হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ঘরের চারপাশের দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করানো তৈলচিত্রগুলো ঘুরে ঘুরে মনোযোগ দিয়ে দেখছিল বিকাশ।
পূর্ণাবয়ব সব তৈলচিত্র। মোট পনেরোটা ছবি। তার মধ্যে কয়েকটা ছবি যে বেশ প্রাচীন তা দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে। তবে সব ক'টা ছবিই বেশ জীবন্ত। ছবির মানুষগুলোর পরনে রাজাদের মতো ঝলমলে পোশাক। মাথায় পাগড়ি বিরাট তলোয়ার ডান হাতে উঁচিয়ে ধরে একই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছে সকলে। ছবির এ ঘরটা দুর্গের বেশ উঁচু জায়গাতে। জানলা দিয়ে শেষ বিকালের আলো এসে পড়েছে ঘরে। সেই আলোতে বিকাশের মনে হচ্ছে ছবির মানুষগুলো যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে বিকাশ বলল, “এই রাওয়ালগড় দুর্গের নাম আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগের আগে কিন্তু শুনিনি।'
রাওয়াল সাহেব মৃদু হেসে প্রথমে জবাব দিলেন, 'আমাদের এই রাজস্থানে এমন অনেক ছোট ছোট দুর্গ এখনও আছে বাইরের লোক যার খবর রাখে না।' তারপর হেসে বললেন, ‘কেন, কলকাতার পরিচিত জনের কাজে এ দুর্গ সম্বন্ধে খোঁজ করেছিলেন নাকি?'
বিকাশ জবাব দিল, “না, তবে গাইড বুকে খোঁজ করে পাইনি।'
তিনি বললেন, 'এটা টুরিস্ট স্পট নয় বলে গাইড বুকে উল্লেখ নেই। তবে দুর্গ দেখতে আপনার মন্দ লাগবে না। আজ তো এলেন, কাজের ফাঁকে দেখবেন সব কিছু, এই দুর্গের মাটি আমার কাছে পবিত্র। সারা জীবন আমি বাইরে বাইরে কাটিয়েছি। এই পবিত্র জন্মভূমির টানেই আবার বছর খানেক হল ফিরে এলাম এখানে। আমার এক মাত্র ছেলেও বিদেশে থাকে। সে-ও নিশ্চয়ই একদিন আমার মতোই এখানে ফিরে আসবে।'
এ কথা বলার পর সগর সিংহ তার পাকানো গোঁফে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘এবার আপনাকে এ ঘরের ছবির মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচয় করাই। তবে আমার চোখে, আমার মনে এঁরা প্রত্যেকেই জীবন্ত। এদের অনেকেই নিজের রক্তবিন্দু দিয়ে এ দুর্গ রক্ষা করেছিলেন। ওই যে জানলার পাশে নীল পাগড়ি পড়া যিনি বলদর্পী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, উনি এই দুর্গের প্রতিষ্ঠাতা রতন সিংহ রাওয়াল। তাঁর পরের জন তাঁর পুত্র বীর সিংহ, তারপর লাল পাগড়ি রাওয়াল কাঞ্চন সিংহ...। এই ভাবে একে একে তাঁর পূর্বপুরুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে তিনি সর্বশেষ একটা ছবির সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেটাও এক বলদর্পী পুরুষের ছবি। ছবির লোকটার গালে একটা লম্বা ক্ষতচিহ্ন। তাঁর হাতে তলোয়ার ছাড়াও কোমরে একটা ছুরি গোঁজা। রাওয়াল সাহেব সে ছবি দেখিয়ে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে বললেন, 'ইনি আমার পিতৃদেব রাওয়াল সমর সিংহ। প্রচণ্ড দুঃসাহসী ছিলেন। যৌবনে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি রেখে ছুরি হাতে বাঘের খাঁচায় ঢুকেছিলেন লড়াই করতে। বাঘা মারা গেছিল ঠিকই। কিন্তু যাবার আগে তার নখের ছাপ এঁকে যায় ওনার মুখে...।'
ছবিটা ভালো করে দেখতে দেখতে বিকাশ হঠাৎ দেখতে পেল যে ছবির নীচে এক কোনায় একটা নাম স্বাক্ষর করা— ‘হরিপদ’।
বিকাশ বলল, 'এ ছবির চিত্রকর বাঙালি ছিলেন? নাম হরিপদ?'
মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে রাওয়াল সাহেব বললেন, 'হ্যাঁ, তবে আমি তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি ওই স্বাক্ষরের জন্য। আপনাকে বলে রাখি আপনি যে ছবি আঁকবেন তাতে স্বাক্ষর করা যাবে না। ছবিতে স্বাক্ষর আমাদের পরিবারের সংস্কার বিরোধী। খেয়াল করুন এই একটা ছবি বাদে অন্য কোনো ছবিতে চিত্রকরের স্বাক্ষর নেই। হরিপদ চিত্রকর নিষেধ শুনল না কাজেই...।'
রাওয়াল সাহেবের কথা শুনে বিকাশ বলল, 'দেখুন প্রত্যেক শিল্পীই চান তার কাজের সাক্ষর রেখে যেতে। ভালো ছবির ক্ষেত্রে শিল্পীর স্বাক্ষর তার পরিচিতি ঘটায়, বিজ্ঞাপনেরও কাজ করে। তবে আপনি না চাইলে আমি আমার আঁকা ছবিতে স্বাক্ষর করব না। শুধু মন দিয়ে কাজটা করতে পারলেই হল।'
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, কাজটাই তো আসল। স্বাক্ষরে কী আসে যায়। কাল সকাল থেকেই কাজ শুরু করুন। আমি রোজ ঘণ্টা চারেক সময় দেব আপনাকে। সাত দিন পর অমাবস্যা। ওর মধ্যেই কাজটা শেষ করবেন আপনি।'
আরও সামান্য কিছু কথাবার্তার পর তারা যখন ছবিঘরের বাইরে বেরিয়ে এল তখন দুর্গ মিনারের ওপাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। তার রক্তিম আলো ছড়িয়ে পড়েছে নিঃসঙ্গ, প্রাচীন এই খণ্ডহর দুর্গের গায়ে। নিস্তব্ধ চারপাশ। দুর্গ প্রাকারের গায়ে অলিন্দ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাওয়াল সাহেব বিকাশকে বললেন, 'এ দুর্গে অনেক কিছু দেখার আছে। কাজ শেষ হলে আপনাকে মহাকালীর মন্দিরে নিয়ে যাব। তিনি খুব জাগ্রত দেবী।'
দুর্গের যেদিকে রাজমহল, সেদিকটা এখনও কিছুটা অক্ষত আছে। সেখানেই একটা ঘরে বিকাশের থাকার ব্যবস্থা করেছেন রাওয়াল সাহেব। তবে দুর্গে কোনো ইলেকট্রিসিটি নেই। পরদিন ভোরে উঠে স্নান-খাওয়া সেরে ছবিঘরে পৌঁছে বিকাশ দেখল রাওয়াল সাহেব সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘকায় শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত রাওয়াল সাহেবের পরনে আজ আপাদমস্তক রাজরাজড়ার মতো ঝলমলে জরির পোশাক। মাথায় পাগড়ি। তবে যে জিনিসটা বিকাশের সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হল রাওয়াল সাহেবের হাতে ধরা খাপসুদ্ধ বিরাট তলোয়ারটা। জিনিসটা বিকাশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে পেরে তিনি একটানে খাপ থেকে বার করে আনলেন তলোয়ারটা। জানলা দিয়ে আসা সূর্যালোকে ক্ষুরধার ইস্পাতের ফলাটা ঝিলিক দিয়ে বিকাশের চোখ ধাঁধিয়ে দিল। তলোয়ারটা উঁচিয়ে ধরে রাওয়াল সগর সিংহ বেশ গর্বিতভাবে বললেন, 'এই হল সেই তলোয়ার! আমাদের বংশের গর্বের প্রতীক। এই তলোয়ার দিয়েই আকবর বাদশার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন আমার পূর্বপুরুষ। বহু যুদ্ধের সাক্ষী এ তলোয়ার। আমার পূর্বপুরুষদের সবার ছবিতে এই একই তলোয়ার আছে খেয়াল করুন। এ তলোয়ার দিয়ে কতজনের যে মাথা কাটা হয়েছে তার হিসাব নেই। এ তলোয়ার আমার কাছে পবিত্র অমূল্য সম্পদ।' কথা শেষ করে সেটা আর খাপে না ভরে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। বিকাশ তলোয়ারের গায়ের অলংকরণ ভালো করে দেখার জন্য তার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আঁকাটা ভালো করে দেখার পর তলোয়ারটা একবার স্পর্শও করল। বিকাশের গা-টা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। তার মনে হল, সে যেন একখণ্ড ইতিহাসকে স্পর্শ করল!
রাওয়াল সাহেব বললেন, 'আবারও বলি, গায়ের আঁকগুলো হুবহু আঁকতে হবে আপনাকে। - তলোয়ারটা এ ঘরেই থাকবে। বারবার আনা-নেওয়া অসুবিধাজনক। তবে জিনিসটা সাবধানে নাড়াচাড়া করবেন। নইলে বিপদ হতে পারে। নিন, এবার তাহলে কাজ শুরু করুন।'
বিকাশ সম্মতি প্রকাশ করল তাঁর কথায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজ শুরু করল সে। সব কিছুই এ ঘরে সংগ্রহ করে রেখেছেন রাওয়াল সাহেব। পেনসিল, তুলি, রং-ক্যানভাস সবকিছু। বিকাশ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে লাগল রাওয়াল সগর সিংহর অবয়ব। দৃপ্তভঙ্গিতে তলোয়ার উঁচিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন সগর সিংহ। কথামতো প্রথম দিন ঘণ্টা চারেক কাজ করল বিকাশ। বিকাশ আর তলোয়ারের খাপটা নিয়ে রাওয়াল সিংহ যখন ছবিঘরের বাইরে এলেন তখন সূর্য মাথার ওপর। বিকাশ তাঁকে বলল, 'তলোয়ারটা খাপে পুরলেন না কেন ?
রাওয়াল সাহেব হেসে বললেন, 'তলোয়ারটার মতো এই চামড়ার খাপটার বয়সও পাঁচশো বছর। এটা তো আর ইস্পাতের নয়। বারবার তলোয়ারটা খাপে ঢোকালে-বার করলে জিনিসটা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আপনার কাজ শেষ হলে তলোয়ারটা একেবারে খাপে পুরব।'
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকাশ নিজের ঘরে ফিরে এল। বিকাশের থেকে বিদায় নিয়ে রাওয়াল সাহেব এরপর নিজের কোনো কাজে জিপ নিয়ে দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বিকেলবেলা যখন বিকাশ বাইরে বেরোল তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। একটা দিন বিকাশের এ দুর্গে কেটে গেল। নীচের চত্বরে রাওয়াল সাহেবের জিপ গাড়িটা নেই। অর্থাৎ তিনি ফেরেননি। এত বড় দুর্গে বিকাশ একা। পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত এ দুর্গ থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। চারপাশটা একটু ঘুরে দেখার জন্য বিকাশ দুর্গের প্রান্তদেশে দাঁড়ানো নজর মিনারটা লক্ষ করে দুর্গ প্রাকারের গায়ে একসময় সৈন্যচলাচলের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। দিনান্তের সূর্যালোকে নিস্তব্ধ চারপাশ। বেশ ভালো লাগছে হাঁটতে। এঁকেবেঁকে উঠে-নেমে মিনারের দিকে এগিয়েছে প্রাচীর। তবে মিনারটা যত কাছে বিকাশের মনে হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি দূরে দাঁড়িয়ে। তবুও হাঁটতে হাঁটতে একসময় সে জায়গাতে পৌঁছে গেল সে। জায়গাটা একটু জঙ্গুলে। চারপাশ ঝোপঝাড় পূর্ণ। দুর্গের শীর্ষবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে মিনারটা। তার একদম কাছে পৌঁছোতেই বিকাশ হঠাৎ দেখতে পেল মিনারের ঠিক নীচে সিঁড়ির মুখে চাতালে বসে আছে বেশ কিছু লোক। অন্তত দশ-বারোজন হবে। পরনে তাদের রাজস্থানি পোশাক-পাগড়ি। তারা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিকাশের দিকে। লোকগুলো নানা বয়সের। শেষ বেলার সূর্যের আলোতে কেমন যেন বিষণ্ণতার ছাপ তাদের মুখে, কারা এরা?
হঠাৎ তাদের মধ্যে থেকে একটা লোক উঠে এগিয়ে এল বিকাশের দিকে। মধ্যবয়সি লোক, মুখে স্মিত হাসি। একমাত্র এ লোকটার পরনেই রাজস্থানি পোশাকের বদলে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। লোকটা স্পষ্ট বাংলায় বেশ নরমভাবে বিকাশের উদ্দেশে বললেন, 'আপনি নিশ্চয়ই নতুন শিল্পী, রাওয়াল সাহেবের ছবি আঁকতে এসেছেন?'
বিস্মিত বিকাশ বলল, 'আপনি কী করে জানলেন?”
স্মিত হেসে লোকটা বললেন, 'আমি আরও জানি। এই যেমন আপনি খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে এ কাজের ব্যাপারে রাওয়াল সগর সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যে বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল, প্রাচীন রাজপরিবারের তৈলচিত্র আঁকার জন্য পরিজনহীন-দুঃস্থ চিত্রকর অমুক বক্স নম্বরে আবেদন করুন। ইত্যাদি ইত্যাদি— ‘পরিজনহীন’ ‘আর’ “দুঃস্থ” শব্দটা বেশ বোল্ড হরফে ছাপা ছিল।'
বিকাশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটার মুখের দিকে। লোকটা এবার হেসে বললেন, ভাবছেন এত সব কীভাবে জানলাম? এখানে তো বাইরের লোক আসে না। আজ দুপুরবেলা আপনাদের দুজনকে দূর থেকে আমি ছবিঘর থেকে বেরোতে দেখেছি। তাতেই ব্যাপারটা অনুমান করেছি। আর বিজ্ঞাপনের ব্যাপারটাও অনুমান। ওরকম একটা বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়েই বছরখানেক আগে আমিও এখানে ছবি আঁকতে এসেছিলাম কলকাতা থেকে। আমার নাম হরিপদ মিত্র। এই বলে লোকটা হাতজোড় করে নমস্কার করল।
বিকাশ প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলল, 'আমি বিকাশ পালিত, কলকাতা থেকে এসেছি। আপনিই তো রাওয়াল সাহেবের বাবা সমর সিংহর ছবিটা এঁকেছেন। খুব সুন্দর কাজ। রাওয়াল সাহেবও আপনার কথা বললেন।’
‘কী বললেন?” জানতে চাইলেন হরিপদবাবু।
বিকাশ একটু ইতস্তত করে বলল, 'ওই বললেন যে ছবিটা আপনি ভালোই এঁকেছেন, কিন্তু ওই স্বাক্ষরের ব্যাপারটা নিয়ে মনোমালিন্য হওয়ায় তিনি আপনাকে বিদায় দিয়েছেন।' প্রসঙ্গটা একটু অপ্রীতিকর হওয়ায় বিকাশ এরপর কথা পালটে বলল, “তবে আপনি যে এখানে আছেন তা তিনি বলেননি।'
লোকটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রথমে বললেন, 'হ্যাঁ, এখানে রয়ে গেলাম। আমার তো কোথাও কেউ নেই। এই যে যাঁরা বসে আছেন, এঁদের সঙ্গে পরিচয় হল। এঁদের মাঝেই রয়ে গেলাম।' ‘ওঁরা কারা?” জানতে চাইল বিকাশ।
হরিপদবাবু বললেন, 'দু-একজন বাদে ওঁরা সবাই রাজস্থানি। কেউ কেউ বহু যুগ ধরে এখানে আছেন। এই মরুদেশই জন্মভূমি।' এরপর তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনাকে কবের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলেছেন রাওয়াল সাহেব ?”
বিকাশ জবাব দিল, ‘সাত দিন, অর্থাৎ আগামী অমাবস্যার মধ্যে।'
হরিপদবাবু বিড়বিড় করে বললেন, ‘অমাবস্যা! আমাকেও তাই বলা হয়েছিল!'
তারপর কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন, 'আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। আমার এখানে থাকার ব্যাপারটা দয়া করে রাওয়াল সাহেবকে জানাবেন না। ব্যাপারটা তিনি জানেন না। আমার আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। আপনি বাঙালি, আমিও বাঙালি। বিদেশে স্বজাতীয় সাক্ষাৎ পেলে আত্মীয় বলেই মনে হয়। দয়া করে অনুরোধটা রাখবেন।
বিকাশ একটু চুপ করে থেকে জবাব দিল, 'ঠিক আছে, আপনি নিশ্চিতে থাকুন।’
অন্ধকার নেমে আসছে। হরিপদবাবু বললেন, 'ধন্যবাদ, আপনি তাহলে এবার এগোন, আবার দেখা হবে।
বিকাশ তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে ফেরার পথ ধরল।
বিকাশের কাজ ভালোই এগিয়ে চলল। রোজ সকালে রাওয়াল সাহেব ঘণ্টা চারেক করে সময় দেন বিকাশকে। তারপর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান। ফেরেন সেই সন্ধ্যার পর। দশ কিলোমিটার দূরে একটা ছোট শহর নাকি আছে। সেখানে রাওয়াল সাহেব যান রসদ সংগ্রহ করে আনতে। তিনি চলে যাবার পরও ছবিঘরে অনেকক্ষণ কাজ করে বিকাশ। এক-একদিন প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাওয়াল সাহেব তার কাজে বেশ খুশি। কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে বিকাশের সঙ্গে নানা গল্প করেন রাওয়াল সাহেব। অধিকাংশ এই দুর্গেরই গল্প। দেওয়ালের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর পিতৃপুরুষদের লড়াই সংগ্রামের কাহিনি। সেসব কথা বলতে বলতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর চোখ-মুখ।
দেখতে দেখতে ছ'টা দিন কেটে গেল। কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে বিকাশ। সামান্য কিছু রেখা আঁকা বাকি। সপ্তম দিন সকালে রাওয়াল সাহেব যখন ছবিঘরে ঢুকলেন তখন তাঁর পোশাক দেখে বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল বিকাশ। তাঁর পরনে রক্তাম্বর, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, খালি পা। সদ্য স্নান সেরে এসেছেন তিনি, তাঁর চুল থেকে তখনও জল ঝরছে। টেবিল থেকে তলোয়ারটা উঠিয়ে নিয়ে তিনি তাঁর ছবির কাছে এগিয়ে গেলেন। বেশ অনেকক্ষণ ধরে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন তাঁর তলোয়ারের আঁকগুলোর সঙ্গে বিকাশের আঁকা মিলছে কি না। ভালো করে দেখার পর মনে হয় তিনি প্রসন্ন হলেন। টেবিলে তলোয়ারটা নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, 'খুব ভালো হাত আপনার। তলোয়ারের আঁকটা হুবহু এঁকেছেন। কাজ তো প্রায় শেষ। ছবিতে নাম স্বাক্ষর না করার ব্যাপারটা খেয়াল আছে তো?”
বিকাশ বলল, 'হ্যাঁ আছে। তলোয়ারটা এখন আপনি নিয়ে যেতে পারেন। '
রাওয়াল সাহেব বললেন, 'এখন এটা এখানেই থাক। রাতে নিয়ে যাব। মহাকালীর মন্দিরে আমি আজ সারাদিন পুজোয় ব্যস্ত থাকব। উনি আমাদের কুলদেবী। আজ অমাবস্যা। তাঁর পুজোর দিন। রাতে আপনি এ ঘরেই থাকবেন। আমি আসব। তলোয়ারটা তখন নিয়ে যাব।' এই বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। বিকাশ আবার কাজে মন দিল। বিকাশের কাজ যখন সম্পূর্ণ হল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। ছবিটা ভালো করে দেখার পর নিজের কাজ দেখেই বেশ তৃপ্ত বোধ করল সে। রাওয়াল সাহেবের ছবিটা বিশেষত তলোয়ারের আঁকগুলো হুবহু ফুটিয়ে তুলেছে সে। তলোয়ারটা শোয়ানো আছে টেবিলে। সে গিয়ে একবার স্পর্শ করল জিনিসটা। প্রথম দিনের মতো সেটা ছুঁতেই একটা শিহরন খেলে গেল তার শরীরে। সত্যিই কত প্রাচীন জিনিস! কত শৌর্য-বীর্য-ইতিহাসের সাক্ষী এ তলোয়ার !
ছবিঘর থেকে বেরিয়ে নিজের থাকার জায়গাতে ফিরে এল বিকাশ। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর রোদের তাত কমে এলে বাইরে বেরিয়ে এল সে। আঁকার কাজটা ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মনটা বেশ ভালো লাগছে তার। রাওয়াল সাহেব টাকা মিটিয়ে দিলে কালই দুর্গ ছেড়ে চলে যাবে বিকাশ। যাবার আগে দুর্গটা আর একবার একটু দেখে নেবার জন্য প্রথম দিনের মতোই নজর মিনারের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছু সময় পর সেখানে পৌঁছে গেল সে। জায়গাটাতে পৌঁছেই তার মনে পড়ে গেল হরিপদবাবু আর সেদিনের দেখা সেই লোকগুলোর কথা। কাজের চাপে তাদের কথা সে ভুলেই গেছিল। এ ক'দিন এদিকে আর আসেওনি সে। আজ অবশ্য হরিপদবাবু বা সে লোকগুলো কেউ জায়গাটাতে নেই। প্রায় পঞ্চাশ ফুট উঁচু মিনার। তার ভিতর থেকে পাথুরে সিঁড়ি উঠে গেছে। ওপর থেকে দুর্গটা দেখার লোভে বিকাশ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। মিনারের মাথার ওপরে একটা ঘর। বিকাশ সে ঘরে উঠেই দেখতে পেল সেই হরিপদবাবু সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন !
হরিপদবাবু তাকে দেখে বলেন, 'আসুন, আপনার কথাই ভাবছিলাম। আপনাকে এদিকে আসতে দেখতে পেয়েছি। কাজ শেষ আপনার ?'
বিকাশ হেসে বলল, 'হ্যাঁ, কাজ শেষ। কালই আমার ফিরে যাবার কথা। এখানে এসেই আপনার কথা মনে হল। ভাবলাম আর দেখা হল না।'
হরিপদবাবুও মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘তলোয়ারের আঁকগুলো ভালো করে এঁকেছেন তো? ওটা কীসের নকশা রাওয়াল সাহেব আপনাকে বলেছেন?”
বিকাশ জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এঁকেছি। রাওয়াল সাহেব বেশ খুশি হয়েছেন। উনি বলেছেন ওই আঁকটা ওঁদের পারিবারিক চিহ্ন।'
হরিপদবাবু বললেন, 'তলোয়ারের গায়ে আঁকগুলো আসলে কী আমি আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। এখান থেকে সারা দুর্গটা দেখা যায়। আপনি জানলা দিয়ে নীচে তাকান, আর মনে মনে ওই আঁকগুলোর কথা ভাবুন। দেখুন কোনও মিল পান কি না?'
তাঁর কথামতো বিকাশ তাকাল নীচের দিকে। গিরি শিরায় পূর্ব-পশ্চিমে ফালির মতো বিস্তৃত দুর্গটা। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকাবার পরই ব্যাপারটা বুঝতে পারল সে। বিকাশ বলে উঠল, ‘আরে, ওই আঁক তো দুর্গেরই নকশা মনে হচ্ছে। এই ওয়াচ টাওয়ার তলোয়ারের সূচিমুখে অবস্থান করছে।’
হরিপদবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, তবে ওই আঁকগুলোর ভিতর আরও অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। আচ্ছা, রাওয়াল সাহেবের বিজ্ঞাপনে দুঃস্থ পরিজনহীন শব্দ দুটো বোল্ড হরফে ছাপানোর ব্যাপারটা বা ছবিতে স্বাক্ষর না করতে দেবার ব্যাপারটা আপনার মনে কোনো সন্দেহ জাগায়নি?”
বিকাশ প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল হরিপদবাবুর দিকে। ঠিক সেই সময় দুর্গের কোথা থেকে যেন ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসতে লাগল। শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই হরিপদবাবু বলে উঠলেন, 'আজ তো অমাবস্যা। রাওয়াল সাহেব মহাকালীর পুজোয় বসেছেন। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি।'
তারপর তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, 'এখান থেকে এখন আপনি কোথায় যাবেন?’
বিকাশ জবাব দিলেন, 'ছবিঘরে যাব। পূজা শেষে রাওয়াল সাহেব সেখানেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলেছেন।'
হরিপদবাবু বললেন, ‘রাওয়াল সাহেবের তলোয়ারটা খাপহীন অবস্থায় ছবিঘরেই আছে তাই না?'
বিকাশ বলল, 'হ্যাঁ, সেখানেই আছে। কিন্তু এ কথা জিজ্ঞেস করলেন কেন?”
হরিপদবাবু মৃদু হেসে জবাব দিলেন, ‘এমনি জিজ্ঞেস করলাম। সূর্য ডুবছে। চলুন এবার নীচে নামা যাক। আপনি আমার কথা তাঁকে বলেননি তো?'
বিকাশ বলল, 'না বলিনি।'
নীচে নামার পর হরিপদবাবু শুধু বললেন, ‘রাতে আবার দেখা হবে।' তারপর বিকাশকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অন্য দিকে হাঁটতে লাগলেন।
নজর মিনার থেকে একবার নিজের থাকার জায়গা হয়ে ছবিঘরে এসে ঢুকল বিকাশ। আর ঠিক তখনই বাইরের অন্ধকার নামল। ছবিঘরের কাজের জন্য একটা ‘পেট্রোম্যাক্স’ রাখা ছিল। কিন্তু সেটা জ্বালাতে গিয়ে বিকাশ দেখল কী কারণে যেন বাতিটা জ্বলছে না। ধীরে ধীরে বাইরে আর ছবিঘরের ভিতরটা গ্রাস করে নিল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। মহাকালীর মন্দির থেকে ঢংঢং ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে বেশ দ্রুত লয়ে বাজতে শুরু করল ঘণ্টা। অন্ধকারে ঘরে বসে সেই ঘণ্টাধ্বনি শুনতে শুনতে হরিপদবাবুর কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পুজো শেষে রাওয়াল সাহেবের আসার প্রতীক্ষা করতে লাগল বিকাশ। হরিপদবাবুর প্রশ্নগুলো . কেমন যেন অদ্ভুত মনে হচ্ছে বিকাশের। ঠারেঠোরে বিকাশকে কী যেন বলতে চাইলেন তিনি। কিন্তু কী কথা? চিন্তা করতে লাগল বিকাশ। বাইরে রাত বেড়ে চলল। এক সময় সেই ঘণ্টাধ্বনিও থেমে গেল। কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল বাইরেটা।
এবার কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল বিকাশের। তার কেন জানি মনে হতে লাগল ঘরের মধ্যে কেমন যেন অস্পষ্ট শব্দ হচ্ছে। তলোয়ার যে টেবিলে রাখা আছে সেটা যেন মৃদু মৃদু কাঁপছে! কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে ঘরের ভিতর! অন্ধকারের ভিতরও দেওয়ালের গায়ে আঁকা ছবির মানুষগুলো যেন জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে! এসব কি বিকাশের মনের ভুল? অনেকক্ষণ অন্ধকার ঘরে একা আছে বলে এসব মনে হচ্ছে? কিন্তু ধীরে ধীরে কেমন অজানা একটা ভয় গ্রাস করতে লাগল। এক সময় অস্বস্তিটা এড়াবার জন্য বিকাশ ঘরের বাইরে যাবার জন্য পা বাড়াতে গেল। ঠিক সেই সময় ঘরের বাইরে পদশব্দ শোনা গেল। মশাল হাতে ঘরে ঢুকলেন দুর্গাধিপতি রাওয়াল সগর সিংহ। মশালের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠল ঘর। রাওয়াল সাহেব একবার বিকাশের দিকে তাকালেন, তারপর মশাল হাতে ঘুরে ঘুরে দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করানো তাঁর পূর্বপুরুষদের ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। সব শেষে তিনি সদ্য আঁকা ছবিটার সামনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়ালেন, তারপর টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে তলোয়ারটা তুলে নিয়ে বিকাশকে বললেন, 'এবার তলোয়ারটা খাপে ভরার সময় হয়েছে। চলুন এবার সেখানে যাওয়া যাক।'
বিকাশ বলল, ‘কোথায় ? '
রাওয়াল সাহেব বললেন, ‘মহাকালীর মন্দিরে। তাঁর পুজো আপনি না গেলে শেষ হবে না। তলোয়ারটাও খাপে ভরা যাবে না। চলুন।' একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল রাওয়াল সাহেবের মুখে।
—‘আচ্ছা' বলে তাঁর সঙ্গে ঘরের বাইরে এগোতে যাচ্ছিল বিকাশ। কিন্তু ঠিক সেই সময় হঠাৎই ঘরের ভিতর প্রবেশ করল একদল লোক। সেই হরিপদবাবু আর তার সঙ্গে দেখা সে দিনের সেই লোকগুলো! তাদের দেখামাত্রই যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল রাওয়াল সাহেবের মুখ। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে তলোয়ার উঁচিয়ে আক্রমণ করতে গেলেন তাদেরকে। কিন্তু তার আগেই কয়েকজন রাওয়াল সাহেবকে জাপটে ধরল। মশালটা ছিটকে পড়ল। টেনেহিঁচড়ে রাওয়াল সাহেবকে তারা বাইরে অন্ধকারে বের করে নিয়ে গেল। দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল রাওয়াল সাহেবের আর্তনাদ। হরিপদবাবু মশালটা তুলে নিয়ে বিকাশকে বললেন, 'চলুন, পালাতে হবে।'
বিকাশ ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে, ‘কোথায়? এসব কী হচ্ছে! আপনার সঙ্গীরা রাওয়াল সাহেবকে ধরে নিয়ে গেল কেন? এরা কারা?'
হরিপদবাবু বিকাশের কথার জবাব দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎই ঘরের দেওয়ালগুলো থেকে অদ্ভুত খচমচ শব্দ শুরু হল। এরপর বিকাশ যা দেখল তাতে তার হাড় হিম হয়ে গেল। ছবির মানুষগুলো সব জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ফ্রেম ছেড়ে বেরিয়ে আসার জন্য হাত-পা ছুড়ছে তারা। তাদের চোখে ফুটে উঠেছে জিঘাংসা! হরিপদবাবুর কয়েকজন সঙ্গী সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে ছবির ফ্রেমের মধ্যেই ঠেসে ধরতে লাগল তাদের। যাতে তারা বেরিয়ে আসতে না পারে সেজন্য। ছবির ফ্রেমের ভিতর আর বাইরের মানুষগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি শুরু হল।
হরিপদবাবু চিৎকার করে বিকাশের উদ্দেশে বলে উঠলেন, 'রাওয়াল সাহেবকে রক্ষা করার জন্য ওঁর পিতৃপুরুষরা জেগে উঠেছেন। বেশিক্ষণ ওঁদের আটকে রাখা যাবে না। চলুন পালান, নইলে আপনাকে বাঁচাতে পারব না।'
এরপরই মশালটা হঠাৎ নিভে গেল। বিকাশের হাত ধরে ঘরের বাইরে এনে অন্ধকারের মধ্যে তাকে দুর্গের বাইরে নিয়ে যাবার জন্য ছুটে চললেন তিনি। পিছন থেকে ভেসে আসতে লাগল বীভৎস চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ।
বিকাশের যখন হুঁশ ফিরল তখন সে কতকটা পথ পেরিয়ে এল তা তার খেয়াল নেই। তবে এখন সে রাওয়ালগড় থেকে অনেক দূরে। যেন হাওয়ার মতো সে এতটা পথ উড়ে এল। তবে রাত শেষ হয়ে এসেছে। শুকতারা ফুটে উঠেছে। সেই অন্ধকারটাও কেটে গেছে। অনেক দূরে আকাশের গায়ে আবছা কালো রেখার মতো দেখা যাচ্ছে দুর্গ পাহাড়টা। একটা হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তারা। বিকাশের সামনে দাঁড়িয়ে হরিপদবাবু। একটু ধাতস্থ হবার পর বিকাশ বলল, ‘এসব তো কিছুই বুঝতে পারছি না। যা ঘটল তা কি সত্যি, না মনের ভুল? দুঃস্বপ্ন?'
হরিপদবাবু বললেন, 'না, সব সত্যি। আপনি বেঁচে গেলেন। মহাকালীর মন্দিরে গেলে আর বাঁচতেন না।'
বিকাশ বলল, 'মানে?'
হরিপদবাবু হেসে বললেন, 'রাওয়াল সাহেব তলোয়ারকে রক্ত না খাইয়ে যে খাপে পুরতে পারতেন না। এ নিয়ম ওঁরা বংশপরম্পরায় পালন করে আসছেন। মহাকালীর মন্দিরে নিয়ে আপনাকে আজ বলি দিতেন তিনি। রাওয়াল সগর সিংহ তাই খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে দুঃস্থ-পরিজনহীন শিল্পীর খোঁজ করেছিলেন, যাতে তার কেউ খোঁজ না করে। ছবিতে স্বাক্ষর না করতে বলাটাও প্রমাণ লোপেরই চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অন্যায়ের শাস্তি আজ পেলেন সগর সিংহ। পরিসমাপ্তি ঘটল এ কাহিনির।
বিকাশ হতভম্বভাবে বলে উঠল, “শুধু পারিবারিক প্রথা অনুসরণ করার জন্য তলোয়ারকে রক্ত খাওয়াতে বলি দিতেন তাঁরা?'
হরিপদবাবু বললেন, ‘এ কাজের পিছনে দুটো গূঢ় কারণ আছে। সেটাই আসল ব্যাপার। তার একটা হল তলোয়ারের আঁকজোকগুলো হল একটা নির্দিষ্ট জায়গার সন্ধান। দুর্গের মধ্যে যেখানে তাঁদের পারিবারিক সম্পদ লুকোনো আছে। তলোয়ারটা দেখার বা ছবিঘরে ঢোকার অনুমতি বংশপরম্পরায় রাওয়াল সাহেবরা ছাড়া কেউ পেতেন না। শিল্পীকে হত্যা করে সে আঁক জানার পথ বাইরের লোকের কাছে বন্ধ করা হত। আর দ্বিতীয় ব্যাপারটা আরও গূঢ়। মহাকালীর উপাসক রাওয়ালরা শিল্পীর প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ সঞ্চয় করতে পারতেন ছবিগুলোর মধ্যে, জাগিয়ে তুলতে পারতেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের আত্মাদের। আজ যেমন সগর সিংহর ছবি ছাড়া অন্য ছবিগুলো জেগে উঠল।' এরপর হরিপদবাবু বললেন, 'এবার আমি যাই। ভোর হয়ে আসছে। দুর্গে আমার সাথীরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।'
বিকাশ বলে উঠল, আপনার সঙ্গী ওই লোকগুলো কারা?”
আধো-অন্ধকারেও একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল হরিপদবাবুর মুখে। তিনি বললেন, 'ওঁরাও সব আমার মতোই চিত্রকর ছিলেন। পাঁচশো বছর ধরে যাঁদের বলি দেওয়া হয়েছিল মহাকালীর মন্দিরে৷ যাই এবার।' কথা শেষ করে মুহূর্তের মধ্যে যেন মিলিয়ে গেলেন হরিপদবাবু। বিকাশের মনে হল একটা কালো ছায়া যেন উড়ে গেল দূরে রাওয়ালগড়ের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আলো ফুটল। বিকাশ মনে মনে হরিপদবাবুর উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে হাঁটতে শুরু করল সামনের রাস্তা ধরে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন