হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

হরেন হাত ছড়িয়ে মাটির ওপর চিত হয়ে শুয়ে ছিল। চোখ খোলার পর সে কে, কোথায় শুয়ে আছে তা কিছুই মনে করতে পারল না। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ পূর্ণিমা, আকাশে সোনার থালার মতো চাঁদ উঠেছে। তবে আকাশে মেঘ আছে। মাঝে মাঝে মেঘের দল ঢেকে দিচ্ছে চাঁদকে। তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। তার একটু পরেই আবার সরে যাচ্ছে তারা, তখন আবার আলোতে ভরে উঠছে চারপাশ। বেশ কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদের লুকোচুরি খেলা দেখল হরেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল। চাঁদের আলোতে চারদিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। হরেন যেখানে বসে আছে সেখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে অনেকটা জায়গা চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে। ওটা মনে হয় একটা জলা— মনে মনে ভাবল হরেন। তার ওপাশে বেশ কয়েকটা ঝুপসি গাছের দঙ্গল। সেগুলো কী গাছ দূর থেকে ঠিক বুঝতে পারল না হরেন। সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছাদ খসে যাওয়া পুরনো আমলের ভাঙা দোতলা বাড়ির কঙ্কাল। চাঁদের আলোতে সেটা ম্লান মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির পেছনে যতদূর চোখ যায় ধু-ধু মাঠ। তারই মধ্যে কোথাও কোথাও হয়তো একটা গাছ ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সে কে! এখানে কেন! মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করল হরেন। না, কিছুই তার মনে পড়ছে না! হঠাৎ, সেই জলার কাছ থেকে একটা শেয়াল ডেকে উঠল— হুক্কা হুয়া, তার সঙ্গীরাও সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল— হুয়া, হুয়া, কেয়া হুয়া...।
বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাৎ করে উঠল হরেনের। এবার তার কেমন ভয়-ভয় করতে লাগল। হরেন উঠে দাঁড়াল, সামনের দিকে আরও অনেকখানি এবার সে দেখতে পেল। হরেন বুঝতে পারল যে জায়গাটাকে সে জলা বলে ভাবছিল সেটা আসলে জলা নয়, বিরাট একটা নদী, পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে। হরেন সেই নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছাল হরেন। কিছুদূরে গিয়ে নদী একটা বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকের ওধারে অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা বিন্দু-বিন্দু আলো। নদীর বুক থেকে শব্দ উঠছে— ছলাৎ-ছল, ছলাৎ-ছল। নদীর ঠান্ডা বাতাসে হরেনের মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। এত বড় নদী যখন তা হলে নিশ্চয়ই গঙ্গা হবে। নিজের মনেই বলল হরেন। কিন্তু এদিক দিয়ে সে কোথায় যাবে? তাই যেদিক থেকে সে এসেছিল সে দিকেই আবার ফিরে চলতে শুরু করল।
ঠিক যে জায়গাটাতে সে শুয়ে ছিল কিছুক্ষণ আগে তার কিছুটা কাছে ফিরে আসতেই হরেনের মনে হল ঠিক একই জায়গায় চাঁদের আলোতে মাটির মধ্যে কে যেন হাত ছড়িয়ে শুয়ে আছে। মনে একটু ভয় ভয় করলেও সে এগিয়ে গেল লোকটার কাছে। লোকটা চিত হয়ে আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। কাছে গিয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকাল হরেন, আর তার পরেই সে চমকে উঠল। আরে এ তো তারই মুখ! সেই-ই তো শুয়ে আছে মাটির মধ্যে, ওই তো তার গায়ে নতুন কেনা সাদা রঙের জামাটা। তার বুকের কাছে বেশ খানিকটা জায়গা লাল হয়ে গেছে। চাঁদের আলোতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সব কিছু।
কিন্তু শুয়ে থাকা লোকটা যদি সে হয়, তাহলে সে নিজে কে! এ কথাটা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ হরেনের মনে পড়ে গেল সব কিছু। হ্যাঁ, সে খুন হয়ে গেছে। আজ সন্ধ্যাবেলায় পানু হালদারের লোকজন তুলে নিয়ে গেছিল তাকে। তারপর তাকে খুন করে লাশটা গঙ্গার ধারে মাঠের মধ্যে ফেলে দিয়ে গেছে। তার সামনে পড়ে থাকা লাশটা আসলে তারই, আর সে হল হরেনের— যাকে বলে ‘আত্মা’। বাবার মুখে অনেকদিন আগে সে শুনে ছিল— আত্মা নাকি অবিনশ্বর, তার সৃষ্টিও নেই। ধ্বংস নেই। সে শুধু শরীর বদল করে মাত্র। এই অবস্থার মধ্যেও হঠাৎ সেই পুরানো কথাটা কেন যেন মনে পড়ে গেল হরেনের। এতদিন কথাটা বিশ্বাস করত না হরেন। কিন্তু এখন দেখছে কথাটা মিথ্যা নয়। হরেন এখন কোথায় যাবে? কোথাও তো একটা তাকে যেতে হবেই। হরেন তার দেহের সামনে দাঁড়িয়ে সেটাই চিন্তা করতে লাগল। দেহটাকে এখানে এমনভাবে ফেলে রেখে যেতেও মায়া লাগছে হরেনের। হাজার হোক এতদিন তো এর জন্যই সে যা কিছু করছে। একটা পেঁচা ভাঙা বাড়িটার কার্নিশ থেকে উড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকা হরেনের দেহ ভেদ করে গঙ্গার দিকে মিলিয়ে গেল। হরেন বুঝতে পারল সে নিজে নিজের হাত-পা সব কিছু দেখতে পারলেও সে আসলে এখন অদৃশ্য হয়ে গেছে, তাই পেঁচাটা ওই ভাবে উড়ে গেল। সে এখন হরেনের বিদেহী আত্মা।
হরেন একবার নীচু হয়ে দেখল তার লাশের হাতের ঘড়িটা। রেডিয়াম দেওয়া ঘড়িটা এখনও চলছে। হরেন দেখল ঘড়িতে রাত এগারোটা বাজে। অর্থাৎ সে খুন হবার পর মাত্র ঘণ্টা চারেক সময় কেটেছে। কিন্তু এখন তার মূল সমস্যা হল সে কোন দিকে যাবে? যেতে হলে তার বেচা মিস্ত্রি লেনের বাড়িটাই ভালো। জন্মের পর থেকে সে ওই বাড়িটাতেই বাস করেছে। বাবা-মা মারা যাবার পর থেকে সে এতদিন একাই ছিল বাড়িটাতে। দিন তিনেক আগে বাড়িটা তালা বন্ধ করে শেষবারের মতো সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু কোন দিক দিয়ে সে সেখানে যাবে? কী ভাবে যাবে? সে এখন আছেই বা কোথায়! মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে একথাই ভাবছিল হরেন, হঠাৎ দূর থেকে একটা রেলগাড়ির ভোঁ শুনতে পেল হরেন। তারপরই সে দেখল দূর থেকে একটা আলোক বিন্দু এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা মালগাড়ি ঘটাংঘটাং শব্দ করতে করতে ভাঙা বাড়িটার পেছনের মাঠের অন্ধকারের বুক চিরে নিজের গন্তব্যের দিকে মিলিয়ে গেল। শুধু বেশ কিছুক্ষণ তার পেছনের লাল আলোটা দেখা যেতে লাগল। হরেন গাড়িটা চলে যাবার পর ভাঙা বাড়ির পাশ দিয়ে গিয়ে মাঠের মধ্যে রেল লাইনের ধারে উপস্থিত হল। তারপর মালগাড়িটা যে দিকে গেল রেললাইন ধরে সেদিকে হাঁটতে শুরু করল। হরেনের মনে হল সে যেন এখন পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে। রেললাইনের মধ্যে পড়ে থাকা পাথর আর তার পাশের ঝোপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না তার। সে তার খুন হয়ে যাওয়ার পেছনের ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতে সোজা হাঁটতে লাগল৷ এসব ঘটনার শুরু বছর তিনেক আগে।
কিঙ্কর ছিল হরেনের ছেলেবেলার বন্ধু। হরেনের কয়েকটা বাড়ি পরেই ছিল কিঙ্করদের বাড়ি। কিঙ্কর ছিল খুব মেধাবী ছাত্র। হরেনের সঙ্গেই সে বি.এ. পাশ করে। তাঁর ইচ্ছা ছিল অধ্যাপক হবে। কিন্তু হঠাৎ বাবা মারা যাওয়াতে বিরাট সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর কাঁধে। সে-ই বাড়ির বড় ছেলে, বাড়িতে ছোট ছোট ভাই বোন। তাই পড়াশোনাতে ইতি টেনে সে নেমে পড়েছিল চাকরির খোঁজে। কিন্তু চাকরি পাওয়া কি মুখের কথা। প্রতিদিন চাকরির খোঁজে এখানে ওখানে ছোটাছুটি আর সংসার চালাবার জন্য টিউশন। এইভাবে দিন কাটতে লাগল তাঁর। হরেনের বাবা-মাও অনেক কাল আগে গত হয়ে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু একটা বাড়ি ছাড়াও যে পরিমাণ নগদ অর্থ হরেনের বাবা রেখে গেছিলেন তা একা মানুষ হিসাবে হরেনের পক্ষে ছিল যথেষ্ট। হরেন কিঙ্করকে সাহায্য করতেও চেয়েছিল, কিন্তু আদর্শবাদী ও প্রখর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কিঙ্কর সে সাহায্য নিতে চায়নি।
হরেনদের পাড়ার গলির ঠিক মুখে আছে বিরাট একটা তিনতলা বাড়ি। বাড়ির মালিকের নাম পানু হালদার। বিরাট ভুঁড়ি আর কুতকুতে চোখের মানুষটা পাড়ার কারুর সঙ্গেই মিশত না। তবে হরেনরা দুর্গা পূজার চাঁদা নিতে গেলে যে টাকাটা তারা চাইত, বিনা বাক্যব্যয়ে সেই টাকাটাই সে দিয়ে দিত। তার অনেক রকম ব্যবসা। বাড়ির পেছনে একটা ওষুধের কারখানাও আছে। কীভাবে যেন পানু হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেছিল কিঙ্করের। পানু হালদারের কাছে আটশো টাকা মাইনেতে খাতা লেখার কাজ নিয়েছিল সে। কিন্তু মাস ছয়েক কাজ করার পরই পানু হালদারের আসল রূপটা সে ধরে ফেলে ছিল— পানু হালদারের ব্যবসা হল জাল ওষুধের! ব্যাপারটা জানবার সঙ্গে সঙ্গে কিঙ্কর চাকরিটা তো ছাড়লই, উপরন্তু ব্যাপারটা সকলকে জানিয়ে দেবার হুমকি দিল পানু হালদারকে। সেটাই কাল হল তাঁর জীবনে।
রোজ সন্ধ্যাবেলা হরেনদের বাড়ির সামনে রোয়াকে বসে আড্ডা মারত হরেন আর কিঙ্কর। সে দিনও তারা বসে গল্প করছিল। কিঙ্কর বলছিল— 'আর চলছে না, ক'দিনের মধ্যে আর একটা কাজ জোটাতে না পারলে ভাইবোনদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হবে।' কথা বলতে বলতে জল তেষ্টা পেয়েছিল কিঙ্করের। জল আনবার জন্য বাড়ির ভিতর ঢুকেছিল হরেন। ঘরের ভিতর জানলার পাশে রাখা কুঁজো থেকে যখন সে জল গড়াচ্ছিল তখন হরেন দেখতে পেয়েছিল ঠিক রোয়াকের সামনে এসে দাঁড়াল একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি। মুহূর্তের মধ্যে তিনজন লোক নেমে ঘিরে ধরল কিঙ্করকে। সামান্য একটা ধস্তাধস্তির পর দুমদুম করে শব্দ হল আর কিঙ্কর পড়ে গেল মাটিতে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই একজন কোমর থেকে ছুরি বের করে বসিয়ে দিল কিঙ্করের গলায়। তারপর তারা চড়ে বসল গাড়িতে। যে তিনজন কিঙ্করকে মারল তাদের চিনতে না পারলেও আরও একজন গাড়ির সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসে ছিল ঘটনার সময়। গাড়িটা চলে যাবার সময় ল্যাম্পপোস্টের আলো এক ঝলক এসে পড়েছিল গাড়ির জানলার পাশে বসা লোকটার মুখে। আর তাতেই লোকটাকে চিনতে পেরেছিল হরেন। লোকটা হল পানু হালদার। পানু হালদারের ঘটনাটা কিঙ্করের মুখ থেকে শোনা ছিল হরেনের, ফলে মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল তার কাছে।
হরেন হয়ে গেল এই খুনের মামলার প্রধান সাক্ষী। পানু হালদারকে পুলিশ অ্যারেস্ট করল বটে, কিন্তু আদালতে চার্জশিট ঠিকমতো দাখিল না করতে পারায়, তিন মাস পর পানু হালদার জামিনে মুক্তি পেল। তারপর থেকে হরেনের ওপর সাক্ষী না দেবার জন্য ভয় দেখাতে শুরু করল পানু হালদার। হরেন পুলিশকে জানিয়ে ছিল ব্যাপারটা, কিন্তু তারা তা গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেনি। উলটে তারা বলেছে— ‘আপনার কী দরকার ছিল মশাই খুনের মামলায় জড়াবার! আমাদের এত ফোর্স নেই যে আপনাকে দিন রাত পাহারা দিয়ে রাখবে, নিজের ঠেলা আপনাকে নিজেই সামলাতে হবে। তা ছাড়া, খুনের মামলায় সাক্ষীদের ওপর এমন একটু-আধটু হয়েই থাকে।'
এইভাবে বছর তিনেক কেটে গেল। এই সময়ের মধ্যে বার চারেক হরেনকে হাজিরা দিতে হয়েছে আদালতে। প্রতিবারই মামলার শুনানির আগে পানু হালদারের লোকজন হুমকি দিয়েছে তাকে। হরেনকে তার অন্যান্য বন্ধুরা পরামর্শ দিয়েছিল এসব ঝামেলার মধ্যে আর না থাকতে হরেনেরও মাঝে মাঝে মনে হত কী হবে এসব করে, যে গেছে সে তো আর ফিরবে না। কিন্তু, কিঙ্করের গলাকাটা রক্তাক্ত মৃতদেহের কথা মনে পড়লেই হরেনের চোয়ালটা যেন কেমন শক্ত হয়ে যেত। তখন মনে হত— পানু হালদারকে কিছুতেই ছাড়া যাবে না, তার শাস্তি চাই।
আগামীকাল ছিল মামলার শেষ শুনানির দিন। তার ঠিক আগের দিনই খুন হয়ে গেল হরেন। এরকম কিছু যে ঘটতে পারে তা হরেন নিজেও সন্দেহ করেছিল। দিন পাঁচেক আগে পানু হালদারের লোকজন রিভলবার উচিয়ে শেষ বারের মতো সাবধান করতে এসেছিল তাকে। তারা বলেছিল দুদিনের মধ্যে হরেনকে লিখিতভাবে আদালতে জানিয়ে দিতে হবে যে হরেন তার সাক্ষ্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, নইলে দুদিন পর তারা এসে হরেনকে তার বন্ধুর কাছে পাঠিয়ে দেবে। পানু হালদারের লোকদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য তিন দিন আগে বাড়িতে তালা দিয়ে হরেন এসে আশ্রয় নিয়েছিল কলকাতা থেকে একটু দূরে বেলঘরিয়ার এক মেসে। ভেবেছিল সেখানে লুকিয়ে থেকে মামলার দিন হাজির হবে কোর্টে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না, পানু হালদারের চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না হরেন। সে খুন হয়ে গেল।
—এসব কথা ভাবতে ভাবতে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় হরেন বেশ কিছুটা দূরে সার সার আলোকবিন্দু দেখতে পেল। হরেনের মনে হল ওগুলো যেন স্ট্রিট লাইটের আলো। রেললাইন ধরে হাঁটা ছেড়ে হরেন হাঁটতে শুরু করল যে দিকে আলো দেখা যাচ্ছে সে দিকে। মিনিট কুড়ি হাঁটার পর সে বুঝতে পারল তার অনুমানই ঠিক, ওগুলো রাস্তারই আলো। কিছুক্ষণ পর হরেন গিয়ে উপস্থিত হল সেই রাস্তায়। রাস্তা সোজা দুদিকে উত্তর দক্ষিণ বরাবর চলে গেছে। রাস্তাতেও লোকজন নেই। মাথার ওপর ভেপার লাইটের উজ্জ্বল আলোতে সারা রাস্তা আলোকিত। মাঝে মাঝে শুধু ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হুসহুস শব্দ করে বেরিয়ে যাচ্ছে ভারী ভারী লরি। রাস্তার পাশে একটা দোকানের সাইনবোর্ড দেখে রাস্তাটার নাম জানতে পারল হরেন— বিটি রোড।
হরেন রাস্তা ধরে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করল। কারণ, কলকাতা ওই দিকেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে গিয়ে উপস্থিত হল একটা চৌরাস্তার মোড়ে। সেখানে দাঁড়িয়ে হরেন ভাবতে লাগল কীভাবে সে এবার বাড়ি যাবে। হঠাৎ তার কানে এল একটা বাসের হর্নের শব্দ। হরেন যে দিক দিয়ে এল সেদিক থেকে একটা বাস আসছে। মোড় মাথায় বাম্পারের কাছে এসে বাসটা আস্তে হয়ে গেল। হরেন দেখল বাসটায় গায়ে লেখা আছে, বিরাটি ধর্মতলা। আরে, এই বাসটা তো তার বাড়ির কাছ দিয়েই যাবে। হরেনের শরীর এখন পাখির মতো হালকা হয়ে গেছে। বাসটা তার পাশ দিয়ে যাবার সময় টপ করে চলন্ত বাসে উঠে পড়ল সে। বাসে কোনো প্যাসেঞ্জার নেই, শুধু দরজার পাশের সিটে বসে একজন রোগা মতো মাঝবয়সি কনডাক্টর খুচরো পয়সা গুনছে। হরেন গিয়ে বসল ঠিক তার উলটোদিকের সিটে। সিটটা একটু দেবে গেল মাত্র। কী মনে হওয়াতে কনডাক্টার একবার সে দিকে তাকাল, তারপর আবার নিজের মনে পয়সা গুনতে লাগল। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হু হু করে ছুটে চলেছে বাস। হরেন জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে। এক সময় রাতের কলকাতায় প্রবেশ করল বাসটা। ট্রাফিকের ভিড়ে জমজমাট রাস্তাগুলো এখন একেবারে শুনশান। অটোমেটিক ট্রাফিক সিগনালের লাল-সবুজ আলোগুলো এখন শুধু শুধু জ্বলছে আর নিভছে। বাড়ির কাছাকাছি এসে জায়গাটা চিনতে পেরে চলন্ত বাস থেকে লাফ দিল হরেন। রাস্তার ওপর একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল, কিন্তু তার বিন্দুমাত্র লাগল না। রাস্তা থেকে চটপট উঠে দাঁড়াল। ওই তো তার উলটো দিকের রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই ডান দিকে পড়বে তাদের পাড়ার গলির মুখ। ধীরে ধীরে রাস্তাটা পার হয়ে উলটোদিকের ফুটপাতে উঠে এল হরেন। তারপর সামনের দিকে চলতে শুরু করল।
কিছুটা হাঁটার পর তার চোখে পড়ল তার পাড়ার গলির মুখটা। ওই তো গলির ঠিক মুখে পানু হালদারের তিনতলা বাড়িটা। বড় রাস্তার ফুটপাত ছেড়ে সে গলির মুখে পা বাড়াল। পানু হালদারের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ হরেনের মনে হল— আচ্ছা পানু হালদার এখন কী করছে? কথাটা মনে হতেই পানু হালদারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল হরেন। তিনতলা বাড়িটাতে বাইরে থেকে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। হরেনের মনে হল – সে তো এখন অদৃশ্য, ভিতরে ঢুকে দেখাই যাক না সে এখন কী করছে। এই ভেবে বাড়ির লাগোয়া ছোট পাঁচিল টপকে বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ল হরেন।
বাড়ির সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। কীভাবে বাড়ির ভিতর ঢুকবে ভাবল হরেন। তার চোখে পড়ল একটা রেন পাইপ দোতলার ব্যালকনির পাশ দিয়ে নীচের দিকে নেমে এসেছে। রেন পাইপটা বেয়ে গিরগিটির মতন অতি সহজেই ওপরের ব্যালকনিতে উঠে এল। আগে হলে সে কিছুতেই এভাবে ওপরে উঠতে পারত না। কিন্তু এখন পারল। ব্যালকনিতে উঠে হরেন দেখল একটা লম্বা প্যাসেজ চলে গেছে সামনের দিকে। তার দু-পাশে বেশ কয়েকটা ঘর। প্যাসেজটা অন্ধকার হলেও তার শেষ প্রান্ত থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে একটা ক্ষীণ আলো ভেসে আসছে। প্যাসেজ পার হয়ে সেই দরজার সামনে এসে দাঁড়াল হরেন। তারপর দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল ঘরের ভিতরে। হরেন দেখল সেই ঘরের ভিতর কেউ নেই। তবে, সেই ঘরের ভিতর দিয়ে আর একটা ঘরে যাওয়া যায়। আসলে বাইরে থেকে যে আলোটা হরেন দেখতে পেয়েছিল, তা আসছে সেই ভিতরের ঘর থেকেই। সেখান থেকে টুকরো টুকরো কথাবার্তার শব্দও শুনতে পেল হরেন। আস্তে করে দরজার পাল্লা আর একটু ফাঁকা করে প্রথম ঘরটার মধ্যে প্রবেশ করল হরেন। তারপর নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল যে ঘরের ভিতর থেকে আলো ভেসে আসছে তার দরজার পাশে। হরেন উকি মারল ঘরের ভিতর। একটা বিরাট বড় সোফার ওপর লুঙ্গি আর গেঞ্জি গায়ে বসে আছে পানু হালদার। তার পায়ের সামনে শুয়ে আছে বিরাট বড় অ্যালসেশিয়ান কুকুর আর তার বাঁ-দিকে আর একটা সোফায় বসে আছে তিনজন লোক। তাদেরকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল হরেন। এই লোকগুলোই আজ সন্ধ্যাবেলায় মেস বাড়ি থেকে খাবার কিনতে যাবার পথে ধরে নিয়ে গেছিল তাকে। তারপর একটা নির্জন জায়গাতে গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গিয়ে তাকে খুন করে তার লাশটা মাঠের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।
লোকগুলোর সামনে একটা ছোট টেবিলে রাখা আছে কয়েকটা গ্লাস আর একটা পানীয়র খালি বোতল। হরেন ঘরের মধ্যে উকি মারতেই কুকুরটা হঠাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠল— ভুক্-ভুক্। ওমনি সবাই তাকাল দরজার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে স্যাৎ করে দরজার আড়ালে সরে গেল হরেন। পর মুহূর্তে তার মনে হল, তার সরে যাবার কোনো দরকার ছিল না। কারণ সে তো এখন অদৃশ্য। পানু হালদারের কণ্ঠস্বর এবার শুনতে পেল হরেন— ‘দেখ তো শম্ভু, বাইরে কেউ আছে কিনা!' তিনজন লোকের মধ্যে যে লোকটা সব চেয়ে ঢ্যাঙা সে এবার উঠে দাঁড়াল, তারপর কোমর থেকে একটা রিভলবার টেনে বার করে সেটা সামনের দিকে বাগিয়ে ধরে সন্তর্পণে দরজার কাছে এসে বাইরের দিকে উঁকি মারল। সে দেখল কেউ কোথাও নেই, এরপর আবার সে গিয়ে বসল আগের জায়গাতে। রিভলবারটা কিন্তু সে আর কোমরে গুঁজল না। সামনের টেবিলের ওপর সেটা ঠক করে রেখে দিয়ে পানু হালদারের উদ্দেশে বলল— ‘আজকের মতো এটার কাজ শেষ স্যার, দুটো গুলি মাত্র খরচা হয়েছে, বাকি চারটে এর মধ্যেই আছে। এটা এবার তুলে রাখুন স্যার।'
পানু হালদার এবার বলল, 'ব্যাটা নিজেকে বড় বেশি চালাক মনে করেছিল। ভেবেছিল কাল কোর্টে হাজির হয়ে আমার ফাঁসির বন্দোবস্ত করবে। আর এখন হয়তো যম রাজ্যের কোর্টে দাঁড়িয়ে আছে'— এই বলে খ্যা খ্যাঁ করে হেসে উঠল সে।
পানু হালদারের কথা শুনে অন্য তিনজনও এবার হাসতে শুরু করল। হরেন এবার দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করল। হরেন বুঝতে পারল কুকুরটা মনে হয় তার উপস্থিতি টের পেয়েছে। কোন একটা বইতে হরেন পড়েছিল যে অশরীরীদের উপস্থিতি নাকি টের পায় কুকুরেরা। হয়তো সেই কথাটা সত্যি। পানু হালদার বা অন্য লোকগুলো কিন্তু ভ্রুক্ষেপ করল না কুকুরটার ডাকে। হাসি থামবার পর পানু হালদার বলল – 'যাই বল, এবার রেটটা কিন্তু বড্ড বেশি নিলি তোরা, কিঙ্করের সময় দিতে হয়েছিল পঞ্চাশ আর হরেনের বেলাতে একেবারে এক লাফে এক লাখ!'
শম্ভু নামের লোকটা বলল— 'আজকের ব্যাপারটাতে রিস্ক অনেক বেশি ছিল স্যার। একে তো দুদিন ধরে গরু খোঁজার মাতো হরেন কোথায় লুকিয়ে ছিল সেটা খুঁজে বার করতে হয়েছে, তারপর যেখানে সে ছিল সেই জায়গাটা কলকাতা শহরের বাইরে। সেখান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করা সহজ ব্যাপার ছিল না, তারপর লাশটাও তো মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলে আসতে হয়েছে।'
হঠাৎ ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে ঢং ঢং করে দুটো ঘণ্টা বাজল। শম্ভুর পাশে যে লোকটা বসে ছিল সে শম্ভুকে বলল— 'রাত দুটো বাজল, এবার চলো গুরু, কাল আবার আমার একটা কিডন্যাপিং-এর কেস আছে।'
শম্ভু এবার পানু হালদারের উদ্দেশে বলল—‘আমরা তাহলে এখন চলি স্যার।'
পানু হালদার বলল—‘তোদের গাড়িটা কোথায় রেখেছিস?'
শম্ভু জবাব দিল—‘বাড়ির পেছন দিকে।'
পানু হালদার বলল – 'সাবধানে যাস, এত রাতে আবার কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পুলিশের চক্করে পড়িস না। আর যাবার আগে টাইগারকে নিচের কম্পাউন্ডে ছেড়ে রেখে যা।'
শম্ভু তার সঙ্গীদের নিয়ে এবার উঠে দাঁড়াল। তারপর টাইগারের কাছে গিয়ে তার বকলেস ধরে টান দিল। কুকুরটা উঠে দাঁড়াল ঠিকই কিন্তু হরেনের দিকে তাকিয়ে সমানে গর গর করতে লাগল। অনেকটা জোর করেই তাকে টেনে হিঁচড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল শম্ভু। ঘরের বাইরে বেরোবার সময়েও কুকুরটা হরেনের দিকে তাকিয়ে একটা গর্জন করে যেন তার নিজস্ব ভাষায় বলে উঠল— 'সাবধান! কেউ না দেখলেও আমি কিন্তু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি।'
কিছুক্ষণ পর বাড়ির নীচে একটা গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার শব্দ শুনতে পেল হরেন। সে বুঝতে পারল শম্ভু আর তার সঙ্গীরা চলে যাচ্ছে। পানু হালদার এবার সোফা থেকে উঠে হরেনের ঠিক পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে বাইরের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল, তারপর আবার ঘরে ফিরে এসে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে সোফার ওপর গিয়ে বসল। ঘরের চারপাশটা একবার ভালো করে দেখল হরেন। ঘরটা বেশ বড়, ঘরের এক কোনায় জানলার পাশে একটা খাটও পাতা আছে। ঘরটা মনে হয় একদম বাড়ির পেছনের দিকে। জানলার বাইরে দিয়ে দূরে স্ট্রিট লাইটের ঘোলাটে আলো দেখা যাচ্ছে। পানু হালদার এক দৃষ্টিতে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে মনে মনে কী ভাবতে লাগল। ঠোটের কোণে তার ক্রুর হাসি।
পানু হালদারের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে হরেনের মনে জেগে উঠতে লাগল একটা প্রতিশোধ স্পৃহা। হ্যাঁ, এই লোকটার জন্যই খুন হয়েছে কিঙ্কর, খুন হয়েছে হরেন নিজেও, আর কাল এই লোকটাই বেকসুর খালাস হয়ে হাসতে হাসতে বেরোবে কোর্ট থেকে! না, কিছুতেই একে ক্ষমা করা যাবে না। এই লোকটাকে চরম শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু কী ভাবে? হরেন তো এর আগে কোনোদিন মানুষ খুন করেনি, কী করে সে শাস্তি দেবে পানু হালদারকে? পানু হালদারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কথাটা ভাবতে লাগল হরেন। এভাবে বেশ কয়েক মিনিট কেটে গেল। নিস্তব্ধ ঘরে শুধুমাত্র দেওয়াল ঘড়িটার টিক্ টিক্ শব্দ শোনা যাচ্ছে। সারা পাড়ায় লোকজন এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তারা কেউ জানেও না ঠিক এই মুহূর্তে তাদের পাড়ার একটা ছেলের ক্ষতবিক্ষত লাশ অনেক দূরের এক নির্জন মাঠে চাঁদের আলোতে পড়ে আছে। পানু হালদার একইভাবে চেয়ে আছে সিলিং-এর দিকে, আর হরেন চেয়ে আছে তার দিকে।
নিস্তব্ধ ঘরে ঘড়ির টিক্ টিক্ শব্দটা বড় বেশি কানে বাজছে হরেনের। হঠাৎ বাইরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে নীচ থেকে কুকুরটার গর্জন শোনা গেল। পানু হালদার একটু যেন চমকে উঠল।
কুকুরটার গর্জন কিন্তু থামল না, কী মনে করে পানু হালদার সোফা থেকে উঠে জানলার দিকে এগিয়ে গেল। হয়তো জানলা দিয়ে উঁকি মেরে নীচের দিকে দেখবার জন্য। ঠিক তখনই একটা কাণ্ড ঘটল—জানলাটা হঠাৎ দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পানু হালদার ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর। হরেনের মনে হল পানু হালদারকে কেউ যেন ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। এর পরে আরও একটা কাণ্ড ঘটল, টেবিলের ওপর রাখা রিভলবারটা হঠাৎ টেবিল থেকে শূন্যে উঠে গেল, আর তার নলটা সোজা ঘুরে গেল মাটিতে পড়ে থাকা পানু হালদারের দিকে। পানু হালদারের মতো হরেনও বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল রিভলবরটার দিকে। হরেন লক্ষ করল রিভলবারের গায়ে আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে আঙুল, তারপর ফুটে উঠল কবজি, বাহু,... কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষের মূর্তি ঘরের মধ্যে আবির্ভূত হল। মূর্তিটা বড় ভয়ংকর, তার গলার কাছটা বেশ অনেকখানি হাঁ হয়ে আছে, বুকের কাছটাও ছিন্নভিন্ন। সারা দেহ তার রক্তে মাখামাখি আর চোখ দুটো যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। পিস্তল হাতে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে যাচ্ছে পানু হালদারের দিকে। লোকটাকে চিনতে পারল হরেন, –এ তো কিঙ্কর ! !!
হরেন পানু হালদারের দিকে তাকিয়ে দেখল ভয়ে তার চোখের মণি যেন ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। কিঙ্কর যত তার দিকে এগোচ্ছে, সে তত মাটির ওপর দু-হাতে ভর দিয়ে পিছনের দিকে হটছে। হটতে হটতে সে এক সময় ঘরের কোনায় উপস্থিত হল। ঘরের কোনায় রাখা ছিল একটা ব্রোঞ্জের তৈরি মূর্তি। বাঁচবার জন্য একটা শেষ চেষ্টা করল পানু হালদার, হঠাৎ সে তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে মাটি থেকে মূর্তিটা তুলে সজোরে ছুড়ে মারল কিঙ্করকে লক্ষ্য করে। হরেন দেখল মূর্তিটা কিঙ্করের হাওয়ার মতো দেহ ভেদ করে ঝনঝন শব্দে আছড়ে পড়ল অন্যদিকের দেওয়ালে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে রিভলবারের প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়াতে ভরে গেল সারা ঘর। কয়েক মুহূর্ত হরেন আর কিছু দেখতে পেল না। শুধু সে শুনতে পেল খট করে জানলাটা আবার খুলে যাবার শব্দ। ধোঁয়াটা সরে গেলে হরেন দেখল ঘরের কোনায় পড়ে আছে নিস্পন্দ পানু হালদারের দেহ, তার বুকের কাছ থেকে একটা রক্তের ধারা নেমে এসে গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। আর তার হাতের পাশেই পড়ে রয়েছে রিভলবারটা, যেটা একটু আগেই ক্ষত বিক্ষত কিঙ্করের হাতে ধরা ছিল। হরেনের এবার কেমন একটা ভয়-ভয় করতে লাগল। তার একবারও মনে হল না যে সে প্রথম যে সব রকম ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে গেছে, বরঞ্চ সেই এখন অন্যের ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। পানু হালদারের দেহের চারপাশে মেঝের ওপর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে রক্তটা। সেটা দেখে হরেনের মনে হল তার বুকের ভিতরটা কেমন করছে। হরেন আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ঘরের দরজাটা খুলে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে আবার করিডর ধরে ব্যালকনির দিকে দৌড়োল হরেন। তারপর সেখানে এসে তর তর করে রেন পাইপ বেয়ে নীচে নেমে পড়ল। ঠিক সেই সময়েই কোথা থেকে যেন সেই বিরাট অ্যালসেশিয়ান কুকুরটা ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল হরেনের ওপর। হরেন চিত হয়ে পড়ে গেল মাটির ওপর। আর কুকুরটা তার জামার নীচের দিকের একটা অংশ ধরে টানতে শুরু করল। হরেন কুকুরটার হাত থেকে বাঁচবার জন্য চেপে ধরল তার গলাটা, একটা ধস্তাধস্তি শুরু হল দুজনের মধ্যে।
‘ও মশাই শুনছেন! ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছুড়ছেন কেন!' একটা ধাক্কা খেয়ে ঘুমটা ভেঙে গেল হরেনের। চোখ খুলে ধড়মড় করে খাটের ওপর উঠে বসল হরেন। আরে এটা তো সেই মেস বাড়ির ঘরটা, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তার পাশের বেডের মাঝবয়সি ভদ্রলোক। তাহলে এতক্ষণ যা ঘটছিল তা নিছকই স্বপ্ন! মনে মনে ভাবল হরেন।
হরেনের ঘুমটা ভাঙিয়ে দিয়ে নিজের কাজে ঘরের কোনার চলে গেলেন ভদ্রলোক। হরেন নিজের হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল—আটটা বাজতে দশ। তাড়াতাড়ি খাট থেকে নেমে পড়ল হরেন, ঠিক সাড়ে দশটার সময় তাকে কোর্টে হাজিরা দিতে হবে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিল হরেন। একটা সাইড ব্যাগের মধ্যে সে বাড়ি থেকে আসবার সময় কয়েকটা গেঞ্জি-পাজামা এনে ছিল। সেগুলো আবার ব্যাগের মধ্যে পুরে, ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ন-টার আগেই মেস থেকে বেরিয়ে পড়ল। তারপর একটা ট্যাক্সি ধরে সোজা গিয়ে হাজির হল কোর্টে।
এজলাসে ঢুকবার আগে হরেন আর পানু হালদারের মুখোমুখি হতে চাইল না, তাই সে ট্যাক্সিটাকে দাঁড় করাল কোর্টের পেছনের চত্বরে। এ দিকটা একটু ফাঁকা ফাঁকা। খান দুয়েক পুলিশের ভ্যান শুধু একপাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর এক পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানের সামনে চা খেতে খেতে গল্প করছে সাদা প্যান্ট-কালো গাউন গায়ে দেওয়া তিনজন উকিল। হরেনের ঘড়িতে এখন দশটা বেজে পাঁচ, সে ঠিক করল আরও মিনিট কুড়ি এই চায়ের দোকানের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকাই ভালো। কারণ পানু হালদার এতক্ষণে নিশ্চয়ই কোর্টে চলে এসেছে তার দলবল নিয়ে। তাই হরেন প্রথমে গিয়ে ঢুকল চায়ের দোকানের মধ্যে। দোকান থেকে এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট কিনে খেল সে, তারপর ঘড়িতে যখন সাড়ে দশটা বাজতে ঠিক পাঁচ মিনিট বাকি, তখন সে দুরু দুরু বুকে গিয়ে প্রবেশ করল এজলাসের মধ্যে।
হরেন দেখল, এজলাস একদম ফাঁকা, তাহলে কি আজ এজলাস বসবে না! এজলাসের মধ্যে দেওয়ালের পাশে কাঠের বেঞ্চের ওপর একজন লোক বসেছিল, হরেন লোকটাকে চেনে, লোকটা হল সরকার পক্ষের উকিল। এজলাসের ভিতর ঢুকে হরেন গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে হরেনকে দেখেই লোকটা বলে উঠল— 'আপনাদের মামলাটা যে এভাবে শেষ হবে তা কল্পনাও করতে পারিনি!'
হরেন বলল 'তার মানে!'
লোকটা জবাব দিল— 'যার বিরুদ্ধে মামলা, সেই যদি আর বেঁচে না থাকে তাহলে আর কীভাবে মামলা চলবে?'
লোকটার কথা শুনে হরেনের বুকের ভিতরটা কেমন ধক্ করে উঠল, সে লোকটাকে বলল – 'মানে, ব্যাপারটা তো আমি, ঠিক...'
সরকারি উকিল এবার বলে উঠল—কাল রাতে নিজের বাড়িতে গুলির আঘাতে খুন হয়ে গেছে পানু হালদার, আর তার কুকুরটাকেও কে যেন গলা টিপে মেরে ফেলেছে।
হরেন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল— “কে খুন করল পানু হালদারকে?”
হরেনের প্রশ্ন শুনে ভদ্রলোক উত্তর দিল “—যতদূর জানতে পেরেছি মৃত কুকুরটার মুখে সাদা কাপড়ের একটা টুকরো ছাড়া খুনি তার অন্য কোনো সূত্র ছেড়ে যায়নি, তবে সন্দেহের বশে পুলিশ শম্ভু নামে এক সমাজবিরোধী আর তার দুই শাকরেদকে গ্রেপ্তার করেছে। জেরার মুখে তারা নাকি জানিয়েছে গতকাল রাত্রে বিশেষ প্রয়োজনে তারা পানু হালদারের কাছে গেছিল ঠিকই, কিন্তু খুন তারা করেনি৷ পুলিশের ধারণা তাদের পিঠে ডান্ডার বাড়ি পড়লেই পানু হালদারে খুনের ব্যাপারটা তারা স্বীকার করে নেবে।”
পানু হালদারের খুনের ফলে মামলাটার সমাপ্তি ঘটলেও হরেনের বেশ কিছু সই-সাবুদের ব্যাপার ছিল কোর্টে। সে সব শেষ হতে হতে বেলা দুটো বেজে গেল। সরকারি উকিলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ট্যাক্সি চেপে হরেন যখন তার বাড়ির সামনে নামল, তখন বিকাল হতে চলেছে। বাড়ির তালা খুলে ভিতরে ঢুকে সোজা দোতালায় নিজের ঘরে প্রবেশ করল হরেন। ঘরের দরজা জানলা প্রথমে ভালো করে খুলে দিল হরেন। অনেকদিন পরে সে আজ চাপমুক্ত, তবুও মনের মধ্যে কোথায় যেন কী একটা খচখচ করছে। ঘরের ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে জামা-প্যান্ট খুলতে লাগল হরেন। জামাটা খুলে আলনাতে ঝোলাতে যেতেই হঠাৎ তার চোখে পড়ল জামার নীচের দিকের অংশটা। হরেন দেখল তার সাদা জামাটার নীচের দিকের একটা অংশ কে যেন ছিঁড়ে নিয়েছে! এতক্ষণ জামাটা প্যান্টের ভিতর গোঁজা থাকায় ব্যাপারটা হরেন লক্ষ করেনি। কয়েক মিনিট জামাটা হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল হরেন, তারপর জামাটাকে বাড়ির পেছনে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলল সে। তারপর স্নান সেরে অনেকদিন পর বাড়ির সামনের রোয়াকটায় গিয়ে নিশ্চিন্তে বসল হরেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন