অদ্ভুত যাত্ৰী

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সঞ্জয় সাত সকালেই টেলিফোনটা পেল। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে মুম্বাই পোর্ট অথরিটির পাবলিক রিলেশন অফিসার প্রভাকর রেড্ডি বললেন, 'মিস্টার রক্ষিত, আপনি কি বেলা দশটা নাগাদ একবার অনুগ্রহ করে পোর্টে আসতে পারবেন?’

ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার মুম্বাই পোর্টে যাবার সূত্রে মিস্টার রেড্ডি সৃঞ্জয়ের পূর্ব পরিচিত। পেশাগতভাবে সৃঞ্জয় একটা কলেজে নৃতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতা করলেও তার বিশেষ পরিচিতি মানবাধিকার আন্দোলনের একজন কর্মী হিসাবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সৃঞ্জয়কে এদেশে তাঁদের সম্মানীয় আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হিসাবেও কিছুদিন হল নির্বাচিত করেছে। এদেশেও মানবাধিকার সংক্রান্ত বেশ কয়েকটা সরকারি কমিটিতে সে আছে। একাজের জন্যই মাঝে মাঝে এখান ওখান থেকে ডাক আসে তার। এই যেমন তাকে অনেক সময় ডকেও যেতে হয়। এর কারণ হল, অনেক সময় ভিনদেশি জাহাজের কুলি-খালাসি অর্থাৎ পদমর্যাদায় নিম্নশ্রেণির কর্মীরা বন্দরে নেমে জাহাজের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ জানায়। বিশেষত যেসব মালবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেন ও উচ্চপদমর্যাদার অফিসাররা সাদা চামড়ার ও কুলিশ্রেণির লোকরা কালো চামড়ার, সেখান থেকে এখনও এ ধরনের কিছু অভিযোগ এই সভ্য পৃথিবীতেও পাওয়া যায়। সৃঞ্জয় যেহেতু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তাই ওই সব ক্ষেত্রে অনেক সময় সৃঞ্জয়কে বন্দর কর্তৃপক্ষ ডেকে পাঠায়। সৃঞ্জয় অনেক সময় অভিযুক্ত আর অভিযোগকারীর সঙ্গে কথা বলে বিবাদের নিষ্পত্তি ঘটায়। আর যেসব ক্ষেত্রে মানবাধিকার স্পষ্টতই লঙ্ঘিত হয়েছে বা হচ্ছে বলে তার মনে হয়, সেসব ক্ষেত্রে সে বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ হয়তো তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি বা জাহাজ কোম্পানিকে জরিমানা করে, প্রয়োজনবোধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে অন্য কোনো ভাবে তার স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করে।

সৃঞ্জয় মিস্টার রেড্ডির কথা শুনে জানতে চাইল, ‘কোথাকার জাহাজ? সাদা চামড়া-কালো চামড়ার ব্যাপার নাকি ?'

মিস্টার রেড্ডি বললেন, 'আফ্রিকান জাহাজ। তবে এটা ওই ধরনের কোনো ঘটনা নয়। একটা অদ্ভুত ব্যাপার! আপনি এলেই বুঝতে পারবেন। আমি হারবার মাস্টারের ঘরে আপনার জন্য অপেক্ষা করব।'

তাঁর কথা শুনে সৃঞ্জয় 'আচ্ছা' বলাতে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন ছেড়ে দিলেন রেড্ডি। সৃঞ্জয়কে বেশ আকর্ষণ করল রেড্ডির বলা ‘অদ্ভুত ব্যাপার’ কথাটা।

ঠিক সময়তেই সৃঞ্জয় পৌঁছে গেল পোর্টে হারবার মাস্টারের ঘরে। রেড্ডি তাঁর কথা মতোই হারবার মাস্টার আর জনাকয়েক কর্মচারীকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর ঘরে। আনুষ্ঠানিক সৌজন্যতা বিনিময় করার পর চেয়ারে বসে সৃঞ্জয় প্রশ্ন করল, 'আপনাদের অদ্ভুত ব্যাপারটা কী এবার বলুন ?”

মিস্টার রেড্ডি বললেন, 'হ্যাঁ, অদ্ভুত ব্যাপারই বটে। শুনলেই বুঝতে পারবেন। একটা ছোট্ট আফ্রিকান জাহাজ গতকাল সকালে খাড়িতে এসে দাঁড়ায়। জাহাজটার নাম 'তারকানা। কাগজপত্র দেখে যা বোঝা গেছে তাতে মাস ছয় আগে তারকানা মোম্বাসা থেকে রওনা হয়ে প্রথমে গেছিল সোমালিয়ার মোগদিসু বন্দরে। সেখান থেকে কিছুদিন পর কলম্ব গিয়ে সেখানে বেশ কয়েকমাস থাকে। অবশেষে সে মোম্বাসা ফেরার পথ ধরেছিল। কিন্তু কয়েকদিন আগে ভারত মহাসাগরে একটানা বেশ কয়েকদিন প্রচণ্ড ঝড়-ঝঞ্ঝা হয়। তা জাহাজটাকে উত্তর দিকে বেশ কিছুটা ঠেলে আনে। ছোট জাহাজ। ক্রু-এর সংখ্যা মাত্র বারোজন। বড় স্টিমারই বলা ভালো। যাই হোক, ঝড়ের দাপটে খোলের একটা অংশ সামান্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর সেটা দেখে জাহাজটাকে নিয়ে আসা হয় মুম্বাই বন্দরের ডক ইয়ার্ডে মেরামতির জন্য। এ পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। এর পরের অংশটা হারবার মাস্টার বলবেন—' এই বলে তিনি তাকালেন হারবার মাস্টারের দিকে।

হারবার মাস্টার বলতে শুরু করলেন। জাহাজটা থেকে আমার কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠানো হয়েছিল। আমি ইঞ্জিনিয়ার পাঠালাম। জাহাজ পরিদর্শন করে তিনি জাহাজ থেকে আমাকে জানালেন যে ক্ষয়ক্ষতি তেমন কিছু নয়। ড্রাই ডকে জাহাজটাকে টেনে আনার দরকার নেই। জনা দশেক কর্মী ঘণ্টা চারেক সময়ের মধ্যে ব্যাপারটা মেরামত করে ফেলতে পারবে। মিস্ত্রি আর লেবার পাঠানো হোক। সেই মতো আমি লোক পাঠাই। সন্ধ্যা নাগাদ কাজ শেষ হয়ে যায় সব ঠিকঠাক মতো। আর এর পরই ঘটে ঘটনাটা। কাজ শেষ করে যখন সবাই জাহাজ থেকে স্পিড বোটে নামতে যাচ্ছে, তখন ডেকে একটা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিবরাজন নামের এক তামিল মিস্ত্রি 'মুরুগান, মুরুগান' বলে চিৎকার করতে করতে লোকটাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। শিবরাজনের বক্তব্য ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা তার দাদা। আফ্রিকায় কাজ করতে গিয়ে সে আর ফেরেনি। শেষ দশবছর তার কোনো খবরও পায়নি মুরুগান বা শিবরাজনের পরিবার। মজার ব্যাপার হল, ডেকে দাঁড়ানো ওই লোকটা কিন্তু নির্বাক ছিল। সে যেন চিনতেই পারছে না মুরুগানকে। শিবরাজনের চিৎকার-চেঁচামেচিতে সেখানে হাজির হয় জাহাজের অন্যরা। তার মধ্যে ছিল জাহাজটা যিনি ভাড়া নিয়েছেন, সেই ভদ্রলোক। তিনি জাতিতে আফ্রিকান। নাম উবাঙ্গি। তিনি ব্যবসায়ী। উবাঙ্গির বক্তব্য, যাকে মুরুগান বলে ডাকা হচ্ছে সে জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও তার নাম বেকন। কেনিয়াতে তার তিন পুরুষের বাস। বেকন উবাঙ্গির খাস ভৃত্য। সে মুরুগান নয়। একথা বলার পর সেই মুরুগান বা বেকনকে তিনি নির্দেশ দেন নিজের কেবিনে ফিরে যাবার জন্য। আর এর পরই সেই লোকটা তাঁর নির্দেশ মতো শিবরাজনকে এক ধাক্কায় ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজের কেবিনে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। শিবরাজনের হাজার ডাকাডাকি সত্ত্বেও সে আর দরজা খোলেনি। এখন মুশকিল হল, শিবরাজন পোর্টে ফিরে এসে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে উবাঙ্গির নামে। তার ধারণা, উবাঙ্গি আসলে ভয় দেখিয়ে মুরুগানকে আটকে রেখেছে নিজের কাছে। যে কারণে মুরুগান তার নিজের ভাইকে না চেনার ভান করছে। তাকে মুক্ত করতে হবে। সে নিশ্চিত যে লোকটা তার দাদাই। লিখিত অভিযোগ যখন, তখন আমাদের কিছু একটা করতেই হবে। তা ছাড়া লোকটা যদি সত্যিই মুরুগান হয়ে থাকে এবং তার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়ে থাকে, তবে আমাদের নৈতিক একটা দায়িত্ব কিন্তু থেকেই যায়। বিশেষত শিবরাজন যখন খুব জোর দিয়ে বলছে যে ওই লোকটা তার দাদা। তাই তদন্ত করার কারণে জাহাজটাকে আমরা বন্দর ছাড়ার অনুমতি দিইনি।'

সৃঞ্জয় বলল, 'এমনও তো হতে পারে লোকটা ওর দাদা নয়? অনেক সময় দুটো লোকের চেহারার অদ্ভুত মিল থাকে।'

তার কথা শুনে হারবার মাস্টার বললেন, 'বন্দরে দীর্ঘ দিন কাজ করার সুবাদে আমরা শিবরাজনকে চিনি। লোকটা বেশ বিচক্ষণ, শান্ত প্রকৃতির লোক। ও নিশ্চিতভাবেই কথাটা বলছে। আপনি আসবেন বলে ওকে আমরা ডেকে পাঠিয়েছি। পাশের ঘরেই আছে। ওর মুখ থেকেই ওর কথা শুনুন।'

এ কথা বলার পর পোর্টের একজন কর্মী ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন লোককে নিয়ে হাজির হল সেই ঘরে। মাঝবয়সি একজন লোক। বছর চল্লিশ বয়স হবে। গোড়ালির ওপর নীল প্যান্ট, হাফ হাতা নীল শার্ট, আর শিরা ওঠা সুগঠিত হাত তাকে ডকের মিস্ত্রি বলে চিনিয়ে দেয়। তার বুকে হারবার অথরিটির এমরম আঁকা আইডেনটিটি কার্ডও আছে। শিবরাজন। তার উদ্দেশে হারবার মাস্টার সৃঞ্জয়কে দেখিয়ে বললেন, ‘তোমার ঘটনাটা নিয়ে এই সাহেব যা যা জানতে চাইছেন তা বলো। উনি যদি কোনো সমাধান করতে পারেন ঘটনাটার।'

শিবরাজন বলে লোকটা সেলাম ঠুকল সৃঞ্জয়ের উদ্দেশে।

সৃঞ্জয় তাকে জিগ্যেস করল, 'ওই লোকটা যে তোমার দাদা তা তুমি নিশ্চিত?”

—'হ্যাঁ, হুজুর।' বেশ দৃঢ় ভাবেই জবাব দিল লোকটা।

—'কী করে নিশ্চিত হলে? এমনও তো হতে পারে সে অন্য লোক। একই রকম লোক তো দেখতে হতেই পারে ?'

শিবরাজন বলল ‘তা হয়। কিন্তু আমি নিশ্চিত হলাম ওর বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলটা দেখে। ছেলেবেলায় একবার ডাব কাটতে গিয়ে ওর বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলটা অর্ধেক উড়ে যায়। দেখুন গিয়ে ওরও ওই আঙুলটা অর্ধেক নেই। এটা দেখেই তো নিশ্চিত হলাম যে আমার দাদা।'

সৃঞ্জয় বলল, 'আচ্ছা তোমার কথা নয় মানলাম। এমনও তো হতে পারে লোকটা তোমার দাদা, কিন্তু সে আর তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইছে না। তাই না চেনার ভান করছে। সেক্ষেত্রে তো আমাদের কিছু করার নেই।'

শিবরাজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, 'না, হুজুর না। তা হতেই পারে না। নির্ঘাত ওই দেঁতো কাফ্রিটা কোনো ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছে। যে দাদা আমাদের মানুষ করার জন্য দেশ ছেড়ে অতদূরে চাকরি করতে গেছিল, যার দয়ায় আমরা সাত জনের পরিবার এক সময় খেয়ে-পরে বেঁচে থেকেছি, আর যাই হোক সে আমাদের অচেনার ভান করতে পারে না। এর মধ্যে ওই কাফ্রি শয়তানটার নিশ্চয়ই কোনো কারসাজি আছে। এই দেখুন দশ বছর আগে আমাদের পাঠানো তার শেষ চিঠি। দশ বছর আগে এসেছিল। সে বলেছিল আর ক'দ্বিনের মধ্যেই সে মোম্বাসা থেকে দেশে ফেরার জাহাজ ধরবে। দোহাই হুজুর, দাদাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন...।' এই বলে সে পকেট থেকে বিবর্ণ একটা চিঠি বার করে এগিয়ে দিল সৃঞ্জয়ের দিকে। তারপর ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।

সৃঞ্জয় চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখল। শিবরাজনের বক্তব্য সমর্থন করছে সেই বিবৰ্ণ কাগজটা তার উদ্দেশে চিঠি লিখেছে জনৈক মুরুগান। তারিখটা বছর দশেক আগের। ঠিকানা লেখা আছে— 'কিকুউ ভিলেজ, মালিন্দি, কিনিয়া।'

‘মালিন্দি' শব্দটা শুনে ঘটনাচক্রে একজনের কথা মনে পড়ে গেল সৃঞ্জয়ের। তার নাম 'লুও তানা'। আরব বংশোদ্ভূত একজন মানবাধিকার কর্মী। নাইরোবিতে মানবাধিকার সম্মেলনে একবার অ্যামানেস্টির প্রতিনিধি হিসাবে গেছিল সঞ্জয়। তখনই লুও তানার সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব। মাঝে মাঝে ই-মেলে সৃঞ্জয়ের সঙ্গে তার কথা হয়। ‘মালিন্দি’ নামটা লুও তানার কাছে থেকেই শোনা। তিনি সে শহরেই থাকেন। যা হোক, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। সঞ্জয় শিবরাজনকে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও। দেখা যাক কী করা যায় ?'

শিবরাজন ঘর থেকে বেরোবার পর সেই চিঠিটা হাতে নিয়ে সৃঞ্জয় বলল, 'শিবরাজনের তথাকথিত দাদা, তার মালিক আর জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কীভাবে দেখা করা যায়? শিবরাজনকেও সঙ্গে নেওয়া যেতে পারে।'

হারবার মাস্টার বললেন, 'চলুন তবে সেই জাহাজেই যাই। স্পিড বোট তৈরি আছে, কোনো অসুবিধে হবে না।'

হারবার মাস্টারের অফিস থেকে ওয়ারলেসের মাধ্যমে তারকানার ক্যাপ্টেনকে জানিয়ে দেওয়া হল যে তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জাহাজে যাচ্ছে।

হারবার মাস্টারের অফিস থেকে প্রথমে জেটি; তারপর স্পিড বোট সৃঞ্জয়, মিস্টার রেড্ডি, হারবার মাস্টার আর শিবরাজনকে নিয়ে রওনা হল নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কিছু জাহাজ, জলযানের বেড়াজাল টপকে মিনিট দশেকের মধ্যেই নজরে এল 'তারকানা।' বয়সেও বেশ প্রাচীন বলেই মনে হয় জাহাজটা। সৃঞ্জয় জানতে চাইল, 'এর খোলে কী আছে জানেন ?

হারবার মাস্টার জবাব দিলেন, ‘মশলা আর নারকেল। শ্রীলঙ্কা থেকে তোলা হয়েছে।'

আগাম খবর পেয়ে সৃঞ্জয়দের জন্য জাহাজের ডেকেই দাঁড়িয়েছিলেন ক্যাপ্টেন। তিনি সাদা চামড়ার লোক। হারবার মাস্টার জানালেন ক্যাপ্টেনের নাম থমসন। সে একজন আফ্রিকান্ডার। অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গবংশোদ্ভূত আফ্রিকান। বোট থেকে জাহাজে উঠে আনুষ্ঠানিক পরিচয়পর্ব মেটার পর সঞ্জয় ক্যাপ্টেনকে সরাসরি প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, মিস্টার উবাঙ্গির সঙ্গে তার ভৃত্য বেকনের সম্পর্ক কেমন বলে মনে হয়? বেকন তার মালিক সম্পর্কে কোনো সময় আপনার কাছে কোনো অভিযোগ করেছে? আপনার কী মনে হয়েছে বেকনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে সফরসঙ্গী করেছেন উবাঙ্গি?'

তার প্রশ্নর উত্তরে মুহূর্ত খানেক চুপ করে থেকে ক্যাপ্টেন বললেন, 'আমার তেমন কিছু মনে হয়নি। বেকন বলে লোকটা সাধারণত সূর্য ডোবার আগে কেবিন থেকে বেরোয় না। ইঙ্গিত বা 'হ্যাঁ' বা 'না' ছাড়া কারো সঙ্গে কোনো কথাবার্তা না বললেও তেমন কিছু ঘটনা ঘটলে সে নিশ্চয়ই আমাদের জানাত। আমার বরং ওদের দুজনের সম্পর্ক বেশ দৃঢ় বলেই মনে হয়েছে। সোমালিয়াতে পাইরেটসরা একবার আমাদের জাহাজে গুলি চালিয়েছিল। তখন ডেকে ছিলেন উবাঙ্গি। গুলির আঘাত যাতে না লাগে উবাঙ্গির দেহে, সেজন্য নিজের দেহ দিয়ে আমি বেকনকে আড়াল করতে দেখেছি উবাঙ্গিকে। আর ওরা দুজনেই কালো চামড়ার লোক। কাজেই বর্ণবৈষম্যের ব্যাপার নিশ্চয়ই এখানে নেই। আপনাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তা নিরসনের জন্য চলুন আপনারা ওদের সঙ্গে কথা বলতে। আমি মিস্টার উবাঙ্গিকে জানিয়েছি যে আপনারা আসছেন।'— এই বলে ক্যাপ্টেন তাদের সবাইকে নিয়ে এগোলেন দুজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর জন্য।

নির্দিষ্ট কেবিনে ক্যাপ্টেন টোকা দিতেই দরজা খুললেন এক দীর্ঘদেহী আফ্রিকান ভদ্রলোক। তাঁর পরনে জোব্বা, কপালে কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। গলা থেকে বুক পর্যন্ত নানা রঙের পাথরের মালা। একটা দাঁতও ঝুলছে লকেট হিসাবে। সম্ভবত সেটা সিংহের দাঁত। সৃঞ্জয়দের দেখে উবাঙ্গি নামের সেই ভদ্রলোক বেশ অসন্তোষের সুরে বললেন, 'একটা বাজে ব্যাপার নিয়ে এত জলঘোলা হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না। এমনিতেই আমাদের দেরি হয়ে গেছে, তারপর আজকের দিনটাও আমাদের আটকে রাখা হল। আমার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আপনাদের যা জানার আছে জেনে, কাগজপত্র দেখে আমাদের যাবার অনুমতি দিন।'

সৃঞ্জয় বলল, 'আপনার অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত। আমরা আপনার সঙ্গীর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।'

ভদ্রলোক বললেন, 'ঠিক আছে বলুন। ও আমার ঘরেই আছে।'

সৃঞ্জয় বলল, “ওকে বাইরে আসতে বলুন। বোঝার কোনো ভুল থাকলে দিনের আলোতে দেখে সেটা কেটে যেতে পারে।’

উবাঙ্গি প্রথমে জানালেন, 'ওর একটা সমস্যা আছে চোখে। সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না।' এরপর যেন নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললেন, 'ঠিক আছে। আলোতেই দেখুন।' উবাঙ্গি হাঁক দিলেন, ‘বেকন বাইরে এসো।’

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে ঘর থেকে ডেকের সূর্যালোকে বেরিয়ে এল একজন লোক। তার গায়ে হাফ শার্ট। দেহের চামড়া কেমন যেন খসখসে, ফাটাফাটা। কিন্তু তার আগেই সৃঞ্জয় মুহূর্তখানেকের জন্য তার চোখ দুটো দেখতে পেল। চোখের কালো মণির অংশ যেন দেখাই যায় না। চোখের সাদা অংশটাই শুধু প্রকট হয়ে আছে। বাঁ-হাতে বুড়ো আঙুল কাটা। তাকে দেখেই শিবরাজন বিহ্বল ভাবে বলে উঠল, 'মুরুগান, দাদা দাদা!'

কিন্তু সে লোকটার কোনো ভাবান্তর হল না শিবরাজনের কথায়।

হারবার মাস্টার তাকে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার নাম কী? তুমি শিবরাজন নামের এই লোকটাকে চেনো?”

সে অস্পষ্ট ভাবে জবাব দিল, 'বেকন।' তারপর মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল যে সে তাকে চেনে না।

শিবরাজন এবার আর্তনাদ করে উঠল, 'দাদা, তুই আমাকে চিনতে পারছিস না?” এবারও নির্বিকার লোকটা।

সৃঞ্জয় খেয়াল করল, শিবরাজন তাকে দাদা বললেও লোকটাকে কিন্তু বয়সে তার থেকে ছোট বলেই মনে হচ্ছে। সৃঞ্জয় এবার তাকে প্রশ্ন করল, 'তুমি এ-জাহাজে স্ব-ইচ্ছায় আছ তো? কেউ তোমাকে আটকে রাখেনি তো? নির্ভয়ে বলো। তেমন হলে আমরা তোমাকে উদ্ধার করব।'

মুহূর্ত খানেক চুপ করে থেকে সে লোক জবাব দিল, 'না, নিজের ইচ্ছাতেই আছি। আমি আমার মালিকের সঙ্গেই থাকব। তিনি যেখানে নিয়ে যাবেন, সেখানেই যাব।' লোকটা এরপর যেন মৃদু টলতে শুরু করল।

উবাঙ্গির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, 'আশাকরি আপনারা এবার ওর সব প্রশ্নর উত্তর পেলেন। এবার ওকে ঘরে ঢুকতে দিন। ও আর রোদ সহ্য করতে পারছে না।

সৃঞ্জয়দের এরপর আইনত আর কিছু করার নেই। সে বলল, 'ঠিক আছে, ও ঘরে যাক।' লোকটা টলতে টলতে ঘরে ঢুকে গেল। উবাঙ্গি এরপর সে-ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার আগে হারবার মাস্টারের উদ্দেশে বললেন, 'আশাকরি সন্ধ্যায় জোয়ারের জল খাঁড়িতে ঢুকলে আমরা যাত্রা শুরু করতে পারব। নইলে ক্ষতিপূরণের মামলা করব।' দরজা বন্ধ হয়ে গেল উবাঙ্গির ঘরের।

সৃঞ্জয়রা জাহাজ থেকে নামার পথ ধরল। তাদের সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে ক্যাপ্টেন বললেন, 'বলেছিলাম না তেমন কোনো ব্যাপার নয়। ও উবাঙ্গির খুব অনুগত। সেদিন জলদস্যুদের গুলিবৃষ্টির সময়ও এমনভাবে ওর মালিককে আড়াল করছিল যে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। কেউ কারো প্রতি অসম্ভব অনুগত না হলে তার জন্য ওভাবে জীবন বাজি রাখে না। তবে আপনাদের সঙ্গীকেও দোষ দিচ্ছি না। দুটো মানুষ অনেক সময় একইরকম দেখতে হয়। তা হলে কিন্তু আমরা আজ সন্ধ্যায় বন্দর ছাড়ছি।'

হারবার মাস্টার বললেন, 'হ্যাঁ, আপনি যাত্রা শুরু করতে পারেন। সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ।' এরপর সেই জাহাজ থেকে নেমে পড়ল সবাই। লঞ্চে জেটিতে ফিরতে ফিরতে রেড্ডি সাহেব শিবরাজনকে বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে তোমারই ভুল হয়েছে। ও তো চিনতেই পারল না তোমাকে। আর একটা ব্যাপার, লোকটাকে তোমার থেকে বয়সে অনেক ছোট বলেই মনে হল।'

হারবার মাস্টার স্পষ্টতই অসন্তোষের সুরে বললেন, 'আমিও খেয়াল করেছি ব্যাপারটা। ও লোক কিছুতেই বয়সে বড় নয়। এসব ঘটনায় বন্দরের বদনাম হয়। শিবরাজনের চিঠিকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত হয়নি।'

শিবরাজন কোনো কথার জবাব না দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল পিছনে সেই জাহাজটার দিকে।

জাহাজঘাটা থেকে সোজা বাড়িতে ফিরে এসেছিল সৃঞ্জয়। কিন্তু বিকেলবেলা আর একটা ফোন। এবার ফোনের ওপাশ থেকে এল শিবরাজনের গলা, – 'স্যার, আমি অনেক কষ্টে ফোন নম্বর জোগাড় করেছি, আমাকে দয়া করে একবার সাহায্য করুন। আর একবার কষ্ট করুন আমার জন্য। আপনার পায়ে ধরি স্যার…’

—‘কী সাহায্য?” জানতে চাইল সৃঞ্জয়।

‘আমি শেষ একবার জেনে নিতে চাই সে আমার দাদা কি না? নইলে সারা জীবন আমাকে এ প্রশ্নটা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। আমি কি এতই ভুল দেখছি? এমনকী কাটা আঙুলটাও মিলে যাচ্ছে! শেষ আর একটা ব্যাপার আমি জানতে চাই।'

—'কী ভাবে সেটা জানা যাবে?

শিবরাজন বলল, ‘আমাকে ওরা জাহাজে উঠতে দেবে না। আমি বোটে করে আপনাকে জাহাজে নিয়ে যাব। আমার দাদার পিঠে একটা জঙুল ছিল। আপনি শুধু দেখবেন লোকটার পিঠে তা আছে কি না?”

সৃঞ্জয় প্রথমে তাকে নিরস্ত করার জন্য বলল, 'যদি জরুল থেকেও থাকে, সে তো চিনতেই চাইছে না তোমাকে। কোনো মানুষকে তো জোর করে আটকানো যায় না। আর জাহাজও তার মত পরিবর্তনের জন্য আটকানো যাবে না।'

শিবরাজন বলল, 'কিছুই করতে হবে না স্যার। শুধু ওটা আছে কি না জানতে চাই। প্লিজ স্যার প্লিজ...।' এরপর কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। অগত্যা শেষ পর্যন্ত সৃঞ্জয় রাজি হল তার কথায় কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

শীতের বেলা। তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমেছে। কুয়াশাও নামতে শুরু করেছে। দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজগুলোর গায়ে একটা একটা করে আলো জ্বলতে শুরু করেছে। জেটিতে একটা বোট নিয়ে অপেক্ষা করছিল শিবরাজন। সৃঞ্জয় সেখানে পৌঁছোতেই সে তাড়াতাড়ি তাকে বোটে নিয়ে রওনা দিল সে-জাহাজের উদ্দেশে। জোয়ারের জল ঢুকতে শুরু করেছে খাঁড়িতে। অন্য জাহাজগুলো থেকে কিছুটা তফাতে কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারকানা নামের আফ্রিকান জাহাজটা। তারও আলো জ্বলে উঠেছে। কুয়াশা মাখা আলোতে জাহাজটা কেমন যেন ভূতুড়ে মনে হচ্ছে। তারা যখন জাহাজটার কাছে পৌঁছোল তখন নোঙর তোলার তোড়জোর চলছে। ক্যাপ্টেন তাদের দেখে একটু বিস্মিত ভাবে বললেন, গেছে। হারবার মাস্টার জাহাজ ছাড়ার অনুমতি দিয়েছেন।'

ক্যাপ্টেনের কথায় সৃঞ্জয় বলল, 'আমি শুধু দু-মিনিট মিস্টার উবাঙ্গির সঙ্গে কথা বলতে চাই। তারপরই জাহাজ থেকে নেমে যাব।'

—'আবার কী? সমস্যা তো মিটে

ক্যাপ্টেন বিরক্তির সুরে বললেন, 'ঠিক আছে আসুন। সময় কিন্তু ওই দু-তিন মিনিটই পাবেন।'

সৃঞ্জয় একাই জাহাজে উঠল। একজন লোক তাকে পৌঁছে দিল উবাঙ্গির কেবিনে। দরজা খুলে সৃঞ্জয়কে দেখে উবাঙ্গি বিরক্ত হয়ে বললেন, 'আবার এসেছেন আপনি? কী ব্যাপার? জাহাজের ইঞ্জিন কিন্তু চালু হয়েছে। নোঙর উঠবে।'

সৃঞ্জয় বলল, ‘বিরক্ত করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি সাহায্য করলে সামান্য কৌতূহল মিটিয়ে চলে যাব।'

—'কী কৌতূহল ?

—‘আমি একবার বেকনের পিঠটা দেখতে চাই। একটা চিহ্ন আছে কি না দেখব। আপনাদের আটকাব না।'

সৃঞ্জয়ের কথায় কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন উবাঙ্গি। তারপর বললেন, 'ভিতরে আসুন।' আলো জ্বলছে কেবিনে। দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল লোকটা। খসখসে চামড়া। অনেকটা অন্ধদের মতো সাদা চোখের মণি। মুখমণ্ডলেও কোনো অভিব্যক্তি নেই। যেন কাঠের তৈরি মুখ। একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। হাত দুটো বেশ লম্বা।

এখন উবাঙ্গি তার উদ্দেশে সেদেশের ভাষায় কিছু বললেন। তা শুনে পিছন ফিরে দাঁড়াল লোকটা। তারপর পিঠ থেকে জামাটা ধীরে ধীরে ওপরে তুলল। তার পিঠের চামড়া হাত-পায়ের থেকে আরও ফাটা ফাটা। কোঁচকানো, খসখসে। হয়তো তার পিঠে এক সময় জরুল ছিল, চামড়ার সঙ্গে উঠে গেছে। জরুলের চিহ্ন না দেখলেও সে-পিঠে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। দুটো গোল ফুটো। এমন ফুটো মানুষের শরীরে হয় নাকি? বিস্মিত সৃঞ্জয় বলে উঠল, ‘ও দুটো কীসের দাগ?'

প্রশ্ন শুনে একটা দুর্বোধ্য হাসি ফুটে উঠল উবাঙ্গির ঠোটে। তিনি বললেন, ‘জলদস্যুদের গুলির দাগ। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি লেগেছিল। জোর করে আটকে রাখলে কি ও আমাকে বাঁচাতে ঝাঁপাত? এবার যান।'

আর কোনো কথা না বলে সৃঞ্জয় বেরিয়ে এল কেবিন থেকে।

সৃঞ্জয় জাহাজ থেকে বোটে নামার সঙ্গে সঙ্গে নোঙর উঠে গেল। শিবরাজন উৎকণ্ঠিত ভাবে বলে উঠল, 'কী দেখলেন ?”

সৃঞ্জয় জবাব দিল, ‘ঠিক বুঝতে পারলাম না। তখন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার দেখা অদ্ভুত গুলির ফুটো দুটো। জেটির দিকে রওনা দিল বোট। আর তারকানাও কুয়াশা মাখা সমুদ্রে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে।

বাড়ি ফিরে এসে সৃঞ্জয়ের হঠাৎ মাথায় এল বন্ধু লুও তানার কথা। সে তো মালিন্দিতেই থাকে। হয়তো সে শিবরাজনের দাদার কোনো খোঁজ দিতে পারে, বা এই অদ্ভুত ব্যাপারের নিষ্পত্তি ঘটাতে পারে? ব্যাপারটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সমেত লুও তানাকে মেল করতে বসল কম্পিউটার খুলে।


সপ্তাহ তিনেক সময় লাগল মেলের জবাব আসতে। লুও তানার চিঠিটা এইরকম— প্রিয় সৃঞ্জয়,

তোমার চিঠির সূত্র ধরে ও তোমার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা করে আমি উক্ত মুরুগান নামক ব্যক্তির সন্ধান করেছিলাম। তার সম্বন্ধে কী জানতে পেরেছি তা বলার আগে কয়েকটা ঘটনার কথা বলব। যার সঙ্গে তোমার অভিজ্ঞতার হয়তো মিল আছে প্রথমবার এই ঘটনা খবরের কাগজের নজরে আসে প্রায় একশো বছর আগে ১৯১৮ সালে। আফ্রিকা তো বটেই, ইউরোপেরও সব কাগজে বেরিয়েছিল সে ঘটনা। ক্লাম্বেয়ার নামে এক শ্বেতাঙ্গ কিনিয়াতে তার আখ খেতে বসন্তকালে আখ কাটার জন্য নিয়োগ করলেন একদল কর্মঠ কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক। দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করত তারা। বিশ্রাম দেওয়া হত না। থামলেই চাবুক। খামারের বাইরে তাদের আসতে দেওয়া হত না। একদিন আশেপাশের গ্রামের মানুষরা আবিষ্কার করল সেই মানুষরা তাদের পরিচিত! তারা কেউ তাদের বাবা, দাদা, ভাই বা আত্মীয় পুরো দলটাই বছর খানেক আগে উগান্ডায় গেছিল কাজ করতে। তারা হঠাৎ ওই আখ খামারে হাজির হল কীভাবে? শেরিফকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামবাসীরা হাজির হল খামারে। কিন্তু সেই মজুররা গ্রামবাসীদের চিনতে অস্বীকার করল। আখ কাটার মরশুম শেষ হল হঠাৎ! আবার হারিয়ে গেল সেই মজুরের দল।

এর পরের ঘটনা মোজাম্বিকের। ১৯৭০ সাল। ২০ বছর পর বাবা সাক্ষাৎ পেল তার ছেলের। সে ছেলে কথা বলতে পারে না তখন। বাবাকে চিনতেও পারছে না। সর্বাঙ্গে তার শুকনো ক্ষতচিহ্ন। জঙ্গলে এক সময় হারিয়ে গেছিল সে। ছেলে পাগল হয়ে গেছে ভেবে বাবা তাকে ঘরে নিয়ে এল। তিন মাস ঘরে ছিল সে। কিন্তু সে তিন মাসে একদানা খাবার স্পর্শ না করেও দিব্যিই একই রকম ছিল। তারপর কোথায় হারিয়ে গেল। এমন আরও ঘটনা আছে। তবে শিবরাজনের মতো একটা শেষ ঘটনা বলি। ১৯৮০ সালে সুদানের খার্তুমে এক ফল বিক্রেতা আবিষ্কার করল তার ভাইকে। তার পরনে ছেঁড়া পোশাক। সারা গায়ে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন, নির্বাক শূন্য দৃষ্টি। যথারীতি সে-ও চিনতে পারছে না তার দাদাকে। এক্ষেত্রে তার দাদা সরাসরি দাবি করে বসল যে সে তার ভাইকে ১৫ বছর আগে নিজের হাতে কবর দিয়েছে। বসন্ত রোগে মারা গেছিল 'নার্সেই' নামে তার এই ভাই। নার্সেই সেদিন সন্ধ্যায় আবার ফলবাজার থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। প্রথম দুটো ঘটনার ক্ষেত্রেও পরবর্তীকালে জানা যায় প্রথম ঘটনার শ্রমিকের সেই দলটি তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে উগান্ডাতে এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আর সরকারি নথি অনুসারে সেই হতভাগ্য পিতার ছেলেকে পিতা-পুত্রর সাক্ষাতের অনেকদিন আগে সিংহ টেনে নিয়ে গেছিল। তার সাক্ষীও আছে।

বেশ অদ্ভুত ব্যাপার তাই না? মৃত মানুষরা ফিরে এল কীভাবে? এর একটা ব্যাখ্যা আছে। আফ্রিকায় এক ধরনের ওঝা বা জাদুকর আছে যারা ব্ল্যাক ম্যাজিকের চর্চা করে। যাদের বলা হয় ভুডু। এই ভুডু জাদুকররা নাকি মৃত মানুষদের কবর থেকে তুলে সে-দেহে প্রাণসঞ্চার করতে পারে মন্ত্র বা ইচ্ছা শক্তির দ্বারা। ওই জ্যান্ত-মড়াদের বলে জোম্বি। তাদের কোনো নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি বা ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে না। ভুডু জাদুকরের আজ্ঞাবহী দাস হিসাবে জোম্বিরা কাজ করে। জোম্বিদের এক অর্থে বলা যায় ‘প্রেতশ্রমিক।' আবার অনেকে বলে যে ভুডু জাদুকররা জীবন্ত মানুষকেও অনেক সময় জোম্বি বানায়। যাকে জোম্বি বানানো হবে তাকে এক ধরনের পাউডার খাওয়ানো হয়। যাতে থাকে ব্যাং, পাফার মাছের নিঃসৃত রস ও আরও জরিবুটি। যা খেলে সে লোকের ইচ্ছাশক্তি লোপ পায় ও সে জাদুকরের আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়। সেও জ্যান্ত মড়া জোম্বিতে রূপান্তরিত হয়। মড়া জ্যান্ত হবার ব্যাপারটা বৈজ্ঞানিকরা আমল না দিলেও জোম্বির ব্যাপারটা কিন্তু চার-পাঁচশো বছর ধরে আফ্রিকার লোকজন বিশ্বাস করে আসছে। তুমি ব্যাপারটা বিশ্বাস না করলেও তাদের বিশ্বাসের সূত্র ধরে বলি তোমাদের সঙ্গে যার সাক্ষাৎ হয়েছিল হয়তো বা সে একজন জোম্বি। জ্যান্ত মড়া। পরিশেষে বলি, তোমার সেই মুরুগানের কথা। কিকুই ভিলেজ নামে আমাদের এখানকার ছোট শহরটার শেরিফ সরকারি নথি ঘেঁটে আমাকে জানিয়েছেন যে শিবরাজন নামে লোকটা শেষ যে চিঠি পেয়েছিল তার দাদার কাছ থেকে সে তারিখের কিছুদিন পরই মুরুগান নামের এক ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসাবে তার পিঠে একটা জড়ুল ছিল। কিকুইতেই তাকে কবরস্থ করা হয়। কাজেই..... শুভেচ্ছা সহ, তোমার বিশ্বস্ত বন্ধু।

লুও তানা

মালিন্দি, কিনিয়া।

চিঠিটা পড়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল সৃঞ্জয়। যার সঙ্গে তার দেখা হল সে কি পুনঃ জীবিত মৃতদেহ নাকি ইচ্ছাশক্তিরোহিত কোনো জীবন্ত জোম্বি? জঙুলের দাগ না থাকলেও শিবরাজন কি এত ভুল করল? আঙুলও তো কাটা ছিল সে লোকটার! হঠাৎই সৃঞ্জয়ের মনে নিয়ে কি কোনো মানুষ বেঁচে থাকতে পারে?

পড়ে গেল লোকটার পিঠটা। বুলেটের অমন ক্ষত শেরিফ তো জানিয়েছেন মুরুগান মারা গেছে! তা হলে প্রথমটাই হয়তো সত্যি। ঠিক এই সময় ঘটনাচক্রে মিস্টার রেড্ডির একটা ফোন এল সৃঞ্জয়ের কাছে। কুশল বিনিময়ের পর তিনি বললেন, “আপনাকে একটা খবর জানাই। সেই যে তারকানা নামের জাহাজটাতে আমরা গেছিলাম, আফ্রিকা উপকূল থেকে একশো কিমি দূরে অগ্নিকাণ্ডে সেটা ধ্বংস হয়েছে বলে খবর এসেছে। সেই উবাঙ্গি আর তার বেকন নামের ভৃত্য ছাড়া সবার সলিল সমাধি ঘটেছে। বেকন নাকি তার মালিককে পিঠে নিয়ে একশো কিমি সাঁতরে উপকূলে ওঠে! অবিশ্বাস্য ব্যাপার তাই না?'

কথাটা শুনে সৃঞ্জয় অস্পষ্টভাবে বলে উঠল, 'হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য ব্যাপার – জোম্বি !

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%