।।পর্ব ১১।।

ঐন্দ্রিলা মুখার্জি

এক সপ্তাহ হতে চললো, রুচিরা বাড়ি ফিরে এসেছে। অসীম জানে যে অভিযান সফল হয়নি বলে রুচিরার মন খারাপ। কিন্তু তা বলে রুচিরা তো এরকম বিমর্ষ থাকার মানুষ না! রুচিরা স্টাডিতে বসে তার ডায়েরিতে কিছু নোট নিচ্ছিল। অসীমও অফিসের কাজ সেরে স্টাডিতে বইপত্র রাখতে গেছিল। রুচিরাকে অন্যমনস্ক দেখে অসীম জানতে চাইলো, তার কিছু প্রয়োজন কিনা। রুচিরা কিছুক্ষণ ভেবে অসীমকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি মনে করো সময়যাত্রা সম্ভব?”

“তুমি ‘স্ট্রিং থিওরি’ তে বিশ্বাস করো?” অসীম জিজ্ঞাসা করলো।

“ব্রায়ান গ্রীন- এর ভিডিওগুলোতে যতটুকু বলা থাকে, তার চেয়ে কম বই বেশি না।” রুচিরা বললো।

“আচ্ছা তোমার ধারণাটা শুনি একটু...” অসীম নিজের থুতনিটা ডান হাতের তালুতে চেপে ডান হাতের কনুইটা টেবিলের উপর রাখলো।

“স্পেস শুধু তিনটে নয়, আসলে তার বেশি ডাইমেন্সন দিয়ে তৈরি। তিনটে ডাইমেন্সন বড়ো, অর্থাৎ আমরা তাতে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারি, তথা লেংথ, ব্রেথ এ্যাণ্ড হাইট। বাকি ডাইমান্সনগুলো অনুপাতে এতটাই ছোটো যে, আমরা তাদের এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। অঙ্ক করে তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করা গেছে, কিন্তু বাস্তবিক তারা আছে না নেই― তার প্রমাণ এখনও আমরা পাইনি।” রুচিরার কথা শেষ না হতেই অসীম বললো, “তুমি তো এমনভাবে বোঝাচ্ছো, যেন আমি স্ট্রিং থিওরি জানি! ধরো, আমি তর্ক করলাম যে যেই ডাইমান্সনে আমরা চলাচল করতে পারি না তার অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তখন তুমি কী দিয়ে তুলনা করে আমায় বোঝাবে?”

“একটা পাতলা ইলেক্ট্রিক তারে কোনো পিঁপড়ে অনায়াসে হাঁটতে পারে, কিন্তু আমরা পারব না। সেরকমই অণু-পরমাণুরা যে ডাইমেন্সনে চলাচল করতে পারে, একটা পিঁপড়ে তা পারবে না।” রুচিরা বললো।

অসীম বললো, “এক্স্যাক্টলি! কারণ হচ্ছে আইন্সটাইনের প্রিয় শব্দ, ‘রিলেটিভিটি’। নিউটন যদিও মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের কারণ আবিষ্কার করেছিলেন আইন্সটাইন। তিনি তাকে বলেছিলেন ‘গ্র্যাভিটেশনল ওয়েভস’। এই গ্র্যাভিটেশনল ওয়েভস হচ্ছে যাকে আমরা সাধারণতঃ বলে থাকি ‘স্পেস টাইম কন্টিনিউয়াম’। এই কন্টিনিউয়াম একটা চাদরের মতো। তাতে কোনো ভারী বল রাখলে তার চারপাশটা ঢালু হয়ে মাঝে তার দিকে নেমে যাবে। যত বেশি সেই বলের ওজন হবে, তত বেশি তার চারপাশটা ঢালু হবে। এই ঢালু গর্তটা যেখানে সমতলের সাথে মিশছে, সেখানে থেকে বলটার মাঝে আমি যদি কোনো হালকা বল রাখি, তাহলে সেটা গড়িয়ে ভারী বলটার দিকে চলে যাবে। এই ঢালু যেখানে সমতলের সাথে মিশছে সেখান থেকে ওই ভারী বলটা অবধি হচ্ছে গ্র্যাভিটেশনল ফিল্ড। যদি এই স্পেস টাইম কন্টিনিউয়ামটাকে আমি ইচ্ছা মতো দোমড়াতে-মোচড়াতে পারি, তাহলে কেন আমি সময়যাত্রা করতে পারবো না? ও হ্যাঁ, বলো তো আমি কী করে বলছি যে এটাতে স্পেস আর টাইম দু’টোই আছে, কেনো একা স্পেস নেই?”

অসীমের কথা শেষ হতেই রুচিরা বলে উঠলো, “মোশন! কোনো কিছু দাঁড়িয়ে নেই, সবই চলমান। জগতে ‘এ্যাবসোলিউট রেস্ট’ বলে কিছু হয় না। স্থিতির অস্তিত্ব প্রমাণ করা সবচেয়ে শক্ত। এবং সবকিছুই একে অপরের তুলনায় কম-বেশি জোরে বা আস্তে ছোটে। একে-অপরের অনুপাতে তারা কতটা জোরে বা আস্তে ছুটছে, তার ধারণার জন্যই আমরা সময়কে ডাইমেনশন হিসেবে ব্যাবহার করি।”

“ইয়েস!” অসীমের চোখ চক চক করে উঠলো।

“আর এই ধারণাটা বোঝানোর জন্য স্ট্রিং থিওরির প্রয়োজন। পরমাণু তৈরি ইলেক্ট্রন প্রোটন ও নিউট্রন দিয়ে। এগুলো তৈরি আরও ছোটো কণা দিয়ে, যার নাম ‘কোয়ার্ক’। এখান থেকেই আমরা ‘কোয়ান্টাম’ মেকানিক্সে ঢুকছি। ‘ক্লাসিকাল লজ্ অফ ফিসিক্স’ এখানে অকেজো। এক একটা কোয়ার্ক তৈরি কম্পমান গাডারের মতো কিছু তার দিয়ে। এগুলোর জন্যই স্পেস টাইম কন্টিনিউয়ামে তিনটে বা চারটে নয়, দশটা ডাইমেনশন থাকা সম্ভব!” অসীম যোগ করলো।

রুচিরা একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে এবারে বললো, “অসীম আমি সময়যাত্রা করেছি। এবং আমি জানি এটা মিথ্যে নয়, কারণ ডঃ সুধীরকুমার বসু এবং সুধাকরবাবু এর সাক্ষী। আর একজন যে আমার সাথে সময়যাত্রা করেছে, সে আর আজ নিজের গল্প বলার জন্য বেঁচে নেই। এমনকি ডঃ রঞ্জন সেন, বসুমিত্র ও সৌরসেনী এরা তিনজন এক রাত্রে একই স্বপ্ন দেখেছিল, যেখানে আমি এদের ফোন করে ডেকেছিলাম সাহায্যের জন্য। এরা প্রত্যেকে আমায় আলাদা করে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যেন স্বপ্ন হলেও সত্যি। এদের কাছে এটা আধোঘুমে দেখা স্বপ্ন হলেও আমার কাছে ঘোর বাস্তব। এমনকি আমি শব্দশক্তি দিয়ে তৈর অসামান্য ভাস্কর্যও দেখেছি, যেটার বর্তমানে অস্তিত্ব নেই, কারণ আমরা সময়যাত্রা করে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পাল্টেছি। সেইজন্যই এই কম্পমান প্রাচীরগাত্রের ছিদ্র যা কম্পমান তারের তৈরী ছোট ছোট ফাঁস, এগুলোর অস্তিত্বের প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস। শব্দশক্তি দিয়ে এত নিপুণ ভাস্কর্য তৈরি তখনই সম্ভব, যখন পাথরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শব্দ থাকবে। আর বেদ অনুযায়ী শব্দ স্বয়ং সৃষ্টির আদি- সমস্ত স্পন্দনের বীজে রয়েছে শব্দ।”

অসীম হাঁ করে শুনছিল। সে বললো, “একটা বিষয়ের উপর এখন অনেক পড়াশুনা চলছে। তাতে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির টিউনিং ফর্ক দিয়ে নক্সা তৈরি করা হয়। এই বিশোয়টাকে ‘সাইম্যাটিক্স’ বলে।”

রুচিরা এবার তাকে সবিস্তারে সমস্ত ঘটনা বললো। শেষে অসীম জিজ্ঞেস করলো, “কিন্তু একটা মানুষ রাতারাতি নরখাদকে কী করে পরিণত হতে পারে রুচিরা, তাও আবার সম্পূর্ণ সজাগ অবস্থায়?”

রুচিরা বললো, “সুধীরবাবু অল্প বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন। তিনি বিনা মাতৃস্নেহে বড়ো হয়েছেন। তারপর তাঁর অল্প বয়সে পত্নিবিয়োগও ঘটে। আমি আমার সাইকোলজিস্ট বন্ধুর সাথে কথা বলে জেনেছি যে, এই দুই কারণেই মানুষের মধ্যে ‘ওরাল এ্যাগ্রেশন’ বা ‘ক্যানিবালিস্টিক টেন্ডেন্সি’ তৈরি হতে পারে। উপরন্তু সন্তান শোকে তিনি বিহ্বল ছিলেন। তিনি এমনিতেই দাম্ভিক প্রকৃতির ছিলেন, তাই সংসারের পিছুটান হারিয়ে তাঁর কাছে মানবিক প্রবৃত্তিগুলোর প্রয়োজন ফুরিয়েছিল।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রুচিরা আরও কিছু বলল, যা শুনে অসীমের মনে বিস্ময়ের পাশাপাশি কিছুটা অস্বস্তি ও ভয়েরও সঞ্চার হল, “যখন ‘ক্যানিবালিস্টিক টেন্ডেন্সি' একটি সমগ্র জাতির মধ্যে দেখা দেয় তখন তাকে ‘উইণ্ডিগো সাইকোসিস’ বলা হয়। নর্থ আমেরিকা অথবা ক্যানাডার আলগনকোয়েন উপজাতির মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায়। তারা বিশ্বাস করে প্রবল শীতে যখন খাদ্যাভাব দেখা দেয় তখন উইণ্ডিগো নামের এক প্রেতাত্মা উপজাতির কোন একজন ব্যক্তিবিশেষের শরীরে বাসা বাঁধে। সেই ব্যক্তির হৃদয় হয়ে যায় বরফশীতল। শীতের মতো নির্মম সেই ব্যক্তি চায় নরমাংস। সে যাকে আক্রমণ করে কিন্তু ভক্ষণ করে না তারও শরীরে বাসা বাঁধে উইণ্ডিগো। এভাবে একটা গোটা জনজাতি পরিণত হয় নরখাদকে, ক্ষুধা নিবৃত্তির তাগিদে!”

“আচ্ছা শেষ প্রশ্ন, সম্মোহন দ্বারা মানুষকে যে কোনো কিছু করানো সম্ভব? আর সম্মোহিত একমাত্র তারাই হয় না যারা দুর্বলমনস্ক?” অসীম বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

রুচিরা উত্তেজিত হয়ে বললো, “সম্মোহন প্রবণ তারাই হয়, যারা অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী; তারা নয় যারা মনের দিক থেকে দুর্বল! সম্মোহিত ব্যক্তিকে দিয়ে যেকোনো কাজ করানো সম্ভব, যদি সেটা তার নিজের বিবেকবুদ্ধির বিরুদ্ধে না যায়। সম্মোহিত অবস্থায় মানুষের মনযোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু তার চরিত্র পাল্টায় না।”

রুচিরা টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট্ট জিনিস বের করলো। অসীমের হাতে দিতে সে দেখলো, সেটা একটা নীল রঙের তিনকোনা পাথর। রুচিরা বললো, “অসীম, আমি যাচাই করে দেখেছি। এই পাথরটা একটা সাধারণ পাথর। যখন রাজর্ষি চালুক্য এই পাথরটা আমার কাছ থেকে ফেরত চাননি, আমার তখনই সন্দেহ হয়েছিল। এই সাধারণ পাথরটা উনি আসাধারণ বলে আমায় সামলে রাখতে বলেছিলেন, আমার মনোযোগ অক্ষুণ্ন রাখার জন্য। মনজাভায় নিজেকে পরিবর্তিত করার পিছনে এই পাথরটির কোনো ভূমিকা নেই। ভূমিকা যদি কারুর থেকে থাকে তাহলে সেটা ভূগর্ভে অবস্থিত সেই অস্থায়ী সময়রথের। মনোজাভা রূপ মানে জানো তো, অস্তিত্বের সেই স্তর যেখানে আমরা ‘ট্যাকিয়ন’ কণা দ্বারা গঠিত হই!”

অসীম এবার চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে বললো, “ট্যাকিয়ন? মানে যে কণা আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে ছোটে?”

রুচিরা এবার মুচকি হেসে বললো, “হ্যাঁ! আইন্সটাইনের স্পেশাল থিওরি অফ রিলাটিভিটি।”

দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। অসীমই নিস্তব্ধতা ভাঙতে প্রথম কথা বললো, “আমি তো উইকিপিডিয়া থেকে এটাও পড়েছি যে, দেবী মহাকালী স্বয়ং শব্দের জননী।”

“আমি এটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। আর ভেবেচিন্তে মহাকালীর প্রতি একটা স্তুতিও লিখেছি। শুনবে?” রুচিরা অসীমকে বললো।

“আলবাৎ!” বলে অসীম চেয়ারটাকে রুচিরার দিকে টেনে নিয়ে এসে বললো।

রুচিরা তার ডায়েরি থেকে একটি স্তুতি পাঠ করে শোনালো,

“।।ব্রহ্মময়ী।।

চতুরহস্তা মুক্তকেশী অগ্নিচক্ষুধারিণী,

প্রশস্ত ললাট, উগ্র স্বভাব, ত্রিনয়নী মুণ্ডমালিনী।

উধ্বত জিহ্বা, খড়্গহস্তা, দৈত্যদানবদলনী,

মমতাময়ী জগন্মাতা তুমিই রক্ষাকারিনী।

পদতলে তোমার মহাকাল, মহাশূন্য তিনিই,

মহাশূন্যে তুমিই হলে শক্তি সঞ্চারিনী।

মহাশূন্যে শক্তি সঞ্চারেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি,

মহাবিশ্বে করেন রূপদান ব্রহ্মা ও সরস্বতী।

মহাবিশ্ব পালন ও রক্ষা করেন লক্ষীনারায়ণ,

ধর্মরক্ষার্থে তাঁদের হয় অবতাররূপে আগমন।

অহংকারী অজ্ঞানী জনে তবু না পায় চৈতন,

করতে না পারে বহুরূপে এক ঈশ্বর দর্শন।

শাস্ত্রবিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি হয় ভাবের উন্নতি!

নইলে তা অপবিদ্যা, মনুষ্যত্বের ঘটায় অবনতি।

মুণ্ড ধারণ করে নিলে অহংকারের দায়,

হস্ত ধারণ করে তুমি কর্মেরও নিলে দায়।

তোমাতে আদি, তোমাতেই অন্ত, তুমি কৃপাময়ী,

মোক্ষদায়িনী করালবদনা, তুমিই ব্রহ্মময়ী।”

রুচিরা শেষ করতেই অসীম বলে উঠলো, “দুর্ধর্ষ!”

অধ্যায় ১১ / ১১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%