।।পর্ব ৩।।

ঐন্দ্রিলা মুখার্জি

“ব্রহ্মা সেদিন সন্ধ্যারতির আয়োজন করছেন। পুজোর সমস্ত আয়োজন হয়ে গেছে। যেই না তিনি হাতের চুলুকে জল নিয়ে তাঁর আরাধ্য শ্রীবিষ্ণুকে সমর্পণ করতে যাবেন, তখুনি দেবরাজ ইন্দ্রের আবির্ভাব ঘটল। ইন্দ্র ব্রহ্মার কাছে প্রার্থনা জানালেন এমন একজন রাজা সৃষ্টি করার জন্য, যে ধরণীর বুকে গজিয়ে ওঠা সমস্ত পাপীদের বিনাষ করবে। ব্রহ্মা 'তথাস্তু' বলে তাঁর চুলুকের জল থেকে এক বালকের সৃষ্টি করলেন। সেই দৈব তেজ সমৃদ্ধ বালকের নাম দিলেন চালুক্য। চালুক্যকে পালন করলেন সপ্তমাতৃকা। তাঁরা তাঁদের শিক্ষায় ও অনুশাসনে সেই বালককে এক অসামান্য রাজা তৈরি করলেন। ভবিষ্যদ্বাণী ঘটল যে রাজা চালুক্য ও তাঁর বংশধরেরা ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্যে নিয়ে আসবেন স্বর্ণযুগ।”

... চালুক্যদের সৃষ্টিরহস্য সম্বন্ধে পশ্চিমী কল্যাণী চালুক্যদের সভাকবির বিবরণ।

রুচিরা এত অবধি নোট নিয়ে ভাবতে লাগলো, এই বর্ণনা কীভাবে প্রাসঙ্গিক!

এমনসময় অসীম ঘরে ঢুকলো। রুচিরা রিভল্বিং চেয়ারে বসেছিল, পাদু’টোকে মাটির উপর সমতলে রেখে, শিরদাঁড়া সোজা করে, কনুই দুটোকে চেয়ারের হাতলে রেখে, হাত দুটো নমস্কারের ভঙ্গিতে থুতনির তলায় রেখে। অসীম রুচিরার এই বিশেষ ভঙ্গীর মর্ম বোঝে। এর মানে রুচিরা গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। এই সময়ে অসীম কখনওই ওকে বিরক্ত করে না।

তাই রুচিরা ব্যস্ত দেখে সে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু রুচিরা তার দিকে নোটপ্যাডটা বাড়িয়ে দিলো।

“চালুক্যদের সৃষ্টিরহস্য সম্বন্ধে কিছু জানো?” রুচিরা জিজ্ঞেস করলো। অসীম নোটপ্যাডের লেখাটা পড়তে পড়তে ঠোঁট উল্টে বোঝালো, সে জানে না।

“তাহলে তোমার সাদা মনে কাদা নেই। তুমি বলো যে, লেখাটা পড়ে তোমার কী মনে হচ্ছে? আসলে কী ঘটেছিল, যা সভাকবি এভাবে বর্ণনা করে গেছেন!”

“আমার তো শুধুই অতিরঞ্জন মনে হচ্ছে...” অসীম বললো।

“আঃ! অতিরঞ্জন তো বটেই। কিন্তু রঞ্জনের শুরুটা কোথায়? সেটার জন্যই তো তোমার আনবায়াস্ড ওপিনিয়ন চাইছি!”

“জল থেকে কী করে মানুষ তৈরি হবে, সেটাই তো বুঝছি না!” অসীম সরলভাবে উত্তর দিলো।

“জলের ধারেই তো সভ্যতা গড়ে ওঠে অসীম! চালুক্য কোনো একজন নয়, চালুক্য একটা সভ্যতা। যে ইতিহাস পড়ে আমরা অভ্যস্ত, সেখানে যে কোনো একজনের গুণকীর্তন থাকলেও, ইতিহাস কখনই কোনো একজন সৃষ্টি করে না। একটা সামান্য ঘটনার সঙ্গেও বহু মানুষ জড়িয়ে থাকে। আমরা কেবল তার বিস্তৃতি সম্পূর্ণভাবে একত্রিত করে উঠতে পারি না। তাই যে ইতিহাস আমরা লিখি বা পড়ি, তা বিভিন্ন ঘটনাকে আশ্রয় করে আমাদের গল্পকরণ মাত্র। আসলে ইতিহাস ভবিষ্যতের মতোই সম্ভাবনাময়। ইতিহাসে কী ঘটেছে, তাও আমরা জানি না আর ভবিষ্যতে কী ঘটতে চলেছে, তাও জানি না! এই দুই-য়ের মাঝে বেঁচে থাকে বর্তমান, দু'জনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে...”

রুচিরা বলে চললো, “চালুক্যদের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে মতভেদ আছে। চালুক্যরা কদম্বদের হারিয়ে দাক্ষিণাত্য অধিগ্রহণ করেছিল ষষ্ঠ শতাব্দীতে। কেউ বলে, তারা কদম্বদের'ই বংশধর ছিল; আবার কেউ বলে, তারা অন্ধ্র ইক্ষ্বাকুদের বংশধর ছিল। ইক্ষ্বাকু মানে সূর্যবংশী, মানে শ্রী রামচন্দ্রের বংশোদ্ভূত। মতভেদ এই কারণে রয়েছে কারণ ইক্ষ্বাকুরা বশিষ্ঠিপুত্র হিরণ্যকগোত্র। আর কদম্ব এবং চালুক্যরা হরিথিপুত্র মানব্যসগোত্র। তাই চালুক্যরা যে কদম্বদের বংশজাত― তার পক্ষে প্রমাণ বেশি। চালুক্যদের মধ্যেও তিনটি ভাগ রয়েছে। বাদামি চালুক্য, পশ্চিমী চালুক্য এবং পূর্বদেশীয় চালুক্য। কিছু মতে এও প্রচলিত আছে যে তারা সবাই একই বংশের নয়। যদিও তার বিপক্ষে প্রমাণ বেশি।

সুতরাং চালুক্যদের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম পুলাকেসি সম্ভবতঃ কদম্ব বংশোদ্ভূই ছিলেন। এবং তিনি বড়ো হয়েছিলেন যে গোষ্ঠীতে, তারা থাকতো দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণ নদীর পাড়ে। তিনি কোনো রাজসিক শিক্ষা সম্ভবতঃ পাননি। তিনি ছিলেন প্রকৃতির শিষ্য। তাই আমার মনে হয়, কৃষ্ণ নদীই হলো কবির কল্পনায় ব্রহ্মার চুলুকের জল আর প্রকৃতি স্বয়ং সপ্তমাতৃকা।”

অসীম মন দিয়ে শুনছিল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বললো, “কত গভীর চিন্তাভাবনা লুকিয়ে থাকে এই সাধারণ গল্পগুলোর মধ্যে, যা আপাত দৃষ্টিতে অতিরঞ্জন মনে হয়...”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, ইতিহাস এক বিরাট রহস্য, যার ছোটো-ছোটো টুকরোগুলো কুড়িয়ে এনে আমরা সেগুলোর মধ্যে যোগাযোগ খুঁজি। তারপর বর্তমানকে আধার করে সেগুলো এমনভাবে সাজাই, যাতে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। আর সেটা করতে গেলে একান্ত প্রয়োজন এক অনুসন্ধিৎসু মনের এবং প্রবল কল্পনাশক্তির। এই দুয়ের সংযোগে তৈরি করতে হয় মনমানচিত্র। আর সেই মন-মানচিত্রই বইয়ের পাতায় ইতিহাস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।”

রুচিরা এই কথাটা বলে আবার কাজে মন দিলো।

অসীম অভিভূত হয়ে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। রুচিরা বললো, “কী যেন বলতে এসেছিলে!”

অসীম একটুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললো, “ও হ্যাঁ! দূরদর্শী গল্প শুনতে চাইছিল। ওকে বলার মতো গল্প আর আমার স্টকে নেই। তাই এসেছিলাম। আর মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গেলাম...”

রুচিরা হেসে বললো, “বাহ্! আর একটা কথাও ওকে বলো। 'চালুক্য' শব্দটার আরও একটা সৃষ্টিরহস্য আছে। চালুক্যদের উৎপত্তি যে গোষ্ঠী থেকে হয়েছিল তা ছিল কৃষিপ্রধান গোষ্ঠী। কৃষিকাজে প্রয়োজন পড়ে শাবলের। এই শাবলকে কন্নড়ে 'চালকি' বলে।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%