হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিভাস আবারও ডায়াল করল মিস্টার চৌধুরির নম্বরে। কিন্তু ওপাশে রিং টোনের বদলে সেই একই রকম গোঁ গোঁ শব্দ! কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর জানিয়ে দিল, 'আপনি যার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন, এই মুহূর্তে তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না। দয়া করে আবার চেষ্টা করুন।'
চৌধুরির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও তো করছে বিভাস। এই নিয়ে বার সাতেক তার নম্বরে ডায়াল করেছে সে। কিন্তু কিছুতেই তাকে মোবাইলে ধরা যাচ্ছে না। বিভাসের মনে হল, বুদ্ধি করে যদি সে অ্যামিউজমেন্ট পার্কের টেলিফোন নম্বরটা তাঁর কাছ থেকে চেয়ে রাখত তবে ভালো হত।
বিভাস জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। আকাশে ঘর কালো মেঘ। বৃষ্টি থামারও কোনো লক্ষণ নেই। হোটেলের জানলা দিয়ে অনেক নীচে দেখা যাচ্ছে শুনশান রাস্তা। মাঝ দুপুরেই যেন রাত নেমে এসেছে। উত্তরবঙ্গ থেকে আজ সকালে যখন বিভাস কলকাতায় পা রেখেছে, তখন থেকে সে দেখছে একইরকম বৃষ্টি। হোটেলের রুম সার্ভিসের ছেলেটা কিছুক্ষণ আগে লাঞ্চ দিতে এসে বলে গেল, আবহদপ্তর নাকি বলেছে আরও ২৪ ঘণ্টা দক্ষিণবঙ্গে নিম্নচাপের প্রভাব থাকবে, অর্থাৎ বৃষ্টি হবে।
মিস্টার চৌধুরিকে না ধরতে পেরে বিভাস এবার ফোন করল শিলিগুড়িতে তাদের কোম্পানির এম. ডি. সান্যাল সাহেবকে। সে সান্যাল সাহেবকে বলল, 'স্যার, মিস্টার চৌধুরিকে তো কিছুতেই এখন টেলিফোনে ধরতে পারছি না। কাল রাতে আমার সঙ্গে ওনার শেষ কথা হয়েছে। উনি বলেছেন বিকাল চারটে নাগাদ পার্কে পৌঁছতে। কিন্তু কলকাতায় প্রচণ্ড বৃষ্টি ...।' সান্যাল সাহেব জিগ্যেস করলেন, আপনি পার্কে যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন? বিভাস জবাব দিল, 'হ্যাঁ, হোটেলের গাড়ি বলে রেখেছি। ওরা বলল ও জায়গাতে পৌঁছতে দু-ঘণ্টার মতো সময় লাগবে।
সান্যাল সাহেব বললেন, 'মিস্টার চৌধুরির সঙ্গে কথা তো হয়েই আছে। আপনি বরং বেরিয়ে পড়ুন। কোনো কারণে পার্কে গিয়ে যদি ওর দেখা না পান, তবে সাধারণ দর্শকদের মতো টিকিট কেটে “হরর হাউসটা” দেখবেন। একটা ধারণা হবে আপনার। পরশু বোর্ড মিটিং। আপনার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ওই মিটিং-এ কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেবে আমাদের পার্কে আমরা ওরকম একটা হরর হাউস বানাব কি না?' এই বলে ফোনে লাইন কেটে দিলেন এম. ডি. সাহেব।
এম.ডি সাহেব যখন নির্দেশ দিলেন তখন পার্কটাতে যেতেই হবে বিভাসকে। তাঁর নির্দেশ মতো বিভাস কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নির্দিষ্ট গন্তব্যে। গাড়িতে ওঠার পর বিভাস ড্রাইভারকে পার্কটার নাম বলে জানতে চাইল, 'আপনি ওই পার্কে গেছেন কোনোদিন ?”
ড্রাইভার ভদ্রলোক জবাব দিলেন, 'হাইওয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে পার্কটা দেখেছি। ভিতরে ঢুকিনি। তবে অনেকেই তো বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যায় ওখানে। ছুটির দিনে খুব ভিড় হয়। আমার পাড়ার একজন তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওখানে বেড়াতে গেছিল কিছুদিন আগে। সে ঘুরে এসে বলল, পার্কের ভিতর নাকি একটা ভূতের বাড়ি তৈরি হয়েছে, সেটা দারুণ! বড়রা পর্যন্ত নাকি সেখানে ঢুকলে ভয় পেয়ে যায়!’
ড্রাইভার ভদ্রলোকের কথা শুনে বিভাস বুঝতে পারল তাহলে মিস্টার চৌধুরি যা বলেছেন তা মিথ্যা নয়, সত্যি তা হলে বাড়িটা মানুষকে আকর্ষণ করছে। গাড়ি চালাতে চালাতে ড্রাইভার ভদ্রলোক এরপর জানতে চাইলেন, 'আপনি কি কাজে যাচ্ছেন ওখানে? নাকি বেড়াতে?”
বিভাস মৃদু হেসে জবাব দিল, 'আমি ওই ভূতের বাড়িটাই দেখতে যাচ্ছি।' তার কথা শুনে গাড়ি চালাতে চালাতে হাসলেন ভদ্রলোক। এমন ভাবে হাসলেন যে বিভাসের মনে হল তিনি যেন বিশ্বাস করলেন না তার কথা।
অথচ বিভাস তো সত্যিই বাড়িটা দেখতে যাচ্ছে। বিভাসদের কোম্পানির নানারকম ব্যবসা আছে। রিয়েল এস্টেট, হোটেল, টি গার্ডেন এসব। সম্প্রতি তারা একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্কও বানিয়েছে। সেই পার্কের ম্যানেজারের দায়িত্ব পেয়েছে বিভাস। সে এখন যে পার্কে যাচ্ছে সেখানকার হরর হাউজের কথা কানে গেছে বিভাসদের কোম্পানির। ব্যাপারটা যদি লোক টানতে পারে তাহলে বিভাসদের পার্কেও ওরকম একটা ভূতের বাড়ি বানানো হবে। সে কারণেই একটা সূত্র ধরে তাদের কোম্পানি যোগাযোগ করেছে, এখানকার পার্কে যিনি ওই হরর হাউজটা বানিয়েছেন সেই মিস্টার চৌধুরি বলে ইঞ্জিনিয়র ভদ্রলোকের সঙ্গে। মিস্টার চৌধুরির সঙ্গে তাদের কোম্পানির যোগাযোগের ব্যাপারে একটা চাপা গোপনীয়তাও আছে। কারণ কোনো কোম্পানিই চায় না যে তাদের ব্যবসায় অন্য কেউ ভাগ বসাক। বিভাস পার্কে যাচ্ছে মিস্টার চৌধুরির গেস্ট পরিচয়ে, কোম্পানির পরিচয়ে নয়। তেমনই কথা হয়ে আছে মিস্টার চৌধুরির সঙ্গে।
এ সব ব্যাপার অবশ্য ড্রাইভারের সঙ্গে আলোচনার বিষয় নয়। তাই ভদ্রলোক হাসলেও বিভাস এ প্রসঙ্গে আর কোনো কথা বলল না তার সঙ্গে। কিছু সময়ের মধ্যেই বিভাসদের গাড়ি কলকাতা শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। বৃষ্টি যেন আরও বাড়ছে। পথঘাট যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল গাড়ি।
বাইরের এক ঘেয়ে বর্ষণসিক্ত অস্পষ্ট দৃশ্যপট দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিল বিভাস। ড্রাইভারের ডাকে ঘণ্টা দুই পর ঘুম ভাঙল তার। 'স্যার আমরা এসে গেছি।'
বিভাস বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেল অ্যামিজউমেন্ট পার্কের বিরাট তোরণের কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে আছে তারা। বিভাসের ঘড়িতে প্রায় পাঁচটা বাজে। বৃষ্টির জন্য ধীরে চালাতে হয়েছে গাড়ি। এক ঘণ্টা বাড়তি সময় লেগেছে আসতে। কয়েক মুহূর্ত মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে গাড়ির লুকিং গ্লাসে নিজেকে একবার দেখে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল বিভাস।
ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। যেন এখনই অন্ধকার নামবে। তবে বৃষ্টিটা কিছুক্ষণের জন্য থেমেছে। এটা একটা ভালো ব্যাপার। গাড়ি থেকে নেমে বিভাস চারদিকে তাকাল। পার্কের প্রবেশ তোরণের শান বাঁধানো বিশাল চত্বরটা একদম ফাঁকা। কোথাও কোনো লোকজন নেই। তোরণের এক পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট আইসক্রিম, ফাস্ট ফুডের স্টলগুলোও শাটার নামানো। বৃষ্টির জন্যই সম্ভবত কোনো টুরিস্ট আসেনি। বিভাস এগোল গেটের দিকে।
গেটের গায়ে একটা বোর্ড ঝুলছে— 'পার্ক ক্লোজড।' তার লাগোয়া টিকিট কাউন্টারও বন্ধ। বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়েও ভিতরে কেউ নজরে পড়ল না। বিভাস হাঁক দিল, 'ভিতরে কেউ আছেন?'
বার কয়েক হাঁক দেওয়ার পরও কোনো সাড়া মিলল না। একটু ভয়ই পেয়ে গেল বিভাস পার্কে কেউ নেই নাকি? এত দূর এসে তাকে কি ফিরে যেতে হবে? মিস্টার চৌধুরির তো থাকার কথা ছিল.....
পকেট থেকে মোবাইল বার করে সে রিং করল মিস্টার চৌধুরির নম্বরে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এবার বিভাস শুনতে পেল রিং টোন। উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ। আর একই সঙ্গে সে শুনতে পেল কাছেই কোথায় যেন একটা মোবাইল বাজছে। আর এরপরই সে দেখতে পেল প্ৰবেশ তোরণের থামের আড়াল থেকে হঠাৎই বেরিয়ে এল একজন লোক। তাঁর পরনে পুরোদস্তুর সাহেবি পোশাক। কোট-হ্যাট। তার মাথার টুপিটা মুখটাকে অনেকখানি আড়াল করে রেখেছে। লোকটা জিগ্যেস করল, 'আপনি কি বিভাস মজুমদার ? নর্থ বেঙ্গল থেকে আসছেন?’
বিভাস সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, আমিই মিস্টার চৌধুরির কাছে এসেছি।' তার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা আবার থামের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর তার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রবেশ তোরণের মূল দরজার পাশে একটা ছোট দরজা খুলে গেল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকটা। বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে লোকটা বিভাসের উদ্দেশে বললেন, 'আসুন, আসুন মিস্টার মজুমদার। আমি নিশীথ চৌধুরি। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।'
পার্কের ভিতর পা রাখল বিভাস। সে আগে কোনোদিন মিস্টার চৌধুরিকে দেখেনি। যা কথাবার্তা সব টেলিফোনেই হয়েছে। ভদ্রলোক টুপিটা খুললেন। ফরসা মুখশ্রী, নিখুঁতভাবে কামানো দাড়ি-গোঁফ। ঘন ভ্রুর নীচে চোখ দুটো বেশ উজ্জ্বল। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে হালকা হাসির রেশ। ভদ্রলোকের অবয়ব বেশ সুন্দর। বয়স মনে হয় বছর পঞ্চাশ হবে।
বিভাস তার সঙ্গে করমর্দন করে একটু হেসে বলল, 'আমি তো বেশ ভয়ই পেয়ে গেছিলাম! চারপাশে কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না!'
নিশীথবাবু বললেন, 'আজ তো বুধবার। পার্ক বন্ধ থাকে। আর বৃষ্টি বলে পার্কের বাইরেও কোনো লোক নেই।
বিভাস বলল, 'আমি আপনাকে অনেকবার ফোন করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুতেই লাইন পেলাম না।”
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমার মোবাইলে কী একটা গণ্ডগোল হয়েছে। মাঝে মাঝে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এবার চলুন, আপনি যেটা দেখতে এসেছেন, সেখানে আপনাকে নিয়ে যাই।'
নিশীথবাবুর পিছন পিছন এরপর হাঁটতে শুরু করল বিভাস। রাস্তার দু-পাশে সুন্দর ভাবে সাজানো ফুলের বাগান, বাহারি গাছ। মাঝে মাঝে কিছুটা করে উন্মুক্ত জায়গা। সেখানে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে বিরাট কোস্টার রাইড, কোথাও উঁচু যান্ত্রিক নাগরদোলা ইত্যাদি। আনন্দদানের উপকরণ, যেসব দেখা যায় এ ধরনের পার্কে। বিভাসদের পার্কেও এসব আছে। এই পার্ক নিশ্চয়ই অন্য সময় টুরিস্টদের চিৎকার-উল্লাসে আর রাইডগুলোর যান্ত্রিক শব্দে মুখরিত হয়ে থাকে, কিন্তু এখন সব নিস্তব্ধ। ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে বিরাট বিরাট রাইডগুলো। যেতে যেতে নিশীথবাবু বললেন, 'চারপাশে লোকজন না থাকলেও যেখানে যাচ্ছি সেখানে কিন্তু লোকজন আছে। আমার সহকর্মীরা ওখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
বিভাস তাঁকে জিগ্যেস করলে, 'এই হরর হাউসের আইডিয়া আপনার মাথায় এল কী ভাবে?”
নিশীথবাবু বললেন, 'আমি তো পেশায় ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়র। কর্মসূত্রে বেশ কয়েকবছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাটাই। বছর পনেরো আগে হাঙ্গেরিতে এরকম একটা “হরর হাউস” আমি দেখি। ওর নাম “ড্রাকুলা ক্যাসল”। ড্রাকুলা ব্যাপারটা তো ও দেশে বেশ জনপ্রিয়। তখনই ব্যাপারটা আমার মাথায় খেলা করে। আমিও যদি ওরকম একটা বাড়ি কোনোদিন বানাতে পারি। মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন মানুষ ভয় পেতেও ভালোবাসে, যদি সে ভয় মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়। সে কারণে মানুষ ভূতের গল্প পড়ে, হরর ফিল্ম দেখে। আমাদের এ বাড়িটা দেখতে তো প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। এখানে বাড়িটা, ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিক্স আর ম্যানুয়াল— এই তিন ধরনের ব্যাপার দিয়ে সাজানো হয়েছে। এ ছাড়া মেকানিক্যাল ব্যাপার তো থাকবেই।' এর পর একটু হেসে নিশীথবাবু বললেন, 'আমার নামটার সঙ্গে কিন্তু একটা ভয়ের ব্যাপার জড়িয়ে আছে।'
—'কীরকম?' জানতে চাইল বিভাস।
—‘নিশীথ' মানে তো রাত্রি, আর রাত মানে অন্ধকার। আর যেখানে অন্ধকার সেখানেই ভূত। আমার নামের জন্যই মনে হয় ছোটবেলা থেকে আমারও ভূতের প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ। ছোটবেলায় পড়ার বইয়ের আড়ালে ভূতের গল্পের বই লুকিয়ে পড়তে গিয়ে অনেকবার মারও খেয়েছি।' কথা শেষ করে হাসলেন ভদ্রলোক। নিশীথবাবুর কথা শুনে এবার হেসে ফেলল বিভাসও।
কথা বলতে বলতে এক সময় তারা পৌঁছে গেল পার্কের শেষ প্রান্তে সেই বাড়িটার সামনে।
অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে! তখনই আবার বৃষ্টি নামবে মনে হয়। বিভাসদের সামনে আধো অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট বাড়িটা। প্রাচীন ইউরোপীয় স্থাপত্যের আদলে তৈরি বাড়িটা। পাথরের তৈরি, শ্যাওলার ছোপ ধরা, গবাক্ষ, গম্বুজওয়ালা একটা ভৌতিক বাড়ি। সারা বাড়ি অন্ধকার, শুধু দোতলার একটা অলিন্দের ঘসা কাচের শার্সির আড়াল থেকে একটা ম্যাটম্যাটে হলদেটে আলো আসছে। সেই আলো আর বাইরের আধো অন্ধকার সত্যিই বাড়িটাকে যেন ভৌতিক করে তুলেছে। যেন বাড়িটা সত্যিই ভূতের। দেখলেই ভিতরটা কেমন ছ্যাৎ করে ওঠে।
নিশীথবাবু বললেন, 'আমরা এ-বাড়ির নাম দিয়েছি— “ব্যারন হাউস”। অর্থাৎ প্রাচীন ইউরোপীয় ভূস্বামীদের বাড়ি। ও বাড়িগুলো এরকমই। আমি কয়েকটা দেখেছি। নানা ভৌতিক গল্প জড়িয়ে থাকে ওই সব বাড়ির সঙ্গে। বাইরে থেকে কেমন লাগছে বাড়িটা?”
বিভাস বলল, 'দারুণ! এ ধরনের বাড়ির ছবি আমি বইতে দেখেছি। হুবহু সেরকম।’
নিশীথবাবু বললেন, ‘চলুন এবার ভিতরে যাওয়া যাক।'
প্রবেশ তোরণের গায়েই একটা ছোট টিকিট কাউন্টার। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও তার ভিতর একজন তরুণী বসে আছে। সে টিকিট দেয়। একটা নীল আলো জ্বলছে ঘরটার ভিতর। ঘরটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেই মেয়েটি বিভাসদের দিকে তাকিয়ে হাসতেই তার লাল টুকটুকে ঠোঁটের আড়াল থেকে উঁকি মারল ধবধবে সাদা স্বদন্ত। গল্পের ভ্যাম্পায়ার গার্লদের যেমন থাকে। বিভাস বুঝতে পারল, ভয় দেখানোর ব্যাপারটা তাহলে টিকিট কাউন্টার থেকেই শুরু হয়।
ক্যাচ ক্যাচ শব্দে খুলে গেল জমিদার বাড়ির প্রবেশ মুখের ভারী দরজা। সত্যিই যেন কোনো প্রাচীন বাড়িতে প্রবেশ করল বিভাস। অন্ধকার পথ এগিয়েছে সামনের দিকে। মাইক্রোফোনে রহস্যময় গলায় অদৃশ্য কেউ বাড়িটার সম্বন্ধে বিবরণ দিতে শুরু করল- 'এ এক পাঁচশো বছরের প্রাচীন প্রাসাদ। এর প্রতিটা অলিন্দে, কক্ষে, থামের আড়ালে জমা হয়ে আছে অনেক কাহিনি, রক্তাক্ত ইতিহাস, নিষ্ঠুরতার গল্প। অনেক কান্না, চাপা দীর্ঘশ্বাস, অতৃপ্ত বাসনা লুকিয়ে আছে এর অন্তঃপুরে...'
বিভাসকে নিয়ে এগোতে এগোতে নিশীথবাবু বললেন, 'সব দেশের জমিদারদের একাংশের এমনকী কবরখানা ও মতো ব্যারনরাও কিন্তু অত্যাচারী হতেন। এসব বাড়িতে গুম ঘর, গরাদ ঘর, থাকত। এসব কিছু এখানেও আছে। আমি আপনাকে প্রথমে জমিদার বাড়ির ভূগর্ভস্থ কবরখানায় নিয়ে যাচ্ছি।'
কিছুটা নীচে নেমে একটা বিরাট ঘরে ঢুকল তারা। আলোতে ঘরের মেঝেতে জেগে আছে সার সার কবর। সত্যিই যেন এটা একটা কবরখানা। নিশীথবাবু বললেন, 'সাধারণত পারিবারিক অশান্তিতে কেউ খুন হলে ব্যাপারটা চাপা দেওয়ার জন্য গোপন এই সমাধিক্ষেত্রে তাদের কবর দেওয়া হত। কবরের চারপাশটা একবার ঘুরে নিন।'
হাঁটতে শুরু করল বিভাস। কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ বিভাসকে চমকে দিয়ে দড়াম করে একটা কররের ঢাকনা খুলে গেল। তার মধ্যে থেকে একটা গলিত শব উঠে বসে হাত বাড়াল বিভাসকে ধরার জন্য। ব্যাপারটা এত আকস্মিক যে বিভাস কেঁপে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। সারা ঘর জুড়ে অট্টহাস্য শুরু হল এরপর। দুমদাম শব্দে খুলে যেতে লাগল অন্য শবাধারগুলোও। সেখান থেকে উঠে বসতে লাগল অদ্ভুত সব মূর্তি। বিভাসের মাথার ওপর পাক খেতে লাগল বিরাট আকারের একটা বাদুড়। তিরিশ সেকেন্ড মতো সময়, তারপর আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পিছন থেকে নিশীথবাবু বললেন, 'এ সবই ইলেকট্রিক আর ইলেকট্রনিক্সের খেল।'
বিস্মিত বিভাস বলে উঠল, 'যারই খেলা হোক না কেন একটা বড়মানুষকেও ভয় দেখানোর পক্ষে যথেষ্ট।'
নিশীথবাবু এরপর তাকে নিয়ে হাজির হল গুম ঘরে। ভয়াবহ রক্তজল করা আর্তনাদে মুখরিত ঘরটা। আলো আর ধ্বনির অদ্ভুত খেলায় বীভৎস পরিবেশ সেখানে। সেখানে শূলের ওপর গাঁথা আছে মানুষের বীভৎস কাটামুন্ডু। তারা কখনও যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে, কখনও অট্টহাস্য করছে। হাড়হিম করা সব ব্যাপার !
নিশীথবাবুর সঙ্গে বিভাস ঘুরতে লাগল সারা বাড়িতে। অদ্ভুত ভৌতিক সব ব্যাপার সারা বাড়িতে। কোথাও অলিন্দ থেকে উঁকি মারছে বীভৎস সব ভৌতিক অবয়ব, কোথাও গড়াগড়ি খাচ্ছে কাটা মুণ্ডু, কোথাও ফাঁসিতে ঝুলছে নরকঙ্কাল। কোথাও শোনা যাচ্ছে নারীকণ্ঠের খিলখিল হাসি, বা আর্তনাদ, চাবুকের শব্দ অথবা রক্তজল করা অট্টহাস্য। যে-কোনো মানুষের ভয় ধরে যাবে তা দেখলে। সাধে কি আর এই হরর হাউস দেখতে এত লোক পয়সা খরচ করে এ পার্কে ছুটে আসছে।
মিনিট কুড়ি পর বাড়ির অন্য সব জায়গা দেখানোর পর নিশীথবাবু বিভাসকে এনে দাঁড় করালেন একটা হলঘরের মতো জায়গাতে। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট স্টেজ। তার চারপাশে কিছু দর্শকাসন। সে ঘরে আলো কিন্তু জ্বলছে। বিভাসকে তিনি বললেন, 'এবার যে আইটেমটা দেখবেন তা কিন্তু পাবলিকের জন্য এখনও চালু করা হয়নি। এটা একটা ভৌতিক নৃত্যের প্রদর্শনী। বলে রাখি, এটা কিন্তু ম্যানুয়াল। অর্থাৎ যারা নাচবেন তারা সত্যিই মানুষ। এ দেশে কেন সারা পৃথিবীতে কোনো হরর হাউসে এ প্রদর্শনী আপনি দেখতে পাবেন না। বলতে গেলে এটা আমার নিজস্ব উদ্ভাবন। আর আপনিই এর প্রথম দর্শক।
বিভাস বেশ অভিভূত হল ব্যাপারটা শুনে। নিশীথবাবুর সঙ্গে স্টেজের সামনে চেয়ারে গিয়ে বসল বিভাস। ঘরের বাতি নিভে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল ঘর।
মঞ্চের চারপাশ ঘিরে জ্বলে উঠতে লাগল বৃত্তাকার একটা আগুনের রেখা। আর মঞ্চের ওপর আবির্ভূত হল কিছু ছায়ামূর্তি। একটা অদ্ভুত বাজনা ধীরলয়ে প্রথমে শুরু হল আর সেই ছায়ামূর্তিগুলো মঞ্চের ওপর নাচতে শুরু করল। ধীরে ধীরে আগুনের শিখা আর বাজনা ক্রমশ বাড়তে শুরু করল, নাচের ছন্দও দ্রুত হতে লাগল তার সঙ্গে সঙ্গে। বীভৎস এক নাচ। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগল বিভাস। ক্রমশ আগুনের শিখাগুলো বাড়তে বাড়তে গ্রাস করে নিল সারা মঞ্চ। যারা নাচছে তাদের মুখগুলোও এবার স্পষ্ট দেখতে পেল বিভাস। আর এরপরই বিভাসকে অবাক করে দিয়ে যেন মূর্তিগুলোর গায়েও মঞ্চের আগুন ছড়িয়ে পড়ল। তার মধ্যেই নাচতে লাগল লোকগুলো। আগুনে খসে পড়তে লাগল তাদের দেহের পোশাক, গায়ের চামড়া, মাথার চুল। লোকগুলোর মুখগুলোয় যন্ত্রণার স্পষ্ট চিহ্ন ফুটে উঠেছে। এ এক নারকীয় দৃশ্য। কিন্তু এ দৃশ্য আর বিভাগের সহ্য হল না। সে পাশের চেয়ারে বসা নিশীথবাবুর উদ্দেশে বলতে গেল, 'আমান, থামান, আর সহ্য হচ্ছে না।'
কিন্তু তার পাশের চেয়ারে তিনি নেই। আর তারপরই মঞ্চের অগ্নিকুণ্ডে অন্যদের সঙ্গে মুহূর্তের জন্য বিভাস যেন দেখতে পেল জ্বলন্ত শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিশীথবাবুকে। আর তারপরই সেই আগুন শব্দ সব থেমে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল ঘর। ততক্ষণে ঘেমে উঠেছে বিভাস। অন্ধকার ঘরের দরজার সামনে থেকে নিশীথবাবুর গলা শোনা গেল, ‘শো শেষ। এবার বাইরে বেরোতে হবে।'
নিশীথবাবুর সঙ্গে হরর হাউসের বাইরে বেরিয়ে এল বিভাস। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বিভাস যে দৃশ্য দেখল তাতে সে বিস্মিত হতবাক। এমন শো-ও হয়? সে শুধু একবার নিশীথবাবুকে বললে, 'আপনি কখন চেয়ার ছেড়ে উঠে গেছেন আমি বুঝতে পারিনি।' তার কথা শুনে অন্ধকারের মধ্যে যেন একবার হাসলেন তিনি।
অগ্নিবলয়ে নাচের দৃশ্যটা বিভাসের মনকে এমন ভাবে আচ্ছন্ন করেছে যে আর কোনো কথাই বলতে পারল না সে। ব্যাপারটা ভাবলেই যেন হৃদকম্প হচ্ছে। এ নাচ দেখে দর্শকরা হার্টফেল করতে পারে।
কিছুটা আচ্ছন্নের মতো হাঁটতে হাঁটতে নিশীথবাবুর সঙ্গে পার্কের বাইরে বেরিয়ে এল সে। ড্রাইভার গাড়িটা গেটের মুখে এনে রেখেছে। গাড়িতে ওঠার আগে বিভাস নিশীথবাবুকে বললেন, 'সত্যি অদ্ভুত বানিয়েছেন বাড়িটা, বিশেষত ওই নাচটা। ব্যাপারটা আমি জানাব ওপরওলাদের। কাজটা আপনি নিশ্চয়ই পাবেন।
তার কথা শুনে কেমন যেন একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল ভদ্রলোকের মুখে। তিনি শুধু বললেন, ওই নাচটা মনে হয় আর দেখানো যাবে না।' এই বলে তিনি হারিয়ে গেলেন অন্ধকারে। বিভাসও উঠে পড়ল গাড়িতে।
কলকাতার কাছাকাছি পৌঁছে রাস্তার পাশে চা খাবার জন্য একটা দোকানে গাড়ি থামাল ড্রাইভার। বিভাসও চা খেতে নামল। ওই নাচটা দেখার পর থেকে মাথাটা কেমন যেন ধরে আছে তার। কিছুতেই ওই ভয়ংকর দৃশ্যটা মন থেকে মোছা যাচ্ছে না। যতবার মনে পড়ছে শিউরে উঠছে সে। দোকানদারকে চা দিতে বলে বেঞ্চে বসে সকালের বাসি খবরের কাগজটা তুলে নিল সে। সারা দিনে খবর কাগজ দেখার সময় হয়নি তার। কাগজের দ্বিতীয় পাতায় একটা খবরে চোখ আটকে গেল তার। অ্যামিউজমেন্ট পার্কে গতকালের এক দুর্ঘটনার বিবরণ। পার্কের হরর হাউজে এক ভৌতিক নৃত্য প্রদর্শনীর পরীক্ষামূলক কাজ চলার সময় শর্টসার্কিট থেকে মঞ্চেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন ওই হরর হাউসের পরিচালক ইঞ্জিনিয়র নিশীথ চৌধুরি-সহ আরও বেশ কয়েকজন! বিভাসের চোখে ফুটে উঠল সেই দৃশ্যটা। অগ্নিবলয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন নিশীথ চৌধুরি। কানে ভেসে এল তাঁর শেষ কথাটা— ওই নাচটা আর মনে হয় দেখানো যাবে না।
হতভম্ব বিভাসের হাত থেকে খসে পড়ল খবরের কাগজটা।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন