তুবড়ি বাঁশি

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

শব্দটা কানে আসতেই বালিশে আধশোয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে জানলার বাইরে তাকালেন কেদার মল্লিক। খোলা জানলা দিয়ে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে। ‘বাঘমুণ্ডি পাহাড়। নির্জন, নিস্তব্ধ দুপুরে পাহাড়ের ওদিক থেকেই ভেসে আসছে ছন্দবদ্ধ, সুরেলা শব্দটা। ও বাঁশিকে কেউ বলে ‘বীন' কেউ বলে ‘তুবড়ি বাঁশি'। পেট ফোলা ওই বাঁশি বাজিয়ে সাপুড়েরা সাপ খেলা দেখায়। ও বাঁশির তালে তালে সাপরা মাথা দোলায়। কেউ কেউ অবশ্য বলেন যে, শব্দ নয়, সাপুড়ে আর ওই পেট মোটা লম্বা বাঁশির এপাশ-ওপাশ নড়াচড়া দেখেই মাথা নাড়ায় সাপ। এ দুইয়ের মধ্যে কোনটা সত্যি তা জানা না থাকলেও ও বাঁশি বাজিয়ে সাপ নাচাতে দেখেছেন কেদারবাবু। ছেলেবেলায় তাদের উত্তর কলকাতার বাড়িতে মাঝে মাঝে বেদে-সাপুড়েরা সাপ খেলা দেখাতে আসত। কলকাতায় মনুমেন্টের তলায়, ছোট রেল প্লাটফর্মেও বাঁশি বাজিয়ে সাপ খেলা দেখাতে দেখেছেন তিনি। তাই তুবড়ি বাঁশির শব্দ তার চেনা।

‘হ্যাঁ, শব্দটা সাপের বাঁশিরই। তাহলে যে খবরটা দিয়েছিল সে মিথ্যা বলেনি। লোকটাও তো বাঘমুণ্ডি পাহাড়ের কোলে এই রিসর্টে বসেই প্রথম শুনেছিল বাঁশির শব্দটা। তারপর সে শব্দ অনুসরণ করে সাপখেলা দেখতে গেছিল। হয়তো তাহলে আমার শখটা পূর্ণ হবে। কলকাতা থেকে এতদূর ছুটে আসাটা বৃথা হবে না।'—মনে মনে ভাবলেন কেদারবাবু। অনেক মানুষের নানা জিনিস জমানো বা সংগ্রহ করার শখ বা নেশা থাকে। এ নেশা বড় মারাত্মক, একবার এর পাল্লায় পড়লে এ নেশা বেড়েই চলে। রাজাবাদশা থেকে সাধারণ মানুষ একবার এই শখের কবলে পড়লে এ নেশা তাকে সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আরও নতুন কিছু জিনিস সংগ্রহর সন্ধানে। নানা জায়গাতে অভিষ্ট জিনিসের খোঁজে দৌড় ঝাঁপ, টাকাপয়সা খরচ এমনকী কোনো কোনো সময় জিনিস সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপদের ঝুঁকির চেয়ে সংগ্রাহকদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্ব পায় তার শখটা। নিজেদের সাধ্য আর ক্ষমতা মতো কোনো সংগ্রাহক সংগ্রহ করেন দেশলাই বাক্স, ডাক টিকিট বা মুদ্রা, কেউ বা জমান গণেশ মূর্তি, বুদ্ধমূর্তি, মুখোশ বা ছবি। এমনকী বিদেশে নাকি এমন কিছু সংগ্রাহক আছেন যাদের শখ বা হবি হল হিংস্র পশু-পাখি সংগ্রহ করা। যুগ যুগ ধরে মানুষের এ নেশা চলে আসছে। আকবর বাদশার শখ ছিল গঞ্জিফা তাস সংগ্রহর। সম্রাট নেপোলিয়নের বাতিক ছিল নস্যির কৌটো জমানোর। আকবর বাদশা না হলেও কেদারবাবুর ঠাকুর্দা জমাতেন ‘পকেট ওয়াচ' বা 'ট্যাক ঘড়ি'। বাবা জমাতেন দেশ-বিদেশের ‘ফাউন্টেন পেন'। বংশানুক্রমে হয়তো তাই নির্দিষ্ট একটা জিনিস সংগ্রহর নেশা দীর্ঘদিন ধরে কেদার মল্লিককে পেয়ে বসেছে। তবে সে জিনিস, মূর্তি, মুখোশ, ট্যাকঘড়ি বা কলম নয়, তা অন্যকিছু। যে কারণে তিনি বৈশাখ মাসে প্রবল গরমের মধ্যেও কলকাতা ছেড়ে পুরুলিয়ার এই বাঘমুণ্ডি পাহাড়ে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তবে তার এই নেশার কথা কেদারবাবুর অ্যাসিস্টেন্ট ভানুলাল আর ঘনিষ্ঠ দু-চারজন লোক ছাড়া বিশেষ কেউ জানে না। কেদারবাবু তার সংগ্রহ নিয়ে কোনো প্রদর্শনীও করেন না। সংগ্রাহকদের কাছে অনেক সময় এমন অনেক জিনিস থাকে যা ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা অনুমোদন করে না সরকারি আইন। এ কারণেই কেদারবাবু সংগ্রাহক হিসাবে নিজের কোনো প্রচার চান না। নিজের সংগ্রহ দেখে নিজেই তৃপ্ত হন।

বিছানায় বসে তুবড়ি বাঁশি শুনতে শুনতে কেদারবাবু ভাবতে লাগলেন, কত বড়, কত বড় হবে? যে লোক দেখেছিল সে তো বলেছিল অন্তত পাঁচ হাত হবে...।' বেশ কিছু সময় ধরে বাঁশি বেজে চলার পর এক সময় তা থেমে গেল। এরপর আরও কিছুটা সময় কেটে যাবার পর কেদারবাবুর হঠাৎ মনে হল, ‘আচ্ছা, লোকটা যদি কোথাও চলে যায়? এরা ভবঘুরে ধরনের লোক, হয়তো আবার সাপ খেলা দেখাতে কোথাও বেড়িয়ে আর দু-পাঁচ দিনের জন্য ঘরেই ফিরল না? তখন এখানে আসাটাই তো বৃথা হয়ে যাবে!'— এ ব্যাপারটা মাথায় আসতেই জানলার বাইরে ভালো করে তাকালেন তিনি। রোদের তেজ একটু কমেছে।

চারটে প্রায় বাজতে চলেছে। পাহাড়ের ছায়াটাও যেন একটু দীর্ঘ হয়েছে। পাশের খাটে শুয়েছিল ভানুলাল, তিনি তাড়াতাড়ি তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বললেন, 'চলো এবার বেরোব। কাজটা যদি ভালোয় ভালোয় মিটে যায় তবে আজ রাতেই কলকাতা রওনা হয়ে যাব।’

কেদারবাবুর তৈরি হয়ে বেরোতে মিনিট দশেক সময় লাগল। রিসর্টের বাইরে বেরিয়ে ভানুলালকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন তিনি। নিজের গাড়ি নিয়েই কলকাতা থেকে পুরুলিয়া এসেছেন তিনি। জিনিসটা হস্তগত হলে তা নিজের গাড়িতে নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ। তাহলে আর লোক জানাজানি হবে না। ভানুলাল গাড়ি স্টার্ট করে সোজা এগোল পাহাড়ের দিকে গ্রামের রাস্তায়। কিছুটা এগোবার পরই রাস্তার ধারে খালি গায়ে ছাগল চড়াচ্ছিল একটা বাচ্চা ছেলে। গাড়ি থেকে গলা বার করে কেদারবাবু ছেলেটাকে বললেন, 'অ্যাই ছোঁড়া, যে লোকটা এখানে সাপ খেলা দেখায় তার ঘর কোথায় রে? একটু আগে যে সাপের বাঁশি বাজাচ্ছিল?”

ছেলেটা তার কথা শুনে দূরে একটা বট গাছ দেখিয়ে বলল 'হুই গাছের লিচে ওর ঘর।”

গাড়ি এগোল। মিনিট খানেকের মধ্যে জায়গাটাতে পৌঁছে গেল গাড়িটা। গাছটার নীচে সত্যিই একটা ঘর দাঁড়িয়ে আছে। মাটির দেওয়াল আর পাতার ছাদ-অলা একটা ঘর। সামনে একটা ছোটো উঠানের মতো নিকানো জায়গা। সেখানে একটা কাঠের পায়া অলা জীর্ণ দড়ির খাটিয়া পাতা আছে। গাড়ির শব্দ পেয়েই সম্ভবত ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল একজন লোক। তার মুখে কাঁচা-পাকা দাড়ি, আদুরে গা, পরনে মালকোঁচা দেওয়া আধময়লা ধুতি। গায়ের রং এখানকার লোকদের মতোই কালো। তার ডান বাহুতে বেশ কয়েকটা তাবিজ-কবচ বাঁধা। গলাতেও একটা তাবিজ ঝুলছে।


কেদারবাবু আর ভানুলাল গাড়ি থেকে নামতেই লোকটা তাদের দেখে নিয়ে একগাল হেসে স্পষ্ট বাংলা উচ্চারণে বলল, 'বাবুরা কি খেলা দেখতে এসেছেন?'

প্রথমেই আসল কথা বলা ঠিক নয়, তাই কেদারবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, খেলা দেখব।' তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নাম কী হে?'

আজ্ঞে আমার নাম সনাতন বাগদি। এখানে লোকে আমাকে ডাকে 'সনা সাপুড়ে' বলে। এরপর লোকটা বলল, 'আপনারা কি কলকাতা থেকে এসেছেন? আমি কলকাতা যাই খেলা দেখাতে।'

তার কথার জবাবে কেদারবাবু কিছু বলার আগেই ভানুলাল ফট করে বলে বসল, “হ্যাঁ, খাস কলকাতার ঝামাপুকুরে বাড়ি। এই বাবু বিরাট মানুষ। বিরাট ব্যবসা আছে। ওনার পয়সাতে সিনেমাও বানানো হয় নাম কেদার মল্লিক। নাম শুনেছ?' ভানুলাল হয়তো লোকটাকে প্রভাবিত করার জন্য আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কথাটা সে মিথ্যাও বলেনি। ইদানীং কেদারবাবু তার লোহালক্কড়ের ব্যবসার পাশাপাশি দুটো বাংলা সিনেমাতে অর্থ লগ্নিও করেছেন। কিন্তু তিনি ইশারায় থামিয়ে দিলেন ভানুলালকে। লোকটা তার সম্বন্ধে বেশি জানলে ভবিষ্যতে হয়তো অসুবিধা হতে পারে।

ভানুলালকে থামিয়ে দিয়ে তিনি সনা সাপুড়েকে বললেন, 'খেলা দেখাবে তো? আজেবাজে সাপ নয়, তোমার সবচেয়ে বড় সাপগুলো আনো। খেলা দেখব।”

সনা সাপুড়ে সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে কেদারবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কলকাতায় কত বড় বড় লোক থাকেন। আমরা গরিব মুখ্যু মানুষ। আমরা কি আর সবাইকে চিনি? হ্যাঁ বাবু, আমি খেলা দেখাব। আপনারা একটু খাটিয়াতে বসুন। আমি এখনই নিয়ে আসছি ওদের।' এই বলে সে তার অন্ধকার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

খাটিয়াতে বসলেন কেদারবাবু। ভানুলাল তার কাছেই দাঁড়াল। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল লোকটা। তার এক হাতে একটা হলদেটে পেট ফোলা তুবড়ি বাঁশি, আর অন্য হাতে ধরা দুটো বেশ বড় চ্যাপটা ধরনের গোলাকার বেতের ঝাঁপি। যে ঝাঁপিতে সাপ নিয়ে সাপুড়েরা ঘোরে।

কেদারবাবুর থেকে হাত দশেক দূরে মাটিতে ঝাঁপি দুটো নামিয়ে রেখে তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসল লোকটা। কয়েক মুহূর্ত সামনে রাখা ঝাঁপি দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকার পর সনা সাপুড়ে প্রথমে ধীরে ধীরে একটা ঝাঁপির ঢাকনা খুলল, তারপর আর একটার। দুটো ঝাঁপির ভেতরেই কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে কালচে খয়েরি রঙের বেশ বড় মোটা দুটো সাপ।

তাদের দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, 'এদের একজনের নাম “বাসুকী” আর অন্য জনের নাম “শেষ নাগ”। বাসুকী যাকে মহাদেবের গলায় আর শেষনাগের ওপর শুয়ে থাকেন বিষ্ণু। এ ব্যাপারটা তো আপনারা জানেনই। এত বড় সাপ আর কোনো বেদে বা সাপুড়ের কাছে দেখতে পাবেন না তা আমি হলফ করে বলতে পারি। এ সাপ দুটো হল রাজগোখরো।'

এই বলে লোকটা তার ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে ঝাঁপি দুটোতে একটু ধাক্কা দিল। প্রথমবার কিছু হল না। কিন্তু দ্বিতীয়বার সে ঝাঁপি দুটোতে আঘাত করতেই সাপ দুটো ঝাঁপি থেকে ফণা মেলে কয়েক ফুট মাথা তুলে এক সঙ্গে তীব্র গর্জন করে উঠল— ‘হি-স্-স্’। কী তীব্র ‘হি-স্-স্’ শব্দরে বাবা! যেন একসঙ্গে বেশ কয়েকটা প্রেশার কুকার থেকে বাষ্প বেরোল। নিজের অজান্তেই যেন ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন কেদারবাবু। আর কয়েক পা পিছিয়ে খাটিয়ার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল ভানুলাল। তাই দেখে সনা সাপুড়ে একটু হেসে বলল, 'ভয় নেই বাবু। সাপ বড় নিরীহ প্রাণী। খিদে না পেলে আর ভয় না পেলে ওরা মানুষের মতো নিজে থেকে কারো ক্ষতি করতে যায় না। বরং ইঁদুর, পোকামাকড় খেয়ে মানুষের উপকার করে। অথচ মানুষই ওদের দেখলে শুধু শুধু মারতে যায়। বহুদিন আমি সাপ নিয়ে ঘর করছি। সাপেদের আমি জানি।'

লোকটা বলল, ‘বসে বসেই আপনি দেখতে পাবেন ওরা কত বড়।'— এই বলে সে পাশে রাখা তুবড়ি বাঁশিটা তুলে নিয়ে দু-হাতে সেটা মুখে ধরে বাঁশিটা ধীরে ধীরে বাজাতে শুরু করল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সাপ দুটোও কুণ্ডলী ছেড়ে ঝাঁপির ভিতর থেকে ধীরে ধীরে ফণা তুলে মাথা ওঠাতে লাগল।

তার কথা শুনে সম্বিত ফিরে পেয়ে কেদারবাবু আবার খাটিয়ায় বসে পড়ে বললেন, 'না, ভয় নয়। ওদের ভালো ভাবে দেখার জন্যই উঠে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নাও এবার খেলা শুরু করো। দেখি তোমার সাপ কত বড়?'

গাল ফুলিয়ে দু-হাত দিয়ে ধরে থাকা বাঁশি আর মাথা দু-পাশে নাড়িয়ে সনা সাপুড়ে বাঁশি বাজাবার সঙ্গে সঙ্গে সাপ দুটোও দু-পাশে অনেকটা নাচের তালে মাথা দোলাতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর সাপ দুটো যখন প্রায় সনা সাপুড়ের মাথার সমান্তরাল উচ্চতায় উঠে এসেছে তখন সনা সাপুড়ে বাঁশি বাজাতে বাজাতে উঠে দাঁড়াতে শুরু করল, আর সাপদুটোও ছন্দবদ্ধ সুরেলা বাঁশির সঙ্গে মাথা নাড়াতে নাড়াতে আরও ওপরে উঠতে শুরু করল। সম্মোহিতের মতো সে দৃশ্যর দিকে তাকিয়ে রইলেন কেদারবাবু আর ভানুলাল।

এক সময় সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল সাপুড়ে। বিস্মিত কেদারবাবুও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। সাপ দুটো এত বড় হতে পারে। সনা সাপুড়ের উচ্চতা কেদারবাবুর মতোই হবে। অর্থাৎ পাঁচ ফিট সাত-আট ইঞ্চি। মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে সে। আর প্রায় তার বাঁশির সমান উচ্চতায় উঠে এসেছে সাপ দুটো। তার বাসুকী আর শেষ নাগ! তাদের ‘ফণাগুলো যেন ছোট থালার মতো বড়! তাতে আঁকা আছে গরুর খুড়ের মতো ছাপ। এজন্যই এদের বলে ‘গো-খুড়ো’-গোখরো। রাজ গোখরো!

ঝাঁপি থেকে পাঁচ ফিট ওপরে উঠে দাঁড়িয়ে বেশ অনেকক্ষণ ধরে নাচল সাপগুলো। তারপর আবার ধীরে ধীরে বাঁশি বাজাতে বাজাতে যেভাবে শরীর ভেঙে লোকটা বসে পড়তে লাগল তেমনই সাপ দুটোও নীচু হতে লাগল। একসময় আগের মতো উবু হয়ে বসে বাঁশি থামিয়ে দিল লোকটা। আর সাপ দুটোও শান্ত হয়ে ঝাঁপির মধ্যে মাথা নামিয়ে নিল। লোকটা ঝাঁপির ঢাকনা দুটো বন্ধ করে দিল।

পুরো ব্যাপারটা দেখে ধাতস্থ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল কেদার মল্লিকের। তারপর তিনি পকেট থেকে কড়কড়ে একশো টাকার নোট বার করে সেটা সনা সাপুড়ের দিকে এগিয়ে দিল। উঠে এসে সে টাকাটা হাতে নিল তারপর ফিরে গিয়ে প্রণামের ভঙ্গিতে নোটটা ঝাঁপি দুটোতে ঠেকিয়ে সেখানেই বসল।

এরপর সে নোটটা ট্যাকে গুঁজতে গুঁজতে বলল, 'একটা কথা বলি বাবু। আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। যারা সাপের খেলা দেখায় তারা সাপের বিষ দাঁত ভেঙে দেয়। অথবা সাপের মুখের দু-পাশে সেলাই করে যাতে তারা বিষ ঢালতে না পারে সেজন্য। ওতে বড় কষ্ট হয় প্রাণীগুলোর। আমি কিন্তু বাসুকী আর শেষ নাগের বিষ দাঁত ভাঙিনি আর ঠোঁটও সেলাই করিনি।'

কেদারবাবু কথাটা শুনে চমকে উঠে বললেন, 'ওরা যদি তোমাকে কামড়ে দেয়?”

সনা সাপুড়ে হেসে বলল, 'এরা আমাকে কোনোদিন কামড়াতে চায়নি, কামড়াবেও না। আমার তো সংসার নেই। ওরা আমার ছেলের মতো। ওই পাহাড়ের মাথায় একদিন সাপ ধরতে বেরিয়েছি। জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ শুনি বেজির ডাক আর সাপের ফোঁস ফোঁস শব্দ। দেখি একটা ঝোপের আড়ালে হাত দেড়েক মাত্র লম্বা দুটো বাচ্চা সাপ লড়ছে একটা ধাড়ী বেজির সঙ্গে। কিন্তু তখনই কী তেজ বাচ্চা দুটোর। বেজিটাকে তাড়িয়ে সাপের বাচ্চা দুটোকে তুলে আনলাম আমার ঘরে। বছর দশেক আগের কথা হবে। তারপর থেকে ওরা আমার কাছেই আছে।'

কেদারবাবু এরপর আসল কথাটা পাড়লেন। তিনি বললেন, 'তুমি আমাকে বেচবে সাপ দুটো? কত দাম লাগবে বলো ?”

সনা সাপুড়ের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সে অবাক স্বরে জানতে চাইল, 'সাপ নিয়ে আপনারা কী করবেন? আপনার কী ওষুধের ব্যবসাও আছে? বিষ তুলবেন?”

জবাবটা মনের ভিতর আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছিলেন কেদারবাবু। তিনি বললেন, 'ওসব বিষ তোলার ব্যাপার নয়। একটা সিনেমার কাজে সাপ দুটো লাগবে। তুমি সাপ দুটো দেবার আগে ওদের বিষ তুলে নিতে পারো। সাপের বিষের নাকি বেশ দাম হয় বলে শুনেছি। সাপ দুটোর জন্য কত দাম নেবে তুমি?”

লোকটা আরও বিস্মিত ভাবে বলল, 'সিনেমা করবেন! তা হলে আমি তো সাপ দুটো নিয়ে যেতে পারি ?”

কেদারবাবু বললেন, ‘না, সিনেমার শুটিং হবে অনেক দূর দেশে। এরোপ্লেনে যেতে হয়, সেখানে তোমাকে নিয়ে যাওয়া যাবে না।’

লোকটা এবার বলল, 'কিন্তু ওদের তো বিষ দাঁত ভাঙা নেই। আমি না থাকলে কিছু ঘটে যেতে পারে।'

কেদারবাবু লোকটা আসল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না দেখে একটু অধৈর্য ভাবেই বললেন, 'ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি তোমাকে দশ হাজার টাকা দেব সাপ দুটোর জন্য।'

সনা সাপুড়ের চোখে বিস্ময়। বিড়বিড় করে সে বলল, ‘দশ হাজার!'

—"হ্যাঁ, দশ হাজারই দেব। টাকা সঙ্গেই আছে। আমাকে দিয়ে দাও ওদের।’

শখের জন্য দশ-বিশ হাজার খরচ করা কেদারবাবুর কাছে সামান্য ব্যাপার। ব্যবসায় লক্ষাধিক টাকা আয় তার প্রতিমাসে। তিনি একা মানুষ। তাই অন্য খরচ-খরচা তার নেই। ব্যবসার আয়ের একটা বড় অংশ তিনি তার শখের জিনিস সংগ্রহর কাজেই ব্যয় করেন। একবার তিনি হায়দরাবাদের নিজামের এক বংশধরের থেকে চার লাখ টাকা দিয়ে একটা জিনিস কিনেছিলেন, ...উগান্ডা থেকেও একটা জিনিস আনাতে তার ব্যয় হয়েছিল কয়েক লাখ। ইজিপ্ট থেকেও একটা জিনিস আনার কথা চলছে। কোন একটা মমির শবাধারে ছিল সেটা। ও জিনিসটারও ভালো দাম পড়বে। এসবের তুলনায় দশ হাজার তো নস্যি কেদার মল্লিকের কাছে।

কিন্তু কেদার মল্লিককে অবাক করে দিয়ে এরপর লোকটা বলল, 'না বাবু, ওদের আমি বেচব না।'

—‘বেচবে না! টাকাটা কি তোমার কম মনে হচ্ছে? ঠিক আছে আমি নয় তোমাকে আরও পাঁচ হাজার দেব।'— বললেন দেবেনবাবু।

সনা সাপুড়ে জবাব দিল, 'ওরা আমার ছেলের মতো। রাতে ওদের ঝাঁপির বাইরে বার করে এক খাটে ঘুমাই। ওদের আমি বেচব কীভাবে? আপনি কদিন সময় দিলে আমি আপনাকে অন্য সাপ ধরে দিতে পারি। বাঘমুণ্ডি পাহাড়ে অনেক সাপ আছে।'

—‘আরও হাজার টাকা দিচ্ছি তোমাকে। এত দাম কেউ দেবে না।'

—এভাবে এক এক হাজার করে বাড়াতে বাড়াতে শেষ পর্যন্ত কুড়ি হাজার টাকায় যখন গিয়ে ঠেকলেন তখন সনা সাপুড়ে ঝাঁপি দুটো আর তার বাঁশিটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ছেলেদের কেউ কি বিক্রি করে বাবু। তবে আমি গরিব মানুষ। গরিবকে আর লোভ দেখাবেন না। বলা যায় না, শেষ পর্যন্ত হয়তো আমার মাথার গণ্ডগোল হয়ে গেল। এবার আপনারা আসুন বাবু।' এই বলে লোকটা তার ঘরের দিকে পা বাড়াল।

কেদারবাবু হাল ছাড়ার লোক নন, 'তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, আমরা এখন যাচ্ছি, সারা রাত ধরে তুমি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবো। টাকাটা কিন্তু পুরো কুড়ি হাজার। কাল সকালে আমরা আবার আসব।'

সনা সাপুড়ে তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে তার ঘরে ঢুকে গেল। আর কেদারবাবুও তার গাড়িতে চড়ে বসলেন।

ঘরে ফিরে পায়চারি করতে লাগলেন কেদারবাবু। তার মনে খালি একই চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। কাল সকালেও যদি লোকটা তাকে ফিরিয়ে দেয় তখন কী হবে? চোখ বন্ধ করলেই তিনি দেখতে পাচ্ছেন সাপ দুটোকে। বাঁশির তালে পাঁচ ফুট উঠে দাঁড়িয়েছে সাপ দুটো। প্রায় থালার মতো বড় তাদের ফণা। তাতে গরুর খুড়ের ছাপের মতো দাগ। তপসিয়ার করিম বলেছে ঠিক ওরকম সাপই তার চাই। তাই যে ভাবেই হোক সাপদুটো পেতে হবে তাকে। অন্য কী কোনো উপায় আছে সাপ দুটোকে হস্তগত করার? ভাবতে লাগলেন কেদারবাবু।

রোদ পড়ে এসেছে। রিসর্ট সংলগ্ন বাগানের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে টুরিস্টরা। জানলা দিয়ে তাদের দেখা যাচ্ছে, কথাবার্তার শব্দ কানে আসছে। সেদিকে তাকিয়ে ভানুলাল বলল, ‘আমি একটু বাগান থেকে ঘুরে আসব স্যার? তা ছাড়া ডিনারের অর্ডারটাও দিয়ে আসতে হবে।’

কেদারবাবু বললেন, ‘যাও। ভাবনার জন্য ফাঁকা ঘরই ভালো। ভানুলাল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। একা ঘরে আগের মতোই চিন্তা করতে করতে কেদারবাবু পায়চারি করতে লাগলেন।

আধ ঘণ্টার মধ্যেই ভানুলাল ফিরে এল। কেদারবাবু তখনও ভেবেই চলেছেন। ঘরে ঢুকে ভানুলাল বলল, ‘একটা কথা ছিল স্যার, টুরিস্ট পার্টির সঙ্গে একটা ছেলে এসেছে কলকাতা থেকে। বাগানে দেখা হল। সে একবার দেখা করতে চায় আপনার সঙ্গে।'

—‘আমার সঙ্গে কেন? তুমি কি আমার সম্বন্ধে কিছু বলেছ তাকে?' জানতে চাইলেন কেদারবাবু।

ভানুলাল বলল, ‘আমি কিছু বলিনি ছেলেটাকে। ও স্টুডিয়ো পাড়ায় ঘোরাঘুরি করে। দু-একটা সিনেমায় চাওয়ালা, রিকশাওয়ালা অর্থাৎ একস্ট্রার পার্ট করেছে। সিনেমায় একটা রোল করার খুব শখ। ও একদিন স্টুডিয়ো পাড়ায় দেখেছে আপনাকে। রিসর্টেও দেখতে পেয়েছে। আপনার নাম জানে। ও আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে এই কারণে যে আপনি কাউকে বলে কয়ে যদি কোনো সিনেমায় ওকে সুযোগ করে দেন সেজন্য। ওকে কি আপনার কাছে আনব স্যার ?'

কথাটা শুনে কেদারবাবু অসন্তোষের ভঙ্গিতে বললেন, 'আমি মরছি নিজের জ্বালাতে, তার ওপর তুমি আবার এসব উটকো ব্যাপার ঘরে আনছ! আমি দেখা করব না।

কিন্তু ‘সিনেমা’, ‘পার্ট’– এসব শব্দ শুনে হঠাৎই কাকতালীয় ভাবে একটা ভাবনা খেলে গেল কেদারবাবুর মাথায়। তিনি এরপর বললেন, 'যাও তো ছোকরাটাকে একবার ডেকে আনো দেখি। সে কেমন পার্ট করতে পারে জানা দরকার।’

কেদারবাবুর কথা শুনে বাইরে বেরিয়ে মিনিট খানেকের মধ্যেই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলেকে নিয়ে ঘরে ফিরে এল ভানুলাল। বেশ সুন্দর চেহারা তার। ছেলেটা হাতজোড় করে কেদারবাবুকে প্রণাম জানিয়ে বলল, 'স্যার আমার নাম বিভূতি সরখেল। আমি চিৎপুরে থাকি।'

কেদারবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, “তা তোমার চেহারা তো দেখছি মন্দ নয়। আমার অ্যাসিস্টেন্ট ভানুলাল তোমার কথা বলল। কিন্তু তোমার ব্যাপারে কাউকে সুপারিশ করার আগে তুমি কেমন অভিনয় করতে পারো তা আমার দেখা দরকার।'

কেদারবাবুর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা উৎসাহিতভাবে বলল, 'আপনি শুধু আমাকে কোথাও একটা চান্স দিন। আমি স্যার সব অভিনয় পারি। হাসি-কান্না-ড্যান্স-ফাইটিং। আপনাকে একটু করে দেখাব স্যার ?”

কেদারবাবু জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, দেখাতে হবে। তবে আমি যে অভিনয় করতে বলব রিয়েল অ্যাক্টিং অর্থাৎ বাস্তবে অভিনয়। পারবে করতে?”

যাকে বলে বিভূতি সরখেল বলল, 'কী করতে হবে বলুন। সিনেমায় নামার জন্য আমি সব অভিনয় জান লড়াইয়ে করব।'

তার বাচনভঙ্গি দেখে কেদারবাবু একটু হেসে বললেন, 'ওই যে জানলার বাইরে পাহাড়ের দিকটাতে একটা বটগাছের তলায় সনা সাপুড়ে নামে একজন সাপুড়ে থাকে। তার কাছে এখন তোমাকে যেতে হবে। মিনিট দশেকের পথ। তুমি নিশ্চয় জানো যে সাপ ধরা বা মারা নিষিদ্ধ ব্যাপার। ওই লোকের কাছে গিয়ে তুমি বনদপ্তরের লোকের ভূমিকায় অভিনয় করবে। লোকটাকে তুমি বলবে যে ওর কাছে দুটো রাজগোখরো আছে সে খবর সরকারের কানে গেছে। কাল সকালে তোমরা সাপ দুটোকে বনদপ্তরে নিয়ে যাবে। আর লোকটা যদি পালাবার চেষ্টা করে তবে তাকে জেলে পোরা হবে। আমি কাল সকালে লোকটার কাছে গিয়ে দেখব যে তুমি বনদপ্তরের লোকের ভূমিকায় অভিনয় করে তাকে ভয় দেখাতে পেরেছ কিনা? যদি পারো তবে সিনেমায় নামা তোমার পাকা।’

ছেলেটা যেন একটু অবাক হল কেদারবাবুর কথায়। তারপর বলল, ‘পারব স্যার, নিশ্চয়ই পারব। আমি এখনই যাচ্ছি স্যার।' এই বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কেদারবাবু তার ফেরার প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। একটা মোক্ষম চাল চেলেছেন তিনি। দেখা যাক ছোকরা ফিরে এসে কী বলে।

পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুবে গেল এক সময়। বাইরের পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে এল। অন্ধকার নামার কিছু সময় পরই ছেলেটা ফিরে এল। তার মুখচোখ খুশিতে ডগমগ। সে বলল, ‘পেরেছি স্যার পেরেছি। সঙ্গে করে আমার আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে গেছিলাম গাড়ি করে। আমি ফরেস্ট অফিসার সাজলাম আর ওরা আমার কর্মী। বললাম যে আমরা কলকাতার হেড অপিস থেকে আসছি। এমন ভয় দেখিয়েছি যে লোকটা আর একটু হলে কেঁদেই ফেলছিল। ওকে বলেছি যে কাল সকালে আমরা ওর সব সাপ নিয়ে যাব। আর পালাবার চেষ্টা করলেই জেলে পুরে দেব। আপনি ওর সঙ্গে কথা বললেই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।

কেদারবাবু শুনে বললেন, “বাঃ বেশ ভালো। কাল ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারব তুমি কতটা সফল। একটা কাগজে তুমি তোমার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর দিয়ে যাও। আমি তোমাকে ঠিক সময় ডেকে নেব সিনেমার ব্যাপারে।'

ছেলেটা তৈরি ছিল। পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে তা কেদারবাবুর হাতে দিয়ে, —‘আমাকে দেখবেন স্যার। আশায় রইলাম' বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

ছেলেটা চলে যাবার ঘণ্টাখানেক পর খাওয়া সেরে শুয়ে পড়েছিলেন কেদারবাবু। মাঝরাতে গেল। জানলার পাশেই তিনি শুয়েছিলেন। বাইরে ফটফটে চাঁদের হঠাৎই যেন তার ঘুম ভেঙে সেটা।

আলোতে দাঁড়িয়ে আছে বাঘমুণ্ডি পাহাড়। সেদিক থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসছে। স্বপ্ন নয় সত্যি। তুবড়ি বাঁশির সুর স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন কেদারবাবু। তবে সেটা যেন এখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণ সুরে বেজে চলেছে। তুবড়ি বাঁশির সেই সুর চন্দ্রালোকে ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ে-জঙ্গলে। কেদারবাবুর কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল শব্দটা শুনে। সেই শব্দ শুনতে শুনতে তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।

পরদিন ভোরের আলো ফোটার পর কেদারবাবু ভানুলালকে সঙ্গে করে রিসর্ট থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পৌঁছে গেলেন সনা সাপুড়ের বাড়িতে। সবে সকাল হয়েছে। চারপাশে খুব সুন্দর পরিবেশ। বট গাছের মাথায় পাখিদের কলকাকলি। গাছের ডালের ফাঁক গলে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়েছে সনা সাপুড়ের ভাঙা ঘরের চালে। তারা গাড়ি থেকে নামতেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল লোকটা। তার লাল চোখ। মুখে রাত্রি জাগরণের স্পষ্ট ছাপ। তাকে দেখে কেদারবাবু একগাল হেসে বললেন, 'কাল সারারাত বাঁশি বাজিয়েছ বুঝি? আমি শুনেছি। '

লোকটা জবাব দিল,'হ্যাঁ, বাবু।'

কেদারবাবু এরপর বললেন, তুমি কী ঠিক করলে বলো ?”

সনা সাপুড়ে বিষণ্ণভাবে বলল, 'কাল আপনারা চলে যাবার পর বনবিভাগের লোক এসেছিল। আমার সব সাপ ওরা আজ এসে নিয়ে যাবে বলেছে। নিয়ে যাবে নিয়ে যাক। কিন্তু আমি আমার ছেলেদের বাসুকী আর শেষ নাগকে নিজের হাতে কাউকে বেচতে পারব না।

সনা সাপুড়ের কথা শুনে কেদারবাবু ছদ্ম বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, 'তাই নাকি? এ লোকগুলোর কী আর কোনো কাজ নেই! কোথায় কে দু-চারটে সাপ পুষেছে তার জন্য চলে আসা! ভারী বজ্জাত তো লোকগুলো!'

সনা সাপুড়ে বলল, ‘লোকগুলো কলকাতার বড় অপিস থেকে এসেছে। অনেক মিনতি করলাম ওদের কাছে। কিন্তু ওরা বলছে সাপ নিয়ে যাবেই।'

কেদারবাবু প্রথমে বললেন, “ওরা যদি বড় অপিস থেকে এসে থাকে তবে সত্যিই গতিক ভালো নয়।' তারপর বললেন আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তাতে তোমার সাপও বাঁচবে আর আমাদের সিনেমার কাজও হবে।'

—‘সেটা কী?' জানতে চাইল সনা সাপুড়ে।

কেদারবাবু বললেন, ‘বিক্রি নয়। সাপ দুটো তুমি সপ্তাহ দুই-এর জন্য আমাকে ভাড়া দাও ৷ পাঁচ হাজার টাকা দেব। আমি সাপ দুটোকে কলকাতা নিয়ে যাব। বনদপ্তরের লোক তোমার ঘরে এসে বাসুকী আর শেষ নাগকে পাবে না। তারা এলে বলবে গোখরো নেই তোমার কাছে। তারা অন্য সাপ নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে চলে যাবে। তোমার আমার দুজনের দু-দিকের ঝামেলা মিটে যাবার পর তুমি আমার বাড়ি থেকে সাপদুটোকে নিয়ে আসবে।

একথা শোনার পর মৃদু উজ্জ্বল হয়ে উঠল সনা সাপুড়ের চোখ দুটো। সে বলে উঠল, ‘আপনার কাছে থাকলে ওদের কোনো ক্ষতি হবে নাতো বাবু? আপনি ওদের ফিরিয়ে দেবেন তো?'

কেদারবাবু তাকে আস্বস্ত করে বললেন, 'কোনো ক্ষতি হবে না ওদের। আর সিনেমা হয়ে যাবার পর ওদের নিয়ে আমি কী করব? ওদের তো কোনো জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে এমনিতেই ছেড়ে দেওয়া হত। ভাড়ার ব্যাপারটা আগে আমার মাথায় আসেনি।'

একথা শুনেও চুপ করে রইল সনা সাপুড়ে।

কেদারবাবু এরপর পিছনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'যা করার তাড়াতাড়ি করো। বনদপ্তরের লোকরা হয়তো এখনই চলে এল। তখন আর কিছু করার থাকবে না। আমি বলছি তো তোমার সাপ তুমি ফেরত পাবে। ওদের কোনো ক্ষতি হবে না।’

সনা সাপুড়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল কেদারবাবুর দিকে। তারপর তার ঘরে ঢুকে একটা কাপড়ের ঝোলা নিয়ে এল। তার মধ্যে থেকে উঁকি মারছে সেই বড় ঝাঁপি দুটো।

ভানুলাল সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিল। লোকটা গাড়ির সিটের ওপর ঝোলাটা নামিয়ে রাখার সময় ভানুলাল স্পষ্ট দেখল লোকটার চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল সেই ঝোলার ওপর।

কেদারবাবু পাঁচ হাজার টাকা বার করে সনা সাপুড়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'ভাড়ার টাকাটা তুমি রাখো।'

সনা সাপুড়ে বিষণ্ণ হেসে বলল, 'না, বাবু ওটা এখন থাক। ছেলেদের জমা রেখে কি কেউ টাকা নেয়? আপনার কাজ মিটলে তখন আমাকে না হয় টাকাটা দেবেন। আপনার ঠিকানাটা আর একবার বলুন? ঝামাপুকুর তো?

কেদারবাবু আর এ ব্যাপারে কথা বলে সময় নষ্ট করলেন না। বলা যায় না লোকটার মত বদলে যেতে পারে। চটপট ঠিকানা বলে গাড়ি নিয়ে সোজা কলকাতার দিকে রওনা হয়ে গেলেন তিনি। পথে যেতে যেতে ভানুলাল শুধু একবার জানতে চাইল, 'লোকটা সাপ নিতে যখন আসবে তখন কী করবেন স্যার?”

কেদারবাবু বললেন, ‘সে সময় দেখা যাবে। কিছু একটা বলে দেব আর কিছু টাকা দিয়ে দেব। সাপ না পেলে ও তো আর পুলিশে যেতে পারবে না। কারণ সাপ ধরা বা রাখা বেআইনি।'

কলকাতায় ফিরে বাড়িতে না ঢুকে কেদারবাবু প্রথমে গিয়ে হাজির হলেন তপসিয়াতে করিমের কাছে। ঝাঁপি দুটো করিমের হাতে দিয়ে তিনি বললেন, 'সাবধান, সাপদুটোর বিষ দাঁত ভাঙা নেই। রাজগোখরো। তুমি যেমন বলেছিলে।'

করিম হেসে বলল, 'আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। সপ্তাহ দুই সময় লাগবে ওদের আপনার কাছে ফিরিয়ে দিতে।'

কেদারবাবুও হেসে বললেন, —'আমি খুব যত্নে রাখব ওদের।'


সপ্তাহ দুই সময় খুব দ্রুত কেটে গেল কেদারবাবুর। ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল কেদারবাবুকে। তারই মাঝে তিনি বার কয়েক ফোনও করেছিলেন করিমকে। সে জানিয়েছে বিষ দাঁতের জন্য তার তেমন অসুবিধা হয়নি। তার কাজ চলছে। এদিন রোববার। বাড়িতে একলাই ছিলেন কেদারবাবু। ভানুলালের রবিবার ছুটি থাকে। সে আসে না। বেলা এগারোটা নাগাদ করিমের ফোন পেলেন তিনি। করিম জানাল তার কাজ শেষ। আজই কোনো একসময় এসে সে দিয়ে যাবে জিনিসটা। আনন্দে নেচে উঠল কেদারবাবুর মন। তার বহুদিনের সাধ এবার মিটতে চলেছে। তার সংগ্রহতে স্থান পেতে চলেছে আরও একটা অদ্ভুত জিনিস!

কেদারবাবুর সংগ্রহশালা অর্থাৎ যে ঘরে তিনি তার শখের জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখেন সে ঘরটা তার ঘরের পাশেই। খবরটা পাবার পর তালা খুলে সে ঘরে ঢুকলেন তিনি। ঘরটা সাধারণত বন্ধই থাকে। জানলা খুলতেই দোতলার এই ঘরটাতে রোদ এসে পড়ল। দেওয়ালের গায়ে সার সার র‍্যাকের মধ্যে সুন্দর ভাবে সাজানো আছে কেদারবাবুর সংগ্রহের জিনিসগুলো। দেশ-বিদেশ থেকে বহু অর্থব্যয় করে কখনও সাদা পথে কখনও বা কালো পথে জিনিসগুলো তিনি সংগ্রহ করেছেন। ঘর বন্ধ থাকলেও সব জিনিসেই মৃদু ধুলোর আস্তরণ পড়ে। কেদারবাবুর সংগ্রহের জিনিসগুলো কোনোটা খুব প্রাচীন, আবার কোনোটা সংগ্রহ করা খুব কঠিন বলে দুর্মূল্য। র‍্যাক থেকে এক এক করে জিনিসগুলো নিয়ে কাপড় আর ব্রাশ দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখতে লাগলেন তিনি।

ঘণ্টা দুই পর যখন তার কাজ শেষ হতে চলেছে তখন বাইরে নীচ থেকে কার যেন গলার শব্দ তার কানে এল। করিম কি তবে জিনিসটা নিয়ে এল? সে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘর পার করে বারান্দায় এসে নীচে তাকিয়ে কেদারবাবু দেখতে পেলেন সদর দরজা খুলে ভিতরের শান বাঁধানো উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে একজন। তার কাঁধে একটা ঝোলা, মাথায় কাপড়ের পাগড়ি। হাতে একটা তুবড়ি বাঁশি। সনা সাপুড়ে! তাহলে লোকটা সত্যিই চলে এল। মুহূর্তর মধ্যে তাকে কী বলবেন তা ভেবে নিলেন কেদারবাবু। সিঁড়ি দিয়ে তাকে ওপরে উঠে আসতে বলে ঘরে ঢুকে দেরাজ খুলে দশ হাজার টাকা বার করলেন তিনি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই কেদারবাবুর ঘরে ঢুকল সনা সাপুড়ে। কেদারবাবু তাকে ইশারাতে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেও লোকটা দরজার কাছেই হাঁটু ভেঙে বসে তার বাঁশিটা আর ঝোলাটা মেঝের ওপর নামিয়ে রেখে পাগড়ি খুলে মুখের ঘাম মুছে বলল, 'অনেক খুঁজে পেতে আপনার বাড়িটা পেলাম। খুব ভয় লাগছিল যদি বাড়ি খুঁজে না পাই! '

কেদারবাবু তার হাতে একশো টাকার বান্ডিলটা দিয়ে বললেন, 'এটা নাও। পুরো দশ হাজার আছে।'

টাকাটা হাতে নিয়ে সনা সাপুড়ে বলল, 'পাঁচের বদলে দশ হাজার! আপনার কাজ তবে ভালো ভাবে মিটেছে নিশ্চয়ই? আমি জানতাম কাজ ভালো হবে। আমার বাসুকী আর শেষ নাগ খুব পয়মন্ত। জানেন, ওই বন বিভাগের লোকগুলো আর আসেনি। আমি হয়তো মিথ্যা ভয় পাচ্ছিলাম। কই আমার বাসুকী আর শেষ নাগ কোথায়? কতদিন ছেলেদের আমি দেখিনি।' —এই বলে সে খাটের তলায়, ঘরের আনাচে কানাচে উঁকি মারতে লাগল। কেদারবাবু এবার আমতা আমতা করে বললেন, 'ওরা এখানে নেই।'

—‘এখানে নেই। তবে কি অন্য কোথাও রাখা আছে? আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন। ওদের নিয়ে রাতের ট্রেনেই ঘরে ফিরব।' লোকটা বলল।

কেদারবাবু বললেন, ‘একটা ব্যাপার ঘটেছে। বনদপ্তরের লোক তোমার বাড়ি যায়নি কেন জানো? ওরা জানত ওখানে গিয়ে আর লাভ নেই। তোমার বাড়ি থেকে সাপ নিয়ে আমরা যে রিসর্টে ছিলাম সেখানে ফিরে গেছিলাম আমাদের মালপত্র নিতে। ওই লোকগুলো যে ওখানেই ছিল তা আমরা জানতাম না। ওরা কীভাবে যেন জেনে গেল আমাদের সঙ্গে সাপ আছে। হয়তো গাড়ির কাচের ফাঁক দিয়ে কেউ দেখতে পেয়েছিল পিছনে রাখা ঝাঁপি দুটো। ওরা আমাদের ফলো করে কলকাতা এল। সাপ নিয়ে যেই বাড়ি ঢুকেছি ওরাও সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ঢুকল। সাপ তো কেড়ে নিই, আমাদেরও আর একটু হলেই ধরে নিয়ে যাচ্ছিল! খুব বাঁচা বেঁচে গেছি! তোমার ক্ষতি হল বলে টাকাটা দিচ্ছি।'

কেদারবাবুর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে টাকাটা মাটিতে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল সনা সাপুড়ে। তার চোখে ফুটে উঠেছে বিস্ময়ের ছাপ। কথাটা যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না। সে সোজা গিয়ে ঢুকল কেদারবাবুর সংগ্রহশালায়। সে ঘরে সাপ কেন, সাপ সংক্রান্ত কোনো জিনিস নেই। কিন্তু সে ঘরে ঢুকে লোকটা কি কোনো ইঙ্গিত পেল? সনা সাপুড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মাটি থেকে তার ঝোলা আর তুবড়ি বাঁশিটা তুলে নিল। লোকটার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। সে শুধু একবার কেদারবাবুর উদ্দেশে বলে উঠল, 'ওদের কেউ আটকে রাখতে পারবে না। আমার বাঁশির শব্দ শুনলেই আমার কাছে চলে আসবে ওরা। যেখানেই থাক ওদের আমি ঠিক খুঁজে বার করব।' এই বলে সে তার বাঁশি বাজাতে শুরু করল। তারপর কেদারবাবুর ঘর ছেড়ে নীচে নেমে বাঁশি বাজাতে বাজাতে পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে গেল। কেদারবাবু শুনতে পেলেন সনা সাপুড়ের বাঁশি পাগলের মতো বাজতে বাজতে এ-গলি সে-গলি বেয়ে দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল পাড়া। কেদারবাবু মনে মনে ভাবলেন, 'যাক আপদ গেল!' স্নান খাওয়া সেরে ঘুম দিলেন তিনি।


সন্ধ্যা নাগাদ আবার বাড়ির নীচ থেকে ডাক শুনলেন কেদারবাবু। প্রথমে তিনি মৃদু চমকে উঠলেন সনা সাপুড়ে আবার ফিরে এল নাকি? ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে কেদারবাবু দেখলেন সনা সাপুড়ে নয় করিম এসেছে। তার হাতে একটা বাক্স। ওপরে উঠে এল করিম। বাক্সটা কেদারবাবুর হাতে গছিয়ে দিয়ে টাকাপয়সা নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে গেল সে। মজুরিটা এবার একটু বেশিই নিল সে। দশ হাজার টাকা। তা নিক। কথায় বলে শখের দাম লাখ টাকা। কাজটা খুব যত্ন করে করতে হয়েছে তাকে। তা ছাড়া ভবিষ্যতে গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারও আছে। কাজেই দশ হাজার টাকা এমন কিছু বেশি সে নেয়নি। করিম চলে যাবার পর নীচে নেমে সদর দরজা বন্ধ করে কেদারবাবু আবার ওপরে উঠে এলেন। তারপর বাক্সটা নিয়ে তিনি ঢুকলেন তার সংগ্রহশালায়। বাতি জ্বালিয়ে কাগজের বাক্সটা তিনি রাখলেন একটা টেবিলে। বাক্সটা ধীরে ধীরে খুলে ফেললেন তিনি। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল অনেকটা নাগড়ার মতো দেখতে এক জোড়া শুঁড়তোলা কালো রঙের জুতো। তার গাটা বেশ পিচ্ছিল নরম মোলায়েম। দু-এক জায়গাতে মৃদু আঁশের মতো হালকা দাগও আছে। সাপের চামড়ার জুতো! জুতোর শুঁড়গুলো অনেকটা সাপের ফণার মতোই। বেশ বানিয়েছে করিম। এ জুতোর ছবি এর আগে একটা বিদেশি বইতে দেখেছিলেন কেদারবাবু। তবে হাতে নিয়ে দেখা তার এই প্রথম। করিম বলেছিল গোখরোর চামড়াই তার চাই। অন্য সাপের চামড়াতে জুতো ভালো হবে না।

জুতো জোড়া ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সেটা পায়ে দেবার আগে ঘরের চারপাশের র‍্যাকগুলোর দিকে তাকালেন কেদারবাবু। র‍্যাকগুলোর মধ্যে সার সার রাখা আছে নানা ধরনের পাদুকা অর্থাৎ খড়ম, চটি, জুতো। কেদারবাবুর শখ হল পাদুকা সংগ্রহর। বিচিত্র শখ! কেদারবাবুর হাতের কাছের র‍্যাকটাতেই রাখা আছে একটা মুক্তা বসানো, সোনার সুতোর কাজ করা চটি। ওটা তিনি কিনেছিলেন হায়দরাবাদের সেই নিজামের বংশধরের কাছ থেকে। তার ঠিক মুখোমুখি র‍্যাকটায় রাখা হলদে রঙের চটিটা সিংহর চামড়ার। জংলি সিংহ শিকারিরা পরে। উগান্ডা থেকে তিনি ওটা আনিয়েছেন। চন্দন কাঠের খড়মটা বেশ পুরনো। ওটা সংগ্রহ হয়েছে দক্ষিণ ভারতের এক প্রাচীন মন্দির থেকে। আর ঘরের কোনায় রাখা কাঠের সোল অলা রঙচঙে হাই হিল বুটটা হল তিব্বতিদের। ওটা পায়ে দিয়ে তারা অপদেবতাদের উদ্দেশে মুখোশ নৃত্য করে। এছাড়া হরিণের চামড়ার চটি, সৈনিকদের প্রাচীন ধাতব পাদুকা, কাঁটা লাগানো জুতো এমন নানা অদ্ভুত আইনি-বেআইনি নতুন-পুরনো পাদুকা রাখা আছে সে ঘরে! এবার তাদের সাথে সংগ্রহশালায় পরে কখনও বাড়ির বাইরে কেদারবাবুর স্থান পাবে এই সাপের চামড়ার জুতো। তবে তার সংগ্রহ যান না। সিংহর চামড়া, হরিণের চামড়া এসব নিষিদ্ধ জিনিস এদেশে। তাছাড়া ব্যবহার করলে তার সাধের সংগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে। কখনও সখনও ইচ্ছা হলে তিনি জুতোগুলো পায়ে দিয়ে ঘরেই হাঁটেন কিছুক্ষণ। তাতেই তিনি তৃপ্ত হন। তেমনই এই মাপের চামড়ার জুতোটাও কখনও সখনও ইচ্ছা হলে ঘরেই পরবেন।

জুতো জোড়া মাটিতে নামিয়ে তাতে পা গলালেন তিনি। দারুণ ফিট করেছে জুতোটা। পায়ের মাপ রাখা ছিল করিমের কাছে। করিম কারিগর বটে! জুতোটা পায়ে দিয়ে ঘরের মধ্যে কয়েক কদম হাঁটলেন কেদারবাবু। বাঃ কী আরাম! এ জুতো জোড়া সব সময় পায়ে দিতে পারলে ভালো হত। তবে তা তো করা যাবে না। তবে আজকের দিনটা অন্তত নাগড়ার মতো এ জুতোটা পায়ে গলিয়ে থাকবেন তা মনে মনে ভাবলেন কেদারবাবু।

সাপের চামড়ার জুতো পায়ে সংগ্রহশালা থেকে নিজের শোবার ঘরে এলেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ সে জুতো পায়ে শোবার ঘরে আর বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করলেন। বেশ আত্মতৃপ্তি বোধ হল তার। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর রাত আটটা নাগাদ সামান্য কিছু খাবার গরম করে তা খেয়ে বিছানার দিকে এগোলেন তিনি। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে। পরদিন ভোরবেলা একটা কাজে ভানুলালের ডাকতে আসার কথা তাকে। বিছানায় ওঠার আগে তিনি খাটের সামনেই ছেড়ে রাখলেন জুতো জোড়া।

তখন মাঝ রাত। একটা দেড়টা হয়তো হবে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল কেদারবাবুর। তার যেন মনে হল দোতলার ঘরের খোলা জানলা দিয়ে অস্পষ্ট একটা শব্দ ভেসে আসছে। তুবড়ি বাঁশির শব্দ! তিনি কি আজও স্বপ্নের মধ্যে শুনতে পাচ্ছেন সেই শব্দ? কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারলেন, না স্বপ্ন নয়, উত্তর কলকাতার অলিগলি বেয়ে শব্দটা যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে কাছে। সাপুড়িয়া তুবড়ি বাঁশির এক অদ্ভুত করুণ শব্দ। সনা সাপুড়িয়া আবার এত রাতে ফিরে এল নাকি? নইলে এত রাতে তুবড়ি বাঁশি কে বাজায়? খাটের ওপর কেদারবাবু প্রথমে উঠে বসলেন। হ্যাঁ, শব্দটা তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন। খাট থেকে তিনি তাড়াতাড়ি নামলেন। পায়ের সামনেই রাখা ছিল সাপের চামড়ার নতুন জুতো জোড়া। সে দুটোতে পা গলিয়ে তিনি জানলার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গরাদ ধরে বাইরে তাকালেন। নীচে উত্তর কলকাতার সর্পিল নির্জন গলি। কেউ কোথাও নেই। একটা কুকুর পর্যন্ত নয়। আশেপাশের বাড়িগুলোরও বাতি নিভে গেছে। এত রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে সব। শুধু একটা ল্যাম্প পোস্টের ক্ষয়াটে বাতি আলো ছড়াচ্ছে নিঃ সঙ্গ গলিটাতে। কিন্তু বাঁশির শব্দ ক্রমশ যেন এগিয়ে আসছে কাছে, আরও কাছে...। অদ্ভুত করুণ আত্মবিলাপ যেন! এক সময় সেই শব্দ পৌঁছে গেল কেদারবাবুর জানলার ঠিক নীচে রাস্তায়।

কিন্তু নীচে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না তিনি। কিন্তু শব্দটা যেন ঠিক তার জানলার নীচ থেকেই আসছে! কেদারবাবু আরও আশ্চর্য হলেন এই ভেবে যে, মাঝরাতে এমন শব্দ শুনে আশেপাশের লোকদের তো উঠে পড়ার কথা! কিন্তু কেউ উঠে দরজা জানলা খুলছে না কেন? অথচ তুবড়ি বাঁশির শব্দটা বেশ জোরেই হচ্ছে! বিষণ্ণ এক আর্তবিলাপের সুর!

কেদারবাবু ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না ব্যাপারটা। ঘরের আলো জ্বালালেন তিনি। তার কিছুটা গিয়ে পড়ল নীচের রাস্তায়। জানলার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে কেদারবাবু যথাসম্ভব উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগলেন কাউকে কোথাও দেখা যায় কিনা? বেশ কিছুক্ষণ করুণ সুরে বাজবার পর হঠাৎই যেন বদলে গেল সে বাঁশির শব্দ। সে শব্দ বদলে গেল দ্রুত লয়ে। ঠিক যেমন সাপ খেলা দেখাবার সময় সাপুড়েরা বাঁশি বাজায় ঠিক তেমনই। আর ঠিক তখনই কেদারবাবু অদ্ভুত এক শীতল স্পর্শ অনুভব করলেন তাঁর পায়ে। জানলা থেকে সরে এসে ঘরের মাঝখানে উজ্জ্বল আলোতে দাঁড়িয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকালেন তিনি। আরে জুতোর শুঁড় দুটো যেন নড়ছে! ক্রমশই তারা যেন সাপের ফণার আকার ধারণ করছে! নড়েচড়ে উঠছে তার জুতো জোড়া। বিস্মিত কেদারবাবু তার পা থেকে জুতো জোড়া খোলার চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই তিনি দেখলেন, জুতো কোথায়, তার পায়ের পাতা দুটো জড়িয়ে ধরে আছে দুটো রাজগোখরো! বাঁশির শব্দে ক্রমশ মাথা তুলছে তারা। কেদারবাবু নড়তে পারছেন না এমনভাবে সাপ দুটো পেঁচিয়ে ধরেছে তার পা। বাঁশির শব্দ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, দ্রুত লয়ে, আরও দ্রুত লয়ে বাজতে শুরু করল বাঁশি। আর তার সঙ্গে সঙ্গে লেজে পা জড়িয়ে ক্রমশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কেদারবাবুর বুকের দিকে উঠে দাঁড়াতে শুরু করল সাপ দুটো। ঠিক যেমন সনা সাপুড়ের বাঁশির সুরে সেদিন উঠে দাঁড়াচ্ছিল তার বাসুকী আর শেষ নাগ। এক সময় তারা সত্যিই উঠে এল কেদারবাবুর বুকের কাছে। ছোবল মারার জন্য তারা ফণা দুটোকে একটু পিছন দিকে হেলিয়ে তীব্র শব্দ করে উঠল— ‘হি-স্-স্...’। আতঙ্কে চিৎকার করার চেষ্টা করলেন কেদারবাবু। কিন্তু আতঙ্কে তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না, অথবা সে শব্দ চাপা পড়ে গেল তুবড়ি বাঁশির শব্দে।

বন্ধ ঘরের দরজা ভেঙে পরদিন উদ্ধার করা হয়েছিল কেদারবাবুর মৃতদেহ। তার চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছিল আতঙ্কে। এ ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগায় পুলিশ তার মৃতদেহ হাসপাতালে পাঠিয়েছিল ময়নাতদন্তে। কিন্তু ময়নাতদন্তে বা পোস্ট মর্টেমে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। ডাক্তার বলল 'কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট' অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। কোনো আতঙ্কর কারণেও অবশ্য এ ঘটনা ঘটতে পারে।

শেষ বিকালে হাসপাতালের লাশকাটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে হারু ডোমের বখশিস মেটাচ্ছিল ভানুলাল। শ্মশানযাত্রার জন্য কেদারবাবুর মৃতদেহ ম্যাটাডরে তোলা হয়ে গেছে। টাকাটা দেবার পর ভানুলালের হঠাৎই চোখ গেল লাশকাটা ঘরের বাইরে কিছুটা তফাতে একটা আবর্জনার স্তূপের ওপর। সেখানে পড়ে আছে একটা তুবড়িবাঁশি। সেটা দেখেই ভানুলালের মনে পড়ে গেল সপ্তাহ দুই আগে বাঘমুণ্ডি পাহাড়ের সেই বিকালের কথা। সনা সাপুড়ে তার উঠানে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে। আর তার তালে তালে ক্রমশ মাথা তুলছে দুটো বিরাট সাপ। বাসুকী আর শেষ নাগ।

একটু কৌতূহলী হয়ে ভানুলাল জানতে চাইল, 'ওই সাপের বাঁশি ওখানে পড়ে কেন?’

হারু ডোম জবাব দিল, 'কাল বিকালে পুলিশ একটা বেওয়ারিশ লাশ এনেছিল। সাপুড়ের লাশ। বাঁশিটা ওই লাশের সঙ্গেই ছিল। লোকটা নাকি দুপুরবেলা পাগলের মতো ওই বাঁশিটা বাজিয়ে রাস্তা ধরে ছুটছিল। তারপর একটা বাসের তলায় চলে যায়। বাঁশিটাই ওর সঙ্গে ছিল, সঙ্গে কোনো সাপ ছিল না।’

অধ্যায় ১০ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%