হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

রাত প্রায় ন'টা। এবারের মতো মেলা শেষের ঘণ্টা অনেকক্ষণ আগেই বেজে গেছে। ঘরমুখো হয়ে গেছে বইপ্রেমী মানুষের ঢল। ফাঁকা বই মেলার মাঠ। পঞ্চাননবাবু তার স্টলের এক কোণে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন। কিছুটা তফাতে আর একটা টেবিলে বসে তার কর্মী হারু ক্যাশের হিসেব করছে। বিক্রিবাটা এমনিতে মন্দ হয়নি। প্রকাশক হিসেবে পঞ্চাননবাবুর এতে উৎফুল্ল হবারই কথা। কিন্তু যতবার সামনের দেওয়াল জোড়া র্যাকের দিকে চোখ যাচ্ছে ততবারই তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের সব র্যাকগুলোও মেলা শুরুর দিন বই ঠাসা ছিল, এখন সেগুলো প্রায় খালি। কিন্তু ওই র্যাকটা ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত ‘বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ'-এ ঠাসা। ওটাই বইয়ের নাম। সারা মেলায় মাত্র তিনজন বইটা নিয়েছিল। তার মধ্যে দুজন কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসে পালটে অন্য বই নিয়ে গেছে। কেনার সময় তারা নাকি সেটাকে ভূতের বই বলে ভেবেছিল। অবশ্য তাদের খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। বইটার মলাটে, স্পাইনে 'বাঙালির ভূত'-এর পর 'ভবিষ্যৎ' শব্দটা আবছা ভাবে ছাপা লেখক বলেছিলেন, 'ভবিষ্যৎ' শব্দটা আবছা ভাবে লিখলে নাকি বাঙালির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ বাড়বে। এটা ‘বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ'-বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড। প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেছিলেন অন্য এক প্রকাশক। সে বইতে আবার 'ভূত' শব্দটা এমনই অস্পষ্ট ভাবে ছাপানো হয়েছিল। আর তাতে নাকি অদ্ভুত ফল পাওয়া গেছিল। লেখকের কাছে তার একটা মাত্র কপি ছাড়া, প্রথম খণ্ডের কোনো কপি পড়ে নেই। পঞ্চাননবাবুও বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ব্যাপারটা সত্যি। কিন্তু এবার কী হল ?
হিসাবপত্র শেষ করে হারু বলল, 'আমি এবার মাঠের বাইরে গিয়ে দেখি, বইপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি এসেছে কিনা ?”
পঞ্চাননবাবুর চোখ বারবার চলে যেতে লাগল, 'বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ' ঠাসা র্যাকগুলোর দিকে। বেশ কিছু টাকা লগ্নি হয়ে গেছে ও বইতে। ভাবতে ভাবতে পঞ্চাননবাবুর মাথা গরম হয়ে উঠতে শুরু করল। অস্পষ্ট ভাবে তিনি বলে উঠলেন শালা !”
না। এটা গালাগাল নয়। নিজের ছোট শ্যালক বিকাশের কথা ভেবেই শব্দটা প্রয়োগ করলেন তিনি। তার জন্যেই এ বই ছাপাবার ব্যাপারে তিনি জড়িয়ে গেলেন। নইলে এতদিন ধরে নিজের বুদ্ধিতে তিনি যে বইগুলো ছাপিয়েছেন, এই যেমন, 'বাথরুমে বাঁধাকপি চাষ’, ‘আলতার আলপনা', ‘সরল সূচি কর্ম', 'সকালে হেঁটে সুস্থ থাকুন'-এসব বইগুলো ভালো ব্যবসা দিয়েছে। পঞ্চানন প্রকাশনার ‘সাতদিনে শল্য চিকিৎসা শিখুন' বইটা তো তিন বছরে পাঁচবার ছাপতে হয়েছে।
মাস দুই আগের ঘটনা। শ্যালিকার বিয়ে উপলক্ষে অনুষ্ঠান বাড়িতে গেছিলেন। আত্মীয় বন্ধু মিলে একটা ঘরে আড্ডা চলছিল। শ্যালক বিকাশ বেশ চালিয়াত ধরনের ছেলে। এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সে করনিকের চাকরী করে। যদিও বিকাশ তিনবারে মাধ্যমিক পাশ, কিন্তু যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের মধ্যে একটা বিরাট ব্যাপার, তাই সেখানকার কর্মী বলে বিকাশকে সবাই সম্ভ্রমের চোখে দেখে।
সেদিন আলোচনার সময় হঠাৎ সে পঞ্চাননবাবুকে বলল, 'জামাইবাবু, আপনি এবার হালকা বই ছাপানো ছেড়ে একটু ভালো বই ছাপাবার চেষ্টা করুন। যে বই আপনার প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাড়াবে। প্রকাশক হিসেবে পুরস্কার এনে দেবে।'
পঞ্চাননবাবু পাশ কাটাবার জন্য বলেছিলেন, 'তেমন লেখকের তো বাজারে আকাল। নইলে আমি কি আর তাদের বই ছাপতাম না?”
বিকাশ বলে উঠেছিল, 'আমি থাকতে আপনার চিন্তা কী? আমাদের সোশিয়োলজি ডিপার্টমেন্টের হেড বিশ্বজীবন বাচস্পতিকে আমি রাজি করাব আপনাকে বই দেওয়ার জন্য। “বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ” বলে তিনি একটা বই লিখেছেন। প্রথম খণ্ড বাজারে আসা মাত্রই শেষ। ও বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ড লেখার কাজও শেষ। বইটা নির্ঘাত অ্যাকাডেমি পুরস্কার পাবে। ওই দ্বিতীয় খণ্ডটা ওনাকে বলে আপনাকে দেওয়ার ব্যবস্থা করব?'
এ কথা শোনার পরও চুপ করেছিলেন পঞ্চাননবাবু। পাশে বসা গৃহিণী বলে উঠলেন, 'আমার ভাইয়ের প্রতি কি তোমার বিশ্বাস নেই? ও যখন বলছে তখন এতবড় সুযোগ হাতছাড়া করছ কেন ?'
ঘাড় নাড়ল ঘরের অন্যরা। এরপর আর বিকাশের কথায় না করা যায় না। 'ঠিক আছে। ভদ্রলোককে তুমি বইপাড়ায় আমার অফিসে নিয়ে এসো।'—বলেছিলেন পঞ্চাননবাবু।
ক'দিনের মধ্যে বিকাশ অধ্যাপক বিশ্বজীবন বাচস্পতিকে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন তার কাছে। লম্বা-চওড়া চেহারা বাচস্পতিবাবুর। নাকের ডগায় ভারী চশমা। কাঁধে পেটমোটা শান্তিনিকেতনি ঝোলা। গম্ভীর কথাবার্তা। সত্যি কথা বলতে কী, তাঁকে দেখে, কথাবার্তা শুনে বেশ ইম্প্রেসড হয়েছিলেন পঞ্চাননবাবু। রাজি হয়ে গেছিলেন তাঁর বই ছাপতে। এরপর বিকাশের সঙ্গে বিশ্বজীবন বাচস্পতি বেশ কয়েকবার পঞ্চাননবাবুর অফিসে এসেছিলেন। কিন্তু মেলা শুরুর পর থেকে তাদের নো-পাত্তা। বিকাশ তার পরিবার নিয়ে হরিদ্বার বেড়াতে গেছে। বিশ্বজীবনবাবু নাকি সাসারামে সমাজতত্ত্ব বিষয়ক কোনো সেমিনারে বক্তৃতা করতে গেছেন। তাঁর মোবাইল সুইচড অফ।
কী কুক্ষনেই যে রাজি হয়েছিলাম!' শালা, শব্দটা উচ্চারণের পর মনে মনে এ কথাটাও ভাবছিলেন পঞ্চাননবাবু। এই সময় একজন স্টলের ভিতর প্রবেশ করল। এখনও কাস্টমার "মেলায় রয়ে গেছে? নাকি ডেকরেটার্সের লোক স্টল খুলতে এসে গেছে? পঞ্চাননবাবু অবাক চোখে দেখলেন লোকটাকে।
লোকটার চেহারা একটু সিড়িঙ্গে ধরনের। তবে কাপড়জামা ধোপদুরস্ত। ফর্সা ধুতি-পাঞ্জাবির ওপর একটা কালো আলপাকার কোট। পঞ্চাননবাবুর স্টলে এখন একটাই আলো জ্বলছে, সেই আলোতে কেমন বিষণ্ণ মনে হচ্ছে লোকটার মুখ। চারপাশের র্যাকগুলোর দিকে তাকাচ্ছে লোকটা। তারপর গিয়ে দাঁড়াল 'বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ' বোঝাই র্যাকটার সামনে। নিজের মনেই বলল 'বাঙালির ভূত।'
শেষ বেলায় কাউকে প্রতারিত করা ঠিক নয়, পঞ্চাননবাবু বললেন, 'বাঙালির ভূত নয়, ভবিষ্যৎ কথাটাও আছে। ওটা ভূতের বই নয়। তবে ভালো বই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের লেখা গবেষণালব্ধ বই।
লোকটা মলাট খুলে উলটোতে উলটোতে বলল, 'আমি জানি এটা ভূতের বই নয়। এর প্রথম খণ্ড পড়েছি।'
পঞ্চাননবাবু একটু আশান্বিত হয়ে বললেন, 'এ বইয়ের প্রথম খণ্ড একটাও বাজারে পড়ে নেই। এই দ্বিতীয় খণ্ডটা....
আগন্তুক তাঁর কথা শেষ না করতে দিয়ে বলল, 'প্রথম খণ্ডটার ব্যাপারে আমি জানি। সেটা যে বাজারে আর একটা কপি নেই সেটাও সত্যি। তবে এই দ্বিতীয় খণ্ড যে আপনি দু-এক কপির বেশি বিক্রি করতে পারেননি, তা-ও বুঝেছি।'
পঞ্চাননবাবু আমতা আমতা করে বললেন, “ইয়ে মানে, এসব বইয়ের সমঝদার পাঠক তো সব সময় পাওয়া যায় না।'
লোকটা পঞ্চাননবাবুর দিকে তাকিয়ে বললে, 'বুঝলাম। আপনি তো বেশ পয়সা খরচ করেছেন। কিন্তু একটা এডিশন শেষ হতে যদি দশবছর সময় লাগে তবে তো আপনার ক্যাপিটাল নিয়েও টানাটানি হবে। আমিও একজন প্রকাশক। ব্যাপারটা আমি বুঝি। আমার নাম নিমাই প্ৰামাণিক।
ভদ্রলোক প্রকাশক! পঞ্চাননবাবু বলে ফেললেন, 'এ আশঙ্কা আমারও হচ্ছে। আসলে এ ধরনের বই আমি আগে কোনোদিন ছাপাইনি। লেখক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। পণ্ডিত মানুষ। বইটা যে মার্কেট পাবে না, তা বুঝতে পারিনি। এ বইয়ের প্রথম খণ্ডটা মার্কেটে নেই দেখে দ্বিতীয় খণ্ডের বিক্রির ব্যাপারে আমার মনে একটা আশা জেগেছিল।'
- 'ক-কপি ছাপিয়েছেন ?'
—‘হাজার কপি’। ‘সঙ্গোপনে সাইকেল চালনা শিক্ষা' নামে একটা বই করার জন্য একজন এসেছিল আমার কাছে। “বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ” করতে গিয়ে ফিরিয়ে দিলাম। সে বইটা করলে এত বিপদে পড়তে হত না।'
—‘হ্যাঁ, তা হত না। তবে এখন সে-সব ভেবে লাভ নেই। আচ্ছা, সব বইগুলো নিলে, আপনি কী দামে ছাড়তে পারবেন বলুন? হাফ দামে দিলে বইগুলোর একটা গতি করার চেষ্টা করতে পারি।'
পঞ্চাননবাবু একটু চুপ করে রইলেন। মনে মনে তিনি হিসেব কষতে লাগলেন। হ্যাঁ, ফিফটি পার্সেন্ট দামে ছাড়লেও লোকসান নেই। প্রথমে 'হ্যাঁ' বলে দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বইয়ের প্রথম খণ্ড নিঃশেষিত হবার ব্যাপারটা আবার মাথায় গণ্ডগোল পাকাল। এমনও তো হতে পারে যে বইমেলায় বইটা বিক্রি না হলেও, কলেজস্ট্রিট বইপাড়ায় বইটা কাটবে?
—“নিমাইবাবু, হাফ দামে বই ছাড়াটা চাপের হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন থার্টি ফাইভ অব্দি নামতে পারি।'
—'না, এক কথা। ফিফটি। নইলে যারা কিনবে তাদের বাজেটে কুলোবে না।'
—'ঠিক আছে। আমি দিন ছয় পর ব্যাপারটা আপনাকে জানাব। যদি ও সময় পর্যন্ত আপনি অপেক্ষা করতে পারেন। এই যে আমার বইয়ের ক্যাটলগ। এতে, নাম ঠিকানা, ফোন নম্বর লেখা আছে।'
—'ঠিক আছে। আজ রোববার। আমি সামনের রোববার সন্ধ্যায় আপনার অফিসে যাব। আপনি সম্মত হলে সেদিনই বইগুলো নগদে কিনে নেব। থাকবেন তো ??
—'হ্যাঁ,থাকব। যদিও বইপাড়া রোববার বন্ধ। ব্যবসার কাজ না হলেও আড্ডা দেওয়া যাবে। চলে আসুন।' নিমাই প্রামাণিক হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মেলা শেষ। বই পাড়াতে আবার ফিরে এলেন পঞ্চাননবাবু। 'বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ' বইটা ক'দিন ধরে নানা ভাবে বিক্রির চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাতে আর মাত্র দু-কপি বিক্রি হল বইটার। পঞ্চাননবাবু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, নিমাই প্রামাণিক যদি আদৌ আসে, তবে দিয়ে দেবেন।
সেই রবিবার চলে এল। সন্ধেবেলায় পঞ্চাননবাবু হাজির কাউন্টারে। নিঝুম বই পাড়া। শুধু বড় রাস্তাটা দিয়ে মাঝে মাঝে হুস হুস শব্দে গাড়ি যাচ্ছে। ঝাঁপ খুলে নিমাই প্রামাণিকের প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। কে জানে লোকটা আসবে কিনা।
নিমাই প্রামাণিক সত্যি-সত্যি এসে হাজির হলেন। প্রথমেই হেসে বললেন, 'নিশ্চয়ই বইটা এক-দুই কপির বেশি বিক্রি হয়নি? আমাকে বইটা দেবেন তো?'
—“হ্যাঁ দেব।’
বইয়ের দাম দুশো টাকা। একশো টাকা করে হাজার বই কিনে নিলেন ভদ্রলোক। একটা ম্যাটাডর ডেকে বইয়ের প্যাকেটগুলো তাতে ওঠানো হল।
—'বইগুলো যাচ্ছে কোথায় ?”
নৈহাটির রক্ষাকালী পাঠাগার বইগুলো নিচ্ছে। সময় পেলে শনিবার সন্ধেবেলা আমাদের ওখানে আসুন না। একটা অনুষ্ঠানও সেখানে। ক্লাবের নাম বললে সবাই চেনে।' জবাব দিলেন নিমাই বাবু
পঞ্চাননবাবু বললেন, নৈহাটি। আরে আমার বাড়ি তো শ্যামনগর। মাত্র দুটো স্টেশন। যাবার চেষ্টা করব। তা, পাঠাগার একই বই এত কিনে কী করবে?”
—‘একবার আসুন। দেখতেই পাবেন।' জবাব দিয়ে অন্ধকার রাস্তায় মিলিয়ে গেলেন নিমাইবাবু।
শনিবার ঘুম থেকে উঠেই সেদিন নিমাই প্রামাণিকের আমন্ত্রণের কথা মনে পড়ে গেল পঞ্চাননবাবুর। কলকাতার বই পাড়াতে আর গেলেন না তিনি। সারাদিন বাড়িতে কাটিয়ে সন্ধে নাগাদ নৈহাটির দিকে রওনা দিলেন।
নৈহাটিতে নেমে রক্ষাকালী পাঠাগারের কথা বলতেই লোকজন পথ বাতলে দিল। জায়গাটা গঙ্গার দিকে। কিছুটা পথ এগোতেই পঞ্চাননবাবু দেখলেন, আরও বহু লোকজন এগোচ্ছে সেদিকে। রাস্তায় আলোর তোরণ দিয়ে সাজানো হয়েছে। পথ চলতি লোকের আলোচনায় বুঝলেন, সেখানে নাকি রক্ষাকালী পুজো হচ্ছে। সেই উপলক্ষে একটা অভিনব ব্যাপার ঘটেছে। তাই দেখতে এত লোকজন।
পায়ে পায়ে পঞ্চাননবাবু পৌঁছে গেলেন সেখানে। টুনি দিয়ে সাজানো হয়েছে পাঠাগার। তার পাশেই আলো আঁধারি পরিবেশে বানানো হয়েছে রক্ষাকালীর পুজো প্যান্ডেল। তার বিশেষত্ব বই দিয়ে তৈরি করা একটা হানাবাড়ি। অভিনব থিম।
অবাক পঞ্চাননবাবু দেখলেন, সে বাড়ির গায়ে জেগে আছে 'বাঙালির ভূত' শব্দটা। বেশ কয়েকটা কঙ্কাল দাঁড় করানো আছে বাড়িটার সামনে। পঞ্চাননবাবুর বই দিয়েই প্যান্ডেলটা বানানো। কাতারে কাতারে লোক ঢুকছে সেই প্যান্ডেলে। তাঁর প্রকাশনার বই যে এমন ভৌতিক কাজে ব্যবহৃত হবে ভাবতে পারেননি পঞ্চাননবাবু। হাজার হোক বই ছাপানো হয় পড়ার জন্যে। প্যান্ডেল বানাবার জন্যে নয়।
পঞ্চাননবাবু বিমর্ষ হয়ে ফেরার পথ ধরলেন ৷
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে পথ ভুল করে ফেলেছিলেন। গলিটা অন্ধকার। হঠাৎ কানে এল, ‘ও মশাই কেমন দেখলেন?'
নিমাই প্রামাণিক।
পঞ্চাননবাবু বললেন, 'শেষ পর্যন্ত আমার বইগুলোর এমন গতি হল?'
—'বইগুলো তো আপনার বিক্রি হল। সেদিন রাতে ক্লাবের ছোকরাগুলো অভিনব কিছু করবে বলে আলোচনা করছিল। বুদ্ধিটা আমিই ওদের দিলাম। রাতে আমি এদিকে মাঝেমধ্যে আসি। যাক গে, বাঁ-দিকের রাস্তা ধরে এগোলে আপনি বড় রাস্তায় পৌঁছোবেন।' উত্তর দিলেন নিমাই বাবু
পঞ্চাননবাবু বললেন, “বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ-এর প্রথম খণ্ডরও এই দশা হয়েছিল কি না কে জানে?
—'না। তাদের অন্য দশা হয়েছিল।'
—'কীরকম?”
পিছন থেকে নিমাই প্রামাণিক জবাব দিলেন, 'প্রথম বইয়ের প্রকাশক বই বেচতে না পেরে শেষে আত্মহত্যা করে। অনেক ধার-দেনা করে তার প্রথম বই প্রকাশ করেছিলেন। এমনকী লাশ পোড়ানোর টাকাও ছিল না। শেষে কাঠের বদলে “বাঙালির ভূত-ভবিষ্যৎ”-এর প্রথম খণ্ড দিয়ে শেষ কাজ হয়েছিল।'
পঞ্চাননবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'আপনি এত কথা জানলেন কী করে ?”
‘জানলাম, কারণ...আমি বইটার প্রকাশক ছিলাম।” পঞ্চাননবাবু ভয়ানক চমকে উঠে দেখলেন, পিছনে কেউ নেই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন