রুরুদানবের সাজা

সুনির্মল বসু

পুরাকালে এক মহাশক্তিশালী দানব বাস করিত, তাহার নাম ছিল রুরু। তাহার শরীরে যেমন শক্তি ছিল, তেমনি ছিল তাহার জেদ। সে একবার যাহা করিবে মনে করিত, কিছুতেই কেহ তাহা হইতে তাহাকে নিরস্ত করিতে পারিত না। ভীষণ একরোখা ও একগুঁয়ে ছিল সে।

একদিন দৈত্য রুরু হিমালয় পর্বতে ভ্রমণ করিতেছে, হঠাৎ দেখিতে পাইল, এক অনুপমা রূপলাবণ্যবতী কন্যাও সেখানে ভ্রমণ করিতেছে। কন্যাটিকে দেখিয়া রুরু চমৎকৃত হইল। এমন সুন্দর চেহারা আর সে কখনও পূর্বে দেখে নাই। দৈত্যকুলে তো দেখেই নাই, দেবতাদের মধ্যেও এমন রূপ অতি বিরল।

অবাক হইয়া ভাবিতে ভাবিতে রুরু ঘরে ফিরিল আর মনে মনে স্থির করিল, যেভাবেই হউক, এই কন্যাটিকে সে বিবাহ করিবেই। এমন রূপবতীকে ঘরে না আনিতে পারিলে তাহার জীবনই বৃথা।

রুরু প্রথমে এই কন্যাটির পরিচয় জানিত না, পরে খোঁজ করিতে করিতে জানিল, মেয়েটি আর কেহ নহেন, স্বয়ং হিমালয়ের কন্যা পার্বতী। সে আরও জানিল, মহাদেবের সহিত তাঁহার পূর্বেই বিবাহ হইয়া গিয়াছে।

পরিচয় জানিয়াও রুরু কিন্তু দমিল না, তাহার জেদ বাড়িয়া গেল— এই পার্বতীকেই সে বিবাহ করিবে।

পার্বতী হইতেছেন শিবের স্ত্রী, তাঁহাকে লাভ করা তো আর সহজ কথা নহে! গায়ের জোরে তাঁহাকে পাওয়া যাইবে না বুঝিয়া রুরু আরম্ভ করিল ভীষণ তপস্যা— ব্রহ্মার তপস্যা। ব্রহ্মাই তাহাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করিতে পারেন।

অতি নির্জন ও দুর্গম স্থানে আসন পাতিয়া রুরু দারুণ কঠোর তপস্যা করিতে লাগিল। স্নান নাই, আহার নাই, নিদ্রা নাই, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, তুচ্ছ করিয়া দিবারাত্র সে পিতামহ ব্রহ্মার তপস্যা করিয়া চলিয়াছে। তাহার তপস্যা দেখিয়া দেবতারাও ভয় পাইয়া গেলেন— এমন তপস্যা তাঁহারা কোনওদিন দেখেন নাই।

এইরূপ করিয়া কাটিয়া গেল অযুত বৎসর। ব্রহ্মাও আর স্থির থাকিতে না পারিয়া রুরুর কাছে আসিয়া প্রশ্ন করিলেন,—‘বৎস, তুমি আমার নিকট কী বর চাও? আমি তোমার তপস্যায় তুষ্ট হইয়াছি।’

রুরু কহিল,—‘আমি পার্বতীকে পত্নীরূপে চাই এবং শিব ও অন্যান্য দেবতাগণও যেন আমার উপর প্রসন্ন থাকেন। পার্বতীর অসামান্য রূপে আমি মুগ্ধ। তাই আমার এই তপস্যা। আমাকে এই বর দিন— যেন তাঁহাকে পাই।’

ব্রহ্মা কহিলেন—‘অসম্ভব বর চাহিতেছ! পার্বতী জগতের জননী, তোমারও জননী। এ বর দেওয়া যায় না, তুমি অন্য কোনও বর চাও।’

রুরু কিন্তু দমিল না, সে অন্য কোনও বর চাহিল না। তাহার তো কিছুরই অভাব নাই। পার্বতীকে রানি করিতে পারিলে তবে তাহার সাধ পূর্ণ হয়।

ব্রহ্মাকে সে বারংবার এক কথাই বলিতে লাগিল এবং বর দেওয়ার জন্য বারংবার অনুরোধ করিতে লাগিল। তাহাতে ব্রহ্মা অসন্তুষ্ট হইয়া বর না দিয়াই চলিয়া গেলেন।

রুরু কিন্তু ছাড়িল না, সে আবার তপস্যা শুরু করিয়া দিল। এবার সে আরও কঠিন তপস্যা করিতে লাগিল। তাহার তপস্যার তেজে স্বর্গে-মর্ত্যে আগুন জ্বলিয়া উঠিল।

মহাদেব এতদিন কিছু বলেন নাই— এবারে আর সহ্য করিতে না পারিয়া পার্বতীকে সব কথা খুলিয়া বলিলেন।

মহাদেবের নিকট সকল কথা শুনিয়া পার্বতী তো রাগিয়া আগুন! বলিলেন—‘বটে, রুরুর এতদূর স্পর্ধা? আচ্ছা, তাহার সাধ মিটাইতেছি! সে জানে না কাহার সহিত লাগিতে যাইতেছে।’

এই বলিয়া পার্বতী একটা খড়্গ লইয়া রুরুর উদ্দেশে ছুটিলেন। পথে একটা সিংহ একটা হাতির সঙ্গে যুদ্ধ করিতেছিল। পার্বতী তখন সেই সিংহটাকে হত্যা করিয়া তাহার চামড়াটা নিজের কোমরে জড়াইলেন, আর তাহার রক্ত লইয়া নিজের মাথায়, চুলে ও সর্বাঙ্গে মাখাইলেন। তখন তাঁহার চেহারাও হইল দানবীর মতো ভয়ংকর।

যে গুহার ভিতরে রুরু তপস্যা করিতেছিল, পার্বতী সেখানে গিয়া পদাঘাতে গুহার দরজাটা ভাঙিয়া হুংকার করিয়া রুরুকে কহিলেন,—‘তুই যাহার জন্য এতদিন তপস্যা করিতেছিস আমিই সেই পার্বতী। সাহস থাকে তো অগ্রসর হ’। দেখি তোর তেজ কত।’

পার্বতীর হুংকারে রুরুর ধ্যান ভাঙিয়া গেল। সম্মুখে এক বিরাট মূর্তি দেখিয়া সে শুধু চমকাইয়াই উঠিল না, ভয়ও পাইল। কিন্তু মনের ভয় বাহিরে প্রকাশ না করিয়া চিৎকার করিয়া কহিল,—‘কেরে তুই, আমাকে ভয় দেখাইতে আসিয়াছিস? জানিস-আমি ‘রুরুদানব’? ভাল চাহিস তো এখান হইতে সরিয়া যা। আমার তপস্যায় বাধা দিস না— না হইলে তোকে এখনই বধ করিব।’

রুরুর কথা শুনিয়া পার্বতী তো হাসিয়াই বাঁচেন না। হাসিতে হাসিতেই কহিলেন,—‘রুরুর দেখিতেছি গুরুতর তেজ! এইবার এই তেজের শেষ হইবে। আসন ছাড়িয়া আয়!’

রুরু ভীষণ চটিয়া উঠিল। কী এই সামান্য রমণীর এত বড় স্পর্ধা— রুরুকে ভয় দেখাইতে আসা! দাঁড়াও দেখাইতেছি মজা!

রুরু দারুণ ক্রুদ্ধ হইয়া আসন হইতে উঠিয়া আসিল এবং পার্বতীকে আক্রমণ করিল।

পার্বতী কিন্তু সরিলেন না, নড়িলেন না। দানবের সহিত তাঁহার ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইল।

কিন্তু রুরুও বড় কম জানে না, সেও পার্বতীকে নানাভাবে আঘাত করিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু যিনি জগৎজননী, তাঁহার সহিত সে আর কতক্ষণ পারিবে?

পার্বতী কিছুক্ষণ পর খড়্গ দিয়া রুরুকে খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া আবার হাসিতে হাসিতে শিবের কাছে ফিরিয়া গেলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%