মধু-কৈটভ বধ

সুনির্মল বসু

পুরাকালে সুরথ নামে এক বিখ্যাত রাজা সমস্ত পৃথিবীকে শাসন করিতেন। তিনি যেমন ছিলেন ধার্মিক তেমন ন্যায়পরায়ণ, আবার তেমনি ছিলেন উদার ও কোমল। তাঁহার এই উদারতা ও কোমলতার সুযোগ লইয়া চারিদিক হইতে যবনেরা মাথা তুলিয়া উঠিল। তাহারা করিল কী, ক্রমে ক্রমে সুরথ রাজার এই বিশাল সাম্রাজ্য গ্রাস করিতে লাগিল এবং অবশেষে তাহারা সংঘবদ্ধ হইয়া সুরথের রাজধানী আক্রমণ করিল।

এই বিপদের সময় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবেরা সুরথ রাজাকে পরিত্যাগ করিয়া যে যেদিকে পারিল পলায়ন করিল।

রাজা আর কী করেন-অগত্যা রাজ্য, রাজপ্রাসাদ, স্ত্রী-পুত্র প্রভৃতি সকলকে ত্যাগ করিয়া একাকী নিবিড় অরণ্যে প্রবেশ করিলেন।

ভীষণ জঙ্গল, তাহারই এক বৃক্ষের তলায় সুরথ রাজা আশ্রয় গ্রহণ করিলেন এবং সেইখানেই তাঁহার দিন কাটিতে লাগিল।

বনের ফলমূল আর ঝর্ণার জল খাইয়া কোনওরকমে তিনি জীবনধারণ করেন। তাঁহার মনে শান্তি নাই, সুখ নাই; রাতদিন কেবল এই দুশ্চিন্তা— তাঁহার আত্মীয়স্বজনেরা হয়তো শত্রুদের হাতে নির্যাতিত হইতেছে, হয়তো উপবাসে তাহাদের দিন কাটিতেছে ইত্যাদি।

দুর্ভাবনায় উন্মাদের মতো রাজা সুরথ বনে বনে ঘুরিয়া বেড়ান। হঠাৎ একদিন দেখিতে পাইলেন, তাঁহারই ন্যায় নিঃসঙ্গ এক ব্যক্তি বিষণ্ণমুখে একটি গাছতলায় বসিয়া আছে।

রাজা সুরথ তাহার নিকট গিয়া বিনীতভাবে প্রশ্ন করিলেন,—‘কে ভাই তুমি? এই জনহীন অরণ্যে একাকী বসিয়া কী ভাবিতেছ?’

সুরথ রাজার প্রশ্নে লোকটি হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। কাঁদিতে কাঁদিতে কহিল,—‘আমার দুঃখের কাহিনি আর কহিবার নহে। আমার নাম সমাধি বৈশ্য। একসময়ে আমার মতো ধনী বণিক আর কেহ ছিল না। এই ধনই আমার সর্বনাশ করিয়াছে। আমি অত্যন্ত দান করিতাম বলিয়া আমার স্ত্রী-পুত্র ষড়যন্ত্র করিয়া আমাকে হত্যা করিতে চায়। তাহাদের ইচ্ছা আমার সমস্ত ধনসম্পত্তি তাহারাই ভোগ করিবে। প্রাণের ভয়ে আমি এই অরণ্যে পালাইয়া আসিয়াছি অথচ এখানে আসিয়া তাহাদের কথাই চিন্তা করিতেছি।’

বৈশ্যের কথা শুনিয়া রাজা সুরথ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন,—‘আমাদের উভয়ের ভাগ্যই একরকম, তাই বোধহয়, বিধাতা এই নিবিড় অরণ্যে আমাদের মিলন ঘটাইয়াছেন।’

এইভাবে সেই জনহীন অরণ্যে রাজ্যহারা সুরথ আর সর্বস্বহারা সমাধি বৈশ্যর নিবিড় বন্ধুত্ব গড়িয়া উঠিল।

একদিন দুই বন্ধু ঘুরিতে ঘুরিতে সম্মুখে দেখিতে পাইলেন ঋষির আশ্রম। এই ঋষির নাম মেধা। দুই বন্ধু গিয়া ঋষির চরণে লুটাইয়া পড়িলেন এবং আশ্রয় প্রার্থনা করিলেন। এভাবে আর নিরাশ্রয় হইয়া ঘুরিয়া বেড়ানো যায় না।

তাঁহাদের মুখে সকল কথা শুনিয়া মেধা ঋষি তাঁহাদের আশ্রয় দিলেন।

তখন রাজা সুরথ ঋষিকে প্রশ্ন করিলেন,—‘হে মহাজ্ঞানী ঋষি, আমাদের একটি প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিতে হইবে। যে আত্মীয়স্বজন আমাদের সঙ্গে শত্রুতা করিয়াছে, আমরা কেন তাহাদের কথা ভাবিয়া কষ্ট পাইতেছি?’

ঋষি হাসিয়া উত্তর দিলেন,—‘বৎস, ইহারই নাম মায়া। এই মায়া দিয়াই নারায়ণ জগৎ-সংসারকে বাঁধিয়া রাখিয়াছেন। মহাদেবী মহামায়ার ইহা হইল খেলা।’

রাজা সুরথ প্রশ্ন করিলেন,—‘কে এই মহাদেবী মহামায়া?’

মেধা ঋষি কহিলেন,—‘প্রলয়ের কালে সমস্ত সৃষ্টি জলে ধ্বংস হইয়া যায়। প্রলয়ের শেষে আবার নতুন সৃষ্টির কাজ আরম্ভ হয়। এইরকম এক প্রলয়ের কালে সমস্ত পৃথিবী যখন জলমগ্ন, তখন ভগবান বিষ্ণু প্রলয়-সলিলে যোগনিদ্রায় অভিভূত থাকেন। সমস্ত ইচ্ছা সংহত করিয়া তিনি যোগনিদ্রায় প্রলয়-সলিলে স্থির হইয়া ভাসিয়া থাকেন। কল্প-কল্পান্ত কাল এইভাবে কাটিয়া যায়। অকস্মাৎ একদিন যোগনিদ্রায় মগ্ন বিষ্ণুর কর্ণ হইতে দুইটি ক্ষুদ্র প্রাণী জন্মগ্রহণ করিল। জন্মিয়াই সেই দুইটি ক্ষুদ্র প্রাণী দৈত্যের মতো বিরাট মূর্তিতে প্রকট হইল। ইহাদের নাম ‘মধু ও কৈটভ’।

মধু ও কৈটভ দেখিল চারিদিকে জল থৈ-থৈ করিতেছে। কোথাও কোনও খাদ্য নাই। সম্মুখে তাহারা দেখিল, বিষ্ণুর নাভিপদ্মের উপর ব্রহ্মা ধ্যানস্থ হইয়া আছেন। মধু ও কৈটভ ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হইয়া ব্রহ্মাকেই গ্রাস করিতে উদ্যত হইল। ব্রহ্মা বিপন্ন হইয়া বিষ্ণুর শরণাপন্ন হইলেন।

বিষ্ণু নয়ন মেলিয়াই দেখিলেন দৈত্য মধু ও কৈটভকে। রোষে তাঁহার নয়ন জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু মধু ও কৈটভ তাহাতে বিন্দুমাত্র দমিল না-কারণ বিষ্ণুর শক্তি লইয়াই তাহাদের জন্ম।

তখন সেই প্রলয়-সলিলেই শুরু হইল তুমুল সংগ্রাম। শত শত বৎসর ধরিয়া এই যুদ্ধ চলিল। তখন মহামায়া মধু আর কৈটভের অন্তরে ভর করিলেন। মহামায়ার মায়ায় মধু আর কৈটভ ভাবিল তাহারাই এই সৃষ্টির নিয়ামক, তাহারাই সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তা।

এই ভাবিয়া দুই দৈত্য বিষ্ণুকে কহিল,—‘হে বিষ্ণু, তোমার শক্তিতে আমরা তুষ্ট হইয়াছি। এখন কী বর চাও বলো।’

নারায়ণ কহিলেন,—‘যদি একান্ত বর দিতে চাও, তাহা হইলে এই বর দাও যেন আমার হাতে তোমাদের মৃত্যু হয়।’

মধু ও কৈটভ চারিধারে অনন্ত জলরাশির দিকে চাহিয়া কহিল,—‘বেশ তাহাই হইবে, তবে আমাদের এমন জায়গায় হত্যা করিবে— যেখানে জল নাই।’

নারায়ণ তখন বিরাট মূর্তি ধারণ করিয়া মধু ও কৈটভকে তাঁহার হাঁটুর উপর ফেলিয়া হত্যা করিলেন।

অনেকের ধারণা যে মধু-কৈটভের মেদ হইতে এই পৃথিবীর সৃষ্টি, তাই পৃথিবীর অপর নাম ‘মেদিনী’।

এইভাবে মধু ও কৈটভের মৃত্যু ঘটিলে অট্টহাসি হাসিয়া উঠিলেন মহামায়া। কারণ তাঁহার লীলাতেই এই দুই দৈত্যের মৃত্যু হইল।

রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য তখন করজোড়ে কহিলেন,—‘হে ঋষি আপনার কথায় এখন বুঝিলাম, দেবী মহামায়ার কৃপা না হইলে দিব্যজ্ঞান লাভ করা যায় না। এখন আমাদের আশীর্বাদ করুন যেন আমরা দেবীর কৃপালাভ করিতে পারি।’

ঋষির আশীর্বাদ লইয়া রাজা সুরথ আর সমাধি বৈশ্য পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মহামায়ার পূজা করিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%