল। তেরে কাট তাক মানে গাট্টা। তুম তারে তাক মানে চিমিটি। দে নানা দেরে নানা মানে কানমলা। এখানে তো সেসব ব্যাপার নেই। রতনপুরের সবাই এই বাড়ির বয়স চারশো বছরই ধরে রেখেছে।
এটা হল রতনপুরের জমিদারবাড়ি। জমিদারদের নাম ছিল শ্রীশ্রী শীল শ্রীযুক্ত রত্নদিত্য। সেখান থেকে হয়েছিল রত্ন। রত্ন থেকে হয়েছে রতন। ওই রতন থেকেই আমাদের এই জায়গার নাম রতনপুর।
একসময়ে খুব রমরমা ছিল। লোকলস্করে ভরা। হাতি-ঘোড়াও ছিল। বছরভর নানা ধরনের অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। আলো দিয়ে গোটা বাড়ি সাজানো হত। পুজোপার্বনের সময় তো কথাই ছিল না। আশপাশের দশটা গাঁয়ের লোক চারদিন ধরে খেত। জমিদারমশাই খাওয়াতে খুবই ভালোবাসতেন। নিজের হাতে পরিবেশন করতেন। কোমরে ধুতি কষিয়ে বেঁধে, গলায় লম্বা সোনার চেন পরে, লম্বা-চওড়া, সৌম্যকান্তি জমিদারমশাই রসগোল্লার বালতি নিয়ে ঘুরতেন। রসে কব্জি ডুবিয়ে একসঙ্গে চারটে করে রসগোল্লা তুলে পাতে দিতেন। পেট আঁইঢাই করলেও 'না' বলা যাবে না। জমিদারমশাইয়ের কথা অমান্য করে কার সাধ্যি? চারটে কেন? ছ'টা রসগোল্লা দিলেও খেতে হত।
যাক, ওসব কথা, আজ আমি আর সালু এখানে এসেছি রসগোল্লা খেতে নয়, এসেছি একটা গা ছমছমে অ্যাডভেঞ্চারে। যদি পারি তাহলে দারুণ একটা ব্যাপার হবে। রতনপুরের সকলের একেবারে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।
তোমরা কেউ কেউ হয়তো ইতিমধ্যেই আমাদের চিনতে পেরেছ। 'কিশোর ভারতী' পত্রিকার 'বইমেলা গল্প স্পেশাল ২' সংখ্যায় আমি লিখেছিলাম 'রালু-সালু'। তোমরা যারা সেই গল্প পড়েছিলে তারা আমাদের সম্পর্কে জেনে গেছ। যারা পড়োনি তাদের জন্য বলে নিই। আমার নাম রাহুল। সবাই ডাকে রালু। আমার একটা সাইকেল আছে। তার নাম সালু। আমরা দুজনে খুব বন্ধু। সবাই আমাদের 'রালু-সালু' বলে চেনে। বলে, 'রালু যেখানে, সালুও সেখানে।' কথাটা একেবারে মিথ্যে নয়। সাইকেল হলে কী হবে, সালু আমার কথা বোঝে, আমিও ওর কথা বুঝতে পারি। আমাকে কিছু বলবার সময় ও আমার হাতেই নড়ে ওঠে, কেঁপে ওঠে, থেমে যায়, বেল বাজায়, চেনে ঝনঝন আওয়াজ করে। আমিও বুঝতে পারি, ও কী বলছে। এটা কোনো অলৌকিক ব্যাপার নয় কিন্তু। এটা মনের ব্যাপার। শুধু আমি একা নই, আমি হলফ করে বলতে পারি, আমার মতো অনেক ছেলেমেয়ে আছে যারা তাদের সাইকেলের কথা বুঝতে পারে। সাইকেলও পারে। তাই না?
আমরা থাকি একটা ছোট্ট গ্রাম কাম মফসসল শহরে। নাম রতনপুর। খুব সুন্দর জায়গা। অনেক গাছপালা, বিল, মাঠ রয়েছে। আমি পড়ি রতনপুর উচ্চবিদ্যালয়ে। ক্লাস এইটে। আমরা ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়ি। আমাদের ক্লাসের মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে সব ব্যাপারে সমানে সমানে যায়। পড়াশোনা, খেলাধুলো যেমন পারে, মারপিটও জানে। আমাদের ক্লাসের দীপশিখা তো ক্যারাটেতে ওস্তাদ। ওকে বড় ক্লাসের ছেলেরাও সমঝে চলে। আমাদের ক্লাসের কারও সঙ্গে গোলমাল পাকাতে এলে এমন হাত-পা ছুঁড়বে যে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি' হয়ে যাবে। চুপিচুপি বলছি, দীপশিখা মেয়ে হলে কী হবে, ও আমাদের ভরসা।
আমাদের রতনপুরের দক্ষিণ দিকে একটা টিলা আর জঙ্গল রয়েছে। আমরা বলি 'বনটিলা'। ওটা একটা ভারি সুন্দর বেড়ানোর জায়গা। পিকনিক করা যায়। সেই বনটিলার পাশে জমিদারবাড়ি।
আমি সালুকে চালিয়ে জমিদারবাড়িতে এসেছি। সালুর হ্যান্ডেলদুটো হল ওর কাঁধ। আমি ওর কাঁধ ধরে রয়েছি। দুজনে দাঁড়িয়ে রয়েছি একটা বড় হিজল গাছের নীচে। সালুর সিটে বসে রয়েছি। পা মাটিতে ঠেকানো। কয়েক গজ দূরেই ভাঙা জমিদারবাড়ি।
'ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ...।'
বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। কোথায় যেন একটা পাখি ডেকে উঠেছে। পাখির গলা এমন গা ছমছমে হয়! আমি সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম। যা করবার তাড়াতাড়ি করতে হবে। একটু পরেই আলো পড়ে যাবে। ইতিমধ্যে বাড়িটার ছায়া বড় হতে শুরু করেছে। বাইরে যেটুকু দেখা যাচ্ছে, এই ভাঙা বাড়ির ভিতরে ঢুকলে তো কিছুই দেখা যাবে না। সালুকে কী করব? এই গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে রেখে যাই? ওকে নিয়ে তো আর ভিতরে যাওয়া যাবে না। নাকি যাওয়া যাবে? আমি খানিকটা হকচকিয়ে আছি। এভাবে একা এখানে আসাটা মনে হচ্ছে, ঠিক হয়নি। খানিকটা জেদের বসে চলে এসেছি। আগুপিছু ভাবা উচিত ছিল। যদি আসতেই হয়, বন্ধুদের ডেকে দল বেঁধে আসা যেত। আসলে কৃতিত্বটা আমি একাই নিতে চেয়েছিলাম, তাই আর কাউকে বলিনি। এই বিশাল ভাঙা বাড়ি, বাদুড়ের ডানা ঝাপটানি, জংলি পাখির কর্কশ ডাক, শীতের ছায়া দেখে মনে হচ্ছে লোভটা বেশি হয়ে গেছে। সঙ্গে সালু আছে ঠিকই, কিন্তু বিপদে পড়লে সে আর কতটা সামলাতে পারবে? যতই আমার বন্ধু হোক, ও তো একটা সাইকেল।
যাক, এসে পড়েছি যখন, যেতে তো হবে। আমি সালুকে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে রেখে জমিদারবাড়ির দিকে পা বাড়ালাম।
এই ফাঁকে কেন এখানে এসেছি সেই গল্পটা বলেনি।
আমাদের রতনপুর ক্লাবের পঞ্চাশ বছর। তিনদিন ধরে বিরাট হইচই হবে। খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা, নাটক, যাত্রা, ফুটবল ম্যাচ, সাঁতার কম্পিটিশন কিচ্ছু বাদ থাকবে না। এই সময় একটা পত্রিকাও বের হবে। অনেকে সেখানে লিখবে। সেদিন আমি ক্লাবে গিয়েছিলাম। সাঁতারের কম্পিটিশনে নাম দিতে। দেখি হরিসাধনবাবু ক্লাবঘরের বাইরে চেয়ারে বসে ক্লাবের এক দাদার সঙ্গে কথা বলছেন। আমাদের বাড়ির কাছেই থাকেন হরিসাধনবাবু। একসময়ে কলকাতার কলেজে ইতিহাস পড়াতেন। এখন বয়েস হয়েছে। অবসর নিয়ে বাগান করেন আর লেখালিখি করেন। তবে মানুষটা একটু খিটখিটে ধরনের। ছোটদের দেখলেই বকাঝকা দেন। সেদিন আমাদের একটি ক্লাবের এক দাদাকে নীচু গলায় বলছে,'বুঝলে অতীশ, ঠিক করছি এবার তোমাদের ক্লাবের পত্রিকায় রতনপুরের ইতিহাস নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখব।'
অতীশদা বলল, 'লিখুন না, ভালোই তো হবে।'
হরিসাধনবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, 'ভালো হবে জানি, কিন্তু লেখার সঙ্গে রতনপুরের জমিদারের একটা ছবি তো ছাপতে হবে।'
অতীশদা বলল, 'রত্নদিত্য জমিদার?'
হরিসাধনবাবু বললেন, 'হ্যাঁ।'
অতীশদা মাথা নেড়ে বলল, 'সে তো পাওয়া যাবে না। এত বছর হয়ে গেল রতনপুরের জমিদারের ছবি কেউ দেখেনি।'
হরিসাধনবাবু হতাশ গলায় বললেন, 'সেটাই তো কথা। আমার লেখায় যদি ছবি থাকত এই প্রথম রতনপুরের মানুষ তাকে দেখতে পেত।'
অতীশদা হরিসাধনবাবুর হাত ধরে বলল, 'দারুণ হবে। দেখুন না একটা ছবি যদি জোগাড় করতে পারেন। একেবারে মারকাটারি কাণ্ড হবে।'
হরিসাধনবাবু বললেন, 'সে যে দারুণ একটা ব্যাপার হবে, সে তো আমিও জানি। কিন্তু ছবিটা পাব কোথায়? আজ পর্যন্ত কোনও বইতে তো ছাপা হয়নি। কলকাতার বিভিন্ন লাইব্রেরিতেও খোঁজ করেছি। লাভ হয়নি।'
অতীশদা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, 'তাও চেষ্টা করে দেখুন। আমাদের ক্লাবের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষ্যে এটাই রতনপুরের মানুষের জন্য সবথেকে বড় উপহার হত।'
হরিসাধনবাবু দুঃখ দুঃখ মুখ করে মাথা নাড়তে লাগলেন। ক্লাব থেকে বেরোনোর সময় আমি হরিসাধনবাবুর মুখোমুখি হয়ে গেলাম। টুক করে যে পালিয়ে যাব সে উপায় ছিল না। হরিসাধনবাবুও দিলেন ধমক।
'এই যে রালু, লেখাপড়া নেই?'
আমি মাথা চুলকে বললাম, 'না মানে, হ্যাঁ মানে...'
'না, হ্যাঁ মানে কী? সারাদিন সাইকেল নিয়ে টইটই করে বেড়ালে চলবে? যাও এখনই বাড়ি গিয়ে পড়তে বসো।'
আমি পালিয়ে বাঁচালাম। তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এমন কিছু করব, যাতে এই হরিসাধনবাবু আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। সাইকেল নিয়ে টইটই করবার ফল উনি বুঝতে পারবেন। তিনদিন ভেবেছি। তারপর ঠিক করলাম...।
জমিদারবাড়িতে এখন আর কোনও দরজা নেই। সদরের মুখটা একেবারে 'হা হা' করছে। ধুলো, ঝরাপাতা, শুকনো গাছের ডাল মাড়িয়ে সদর টপকাতেই ঝপ করে একটা স্যাঁতেস্যাঁতে ঠান্ডা ভাব গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারশো বছরের পুরোনো বাড়ির ভিতর ঢুকেছি ভাবতেই শরীরের ভিতরটা শিউরে উঠল। মস্ত বড় উঠোন। খিলান দেওয়া গোল বারান্দা। বারান্দায় সারি সারি ঘর। কোনোটায় দরজা রয়েছে, বড় বড় দরজা। কোনোটায় দরজা নেই। আমি বারান্দায় উঠে পড়লাম। যা ভেবেছিলাম তাই। বাড়ির ভিতরটা অন্ধকার। ছায়া ছায়া। সোঁদা গন্ধও আসছে। আমি এখন কী করব? প্রতিটা ঘরে উঁকি মারব? অসম্ভব। এতগুলো ঘরে কোথায় জমিদার রত্নদিত্যের ছবি টাঙানো রয়েছে? আদৌ কি রয়েছে? আর যদি বা থাকে সেই ছবি কি আস্ত থাকবে? হতেই পারে না। আমি বোকার মতো কাজ করেছি। ফিরে যাওয়া উচিত। এখনই ফিরে যাওয়া উচিত।
আশ্চর্য! ফিরে যাব ভেবেও ফিরতে পারছি না! কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। কেউ যেন সম্মোহন করে ফেলেছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। মনে হয়, একধরনের টান অনুভব করছি। ইশ, একটা টর্চ আনা উচিত ছিল।
বড় বড় ঘরে উঁকি দিতে থাকি একটার পর একটা। কোনো ঘরে জানলা ভেঙে পড়েছে। বাইরের আলো ঢুকেছে। কোথাও আবার অন্ধকার ঘুটঘুটি। আমার সাড়া পাওয়ায় বাদুড় উড়ে গেল ফরফর করে। ঘরের দেওয়ালগুলোর অবস্থা বাড়ির মতো শোচনীয়। ইট সুড়কি, পলেস্তারা খসে পড়েছে। যে-কোনো সময় মুখ থুবড়ে পড়বে।
কিন্তু কোথায় ছবি? কোনো ঘরে ছবির চিহ্নমাত্র নেই। কিছুই নেই। খাট পালঙ্কের ভাঙাচোরা পড়ে রয়েছে। আস্ত কিছু থাকবেই বা কী করে? নিশ্চয় চোর-ডাকাতে সব নিয়ে গেছে।
বারান্দা শেষ করে আমি একটা সিঁড়ির মুখে এলাম। একসময়ে শ্বেত পাথর দিয়ে বাঁধানো ছিল, এখন দাঁত বের করা পুরোনো ইটে এবড়ো-খেবড়ো হয়ে গেছে। ওপরে উঠব? কিছুতেই নয়। এই ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে বড় বিপদ হয়ে যাবে। তার থেকে ফিরে যাই। নীচে যখন ছবি নেই, ওপরে থাকবে কেন? আর নয়, অনেক হয়েছে। ঘোর কাটিয়ে নিজেকে জোর করে বের করতে হবে। চেষ্টাও করলাম, কিন্তু পারলাম কই! গা ছমছম জমিদারবাড়ির টান এড়ানো খুব কঠিন। তাই পিছন ফিরতে গিয়েও থমকে গেলাম। দোতলার ঘরগুলোতে না যাই বারান্দাটাতে একবার উঁকি মেরে এলে হয় না? অনেক সময়ে বারান্দায় পূর্বপুরুষদের ছবি ঝোলানো থাকে। জমিদারবাবুর নাতিরা যদি তেমন কিছু করে থাকে? উঠব? সালুকে ভিতরে এনে রাখলে মনে সাহস পেতাম। ও তো আমার বন্ধু।
আমি নড়বড়ে হাতল ধরে এক এক পা করে উঠতে থাকি। সিঁড়ি শেষ হতেই ঘটনাটা ঘটে। সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে, তার ঠিক মুখেই দেখতে পাই দেওয়ালে মস্ত একটা ছবি ঝুলছে। মলিন হয়ে যাওয়া, ধুলোয় ঢাকা সোনালি ফ্রেমের ছবি। তেল রঙে আঁকা, অভিজাত, এক সুপুরুষ তাকিয়ে আছেন। রং নষ্ট হয়ে গেলেও মানুষটাকে লাগছে উজ্বল।
আমি এগিয়ে যাই। পাথরের বারান্দা টপকে মাথা তুলে ছবিটার দিকে তাকাই। নীচে প্রায় মুছে যাওয়া ফলকে লেখা শ্রীশ্রী শীল শ্রীযুক্ত রত্নদিত্য। এক মুহূর্ত দেরি করি না। আমার বুকের ভিতরটা যেন লাফাচ্ছে। ডিঙি মেরে উঠি। ছবি ধরে টান মারি। মরচে ধরা চেন ছিঁড়ে ছবি হাতে চলে আসে। আমি ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে হুড়মুড়িয়ে নিচে নামি। আধখানা পথ যেতেই পিছন থেকে কেউ একজন গম্ভীর গলায় ডাক দিল, 'এই যে খোকা আমার বাড়িতে প্রথমদিন এলে, কিছু না খেয়েই চলে যাবে?'
আমি পিছন ফিরলাম। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমার হাতের ছবির মানুষটা সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন!
'এসো, ওপরে এসো, একটু মিষ্টিমুখ করে যাও। জমিদারবাড়ি থেকে কেউ না খেয়ে যায় না।'
এ হতেই পারে না। আমি মিথ্যে দেখছি। ভুল দেখছি। আমার মাথায় জমিদারমশাইয়ের গল্প চেপে আছে। তাই এসব দেখছি। আমাকে পালাতে হবে। এখনই পালাতে হবে। এই ভেবে যে-ই পা বাড়িয়েছি, ফসকে পড়লাম হুড়মুড়িয়ে। একেবারে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে। আর নেমেই দেখি সিঁড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সালু। আমার সাইকেল। আমার বন্ধু। ও কোথা থেকে এল! ওকে না বাইরে রেখে এসেছিলাম। নাকি দোতলায় ওঠবার আগে মনে সাহস পেতে টেনে এনেছি ভিতরে? যাই হোক, আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে সালুর পিঠে উঠে বসে প্যাডেলে চাপ দিলাম। আমার এক হাতে শক্ত করে ধরা আছে জমিদারের ছবি। উঠোন পেরিয়ে সালু ছুটল বনবন করে। সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে একেবারে রাস্তায় এসে পড়ল।
'হ্যাঁরে সালু, আমি কি ছবিটা চুরি করলাম?
ঘণ্টি বাজাতেই সালু যেন উত্তর দিল, 'একেবারেই নয় রে রালু। তুই ইতিহাস রক্ষা করলি। ইতিহাস রক্ষা করতে একটু-আধটু এরকম অ্যাডভেঞ্চার লাগে।'
তারপর কী হল?
রতনপুর ক্লাবের পত্রিকায় জমিদার শ্রীশ্রী শীল শ্রীযুক্ত রত্নদিত্য মহাশয়ের ছবি ছাপা হল। নীচে লেখা হল, এই ছবি খুঁজে আনবার জন্য শ্রীমান রালুকে অনেক ধন্যবাদ। আমি ওই লেখা দেখে বেঁকে বসলাম।
'শুধু রালু লিখলে হবে না। সালুর কথাও লিখতে হবে।'
তাই লেখা হল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন