হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বাঘু সর্দারের বাড়ির সামনে এসে বেশ অবাক হয়ে গেল নিখিল। কোথায় সেই খড়ে ছাওড়া সুন্দর বাড়িটা? ঝকঝকে-তকতকে নিকানো মাটির দেওয়াল-উঠোন? যে বাড়ির দাওয়ায় বসে বাঘু মণ্ডল বলেছিল, — এই সোঁদর বনের প্রতিটা গাং-খাড়ি-বাদাবন আমি হাতের তালুর মতন চিনি। সামনের বার আসবেন কত্তা। আমি আপনাকে ঠিক বনবিবির বড় পুষ্যিকে দেখাব। এখানে যারা বেড়াতে আসে, লাখে একজন দেখতে পায় তাকে, শুধু গল্প শোনে। বাকিরা
বাঘুর কথা সমর্থন করে তার শাকরেদ হারান বলেছিল, –হ্যাঁ, সামনের বার আসবেন। তবে, শীতে নয়, বর্ষার মুখে। শীতে এত লঞ্চ আসে, এত হইচই হয় যে, তারা কেউ নদীর চরে আসে না। বাদাবনেই সেঁদিয়ে থাকেন। বাঘু সর্দার কাউকে কথা দিলে তাকে বাঘ দেখাবেই। লঞ্চ আর পারমিট নিয়ে এখানে এসে খুঁজবেন আমাদের।
তাদের কথার ভরসাতেই লঞ্চ-পারমিট জোগাড় করে বাঘু মণ্ডলের বাড়ির দরজায় হাজির হয়েছে নিখিল। সঙ্গে এনেছে বিজনকেও। কিন্তু কোথায় বাঘুর বাড়ির দরজা? তাদের সামনে রয়েছে চালহীন ধসে পড়া কয়েকটা মাটির দেওয়াল। আশপাশের বাড়ি-ঘরগুলোও সেই অবস্থা।
আর এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকেও দেখে মনে হচ্ছে, কোনো মহাদানব যেন তাদের মাথার ঝুঁটিগুলো টেনে ছিঁড়ে নিয়েছে। হ্যাঁ, দানবই বটে। তার নাম, আয়লা। যে ঝড় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে সুন্দরবনের বহু গ্রাম আর বাদাবনবেষ্টিত দ্বীপ। তার হাত থেকে নিস্তার পায়নি বাঘুর ডেরা এই ছোট গ্রাম বনবিবিপুরও।
বাঘু সর্দারের বাড়ির সামনে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল নিখিলরা। ঠিক সেই সময় কাছেই একটা ভাঙা বাড়ির পাশে একটা প্লাস্টিকের ছাউনির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একজন বৃদ্ধা৷ তার কোলে একটা বাচ্চা। সে নিখিলদের এক ঝলক দেখে নিয়ে জানতে চাইল, – কাকে খুঁজছেন বাবুরা?
নিখিল বলল,—বাঘু মণ্ডলকে। এটাই তো তার বাড়ি?
বৃদ্ধা জবাব দিল,—হ্যাঁ, কিন্তু সে তো নেই?
—কোথায় গেছে?
সে বলল,— সাত দিন হল, সে একদল বাবুকে নিয়ে বাঘ দেখাতে গেছে। বলে গেল তিন দিনের মধ্যে ফিরবে। এখনও ফিরল না।
নিখিল জিগ্যেস করল,—আপনি কি বাঘু মণ্ডলের কেউ হন? সে আমাদের বাঘ দেখাবে বলেছিল তাই এসেছিলাম। আচ্ছা তার শাকরেদ হারান মাঝিকে পাওয়া যাবে?
বৃদ্ধা বলল, –হারানের খোঁজ আমি জানি না। হয়তো সে-ও বাঘুর সঙ্গে আছে। আমি হলাম বাঘুর মা। আর এই তার ছেলে। আয়লা আমাদের সব নিল, ঘর নিল, জমি নিল, এই বাচ্চাটার মা-কেও নিল। বাঘুও এখন নেই, এই বাচ্চাটা নিয়ে তাঁবুর তলায় খুব কষ্টে আছি আমি। বাঘু যাদের বাঘ দেখাতে নিয়ে গেছে, তারা নাকি বাঘ দেখাতে পারলে অনেক টাকা দেবে বলেছে। সেই টাকা নিয়ে ফিরে এসে বাঘুর আমাদের সামসেরগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার কথা। আমার সেখানে গিয়ে ঘর তুলব। আর এখানে থাকব না।
কথাগুলো বলে সে একটু ইতস্তত করে বলল, – আমাকে দশটা টাকা দেবেন? যা চাল ছিল সব শেষ। অথচ বাঘুর খোঁজ নেই।
তার কথা শোনার পর নিখিল পঞ্চাশটা টাকা পকেট থেকে বার করে এগিয়ে দিল তার দিকে। প্রকৃতি আজ এ মানুষগুলোকে সত্যি কত অসহায় করে তুলেছে। এদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে আয়লা।
- বৃদ্ধা টাকাটা নিল। তারপর বলল, – আপনাদের ভালো হোক। কত কষ্ট করে আপনারা এখানে এসেছেন বাঘ দেখতে। বাবা কালুরায়-দক্ষিণরায়রা যেন তাঁদের পুষ্যিদের সঙ্গে আপনাদের দেখা করিয়ে দেন। আর গাঙে তো নিশ্চই যাবেন আপনারা, যদি বাঘুর সঙ্গে দেখা হয়, তবে তাকে বলবেন, সে যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। বড় কষ্টে আছি আমরা।’
শেষ কথাগুলো ছলোছলো চোখে বলে বাঘুর মা বাচ্চা কোলে এগোল তার তাঁবুর দিকে। সে চলে যাওয়ার পর নিখিল বেশ হতাশ ভাবে বিজনকে বলল, এবারও মনে হয় বাঘ দেখা হল না। কত খরচ করে নিজেরাই লঞ্চ ভাড়া করলাম, কত আশা করে তোকে এখানে বাঘ দেখাব বলে আনলাম, সব কিছুই ব্যর্থ হল।
বিজন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, – ‘ব্যর্থ হবে কেন? আমরা সুন্দরবনের প্রকৃতি দেখব। এখানে ক'টা টুরিস্টই বাঘের দেখা পায় বল? ভূত দেখার গল্পর মতো সবাই বলে, এ দেখেছে-সে দেখেছে, কিন্তু ভূতের মতোই নিজেরা কেউ বাঘের দেখা পায় না। এখন কী করবি বল?’
নিখিল বলল, —আর কী করব! এখান থেকে লঞ্চে ফিরে যাই, তারপর যাব সজনেখালিতে, সেখানে রাত কাটিয়ে কাল ভোরে যাব দোবাঁকি, বুড়িডাবড়ি ওই সব জায়গায়। সাধারণ টুরিস্টরা যেমন যায়।
বেলা বাড়ছে। নিখিলরা আর সেখানে না দাঁড়িয়ে এগোল জেটির দিকে। যেখানে রয়েছে তাদের লঞ্চ। ছোট লঞ্চ। নিখিলরা ছাড়া আর মাত্র দুজন লোক লঞ্চে। সারেং আর তার হেল্পার। কিছুক্ষণের মধ্যে লঞ্চে এল নিখিলরা। লঞ্চ তাঁদের নিয়ে যাত্রা শুরু করল সজনেখালির উদ্দেশে। বেলা থাকতেই, সূর্য ডোবার আগে সেখানে পৌঁছে গেল তারা - সজনেখালির জেটিতে বসে গল্প করছিল নিখিল আর বিজন। এটা টুরিস্ট সিজিন নয়, জেটিতে লোকজন নেই, লঞ্চের ভিড়ও নেই। কিছুটা তফাতে জলের ওপর শুধু একলা দাঁড়িয়ে আছে নিখিলদের ছোট লঞ্চটা। জেটির থামের সঙ্গে কাছি দিয়ে বাঁধা আছে লঞ্চ। একটা টিমটিমে বাতি শুধু জ্বলছে লঞ্চে। তার লোক দুজন নামার পর পরই খাওয়া সেরে খোলে ঘুমোতে গেছে। কোনো সাড়া নেই তাদের। নিখিল আর বিজন অবশ্য থাকার ব্যবস্থা করে নিয়েছে টুরিস্ট লজে। সে জায়গা জেটি থেকে বেশি দূরে নয়। সেখানেও তেমন কোনো লোকজন নেই। সেখানে খাওয়া সেরে হাঁটতে হাঁটতে জেটিতে এসে গল্প করতে বসেছে তারা। বেশ সুন্দর লাগছে তাদের এ জায়গাটা। নদীর ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগছে। নদীর জল জেটির কংক্রিটের থামে ধাক্কা খেয়ে মৃদু ছলাৎছল-ছলাৎছল শব্দ তুলছে। আকাশে সোনার থালার মতো বেশ বড় চাঁদ উঠেছে। পূর্ণিমার চাঁদ। তার প্রতিবিম্ব মাঝে মাঝে ঝিলিক দিচ্ছে নদীর কালো জলের মাথায়। দূরে চাঁদের আলোতে দেখা যাচ্ছে কালো কালো সব বিন্দু। নদীর গায়ে জেগে থাকা সব দ্বীপ। সেখানে ডেরা বাঁধে বাবা দক্ষিণরায়ের পুষ্যিরা। গায়ে যাদের ডোরাকাটা দাগ, চোখ যাদের ভাঁটার মতো জ্বলে। নিঃশব্দে যারা ঘুরে বেড়ায় এই নদীবেষ্টিত বাদা বনের রাজ্যে।
বেশ রাত হয়েছে। চারপাশের জ্যোৎস্না আলোকিত চরাচরের দিকে তাকিয়ে নিখিল এক সময় বলল, – তুই ঠিকই বলেছিস বিজন, বাঘ দেখা যদি নাও হয়, এই প্রকৃতির সৌন্দর্যই বা কম কী? দেখেছিস চাঁদের আলোতে কী অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছে চারদিক!
বিজন বলল, —হ্যাঁ, ঠিক তাই। বাঘ তো চিড়িয়াখানাতেও দেখা যায় কিন্তু এরকম সুন্দর পরিবেশ আর কোথাও পাওয়া যাবে কি?
ঠিক এই সময় তাদের পিছন থেকে কে যেন হঠাৎ বলে উঠল,—না, এরকম সুন্দর পরিবেশ অন্য কোথাও পাবেন না। তবে এখানকার বাঘের সঙ্গে চিড়িয়াখানার বাঘেরও বিস্তর ফারাক। বাদা বনের বাঘ হল সব বাঘের রাজা।
কে বলল কথাটা? পিছনে ফিরে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল নিখিল চাঁদের আলোতে কয়েক হাত তফাতে দাঁড়িয়ে আছে বাঘু সর্দার। তার পরনে মালকোঁচা দেওয়া সাদা ধুতি, হাতে একটা হেঁতালের লাঠি। কালো সুঠাম অঙ্গ বেয়ে যেন চাঁদের আলো চুঁইয়ে পড়ছে। সে আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে তার গলায় ঝোলা রুপোর মাদুলিটা। তাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে বাঘু সর্দার।
তাকে দেখেই নিখিল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বাঘু সর্দার তুমি এখানে আছ! তোমাকে খুঁজতে আজ তো তোমার গ্রামে গেছিলাম আমরা। তোমার মা বলল, তুমি কাদের বাঘ দেখাবে বলে সেখান থেকে সেই যে বেরিয়েছ আর ফেরোনি! তুমি তো গতবার আমাকে বাঘ দেখাবে বলেছিলে? সে ভরসাতেই সব জোগাড়যন্ত্র করে আমার এই বন্ধুকে নিয়ে বাঘ দেখতে এসেছি। ওই তো আমাদের লঞ্চ।
বাঘু সর্দার তার কথা শুনে ঝকঝকে সাদা দাঁত বার করে হেসে বলল, –সে জন্যই তো আপনাদের কাছে চলে এলাম।
নিখিল বেশ উৎসাহিত হয়ে বলল, –তোমাকে আমাদের খবর কে দিল? নিশ্চয়ই তুমি আজ বাড়ি ফিরেছিলে! তা তুমি আমাদের কবে বাঘ দেখাতে নিয়ে যাবে?
তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বাঘু এবার একটু ইতস্তত করে বলল, —হ্যাঁ, দেখাব বই কী। কিন্তু তার জন্য আমাকে হাজার টাকা দিতে হবে, আগে আমি টাকার কথা কাউকে বলতাম না। বাঘ দেখার পর খুশি হয়ে যে যা দিত, তাই হাত পেতে নিতাম। কিন্তু এখন আমার টাকা বড় দরকার। আয়লা আমার সব কেড়ে নিয়েছে...।
বিজন বলল,–তোমার ঘরবাড়ির অবস্থা আমরা নিজের চোখে দেখে এসেছি। তোমার মা-র মুখে কিছুটা শুনেওছি। তোমাকে এ ব্যাপারে আর কিছু বলতে হবে না। তোমাকে হাজার টাকাই দেব।
–সত্যি হাজার টাকা দেবেন। চকচক করে উঠল বাঘু সর্দারের চোখ।
—হ্যাঁ, সত্যি দেব। তুমি কাল কখন আমাদের বাঘ দেখাতে নিয়ে যাবে বলো? নিখিল জানতে চাইল।
বাঘু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, – আজই, এখন।
—এই রাতের বেলা। এখনই। বিস্মিত কণ্ঠে নিখিল বলল।
বাঘু সর্দার হেসে বলল, – হ্যাঁ, এখনই। নদীর ধারে বাঘ আসে সকাল-সাঁঝের গোধূলি বেলায়, আর গভীর রাতে। এক জায়গাতে নদীর চরে বাঘের খোঁচ অর্থাৎ পায়ের ছাপ দেখে এসেছি আমি। বিরাট মদ্দা বাঘ একটা।
নিখিল বলল, – কিন্তু এত রাতে বাঘ দেখতে যাওয়া কি ঠিক হবে? তা ছাড়া সারেং কি সেখানে এখন লঞ্চ নিয়ে যেতে রাজি হবে?
বাঘু সর্দার বলল,—রাতে লঞ্চ ছাড়ার নিয়ম নেই। জল পুলিশ ধরবে। তা ছাড়া, লঞ্চের শব্দ কানে গেলে বাঘ দুরে সরে যাবে। এই জেটির নীচে আমার নৌকো রাখা আছে। আপনারা যাবেন সে নৌকাতে। জায়গাটা বেশি দূরে নয়, রাত থাকতেই আবার ফিরে আসব আমরা।
নিখিল কী সিদ্ধান্ত নেবে বুঝতে না পেরে তাকাল বিজনের দিকে। তারা দুজনেই ভাবতে লাগল কী বলবে বাঘু সর্দারকে।
তাদের অবস্থা বুঝতে পেরে বাঘু সর্দার হেসে ফেলে বলল, –আপনারা শহরের মানুষরা কিন্তু বেশ ভিতু হন বাবু। একটু সাহস না দেখালে দক্ষিণরায়ের ব্যাটা আপনাদের দেখা দেবেন কেন ? আমার ওপর ভরসা রাখুন। গাং আজ শান্ত আছে। আপনারা তো পাড়েও নামবেন না, বনেও ঢুকবেন না, আপনাদের ভয় কী? এ জঙ্গল আমি হাতের তালুর মতো চিনি। কোনো ভয় নেই আপনাদের। কী সুন্দর জোৎস্না দেখেছেন আজ! নৌকায় দাঁড়িয়ে নদীর চরে জঙ্গলের রাজাকে দেখবেন আপনারা। যে দৃশ্য বাঘু সর্দার আজ আপনাদের দেখাবে তা কোনোদিন ভুলতে পারবেন না। আমি নৌকো বার করছি, আপনারা চলে আসুন।
বাঘু সর্দারের শেষ কথাগুলোতে এমন একটা আহ্বান ছিল যে নিখিলরা আর তাকে না বলতে পারল না। একটা রশি টেনে বাঘু একটা নৌকা বার করে তাতে উঠে বসল। তারা দুজনও উঠল তাতে। ছই আলা ছোট একটা নৌকা, বাঘু দাঁড় ফেলল জলে।
নদীর বেয়ে এগিয়ে চলেছে নৌকো। নদীর এপাশ-ওপাশ থেকে বেরিয়ে গেছে নাম না জানা সব গহীন খাঁড়ি। দিনের বেলাতেও সূর্যালোক প্রবেশ করে না। তার দু-পাশে ঘন জঙ্গল, গাছগুলো নুইয়ে পড়েছে নদীর জলে। কী গা ছমছমে পরিবেশ! কোথাও আবার চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত বিস্তীর্ণ জনমানবহীন চর। তার ওপাশে আবার ঘন জঙ্গল। অপার্থিব এক পরিবেশ বিরাজ করছে চারপাশে। নিখিলদের মুখে কোনো কথা নেই। বিস্মিত ভাবে তারা তাকিয়ে দেখছে এই অজানা পৃথিবীকে। মাথার ওপর চাঁদ যেন তাদের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় ভাবে হাসছে। ছপছপ শব্দে দাঁড় বেয়ে চলেছে বাঘু। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। বাঘু সম্ভবত নিখিলদের থেকে বয়সে কিছু বড় হবে। কিন্তু তাকে দেখে আরও বেশি বয়সি মনে হয়। নোনা জল এ তল্লাটের মানুষদের তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে দেয়। বাঘুর মুখে এখন কেমন যেন একটা বিষণ্ণ ভাব। সে মুখের দিকে তাকিয়ে নিখিল ভাবল, বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সত্যি কত কষ্ট করতে হয়, এই সব অসহায় মানুষগুলোকে।
বড় নদী ছেড়ে এক সময় খাঁড়িতে প্রবেশ করল নৌকো। তার দু-পাশে হেঁতালের ঝাড়, মায়ের মাঝে ভূতের মতন দাঁড়িয়ে আছে ঝুপসি গরান-গেঁওয়া। এঁকেবেঁকে খাঁড়ি হারিয়ে গেছে আরও গভীর বনে। মাঝে মাঝে নানা বাঁক। সেখানে অন্য খাঁড়ি এসে মিশেছে। এরকমই একটা খাঁড়ির বাঁকে হঠাৎ কিছু দুরে ঝুপ করে একটা শব্দ হল। কিছুটা জল লাফিয়ে উঠল আকাশের দিকে। শব্দ শুনে নিখিল বলল, — ও কীসের শব্দ ?
বাঘু সর্দার জবাব দিল,—তেমন কিছু ব্যাপার নয়। একটা কুমির চরে শুয়েছিল। নৌকোর শব্দ শুনে জলে নেমে গেল।
সে কথাটা তাচ্ছিল্যের ঢঙে বললেও একটু আঁতকে উঠে ছই এর আরও একটু ভিতর দিকে ঢুকে বসল তারা দুজন। তাই দেখে যেন মৃদু হাসল বাঘু। আর এর কিছুক্ষণ পরই মুহূর্তের জন্য ঢেকে গেল চাঁদ। কী হল? কোথা থেকে যেন উঠে এসেছে এক খণ্ড মেঘ। বাঘু একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, – বর্ষার মেঘ। তবে আপনারা ঘাবড়াবেন না। আমি মেঘ চিনি, এ মেঘ গর্জাবে, তবে তেমন জল দেবে না। আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন।
বিজন বলল, – আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?
বাঘু জবাব দিল,–নেতিধোপানির দিকে, সেখানে চাঁদ সদাগরের ডিঙা লেগেছিল। স্রোতের অভিমুখে তরতর করে এরপর এগিয়ে চলল নৌকো। বাঘুকে আর দাঁড় বাইতে হচ্ছে না। আরও বেশ কয়েকটা টুকরো মেঘ এসে জমা হয়েছে আকাশে। মাঝে মাঝে তারা ঢেকে দিচ্ছে চাঁদকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশে নেমে আসছে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।
অবশেষে এক সময় তারা এসে উপস্থিত হল নির্দিষ্ট জায়গাতে। দুটো খাঁড়ি এসে মিশেছে সে জায়গাতে। খাঁড়ির পাড়ে বেশ কয়েকটা চর। আর সেই ফাঁকা জায়গার পর শুরু হয়েছে ঘন জঙ্গল। সেখানে চরের কাছে ডাঙা থেকে হাত পঁচিশের তফাতে জলে আঁকশি ফেলে নৌকা দাঁড় করাল বাঘু। ঠিক সেই সময় ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। বাঘু আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলল,—আপনারা কিন্তু জলে নামবেন না আর শব্দ করবেন না। সে কাছেই আছে। জলে বা ডাঙায় না নামলে আপনাদের কোনো ভয় নেই। আমি আসছি।
বিস্মিত নিখিল প্রশ্ন করল। কোথায় যাবে তুমি?
সে শুধু জবাব দিল, – বাঘ দেখাতে।
আর তারপরই তাদেরকে হতবাক করে দিয়ে হেঁতালের লাঠি নিয়ে ঝাঁপ দিল জলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঘু সাঁতরে উঠে গেল পাড়ে। তারপর নৌকার দিকে তাকিয়ে ইশারায় তাদের চুপ থাকতে বলে কাদা জমি পেরিয়ে ঢুকে গেল জঙ্গলের মধ্যে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় নিখিলরা তাকিয়ে রইল চর-জঙ্গলের দিকে।
ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। খাঁড়ির নোনা বাতাস গায়ে এসে লাগছে। বর্ষার মেঘের যাওয়া আসা মাঝে মাঝেই চারপাশে নামিয়ে আনছে অন্ধকার। মেঘের চাপা গুড়গুড় শব্দও যেন শোনা যাচ্ছে এবার। মুহূর্তে-মিনিট করে সময় এগিয়ে চলেছে। বাঘু কিন্তু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে না। কী হল বাঘুর? তাদের ফেলে রেখে সে কোথায় গেল। বাতাস আরও বাড়ছে, মেঘের গর্জনও ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে।
এভাবে মিনিট দশেক সময় কেটে গেল। ব্যগ্রভাবে তারা দুজন তাকিয়ে আছে চরের দিকে। ক্রমে একটা চাপা আশঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু করল তাদের মনে। বাঘু যদি আর না আসে তবে তারা দুজন ফিরবে কীভাবে?
বিজন চাপা স্বরে বলেই ফেলল, – এ ভাবে এসে আমরা ঠিক করিনি। ঈষৎ কাঁপা-কাঁপা শোনাল তার গলা। নিখিল নিশ্চুপ। আর এরপরই একটা বড় মেঘ ঢেকে দিল চাঁদকে। কিন্তু আগের মুহূর্তেই নিখিল যেন দেখল বাঘু বেরিয়ে আসছে জঙ্গল থেকে!
সে কি ঠিক দেখল? কিন্তু তা বোঝার উপায় নেই। মেঘটা সরছে না, কালো চাদরে মুড়ে রয়েছে চর। তা আকাশে কয়েকটা রূপালি রেখা মাঝে মাঝে খেলা করছে ঠিকই, কিন্তু তার আলো পৃথিবী স্পর্শ করছে না।
বাতাস আরও বাড়ল। এবার বেশ জোরে দুলতে শুরু করল নৌকা। বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে তাদের সর্বাঙ্গ। আপ্রাণ ভাবে তারা দেখার চেষ্টা করছে চরটা। না, এভাবে আর থাকা যাবে না। আতঙ্কিত নিখিল বাঘুর নাম ধরে ডাকতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় সারা আকাশ ফালা ফালা করে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। কয়েক মুহূর্তের জন্য দিনের আলোর মতো আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। আর সেই আলোতে এক অদ্ভুত দৃশ্য স্পষ্ট দেখতে পেল নিখিলরা। জলের একদম ধারে নৌকার দিকে পিছন ফিরে হেঁতালের লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে বাঘু সর্দার, আর তার হাত পনেরো তফাতে তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিরাটাকার প্রাণী। তার চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। বিদ্যুতের ঝলকে তার কালো ডোরাকাটা উজ্জ্বল হলুদ দেহ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আর এরপরই চরাচর কাঁপিয়ে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। আর তার সঙ্গে মিশে গেল আরও একটা গর্জন। পর মুহূর্তেই আবার অন্ধকারে ঢেকে গেল সব কিছু। গলার শব্দ হারিয়ে ফেলেছে নিখিলরা। নৌকার ছই ধরে কোনোমতে তারা দাঁড়িয়ে। আতঙ্কিত অসাড় দেহ। কী হল বাঘু সর্দারের?
আর এরপরই তাদের মনে হল কে যেন সাঁতরে নৌকার দিকে আসছে। বাঘটা নাকি? মনের সব শক্তি এক করে কাঁপা কাঁপা হাতে বৈঠাটা উঠিয়ে নিল নিখিল। বাঁচার একটা শেষ চেষ্টা করার জন্য হাতিয়ারের মতো সে বাগিয়ে ধরল বৈঠাটা। কিন্তু নৌকায় যে উঠে এল সে বাঘ নয়, বাঘু সর্দার। নৌকায় উঠে সে চটপট নোঙর তুলে নিখিলের হাত থেকে বৈঠা নিয়ে চাপা স্বরে বলল চটপট দূরে সরে যেতে হবে। ও এখনও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে। কথাটা শেষ করেই ছপাছপ শব্দে দাঁড় বইতে লাগল বাঘু।
পাড় থেকে আরও কিছুটা এগোতেই মেঘটা হঠাৎই চাঁদের থেকে সরে গেল। আবার চাঁদের আলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠল চর। সেদিকে আঙুল তুলে বাঘু বলে উঠল ওই দেখুন বাবু, এখনও ওখানে দাঁড়িয়ে। আমি তো জঙ্গলে ঢুকে আমার পিছন পিছন টেনে আনলাম। নিখিলরা চরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল তাকে। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে জলের পাড়ে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে প্রাণীটা। বিরাট একটা বাঘ! জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে দ্রুত সরে যাওয়া নৌকাটার দিকে। আর এরপরই নিষ্ফল আক্রোশে গর্জন করে উঠল প্রাণীটা। সে গর্জনে কেঁপে উঠল চরাচর। পরমুহূর্তেই বাঘু সর্দার হেসে উঠে বলল, –ও ব্যাটাকে আজ খুব ঠকালাম ! ব্যাটা মানুষখেকো!
ক্রমে ক্রমে সেই চর থেকে দূরে সরে গেল নৌকা। মিলিয়ে গেল সেই চর। কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর নিখিল বলল, –তুমি এই ভয়ঙ্কর কাজটা করতে গেলে কেন? টোপ হয়ে বাঘটাকে টেনে আনলে? ওরকম একটা হিংস্র প্রাণী। যদি কোনো দুর্ঘটনা হত?
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বিষণ্ণ হেসে বাঘু সর্দার বলল, –বাঘের থেকেও হিংস্র কে জানেন? আমাদের মতো গরিব মানুষের পেটের খিদে। এর জন্য মানুষ সব কিছু করতে পারে, সব কিছু করে। বাঘ-সাপ- বন্দুক-কামান- সব কিছুর সামনেই পেটের তাগিদে দাঁড়াতে হয় মানুষকে।
তারপর সে বলল, –আপনাদের একটা কাজ করে দিতে হবে বাবু। টাকাটা আমি হাতে নেব না। ফেরার পথে টাকাটা আপনারা আমার মায়ের হাতে দিয়ে যাবেন। আপনারা তো সে পথেই ফিরবেন। আমার জন্য দয়া করে যদি একটু কষ্ট করেন।
নিখিল বলল, –তা না হয় করব।। কিন্তু তুমি বাড়ি যাবে না?
বাঘু সর্দার জবাব দিল,—না এখন ফেরা হবে না। আমার আরও টাকার দরকার। বুড়ি মা-টাকে দেখতে হবে, ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে। আমি এখন এদিকেই থাকব। দেখি যদি আবার কেউ বাঘ দেখতে যেতে চায়।
আর কোনো কথা বলল না বাঘু সর্দার। সে চুপচাপ দাঁড় বাইতে লাগল। সজনেখালির জেটিতে যখন নৌকা এসে ভিড়ল তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। চাঁদ আবার হাসছে।
তার প্রতিবিম্ব ধরা দিচ্ছে জলে, মেঘহীন আকাশে ছড়ানো খইয়ের মতো ফুটে আছে অসংখ্য নক্ষত্র।
নিখিল আর বিজন নৌকো থেকে নামার পর বাঘু সর্দার তার লাঠিটা নিখিলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,—এটা রাখুন। এটা দেখলে আমার কথা মনে পড়বে আপনার। কেউ যদি সুন্দরবনের বাঘ দেখতে আসে, তাকে বলবেন আমার কথা। আমি তাকে ঠিক বাঘ দেখিয়ে দেব। এই গরিব মানুষটাকে আপনারা ভুলবেন না। আমি এখন চলি। বাবু
নিখিল বলল, – তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ?
প্রশ্নটা যেন কানে গেল না বাঘুর। সে দাঁড় টানতে শুরু করল। তার নৌকা হারিয়ে গেল নদীর বাঁকে। এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতার স্মৃতি নিয়ে মাঝরাতে নিখিলরা ফিরে এল টুরিস্ট লজে।
পরদিন ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হল দুজনের। ইতিমধ্যে লোকজন জেটিতে পৌঁছে লঞ্চে উঠে গেছে। নিখিলরা যখন জেটিতে পৌঁছল তখন প্রায় আটটা বাজে। আসল জিনিস দেখিয়ে দিয়েছে বাঘু সর্দার। আজ তারা লঞ্চে সুন্দরবনের দর্শনে বেরোবে। জেটিতে একটা চা-দোকান। লঞ্চে ওঠার আগে তারা চা খাবার জন্য দোকানটাতে ঢুকল। উনোনের সামনে দোকানি ছাড়া দোকানের ভিতর এক কোণে একটা টেবিলে বসে ছিল একজন মাত্র লোক, তাকে দেখে নিখিল বলে উঠল, – আরে তুমি হারান না? বাঘুর সঙ্গে থাকো না? মনে আছে, গত বছর বাঘুর বাড়িতে তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
হারান কিছুক্ষণ নিখিলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার পর বলল,—হ্যাঁ চিনতে পারছি। কিন্তু...
— কিন্তু কী? জানতে চাইল নিখিল।
হারান ইশারায় তার পাশে বসতে বলল তাদের। তারা বসার পর সে চাপা স্বরে বলতে শুরু করল,— দিন সাতেক আগে একটা পয়সাওয়ালা পার্টি এসেছিল, বাঘ দেখাতে পারলে অনেক টাকা দেবে বলেছিল তারা। নৌকা নিয়ে তাদের লঞ্চকে পথ দেখিয়ে, নেতিধোপানির কাছে এক চরে নিয়ে গেলাম আমি আর বাঘু সর্দার। আগের দিন বিকালেই সে চরে বাঘের টাটকা পায়ের ছাপ দেখেছি আমরা। যাই হোক চরের কাছাকাছি নদীতে নোঙর করল লঞ্চ। তার পাশে নৌকা নিয়ে আমরা। সময় কাটাতে লাগল, কিন্তু বাঘের দেখা নেই। অথচ আমাদের স্থির বিশ্বাস বাঘটা কাছাকাছি আছে। এক সময় লঞ্চের লোকজন অধৈর্য হয়ে আমাদের গালাগাল করে ফিরে যেতে চাইল। আমি তাই তাদের বোঝাবার জন্য নৌকা ছেড়ে লঞ্চে উঠলাম। তাদের বাঘ দেখাতে না পারলে টাকাগুলো ফস্কে যাবে। হয়তো তাদের আর কিছুক্ষণ আটকে রাখতে পারলে বাঘের দেখা মিলতে পারে। আমি যখন তাদের বোঝাচ্ছি, তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড করল বাঘু সর্দার।
নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে চরে নেমে পড়ল। তার নিশ্চিত ধারণা ছিল বাঘটা কাছাকাছিই কোথাও আছে। শিকার দেখে সে যদি বেরিয়ে আসে তবে সে একছুটে নৌকায় উঠে পড়বে।
কাদা জমি ধরে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল সে। তার অনুমান কিন্তু মিথ্যা ছিল না। একটা গরান গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সেই ভয়ংকর প্রাণীটা, তারপর বিদ্যুৎ গতিতে ছুটল বাঘু সর্দারকে ধরার জন্য। বাঘু সর্দারও নৌকার দিকে ছুটল। কিন্তু পাড়ের কাছাকাছিতে কাদামাটিতে পড়ে গেল সে। লম্বা লাফে হিংস্র প্রাণীটা ধরে ফেলল তাকে। তারপর আমাদের চোখের সামনেই....। বাঘু সর্দারের নৌকোটা এ জেটিতেই নিয়ে এসেছে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা। আমি সেটা ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে এসেছি...।
আর কথা বলতে পারল না হারান। সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। হতবাক নিখিল আর বিজন তাকিয়ে রইল বাঘু সর্দারের শাকরেদের দিকে। নিখিলের হাতে এখনও ধরা আছে বাঘু সর্দারের হেঁতালের লাঠিটা।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন