মিগুছোগলের পুঁথি

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

আইস-এক্সটা একটা বরফের চাঙড়ে গেঁথে হতাশভাবে শেরপা নামচি বলল, 'আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই অন্ধকার নামবে, তুষার ঝড়ও শুরু হবে। মাথা গোঁজার কোনো জায়গা নেই। কাল দিনের আলো যখন ফুটবে তখন অন্তত পনেরো ফুট নীচে চাপা পড়ে থাকবে আমাদের দেহ। আর কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না।'

নামচির কথা শুনে আমি আর হান্স একবার চারপাশে তাকালাম। যেদিকে চোখ যাচ্ছে, সেদিকেই শুধু বরফ আর বরফ! নেপাল হিমালয়ের উত্তুঙ্গ শিখররাজি রাত্রি নামার প্রতীক্ষায়। কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই। আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি বারো হাজার ফুট উচ্চতায়। তিন হাজার ফুট নীচে ফেলে এসেছি বেসক্যাম্প। গ্লেসিয়ার বেয়ে এখন নীচে নামার চেষ্টা করা মানে সরাসরি মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। আবার সামনে কোন দিকে এগোব তা এখন জানা নেই। পথ হারিয়েছি আমরা। সামনে রাত্রি আসছে। অতএব...।

হান্স রুমেনিয়ার মানুষ। বেশ শক্তপোক্ত ধাঁচের লোক। ইউরোপের বেশ কয়েকটা পিক এক্সপিডিশনে গেছে। পাহাড় বা বরফ ওর কাছে নতুন নয়, কিন্তু তার চোখেও কেমন একটা হতাশার ভাব লক্ষ করলাম। আমার মনে পড়ল রিচেন মনাস্ট্রির অধ্যক্ষ চেন-পো-র সাবধানবাণী, 'আপনারা মিগুছোগল গুম্ফায় যাবেন না। সে পথ বড় দুর্গম। তুষার ঝড়ে বহু মানুষ হারিয়ে গেছে ও পথে। তা ছাড়া ওই গুম্ফায় নানা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। ওখানে আপনাদের না যাওয়াই ভালো।’

মৃদু তুষারপাত শুরু হল। তার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা। কোথায় যাব আমরা? এই দুর্গম বরফাবৃত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম বৃদ্ধ লামা চেন-পো-র কথা শুনলেই ভালো হত। আটঘণ্টা ধরে এই বরফ রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু মিগুছোগল মনাস্ট্রির চিহ্ন কোথাও নেই !

চেন-পো আমাদের সাবধান বাণী শোনালেও তিনি কিন্তু মিগুছোগল মনাস্ট্রির সন্ধানে আমাদের অভিযানের নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আমি বৌদ্ধ শাস্ত্র গবেষক সুকুমার রক্ষিত, আর হান্স, ভেষজ বিজ্ঞানী স্ব-স্ব প্রয়োজনে কিছুদিন আগে নেপালের রিচেন মনাস্ট্রিতে এসেছিলাম মনাস্ট্রির লাইব্রেরিতে কাজ করার জন্য। বেশ কিছু প্রাচীন বৌদ্ধ পুঁথি আছে সেখানে। বলা বাহুল্য সেখানে মঠাধ্যক্ষ চেন-পোর আতিথ্যেই আমরা ছিলাম। একই জায়গাতে থাকা ও লাইব্রেরিতে কাজ করার সূত্রে হান্সের সঙ্গেও আমার পরিচয় সেখানেই। যাই হোক, কাজের জন্য প্রাচীন পুঁথি ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমরা বেশ কয়েকটা পুঁথিতে ‘ব্ৰহ্ম পুঁথি' নামে পালি ভাষায় লিখিত এক পুঁথির উল্লেখ দেখি। যে পুঁথিতে নাকি প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল সহ, বহুবিধ মারণ রোগের ভেষজ প্রতিষেধকের খোঁজ দেওয়া আছে। কৌতূহল নিরসনের জন্য আমরা এ ব্যাপারে চেন-পোকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানান, 'হ্যাঁ, এ পুঁথি সত্যিই আছে নেপাল হিমালয়ের তুষারাবৃত অঞ্চলে অবস্থিত এক মঠে। মঠাধ্যক্ষের নাম মিগুছোগল। তাঁর নাম অনুসারে ওই মঠের নাম। মিগুছোগল অন্ধ মানুষ। অতিবৃদ্ধ। তার বয়স নাকি তিনশো বছর! তিব্বতের প্রাচীন ছোগল রাজবংশে তাঁর জন্ম। “ব্রহ্মপুঁথিও” ওই রাজবংশের সম্পত্তি। আরও দুজন অন্ধ বৃদ্ধ লামাকে নিয়ে তিনি ওই মঠ সেই পুঁথির রক্ষণাবেক্ষণ করেন, আর ব্রহ্মজ্ঞান চর্চা করেন। প্রকৃতি মানুষ জীবজগৎ সম্পর্কে বহু গূঢ় তত্ত্ব লিপিবদ্ধ হয়ে আছে ওই পুঁথিতে।'

লামা-চেন-পোর এ কথা শোনার পরই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর্তব্য ঠিক করে নিয়েছিলাম আমি আর হান্স। ও পুঁথি আমাদের দেখতেই হবে! এরপর আমরা চেন-পোর কাছ থেকে রাস্তা জেনে নিয়ে, তাঁর নিষেধ অগ্রাহ্য করে মাত্র কয়েকদিনের প্রস্তুতিতে রওনা দিয়েছিলাম মিগুছোগলের মঠের সন্ধানে। সঙ্গে নিয়েছিলাম গাইড নামচিকে। ও অনেকদিন আগে একবার এ পথে এসেছিল। দূর থেকে দেখেছিল মঠটা।

তুষারপাত ক্রমশ বাড়ছে। অসহায় আমরা। আমি হতাশ ভাবে বলতে যাচ্ছিলাম, 'তাহলে, এখানে এভাবে মৃত্যুই কি আমাদের ভবিতব্য?' ঠিক সেই সময় হান্স হঠাৎ বলল, “আরে ওই দেখুন কি একটা প্রাণী !’

হান্সের দৃষ্টি অনুসরণ করে আমি আর নামচি তাকিয়ে দেখলাম, আমাদের বেশ কিছুটা দূরে বরফের সঙ্গে প্রায় মিশে দাঁড়িয়ে আছে সাদারঙের এক চতুষ্পদ জন্তু। তুষার ঝড়ের জন্য তাকে ঠিকমতো চেনা না গেলেও মনে হচ্ছে সেটা কুকুরজাতীয় কোনো প্রাণী হবে। দূর থেকে সে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে।

তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে নামচি আমাদের বলল, ‘প্রাণীটাকে অনুসরণ করতে হবে আমাদের। নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোনো গর্তে বা পাহাড়ের ফাটলে ওর আস্তানা। ওর পিছু পিছু গিয়ে সেরকম কোনো আস্তানাতে মাথা গুঁজে তুষারপাতের হাত থেকে রাতে যদি নিজেদের বাঁচাতে পারি তবে শেষ পর্যন্ত আমরা হয়তো বেঁচে যাব।' এই বলে সে আইস অ্যাক্সটা তুলে নিয়ে যেদিকে প্রাণীটা সেদিকে এগোল। প্রাণীটাও চলতে শুরু করল সঙ্গে সঙ্গে। আমরাও এগোলাম।

প্রাণীটা ধীর গতিতে চলছে। মাঝে মাঝে থামছে। পিছনে তাকাচ্ছে। আবার চলছে। তুষার পাতের মধ্যে দিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে আমরাও তাকে অনুসরণ করছি। কোনদিকে চলছি আমাদের কোনো ধারণা নেই। বরফের ঢাল বেয়ে এক সময় ওপরে উঠতে শুরু করল প্রাণীটা। আমরাও তাই করলাম, বেশ উঁচু ঢাল। পা ফসকালেই কয়েক হাজার ফুট নীচে গড়িয়ে পড়তে হবে। অতি সাবধানে আমরা উঠতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওপরে ওঠার পর আমরা যখন ঢালের মাথায় প্রায় পৌঁছে গেছি, ঠিক তখনই কোথায় যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল প্রাণীটা।

দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। হান্স প্রায় আর্তনাদের স্বরে বলে উঠল, 'যাঃ, এবার কী হবে?'

নামচি বলল, 'পিছনে ফিরে তো লাভ নেই। ঢালের মাথায় ওঠা যাক। তারপর কপালে যা আছে হবে।'

তার কথা শুনে অবসন্ন শরীরগুলো নিয়ে কোনোরকমে ওপর দিকে এগোতে থাকলাম আমরা। যা হোক কোনোরকমে এক সময় ওপরে আমরা উঠে এলাম। ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তুষারপাত হঠাৎ যেন বন্ধ হয়ে গেল। আর তারপরই সামনে তাকিয়ে আমরা যা দেখলাম তাতে আনন্দে কিছুক্ষণের জন্য কথা হারিয়ে ফেললাম আমরা। তিনদিকে পাহাড়ের ঢালের মধ্যে বরফাবৃত চত্বরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নপ্রায় এক প্রাচীন মনাস্ট্রি। তার ঢালু ছাদ বরফে ঢেকে গেছে। চারপাশে শুধু বরফ আর বরফ। সম্ভবত এটাই সেই মিগুছোগল গুম্ফা। যার খোঁজে মৃত্যুমুখে পতিত হতে চলেছিলাম আমরা! সেই প্রাণীটাকেও আবার দেখতে পেলাম। মঠের তোরণের সামনে দাঁড়িয়েছিল সে, তারপর ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। সম্ভবত মঠের পোষা কুকুর হবে। ওই তাহলে আমাদের পথ দেখিয়ে এখানে এনেছে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার পর এগোলাম মনাস্ট্রির দিকে।

মনাস্ট্রির সামনে ছোট্ট চত্বরটায় দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা চোর্তেন বা ধর্মীয় স্তম্ভ। সেগুলোও চত্বরের মতোই বরফে মোড়া। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম মনাস্ট্রিটা যত প্রাচীন মনে হয়েছিল আসলে তা তার চেয়ে প্রাচীন। স্থানে স্থানে পাথর-কাঠ খসে পড়েছে। বিবর্ণ হয়ে গেছে মন্দির গাত্রের অলংকরণ। মনাস্ট্রি প্রবেশদ্বারের দু-পাশে পাথুরে খিলানে খোদিত আছে নৃ-মুণ্ডমালা শোভিত বিকট দর্শন মূর্তি। তাদের দেহের নানা স্থানও খসে পড়েছে। তবে তার জন্য সম্ভবত ওই বিকট মূর্তি দুটোর বীভৎসতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গুম্ফার মাথায় বাতাসে উড়ছে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া শতচ্ছিন্ন এক ধর্মীয় পতাকা বা লুংদার।

আমরা চত্বর পেরিয়ে মনাস্ট্রির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন মুণ্ডিত মস্তক, ন্যুব্জ, অতিবৃদ্ধ মানুষ। পরনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মতো লাল চাদর আর সারং। অসংখ্য বলিরেখা আঁকা তার মুখে। আর তার পিছন পিছন বেরিয়ে এলেন আরও দুজন, তাঁরাও মুণ্ডিত মস্তক, বয়ঃবৃদ্ধ। তবে তাদের পরনে সাদা পোশাক। তাঁদের দৃষ্টি দেখে আমরা একটা জিনিস বুঝতে পারলাম যে তাঁরা তিনজনই অন্ধ।

আমাদের উপস্থিতি অনুভব করলেন তাঁরা। মুহূর্তখানেক চুপ করে থাকার পর প্রথমে আগত লামা আমাদের উদ্দেশে বললেন, ‘এই প্রাচীন গুম্ফায় মিগুছোগল আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছে।' তিব্বতি ভাষায় তিনি কথা বললেও, পেশা গত কারণে ভাষাটা আমাদের জানা। তাই তাঁর কথা বুঝতে পারলাম আমরা। বুঝতে পারলাম তিনিই লামা মিগুছোগল।

এরপর আমরা আমাদের পরিচয় দিয়ে যখন আমাদের আসার কারণ ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছি তখন তিনি আমাদের অবাক করে দিয়ে বললেন, 'আমি জানি আপনারা এসেছেন ব্রহ্মপুঁথির জন্য। হ্যাঁ ও পুঁথি এ-মঠেই রক্ষিত আছে। আপনারা দেখতে পাবেন সে পুঁথি। ভিতরে আসুন।'

শুনেছি অনেক তিব্বতিলামা নাকি দৈব ক্ষমতা সম্পন্ন হন। মিগুছোগল হয়তো সেই ক্ষমতার অধিকারী।

মিগুছোগল আমাদের নিয়ে মঠের ভিতর প্রবেশ করলেন। অতি প্রাচীন মঠ। বহুবিধ প্রাচীন শিল্পবস্তু ছড়িয়ে আছে ভিতরে। প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি, বিভিন্ন চিত্রকলা, সোনা রুপোর কাজকরা সিল্কের থাংকা, জপযন্ত্র আরও কত কিছু! একটা ঘরে এনে তোলা হল আমাদের। মিগুছোগল বললেন, 'এই আপনাদের রাত্রিবাসের জায়গা। খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিন। তারপর সে পুঁথি দেখতে পাবেন আপনারা।’ এই বলে মিগুছোগল অন্তর্হিত হলেন। ঘরে রয়েছে কাঠের তৈরি কিছু আসবাব। আর রয়েছে একটা চর্বির তেলের প্রদীপ। সে আলো ছড়াচ্ছে ঘরে।

কিছুক্ষণ পরে মিগুছোগলের সঙ্গী সাদা পোশাক পরা লামা দুজন ঘরে খাবার দিয়ে গেল। খাবার দেবার সময় লক্ষ করলাম, লামা দুজনের হাতে বিরাট বিরাট বাঁকানো নখ। সম্ভবত বহু যুগ নখ কাটেননি তাঁরা। মাখনের মণ্ড দেওয়া দইয়ের মতো খাবার বেশ তৃপ্তি করে খেলাম। দেহে বল এল, খাওয়ার পর জানলায় দাঁড়িয়ে নামচি আমাদের বলল, ‘সাহেব কি অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, চারপাশের পাহাড়ে তুষার ঝড় হচ্ছে, কিন্তু মঠের চত্বরে কোনো ঝড় নেই!'

জানলার কাছে গিয়ে আমরাও দেখলাম ব্যাপারটা। সত্যি বড় অদ্ভুত ব্যাপার! যেন কোন জাদুমন্ত্রে ঝড় প্রবেশ করতে পারছে না মঠ চত্বরে। কেউ যেন মঠের চারপাশে অদৃশ্য দেওয়াল তুলে ঝড়ের গতি রুদ্ধ করে দিয়েছে! এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে ঝুপ করে অন্ধকার নামল। তার সঙ্গে সঙ্গে কাচের শার্সির ফাঁক গলে ঘরে প্রবেশ করতে লাগল সুতীক্ষ্ণ ঠান্ডা বাতাস। তার থেকে বাঁচার জন্য আমরা তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে দিলাম। তারপর প্রদীপের আলোতে লামা মিগুছোগলের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম।

বেশ কিছুক্ষণ পর মিগুছোগল ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে স্বযত্নে ধরা রেশম কাপড়ে মোড়া একটা জিনিস। সেটা যে একটা পুঁথি তা তার আকার দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ব্রহ্ম পুঁথি! লামার হাতে ওটা দেখেই রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। ওর টানেই তো মৃত্যুর হাতছানি উপেক্ষা করে এত দূরে ছুটে এসেছি।

লামা পুঁথিটা যত্ন করে টেবিলে নামিয়ে রেখে আমাদের উদ্দেশে বললেন, 'আপনাদের দেখার জন্য পুঁথিটা রেখে যাচ্ছি। এ বড় অমূল্য সম্পদ। তবে আপনারা এখানে আসতে দেরি করে ফেলেছেন। মাত্র একদিন আপনারা এ পুঁথি দেখার সুযোগ পাবেন। বহু যুগ আমরা এ মঠে কাটিয়েছি। মাত্র কালকের দিনটা, তারপরই আমরা এ মঠ চিরদিনের মতো পরিত্যাগ করে চলে যাব হিমালয়ের আরও গভীরে। আরও কঠিনতম তপস্যার জন্য। যে স্থান সাধারণ মানুষের পক্ষে অগম্য।'

তাঁর কথা শুনে আমি জানতে চাইলাম, 'আচ্ছা, এ পুঁথিতে সত্যিই এমন কিছু কি লেখা আছে যা সাধারণ মানুষের অজানা ?'

মিগুছোগল বললেন, 'হ্যাঁ। এ পুঁথির প্রথম অংশে বিবৃত আছে ব্রহ্মজ্ঞান, প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলার তত্ত্ব। তবে তা বোঝার জন্য বিশেষ জ্ঞান ও অনুশীলনের প্রয়োজন। আর দ্বিতীয় তাংশে আছে বিভিন্ন ওষধির কথা। দ্বিতীয় অংশটা হয়তো আপনাদের কাজে লাগতে পারে।'

হান্স শুনে বলল, “কিছু মনে করবেন না, আপনাকে একটা কথা বলি, এ পুঁথি আপনারা সাধারণ লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখেছেন কেন? আপনাদের কথা যদি ঠিক হয় তবে এ পুঁথি থেকে তো মানুষের প্রভূত উপকারের সম্ভাবনা আছে।’

হান্সের বক্তব্য শুনে বৃদ্ধ লামা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, 'হ্যাঁ, আপনার কথা হয়তো সত্যি, কিন্তু প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলার যে অসীম ক্ষমতা এ পুঁথির আছে, তা ধ্বংসের কাজেও ব্যবহার করা যায়। তাই লোকচক্ষুর অন্তরালে এ পুঁথি স্বযত্নে রক্ষা করেছি আমরা। বলা যেতে পারে, আপনারাই বাইরের পৃথিবীর প্রথম মানুষ যারা এই পুঁথি দেখার সৌভাগ্য অর্জন করবেন। এত কষ্ট করে আপনারা এসেছেন তাই আর আপনাদের ফেরালাম না। এরপর কোনো মানুষ আর এ পুঁথির হদিশ পাবে না।' আর কোনো কথা বললেন না লামা, পুঁথি রেখে ঘর ছেড়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন।

মিগুছোগল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তেই সাগ্রহে আলোতে পুঁথি নিয়ে টেবিলে বসে পড়লাম আমরা। রেশমের আবরণ উন্মোচন করতেই বেরিয়ে পড়ল তুলোট কাগজে লেখা সেই পুঁথি। থরেথরে সাজানো বেশ কয়েক হাজার পৃষ্ঠা। একটা অদ্ভুত প্রাচীন গন্ধ ছড়াচ্ছে তার থেকে। অতি যত্নে পৃষ্ঠাগুলো ঘাঁটতে শুরু করলাম। সময় এগিয়ে চলতে লাগল। কালো কালির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হরফ। ভাষাটা আমরা পাঠ করতে পারছি ঠিকই, তবে কিছুতেই তার মর্ম উদ্ধার করতে পারছি না। ঘণ্টা পাঁচেকের ব্যর্থ চেষ্টার পর পুঁথির প্রথম অংশের কিছুই বুঝতে না পেরে একসময় অধৈর্য হয়ে টেবিল ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেলাম জানলার কাছে। প্রদীপের চর্বি পুড়ে একটা ধোঁয়া আর কটু গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে ঘরের মধ্যে। জানলাটা খুললে যদি বাইরের বাতাসে ঘরের বদ্ধ বাতাসটা কেটে গিয়ে মনটা একটু চনমনে হয় সে জন্য। জানলা খুললাম আমি। হান্স আর নামচিও সম্ভবত এক ঝলক তাজা বাতাস নেবার জন্য আমার কাছে এসে দাঁড়াল। জানালা খুলতেই প্রথমে আমাদের চোখে পড়ল জ্যোৎস্না আলোকিত বরফাবৃত পাহাড়শ্রেণির অপূর্ব দৃশ্য। মেঘমুক্ত আকাশে রুপালি চাঁদের আলোতে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আর এরপরই আমরা দেখতে পেলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য। আমাদের জানলার কিছু দূরে মঠের সামনের চত্বরে বরফ ঢাকা একটা স্তম্ভের নীচে বসে আছেন মিগুছোগল। সম্ভবত তিনি ধ্যানস্থ। আর তার দু-পাশে পাথরে মূর্তির মতো বরফের ওপর বসে আছে বিরাট শ্বেতকায় দুটো কুকুর! চাঁদের আলোতে ধবধব করছে তাদের শরীর। যেন জ্যোৎস্না চুঁইয়ে পড়ছে তাদের দেহ থেকে। বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাদের দেখার পর হান্স বলল, 'কুকুর দুটোকে দেখেছ, কী বিশাল আর সুন্দর দেখতে!'

আমি তার কথায় সহমত প্রকাশ করার আগেই নামচি বলল, ‘সাহেব ওগুলো কিন্তু কুকুর নয়,হওগুলো তুষার নেকড়ে! খুব হিংস্র প্রাণী। আমি ভুল বলছি না। ও প্রাণী আমি আগে দেখেছি।' তার কথা শুনে চমকে উঠলাম আমরা। তার মানে কি মিগুছোগল এমন কোনো জ্ঞানের অধিকারী যার দ্বারা হিংস্র প্রাণীকে বশ মানানো যায়? আর এ জ্ঞানের আধার কি এই ব্রহ্ম পুঁথি? ব্যাপারটা চিন্তা করতে লাগলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ এরপর আমরা জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ঘরে আবার ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে শুরু করেছে। জানলা বন্ধ করে আমরা আবার ফিরে এসে বসলাম আগের জায়গাতে।

এবার আমরা দেখতে শুরু করলাম পুঁথির দ্বিতীয় অংশ। দেখলাম এ অংশ আমরা বেশ বুঝতে পারছি। বিভিন্ন ভেষজ ওষধির কথা বিবৃত এ অংশে। কোন রোগে কি গাছগাছড়া প্রয়োজন ও তাদের উৎস সন্ধানও বিবৃত আছে পাতার পর পাতায়। বেশ কিছু মারণ রোগের প্রতিষেধক, বিজ্ঞান যা এখনও আবিষ্কার করতে পারেনি তার খোঁজও দেওয়া আছে পুঁথিতে। কৌতূহলের সঙ্গে আমরা এক একটা পাতা উলটাতে লাগলাম আর বিস্মিত হতে থাকলাম। সারা রাত যে কীভাবে কেটে গেল আমাদের তা বুঝতেই পারলাম না। এক সময় দেখি হাতঘড়িতে ভোর পাঁচটা বাজে। অথচ পুঁথির সিকি ভাগ পাতাও পাঠ করতে পারিনি আমরা। আমি তাই হান্সকে বললাম, ‘এ পুঁথির বেশির ভাগটাই অপাঠ্য থেকে যাবে আমাদের কাছে। হাতে তো মাত্র একটা দিন। নোটটোট নেওয়া কিছুই করা যাবে না ৷’

হান্স পুঁথির থেকে চোখ সরিয়ে কী যেন ভাবছিল, আমার কথা শুনে হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘সব করা যাবে। কিছুতেই এ পুঁথি আর হাতছাড়া করব না আমি।'

আমি বললাম, 'মানে?'

সে এবার একটু ইতস্তত করে আমাকে চমকে দিয়ে বলল, 'আমি ঠিক করেছি, এ পুঁথি নিয়ে আমরা চলে যাব। মাত্র তিনজন লোক। তা-ও আবার অন্ধ বৃদ্ধ। আমাদের বাধা দেবার কেউ নেই। বাইরে আলো ফুটলেই এ কাজ করার চেষ্টা করব।'

আমি উত্তেজিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, 'তার মানে আমরা লামাদের অসহায়তার, সরলতার সুযোগ নিয়ে চুরি করব? না, এ হতে পারে না। এ পুঁথি মঠের সম্পত্তি। এটা নিয়ে ওরা যা করে করুক।'

নামচিও আমার কথা সমর্থন করে বলল, 'সাহেব ঠিকই বলেছেন। তা ছাড়া এ কাজে পাপ হবে।'

হান্স বলল, 'না, এ পুঁথি নিয়ে যা খুশি করতে দেওয়া যায় না। হয়তো ওরা এ অমূল্য পুঁথিকে ধ্বংস করে ফেলবে। বহু অমূল্য গাছগাছড়ার সন্ধান আছে এতে যা চিকিৎসাশাস্ত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। আর এ পুঁথির মূল্য কত হতে পারে ধারণা আছে? বিলিয়ন ডলার! ওই টাকা পেলে আমরা আরও ভালো গবেষণা করতে পারব। নামচিকেও আর পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে হবে না। পায়ের ওপর পা তুলে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে।'

তার এই কথা শোনার পর নামচিরও মুহূর্তের মধ্যে যেন মত পরিবর্তন ঘটে গেল। সে বলল, ‘তেমন হলে আমি রাজি আছি।'

আমি তবুও প্রতিবাদ করে বললাম, 'না আমি তবুও রাজি নই। আমি সঙ্গে পুঁথি নিয়ে যেতে দেব না, আমরা চোরের দল নই।'

হান্সও এবার উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'তাহলে আপনি এই বরফের রাজ্যে পচে মরুন। অথবা ওই লামাদের সঙ্গে হিমালয়ে পাড়ি দিন। আপনি তো দেখছি চোখ থাকতেও লামাদের মতোই অন্ধ! এ পুঁথি আমি নিয়ে যাবই।’ বেশ রূঢ় শোনাল তার কণ্ঠস্বর।

তার কথা শুনে আমি যেন কী বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই টেবিলটা কীসের ধাক্কায় যেন নড়ে উঠল। তারপর আমাদের চমকে দিয়ে টেবিলের নীচ থেকে বেরিয়ে এল বিরাট বড় একটা প্রাণী। মিগুছোগলের সঙ্গে যাদের দেখেছিলাম, ঠিক সেরকম একটা তুষার নেকড়ে।

টেবিলের পাশ থেকে ছিটকে সরে এসে আতঙ্কে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিন্তু প্রাণীটা আমাদের আক্রমণ করল না। আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। প্রাণীটা চলে যাবার পর হান্স প্রথমে বলল, 'প্রাণীটা হঠাৎ দেখা দিয়ে বেশ চমকে দিল। সম্ভবত যখন আমরা পুঁথিতে মগ্ন ছিলাম, তখন খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে ও টেবিলের নীচে আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা খেয়াল করিনি। বাইরে দিনের আলো ফুটবে বলে চলে গেল।' এ কথা বলার পর সে আমার উদ্দেশে বলল, 'আপনি কী করবেন সিদ্ধান্ত নিন। আমি নামচিকে নিয়ে বাইরেটা একবার দেখে আসি।' কথাগুলো বলে নামচিকে নিয়ে ঘর থেকে হান্স বেরিয়ে গেল।

আমি খোলা পুঁথির সামনে বসে ভাবতে লাগলাম, 'কী করব?’ ওদের সঙ্গে পুঁথি নিয়ে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। আবার ওরা চলে গেলে এই বরফের রাজ্য থেকে আমি ফিরব কী ভাবে?

আধ ঘণ্টা পর তারা আবার ঘরে ফিরে এল। উৎফুল্ল হান্স বলল, 'বাইরে আলো ফুটেছে। তুষারপাতও আর হচ্ছে না। আমাদের বেসক্যাম্পে নামার অন্য একটা পথও দেখতে পেয়েছি। আমরা দ্রুত নেমে যাব। রাত্রি জাগরণের পর মিগুছোগল আর তার সঙ্গীরা মনে হয় ঘুমোচ্ছেন, কোথাও তাদের সাড়া পেলাম না। নেকড়ে দুটোও মনে হয় চলে গেছে। এই সুযোগ...।' এ কথা বলে হান্স পুঁথিটাকে টেবিল থেকে তুলে নিয়ে এগোল দরজার দিকে। তার সঙ্গে সঙ্গে নামচি।

আমি তাদের শেষ বারের জন্য নিরস্ত্র করার চেষ্টায় বলে উঠলাম, 'ভেবে দেখুন, কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?' আমার কথার জবাবে ঘর ছেড়ে বেরোতে বেরোতে হান্স বলল, 'আপনার ইচ্ছা হলে আমাদের সঙ্গে আসুন নইলে ঘরেই থাকুন। আর ফিরতে পারবেন না আপনি।' হান্সের শেষ কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন আতঙ্ক সৃষ্টি হল আমার মনে। অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাদের অনুসরণ করলাম আমি।

মনাস্ট্রি ছেড়ে আমরা পা রাখলাম বরফাবৃত চত্বরে। সূর্যোদয় হয়েছে। তুষারপাত বন্ধ ভোরের আলোতে ঝলমল করছে চত্বরকে ঘিরে রাখা তুষার আবৃত পাহাড়শ্রেণি। বেশ শান্ত পরিবেশ। চারপাশে কেউ নেই। আমার কিছুটা আগে পুঁথি নিয়ে হান্স আর নামচি, তাদের কয়েকপা পিছনে আমি। নিঃশব্দে আমরা চত্বরটা পার হচ্ছি। আমরা যখন চত্বরের ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে গেছি ঠিক তখনই আমাদের কানে এল একটা গলা! আপনারা কি পুঁথিটা নিয়ে চলে যাচ্ছেন?'

কণ্ঠস্বর শুনে চমকে পিছনে ফিরে দেখি মনাস্ট্রির দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন মিগুছোগল। তার দু-পাশে তাঁর সঙ্গী দুই লামা।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। প্রশ্নকর্তাকে বেশ শান্তই মনে হল, তবে তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছে।

হান্স, একটু ইতস্তত করে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, যাচ্ছি।'

মিগুছোগল শুনে শান্ত ভাবেই বলল, ‘আমরা অন্ধ, অশক্ত বৃদ্ধ। আপনারা পুঁথিটা নিয়ে যেতে চাইলে আপনাদের বাধা দেবার ক্ষমতা নেই। তবে যাবার আগে একটা অনুরোধ আছে। অন্ধ হয়ে যাবার পর দীর্ঘ দিন ও পুঁথি পাঠে বঞ্চিত আমি। আমার সহকারীদেরও ক্ষমতা নেই। আপনি পুঁথির প্রথমাংশের অর্থ নির্ণয় করতে না পারলেও পাঠে নিশ্চয়ই সক্ষম। আমার অনুরোধ, আপনারা চলে যাবার আগে যদি ও পুঁথির কিছু অংশ পাঠ করে আমাকে শোনান।

মিগুছোগলের অনুরোধ শুনে চুপ করে কী সিদ্ধান্ত নেবে তা সম্ভবত ভাবতে লাগল হাল। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে মিগুছোগল এরপর বললেন, 'এতে আপনার উপকার হবে। আমার সাহায্য ছাড়া ব্রহ্মপুঁথির গূঢ় তত্ত্বের অর্থ উদ্ধার করতে পারবেন না আপনি। আপনাকে আমি অর্থ বুঝিয়ে দেব। নিন পুঁথিটা খুলুন। প্রথম অংশের অষ্টাদশ পৃষ্ঠা থেকে পাঠ শুরু করুন। বেশ শান্ত সমাহিত স্বরে অতিবৃদ্ধ লামা কথাগুলো বললেও আমার মনে হল তার মধ্যে কোথার যেন একটা প্রচ্ছন্ন নির্দেশ আছে। কানের মধ্যে মিগুছোগলের কথাগুলো কেমন যেন অনুরণন সৃষ্টি করছে।

দেখলাম কয়েক মুহূর্ত মিগুছোগলের দিকে তাকিয়ে থাকার পর হান্স পুঁথিটা খুলে ফেলল, তারপর সম্ভবত অষ্টাদশ পৃষ্ঠা খুঁজে নিয়ে পাঠ করতে শুরু করল। ঠিক সেই সময় আবার কোথা থেকে যেন মৃদু তুষার পাত শুরু হল। ধীরে ধীরে পাঠ করছে হান্স। মিগুছোগল এক সময় বলে উঠলেন, 'আরও জোরে, আরও জোরে পাঠ করুন। আপনার পাঠ আমি ঠিক মতো শুনতে পাচ্ছি না। দেখলাম তাঁর নির্দেশ মেনে উচ্চস্বরে পাঠ করতে শুরু করল হান্স। তুষারপাত মুহূর্তে মুহূর্তে যেন বেড়ে চলেছে, আর তার সঙ্গে যেন বাতাসও বাড়ছে। আমাদের দেহের ওপর পেঁজা তুলোর মতো বরফ জমছে। আর তার মধ্যে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে পুঁথি পাঠ করে চলেছে হান্স আর আলোও যেন চারপাশে কমতে শুরু করেছে হঠাৎ।

আমার কেন যেন এবার ভয় ভয় লাগল। আমার এরপর হঠাৎ চোখ পড়ল মনাস্ট্রির চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোর দিকে পাহাড়গুলো যেন কাঁপছে। একটা গুড়গুড় শব্দ আর প্রচণ্ড বাতাস এগিয়ে আসছে সেদিক থেকে। আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। হঠাৎ আমার মনে হল, হান্সের পুঁথি পাঠ সত্যি সত্যিই প্রকৃতিকে জাগিয়ে তুলছে। ব্রহ্মপুঁথির গূঢ় অর্থ কি শব্দ ব্রহ্মা? তাই কি মিগুছোগল উচ্চস্বরে পুঁথি পাঠ করতে বললেন? হান্সের কোনো কিছুই খেয়াল নেই। সে যেন সম্মোহিতের মতো আরও উঁচু থেকে উঁচু গলায় পাঠ করে চলেছে। তার কাছে নামচি সে-ও যেন বাহ্যজ্ঞানহীন পাথরের মূর্তি। না হান্সকে থামাতেই হবে। আমি চিৎকার করে থামাতে গেলাম কিন্তু বাতাসের ঝাপটা আমার গলার শব্দ মুছে দিল। একটা প্রচণ্ড ঝড় হঠাৎ এরপর হান্সের হাত থেকে পুঁথিটাকে ছিটকে দিল। রাশি রাশি পুঁথির পাতা উড়তে লাগল প্রবল বাতাসে। স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে হান্স। আর এরপরই ঝড়ের মধ্যে অট্টহাসির শব্দ শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে অট্টহাস্য করছেন লামা মিগুছোগল। আর তার দু-পাশে সেই লামাদের জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট দুটো তুষার নেকড়ে! লাল জিভ আর হিংস্র সাদা দাঁত বার করে তারাও যেন হাসছে। আশেপাশের স্তম্ভগুলোর বরফ খসে পড়ে পড়ে তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে বীভৎস সব মূর্তি। কান ফাটানো ঝড়ের শব্দ। দেখলাম আশেপাশের পাহাড় থেকে লক্ষ লক্ষ টন বরফের চাঁই নীচে মনাস্ট্রি চত্বরের দিকে ঝড়ের গতিতে নেমে আসছে আমাদের পিষে ফেলার জন্য! আর তার মধ্যে শোনা যাচ্ছে লামা মিগুছোগলের রক্ত জল করা হাসি। ঝড়ের ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম আমি। মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার নেমে এল চোখে। জ্ঞান হারাবার আগে শুধু শুনতে পেলাম মিগুছোগলের হাসির অনুরণন।

একদিন পর আমাদের বেস ক্যাম্পের কাছে মৃতপ্রায় অবস্থায় আমাকে উদ্ধার করে ক্যাম্পের লোকেরা। তুষার ঝড়ে ওপর থেকে এত নীচে গড়িয়ে পড়ে কীভাবে বাঁচলাম তা জানি না। একদিন পর একটা বড় দল আবার ওপরে উঠল হান্সের খোঁজে। কিন্তু তখন সেখানে হান্স, নামচি বা মিগুছোগল গুম্ফার কোনো চিহ্নই নেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%