সুনির্মল বসু

মহারাজ বিদুরথ বাহির হইয়াছেন মৃগয়ায়।
চলিতে চলিতে অরণ্যের মধ্যে হঠাৎ তাঁহার নজরে পড়িল একটা বিরাট গর্ত। এত বড় গর্ত পৃথিবীতে সাধারণত দেখা যায় না। গর্তটি দেখিয়া রাজা মনে মনে চিন্তা করিলেন— কোনও মানুষের বা জীবজন্তুর পক্ষে এত বড় গর্ত করা সম্ভব নয়, এ গর্তের রহস্য বাহির করিতেই হইবে।
রাজা এদিক ওদিক সন্ধান করিতেছেন, এমন সময় এক মুনির সঙ্গে দেখা। রাজা মুনিকে এই গর্তের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিতেই তিনি কহিলেন— ইহাই হইতেছে পাতালে যাইবার পথ। কুজৃম্ভ নামে এক দানব এই গর্ত নির্মাণ করিয়াছে। এই দানব বড় সহজ দানব নহে! বিশ্বকর্মার নির্মিত মুষল চুরি করিয়া আনিয়া এ মহাবলবান হইয়া পড়িয়াছে। মুষলের বলে দৈত্যের অসাধ্য বলিয়া কিছুই নাই। মুনি-ঋষিরা তাহার অত্যাচারে সর্বদাই তটস্থ। দেবতারা পর্যন্ত ইহাকে সমীহ করিয়া চলে। মুষলের জোরে সে পৃথিবী বিদীর্ণ করিয়া এই পথ নির্মাণ করিয়াছে। সেই কুজৃম্ভ দৈত্য তাহার দলবল লইয়া পাতালে গিয়া লুকাইয়া থাকে।
মুনির কথা শুনিয়া বিদুরথ কহিলেন,—‘এ দানবকে হারাইতে হইলে আগে তাহার মুষলটিকে ধ্বংস করা দরকার। আচ্ছা, বলুন তো মুনিঠাকুর, এই মুষলটিকে অকর্মণ্য করা যায় কী প্রকারে?’
মুনি কহিলেন,—‘বিশ্বকর্মা নির্মিত এই মুষলটি অতি সাংঘাতিক। কিছুতেই ইহাকে নিস্তেজ করা যায় না; তবে বিধান আছে, যদি কোনও স্ত্রীলোক এই মুষলটি ছুঁইয়া দেয় তাহা হইলে সেদিনের মতো ইহার সকল ক্ষমতা নষ্ট হইয়া যাইবে।’
মুনির কথা শুনিয়া বিদুরথ বাড়ি ফিরিয়া আসিলেন, আর তাঁহার মন্ত্রীদের কাছে এই গল্পটি বলিলেন।
রাজকন্যা মুদাবতী সেই সময় কাছেই ছিলেন, অলক্ষ্যে তিনিও রাজার কাহিনিটি শুনিলেন।
এই ঘটনার কিছুদিন পরই রাজকন্যা মুদাবতী সখীদের লইয়া উপবনে ভ্রমণ করিতেছেন, এমন সময়ে হঠাৎ সেই দানব কুজৃম্ভ তাঁহাকে বলপূর্বক ধরিয়া লইয়া গেল এবং সেই রহস্যময় সুড়ঙ্গপথে পাতালে প্রবেশ করিল।
এই সংবাদ পাইয়া রাজা বিদুরথ তাঁহার দুই পুত্রকে পাঠাইলেন রাজকন্যাকে উদ্ধার করিতে।
কিন্তু দানবের সাংঘাতিক সেই মুষলের সঙ্গে আঁটিয়া উঠা সহজ নহে। দানব দুই রাজপুত্রকেও বন্দি করিয়া রাখিল।
রাজা বিদুরথ যখন এই দুঃসংবাদ শুনিলেন তখন তিনি রাগে, দুঃখে ঘোষণা করিলেন,—‘এই দানবকে হারাইয়া যে তাঁহার কন্যা ও পুত্রদের উদ্ধার করিতে পারিবে তাহাকে তিনি যথোচিত পুরস্কার তো দিবেনই, তাহার উপর কন্যা মুদাবতীকেও দান করিবেন।’
রাজার ঘোষণা শুনিয়া দৈত্যের মুষলের ভয়ে আর কেহ একাজ করিতে সাহস করে না।
অবশেষে একদিন এক সুদর্শন যুবক আসিয়া রাজাকে নমস্কার করিয়া কহিলেন,—‘মহারাজ, আমি একবার চেষ্টা করিয়া দেখি।’
যুবকের সুন্দর বলিষ্ঠ চেহারা দেখিয়া রাজা বিদুরথ খুশি হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—‘তুমি কে? তোমার পরিচয় দাও।’
যুবক কহিল—‘আমি ভনন্দন রাজার পুত্র বৎসপ্রী।’
বিদুরথ আরও সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন,—‘ভনন্দন আমার বিশেষ বন্ধু। কিন্তু তুমি এই দুরূহ কাজ করিতে পারিবে কি? সে দানব অতি ভীষণ, তাহার মুষলটিও সাংঘাতিক। তথাপি আশীর্বাদ করি তুমি জয়যুক্ত হও।’
কুমার বৎসপ্রী তখন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া সেই পাতালপুরীতে প্রবেশ করিয়া দানবের আড্ডায় হানা দিলেন। দানবও টের পাইয়া হুংকার দিয়া ছুটিয়া আসিল।
দুইজনেই মহাপরাক্রমশালী বীর। ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইল। তিন দিন, তিন রাত্রি সমানভাবে যুদ্ধ চলিল।
অবশেষে দানব আর সংগ্রাম করিতে না পারিয়া মুষল আনিতে তাহার অনুচরকে পাঠাইল।
বিশ্বকর্মার নির্মিত মুষল, অত্যন্ত সম্ভ্রমের সঙ্গে ইহাকে ব্যবহার করিতে হয়। ব্যবহারের পূর্বে তাহাকে যথাবিধি পূজা-অর্চনা করিতে হয় তাহার পর নাড়াচাড়া চলে।
রাজকন্যা মুদাবতী ইহাই চাহিতেছিলেন। মুষল পূজার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত হইলেন এবং অত্যন্ত ভক্তির ভাব দেখাইয়া মুষলটিকে স্পর্শ করিয়া প্রণাম করিলেন। স্ত্রীলোকের স্পর্শে সেইদিনের মতো মুষলটি অকেজো হইয়া পড়িল, কিন্তু কেহই তাহা টের পাইল না।

মূষল হাতে পাইয়া দানব অতি বিক্রমে তাহা লইয়া বৎসপ্রীকে আক্রমণ করিল, কিন্তু বৎসপ্রী অবলীলাক্রমে মুষল প্রতিরোধ করিলেন।
মুদাবতী যে স্পর্শ করিয়া ইহাকে অকেজো করিয়া দিয়াছেন, দানব তো তাহা জানে না। সে ভয়ংকর দমিয়া গেল।
এখন আর বৎসপ্রীকে পায় কে? মুষলকে নিষ্ফল হইতে দেখিয়া তিনি বাণে বাণে দানবকে অস্থির করিয়া ফেলিলেন এবং শেষে তাহাকে হত্যা করিলেন।
তাহার পর আর কী? বৎসপ্রী, রাজপুত্র, রাজকন্যা ও আরও বহু বন্দি মুনি-ঋষিদের উদ্ধার করিয়া বিদুরথের কাছে ফিরিলেন।
রাজা বিদুরথ তাঁহার প্রতিজ্ঞা রাখিলেন। মহাধুমধামে মুদাবতীর সহিত বৎসপ্রীর বিবাহ হইয়া গেল।
পরে রাজা বিদুরথ জানিলেন যে, মুদাবতী সুকৌশলে দানবের মুষলটি বৎসপ্রীকে জিতাইবার জন্য নিষ্ফল করিয়া দিয়াছিল।
তাহা না হইলে এই মহাদানবকে পরাহত করা বৎসপ্রীর পক্ষে সহজ হইত না। মুদাবতী ও তাহার ভ্রাতারাও অত সহজে মুক্তিলাভ করিত না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন