প্রেতশিলা

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ট্রেন থেকে প্লাটফর্মে নামতেই পাণ্ডার দল আর ধর্মশালার লোকজন এমনভাবে বিপিনকে ছেঁকে ধরে ছিল যে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার জোগাড়! ছোট কাকা অবশ্য আগেই সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন ‘কারুর ফাঁদে পা দিবি না। কেউ ধরলে সোজা বলে দিবি যে আমাদের কাজ করে বিষ্ণুপাণ্ডা। আর ধর্মশালা তো আগেই এখান থেকে ঠিক করে যাচ্ছিস, কাজেই ও নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। ভারত সেবাশ্রম সংঘতে বুকিং পাওয়া গেল না ঠিকই কিন্তু ও ধর্মশালাটাও মন্দ নয়। আমাদের অপিসের পরিতোষ গত বছরই ওখানে উঠেছিল। কোনো অসুবিধা হয়নি।’

কিন্তু বিষ্ণুপাণ্ডার নাম বলাতেও তাকে সহজে ছাড়তে চাচ্ছিল না পাণ্ডার দল। ষণ্ডা মতন একজন পাণ্ডা তো আর একটু হলেই বিপিনকে বগলদাবা করে নিজের ডেরায় নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের হাত ছাড়িয়ে বিপিন যখন প্লাটফর্মের বাইরে একটা ফাঁকা জায়গাতে এসে দাঁড়াল তখন বেলা প্রায় চারটে। ট্রেন প্রায় আট ঘণ্টা লেট। খিদেতে পেট চুঁইছুঁই করছে। একটু দম নিয়ে সে প্রথমে পকেট থেকে মোবাইল বার করল ধর্মশালায় আর বিষ্ণুপাণ্ডাকে ফোন করার জন্য। কিন্তু জহর কোটের ডান পকেটে হাত ঢুকিয়েই বিপিন দেখল ধর্মশালার ঠিকানা-ফোন নম্বর লেখা বুকিং-এর কাগজটা সেখানে নেই। ট্রেন থেকে নামার আগেই তো এ পকেটেই কাগজটা সে রেখেছিল। পকেট থেকে একটু বাইরেও বেরিয়ে ছিল কাগজটা। তাহলে কি পাণ্ডাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় কাগজটা পড়ে গেল বা কেউ সেটা তুলে নিল! ব্যাপারটা সম্ভবত সঠিক, কারণ, এরপর জামা-কাপড়ের অন্য পকেট হাতড়েও সেই কাগজটার সন্ধান মিলল না। কাগজটা কি আর প্লাটফর্মে গেলে পাবার সম্ভাবনা আছে? তা ছাড়া সেখানে আবার যাওয়া মানে তো পাণ্ডাদের খপ্পরে পড়া। ধর্মশালার নামটা অবশ্য তার মনে আছে। গয়াতীর্থ ধর্মশালা। তবে বিষ্ণুপাণ্ডা নিশ্চয়ই তার ঠিকানা বলতে পারবে। বিষ্ণুপাণ্ডার নম্বর বিপিনের মোবাইলে সেভ করা আছে। বিপিন ফোন করল বিষ্ণুপাণ্ডাকে।

কিন্তু তাকে ফোন করে বিপিন তার বিপদটা বুঝতে পারল। বিষ্ণুপাণ্ডা ফোন ধরল ঠিকই, বিপিনের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে সে বলল, 'আমি আপনার জন্য বেলা বারোটা অব্দি প্লাটফর্মে অপেক্ষা করেছি। হঠাৎ আমার মোবাইলে খবর এল, আমার এক আত্মীয় খুব অসুস্থ। তার জন্য আমি পাটনা চলে এসেছি। কাল রাতে আমি গয়া ফিরে পরশু সকালে আপনার কাজ করে দেব। একটা মাত্র দিনের তো ব্যাপার। এই একটা দিন আশেপাশের জায়গাগুলোতে বেড়িয়ে নিন। তা ছাড়া আপনার ট্রেনের টিকিটও তো পরশু কাটা আছে বলেছিলেন। ওদিন সকাল সকাল কাজ শেষ হবে। অনায়াসে বিকালের ট্রেন ধরতে পারবেন।'

এ পর্যন্ত তা-ও ঠিক ছিল। কিন্তু, বিপিন এরপর তাকে ‘গয়াতীর্থ ধর্মশালার' ঠিকানা জানতে চাইতেই সে বলল, “কোন গয়াতীর্থ বলুন তো? ও নামে এখানে অন্তত দশটা ধৰ্মশালা আছে।' ওপাশ থেকে বিষ্ণুপাণ্ডা জবাব দিল, 'গয়াতে অনেক হোটেল, ধর্মশালা আছে। কোথাও রাতটা কাটিয়ে দিন। কাল রাতে ফিরে আমি আপনাকে ফোন করব। আমি এখন রাখছি।' এই বলে বিপিনকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লাইনটা কেটে দিল বিষ্ণুপাণ্ডা।

বিপিন ভাবল যে ছোট কাকাকে একবার ফোন করে তার অপিসের পরিতোষের মাধ্যমে যদি গয়াতীর্থ ধর্মশালার ঠিকানাটা বার করা যায়। কিন্তু এর পরক্ষণেই তার মাথায় এল যে তিনি গত পরশু জামাইয়ের সঙ্গে কাশ্মীরের বৈষ্ণদেবী দর্শনে গেছেন। ছোট কাকা মোবাইল ব্যবহার করেন না। আর তার জামাইয়ের ফোন নম্বর বিপিনের জানা নেই।

বিপিন দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল কী ভাবে, কোথায় যাওয়া যায়? গয়াতে গাটকাটাদের যা উৎপাত তাতে ভুল জায়গাতে পৌঁছলেই বিপদ! বিপিনের একটু রাগও হল ছোট কাকার ওপর। এই সব ধর্মকর্ম নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই বিপিনের। তার বাবা মারা গেছেন তিন বছর হল। তার কাকার অবশ্য ধর্মর ওপর বিশ্বাস প্রবল। সান্ধ্য আহ্নিক না করে জল খান না।

একাদশী, চতুর্দশী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা সব মানেন। বাড়িতে এখনও মুরগির ডিম নিষিদ্ধ। গত দু-বছর ধরে তিনি খালি বলে আসছেন, ‘এবার একবার গিয়ে গয়াতে তোর বাবার পিণ্ডটা দিয়ে আয়। তোর বাবা ঠাকুর্দার পিণ্ড দিয়ে এসেছিলেন। তোদের বাড়িতে এখন মুরগি রান্না হয় জানি। কিন্তু বামুনের ছেলে হয়ে কিছুটা ধর্ম তো মানবি। মাত্র এক-দুদিনের তো ব্যাপার।'

কাকা অন্য বাড়িতে থাকলেও বিপিনের বাবা মারা যাবার পর কাকাকেই পরিবারের অভিভাবক বলা যেতে পারে। পরিবারের সামাজিক অনুষ্ঠানে কাকার একটা ভূমিকা আছে। কাজেই শেষ পর্যন্ত তাঁর অনুরোধ অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি বিপিনের। প্রেতযোনি থেকে বাবার আত্মার মুক্তি দেবার জন্য সে উপস্থিত হয়েছে গয়াক্ষেত্রে।

বিপিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার কিছুটা তফাতেই একটা ছোট খাবারের দোকান। কড়াইতে পুরি ভাজা চলছে। বিপিনের সেদিকে চোখ যেতেই সে ভাবল, আগে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক, তারপর কোথায় কীভাবে যাওয়া যাবে ঠিক করা যাবে। দোকানদারও হয়তো হোটেল-ধর্মশালার কোনো খোঁজ দিতে পারে। বিপিন তার ব্যাগ-পত্তর নিয়ে দোকানের ভিতর ঢুকল।

দোকানে খদ্দেরের ভিড় নেই। শুধু বিপিন যেখানে বসল তার উলটো দিকে একটা কেঠো চেয়ারে চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে বসে চশমা চোখে খবরের কাগজ পড়ছে একজন মাঝবয়সি রোগা মতো ভদ্রলোক।

বিপিন, চা-পুরি-জিলিপির অর্ডার দিল। খাবার চলে এল। খাওয়া শুরু করল বিপিন। ‘মশাই কোথায় থাকেন? আজই এলেন? নাকি কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছেন?' নির্ভুল বাংলা উচ্চারণে প্রশ্নটা শুনে বিপিন তাকিয়ে দেখল তার দিকে চেয়ে আছেন সেই চশমাপরা ভদ্রলোক।

বাংলার বাইরে বাঙালির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সব বাঙালিরই ভালো লাগে। সামনের ভদ্রলোক বাঙালি বলেই মনে হচ্ছে। সে জবাব দিল, 'এই ট্রেন থেকে নামলাম। কলকাতা থেকে আসছি। আপনি কোথা থেকে এসেছেন?”

ভদ্রলোক হেসে বললেন, 'আমার বাড়ি বাংলাতে। বর্ধমানের এক জায়গাতে। তবে এখন এক বছর ধরে আমি গয়াতেই থাকি।’

ভদ্রলোক গয়াতেই থাকেন? তাহলে লোকটা হয়তো কোনো হোটেল বা ধর্মশালার খোঁজ দিতে পারে। একথা ভেবে বিপিন বলল, 'আপনি আমাকে একটা ভালো হোটেল বা ধর্মশালার খোঁজ দিতে পারেন দুটো রাত থাকার জন্য? এখানে দালাল বা পাণ্ডাদের যা উৎপাত তাতে যে কোনো জায়গাতে গিয়ে উঠতে ঠিক ভরসা পাচ্ছি না।'

ভদ্রলোক বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এখানে ভালো, নিরাপদে থাকার জায়গা বলতে তো ভারত সেবাশ্রম সংঘ আর কিছু সরকারি জায়গা। কিন্তু আগে থেকে বুকিং না থাকলে সেসব জায়গাতে থাকা মুশকিল।' এই বলে বাইরের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগলেন তিনি।

বিপিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর স্বগতোক্তি করল, ভারি মুশকিলে পড়লাম তো! কোথায় যাই এখন!

কথাটা সম্ভবত কানে গেল ভদ্রলোকের। তিনি এবার বিপিনের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আমার বাড়িতে একটা ঘর ফাঁকা আছে। খুব সাধারণ একটা ঘর। খাট-বিছানা ছাড়া অন্য আসবাব নেই। ব্রাহ্মণী পাহাড়ের দিকে বাড়িটা। ইচ্ছা হলে দুটো রাত আপনি সেখানে কাটাতে পারেন।'

বিপিন জানতে চাইল, 'কত ভাড়া দিতে হবে?”

ভদ্রলোক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, 'কী বলি বলুন তো? আমি তো আগে ঘর ভাড়া দেইনি। দু-দিনের জন্য পাঁচশো টাকা চাইলে কি বেশি চাওয়া হবে?' এই বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক।

টাকাটা খুব একটা বেশি নয়। ভদ্রলোক বাঙালি, চেহারা, কথাবার্তাও ভদ্রলোকেরই মতো। তবুও তার ডাকে সাড়া দেবার আগে একটু ভেবে নেবার জন্য চুপ করে গেলাম ৷

ভদ্রলোক বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমি এবার বেরোব। ইচ্ছা হলে চলুন। ওই দেখুন পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমেছে। এখন না বেরোলে বৃষ্টি নামার আগে বাড়ি পৌঁছানো যাবে না।'

বিপিন তার কথা শুনে বাইরে তাকিয়ে দেখল আলোটা কেমন যেন মরে আসছে। সত্যি মেঘ জমেছে আকাশে। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে চলুন। তবে ঘর পছন্দ না হলে কিন্তু ফিরে আসব।'

ভদ্রলোক সেকথা শুনে হেসে বললেন, 'ঠিক আছে। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন আপনাকে আটকাব না।'

বিপিন এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে, দাম মিটিয়ে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল লোকটার সঙ্গে। ভদ্রলোক এবার নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, 'আমার নাম কিঙ্কর আচার্য।' বিপিনও তার নাম পরিচয় দিল। বাইরে কিছুটা তফাতে একটা টাঙাওয়ালা দাঁড়িয়ে ছিল। তারা দুজন সেই টাঙাতে গিয়ে উঠল। কিঙ্করবাবুর নির্দেশে লোকজন, গাড়ি ঘোড়ার পাশ কাটিয়ে টাঙা ছুটল কিঙ্করবাবুর আস্তানার উদ্দেশে। বিপিন চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগল। কিছুটা দূরে অর্ধচন্দ্রাকারে শহরটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনুচ্চ পাহাড়শ্রেণি। সেদিকে তাকিয়ে বিপিন বলল, ‘পাহাড়গুলো দেখতে খুব ভালো লাগছে। আমি এই প্রথম গয়াতে এলাম। ওই পাহাড়গুলোর নাম কী?'

কিঙ্করবাবু বললেন, 'উত্তরদিকের পাহাড়ের নাম 'রাম-সীতা পাহাড়'। উত্তর-পশ্চিমের পাহাড়টাকে বলে ‘প্রেতশিলা'। আর আমরা যে পাহাড়ের দিকে যাচ্ছি সেটা ‘ব্রাহ্মণী পাহাড়’।

অনেকে বলে ওই পাহাড়গুলো নাকি আসলে গয়া অসুরের দেহ। ভগবান বিষ্ণু তার পায়ের চাপে গয়াসুরকে এখানে বধ করেন। তার বিশাল দেহ বুদ্ধ গয়া থেকে ওই প্রেতশিলা পাহাড় পর্যন্ত পড়েছিল। কৃষ্ণর পাদস্পর্শে মুক্তি লাভ করে স্বর্গে যায় গয়াসুরের আত্মা। তাই এখানে কারো পিণ্ডদান করলে তার আত্মারও মুক্তি ঘটে বা মোক্ষ লাভ হয়। ত্রেতা যুগে রামচন্দ্র নাকি দশরথের পিণ্ডদান করেন এই গয়াক্ষেত্রে।'

বিপিন জানতে চাইল, ‘এ শহরটা কত পুরনো? এখানে কী কী দেখার আছে?”

ভদ্রলোক জবাব দিলেন, 'অনেক প্রাচীন এ জায়গা। পদ্মপুরাণ, গরুড়পুরাণ, ভগবতগীতায় গয়াধামের উল্লেখ আছে। অনেক মন্দির আছে এখানে। শহরের কেন্দ্রে আছে বিষ্ণুপদ মন্দির। প্রেতশিলা পাহাড়ের মাথায় যমরাজের মন্দির। ফল্গুতট আছে। অক্ষয়বট আছে। সীতার আশীর্বাদে সে অমর। পুরাণে লেখা আছে যে মহাপ্লাবনের সময় সারা পৃথিবী জলের তলায় ডুবে গেলেও অক্ষয়বট ডোবেনি। এ ছাড়া একটা গাড়ি নিয়ে আপনি বুদ্ধগয়াতে ঘুরে আসতে পারেন। এই গয়াধামে যুগযুগ ধরে রাজা-মহারাজা থেকে সাধারণ গরিব মানুষ আসে পিণ্ডদানের জন্য। প্রেতযোনি থেকে তাদের পিতৃপুরুষের আত্মার মুক্তিদানের জন্য।'

বিপিন এবার বলল, 'আচ্ছা আপনি এসব প্রেতযোনি ইত্যাদি ব্যাপার বিশ্বাস করেন?’

কিঙ্করবাবু কয়েক মুহূর্তর জন্য যেন প্রশ্ন শুনে থমকে গেলেন। তারপর বললেন, ‘এক সময় আমি এসব নিয়ে চর্চা করতাম। এখন অবশ্য করি না। আমি বিশ্বাস করি বা না করি, তার থেকে বড় কথা লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যাপারটা বিশ্বাস করেন। মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা প্রেতযোনিতে প্রবেশ করে। প্রেতযোনি থেকে মুক্তি লাভের আশায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট ভাবে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। পিণ্ড লাভের আশায় হাহাকার করে। এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই যুগ যুগ ধরে মানুষ এখানে পিণ্ড দিতে আসে।'

বিপিনদের কথা বলার মাঝেই বড় রাস্তার লোকজনের ভিড় ছেড়ে ফাঁকা রাস্তায় ঢুকে পড়ল টাঙা। ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসতে লাগল পাহাড়টা। তারপর আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কিঙ্করবাবুর নির্দেশে একটা বাড়ির সামনে টাঙা এসে থামল। একতলা একটা খুব পুরনো বাড়ি। তার একটা অংশ বয়সের ভারে ভেঙে পড়েছে। কিছুটা ঝোপ-জঙ্গলও রয়েছে এদিক-ওদিক। অন্য ঘর-বাড়ি এদিকটায় আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের থেকে যেন আলাদা হয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। বিপিনরা টাঙা থেকে নামতেই বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়ল তাদের গায়ে। পাহাড়ের মাথা কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। অন্ধকার নেমে আসছে।

ভাড়া মিটিয়ে কিঙ্করবাবুর সঙ্গে সদর দরজার দিকে এগোতে এগোতে বিপিন জানতে চাইল, 'আপনি একলাই থাকেন এ বাড়িতে?' কিঙ্করবাবু একটু বিষণ্ণ হেসে জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, তেমনই বলতে পারেন।'

যে ঘরে বিপিনের থাকার ব্যবস্থা হল সেটা খুব সাধারণ একটা ঘর। আসবাব বলতে সাধারণ একটা খাট আর চেয়ার-টেবিল। বিপিনের অবশ্য এতে তেমন অসুবিধা নেই। মাত্র দু-রাতের তো মামলা। বিপিনকে তার ঘরে ঢুকিয়ে একটা লণ্ঠন জ্বালিয়ে অন্য ঘরে চলে গেছিলেন কিঙ্করবাবু। কোনো কাজ না থাকায় বিপিন বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিল। পথশ্রমে ঘুমিয়েও পড়েছিল। তার যখন ঘুম ভাঙল তখন রাত প্রায় আটটা। বাইরে বৃষ্টিও কিছুটা ধরে এসেছে। ঘুম ভেঙে সে উঠে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের দরজায় প্রথমে টোকা শোনা গেল। তারপর দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন কিঙ্করবাবু। তার হাতে কাগজ চাপা দেওয়া একটা থালা। তিনি সেটা টেবিলে নামিয়ে রেখে একটা চেয়ার টেনে বিপিনের মুখোমুখি বসে বললেন, ‘আশপাশে কোনো হোটেল নেই। রাতে তো আপনাকে খেতে হবে। তাই দুটো রুটি আর একটু তরকারি দিয়ে গেলাম। এর চেয়ে বেশি জোগাড় করা সম্ভব হল না।'

বিপিন বলল, ‘এই যথেষ্ট। আপনার বিব্রত হবার কারণ নেই।'

কিঙ্করবাবু এরপর বললেন, 'একটা ব্যাপার জানা হয়নি। আপনি কি এখানে বেড়াতে এসেছেন, নাকি অন্য কোনো কাজে?'

বিপিন বলল, 'আসলে সবাই এখানে সাধারণত যে কাজে আসে, আমিও সে কাজেই এসেছি। পিণ্ডদান করতে। এসব প্রেতযোনি ইত্যাদি ব্যাপার আমি ঠিক বিশ্বাস করি না। বলতে পারেন অনেকটা আত্মীয়-স্বজনদের চাপে পড়েই এসেছি। বিষ্ণুপাণ্ডা বলে একজন পাণ্ডার কাজটা করে দেবার কথা। কিন্তু এখানে এসে জানলাম সে পাটনা গেছে। কাল সকালে ফিরবে। তারপর পরশু সকালে আমার কাজ হবে। কাল কাজ নেই। বুদ্ধগয়া কীভাবে যাওয়া যায়?’

কিঙ্করবাবু প্রথমে বললেন, 'কাল আপনি এখান থেকে টাঙা নিয়ে প্রথমে সোজা বাসস্ট্যান্ডে চলে যাবেন। সেখান থেকে সরকারি টুরিজিম ডিপার্টমেন্টের বাস ধরবেন। বুদ্ধগয়া ছোট জায়গা। ঘুরে বেড়াতে তেমন অসুবিধা হবে না। প্রয়োজন হলে ওখানেও সরকারি গাইড পাবেন।'

বিপিন এরপর তাকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কাছেই একটা ঘর থেকে একটা চাপা গোঙানির শব্দ ভেসে আসতে শুরু করল। মানুষের গলা! যন্ত্রণাক্লিষ্ট ভাবে কে যেন আর্তনাদ করে উঠল, 'কিঙ্কর? কিঙ্কর ?”

ডাকটা কানে যেতেই কিঙ্করবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

বিপিন মৃদু বিস্মিতভাবে তাকে বলল, 'কার শব্দ? এ বাড়িতে আর কে থাকেন?”

কিঙ্করবাবু বিষণ্ণভাবে বললেন, 'এ বাড়িতে আর একজন থাকেন। তবে তার যা অবস্থা তাতে আর না থাকলেই ভালো?”

—“কে তিনি?”

বিপিনের প্রখর জবাবে কিঙ্করবাবু ইশারায় অনুসরণ করতে বললেন তাকে। কিঙ্করবাবুর কথায় বিপিন খাট থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে একটা ঘর টপকে তার পিছন পিছন হাজির হল আর একটা ঘরের সামনে। সে ঘরেও একটা লণ্ঠন জ্বলছে। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে সেই লণ্ঠনের আলোতে বিপিন দেখতে পেল ঘরের ভিতর একটা খাটে গলা পর্যন্ত কম্বল ঢেকে শুয়ে আছেন এক বেশ বয়স্ক ভদ্রলোক। যন্ত্রণাকাতর মুখ, চোখের পাতা বন্ধ। মাঝে মাঝেই আর্তনাদ করে উঠছেন তিনি।

কিঙ্করবাবু চাপা স্বরে বলে উঠলেন, 'আমার বাবা।'

বিপিন জানতে চাইল, 'কী হয়েছে ওনার?'

—‘একটা কার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। তারপর থেকে এই অবস্থা। ভালো হবার আর সম্ভাবনা নেই।' —একথা বলে কিঙ্করবাবু কয়েক মুহূর্ত মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বিপিনকে বললেন, “রাত হয়েছে। ঘরে গিয়ে খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ুন। কাল ভোরে উঠে বুদ্ধগয়া দেখতে যাবার জন্য বেরিয়ে পড়বেন।'

বিপিন এরপর ঘরে ফিরে খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ল। রাতটা নিশ্চিন্তেই কেটে গেল বিপিনের। শুধু মাঝরাতে একবার খুব সামান্য সময়ের জন্য ঘুম ভেঙে ছিল তার। সেই সময় যেন তার কানে ভেসে এসেছিল কথাবার্তার সামান্য শব্দ। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে শব্দ অবশ্য বিপিনের শোনার ভুলও হতে পারে।

পরদিন ভোরবেলাই বিপিন বেরিয়ে পড়েছিল সে বাড়ি থেকে। বাড়ি থেকে বেরোবার আগে কিঙ্করবাবু একটা চাবি দিয়ে গেলেন বিপিনকে। যাতে কিঙ্করবাবু বাড়িতে না থাকলে তার ঘরে ঢুকতে অসুবিধা না হয়। কিঙ্করবাবুর বাড়ি থেকে টাঙাতে বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে সরকারি বাসে সোজা বুদ্ধগয়া পৌঁছে গেল বিপিন। গতকাল বৃষ্টির পর মেঘমুক্ত রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ, দারুণ পরিবেশ। দেশি-বিদেশি নানা টুরিস্টদের ভিড়ে মিশে বুদ্ধগয়ার নানা দ্রষ্টব্য মহাবোধি মন্দির, জাপানি মন্দির, বোধিবৃক্ষ এসব নানা দ্রষ্টব্য স্থান দেখল বিপিন। মনে মনে সে ভাবল, “ভাগ্যিস গয়াতে এসেছিলাম, নইলে এত সুন্দর জায়গা দেখা হত না!' বুদ্ধগয়া দেখা শেষ করে বিকালের বাস ধরে সন্ধ্যা নাগাদ গয়াতে ফিরল সে। তারপর টাঙা ধরে রওনা হল কিঙ্করবাবুর বাড়ির দিকে। সেদিকে এগোতে এগোতেই বিষ্ণুপাণ্ডার ফোন পেল বিপিন। বিষ্ণুপাণ্ডা বলল সে গয়াতে ফিরে এসেছে। বিপিন যেন ভোরবেলা পঞ্চমহল্লাতে পৌছে যায়। যত তাড়াতাড়ি সে পৌঁছতে পারবে, ততই কাজের সুবিধা। বিপিন তাকে বলল যে ভোরের আলো ফুটলেই সে রওনা হবে পঞ্চমহল্লায়। যাক, আর সম্ভবত কোনো ঝামেলা হবে না। ভালোয় ভালোয় সব কাজ মিটবে। বেশ উৎফুল্ল হল বিপিন। কিঙ্করবাবুর বাড়ির সামনে যখন সে টাঙা থেকে নামল তখন সন্ধ্যা নামতে চলেছে। বাড়িটা কেমন যেন নিঃসঙ্গ-বিষণ্ণ দিন শেষের আবছা আলোতে।

বিপিন বাড়িতে ঢুকল। কিঙ্করবাবুকে সে দেখতে পেল না। কিঙ্করবাবুর বাবা যে ঘরে আছেন সে ঘরের পাশ দিয়ে নিজের ঘরে যাবার সময় সে একবার তাকাল সেদিকে। দরজা বন্ধ। কোনো শব্দ আসছে না ভিতর থেকে। চাবি সঙ্গেই ছিল। তালা খুলে এরপর নিজের ঘরে ঢুকল বিপিন। রাতের খাবার সে বাইরে থেকে কিনে এনেছে। টাঙাওয়ালার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে যে ভোরের আলো ফুটলেই সে তাকে নিতে আসবে। তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে শুয়ে পড়বে সে। আর আজ রাতেই কিঙ্করবাবুর ভাড়ার টাকা মিটিয়ে দেবে। বিপিন মনে মনে ভাবল। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বিপিন তার সঙ্গে আনা কয়েকটা ম্যাগাজিন ঘণ্টাখানেক ধরে পড়ল। তারপর রাত আটটা নাগাদ খাওয়া সেরে কিঙ্করবাবুর আগমনের প্রতীক্ষা করতে লাগল বিছানায় শুয়ে।

কিঙ্করবাবুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে বিপিন ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাত দশটা নাগাদ বিপিনের ঘুম ভেঙে গেল। খাটে উঠে বসতেই বিপিনের কানে এল গতদিনের মতোই সেই গোঙানির শব্দ। কিঙ্করবাবুর গলা। সম্ভবত বাবার সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। কিঙ্করবাবুর গলা কানে আসতেই বিপিন ভাবল টাকাটা তাকে দিয়ে আসা যাক। বিপিন পরদিন ভোরবেলা যখন বেরোবে তখন হয়তো কিঙ্করবাবুর ঘুম ভাঙল না, বেরোতে দেরি হয়ে যাবে। বিপিন আর পরদিন ফিরবে না এ বাড়িতে। কাজকর্ম মিটিয়ে আশেপাশে একটু ঘুরে বিকালে প্লাটফর্মে ট্রেন ধরতে চলে যাবে। বিপিন তাই খাট থেকে নেমে ঘর থেকে বেরোল কিঙ্করবাবুর সঙ্গে দেখা করার জন্য।

হ্যাঁ, কিঙ্করবাবুরই গলা। বাবার ঘরে কথা বলছেন তিনি। পায়ে পায়ে এগিয়ে বিপিন সে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আধভেজা দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে আবছা একটা আলো আসছে। সম্ভবত একটা লণ্ঠন জ্বলছে সে ঘরে। বিপিন দরজাতে টোকা দিতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ঘরের ভিতর থেকে ভেসে এল কিঙ্করবাবুর গলা— 'বাবা আমি আর পারছি না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। তুমি আর আমাকে বাধা দিও না।'

তার কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বিপিন।

কিঙ্করবাবুর কথা শুনে তার বাবা অস্পষ্ট ভাবে কিছু একটা বললেন যা বুঝতে পারল না বিপিন। তবে প্রত্যুত্তরে কিঙ্করবাবু বললেন, “আমার আর কিছু করার নেই বাবা। তোমার জন্য এই একটা বছর প্রতিটা দিনরাত আমি কষ্ট করেছি। আমার সামান্য যা কিছু ছিল তা সব আজ নিঃশেষ এখানে থাকতে গিয়ে। তিন মাসের ভাড়া বাকি। বাড়িওয়ালা আর দু-তিন দিনের মধ্যেই এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে আমাকে। তখন কোথায় থাকবে তুমি? আজ রাতটাই একসঙ্গে আমাদের শেষ রাত।'

একটু জড়ানো ভাবে বললেও কিঙ্করবাবুর বাবার এর পরের কথাগুলো বুঝতে পারল বিপিন। তিনি কাতরভাবে বললেন— 'আমি কি কষ্ট করিনি তোর জন্য। মা মরা ছেলেকে কত কষ্টে বড় করে তুলেছি। আর এখনও প্রতি মুহূর্তে কত যন্ত্রণা ভোগ করছি শুধু তোরই জন্য। তোর মায়ায়। আমার প্রতি কি তোর কোনো মায়া নেই?”

—‘মায়া আছে বলেই তো আমিও এতটা কষ্ট করেছি তোমার জন্য। কতবার ভেবেছি কাজটা করব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই মায়ার জন্য পারিনি। তবে আর নয়।'— কিঙ্করবাবুর কথাগুলো বেশ রুক্ষ শোনাল বিপিনের কানে।

কিঙ্করবাবুর বাবা আবারও কাতরকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘দয়া কর। শেষ একবারের জন্য তুই একবার ভেবে দেখ। আমি যদি তোর জন্য এত কষ্ট করতে পারি তবে তুই...

ভদ্রলোককে কথা শেষ না করতে দিয়ে কিঙ্করবাবু স্পষ্টতই কঠোর কণ্ঠে বললেন, ‘না আমি আর ভাবব না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। তুমি আমাকে আর বাধা দিতে পারবে না। আমি এখন যাচ্ছি।’— এই বলে দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে বিপিনের মুখোমুখি হয়ে গেলেন তিনি। দরজার বাইরে বিপিনকে দেখে প্রথমে মৃদু চমকে উঠলেন কিঙ্করবাবু। কিন্তু তার পরমুহূর্তেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, 'আপনি কাল সকালেই চলে যাচ্ছেন তাই তো?'

বিপিন বলল, 'হ্যাঁ, কাল খুব ভোরে। সেই জন্য টাকাটা দিতে এলাম আপনাকে। একথা বলে টাকাটা এগিয়ে দিয়ে সে বলল, 'আপনি আমাকে এ বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে অনেক উপকার করলেন। নইলে খুব বিপদে পড়তাম।'

কিঙ্করবাবু টাকাটা তার হাত থেকে নিয়ে বললেন, 'তার থেকে আপনি অনেক বেশি উপকার করলেন এই টাকাটা দিয়ে। একটা কাজের জন্য আমার খুব প্রয়োজন ছিল টাকার।'

বিপিন তাকাল কিঙ্করবাবুর দিকে। ঘরের ভিতর থেকে একটা আলোর রেখা এসে পড়েছে কিঙ্করবাবুর মুখে। বিপিনের মনে হল কিঙ্করবাবুর চোখ দুটো যেন ছলছল করছে। হাতে ধরা টাকার দিকে তাকিয়ে কিঙ্করবাবু এরপর একটু ধরা গলায় বিপিনের উদ্দেশে বললেন, 'অনেক রাত হল। ভোরে উঠতে হবে। এবার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমিও ভোরে বেরোব। সকালে হয়তো দেখা নাও হতে পারে। সাবধানে বাড়ি ফিরবেন।”

একথা শোনার পর তাকে আরও একবার ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ঘরে ফিরে বিপিন শুয়ে পড়ল।

পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভেঙে গেল বিপিনের। সামান্য জিনিসগুলো আগের রাতেই গোছগাছ করে রেখেছিল সে। ঘর থেকে যখন সে বেরোল তখন ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। কিঙ্করবাবুর নাম ধরে বারকয়েক ডাক দিয়েও তার সাড়া পেল না বিপিন। কিঙ্করবাবুর বাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বিপিন দেখল সে ঘরের দরজা খোলা। শূন্য খাট। কিঙ্করবাবুর বাবা বা তিনি কেউ নেই সে ঘরে। তাহলে সম্ভবত বাবাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাবার জন্য কোথাও কাক ভোরেই রওনা দিয়েছেন কিঙ্করবাবু। তিনিও ভোরে বেরোবেন বলেছিলেন। একথা মনে মনে ভেবে নিল বিপিন। কথামতো টাঙা এসে দাঁড়িয়েছিল বাড়ির বাইরে। বিপিন কিঙ্করবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে টাঙায় চেপে রওনা হয়ে গেল পঞ্চমহল্লার উদ্দেশে।

পঞ্চমহল্লায় তার জন্য অপেক্ষা করছিল বিষ্ণুপাণ্ডা। সে তাকে নিয়ে চলল ‘ফল্গু তটে। বিস্তীর্ণ বালু তট। তবে বালি খুঁড়লেই জল বেরোয়। কথিত আছে সীতার অভিশাপে নাকি ফল্গু অন্তঃ সলিলা হয়েছিল। নদীতটে এক জায়গাতে স্নানের বন্দোবস্ত আছে। সেখানে স্নান সেরে বিপিন বিষ্ণুপাণ্ডার সঙ্গে পিণ্ডদানের কাজে বসল। সেখানে পিণ্ডদানের কাজ শেষ করার পর পাণ্ডার সঙ্গে সে গেল অক্ষয়বটে। প্রাচীন এই গাছটি নাকি অমর। পৌরাণিক গাথা অনুসারে মহাপ্রলয়ের সময়ও এই অক্ষয়বট নাকি ডোবেনি। এই বৃক্ষর নামই তার পরিচয়। পিণ্ডদানের ধর্মীয় কাজ শুরু হয় ফল্গুতীরে, শেষ হয় অক্ষয়বটে এসে। বিপিনের সব কাজ শেষ হল একসময়। ইতিমধ্যে ঘণ্টা দুই সময় কেটে গেছে। বেলা প্রায় ন'টা বাজে। সূর্য অনেকক্ষণ আগে উঠলেও আকাশের মুখ ভার ৷ পাহাড়ের মাথায় সকালেই মেঘ জমতে শুরু করেছে। নির্বিঘ্নে সব কাজ মিটিয়ে দক্ষিণা বুঝে নেবার পর বিষ্ণুপাণ্ডা বিপিনকে বলল, 'কাজ তো শেষ, সারাদিন এখন কী করবেন?”

বিপিন বলল, “বিকালে ট্রেন ধরার আগে ভাবছি কিছুটা ঘুরে নেব। কোথায় কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো?'

বিষ্ণুপাণ্ডা আকাশের দিকে একটু তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘আমি এখন প্রেতশিলা পাহাড়ে যাব। আপনি সঙ্গে যেতে পারেন। জায়গাটা ভালো লাগবে। ওপরে যম দেবতার মন্দির ছাড়াও ওপর থেকে পুরো গয়া শহরটা দেখা যায়।”

বিপিন সম্মত হয়ে গেল সে প্রস্তাবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা টাঙায় চেপে বিষ্ণুপাণ্ডার সঙ্গে বিপিন রওনা দিল প্রেতশিলা পাহাড়ের দিকে। পথে যেতে যেতে বিপিন বিষ্ণুপাণ্ডাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি ওখানে কী করতে যাচ্ছেন?'

বিষ্ণুপাণ্ডা বলল, 'আমার যা কাজ। একজন ওখানে পিণ্ডদান করবে।'

বিপিন জানতে চাইল, 'সবাই তো ফল্গুর তীরেই পিণ্ড দিচ্ছে দেখলাম। আমিও তো দিলাম। প্রেতশিলা পাহাড়েও পিণ্ড দেওয়া হয়?’

বিষ্ণুপাণ্ডা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, হয়। সবাই সাধারণত ফল্গুতীরে পিণ্ড দিলেও যাদের অপঘাতে মৃত্যু হয় তাদের প্রেতযোনি থেকে মুক্তি দানের জন্য প্রেতশিলাতে পিণ্ডদান করে সেখানে ত্রিপিণ্ডিশ্রাদ্ধ করা হয়।'

কথা বলতে বলতে তারা পৌঁছে গেল প্রেতশিলা পাহাড়ের নীচে। টাঙা থেকে নেমে বিষ্ণুপাণ্ডা বলল, ‘এবার আমি যাই। যার কাজ করব দেখি সে এসেছে কিনা? আপনি ধীরে ধীরে সব ঘুরে দেখুন। তবে আকাশের গতিক ভালো নয়। বৃষ্টি নামবে।' এই বলে সে বিপিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অন্য দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ধাপে ধাপে পাথুরে পথ উঠে গেছে প্রেতশিলা পাহাড়ের মাথায়। পাকদণ্ডী বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল বিপিন। পথের দু-পাশে ঝোপঝাড়, ইতস্তত ছড়িয়ে আছে বড় বড় পাথর। ওপরে ওঠার পথে রাস্তার মাঝে মাঝে রয়েছে যাত্রীদের বিশ্রাম নেবার জন্য ছোট ছোট টিনের শেড। তবে ফল্গুতীরের মতো এখানে লোকজন আর পাণ্ডাদের হাঁকডাক নেই। মাঝেমধ্যে দু-একজন লোক নিঃশব্দে বিপিনের পাশ কাটিয়ে ওঠানামা করছে। মাথার ওপর আকাশ ক্রমশ ছেয়ে যাচ্ছে কালো মেঘে। ধীরে ধীরে এক সময় প্রেতশিলার মাথায় উঠে এল বিপিন। পাহাড়ের মাথায় তিনটে কুণ্ড আছে। সেই সব কুণ্ডে স্নান সেরে প্রেতশিলা পাথরের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পিণ্ডদানের কাজ করছে কিছু মানুষ। যাদের উদ্দেশে পিণ্ডদান করা হচ্ছে তাদের প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে কোনো না কোনো অপঘাতে। প্রেতশিলা নামের বিরাট বড় পাথরখণ্ডটা অনেকটা হাতির পিঠের মতো দেখতে। কালো পাথর খণ্ড। তাকে ঘিরে প্রায় নিঃশব্দে পারলৌকিক কাজ সাঙ্গ করছে লোকজন। চারপাশে কেমন একটা থমথমে পরিবেশ। মাথার ওপর সূর্যর কোনো তেজ নেই। মৃদু ঠান্ডা বাতাস বইছে। তিনটে কুণ্ড, প্রেতশিলা, পাহাড়ের মাথায় যমরাজের মন্দির কিছু সময়ের মধ্যেই দেখে নিল বিপিন। বৃষ্টি নামবে। তাই এরপর নীচে নামার পথ ধরল বিপিন

কিন্তু বিপিন নীচে নামতে পারল না। হঠাৎই পৃথিবীতে যেন অন্ধকার নেমে এল। কালো মেঘে ঢেকে গেল সূর্য। বৃষ্টি নামবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই। কাজেই অল্প একটু নীচে নেমে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য বিপিন তাড়াতাড়ি আশ্রয় নিল রাস্তার পাশে একটা শেডের নীচে। চারপাশে কোনো লোকজন নেই। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা বাতাসও বাড়ছে। সেই বাতাসে পাকদণ্ডীর ওপর থেকে নেমে কিছুটা নীচে দাঁড়িয়ে বিপিন ঠান্ডা বাতাসে কাঁপতে লাগল।

এক সময় বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা এসে পড়ল পৃথিবীতে। যেন মহাপ্রলয়ের প্রথম সংকেত। ঠিক সেই সময় বিপিন দেখল পাকদণ্ডী বেয়ে একজন লোক দ্রুত উঠে আসছে ওপর দিকে। এসময় একা লোকটাকে ওভাবে আসতে দেখে বেশ একটু ভয় পেয়ে গেল বিপিন। কে ও? চোর-ডাকাত নয়তো? কিন্তু লোকটা বিপিনের কাছাকাছি ওপরে উঠে আসতেই বিপিন চিনতে পারল তাকে। আরে এ যে কিঙ্করবাবু!

কিঙ্করবাবু খেয়াল করেননি শেডের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা বিপিনকে। ব্যস্তসমস্ত হয়ে তিনি ওপরে উঠছেন। তার এক হাতে দড়ি বাঁধা মেটে হাড়ি আর পাট কাঠি। অন্য হাতে একটা ব্যাগ। কিঙ্করবাবু যখন বিপিনের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছেন বিপিন তখন ডাকতে যাচ্ছিল তাকে।। কিন্তু ঠিক তখনই একটা ব্যাপার ঘটল। উলটো দিকে রাস্তার পাশে একটা বিরাট বড় পাথরের আড়াল থেকে একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এসে দু-পাশে দু-হাত বাড়িয়ে কিঙ্করবাবুর পথ আটকে দাঁড়াল। তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন কিঙ্করবাবু। তারপর মুহূর্তখানেক তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সরে যাও, সরে যাও।'

তা শুনে সেই ছায়ামূর্তি কিঙ্করবাবুর উদ্দেশে হাতজোড় করে কাতর কণ্ঠে বলে উঠল, 'যাস না কিঙ্কর, যাস না। আমি তোকে কিছুতেই প্রেতশিলায় যেতে দেব না। ফিরে চল, ফিরে চল....।' কিঙ্করবাবুর এর পরের কথা শুনে ওই অস্পষ্ট ছায়ামূর্তির পরিচয় বুঝতে অসুবিধা হল না বিপিনের। লোকটার উদ্দেশে কিঙ্করবাবু কঠিন স্বরে বলে উঠলেন, 'প্রেতশিলায় না গিয়ে আমি আজ আর ফিরব না বাবা। তুমি সরে যাও। ওপরে উঠতে দাও আমাকে।

কিঙ্করবাবুর দুর্ঘটনাগ্রস্ত শয্যাশায়ী বাবা এখানে এভাবে উঠে এলেন কীভাবে? কিন্তু বিপিন একথা ভাবতে না ভাবতেই কিঙ্করবাবুর বাবা 'না-না' বলে আর্তনাদ করে বাধা দেবার জন্য জড়িয়ে ধরতে গেলেন। আর কিঙ্করবাবু সঙ্গে সঙ্গে তাকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারলেন। তার বাবা ছিটকে পড়লেন পাথরের আড়ালে। সেখান থেকে তার আর্তনাদ ভেসে এল, “না, যাস না, খাস না। আমাকে দয়া কর...'

কিঙ্করবাবুর গলা থেকেও যেন এবার আর্তনাদ শোনা গেল। কোনো দিকে না তাকিয়ে যেন কাঁদতে কাঁদতে তিনি ছুটতে শুরু করলেন ওপরে ওঠার জন্য। ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে বিপিন আর তাকে ডাকার কোনো সুযোগই পেল না। আর এর পরমুহূর্তে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টি আর অন্ধকারে মুছে গেল বিপিনের চারপাশের পৃথিবী। বিপিনের কানে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অনুরণিত হতে লাগল কিঙ্করবাবুর বাবার কাতর আবেদন— ‘যাস না, যাস না, আমাকে দয়া কর...'

প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় ধরে নাগাড়ে বৃষ্টি চলল। তারপর একসময় আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। বৃষ্টিও থামল। এই মহাদুর্যোগের মধ্যে এতক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিপিন। কিঙ্করবাবুর আচরণটা দুর্বোধ্য ঠেকেছে তার। এর পাশাপাশি একটা যেন বিতৃষ্ণাও জন্মেছে তার প্রতি। বৃদ্ধ বাবাকে কেউ অমন ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে চলে যায়! লোকটা কী পাষণ্ড। সেই বৃদ্ধর জন্য একটা দুঃখবোধ কাজ করছে বিপিনের মনে। বৃষ্টি থামতেই বিপিন প্রথমে এগিয়ে গেল সেই পাথরটার দিকে। যার পিছনে ছিটকে পড়েছিলেন কিঙ্করবাবুর বাবা। কিন্তু সেই পাথরের আড়ালে কেউ নেই। হয়তো বা সেই অন্ধকার বৃষ্টির মধ্যেই ভদ্রলোক কোথাও চলে গেছেন। বিপিন এরপর পাকদণ্ডী বেয়ে নীচে নামতে শুরু করল। তবে এই অদ্ভুত ব্যাপারের সঙ্গে সেই খটকাটা রয়েই গেল তার মনে। কিঙ্করবাবুর মেরুদণ্ড ভাঙা বাবা অতটা ওপরে উঠে এলেন কীভাবে! প্রেতশিলা থেকে নেমে একটা টাঙা নিয়ে বিপিন সোজা ছুটল স্টেশনের দিকে।

প্লাটফর্মে বসে ঘণ্টাচারেক সময় কাটিয়ে দিল বিপিন। বিকালের পর থেকে প্লাটফর্মে ভিড় বাড়তে লাগল। যাত্রীদের ভিড় তো আছেই তার সঙ্গে পাণ্ডা আর হোটেলের দালালদের সমাগম। এক একটা করে ট্রেন এসে থামছে, আর তার সঙ্গে পাণ্ডা আর যাত্রীদের চিৎকার চেঁচামেচিতে কান পাতা দায় হচ্ছে। সন্ধ্যা নাগাদ বিপিন অ্যানাউন্সমেন্ট শুনল তার নির্ধারিত গাড়ি প্লাটফর্মে ঢুকছে। গাড়ি এসে থামতেই বিপিন ভিড় ঠেলে এগোল তার নির্দিষ্ট বগিতে ওঠার জন্য। আর ঠিক সেই সময় ভিড়ের মধ্যে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল বিষ্ণুপাণ্ডার সঙ্গে। বিষ্ণুপাণ্ডা তাকে দেখে একগাল হেসে বলল, 'আপনি যে কিঙ্করবাবুর বাড়িতে ছিলেন তা বলেননি তো?

বিপিন বলল, 'হ্যাঁ, ছিলাম। আপনি তাকে চেনেন ? ”

বিষ্ণুপাণ্ডা জবাব দিল, 'হ্যাঁ, চিনি। লোকটা পাগলাটে ধরনের। মাথাটা মনে হয় একটু গণ্ডগোল আছে।'

—‘গণ্ডগোল আছে মানে?' জানতে চাইল বিপিন।

বিষ্ণুপাণ্ডা হেসে বলল, 'এরকমই এক সন্ধ্যা বেলায় এই প্লাটফর্মে কলকাতা থেকে আসা একটা ট্রেন থেকে একলা নেমেছিল লোকটা। তখনই আমার সঙ্গে তার প্রথম দেখা। কথা হল পরদিন সে প্রেতশিলাতে পিণ্ড দেবে। কিন্তু তার পরদিনই সে এসে আমাকে জানাল যে সে এখানে কিছুদিন থাকবে তারপর কাজটা করবে। একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে যেখানে আপনি ছিলেন সেখানে থাকতে শুরু করল লোকটা। মাঝে মাঝেই সে আমার সঙ্গে এসে দেখা করত আর বলত যে পরদিন পিণ্ডদানের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু পরদিনই আমাকে এসে বলত, 'আজ থাক অন্য দিন হবে।' একবার তো প্রেতশিলা পাহাড়ের নীচ পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছিল। খ্যাপা আর কাকে বলে! অবশেষে আজ সে কাজ মিটল। ওর জন্যই তো আজ প্রেতশিলা গেছিলাম। কাজ শেষ করে একবছর পর লোকটা এই গাড়িতে আজ দেশে ফিরে যাচ্ছে। একটু আগে প্লাটফর্মে দেখা হল তার সঙ্গে।' একটানা কথাগুলো বলে সম্ভবত কিঙ্করবাবুকে দেখার জন্যই ভিড়ের মধ্যে তাকাল বিষ্ণুপাণ্ডা।

বিপিন বিস্মিতভাবে তাকে প্রশ্ন করল, 'কিঙ্করবাবু কার পিণ্ডদান করলেন?”

বিপিনের প্রশ্নর জবাব দিতে পারল না বিষ্ণুপাণ্ডা। ট্রেন থেকে একটা বড় দল নেমেছে দেখে খদ্দের ধরার জন্য বিষ্ণুপাণ্ডা ছুটল সেদিকে। বিপিনের আর সময় ছিল না তার পিছু ধাওয়া করার। ট্রেন ছেড়ে দেবে তখনই। নিজের কম্পার্টমেন্ট খুঁজে নিয়ে সে ট্রেনে উঠে পড়ল। ট্রেন যাত্রা শুরু করল কলকাতার দিকে। ট্রেনে ওঠার পর বিপিন কিছুক্ষণ ধরে এই অদ্ভুত ব্যাপারটা নিয়ে ভাবল ঠিকই, কিন্তু এরপর তার মন চলে গেল কলকাতার দিকে। পিছনে পড়ে রইল গয়াধাম, প্রেতশিলা পাহাড়। জানলার পাশে লোয়ার বার্থ বিপিনের। রাত ন'টা নাগাদ খাওয়া সেরে সে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমের মধ্যে বারবার তার স্বপ্নে ফিরে আসতে লাগল কিঙ্করবাবুর বাবার সেই ঘর। সেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট বৃদ্ধর করুণ আর্তনাদ, সেই প্রেতশিলা পাহাড়ের ঘটনাটা। বিপিন যখন ঘুম ভেঙে জানলার পাশে উঠে বসল তখন অন্য যাত্রীদের ঘুম ভাঙেনি। বাইরে আধো অন্ধকার। আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। একটা ছোট্ট হল্ট স্টেশনে গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। বিপিন ঘড়ি দেখে হিসাব করে অনুমান করল এ জায়গাটা বর্ধমানের কাছাকাছি কোনো একটা স্টেশন হবে। বাইরে তাকাল বিপিন। প্লাটফর্ম থেকে মেঠো রাস্তা নেমে আধো অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেছে কোনো গ্রামের দিকে। জনশূন্য প্লাটফর্মে বিপিন হঠাৎ দেখতে পেল একটা লোক প্লাটফর্মে তার জানলার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সম্ভবত এ গাড়ি থেকেই নেমেছে সে। মুহূর্তর মধ্যে তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল লোকটার। আরে এ যে কিঙ্করবাবু! বিপিনকে দেখতে পেয়ে তিনি জানলার পাশে এগিয়ে এসে বললেন, ‘এক বছর পর দেশে - ফিরলাম।'

তবে এতদিন পর নিজের জায়গাতে ফিরলেও তার চোখে-মুখে কোনো আনন্দ নেই, প্লাটফর্মের রাত শেষের ক্ষয়াটে আলোতে তার মুখে জেগে আছে স্পষ্ট বিষণ্ণতা। সারা রাত প্রেতশিলা পাহাড়ের স্বপ্ন কাজ করেছে বিপিনের মনে। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে বিপিন তাকে বলল, 'কাল প্রেতশিলা পাহাড়ে আমি আপনাদের দেখেছি। বাবাকে আপনি ধাক্কা মারলেন কেন? তাকে কি আপনি ওখানে ফেলে এলেন? তা ছাড়া ফেরার সময় বিষ্ণুপাণ্ডার সঙ্গে দেখা হল। সে বলল...

মৃদু চমকে উঠলেন কিঙ্করবাবু। তারপর বিপিনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, 'আপনি যা দেখেছেন, যা শুনেছেন সব সত্যি। কাজটা আমাকে করতেই হত। তাই ধাক্কা মেরেছিলাম তাকে।'

—'মানে?' বিপিন জানতে চাইল।

কিঙ্করবাবু জবাব দিলেন, 'তাঁর পিণ্ডদানের জন্যই আমি গয়াতে গেছিলাম। আমি আপনাকে একবার কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম আমি তন্ত্রসাধনা, প্রেতচর্চা করতাম একসময়। পিণ্ডদানের আগের রাতে শেষবারের জন্য একবার তাকে দেখতে ইচ্ছা করল এবং তার সঙ্গে আমার সাধনা সত্যি কিনা তা দেখার জন্য আহ্বান করলাম তাঁকে। তিনি এসে হাজির হলেন, কিন্তু প্রেতযোনির অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও আর ফিরতে চাইলেন না। আমিও জড়িয়ে গেলাম এক অদ্ভুত সংকটে। একদিকে স্নেহ ভালোবাসার বন্ধন, অন্যদিকে মানুষরূপ ধারণে তার অসহ্য যন্ত্রণা। মৃত্যুর আগের যন্ত্রণা ফিরে এসেছিল তাঁর। অবশেষে কাল তাঁকে সে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলাম আমি। তাঁর পিণ্ডদান করলাম।' এই বলে হতভম্ব বিপিনকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে প্লাটফর্ম থেকে মেঠো রাস্তায় নেমে গেলেন বিপিনবাবু। হুইসেল দিয়ে চলতে শুরু করল ট্রেন। বিপিন দেখল মেঠো পথে নেমে কিছুটা এগিয়ে একবার পিছনে তাকালেন কিঙ্করবাবু। সম্ভবত তিনি নিশ্চিত হতে চাইলেন যে প্রেতশিলা পাহাড় থেকে কেউ তাকে অনুসরণ করে আসেনি। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। বিপিনের চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলেন কিঙ্করবাবু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%