সুনির্মল বসু

পূর্বকালে আমাদের এই ভারতবর্ষে জনক নামে এক বিখ্যাত রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন যেমন ধার্মিক তেমনি জ্ঞানী। যাগযজ্ঞে, দানে-ধ্যানে ও ধনে-মানে তাঁহার মতো রাজা আর কেহ ছিলেন না। দেশ-বিদেশ হইতে কত যে জ্ঞানী-গুণী, কত যে ঋষি-মুনি, কত যে সাধক-তাপসী তাঁহার সভায় উপস্থিত হইতেন তাহার আর সীমাসংখ্যা ছিল না। রাজা জনকের সভায় সম্মান লাভ করিলে, সমগ্র ভারতেই প্রতিষ্ঠা ও সমাদর লাভ হইত। রাজা জনকের যেমন তুলনা ছিল না, তাঁহার রাজসভারও তেমনি তুলনা ছিল না।
এই রাজা জনক একবার এক প্রচণ্ড যজ্ঞের আয়োজন করেন। ওই যজ্ঞে খুব বেশি দক্ষিণা দেওয়া হইয়াছিল বলিয়া ঋষিরা ওই যজ্ঞের নাম দিয়াছিলেন ‘বহু দক্ষিণা-যজ্ঞ।’
যজ্ঞ শেষ হইলে ঋষিদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত জানিবার জন্যে রাজা জনক এক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি যজ্ঞসভায় এক হাজার ধেনু আনাইয়া প্রত্যেকটি ধেনুর শৃঙ্গ সোনা দিয়া বাঁধাইয়া দিলেন। অবশেষে ঋষিদের ডাকিয়া বলিলেন,—‘আপনারা সকলেই ব্রহ্মবিদ, কে ছোট, কে বড় আমি জানি না। আপনাদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত তিনি কৃপা করিয়া আমার এই দান গ্রহণ করুন।’ রাজা জনকের কথা শুনিয়া সকলেই চুপ করিয়া রহিলেন। কেহ কিছু বলিতে পারিলেন না। কুরু পাঞ্চালের দেবজ্ঞ ব্রাহ্মণ প্রায় সকলেই উপস্থিত। কাহার এতটা স্পর্ধা যে সভায় দাঁড়াইয়া বলেন,—‘আমি শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, এই হাজার ধেনু আমারই।’
সহসা এক তেজস্বী প্রৌঢ় ঋষি দাঁড়াইয়া তাঁহার এক শিষ্যকে আদেশ দিলেন,—‘তুমি এই সকল ধেনু আমার আশ্রমে লইয়া যাও।’
এই ঋষির নাম যাজ্ঞবল্ক্য।
যাজ্ঞবল্ক্যের কথায় অন্যান্য ঋষিদের চমক ভাঙিল। তাঁহারা ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিলেন—‘কী, যাজ্ঞবল্ক্যের এতদূর স্পর্ধা? তিনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত প্রতিপন্ন করিতে চাহেন?’ কেহ কেহ বলিলেন,—‘যাজ্ঞবল্ক্য, তুমি নাকি একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, তুমি নাকি ব্রহ্মিষ্ঠ কোন্ মুখে তুমি এ কথা কহিতেছ? তোমার লজ্জা করে না?’
তাঁহারা যাজ্ঞবল্ক্যের প্রতি এইরূপ ক্রোধপূর্ণ অনেক কটুবাক্য প্রয়োগ করিতে লাগিলেন— কিন্তু ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য কোনও কথারই উত্তর দিলেন না। তিনি নির্বিকার হইয়া রহিলেন। জনক রাজাও একপার্শ্বে দাঁড়াইয়া এই দৃশ্য দেখিতে লাগিলেন।
জনক রাজার পুরোহিত ছিলেন অশ্বল! তিনি এই ব্যাপারে ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া উঠিলেন। তাঁহার দম্ভ ছিল তিনিই শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এবং ব্রহ্মবিদ। তিনি উত্তেজিত হইয়া যাজ্ঞবল্ক্যকে বিদ্রুপ করিতে লাগিলেন।
যাজ্ঞবল্ক্য তাঁহাকে বিনীত প্রণাম জানাইয়া কহিলেন,—‘ঋষিবর, আমার ধেনুর প্রয়োজন ছিল— তাই এগুলি গ্রহণ করিয়াছি। আপনি ব্রহ্মিষ্ঠ, আপনার চরণে আমার কোটি কোটি প্রণাম।’
অশ্বল যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করিতে লাগিলেন। যাজ্ঞবল্ক্য হাসিয়া সমস্ত প্রশ্নেরই যথাযথ উত্তর দিলেন। তখন অশ্বলের সমস্ত অহংকার চূর্ণ হইল, তিনি মুখ নিচু করিয়া বসিয়া পড়িলেন।
যাজ্ঞবল্ক্যের স্নিগ্ধ স্বরে, তাঁহার প্রশান্ত বিনয় মাধুর্যে উপস্থিত সকলেই বিমুগ্ধ হইয়া গেলেন। রাজা জনক প্রসন্ন হইয়া বুঝিতে পারিলেন যাজ্ঞবল্ক্যই শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মিষ্ঠ। সেদিন যাজ্ঞবল্ক্যের মুখ হইতে যেসব জ্ঞানামৃত বাহির হইয়াছিল তাহাই সংগৃহীত হইয়া বৃহদারণ্যক উপনিষদের মুখ্যাংশের রূপ ধরিয়াছে।
যাজ্ঞবল্ক্য বহু ধন উপার্জন করিয়াছিলেন— কিন্তু তাহা ভোগ না করিয়া সংসার ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাসী হইলেন। তাঁহার দুই স্ত্রী ছিলেন— মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নী। দুইজনের মধ্যে মৈত্রেয়ী ছিলেন বেশি বুদ্ধিমতী।
সংসার ত্যাগ করিয়া যাইবার সময় যাজ্ঞবল্ক্য দুই স্ত্রীকে ডাকিয়া কহিলেন,—‘আমি আমার সম্পত্তি তোমাদের দুইজনের মধ্যে ভাগ করিয়া দিয়া যাইতেছি।’
মৈত্রেয়ী তখন ঋষিকে প্রশ্ন করিলেন,—‘তুমি সংসার ত্যাগ করিয়া যাইতেছ আর আমি তোমার সম্পত্তি ভোগ করিব? পৃথিবীর সমস্ত ধনরত্ন পাইলে কি অমর হইতে পারিব?’
ঋষি উত্তর দিলেন,—‘না, তাহা পারিবে না।’
তখন মৈত্রেয়ী কহিলেন,—‘তবে এইসব অসার বস্তু আমাকে দিয়া যাইতেছ কেন? তুমি ব্রহ্মবিদ্যা জানো তাহারই ভাগ আমাকে দাও। আমি অন্য কিছুই চাহি না।’
ঋষি তখন আনন্দের সঙ্গে মৈত্রেয়ীকে ব্রহ্মজ্ঞান দিলেন এবং কহিলেন,—‘মানুষ নিজের আত্মার জন্যই আনন্দ লাভ করে— আত্মাই মানুষের সর্বাপেক্ষা প্রিয়। এই আত্মার দর্শন পাইলেই মানুষ চিরকালের জন্য জন্ম-মৃত্যু হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারে।’

মৈত্রেয়ী যাজ্ঞবল্ক্য ঋষির নিকট হইতে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া ধন্য হইলেন। ঋষিও সংসার ছাড়িয়া সন্ন্যাসী হইয়া বনে চলিয়া গেলেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন