সুনির্মল বসু

ঋষি দুর্বাসার ছিল অসাধারণ ক্ষমতা। তাঁহার মুখ হইতে যে কথা বাহির হইত সে কথা কেহ বিফল করিতে পারিত না। তাই ত্রিভুবনের সকলেই তাঁহাকে ভয় করিত।
দুর্বাসা ছিলেন যেমনি ক্রোধী আবার তেমনি ক্ষমাহীন। তাঁহার সম্মুখে সামান্যতম অন্যায় কেহ করিলেও তাহার আর রক্ষা ছিল না।
একদিন দেবরাজ ইন্দ্র হঠাৎ দুর্বাসার সম্মুখে আসিয়া পড়িলেন। তিনি তাঁহার ঐরাবত হাতিতে চড়িয়া যাইতেছিলেন, এমন সময় হঠাৎ দুর্বাসা মুনির সহিত তাঁহার দেখা।
দুর্বাসাকে দেখিয়া ইন্দ্র হাতির উপর হইতেই তাঁহার স্তব করিতে লাগিলেন। স্তবের শেষে দেবরাজ মন্দার ফুলের একগাছা মালা ঋষির হাতে দিতে গেলেন, কিন্তু দৈবক্রমে সেই মালাগাছা ঐরাবতের দন্তে আটকাইয়া গেল এবং সেখান হইতে মাটিতে পড়িয়া গেল।
এই ব্যাপার দেখিয়া দুর্বাসা মুনি ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিলেন। তিনি ভাবিলেন দেবরাজ অত্যন্ত অহংকারী; তাই হাতি হইতে নামিয়া তিনি মালা দিতে পারিলেন না। এই অহংকারের ফল ফলিবেই ফলিবে।
তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে অভিশাপ দিলেন,—‘দেবরাজ তোমার অত্যন্ত দম্ভ হইয়াছে, আজ হইতে তোমার স্বর্গরাজ্য লক্ষ্মীশূন্য হইবে। দেখি তুমি কীরূপে রাজত্ব করো।’
দুর্বাসার বাক্য অব্যর্থ। দেখিতে দেখিতে স্বর্গরাজ্য হইতে লক্ষ্মীদেবী অন্তর্হিতা হইলেন। স্বর্গবাসী দেবতারা হায় হায় করিয়া উঠিলেন, তাঁহারা সমস্ত শক্তি হারাইলেন, কারণ লক্ষ্মীদেবী ছিলেন তাঁহাদের সমস্ত শক্তির মূল।
দেবতারা দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে, এই সুযোগে দৈত্যগণ স্বর্গরাজ্য আক্রমণ করিল। শক্তিহীন দেবতারা প্রাণভয়ে পলাইতে লাগিলেন, কারণ তখনও তাঁহারা অমর হন নাই।
দৈত্যগণ স্বর্গরাজ্য দখল করিল, এবং মনের সুখে সেখানে বাস করিতে লাগিল।
এদিকে স্বর্গচ্যুত দেবতারা সকলে গিয়া ব্রহ্মার শরণাপন্ন হইলেন। ব্রহ্মা উপদেশ দিলেন,—‘তোমরা ভগবান বিষ্ণুর শরণ লও। তিনি ইচ্ছা করিলে সব পারেন। লক্ষ্মীদেবী তাঁহারই অধীন, একমাত্র তিনিই তোমাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করিয়া দিতে পারেন।’
তখন দেবরাজ ইন্দ্র অন্যান্য দেবতাদের লইয়া ক্ষীরোদ সমুদ্রতীরে যেখানে ভগবান বিষ্ণু বিরাজ করিতেছিলেন, সেখানে হাজির হইলেন এবং করজোড়ে তাঁহার স্তব করিতে লাগিলেন।
স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া নারায়ণ কহিলেন,—‘তোমরা অমর না হইলে দৈত্যদের সঙ্গে পারিবে না। স্বর্গরাজ্যও উদ্ধার হইবে না।’ দেবতারা আবার ফিরিয়া আসিলেন ব্রহ্মার কাছে।
ব্রহ্মা কহিলেন,—‘সপ্ত সমুদ্রের তলে সঞ্চিত আছে অমৃত। সেই অমৃত যে পান করিবে, সে অমর হইবে। কিন্তু এই অমৃত উদ্ধার করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। সমস্ত সাগরকে ভালভাবে মন্থন করিলে তবে সেই অমৃত পাওয়া যাইবে।’
এই কথা শুনিয়া দেবতারা হতবুদ্ধি হইয়া গেলেন। ইন্দ্র প্রশ্ন করিলেন,—‘কী উপায়ে ইহা সম্ভব হইতে পারে?’
ব্রহ্মা কহিলেন,—‘একমাত্র উপায় হইতেছে, মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড করিতে হইবে, মন্দার পর্বতকে বেষ্টন করিয়া থাকিবে বাসুকি নাগ। একদিকে দেবতারা এবং আর একদিকে দৈত্যরা তাহাকে ধরিয়া টানিবে আর তাহাতেই উঠিবে অমৃত।’
দেবতারা কহিলেন,—‘তাহা না হয় হইল, কিন্তু এই বিশাল পর্বতকে ধারণ করিবে কে?’
ব্রহ্মা কহিলেন,—‘তোমরা আবার বিষ্ণুর শরণাপন্ন হও। তিনি ভিন্ন আর কেহ এই কাজ করিতে পারিবেন না।’
আবার দেবতারা গিয়া বিষ্ণুর শরণ লইলেন এবং তাঁহার স্তব করিতে লাগিলেন।
বিষ্ণু কহিলেন,—‘তোমরা নিশ্চিন্ত হও, আমি কূর্মের আকারে মন্দার পর্বতকে ধারণ করিব।’
অমৃতের আশায় দৈত্যরাও ওই কার্যে সম্মত হইল। বিষ্ণু বিরাটকায় কূর্মের রূপ ধরিয়া মন্দার পর্বতকে পৃষ্ঠে রাখিলেন। বাসুকি নাগ মন্দার পর্বতকে বেষ্টন করিয়া মন্থন-রজ্জুতে পরিণত হইল।
ইহার পর আরম্ভ হইল সেই বিরাট মন্থন-কার্য। এইরূপে কিছুদিন গত হইলে সমুদ্র হইতে উঠিল ভয়ংকর বিষ। এই বিষের ঝাঁঝে সমস্ত দেবতা-দানব মুহ্যমান হইলেন।
তখন দেবাদিদেব মহাদেব দেবতাদের আকুল প্রার্থনায় আসিয়া এই তীব্র বিষ নিজের কণ্ঠে গ্রহণ করিলেন। বিষের তেজে মহাদেবের শুভ্রকণ্ঠ নীল হইয়া গেল। সেই হইতে মহাদেব ‘নীলকণ্ঠ’ বলিয়া সর্বত্র পরিচিত হইলেন।

বহুদিনের চেষ্টার পর অবশেষে একদিন অমৃতকুম্ভ হাতে লইয়া সমুদ্রের ভিতর হইতে স্বর্গচ্যুতা লক্ষ্মী আবির্ভূতা হইলেন।
অমৃত দেখিয়া দেবতা-দানব উভয় পক্ষই আনন্দিত হইলেন। কিন্তু দেবতারা ভয় পাইলেন যদি দৈত্যরা এই অমৃত দখল করিয়া বসে; তাহা হইলে তাহারাই অমর হইবে। দেবগণ দুশ্চিন্তায় পড়িলেন।
তখন ভগবান বিষ্ণু এক মোহিনী নারীর বেশ ধরিলেন। তাহাকে দেখিয়া দৈত্যরা অমৃতের কথা ভুলিয়া গেল—আর সেই সুযোগে দেবতারা অমৃত পান করিয়া অমর হইয়া গেলেন।
ভগবান বিষ্ণু কূর্ম-অবতারে এইভাবে দৈত্যদের সকল শক্তি খর্ব করিয়াছিলেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন