ঘোস্ট হান্টার

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

—‘মশাই কি এ বাড়িতে আজই এসেছেন? দোতলার ভাঙা বারান্দায় যখন আপনার ছায়াটা পড়েছিল তখন তা দেখে আমি বেশ ইম্প্রেসড হয়েছিলাম। তারপর আপনি যখন দিনের আলোতে বাগানে নেমে এলেন তখন বুঝলাম আমার ভাবনা ঠিক নয়।' ফোয়ারার পিছন থেকে বেরিয়ে সুগতর মুখোমুখি হয়েই একগাল হেসে ভদ্রলোক কথাগুলো বললেন।

সুগত ভালো করে তাকাল ভদ্রলোকের দিকে। মাঝবয়সি ভদ্রলোক, মাথায় টাক, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, সাদা রঙের শার্ট, ট্রাউজারের ওপর অনেকগুলো পকেট-অলা একটা হাতকাটা জ্যাকেট। সুগত তাঁকে ভালো করে দেখার পর জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আজ দুপুরের ট্রেনেই 'এসেছি। আমার নাম সুগত। ক'টা দিন থাকব এখানে।’

ভদ্রলোক এরপর জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি কী করেন? শুনেছি এসব প্রাচীন বাড়িতে অনেক সময় মোহর-টোহর পাওয়া যায়। আপনি কি তেমন কোনো গুপ্তধন খুঁজতে এসেছেন? নাকি আপনি এ-বাড়ির কোনো শরিক?’

সুগত হেসে জবাব দিল, 'না, আমি সে দুটোর কোনোটাই নই। আমি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করি। সামনে পুজো, লেখার চাপ আছে, নিরিবিলিতে লেখার জায়গা খুঁজছিলাম। আমার এক উকিল বন্ধু পরিতোষের তত্ত্বাবধানে আছে এ বাড়িটা। অংশীদারদের মধ্যে কী একটা আইনি বিবাদ চলছে দুশো বছরের পুরোনো এই বাড়িটা নিয়ে। বন্ধু খোঁজ দিল। তার থেকে একটা ঘরের চাবি নিয়ে চলে এলাম। আজ এক তারিখ। চার-পাঁচ তারিখে ফিরে যাব।’

ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘ও পরিতোষবাবু। আমিও তো তাঁর কাছ থেকেই এ-বাড়িতে থাকার অনুমতি পেয়েছি। আমি যে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে আগে চাকরি করতাম তার লিগাল অ্যাডভাইসার ছিলেন উনি। সেই সূত্রেই আলাপ ওঁর সঙ্গে। আমি গতকাল রাতে এসেছি।'

সুগত এবার জিগ্যেস করল, 'তা আপনার পরিচয়টা? আপনি কী কাজে এখানে এসেছেন?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘ওহোঃ, আপনাকে এত কথা বললাম, অথচ নিজের পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি। আমার নাম বসন্ত সমাজপতি। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম। বেশ কিছুদিন লন্ডনে ছিলাম। সংসারপত্র পাতিনি।' একথা বলার পর তিনি সুগতকে চমকে দিয়ে বললেন, “বারাসতে নীলকর সাহেবদের এই পুরোনো বাড়িতে আমি ভূত খুঁজতে এসেছি।'

—‘ভূত খুঁজতে এসেছেন?” বিস্মিতভাবে বলে উঠল সুগত। আর যাই হোক ভদ্রলোককে দেখে পাগল তো মনে হচ্ছে না! বসন্তবাবু সম্ভবত সুগতর মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, 'হয়তো আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না, কিন্তু আমি সত্যিই একজন “ঘোস্ট হান্টার”। জানেন ইউরোপের অনেক জায়গাতে রীতিমতো বৈজ্ঞানিকভাবে এ কাজ করা হয়। আমি ও দেশে গিয়েই ব্যাপারটা জানতে পারি। 'ঘোস্ট হান্টার সোসাইটি' বলে একটা সংস্থা আছে লন্ডনে। সারা পৃথিবীর বহু খ্যাতনামা ডাক্তার, বৈজ্ঞানিক, অধ্যাপক তার সদস্য। তাদের উদ্যোগে বহু লোক ভূতের উপস্থিতি টের পেয়েছে এক সময়ের কুখ্যাত বন্দিশালা “টাওয়ার অফ লন্ডনে”। এমনকী আমাদের কলকাতা শহরেও তেমন কিছু বাড়ি আছে। যেমন গাস্টিন প্লেসে বেতার দপ্তরের পুরোনো বাড়িটা, বা আলিপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরির বিরাট বাড়িটা। আর এ-বাড়িতেও ভূত আছে বলে আমার ধারণা।' কথা শেষ করে বিকালের আলোতে সুগতদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় খণ্ডহর বিরাট দোতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন ভদ্রলোক।

সুগত নিজে ভূত-ভগবানে বিশ্বাস করে না। তার বেশ মজাই লাগল ভদ্রলোকের কথা শুনে।

ভূতের সঙ্গে বিজ্ঞান! সে জানতে চাইল, ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ করা হয় মানে?”

বসন্তবাবু বললেন, 'আসলে ভূতের উপস্থিতি প্রায়শই আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়তে ধরা দেয় না। তাদের উপস্থিতি বোঝার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। আপনি যদি আমার ঘরে এখন একবার চলেন তবে ব্যাপারটা আমি ভালো করে বোঝাতে পারি। দোতলার ডান দিকে তো আপনার ঘর, আর আমারটা বাঁ-দিকের শেষ মাথায়। যাবেন?'

ভদ্রলোকের কথা শুনে বেশ কৌতূহল লাগছে সুগতর। সে বলল, 'হ্যাঁ চলুন।' জীর্ণ, শুষ্ক ফোয়ারাটার পাশ থেকে বাড়িটার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বসন্তবাবু বললেন, 'জানি অনেকেই ভূতে বিশ্বাস করেন না, হয়তো বা আপনিও করেন না, কিন্তু আমাদের এই যে এত প্রাণ-স্পন্দন, ইংরিজিতে যাকে বলে “স্পিরিট”, মৃত্যুর পর তা কোথায় যায় ভেবে দেখেছেন? তারা অদৃশ্যভাবে থাকে আমাদের আশেপাশেই। গীতাতেও তো বলা হয়েছে “আত্মা অবিনশ্বর”। আমরা ব্যাপারটা পাত্তা না দিলেও বিদেশে অনেক কাজ হচ্ছে এ নিয়ে।'


বাড়িটাতে কয়েকটা ঘরই মাত্র বাসযোগ্য। উত্তরাধিকারীরা মাঝে-মধ্যে এসে থাকে। সুগত আর বসন্তবাবুর ঘর দুটো তার মধ্যে দুটো ঘর। দোতলায় উঠে বসন্তবাবুর ঘরে ঢুকে একটা টেবিলের পাশে দুটো চেয়ারে তারা বসল। জানলা দিয়ে আলো ঢুকছে ঘরে। বেশ কিছু ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি রাখা আছে টেবিলে। সুগতরা বসার পর বসন্তবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, যে কথা আপনাকে বলছিলাম, থিয়সফি বলে মৃত্যুর পর সব কিছু শেষ হয় না। রূপান্তর হয় মাত্র। অন্য রূপ পায় আত্মা। মাঝে মাঝে তারা শরীরী রূপ ধারণ করে দর্শন দিলেও সাধারণত তারা অদৃশ্যই থাকে। অদৃশ্য বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে আমাদের ইন্দ্রিয় তাদের ধরতে পারে না। কিন্তু টেবিলের এই যন্ত্রপাতিগুলো মানুষের ইন্দ্রিয়র চাইতে অনেক বেশি স্পর্শকাতর। পরিবেশের সামান্য কিছু পরিবর্তনও এদের নজর এড়ায় না। যে কোনো শব্দ, আলো, উত্তাপের তারতম্য নিখুঁতভাবে যন্ত্রগুলো ধরতে পারে।'

সুগত জিগ্যেস করল, 'কী রকম?'

বসন্তবাবু টেবিল থেকে একটা ছোট ক্যামেরা তুলে নিয়ে বললেন, 'এই যেমন এটা “আলট্রা ভায়োলেট রে” যুক্ত একটা অত্যাধুনিক ক্যামেরা। অন্ধকারের মধ্যে আমরা কোনো ছায়া দেখতে পাই না, কিন্তু এ ক্যামেরার চোখে তা ধরা পড়ে। তারপর ধরুন এই টেম্পারেচার গ্যাজেটটা। আমাদের প্রত্যেকের দেহেই টেম্পারেচার আছে। কারও উপস্থিতি ঘরের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। উষ্ণতার সূক্ষ্ম পার্থক্য হলে এর গায়ের ইন্ডিকেটর ল্যাম্পটা বিপবিপ শব্দে তা জানান দেয়। আর টেবিলের ওপর রাখা কালো রেডিয়োর মতো বাক্সটা হল সাউন্ড ডিটেকটর। খুব বেশি বা খুব কম কম্পাঙ্কের শব্দ যা মানুষ শুনতে পায় না, তা এই যন্ত্রে ধরা পড়ে।'— এভাবে বেশ কিছু ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র একের পর এক দেখিয়ে তার কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করলেন তিনি। সুগত বেশ চমৎকৃত হল বসন্তবাবুর ভূত ধরার জিনিসপত্র দেখে আর তাঁর কথা শুনে। কিন্তু সুগতকে তার নিজের কাজও করতে হবে। তাই সে একসময় চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল, 'এখন আমি যাই। এক বাড়িতে যখন আছি তখন দেখা হবেই। আর কোনো ভূতের খোঁজ পেলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন।'

ভদ্রলোক বললেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।'

বাড়িটাতে ইলেকট্রিসিটি নেই। ঘরে ফিরে এসে মোমের আলোতে লিখতে বসে গেল সুগত। একটানা অনেকক্ষণ লিখল সে। তারপর খাওয়া সেরে রাত বারোটা নাগাদ আলো নিভিয়ে সে যখন শুতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দরজায় ঠোকা দেবার শব্দ শুনে দরজা খুলে সুগত দেখল বসন্তবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। লিখতে লিখতে সুগত ভুলেই গেছিল তাঁর কথা। সুগত ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে তাঁকে জিগ্যেস করল, “এত রাতে কী ব্যাপার ? '

ভদ্রলোক বললেন, 'বাইরে বেরিয়ে ছিলাম। ঘরে ঢোকার আগে ভাবলাম একবার খোঁজ নিয়ে যাই আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা?'

সুগত হেসে বলল, ‘ধন্যবাদ। এখন পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয়নি। তা এত রাতে কোথায় গেছিলেন?”

ভদ্রলোক বললেন, — বাড়িটা অদ্ভুত বাড়ি মশাই। একসময় নীলকর সাহেবদের কুঠীবাড়ি ছিল এটা। আজ সকালে বাড়িটা পুরো ঘুরে দেখেছি। নীল পচবার বড় বড় চৌবাচ্চা, কাছারি ঘর, নাচঘর, এমনকী গুমঘরও এ বাড়িতে আছে। বাড়ির পিছন দিকের ভাঙা অংশে সেই গুমঘরটা - আছে। আমি সেখানে গেছিলাম।'

সুগত বলল, ‘এত রাতে সেখানে গেছিলেন? ভূত না থাকলেও সাপখোপও থাকতে পারে। তা যাদের আপনি খুঁজছেন, তাদের কারো উপস্থিতি টের পেলেন সেখানে?”

ভদ্রলোক হেসে বললেন, 'সাপের ব্যাপারটা আমার মাথায় আছে। সত্যি কথা বলতে কী আজ এখানে সাপ দেখেওছি। সব কাজেই তো কিছু ঝুঁকি নিতে হয়। না, যাদের খুঁজছি তাদের দেখা পাইনি এখনও। কাজ তো সবে শুরু করলাম। ওই গুমঘরে ক্যামেরা বসিয়ে এলাম। দেখা যাক কী হয় ?”

সুগত বলল, 'আচ্ছা, আপনি তো নিশ্চয়ই এর আগেও কোথাও না কোথাও ভূত খুঁজতে গেছিলেন? পেয়েছেন কিছু?'

বসন্তবাবু জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, গেছি বেশ কিছু জায়গাতে। কিন্তু তাদের দেখা পাওয়া তো সহজ নয়! কত লোকের সারা জীবন কেটে যায় তাদের খোঁজে। তবে ভানাগড় দুর্গের একটা বুরুজে আমার ক্যামেরাতে একটা ছায়ার ছবি উঠেছিল। ধোঁয়া ধোঁয়া একটা অবয়ব। পরে শুনেছিলাম ওই বুরুজ থেকে লাফিয়ে পড়ে এক সিপাই নাকি আত্মহত্যা করেছিল।' এরপর তিনি বললেন, ‘এত পুরোনো বাড়ি!' কত ঘটনার সাক্ষী ছিল একসময়। আমার ধারণা এখানে আমার আসা ব্যর্থ হবে না। কাল নাচঘরেও একটা ক্যামেরা আর টেম্পারেচার গ্যাজেটটা বসাব। ঠিক আছে আমি এখন যাই। অনেক রাত হল।'— এই বলে বসন্তবাবু নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

সুগত ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে করতে মনে মনে বলল, ‘মানুষের কী উদ্ভট শখ। ভূতের খোঁজে নইলে কেউ ঘুরে বেড়ায়!'


পরদিন লেখার চাপে সারাদিন ঘর ছেড়ে বেরোনো হল না সুগতর। সন্ধ্যাবেলায় তার ঘরে এসে হাজির হলেন বসন্তবাবু। তিনি জানতে চাইলেন, ‘লেখা কেমন চলছে?’

সুগত বলল, “ভালো, ওদিকে আপনার কী খবর। কারো উপস্থিতি ধরা-টরা পড়ল?’

তিনি হেসে জবাব দিলেন, 'এখনও পড়েনি, তবে আমার ধারণা নিশ্চয়ই পড়বে। জানেন, নাচঘরে ওই টেম্পারেচার গ্যাজেটটা বসাবার সময়ই বিপবিপ শব্দ হয়েছে দুবার। বিশাল ঘরটা কী গা-ছমছমে মশাই! মনে হচ্ছিল ঘরের কোণ থেকে কারা যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকে ! আজ গ্রামে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম এ বাড়িটার ব্যাপারে। তাতে তারা যা বলল তাতে এ বাড়িটা নাকি ভূতুড়ে। মাঝরাতে নাকি এ-বাড়ি থেকে শোনা যায় আর্তনাদের শব্দ। ঘোড়ার ডাক, নাচগানের আওয়াজ! একবার নাকি এ-বাড়ির বারান্দায় লালমুখো এক নীলকর সাহেবকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল গ্রামের একজন।'

সুগত হেসে ফেলে বলল, 'কই আমরা তেমন কিছু শব্দ শুনতে বা দেখতে পাচ্ছি না তো?

ভদ্রলোক মনে হয় মৃদু আহত হলেন সুগতর অবিশ্বাসের ঢঙে বলা কথাগুলো শুনে। তিনি বললেন, 'তারা কি সব সময় ধরা দেয়? তাদের প্রতি বিশ্বাস রাখুন, তা হলে হয়তো আপনিও তাদের দেখতে পাবেন।’

এরপর তার সঙ্গে আরও কিছু কথা বলে নিজের ঘরে চলে গেলেন ভদ্রলোক। সুগতর সঙ্গে তাঁর আবার দেখা হল পরদিন বিকালে। সকাল থেকে শুরু করে সারা দুপুর নিজের কাজ করেছে সুগত। শেষ দিকে একটা কলম একটু গণ্ডগোল করছিল। ঠিক মতো কালি আসছে না নিবে। তাছাড়া একটানা লিখতে আর ভালোও লাগছিল না তার। কাজেই একঘেয়েমি কাটাতে সে দোতলার ঘর থেকে নেমে এসেছিল বাগানে। বাগান বলতে একটা আগাছার জঙ্গল। আর তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ডানা ভাঙা পাথরের পরি সমেত ফোয়ারা। সুগত দেখল একতলার একটা ভাঙাচোরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বসন্তবাবু। হাতে ধরা দুটো যন্ত্র। সুগত জিজ্ঞেস করল, “কী, কিছু ধরা পড়ল আপনার যন্ত্রে?”

তিনি প্রশ্ন শুনে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন, 'আর বলবেন না মশাই! এখানে যে ভাম বিড়াল আছে তা জানা ছিল না। নাচঘরে দেখি সে তার জড়িয়ে বসে আছে। তার-টার ছিঁড়ে একাকার কাণ্ড। এখন তো সবে বেলা চারটে। কলকাতা তো মাত্র একঘণ্টার পথ। ভাবছি এ জিনিসগুলো কলকাতা গিয়ে ঠিক করে আনি। রাতের মধ্যেই আবার ফিরে আসব।'

ভূতের বদলে ভাম বিড়াল! সুগত শুনে হেসে ফেলতে গিয়েও সংযত হল। ভদ্রলোক দুঃখ পেতে পারেন। তবে তাঁর কলকাতা যাবার কথা শুনে সুগত তাঁকে বলল, 'আপনি তো কলকাতা যাচ্ছেন, আমার একটা উপকার করতে পারবেন? আমার দুটো কলমের একটা খারাপ হয়ে গেছে। যদি আপনি একটা কলম কিনে এনে দেন...।' কী কলম, আর তা কোথায় পাওয়া যাবে তাও তাঁকে বলল সুগত।

বসন্তবাবু বললেন, 'নিশ্চয়ই আনব।' এই বলে তিনি হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সুগত কিছুক্ষণ বাগানে বেড়িয়ে আবার ঘরে ফিরে লিখতে বসে গেল। লেখায় ডুবে গেলে সময় কীভাবে কেটে যায় তা বোঝা যায় না। দরজায় টোকা পড়ার শব্দ শুনে সুগত দেখল রাত দশটা বাজে। সে দরজা খুলতেই বসন্তবাবু বললেন, ‘এইমাত্র ফিরলাম। ট্রেনে-বাসে যা ভিড় আর বলবেন না। পথে-ঘাটে আর বেরোনো যায় না। ভাগ্য ভালো আমার কাজ হয়েছে। জিনিসগুলো সারিয়ে এনেছি। আর এই নিন আপনার কলম। আমি এখন যাই। খুব ক্লান্ত লাগছে।'

সুগত বলল, 'কলমের দামটা নিয়ে যান।'

ভদ্রলোক বললেন, “না, না, দাম নিতে পারব না। আপনি লেখক মানুষ বলে কথা! কলমটা আপনাকে আমি উপহার দিলাম। কলকাতায় গিয়ে পরিতোষবাবুর সঙ্গেও দেখা করলাম। তিনি আপনার অনেক প্রশংসা করলেন। এখান থেকে চলে যাবার পর হয়তো আমাদের আর দেখা হবে না। কলমটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।' এই বলে তিনি এগোলেন তাঁর ঘরের দিকে।

বসন্তবাবুর কলমটাতে বেশ ঝরঝরে লেখা হচ্ছে। বসন্তবাবুর কলমটা দিয়ে পরদিনও সারাটা সময় সুগত লিখে কাটাল। এদিন রাতে কিন্তু আগের দু-রাতের মতো তার খোঁজ নিতে এলেন না বসন্তবাবু। শুধু রাত আটটা নাগাদ ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে সুগত একেবারের জন্য দূর থেকে দেখতে পেয়েছিল তাঁকে। চাঁদের আলোতে তিনি ভাঙা বাড়ির একতলার একটা অংশ থেকে বেরিয়ে অন্যদিকে ঢুকে গেলেন। ভূত খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি।

চতুর্থ দিন বিকাল পর্যন্ত লিখে অবশেষে সুগত লেখাটা শেষ করে ফেলল। প্রায় দুটো দিন হতে চলল বসন্তবাবুর সাক্ষাৎ পায়নি সুগত। লেখা শেষ করে বসন্তবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে দেখল সে ঘর তালাবন্ধ। নীচে নেমে তাঁকে বাগানেও খুঁজল সে। কিন্তু তাঁর খোঁজ মিলল না। তিনি কি সুগতকে না জানিয়েই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। হয়তো বা তা হতে পারে। এ বাড়িতে শেষ পর্যন্ত নিশ্চয়ই তিনি কিছুই খুঁজে পাননি। পাবার কথাও নয়। কারণ, ভূত বলে তো কিছুই নেই। হয়তো সুগতর প্রশ্নর সামনে দাঁড়াতে চাননি তিনি।— এসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরে এল সুগত। পরদিন ভোরে কলকাতা ফিরে যাবে সুগত।

বসন্তবাবু লোকটাকে এমনিতে বেশ ভালোই লেগেছিল তার। যাবার আগে একবার সুগতর তাঁর সঙ্গে দেখা হলে ভালো লাগত। কেন জানি সুগতর বারবার মনে হতে লাগল বসন্তবাবুর কথা। পরদিন ভোরবেলা আলো ফুটলে কলকাতা রওনা হতে হবে বলে রাত আটটা নাগাদ তার জিনিসপত্র সুটকেসে গুছিয়ে নিচ্ছিল সে। হঠাৎ তার ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই সে দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বসন্তবাবু!

সুগত তাঁকে দেখেই বলল, 'আরে, আপনার তো দেখাই নেই! আজ বিকালে আপনাকে কত খুঁজলাম, পেলাম না। বাইরে গেছিলেন নাকি? কাল ভোরে আমি চলে যাচ্ছি।'

ভদ্রলোক জবাব দিলেন, 'জানি সে জন্যই তো আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। দিনের বেলা আপনার সঙ্গে দেখা হবে না। আমি কোথাও যাইনি। ভূতের খোঁজে এ-বাড়ির নানা জায়গাতে অন্ধকারে ঘুরছিলাম।'

সুগতর মুখ দিয়ে প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল, 'আপনার যন্ত্রে কিছু ধরা পড়ল?'

ভদ্রলোক প্রশ্ন শুনে আক্ষেপের স্বরে বললেন, ‘যন্ত্রগুলোর কথা আর বলবেন না মশাই। সে দিন তো কলকাতায় ওগুলো সারাতে নিয়ে গেলাম। ছোকরা মিস্ত্রিটা মনে হয় ভুলভাল তার জুড়ে দিয়েছে। গণ্ডগোল করছে সব যন্ত্রগুলো।'

—'সে কীরকম?”

ভদ্রলোক বিষণ্ণ হেসে বললেন, 'যেখানে ওগুলো বসিয়েছি সেই নাচঘরে পা রাখলে ক্যামেরাটা শুধু আমার ছবিই তুলে যাচ্ছে! টেম্পারেচার গ্যাজেটটা লাল আলো জ্বালিয়ে বিপ্‌বিপ্ শব্দ করেই চলেছে!'

সুগত শুনে বলল, ‘তবে কী করবেন? কলকাতা ফিরে যাবেন নাকি?’

বসন্তবাবু বললেন, “না, যন্ত্র ছাড়াই ভূত খুঁজে পাওয়া যায় কিনা দেখি? তা ছাড়া বাড়িটা আমার ভালো লেগে গেছে বেশ। এখানেই থাকব ভাবছি। আচ্ছা এবার আসি।' এই বলে সুগতকে নমস্কার জানিয়ে ভদ্রলোক সিঁড়ির দিকে এগোলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুগত কিছুক্ষণ পর দেখতে পেল চাঁদনি রাতে আগাছাপূর্ণ বাগানের মধ্যে দিয়ে নাচঘরের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন তিনি। ভূত খুঁজতে যাচ্ছেন বসন্তবাবু।

ভোরবেলাই সুগত সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। বেরোবার সময় বসন্তবাবুর সঙ্গে দেখা হয়নি তার। হওয়ার কথাও ছিল না। বারাসাত থেকে ট্রেনে কলকাতা পৌঁছে সুগত ট্যাক্সি নিয়ে পরিতোষের চেম্বারে ছুটল চাবিটা ফেরত দেবার জন্য। বাড়িটাতে সুগতর কেমন কাটল এসব টুকিটাকি খবর জানার পর পরিতোষ বলল, 'একটা খারাপ খবর আছে। ও বাড়িতে বসন্ত সমাজপতি বলে যে ভদ্রলোকের সঙ্গে তোর পরিচয় হয়েছিল সে ভদ্রলোক মারা গেছেন।'

সুগত চমকে উঠে বলল, 'সে কী! কখন?’

পরিতোষ বলল, 'তিনদিন আগে বিকালে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন কী সব যন্ত্রপাতি ঠিক করাতে। ফাঁক পেয়ে আমার এখানেও মিনিট পাঁচেকের জন্য দেখা করতে এলেন। বললেন তোর জন্য একটা কলমও কিনেছেন। কিন্তু এখান থেকে বেরিয়েই ধর্মতলার মোড়ে দুর্ঘটনাটা ঘটল। বাস চাপা পড়েছিলেন। স্পট ডেড।'

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সুগতর মাথাটা কেমন করে উঠল। তাহলে কার সঙ্গে ও-বাড়িতে তিন রাত কাটাল সুগত? কিন্তু এমন ব্যাপার হতে পারে নাকি? আর এরপরই সুগতর মনে পড়ে গেল গতরাতে বসন্তবাবুর সে কথা— ‘ক্যামেরাটা শুধু আমার ছবিই তুলে যাচ্ছে! টেম্পারেচার গ্যাজেটটা লাল আলো জ্বালিয়ে বিবিপ্ করেই চলেছে...।'

বসন্তবাবুর যন্ত্রগুলো কি তবে সত্যিই ঠিকমতো কাজ করছিল!!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%