সুনির্মল বসু

বহুকাল পূর্বে দেবর্ষি নারদ একদিন নানা রাগ-রাগিণীযুক্ত গান করিতেছিলেন। নারদের মনে অত্যন্ত অহংকার ছিল, তাঁহার মতো গান নাকি কেহই গাহিতে পারে না।
অহংকার করিলেই পতন হয়, তাই বোধহয় দেবর্ষি নারদের কণ্ঠে সেই রাগ-রাগিণীর তালভঙ্গ হইতে লাগিল। কিন্তু নারদ কিছুই ধরিতে পারিলেন না, তিনি ভাবিলেন বুঝি গান ঠিকই হইতেছে।
এদিকে সে রাগ-রাগিণীরা এক ফন্দি আঁটিল। নারদের গর্ব খর্ব করিতে হইবে। এই স্থির করিয়া তাহারা বিকলাঙ্গ নরনারীর রূপ ধরিয়া পথের ধারে পড়িয়া রহিল।
গানের শেষে যখন দেবর্ষি পথ দিয়া যাইতেছেন, তখন দেখিলেন পথে কতকগুলি বিকলাঙ্গ নর-নারী পড়িয়া রহিয়াছে। তাহাদের দেখিয়া নারদ অবাক হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—‘তোমাদের এমন দুর্দশা কেন? কে এই অবস্থা করিল?’
তাহারা কহিল,—‘নারদ নামে একটি লোক আছেন, তাঁহার ধারণা, তাঁহার মতো সংগীতজ্ঞ বুঝি আর কেহ নাই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সংগীত সম্বন্ধে তাঁহার কোনও ধারণাই নাই। তিনিই আমাদের এই দুর্দশা করিয়াছেন।’
নারদ কহিলেন,—‘তোমরা কাহারা?’
তাহারা কহিল,—‘আমরা রাগ-রাগিণী, নারদ মুনি আমাদের লইয়া ভুল আলাপ করাতে এই শোচনীয় দশা হইয়াছে।’
এই কথা শুনিয়া নারদের অহংকার চূর্ণ হইল। দুঃখিত হইয়া কহিলেন,—‘তোমাদের এই দুর্দশায় আমি অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি। কী করিলে তোমরা পূর্বের রূপ ফিরিয়া পাও আমাকে জানাও, আমি তাহাই করিব। আমার ধারণা ছিল, আমি বিশুদ্ধ রাগ-রাগিণীতে গান করি। আজ আমার ভুল ভাঙিল। এখন বলো কী করিতে হইবে?’
বিকৃত রাগ-রাগিণীরা তখন কহিল,—‘মহাদেব যদি নিজে গান করেন তবেই আমাদের পূর্বের অবস্থা ফিরিয়া পাইব।’
নারদ তখন চলিলেন দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে। মহাদেব নারদের মুখে সমস্ত কাহিনি শুনিয়া কহিলেন,—‘আচ্ছা, আমি গান গাহিতে পারি, তবে তাহার জন্য উপযুক্ত শ্রোতা চাই। উপযুক্ত শ্রোতা না পাইলে আমি কিছুতেই গাহিব না। যদি আমাকে দিয়া গান গাওয়াইতে চাও, তবে শীঘ্র একজন সুযোগ্য শ্রোতার সন্ধান করো।’
নারদ লজ্জায় সংকুচিত হইলেন। তিনি বুঝিলেন, তিনি শুধু গায়ক হিসাবেই অযোগ্য নহেন, গানের শ্রোতা হইবার যোগ্যতাও তাঁহার নাই।
নারদ মহাদেবকে কহিলেন, ‘হে দেব! স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল— এই ত্রিভুবনে আপনার গানের প্রকৃত শ্রোতা কে কে আছেন— বলুন, আমি তাঁহাদের এইখানে লইয়া আসি।’
মহাদেব কহিলেন,—‘আমার গানের প্রকৃত শ্রোতা তো খুঁজিয়া পাইতেছি না। তুমি এক কাজ করো, ব্রহ্মা আর বিষ্ণুকে যদি লইয়া আসিতে পারো, তাহা হইলে আমার কাজ চলিতে পারে। তুমি তাঁহাদেরই লইয়া আসো। তাঁহারা না আসিলে আমি কিন্তু গাহিব না।’
ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর কাছে নারদ গিয়া সকল কথা নিবেদন করিতেই তাঁহারাও সম্মত হইলেন। তাঁহাদের লইয়া নারদ মহাদেবের নিকটে আসিলেন।
উপযুক্ত শ্রোতা পাইয়া দেবাদিদেব মহাদেব গান আরম্ভ করিলেন, আর কিছুক্ষণ পরেই সেই বিকলাঙ্গ নর-নারীরূপী রাগ-রাগিণীরা তাহাদের পূর্ব অবস্থা ফিরিয়া পাইয়া সকলে সেই গানের আসরে হাজির হইল।

মহাদেব তখনও গান গাহিয়া চলিয়াছেন, কিন্তু ব্রহ্মা সে গানের কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। বিষ্ণু কেবল কিছু কিছু বুঝিতে পারিলেন।
তন্ময় হইয়া শুনিতে শুনিতে হঠাৎ বিষ্ণু গলিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার শরীর হইতে অবিরল ধারায় জল ঝরিতে লাগিল।
তাহা দেখিয়া ব্রহ্মা তাড়াতাড়ি সেই ঝরা জল আপন কমণ্ডলুতে গ্রহণ করিতে লাগিলেন। সেই জলই ‘গঙ্গাজল’ বলিয়া পরিচিত হইল। গঙ্গার আর একটি নাম হইয়াছে ‘বিষ্ণুপদা-গঙ্গা’।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন