ঐন্দ্রিলা মুখার্জি
রুচিরা সেদিন বাড়ি ফেরার পথে সুধীরবাবুর বাড়িতে যায়। কলিংবেলটা বাজাতেই রুচিরার বয়সী এক ভদ্রমহিলা দরজাটা খোলে। তাকে দেখে রুচিরা হেসে বলে, “আরে পৌলমী যে! কবে এলে?”
“এই তো আজ বিকালে। বাবার শরীরটা কাল রাত থেকেই খারাপ। তাই চলে এলাম।” পৌলমী হেসে জানালো।
রুচিরা ঘরে ঢুকলে, পেশায় আ্যন্থ্রোপোলজিস্ট পৌলমী বললো, “অনেকদিন পর দেখা হলো। আসলে আমি বহুদিন ইন্দোনেশিয়ায় ছিলাম।” বলে পৌলমী মৃদু হাসলো।
৮বছর আগে শেষ দেখা হওয়া পৌলমীর সাথে এই পৌলমীর বেশ তফাৎ। আগে সে অনেক চুপচাপ ছিল। এখন অনেক সপ্রতিভ। ডানপিটেমিটা আগের মতোই চেহারায় ফুটে ওঠে। এমনিতেই বাবা ও মেয়ের মুখশ্রীতে অনেক মিল, তার উপর তার বর্তমান সপ্রতিভতায় তাকে আরও বেশি করে সুধীরবাবুর আত্মজা লাগছে।
পৌলমী যখন অনেক ছোটো, তখন সুধীরবাবুর স্ত্রী মারা যান। বাবার সান্নিধ্যেই সে বড়ো হয়েছে। তাই বাবারই মতো তার ছোটোবেলা থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়ে আগ্রহ ছিল। অবশেষে সে নৃ-বিদ্যা তথা আ্যন্থ্রোপোলজিকে জীবনসাধনা হিসেবে বেছে নেয়।
পৌলমীর সঙ্গে রুচিরার প্রথম দেখা হয়েছিল এ. এস. আই-এর একটি সমাবেশে। সেদিন বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল দু'জনের মধ্যে। কিন্তু সেই সখ্যতা রয়ে গিয়েছিল হলঘরের সীমা অবধি, কারণ পরেরদিনই বিদেশ পাড়ি দিয়েছিল পৌলমী, নৃ-তাত্ত্বিক গবেষণার উদ্দেশ্যে। ব্লান্ট কাট করা সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার পৌলমীকে বরাবরই রুচিরার খুব আকর্ষণীয় লাগে, তবে আজ যেন তাকে ভীষণ উজ্জ্বল লাগছিল, যাকে বলে 'ইনক্যানডেসেন্ট'!
রুচিরাকে সুধীরবাবুর ঘরের সামনে নিয়ে গিয়ে পৌলমী বললো, “আমি মাসিকে তোমার জন্য চা বানাতে বলে দিচ্ছি। আমাকে বাবার জন্য ওষুধ আনতে বেরোতে হবে।”
রুচিরা হালকা হেসে সম্মতি জানালো।
চোখে চোখ রাখলে সংযোগ ভেঙে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়াটা রুচিরার বড়ো রূঢ় লাগে। তাই পৌলমীর সাথে তার সাক্ষাতের ইতি টানতে সে চোখ নিচু করলো। কয়েক মুহূর্ত রুচিরা চেয়ে রইল সেই বস্তুর দিকে, যা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রুচিরার একটা খটকা লাগল বটে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ভেবে সে চিন্তাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেললো।
দরজার দিকে যেতে যেতে পৌলমী বলে গেলো, “মালতী মাসি, বাবার ঘরে দু'কাপ চা দিও।”
পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকে রুচিরা দেখলো, সুধীরবাবু আধ-শোওয়া হয়ে কোমর থেকে পা অবধি চাদর ঢাকা নিয়ে বই পড়ছেন। বইটি রুচিরার পরিচিত।
রুচিরা বললো, “কেমন আছেন স্যার?”
সুধীরবাবু চমকে উঠে বই থেকে মুখ তুললেন।
―আরে তুই! আয় বোস।
খাটের পাশের চেয়ারটি দেখিয়ে তিনি বললেন।
ইতিমধ্যে মালতী মাসি দু'কাপ চা নিয়ে ঢুকলো। বয়স্ক মালতী মাসি কানে ভালো শোনেন না। পরিবার নিয়ে তিনি সুধীরবাবুর বাড়ির আউট-হাউসে থাকেন।
সুধীরবাবু মালতী মাসিকে বললেন― রান্নাটা করে দিয়ে থাকলে তুমি চলে যেতে পারো। শুধু আমার জন্য একটু গরম জল ফ্লাস্কে...
সুধীরবাবুর কথা শেষ হলো না। তার আগেই মালতী মাসি বেরিয়ে গেলেন।
সুধীরবাবু এই উপেক্ষায় অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “মালতীদি আজকাল আর কানে ভালো শোনে না। মায়া পড়ে গেছে, নেহাৎ আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমার মেয়েটাকে মানুষ করেছে তাই। আমার মেয়েটারও আমার মতোই দুর্ভাগ্য, ছোটোবেলায় মাকে হারালো। আমাকে তো তাও দেখার কেউ ছিল না। অন্ততঃ মালতীদির জন্য আমার মেয়েটা ছোটোবেলায় একটু যত্ন পেয়েছে।
কিছুক্ষণের জন্য ঘরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
রুচিরাই নীরবতা ভেঙে সকালের কার্যকলাপ খুলে বললো।
মন দিয়ে সব শুনে সুধীরবাবু রুচিরাকে বললেন, “অলরাইট! তোর হাইপোথিসিস কী?”
রুচিরা চায়ে চুমুক দিয়ে বললো, “আমার মনে হয়, কালী মন্দির ছিল। বাদামী চালুক্যদের স্থাপত্যগুলি পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছিল। তাদের রাজধানী, কর্নাটকের বাদামী শহরে গেলে আজও আমরা দেখতে পাই স্যান্ডস্টোনের পাহাড় কেটে তৈরি করা মন্দির, প্রাসাদ এবং দুর্গ। আর দুর্গের মাঝে অগস্ত্য কুণ্ড।
সম্ভবতঃ এই কালী মন্দিরও ছিল সে'রকমই এক মন্দির। যদিও তা সম্ভবতঃ চালুক্যদের পূর্ব সময়কার! তার কারণ মহাভারতের 'অশ্বমেধিকা' পর্বে এই কালীমন্দিরের উল্লেখ আছে।
ভূগর্ভে সেটি যেতে পারে দু'ভাবে―
এক, কোনো ভূমিকম্পে সেটি আশেপাশের কিছুটা জায়গাসহ ধসে যায় ও কালক্রমে মাটির তলায় চাপা পড়ে যায়। এই ধ্বংসাবশেষের উপরেই পুনর্বার বেদি তৈরি করে স্থাপিত হয় মহামায়া মন্দির। কিন্তু এর সম্ভাবনা কম, কারণ জায়গাটি ভূমিকম্পপ্রবণ নয়।
দুই, যার সম্ভাবনা ও প্রাসঙ্গিকতা বেশি তা হলো, এই মন্দির এবং তার প্রাঙ্গন পাহাড়ের গা কেটে তৈরি হওয়ার ফলে মন্দির প্রাঙ্গন ছিল মাটির অনেকটা নিচে। ঠিক যেমন ডিনামাইট দিয়ে ব্লাস্ট করালে সমতলের মাঝে এক বিশাল কোটরের সৃষ্টি হয়, তেমনই। সুতরাং মন্দির প্রাঙ্গনে নামতে হতো সিঁড়ি দিয়ে।
সেই কালী মন্দিরে সম্ভবতঃ নরবলি হতো। কোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটার ফলে সেই মন্দির প্রাঙ্গন মাটি ফেলে বিলীন করে দেওয়া হয়। এই ভূগর্ভস্থ কালী মন্দিরের উপর তৈরি হয় মহামায়া মন্দির...”
―ব্রাভো! তোর কথা শুনে মনে হলো, ব্যোমকেশের একটা গল্প পড়ছি। তুই গোয়েন্দা গল্পের ভক্ত না?
সুধীরবাবুর কথায় রুচিরা সম্মতিসূচকভাবে হেসে চায়ে চুম্বক দিল।
―হুম্! অনুমান করার স্টাইল দেখলেই বোঝা যায়।
তারপর আরও দু'একটা বিষয় আলোচনা করে রুচিরা উঠে গেলো। বেরিয়ে যাওয়ার পথে রুচিরার পৌলমীর সাথে দেখা হলো। পৌলমী হেসে বললো, “অল দ্য বেস্ট ফর ইওর এক্সপিডিশন।”
রুচিরাও ঘাড় নেড়ে হালকা হেসে বললো, “আজ কথা হলো না। আসলে অনেক রাত হয়েছে। অসীম হয়তো না খেয়ে বসে আছে। তাই আজ আসি...”
রুচিরা বাড়ি ফিরলো বটে, তবে মনে একটা খটকা রয়ে গেলো। কিন্তু এখন সে সবে মন দিয়ে লাভ নেই। কাল ছুটি, পরশু যাওয়া। সুধীরবাবু অসুস্থতার কারণে কয়েকদিন বিশ্রাম নেবেন। উনি এক্সপিডিশন জয়েন করবেন সাতদিন পর থেকে।
বাড়ি ফিরে রুচিরা দেখল অসীম গম্ভীর মুখে সোফায় বসে বই পড়ছে। কিন্তু অসীমের গম্ভীর মুখ দেখে সমস্যার কথা জিজ্ঞাসা করার জায়গায় সে সোজা বললো, “বিরিয়ানিটা আমি এসে গরম করছি। তুমি টেবিল সাজিয়ে ফেলো। অমন গম্ভীর মুখ করে রেখে সারপ্রাইজ দেওয়ার কিছু হয়নি। জানি, তোমার প্রোমোশন হয়েছে।”
এই বলে সে ভেতর ঘরে চলে গেলো।
অসীম মুখ খুলে বসে রইলো। বহুদিন ধরে তার প্রোমোশনের কথা চলছে বটে, কিন্তু রুচিরাকে সে কিছুই জানায়নি। তাছাড়া রুচিরা বিরিয়ানির ব্যাপারটাই বা জানলো কী করে? অসীম তো পুরো বিরিয়ানিটাই এয়ারটাইট ডাব্বায় ঢেলে রেখে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ঢুকিয়ে রেখেছে। বিরিয়ানির বাক্সগুলোও সে মুখবন্ধ ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। আর সে সত্যিই ভেবেছিল, গম্ভীর মুখে বসে থেকে রুচিরাকে চিন্তায় ফেলবে, তারপর তার প্রিয় বিরিয়ানি পরিবেশন করে সারপ্রাইজ দেবে! আসলে শুধু তার প্রোমোশনের জন্য নয়, রুচিরা একমাসের জন্য ট্যুরে যাবে, সেটাও কারণ ছোটো-খাটো এই সেলিব্রশনের! তাই সে যারপরনাই অবাক হয়েছে। যাই হোক, রুচিরা ফিরলে ওকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে।
রুচিরা ফিরতেই অসীম বললো, “তোমার আর্ট অফ্ ডিডাক্শনটা সবিস্তারে বর্ণনা করো!”
রুচিরা বিরিয়ানিটা বের করে গরম করতে করতেই বললো― “ঘরে ঢোকার আগে জুতো খোলার জন্য তুমি স্ল্যাবের উপর বিরিয়ানির প্যাকেটটা নামিয়ে রেখেছিলে। প্যাকেট থেকে তেল চুঁইয়ে পড়ায় সেখানে তেল লেগে রয়েছে, আর তা থেকে চমৎকার বিরিয়ানির গন্ধ বেরোচ্ছে! তোমার কাছে বিরিয়ানি মানেই উৎসব আর উৎসব মানেই তো বিরিয়ানি! তাই আন্দাজ করলাম।”
অসীম লম্বা নাক টেনে বললো― যাকগে! মানলাম, তুমি না হয় আমার খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সব জানো। কিন্তু প্রোমোশনের ব্যাপারটা কী করে বুঝলে? আমি তো তোমায় কিছু জানাইনি! আর কোনো ইঙ্গিতও দিইনি। বেশ ভালোই তো গম্ভীর হয়ে বসেছিলাম...”
অসীম খাবারটা পরিবেশন করতে করতে রুচিরা বললো― “ইঙ্গিত দাওনি! ওরম মনে হয়। পুরোটাই আমি ব্যাক ক্যাল্কুলেশন করেছি। অনেকদিন ধরেই ছটফট করছিলে। আনন্দে আনমনা ছিলে। ভাবছিলে আমি লক্ষ্য করিনি। প্লাস আজকে বিরিয়ানি ট্রিট! এমন কোনো কারণ তো থাকতেই হবে যে, আমি এই খাওয়াটা রিফিউজ করতে পারব না! আর ইয়ার এন্ডিং-এর সময় এই কারণটাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত নয় কি?
অসীম বিরিয়ানির স্বাদ নিতে নিতে মনে মনে রুচিরার প্রশংসা না করে পারলো না। রুচিরার বহু গুণ'ই তাকে মুগ্ধ করে, কিন্তু রুচিরার পর্যবেক্ষণ শক্তির সে মস্ত বড়ো অনুরাগী!
রুচিরা একগ্রাস বিরিয়ানি মুখে তুলে বললো, “আর তাছাড়া তুমি গম্ভীর হয়ে বসে আছো মানে যে অভিনয় করছো, সেটা এত বছরে আমার আর জানতে বাকি নেই!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন