শৃঙ্গী ঋষির কথা

সুনির্মল বসু

পরীক্ষিৎ ছিলেন অর্জুনের পৌত্র। অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ সুশাসক ছিলেন তিনি। তাঁহার রাজ্যে প্রজাদের কোনও অভাব অভিযোগ ছিল না। পরীক্ষিতের মৃগয়ায় ছিল বড়ই শখ। মৃগয়া করিতে তিনি প্রায়ই গভীর বনে প্রবেশ করিতেন— ইহাতে তিনি বিশেষ আনন্দ লাভ করিতেন। একদিন তিনি একটি মৃগকে অনুসরণ করিতে করিতে বনের ভিতর পথ হারাইয়া ফেলিলেন এবং তাঁহার লোকজন হইতেও বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িলেন।

ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হইয়া তিনি ইতস্তত ঘুরিতে ঘুরিতে সহসা এক মুনির আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। এই মুনির নাম শমীক। বৃদ্ধ শমীক সে সময় মৌনব্রত অবলম্বন করিয়া তপস্যা করিতেছিলেন— তিনি রাজা পরীক্ষিৎকে লক্ষ করেন নাই।

রাজা মুনিকে প্রশ্ন করিলেন,—‘বলুন তো মুনি, আমার বাণবিদ্ধ হরিণটি কোনদিকে গেল?’

মৌনী মুনি রাজার প্রশ্নের কোনও উত্তর দিলেন না।

এই ব্যাপারে রাজা পরীক্ষিৎ ক্রোধে জ্ঞানশূন্য হইলেন, ভাবিলেন মুনি তাঁহাকে অবজ্ঞা করিতেছেন। সামনেই একটি মৃত সর্প পড়িয়াছিল। কাণ্ডজ্ঞানরহিত রাজা সেটিকে তাঁহার ধনুকে জড়াইয়া মুনির গলায় পরাইয়া চলিয়া গেলেন।

শমীকের পুত্র শৃঙ্গী ছিলেন মহাতেজস্বী ঋষি। তিনি সে সময়ে আশ্রমে ছিলেন না। তাঁহার এক বন্ধু দূর হইতে পরীক্ষিতের এই কাণ্ড লক্ষ করিয়া তৎক্ষণাৎ শৃঙ্গীকে এই সংবাদ জানাইলেন।

এই খবর পাইয়া শৃঙ্গী ক্রোধে কাঁপিতে কাঁপিতে ছুটিয়া আসিলেন আর পিতার এই শোচনীয় অবস্থা প্রত্যক্ষ করিলেন। ক্রোধে দিশাহারা হইয়া তিনি পরীক্ষিৎকে অভিশাপ দিলেন,—‘আমার নিরীহ পিতার গলায় যে মৃত সাপ ঝুলাইয়াছে, আজ হইতে সপ্তম দিনের সূর্যাস্তের পূর্বে সর্পাঘাতেই তাহার মৃত্যু হইবে।’

শমীক মুনির মৌনব্রত ভঙ্গ হইলে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া তিনি শৃঙ্গীকে অত্যন্ত তিরস্কার করিয়া কহিলেন,—‘তুমি অতিশয় মূর্খ। যাঁহার আশ্রয়ে নিরুদ্বেগে নিরাপদে থাকিয়া আমরা ধ্যানধারণা করিতেছি, সেই রাজাকেই তুমি অভিশাপ দিলে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় পরিশ্রান্ত রাজা যদি না বুঝিয়াই আমাকে অপমান করিয়া থাকেন, তাহা হইলেও তাঁহার কোনও ক্ষতি করা তোমার পক্ষে গুরুতর অন্যায়।’

শৃঙ্গীর অনুতাপ হইল, তিনি মাথা নিচু করিয়া পিতাকে বলিলেন—‘আমারই অন্যায় হইয়াছে বাবা। কিন্তু অভিশাপ ফিরাইবার কোনও উপায় নাই।’

শমীক তখনই এক সঙ্গীকে দিয়া পরীক্ষিৎকে সকল কথা জানাইলেন। পরীক্ষিৎ রাজাও মৃত্যুভয়ে ভীত হইয়া মন্ত্রীদের পরামর্শে একটি স্তম্ভের উপর ছিদ্রহীন একটি লৌহকক্ষ নির্মাণ করাইয়া তাহাতে বাস করিতে লাগিলেন। তাহাতে সর্প-প্রবেশের আর কোনও পথ রহিল না।

এইরূপে ছয়দিন কাটিয়া গেল। সপ্তম দিনে তক্ষক একটি সদাচারী ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে রাজবাড়িতে প্রবেশ করিবার উপায় খুঁজিতেছে, এমন সময় কাশ্যপ নামে এক ব্রাহ্মণ তাড়াতাড়ি সেইস্থানে হাজির হইলেন।

ব্রাহ্মণবেশী তক্ষক তাহাকে প্রশ্ন করিল,—‘কে আপনি? এত তাড়াতাড়ি কোথায় যাইতেছেন?’

কাশ্যপ কহিল,—‘আমি একজন বিষবৈদ্য। আজ রাজাকে তক্ষক দংশন করিবে, আমি আবার তাঁহাকে বাঁচাইয়া তুলিব।’

তক্ষক তখন আপনার পরিচয় দিয়া কহিল,—‘দেখি আপনার ক্ষমতা কতখানি! এই বটবৃক্ষ আমি দংশন করিয়া ভস্মীভূত করিতেছি, আপনার মন্ত্রবলে তাহা আবার পুনর্জীবিত করুন দেখি?’

এই বলিয়া তক্ষক একটি বটবৃক্ষকে দংশন করিল, দেখিতে দেখিতে সেই বৃক্ষটি তক্ষকের বিষে ভস্মে পরিণত হইল। কাশ্যপও মন্ত্রবলে পুনরায় বৃক্ষটিকে বাঁচাইয়া তুলিলেন।

তক্ষক স্তম্ভিত হইয়া কহিল,—‘আপনার ক্ষমতা দেখিতেছি অদ্ভুত, আপনি হয়তো রাজাকে আবার বাঁচাইতে পারেন। কিন্তু শৃঙ্গী ঋষির শাপে আমি তাঁহাকে দংশন করিতে যাইতেছি, আপনি এক্ষেত্রে সফলকাম হইবেন কি না সন্দেহ। আমি আপনাকে প্রচুর অর্থ দিতেছি, আপনি ঘরে ফিরিয়া যান।’

কাশ্যপ কহিল,—‘আমি অত্যন্ত দরিদ্র, অর্থের লোভেই আমি এখানে আসিয়াছি। অর্থ পাইলেই আমার হইল, রাজাকে বাঁচাইবার আমার অন্য কোনও অভিপ্রায় নাই।’

তক্ষক তখন কাশ্যপকে প্রচুর অর্থ দিয়া বিদায় করিল। কাশ্যপও ধ্যানবলে জানিল পরীক্ষিতের আয়ু শেষ হইয়াছে— তাই সেও বিদায় লইল। তাহার পর তক্ষক একটি ক্ষুদ্র কীটের রূপ ধরিয়া একটি ফলের মধ্যে প্রবেশ করিল, এবং তাহারই পরামর্শে কয়েকটি নাগ তপস্বীর বেশ ধারণ করিয়া সেই ফল রাজাকে খাইতে দিল।

সপ্তম দিবসের সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যাইতেছে। আর একটু পরেই রাজা পরীক্ষিৎ নিরাপদ হইবেন, আর ভয় নাই। শৃঙ্গী মুনির শাপ আর বুঝি ফলিল না।

ছদ্মবেশী তপস্বীরা রাজাকে তখন সেই ফল খাইতে দিল। রাজাও পরম নিশ্চিন্তে কিছুমাত্র শঙ্কা না করিয়া যেই সেই ফল খাইতে গেলেন— অমনি সেই কীট তক্ষকের রূপ ধারণ করিয়া রাজাকে বেষ্টন করিয়া সগর্জনে দংশন করিল।

মন্ত্রীরা চাহিয়া দেখিল পদ্মবর্ণ তক্ষক রাজাকে দংশন করিয়া আকাশে যেন সীমান্তরেখা বিস্তার করিয়া উড়িয়া যাইতেছে। বিষের আগুনে পরীক্ষিতের গৃহ আলোকিত হইল। রাজাও বজ্রাহতের ন্যায় পড়িয়া গেলেন।

রাজা পরীক্ষিতের মৃত্যু হইল। শৃঙ্গী ঋষির অভিশাপও ফলিয়া গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%