সুনির্মল বসু

বহুকাল পূর্বের কথা। মহাকবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস স্থির করেন— তিনি রচনা করিবেন এক মহাকাব্য— আর সেই কাব্যে তিনি বহু বিচিত্র ঘটনার সমাবেশ করিবেন। ইহা হইবে ভারতীয় সাহিত্যের বৃহত্তম গ্রন্থ।
শোনা যায় ব্যাস ঋষি নাকি অতি ভীষণ-দর্শন ছিলেন। তাঁহার গাত্রের বর্ণ ছিল ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। তাই তাহার নামের পূর্বে এই কৃষ্ণ শব্দটি ব্যবহার হইত।
মহাকবি কাব্য তো লিখিবেন— কিন্তু তাঁহার সহিত কলম ধরিবেন কে? এইরূপ অনুলেখক আর কে আছে?
সহসা তাঁহার মনে পড়িল চতুর্ভুজ গজাননের কথা। গণেশের চারিটি হাত, আর সেই চার হাতেই তিনি লিখিতে পারেন। তিনিই তাঁর এ মহাকাব্যের উপযুক্ত লেখক হইতে পারেন।
ব্যাসঋষি চলিলেন গণেশের সন্ধানে কৈলাসে।
গণেশ তখন কৈলাসে নিদ্রাভিভূত ছিলেন। ব্যাসের সাড়া পাইয়া তাঁহার নিদ্রা ভাঙিয়া গেল, জিজ্ঞাসা করিলেন,—‘কে?’
ব্যাস উত্তর করিলেন,—‘আমি ব্যাস।’
গণেশ তখন তাঁহাকে সাদরে অভ্যর্থনা করিয়া বসিতে দিলেন এবং তাঁহাকে আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন।
ব্যাস তখন অকপটে তাঁহার আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করিলেন।
ব্যাসের কথা শুনিয়া গণেশ তো মনে মনে অসন্তুষ্ট হইলেন। তাঁহার মতো এমন একজন মান্য-গণ্য দেবতাকে কিনা ব্যাসের সামান্য লিপিকার হইতে হইবে? কিন্তু তিনি সে ভাব অন্তরে চাপিয়া ব্যাসকে জব্দ করিবার জন্য কহিলেন,—‘আমি সম্মত আছি, কিন্তু একটা শর্ত আমার চাই।’
ব্যাস প্রসন্ন হইয়াছেন। গণেশ তাঁহার কাব্যের লিপিকার হইবেন, ইহাতে তাঁহার আর আনন্দের শেষ নাই।
তিনি প্রশ্ন করিলেন,—‘কী শর্ত বলুন?’
গণেশ কহিলেন,—‘দেখুন ব্যাসদেব, আমি একটু স্থূলাকার, কাজ করিতে করিতে থামিলে আমার বড় কষ্ট হয়। একবার থামিলে আর লিখিতে পারি না। তাই আপনি আমাকে দিয়া এই কাব্য লিখাইবার সময় কিন্তু একবারও থামিতে পারিবেন না। অনর্গল আপনার বলিয়া যাইতে হইবে।’

গণেশের শর্ত শুনিয়া ব্যাসদেবের মুখ শুকাইয়া গেল। কী সর্বনাশ! এত বড় মহাকাব্য তাঁহার একটানা ভাবে বলিয়া যাইতে হইবে। একটু ভাবিতেও সময় পাওয়া যাইবে না। এ তো অসম্ভব কাজ!
একটু চিন্তা করিয়া তিনি গণেশকে কহিলেন,—‘আচ্ছা, আপনার শর্তে আমি রাজি আছি। কিন্তু আমারও একটা পালটা শর্ত আছে— আপনিও না বুঝিয়া কোনও শ্লোক লিখিতে পারিবেন না।’
যাহা হউক, এমনিভাবেই দেবতা আর মানুষ মিলিয়া পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ‘মহাভারত’ লিখিত হয়।
এইরূপ কিংবদন্তি আছে, মহাকবি ব্যাসের যখন চিন্তা করিবার প্রয়োজন হইত, তখন তিনি এমন কঠিন দুরূহ শ্লোক রচনা করিতেন, যাহার অর্থ গণেশও সহজে বুঝিতে পারিতেন না। কলম থামাইয়া তাঁহারও ইহার অর্থ চিন্তা করিতে হইত। এইসব দুরূহ শ্লোকগুলি ‘ব্যাসকূট’ বলিয়া পরিচিত। অল্প বা অধিক যাহাই হউক মহাভারতের ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। মহাভারতের বহু শ্লোক প্রবাদরূপে সুপ্রচলিত হইয়াছে।
মহাভারত-কাহিনি রচনা করিবার আরও ইতিহাস আছে।
রাজা জন্মেজয়ের সভায় ব্যাসদেব আসিয়াছেন।
রাজা কৌতূহলী হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—‘আচ্ছা মহর্ষি, আপনি বর্তমান থাকিতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বন্ধ হয় নাই কেন? আপনি তো কুরু-পাণ্ডবকে এই যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত করিতে পারিতেন।’
মহর্ষি ব্যাস হাসিয়া কহিলেন—‘মহারাজ জন্মেজয়, আগামীকল্য প্রভাতে আপনার প্রাসাদের দ্বারে একটি রথ আগমন করিবে— আপনি সে-রথে আরোহণ করিবেন না। যদিও বা আরোহণ করেন, কদাচ মৃগয়ায় যাইবেন না। যদিও মৃগয়ায় যান, তবে অরণ্য অভ্যন্তরে কোনও রাজপুরীতে উঠিবেন না। যদিও বা কোনও রাজপুরীতে উঠেন, তবে কোনও সুন্দরী কন্যার দিকে দৃষ্টি দিবেন না। আর যদিও বা দৃষ্টিপাত করেন, তবে তাহাকে বিবাহ করিবেন না। বিবাহ করিলেও তাহাকে আর রাজবাটীতে আনিবেন না। আর যদি একান্তই আনেন, তাহাকে পাটরানির মর্যাদা দিয়া রাজসভায় আনিবেন না।’
এই কথা কহিয়া ব্যাসঋষি বিদায় গ্রহণ করিলেন। রাজা জন্মেজয় ব্যাসদেবের মুখে তাঁহার প্রশ্নের কোনও উত্তর না পাইয়া তাঁহার উক্ত এইসকল কথা সম্বন্ধে চিন্তা করিতে লাগিলেন।
ব্যাসদেবের কথা ফলিয়া গেল। পরদিন প্রভাতে সুন্দর একখানি রথ প্রাসাদে উপস্থিত হইল। কিন্তু জন্মেজয় তাঁহার নিষেধ-বাণী ভুলিয়া, সেই রথে চড়িয়া মৃগয়ায় গেলেন এবং অরণ্য-প্রাসাদের রাজকন্যাকে বিবাহ করিয়া পাটরানি করিয়া ঘরে আনিলেন।
কিছুকাল গত হইল একদিন মহর্ষি ঋষ্যশৃঙ্গ রাজসভায় উপস্থিত হইলেন। ঋষ্যশৃঙ্গের আকৃতিটি ছিল বড় কদাকার। শোনা যায়, মাথায় তাঁহার হরিণের মতো শৃঙ্গ ছিল। তাঁহাকে দেখিয়া রাজার এই নূতন মহিষী বিদ্রুপের হাসি হাসিলেন। কিন্তু ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি ছিলেন অত্যন্ত সরল। রানির হাসি দেখিয়া তিনি ভাবিলেন, রানি বুঝি হাসি দিয়াই তাঁহাকে অভ্যর্থনা করিলেন। তাই তিনিও রানির হাসির উত্তর হাসি দিয়াই দিলেন। তিনিও রানির দিকে চাহিলেন হাসিমুখেই। ইহাতে রাজা জন্মেজয় মুনির উপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে বিতাড়িত করিতে অনুচরবর্গকে আদেশ দিলেন। ইহাতে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি ক্ষিপ্ত হইয়া রাজাকে অভিশাপ দিলেন। রাজা মুনির শাপে ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া পড়িলেন।
ব্যাধিগ্রস্ত হইয়া রাজা জন্মেজয় আবার ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিরই শরণ লইলেন। মুনি কহিলেন,—‘মহাভারত শ্রবণ করিলে আপনার রোগমুক্তি হইবে।’
রাজা জন্মেজয় তখন ব্যাসের কাছে আসিয়া সমস্ত কথা নিবেদন করিলেন। ব্যাস কহিলেন,—‘আপনার প্রশ্নের উত্তর পাইয়াছেন রাজা? আমার সামান্য নিষেধ-বাণীই আপনি মানিতে পারিলেন না, আর রাজনীতির সেই বিরাট আবর্তে আমাদের কথায় ‘কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ’ বন্ধ করা কি সম্ভব?’
যাহা হউক, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস মহারাজ জন্মেজয়কে মহাভারতের কাহিনি বলিতে লাগিলেন!
আর একটি কাহিনি আছে। ইহা বহুকাল পূর্বের কথা। কী করিয়া যে এই অষ্টাদশ-পর্ব মহাভারত লিখিত হইয়াছিল এবং প্রকৃতপক্ষে মহর্ষি ব্যাসই এই মহাকাব্য একাকী রচনা করিয়াছিলেন কি না এ সম্বন্ধেও ঠিক বলা যায় না। এ বিষয়ে ঋষি জৈমিনীর নামও শোনা যায়।
ইহার বহুকাল পরে বাংলা ভাষায় মহাভারত রচিত হইয়াছে। কৃত্তিবাসের রামায়ণ লিখিত হইয়াছিল চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, কিন্তু বাংলা ভাষায় প্রথম মহাভারত ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধের পূর্বে হয় নাই।
বাংলাদেশে প্রথম মহাভারত রচনার কাহিনিটি এইরূপ— বাংলার পূর্বপ্রান্তে চট্টগ্রাম। ইহার একদিকে দিগন্ত বিস্তৃত ঊর্মিউচ্ছল নীলসিন্ধু জল, অপরদিকে গগনচুম্বী কৃষ্ণ পর্বতরাজি।
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে হোসেন শাহ বাংলার সিংহাসনে বসিলেন। চট্টগ্রাম অধিকার করিয়া তাহার শাসনকর্তা হইয়া আসিলেন হোসেন শাহর প্রিয়পাত্র পরাগল খাঁ। খাঁ সাহেব অত্যন্ত রাশভারী ও রুক্ষ মেজাজের লোক ছিলেন।
তিনি ছিলেন যুদ্ধপ্রিয়। কিন্তু চট্টগ্রামে তাঁহার আর মন বসিতেছে না। এখানকার জলীয় বাতাস আর শান্ত প্রকৃতির জনসাধারণ তাঁহাকে যেন একেবারে কর্মহীন পঙ্গু করিয়া ফেলিতেছে। এখানে নাই কোনও উত্তেজনা, নাই কোনও রোমাঞ্চ, নাই কোনও রণোন্মাদনা।
রাজকবি ছিলেন পরমেশ্বর দাস। তিনি একদিন রাজসভায় গিয়া দেখেন পরাগল খাঁ বিরস মুখে বসিয়া আছেন।
রাজকবি কহিলেন,—‘মহারাজ, গল্প বলি শুনুন। মন-মেজাজ আপনার ভাল হইবে।’
পরাগল খাঁ উত্তর দিলেন,—‘তোমাদের ওই করুণ কাহিনি আমি শুনিতে চাহি না, আমার গরম রক্তে তোমাদের ওই ঠান্ডা গল্প সহ্য হয় না। যদি তোমার কোনও নূতন কাহিনি থাকে বলিতে পারো।’
রাজকবি কহিলেন,—‘না না এ নূতন কাহিনিই বটে, আপনার মনের মতো হইবে। আপনি একটু ধৈর্য ধরিয়া শুনুন। ভাল না লাগিলে গল্প বন্ধ করিয়া দিব।’
পরাগল খাঁ কী আর করেন, অগত্যা রাজকবিকে কহিলেন, ‘আচ্ছা যখন ছাড়িবেই না, তখন শুরু করো।’
রাজকবি পরমেশ্বর দাস তখন খুশি হইয়া আরম্ভ করিলেন ‘পাণ্ডব-বিজয়’ কাহিনি।
কাহিনি শুনিতে শুনিতে পরাগল খাঁ উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন এবং শেষে হুকুম দিলেন—
‘এই সব কথা কহ সংক্ষেপ করিয়া।
দিনেকে শুনিতে পারি পাঁচালী রচিয়া॥’
বাংলা ভাষায় ইহাই প্রথম মহাভারত। ইহার নাম ‘পাণ্ডববিজয় পঞ্চালিকা’। ইহার রচয়িতা কবীন্দ্র পরমেশ্বর।
পরাগল খাঁর মৃত্যুর পর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা হইলেন তাঁহার পুত্র ছুটি খাঁ। তাঁহার সভাকবি ছিলেন শ্রীকর নন্দী। ছুটি খাঁ পরমেশ্বর দাসের সংক্ষিপ্ত মহাভারত পছন্দ করিলেন না, তাই শ্রীকর নন্দীকে দিয়া একটা বিস্তারিত মহাভারত রচনা করাইলেন। শ্রীকর নন্দী জৈমিনীর মহাভারত অনুসরণ করিয়া তাঁহার কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। রামচন্দ্র খান এবং রঘুনাথ নামে অপর দুইজন কবিও বাংলা ভাষায় মহাভারত রচনা করিয়াছিলেন।
বাংলা মহাভারতের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা কবি কাশীরাম দাস ইহাদের পরে আসিলেন। তাঁহার তিন ভাই— কৃষ্ণদাস, গদাধর এবং কাশীরাম। কাশীরামের জন্ম হয় বর্ধমান জেলার কাটোয়াতে।
কাশীরাম মহাভারতের মাত্র সাড়ে তিন পর্ব রচনা করিয়াছিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারতে একটি ছড়া পাওয়া যায়—
‘আদি, সভা, বন, বিরাটের কিছু দূর।
ইহা রচি কাশীদাস গেল স্বর্গপুর॥’
ইহার পর তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র নন্দকুমার বাকি মহাভারতটা শেষ করেন। তাঁহার রচনায় আছে—
‘জ্যেষ্ঠতাত কাশীদাস পরলোক কালে।
আমারে ডাকিয়া বলিলেন করি কোলে॥
শুন বাপু নন্দরাম আমার বচন।
ভারত-অমৃত তুমি করহ রচন॥’
ইহা হইতেই সুস্পষ্ট বোঝা যায় যে কাশীদাসী মহাভারত সম্পূর্ণ করেন তাঁহার ভ্রাতুষ্পুত্র নন্দকুমার।
ইহা লইয়াও আবার মতান্তর আছে। কেহ কেহ বলেন কাশীরামের শান্তি-পর্বটি কৃষ্ণানন্দ বসুর রচনা আর স্বর্গারোহণ পর্বটি জয়ন্ত দাসের রচনা।
কাশীরাম দাসের পুত্রের নাম ছিল দ্বৈপায়ন। তিনিও একখানি ‘ভারত পাঁচালী’ লিখিয়াছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে কোচবিহারেও দুইখানি মহাভারত রচিত হয়। ইহার পর অষ্টাদশ শতাব্দীতে মহাভারত রচনা করেন শঙ্কর চক্রবর্তী, সরলা দাস ও রাজেন্দ্র সেন।
যাহা হউক মহাভারত একটি বিরাট ধর্মগ্রন্থ, ইহাকে ‘সংহিতা’ বা ‘পঞ্চম বেদ’ বলা হয়।
প্রচলিত ছড়া আছে—
‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান,
যেই জন শোনে তাহা, হবে পুণ্যবান্।’

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন