সুনির্মল বসু

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়ী হইয়া পাণ্ডবদের বড় ভাই যুধিষ্ঠির ভাবিলেন,—‘তাইতো যুদ্ধে তো জিতিলাম, কিন্তু যুদ্ধের যেসব পাপ করিয়াছি তাহা দূর করি কী উপায়ে?’
অন্তর্যামী মহর্ষি বেদব্যাস যুধিষ্ঠিরের মনের কথা বুঝিতে পারিয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া কহিলেন,—‘ধর্মরাজ, আপনি অশ্বমেধ-যজ্ঞের ব্যবস্থা করুন। এই যজ্ঞ করিলেই আপনার সব পাপ দূরে যাইবে।’
ব্যাসদেবের কথায় যুধিষ্ঠির খুব ধুমধামের সঙ্গে অশ্বমেধ-যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। যজ্ঞের অশ্ব সারাদেশ ঘুরিয়া আসিল, কেহ তাহাকে আটকাইতে পারিল না। সমস্ত ভারতের ক্ষত্রিয় রাজারা যুধিষ্ঠিরকে একচ্ছত্র সম্রাট বলিয়া মানিয়া লইলেন।
এমন যজ্ঞ কেহ কোনদিনও দেখে নাই। নিমন্ত্রিতেরা যজ্ঞসভায় আসিয়া মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন। সবাই বলিতে লাগিলেন,—‘এমন বিরাট যজ্ঞ আর কেহ কখনও করিতে পারেন নাই।’
যজ্ঞের শেষে কোথা হইতে একটি নকুল ছুটিয়া আসিল সেই যজ্ঞভূমিতে। নকুলটা দেখিতে বড় অদ্ভুত। তাহার মাথা হইতে পা পর্যন্ত একদিকটা একেবারে স্বর্ণে গঠিত। অপরদিকের বাকি অর্ধেকটা ঠিক সাধারণ নকুলের মতো।
নকুলটা যজ্ঞভূমিতে আসিয়া হোমের আগুনের ভস্মস্তূপের উপর কিছুক্ষণ গড়াগড়ি দিল, তাহার পর গা-ঝাড়া দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।
তাহার পর সকলকে স্তম্ভিত করিয়া ঠিক মানুষের মতো ভাষায় সে কহিতে লাগিল,—‘আপনারা সবাই কহিতেছেন এরূপ যজ্ঞ কেহ করিতে পারে নাই। ইহা সম্পূর্ণ খোশামোদের কথা। এ যজ্ঞ যজ্ঞই নহে। বহুকাল পূর্বে এই কুরুক্ষেত্রেই এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ এক সরা ছাতু দিয়া যে যজ্ঞ করিয়াছিলেন, এই যজ্ঞ তাহার নিকট কিছুই নহে। আমি মিথ্যা পরিশ্রম করিলাম।’
নকুলের কথায় উপস্থিত সকলে আশ্চর্য হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—‘হে নকুল, তুমি কোন্ যজ্ঞের কথা বলিতেছ, আমরা কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। সব বৃত্তান্ত খুলিয়া বলো।’
নকুল কহিতে লাগিল,—‘বহুদিন পূর্বে এই কুরুক্ষেত্রেই এক অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। তাঁহার কোনও আয় ছিল না, অথচ তিনি ভিক্ষাও করিতেন না। ধান কাটা হইয়া গেলে যেসব ধান মাঠে পড়িয়া থাকিত, তাহাই কুড়াইয়া আনিয়া তাহা খাইয়াই তাঁহারা সপরিবারে কোনওরূপে জীবনধারণ করিতেন।
তাঁহার পরিবারে ছিলেন ব্রাহ্মণী, এক যুবক পুত্র ও তাঁহার তরুণী স্ত্রী।
একবার ওই অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। বৃষ্টির অভাবে মাঠে আর চাষবাস হয় না। কাজেই এই ব্রাহ্মণ-পরিবার উপবাস করিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণ সারাদিন মাঠে মাঠে ঘুরিয়াও আর এক কণা ধান পান না। তাই উপবাস করা ছাড়া উপায় কী?
কয়েকদিন উপবাস থাকিবার পর ব্রাহ্মণ একদিন খোঁজ পাইয়া দূরের এক মাঠে গেলেন কিছু যবের দানা কুড়াইতে। সমস্ত দিন রৌদ্রে পুড়িয়া তাঁহারা কিছু যবের দানা কুড়াইয়া বাড়ি ফিরিলেন। বেলা শেষে সেগুলি ভাজিয়া গুঁড়া করিয়া কিছু ছাতু মিলিল। সেই ছাতু চারিটি ভাগ করিয়া যখন তাঁহারা খাইতে বসিবেন— এমন সময়ে একজন ব্রাহ্মণ অতিথি উপস্থিত হইলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হইয়া আসিয়াছেন।
অতিথি নারায়ণ, তাই ব্রাহ্মণ তাঁহার ভাগের ছাতু তাঁহাকে খাইতে দিলেন। কিন্তু তাহা খাইয়াও ব্রাহ্মণের ক্ষুধা মিটিল না, তাহা জানিয়া ব্রাহ্মণী তাঁহার ভাগের ছাতুও তাঁহাকে দিলেন। কিন্তু তাহাতেও অতিথির পেট ভরিল না। তখন ব্রাহ্মণের পুত্র নিজের ভাগের ছাতুও অতিথিকে দিয়া দিলেন। তাহা খাইয়া অতিথি বলিলেন,—‘আর একটু খাইলেই আমার উদর পূর্ণ হইবে, এখনও কিছু ক্ষুধা আছে।’ তখন ব্রাহ্মণের পুত্রবধূ নিজের অংশও অতিথিকে দান করিলেন।
এইবার অতিথি সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন,—‘হে ব্রাহ্মণ, আমি অত্যন্ত তৃপ্ত হইয়াছি। আমি আর কেহ নহি, আমি ‘ধর্ম’। তোমাকে পরীক্ষা করিতে আসিয়াছিলাম। তোমাদের এরূপ আত্মত্যাগে আমি মুগ্ধ। ওই দেখো, স্বর্গ হইতে পুষ্পবৃষ্টি হইতেছে। তোমরা সকলে আমার সহিত স্বর্গে চলো।’
ব্রাহ্মণেরা সপরিবারে দিব্যদেহে স্বর্গে চলিয়া গেলেন।
‘আমি থাকিতাম ওই ব্রাহ্মণের গৃহের এক কোটরে। তাঁহারা স্বর্গে চলিয়া গেলে, আমি কোটর হইতে বাহিরে আসিয়া যেখানে ওই ছাতুর গুঁড়া পড়িয়াছিল সেখানে গেলাম এবং ভাবিলাম যেখানে এতগুলি মহাত্মা চলাফেরা করিয়াছেন সেখানে ধুলায় একটু গড়াগড়ি দেই, যদি তাঁহাদের আশীর্বাদে আমার এই পশু-জন্ম ঘুচিয়া যায়।

সেখানে গড়াগড়ি দিতেই আমার দেহের যে অংশ ছাতুর গুঁড়া লাগিয়া ছিল সেই অংশ সোনা হইয়া গেল। তাহার পর হইতে আমি বহু ধার্মিকের বাড়ি গিয়াছি, বহু যজ্ঞক্ষেত্রে গড়াগড়ি দিয়াছি কিন্তু আমার দেহের বাকি অংশ আর সোনা হইল না। বড় আশায় যুধিষ্ঠিরের এই যজ্ঞসভায় আসিয়াছিলাম, কিন্তু এখানেও আমার ইচ্ছা পূর্ণ হইল না।’
নকুলের কথা শুনিয়া সকলে বিস্মিত হইলেন। সকলে বলাবলি করিতে লাগিলেন,—‘কে ওই আশ্চর্য নকুল! সে যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞের নিন্দা করিতেছে কেন?’
তখন নকুলকে প্রশ্ন করা হইলে, সে কহিল,—‘একদা মহর্ষি জামদগ্নি শ্রাদ্ধের জন্যে হোমধেনু দোহন করিয়া একটি নতুন ভাণ্ডে সেই দুগ্ধ রাখিয়াছিলেন। আমি ধর্ম, আমি মহর্ষিকে পরীক্ষা করিবার জন্য ক্রোধরূপে সেই ভাণ্ডে প্রবেশ করিয়া তাঁহার দুগ্ধ নষ্ট করিয়া ফেলি। কিন্তু তাহাতে জামদগ্নি ক্রুদ্ধ হইলেন না দেখিয়া আমি ব্রাহ্মণরূপে আবির্ভূত হইয়া বলি,—‘ভৃগুশ্রেষ্ঠ, আমি জানিতাম ভৃগুবংশীয়গণ অত্যন্ত ক্রোধী। এখন বুঝিতেছি, এই অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি পরাজিত হইয়া ভীত হইয়াছি। আপনি আমার উপর প্রসন্ন হউন।’
জামদগ্নি কহিলেন, ‘ক্রোধ, তুমি আমার নিকট কোনও অপরাধ করো নাই—আমি পূর্বপুরুষগণের জন্যে এই দুগ্ধ রাখিয়াছিলাম, তুমি তাঁহাদের প্রসন্ন করো।’
তাঁহার কথা শুনিয়া আমি তাঁহাদের নিকট গেলাম এবং তাঁহাদের শাপে এই নকুলের রূপ পাইলাম। পূর্বপুরুষগণ আমাকে কহিলেন,—‘ধর্মের নিন্দা করিলে তোমার শাপমুক্তি হইবে।’
‘সেই হইতে আমি তপোবন ও যথাস্থানে গিয়া ধর্মের নিন্দা করিতে লাগিলাম। যুধিষ্ঠির সাক্ষাৎ ধর্ম, সেইজন্য এখানে আসিয়া তাঁহার যজ্ঞের নিন্দা করিলাম।’
বলিতে বলিতে নকুল শাপমুক্ত হইয়া অদৃশ্য হইলেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন