রাজা নৃগের কাহিনি

সুনির্মল বসু

যদুবংশের ছেলেরা বনে বনে খেলা করিয়া বেড়ায়; আনন্দেই তাহাদের দিন কাটে।

একদিন খেলিতে খেলিতে তাহারা সবাই বড় ক্লান্ত বোধ করিল এবং ভীষণ তৃষ্ণায় তাহারা অস্থির হইয়া পড়িল— তাই তাহাদের কয়েকজন চলিল জলের সন্ধানে।

জলের অন্বেষণ করিতে করিতে তাহারা অনেক দূরে গিয়া দেখিল, এক স্থানে একটি বড় কূপ রহিয়াছে। জলের কূপ দেখিয়া তাহারা তো আনন্দে মাতিয়া উঠিল, তাড়াতাড়ি ছুটিয়া গেল কূপটির নিকট।

কূপটির নিকটে গিয়াই তাহারা তো স্তম্ভিত হইয়া গেল। তাহারা অবাক হইয়া দেখিল— বিরাট চেহারার এক কৃকলাস সেই কূপের মধ্যে পড়িয়া রহিয়াছে।

তাহাদের আর জল পান করা হইল না, ছুটিয়া গিয়া অন্যান্য সঙ্গীদের কাছে এই খবর দিল। তাহারাও কৃকলাসটিকে দেখিবার জন্য দৌড়াইয়া আসিল। এত বড় কৃকলাস তাহারা আর কখনও দেখে নাই।

কৌতূহলবশত ছেলের দল দড়িতে ফাঁস লাগাইয়া ওই বড় কৃকলাসটিকে তুলিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু তাহা এত ভারী যে নাড়াইতে পারিল না।

ছেলের দল তখনই ছুটিল শ্রীকৃষ্ণের কাছে এবং তিনিও ছেলেদের কথা শুনিয়া তৎক্ষণাৎ কূপের নিকট আসিয়া হাত দিয়া টানিয়া কৃকলাসটিকে উপরে তুলিলেন।

এ-কী, কোথায় গেল সেই কৃকলাস! ছেলেদের দল বিস্ময়ে তাকাইয়া দেখিল, শ্রীকৃষ্ণের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে একজন সুন্দর রূপবান পুরুষ, তপ্ত স্বর্ণের মতো তাঁহার গায়ের বর্ণ, আর পরিধানে অতি উজ্জ্বল মূল্যবান পোশাক— যেন কোনও সাক্ষাৎ দেবতা!

বালকদের তো আর কৌতূহলের শেষ নাই, উৎকট বিশ্রী কৃকলাস কীরূপে মুহূর্তের ভিতর এই রূপবান দেবমূর্তিতে পরিণত হইল, তাহারা কিছুই বুঝিতে পারিতেছে না। অবাক হইয়া সকলে সেইদিকে তাকাইয়া আছে।

বালকদের কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাঁহাকে প্রশ্ন করিলেন,—‘মহাশয়, আপনি কে? কোন কর্মের ফলে আপনার এই দশা হইয়াছিল? যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে বলুন।’

শ্রীকৃষ্ণকে নমস্কার করিয়া দেবমূর্তিটি কহিলেন,—‘প্রভু, আপনার নিকটে কোনও কথা বলিতে আমার আপত্তি নাই; আমি ইক্ষ্বাকুবংশের রাজা— নাম নৃগ। আপনি আমার নাম নিশ্চয়ই জানেন। আপনারই আদেশক্রমে আমার কথা আপনাকে বলিতেছি। আমি অসংখ্য দান করিয়াছি। লোককে কত যে গাভী, হাতি, অশ্ব, সোনা-দানা ইত্যাদি দান করিয়াছি তাহার আর সীমা-সংখ্যা নাই। দানই ছিল আমার প্রধান ব্রত। যজ্ঞও যথেষ্ট করিয়াছি, পুণ্যকাজ যে কত করিয়াছি তাহার তুলনা হয় না।

‘একদিন আমার গাভীর পালে এক ব্রাহ্মণের গাভী আসিয়া কখন যে মিশিয়া গিয়াছে কেহই তাহা জানিতে পারে নাই। সেই গাভীগুলি ব্রাহ্মণদের দান করিবার সময়ে অজানিতে ব্রাহ্মণের সেই গাভীটিকেও দান করিয়া ফেলি। যে ব্রাহ্মণ গাভী নিয়া যাইতেছিলেন, গাভীর মালিক সেই বিপ্র নিজের গাভীটিকে চিনিতে পারিয়া কহিলেন,—‘এ গাভী আমার, তুমি ঠাকুর, কেন লইয়া যাইতেছ?’

কিন্তু ব্রাহ্মণটি কহিল,—‘এ গাভী কেমন করিয়া তোমার হইবে? স্বয়ং রাজা ইহা আমাকে দান করিয়াছেন।’

বিপ্র কহিল,—‘আমার গাভী রাজা তোমাকে দিবেন কী করিয়া? কখনও তিনি দিতে পারেন না। আচ্ছা, চলো রাজার কাছে যাই।’

‘দুই ব্রাহ্মণ গাভী লইয়া আমার নিকট উপস্থিত। তাঁহাদের মুখে সমস্ত কথা শুনিয়া আমি মহাচিন্তায় পড়িলাম। ভুল স্বীকার করিয়া ওই একটি গাভীর পরিবর্তে উৎকৃষ্ট এক লক্ষ গাভী দুই ব্রাহ্মণকেই দিতে চাহিলাম; কিন্তু গাভীর মালিক তাহাতে রাজি হইলেন না। যে ব্রাহ্মণকে গাভী দান করিয়াছিলাম, তিনিও আমার কথায় সম্মত হইলেন না, তিনিও গাভীটি ছাড়িতে চাহিলেন না। আমি তাঁহাদের অনেক অনুনয় বিনয় করিলাম; এমনকী তাঁহাদের চরণ ধরিয়া ক্ষমাভিক্ষা পর্যন্ত করিলাম; কিন্তু সবই নিষ্ফল হইল। পরের দ্রব্য অপহরণ না করিয়াও হইলাম তস্কর।’

‘মনটা অস্থির হইয়া উঠিল, সমস্যার কোনওই সমাধান করিতে পারিলাম না। এমন সময় দেখি, যমদূত আমার সম্মুখে দাঁড়াইয়া। বুঝিলাম, আমার মৃত্যু উপস্থিত।’

যমদূত আমাকে যমালয়ে লইয়া গেলে যমরাজ কহিলেন,—‘মহারাজ, আপনার পুণ্যের শেষ নাই, সেইজন্য আপনার শুভও হইবে অসীম। কিন্তু আপনার মৃত্যুকালে আপনার অজ্ঞাতসারে এই গাভীর ব্যাপারে কিছু প্রমাদ করিয়াছেন। এই কারণে আপনার কিছু পাপও হইয়াছে— ইহারও ফল ভোগ করিতে হইবে। এখন বলুন আগে পুণ্য ভোগ করিবেন, না আগে পাপ ভোগ করিবেন?’

‘আমি আগে পাপ ভোগ করিতে চাহিলাম, কারণ আগের পাপের ফলে দুঃখ ভোগ করিয়া পরে পুণ্যের ফলে সুখ ভোগ করিবার ইচ্ছা হইল।’

আমার কথা শুনিয়া যমরাজ কহিলেন,—‘তবে আপনার পতন হউক। কৃকলাস হইয়া আপনি একটি কূপে পড়িয়া থাকুন। শ্রীকৃষ্ণ আসিয়া আপনাকে মুক্ত করিবেন।’

তৎক্ষণাৎ আমি একটা বৃহৎ কৃকলাস হইয়া কূপে পতিত হইলাম। ‘হে প্রভু কৃষ্ণ! আজ আমার মুক্তি! আপনার দর্শন ও স্পর্শ পাইবার জন্য এতদিন অত্যন্ত উদগ্রীব ছিলাম। পরম ভাগ্যবশত আজ আপনার সাক্ষাৎ মিলিল। আজ আমার জীবন ধন্য হইয়া পাপের শেষ হইল।’

এই কহিয়া রাজা নৃগ শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম করিয়া দিব্য বিমানে উঠিয়া পুণ্যের ফলভোগ করিতে স্বর্গে চলিয়া গেলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%