অন্যমনস্ক শোভন নস্কর

প্রচেত গুপ্ত

সেদিন সন্ধেবেলা শ্যামবাজারের মোড়ে এক কাণ্ড হল।

ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক বাসে উঠলেন। হাতে ব্যাগ আর বগলে কাঠের লম্বা হাতলওলা ছাতা। বোঝাই যাচ্ছে, অফিস থেকে ফিরছেন। ভদ্রলোক একটা বসবার সিটও পেয়ে গেলেন। বসলেন আরাম করে, যেন বাড়িতে গদির সোফায় বসেছেন। চোখ থেকে চশমা খুলে ধুতির খুট দিয়ে চশমার কাচ মুছতে মুছতে হাঁক দিলেন, 'কই গো, সাবান আর গামছাটা দাও দেখি, স্নানটা সেরে ফেলি। উফ, যা গরম পড়েছে।'

বাসের যাত্রীরা তো হাঁ। মানুষটা বলে কী! চলন্ত বাসে সাবান মেখে স্নান করবে! নির্ঘাত গরমে মাথা গোলমাল করছে। ভদ্রলোক ফের গলা তুলে বললেন, 'বালতির জল ঠান্ডা আছে তো?'

যাত্রীরা এবার নড়েচড়ে বসল। দু-একজন উঠে গুটি-গুটি দরজার দিকে এগিয়েও গেল। নেমে যাওয়াই ভালো। মাথা গোলমেলে মানুষের সঙ্গে বাসযাত্রা উচিত নয়। এখন ঠান্ডা জলে স্নান করতে চাইছে, এরপরে কী করবে তার ঠিক নেই। কামড়েও দিতে পারে। বাসের কন্ডাক্টর কড়া গলায় বললেন, 'কী বলছেন হাবিজাবি কথা! এটা বরানগর যাওয়ার বাস। এখানে স্নানের জল কে দেবে? আর দিলেই বা আপনি করবেনটা কী?'

ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এই কথায় থমকে গেলেন। কেমন যেন ভেবাচেকা খেয়ে বিড়বিড় করে বললেন, 'এটা বাস!'

কন্ডাক্টর চোখ পাকিয়ে বললেন, 'তবে কী ভেবেছেন? আপনার বাড়ির বসবার ঘর?'

চশমাটা ফের চোখে পরে নিয়ে ভদ্রলোক চারপাশে তাকালেন, তারপর জিব বের করে বললেন, 'ছি-ছি। কী কাণ্ড দেখুন দেখি। বাসে উঠেছি খেয়ালই নেই। ভেবেছি, বাড়ি চলে এসেছি। আমাদের বাড়িতে ঢোকবার মুখে অমন দুটো সিঁড়ি আছে কিনা। সেই সিঁড়ি ডিঙিয়ে দালানে উঠতে হয়। ইস, কী মারাত্মক ভুল করেছি! গিন্নিকে স্নানের জল পর্যন্ত দিতে বললাম। রোজ যেমন বলি আর কী। খুবই লজ্জার কথা। এত বড় একটা গোলমাল করে ফেললাম! অন্যমন্যস্ক ছিলাম। অফিসের একটা হিসেব মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মনে হচ্ছে, একটা যোগ ভুল করে এসেছি। হাতে এগারোর বদলে সাত রেখেছিলাম। চারের তফাত হয়ে গেল। ওই চার নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লাম যে বাসে উঠছি না নিজের বাড়িতে ঢুকছি মাথায় ছিল না। কিছু মনে করো না ভাই। এই নাও পয়সা, টিকিট দাও।'

কন্ডাক্টর হেসে ফেলে বললেন, 'নানা, কিছু মনে করিনি। ভুল তো হতেই পারে।'

উলটো দিকে বসা এক রসিক যাত্রী বললেন, 'দাদা, বাসে উঠে নিজের ঘর মনে করছেন ঠিক আছে, কিন্তু ঘরে গিয়ে আবার বাস উঠেছেন ভেবে বসবেন না। গিন্নিকে টিকিটের পয়সা এগিয়ে দিলে একটা তুলকালাম কাণ্ড হবে।'

বাকি যাত্রীরা 'হো-হো' আওয়াজে হেসে উঠল। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মানুষটাও লজ্জা লজ্জা মুখ করে হেসে নিজেকে সামলালেন। না সামলে উপায় কী? এমন বিড়ম্বনার মধ্যে তাঁকে যে প্রায়ই পড়তে হয়। এ ধরনের কাণ্ড উনি হামেশাই ঘটান।

ভদ্রলোকের নাম শোভন নস্কর। সবাই ডাকে 'শোভনবাবু'। বয়স চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ। চাকরি করেন বেসরকারি অফিসে। দুনিয়ায় অন্যমনস্ক মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু শোভনবাবুর মতো অন্যমনস্ক পাওয়া দুষ্কর। অন্যমনস্ক হওয়ার কারণে তিনি যে কত ভুল করে বসেন তার ঠিক নেই। অফিসে, পাড়ায়, ক্লাবে আড়ালে তাঁকে ডাকা হয় 'ভুলনবাবু'। তবে ভুল করলেও মানুষটা ভালো। মনে কোনও প্যাঁচ নেই। লোভও নেই। নিজের যোগ্যতায় যেটুকু যা পেয়েছেন তাতেই খুশি। কাজের ব্যাপারেও দায়িত্বশীল। ফাঁকিবাজি নেই। সে বাড়িতেই হোক, অফিসেই হোক অথবা পাড়ার ক্লাবেই হোক। নিজের কাজটুকু মন দিয়ে করবার চেষ্টা করেন। অল্প মন নয়, বেশি মন। আর তাতেই মাঝেমধ্যে হয় বিরাট বিপত্তি। কাজ করবার সময় আগের কাজের কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। হিসেবে কোনও গোলমাল হল না তো? ভুল হয়নি কোথাও? বাদ গেল নাকি কিছু? ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন। ব্যস, তাতেই যেটুকু কেলেঙ্কারি হওয়ার হয়ে যায়। তবে মানুষ ভালো বলে, 'ভুলনবাবু'-র ওপর কেউ বেশিক্ষণ রাগ করতে পারে না। প্রথমটায় তেঁড়েফুড়ে উঠলেও, শেষপর্যন্ত হাসিতেই ঘটনা শেষ হয়। ওই বাসের মতোই।

অন্যমনস্ক হওয়ার কারণে ছোটবেলায় শোভন নস্করকে কম বকুনি খেতে হয়নি। শুধু বকুনি নয়, সেই খাওয়ার মেনুতে কানমলা, গাট্টাও থাকত। থাকবে তো বটেই। অন্যমনস্ক হয়ে তিনি কোনও কোনও সময় ছোটখাটো ভুল করতেন না, একেবারে বাঘা বাঘা গোল পাকাতেন। তবে শুধু যে বকুনি জুটেছে এমন নয়, প্রাইজও জুটেছে। যেমন হয়েছিল, ক্লাস সেভেনে হাফইয়ারলি পরীক্ষায়।

ক্লাসে এসে অঙ্ক পরীক্ষার খাতা দেখাচ্ছিলেন প্রদীপস্যার। ছেলেদের নাম ডাকছিলেন আর হাতে খাতা তুলে দিচ্ছিলেন। সেইসঙ্গে নিজের দাতঁ দু-ভাবে ব্যবহার করছিলেন। যার খাতায় নম্বর কম, তার জন্য দাঁত কিড়মিড়, আর যার নম্বর বেশি তার জন্য দেঁতো হাসি। প্রদীপস্যার আবার কথায় কথায় 'হুম' শব্দ করেল। শোভন নস্করের খাতা হাতে নিয়ে স্যার থমকে গেলেন।

'হুম। শোভন, এটা কী করেছিস?'

ক্লাস সেভেনের শোভনবাবু মাথা চুলকে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, 'কী করেছি স্যার? নিশ্চয় ভুল করেছি। সিলি মিসটেক। অঙ্কে আমার খুবই বোকার মতো ভুল হয়।'

প্রদীপস্যার গোল চশমা কপালে তুলে বললেন, 'সিলি মিসটেক তো ছোটখাটো ব্যাপার হে। মিসটেক যদি পুকুর হয়, তুই মিসটেকের মহাসাগর করেছিস। মিসটেক যদি নাতি হয়, তুই মিসটেকের ঠাকুরদা করেছিস।'

শোভনবাবু আরও কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, 'আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার।'

প্রদীপস্যার বললেন, 'আমিও কি ছাই বুঝতে পারছি? তুই নিজে এসে দেখে যা কী কাণ্ড করেছিস। খাতাটা তুলে ক্লাসের সবাইকে দেখা।'

শোভনবাবুকে দেখাতে হয়নি, প্রদীপস্যার নিজেই সবাইকে খাতা তুলে দেখিয়েছিলেন। খাতায় খুব যত্ন করে একটা ম্যাপ আঁকা। ম্যাপের বিষয় 'ভারতবর্ষের জলবায়ু'। কোথায় বৃষ্টি বেশি, কোথায় মরুভূমি, কোথায় বরফ পড়ে পেনসিলের শেড আর আঁকিবুকি দিয়ে বোঝানো। ক্লাসের অনেক ছেলেই হেসে গড়িয়ে পড়ল। প্রদীপস্যার হুংকার দিলেন, 'অঙ্ক খাতায় ম্যাপ এঁকেছিস কেন? এটা কি ভূগোলের পরীক্ষা? হুম।'

শোভনবাবু ঢেঁক গিলে বললেন, 'স্যার ভুল করে এঁকে ফেলেছি। সব অঙ্ক হয়ে গেলে মনে মনে ভূগোলের রিভিশন দিচ্ছিলাম। পরদিনই ভূগোল পরীক্ষা ছিল কিনা। তখনই অন্যমনস্ক হয়ে খাতায় ম্যাপ এঁকে ফেলেছি। আর কখনো হবে না, অন্যায় হয়ে গেছে স্যার।'

প্রদীপস্যার গম্ভীর বললেন, 'হুম। তুই যে অন্যমন্যস্ক হয়ে নানা কাণ্ড করিস সে খবর স্কুলে সবাই জানে। তা বলে অঙ্ক খাতায় জলবায়ুর ম্যাপ এঁকে বসবি! ছিছি।'

শোভনবাবু বলেলেন, 'এবারের মতো মাপ করে দিন স্যার।'

প্রদীপস্যার আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, 'হুম, এরকম তুই আগেও বলেছিস। গত বছর ইতিহাসের হোমওয়ার্ক করতে গিয়ে খাতায় পাটিগণিত করেছিলি। সম্রাট আকবরের কথা লিখতে গিয়ে চৌবাচ্চায় নল দিয়ে জল ঢোকা বেরোনোর পাটিগণিত করেছিলি। করিসনি? তখনও বলেছিলি, আর হবে না। আর কতবার তোকে ছেড়ে দিতে হবে? হুম। এবারের অঙ্ক পরীক্ষায় তুই কত পেয়েছিস বলেতে পারবি?'

শোভনবাবু ছলছল চোখে বলেছিলেন, 'জানি না স্যার। মনে হয় খুবই কম।'

প্রদীপস্যার ফেঁস করে নিশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, 'হুম। ভালোই নম্বর পেয়েছিস। বেশিরভাগ অঙ্কই কারেক্ট। সঙ্গে এক্সট্রা পাঁচ নম্বর পেয়েছিস ম্যাপের জন্য। যদিও অঙ্ক পরীক্ষায় ম্যাপের জন্য নম্বর দেওয়া যায় না। তারপরেও দিয়েছি। কারণ ম্যাপ সুন্দর হয়েছে। তোদের ভূগোলস্যারকে দেখিয়েছিলাম। তিনিও প্রশংসা করেছেন। তবে মনে রাখবি এই শেষবার। এরপর এরকম ভুলো মন দেখলে দশ নম্বর মাইনাস করে দেব। হুম।'

ক্লাসের যেসব ছেলে খানির আগেই হেসে গড়িয়ে পড়েছিল, তাদের মুখ শুকিয়ে আমসি। বকুনির বদলে এক্সট্রা নম্বর! হিংসে তো হবেই।

সেবার বেঁচে গেলেও ক্লাস টেনে পড়বার সময় বাঁচতে পারেননি শোভন নস্কর। স্কুলে চলছিল ফুটবল লিগ। ক্লাস নাইনের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচে শোভনবাবু খেলছিলেন রাইট আউটে। ফুটবল খেলায় শোভনবাবু ছিলেন ওস্তাদ। দম ছিল খুব। মাথা নামানো গোঁত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো বল নিয়ে এগিয়ে যেতেন। ড্রিবল করবার কায়দাও জানতেন ভালো। বিপক্ষ দলের কেউ সামনে এলে ডাইনে-বাঁয়ে এমন প্যাঁচ দিতেন যে বেচারি নাস্তনানাবুদ হয়ে নিজের পায়ে জড়িয়েই হুমড়ি খেত। কিন্তু সেদিন হল সর্বনাশ। হাফ টাইমের একটু পরে শোভনবাবুর পা থেকে কীভাবে যেন বল কেড়ে নিয়ে ক্লাস নাইনের অর্ক সাঁই-সাঁই করে ক্লাস টেনের চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। শোভনবাবুও পিছু নিলেন। তার পা থেকে বল বেরিয়ে গেছে, প্রেস্টিজের ব্যাপার। অর্ক পৌঁছে যায় ক্লাস টেনের পেনাল্টিবক্সে। ঝাঁপিয়ে বল ছিনিয়ে নেন শোভনবাবু। আর তারপরেই হল কেলেঙ্কারি। হালকা পায়ের ঠেলায় নিজের দলের গোলকিপার শান্তনুকে ঠকিয়ে গোলে বল ঢুকিয়ে দিলেন শোভনবাবু। সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসল। কেলেঙ্কারির এখানেই শেষ নয়। খেলা শেষের তিন মিনিট আগে বল কাড়াকাড়িতে জড়িয়ে পড়ে আবার নিজেদের পেনাল্টিবক্সে ঢুকে পড়ছিলেন শোভনবাবু। প্রতিপক্ষর পা থেকে বল সরিয়ে নিলেন পায়ের টানে। ক্লাস টেনের সবাই জানত, এবার বল নিয়ে উলটো দিকে ছুটবেন শোভনবাবু। কিন্তু একী কাণ্ড! ছেলে যে নিজের গোলের দিকে এগোয়! বেচারি গোলকিপার হিমাদ্রি আর্তনাদ করে উঠল।

'ওরে শোভন করিস কী? করিস কী? আমার হাতে বল দে।'

আর করিস কী, শোভনবাবু বল ডান পা, বাঁ-পা করে হিমাদ্রি ঠকিয়ে গোলে বল ঢুকিয়ে দিল।

পরপর দুটো সেমসাইড গোল খেয়ে সেদিন ক্লাস টেনকে হারতে হয়েছিল। এর থেকে লজ্জার আর কী আছে? খেলা শেষে সবাই মিলে চেপে ধরল শোভনবাবুকে। তারা এই মারে তো সেই মারে।

'একটা সেমসাইড হলে তাও মেনে নেওয়া যেত। দু-দুটো সেমসাইড করলি! আমাদের হারিয়ে ছাড়লি!'

শোভনবাবু শান্ত ভাবে বলেছিলেন, 'আমারই দোষ। প্রথমবার বলটা কীভাবে পা ফসকে আমাদের গোলের ভিতর ঢুকেছিল সেইটা দেখতেই দ্বিতীয়বার বলটা নিয়ে নিজেদের গোলের কাছে যাই। গোলে ঢুকিয়েও দিই। ভুলেই গিয়েছিলাম, বল গোলে ঢুকলে বিপদ। আবার গোল খেয়ে গেলাম। কথাটা মাথাতেই ছিল না। এবার তোরা ঠিক কর কী শাস্তি দিবি। তবে সেমসাইড কেন করেছি সেটা জানা দরকার ছিল। গোলে মন ছিল বেশি, গোলটা কার সেটা মাথায় ছিল না।'

ছেলের দল তো হতবাক। এই ছেলেকে কী শাস্তি দেবে?

শোভনবাবু ভেবেছিলেন, বড় হওয়ার পর 'অন্যমনস্ক অসুখ' কমবে। অসুখ কমল। আগের মতো আর ঘন ঘন হয় না। তবে যেটুকু হয় সেটুকুই মারাত্মক। মারাত্মক না হলে কেউ বাসে উঠে স্নানের জল চায়? এই তো সেদিন এক ভয়ংকর কাণ্ড ঘটেছিল। বাজারে যাওয়ার সময় শোভনবাবুর গিন্নি বললেন, 'আম আনবে বেশি করে। মোরোব্বা বানাব।'

আমের মোরোব্বা শোভনবাবুর অতি প্রিয়। তিনি খুশি মনে বাজারে ঢুকলেন। মনে মনে ছোটবেলায় শোনা একটা ছড়া আওড়াতে লাগলেন, 'জ্যোষ্ঠি মাসের গরমে, আম জাম খাও আরামে/এক ছুটে গিয়ে ঠান্ডা পুকুরে, ঝাঁপ দাও ভাই দড়ামে।' ব্যস, শোভনবাবু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। আহা! ছোটবেলার গরমকাল কেমন মজারই না ছিল। গরমের ছুটি, ফুটবল, পুকুরে সাঁতার। গদগদ মনে শোভনবাবু আমের বদলে ভুল করে এক কেজি কালোজাম কিনে বসলেন। কেনবার পরই মাথায় এল হরিনাথ ঘোষালের কথা। হরিনাথ ঘোষাল থাকেন শোভনবাবুর পাড়াতেই, দুটো গলি পরে। রগচটা মানুষ। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আরও যেন খিটখিটে হয়ে গেছেন। কিন্তু কালোজাম কেনবার পর হরিনাথ ঘোষালের নাম কেন মনে পড়বে? কালোজামের সঙ্গে কষটে মিঠে স্বাদ, নুন দিয়ে টপাটপ মুখে ফেলবার সম্পর্ক আছে, হরিনাথ ঘোষালের সম্পর্ক কী? কিছুতেই মনে করতে পারলেন না শোভন নস্কর। মাথার মধ্যে ভন ভন করতে লাগল। খুবই অস্বস্তির ব্যাপার। তিনি কালোজাম ভর্তি থলি নিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে পড়লেন। মিনিট দশ গেলেই শোভনবাবুর বাড়ি। পার্কের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট করলে মিনিট তিন-চার মিনিট কম হয়। আজ যেন একটু বেশি সময় লাগল। গেট খুলে ভিতরে ঢুকে কড়া নাড়বার পর শোভনবাবু বুঝলেন, ভুল করে ফেলেছেন। মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছেন। নিজের বাড়িতে নয়, তিনি ভুল করে এসে পড়েছেন হরিনাথ ঘোষালের বাড়িতে।

'কী ব্যাপার শোভনবাবু এই সাত সকাল আপনি! বিপদ-আপদ কিছু হয়েছে নাকি?'

কী বলবেন, কী করবেন বুঝতে না পেরে শোভনবাবু ম্যানেজ করবার জন্য বললেন, 'নানা, বিপদ কিছু নয় দাদা। বাজারে গিয়ে দেখলাম, চমৎকার কালোজাম এসেছে। রসে একেবারে টইটুম্বুর। তাই আপনার জন্য অল্প কয়েকটা নিয়ে এসেছি।'

কথা শেষ করে হাতে ধরা ব্যাগটা এগিয়ে দিতেই সব মনে পড়ে গেল। বছর খানেক আগে হরিনাথ ঘোষাল এক গরমের দুপুরে বোস না মিত্তিরদের বাগানের গাছের টসটসে কালোজাম দেখে লোভ সামলাতে পারেননি। পাঁচিলে উঠে পড়েছিলেন যদি ক'টা পাড়া যায়। কালোজামে হাত বাড়াতেই পা ফসকে পড়েছিলেন পাঁচিল থেকে। পা-ও ভেঙেছিল। এই ধেড়ে বয়েসে অন্যের বাগান থেকে কালোজাম চুরি করতে গিয়ে পা ভাঙা খুবই লজ্জার ঘটনা। হরিনাথ ঘোষাল ঘটনা লুকোতে চেষ্টা করেন। নিজের বাড়ির উঠোনে পা পিছলে পড়েছেন বলে পাড়ায় গল্প চাউর করেন। কিন্তু ছোট ছেলেরা সব খবর রাখে। তারা সত্যি ঘটনা পাড়ায় ছড়িয়ে দিল। হরিনাথ ঘোষালের নাম হল 'কালোজাম ঘোষাল'। এই গল্প সবার জানা।

শোভনবাবুও শুনেছিলেন, ভুলে গিয়েছিলেন এই যা। শুধু মনে পড়েছিল, কালোজামের সঙ্গে মানুষটার কী যেন একটা সম্পর্ক রয়েছে না? আর সেটা জানতে অন্যমনস্ক হয়ে তিনি খোদ হরিনাথ ঘোষালের বাড়িতেই চলে এসেছেন। যাকে বলে একেবারে বাঘের গুহায়। হরিনাথ ঘোষাল এমনিতেই বদমেজাজি, হাতে কালোজামের ব্যাগ পেয়ে মেজাজ সপ্তমে চড়ল। মনে হয়, ভাঙা পায়ের ব্যথা ফিরে এল।

ভালো মানুষ বলে সবাই শোভনবাবুর ভুলকে ক্ষমা করে দেয়। হরিনাথ ঘোষাল ক্ষমা করতে পারলেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল, রাস্তা দিয়ে ছুটছেন শোভন নস্কর। তাঁর ধুতির কেঁচা ধুলোয় লুটোচ্ছে। পিছনে ছুটেছেন হরিনাথ। মাথার ওপর কালোজাম ভর্তি ব্যাগ ঘোরাচ্ছেন গদার মতো। কালোজাম ব্যাগ থেকে বেরিয়ে রাস্তার চারপাশে ছিটকে ছিটকে পড়ছে। লোকজন ক্যাচ ধরবার মতো করে একটা করে লুফছে আর টপাটপ মুখে পড়ছে।

তবে ছোটবেলার সেই অঙ্ক পরীক্ষার মতো এই বড়বেলাতেও শোভন নস্কর অন্যমস্কতার জন্য মাঝেমধ্যে বাড়তি নম্বরের মতো প্রশংসা পেয়ে যান। গত পরশুর ঘটনাটাই তো সেরকম।

পরশু পাড়ার ক্লাবের প্রেসিডেন্ট নকুলবাবুর ষাট বছরের জন্মদিন ছিল। সন্ধেবেলা নেমন্তন্ন। নেমন্তন্নর কথা মনে ছিল শোভনবাবুর, কিন্তু কেন নেমন্তন্ন সেটা গিয়েছিলেন ভুলে। ক্লাবের কাউকে যে জিগ্যেস করবেন সে উপায় নেই। খুব একচোট হাসাহাসি হবে। সন্ধেবেলা সেজেগুজে রওনা হলেন শোভনবাবু। মনটা খুঁতখুঁত করছে, কোনও উপহার নেওয়া হল না। কেন নেমন্তন্ন না জানলে উপহার নেবেন কী করে? কার জন্যই বা নেবেন? কিছুটা পথ যাওয়ার পর মাথায় বিদ্যুতের ঝলক দিল! মুচকি হাসলেন শোভনবাবু। খুশি মনে উপহার কিনে পৌঁছে গেলেন নকুলবাবুর বাড়ি। কিন্তু উপহার দেখে যে সবাই থ'। ষাট বছরের জন্মদিনের জন্য একটা বড়সড় পুতুল এনেছেন! সবাই হেসে কুটোপাটি খেতে লাগল। এ কী কাণ্ড করছেন 'ভুলনবাবু'! ক্লাবের প্রেসিডেন্টের বয়সটাই ভুলে মেরেছেন? একেবারে আট-নয়তে নামিয়ে দিয়েছেন!

শোভন নস্কর আমতা আমতা করে বললেন, 'আমি ভেবেছিলাম, নকুলবাবুর নাতনির জন্মদিন...ইস, কী ভুল যে করলাম!'

একথা শুনে নকুলবাবুর ফুটফুটে ছোট্ট নাতনি লাফিয়ে উঠল। হাততালি দিয়ে বলল, 'কী মজা, কী মজা! দাদুর বার্থ ডে-তে আমার গিফট এসেছে। হুরে! কী মজা!'

নকুলবাবুও নাতনির খুশিতে খুব খুশি হয়ে শোভনবাবুর পিঠ চাপড়ে বললেন, 'এরকম অন্যমনস্ক মানুষ দু-একজন থাকা ভালো। নইলে এমন চমৎকার ভুলগুলো করবে কে?'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%