ঐন্দ্রিলা মুখার্জি
রুচিরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো অঘোরীর কথা মতো পাথরটাকে চেপে ধরে জপ করতে আরম্ভ করলো। প্রথমে তার হাতের তালুটা অসম্ভব গরম হয়ে গেলো, তারপর ধীরে ধীরে সেই তাপ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লো। ক্রমে তার শরীরটা অসম্ভব হালকা এবং ছোটো মনে হতে লাগলো। পথে রুচিরা অনেক কিছু শুনতে পাচ্ছিল। তার মধ্যে একবার মনে হলো সুধীরবাবু বলছেন, “শোন মালতী, তোর জন্য আমার সাধনায় যদি ব্যাঘাত ঘটেছে তাহলে তোর পরিবারকে আস্ত...”
রুচিরা পুরোটা শুনলো না, যাতে তার ধ্যান ভঙ্গ না হয়। একসময় তার মনে হতে লাগলো যে তার শরীরটার কোনো অস্তিত্বই নেই। শুধু তার চৈতন্য অবশিষ্ট রয়েছে। এই সময়টা ছিল শান্তিপূর্ণ এবং আনন্দময়, যেন তার কোনো অতীত নেই বা কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সে হলো সচ্চিদানন্দ!
ধীরে ধীরে তার শরীর আবার ভারী হতে লাগলো। তার যখন মনে হলো সে আবার তার শরীরের সম্পূর্ণ ভার ফিরে পেয়েছে, তখন সে চোখ খুললো। রুচিরা দেখলো সে যে ভঙ্গিতে বসে ছিল সেই ভঙ্গিতেই রয়েছে, কিন্তু তার চারপাশটা পাল্টে গেছে। সে কোনো একটা জঙ্গলে রয়েছে। দূরে কয়েকটা লোকের শোরগোল শোনা যাচ্ছে। রুচিরা উঠে সেই দিকে যেতে লাগলো।
কাছাকাছি পৌঁছে সে দেখলো, সেখানে কোনো এক্সপেডিশন ট্রুপ ক্যাম্প করেছে। তার ধীরে ধীরে জায়গাটা ইন্দোনেশিয়া মনে হতে লাগলো। একজনকে সে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো, ডঃ পৌলমী বসুর ঠিকানা। লোকটা একটা তাঁবু দেখিয়ে দিলো। রুচিরা সেখানে গিয়ে পৌলমীর নাম ধরে ডাকতেই পৌলমী বেরিয়ে এলো। রুচিরাকে বিধ্বস্ত অবস্থায় তার তাঁবুর সামনে দেখে তো সে অবাক! একে সাত বছর পর দেখা, তায় আবার রুচিরা এত বিধ্বস্ত! রুচিরাকে সে তাঁবুর ভেতরে ঢুকিয়ে বসালো। রুচিরার জন্য সে খাবারের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু রুচিরা তাকে থামিয়ে একটা কথাই বললো, “তোমাকে তোমার বাবার খুব দরকার…” এই বলে সে পৌলমীর ডান হাতের তালুতে পাথরটা দিয়ে তার উপর নিজের হাতটা রেখে মহামৃত্যুঞ্জয় জপ করতে লাগলো। পৌলমী তো হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার বাবার দরকারের কথা ভেবে সে কিছু বললো না। উপরন্তু তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে রুচিরাকে বিশ্বাস করতে বলছিল। আবার সেই একই অনুভূতির মধ্য দিয়ে রুচিরাকে যেতে হলো। পার্থক্য কেবল এইটুকু যে, এবারে সে একা ছিল না।
পুনরায় শরীরের ভার ফিরে পেয়ে তারা যখন চোখ চাইলো তখন দেখলো, এক জটাধারী লাল বস্ত্রপরিহিত অঘোরী একটা ব্যারিকেডকে জূপকাষ্ঠ করে একজনের গলা কাটতে যাচ্ছে উদ্যত খড়্গ হাতে। পৌলমী সেই জটিল পরিস্থিতিতেও তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে চিনতে পারলো।
“বাবা!” পৌলমীর ডাক শুনে অঘোরীবেশে সুধীরবাবু চমকে উঠে তার দিকে তাকালো। তাঁর হাত থেকে খড়্গটা পড়ে গেলো।
এ কী দেখছেন তিনি! যে মেয়ের মৃতদেহ ভক্ষণ করে তিনি দক্ষযজ্ঞে নেমেছেন, সেই মেয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে! রুচিরার হাত ধরে পৌলমী দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে বারিধারা দেখে সুধীরবাবুও নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমার মেয়ে ফিরেছে, সে মৃত নয়! রুচিরা, তুই ওকে ফিরিয়ে আনলি?”
রুচিরা তাকিয়ে দেখলো, জূপকাষ্ঠে যে গলা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে প্রধান পুরোহিত। মানে তারা এই সময়যাত্রা শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে ফিরে গেছে। পুরোহিত মশাইও প্রাণে বাঁচবেন ভেবে সে খুশি হলো। তারপর সুধীরবাবুর দিকে তাকিয়ে বললো, “না স্যার, অতীত থেকে আমি পৌলমীকে এনেছি। আপনাকে এই ঘৃণ্য অপরাধ করার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। আপনার বাড়িতে সেদিন ওটা যে পৌলমী ছিল না, সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। ওই মেয়েটার বাঁপায়ে পাঁচটি আঙুল ছিল। কিন্তু পৌলমীর আছে ছ’টি। ওর একটা অতিরিক্ত কড়ি আঙুল আছে। এছাড়া আজ যখন আপনার সাথে ফোনে আমার কথা হলো, সেটা কিন্তু সাধারণ কলের মতো নয়। আপনি ফোনটা ধরলেন না। মানে নকল পৌলমী ফোনটা ধরলো না। আপনি অলরেডি এখানে তখন চলে এসেছেন। কিন্তু ফোনটা আনেননি, কারণ তাতে আপনার অবস্থান ধরা পড়ে যেতে পারে। আপনাকে সে একটা অন্য ফোন থেকে আপনার নতুন নম্বরে ফোন করে। আপনাকে ফোনে রেখে সে আপনার পুরোনো ফোন থেকে আমাকে ফোন করে ও দু’টি ফোন লাউডস্পীকারে একসাথে ধরে থাকে, যাতে আমার মনে হয়, আপনি আপনার ফোন থেকে আমাকে কল করেছেন। কিন্তু স্যার আপনি এটা কেন করলেন?”
“আজ যে ইতিহাস আবিষ্কারের নেতৃত্ব তুই করছিস, পঁচিশ বছর আগে আমি তার নেতৃত্ব করেছিলাম। কিন্তু গ্রামের মানুষ কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে আমার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। এরপর বহুকাল গেছে, আমি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছি, কিন্তু এই ঘটনা ভুলতে পারিনি। আমি আমার সকল প্রিয়জনকেই হারিয়েছি, কিন্তু যেদিন খবর পেলাম পৌলমী ইন্দোনেশিয়ায় ল্যান্ডস্লাইডে মারা গেছে, সেদিন আর নিজের মধ্যেকার পাশবিক প্রবৃত্তিটাকে ধরে রাখতে পারিনি। আমার মেয়ে যখন মৃত অবস্থায় ফেরে আমার পুরোনো ক্ষতগুলো টাটকা হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে একটা ছিল, কয়েকজনের গোঁয়ার্তুমির কারণে কুকনুরের মহামায়া মন্দিরের রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পারা। তাই সংকল্প নিলাম প্রতিশোধ নেবো তাদের উপর― যারা আমাকে অসামান্য এক আবিষ্কার করা থেকে আটকেছিল। আমার মেয়েকে ভক্ষণ করে নামলাম আমি দক্ষযজ্ঞে! এই মূর্খগুলোর অজ্ঞানতাকে আমি কাজে লাগিয়েছিলাম তোদেরকে দিয়ে মহামায়া মন্দির খনন করিয়ে। আমি এক বছর আগে কুকনুরে এসেছিলাম, কিন্তু বাঙালী প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে নয়, কন্নড় সাংবাদিক হিসেবে। প্রথমে সেই ভবঘুরে অঘোরীকে খুঁজে বের করি। তারপর তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তার বিশ্বাস অর্জন করি ও তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করি। তারপর নিজে আঘোরী সেজে কুকনুরে এসে সে সব লোকগুলোকে খুঁজে বের করি, যারা ২৫ বছর আগে আমার ইতিহাস আবিষ্কারের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল। ইতিমধ্যে আমি সম্মোহনের বিদ্যা ও অঘোরী বিদ্যা অর্জন করি বই পড়ে ও সেখানকার সমস্ত লিখিতি বিধান অভ্যাস করে...” সুধীরবাবু এতদূর অবধি বলে থামলেন।
রুচিরা বললো, “আর এই কারণেই আপনি সেদিন ‘ওয়েসিস অফ স্টিলনেস’ বইটা পড়ছিলেন?”
সুধীরবাবু অন্যমনস্কভাবে মাথা নেড়ে রুচিরার কথায় সম্মতি জানালেন। তিনি আরও যোগ করলেন, “তাই আমি অসুস্থতার নাটক করে তোদের আগে এখানে পাঠাই। আর তাই আমি আমার পৌলমীর মতো দেখতে একটা মেয়েকে পৌলমী সেজে আমার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিই, যাতে কারুর সন্দেহ না হয়। কিন্তু মালতী বুঝে গিয়েছিল। তাই তাকে আমি শাসিয়ে চুপ করে রেখেছিলাম। সে একটু প্যাসিভ এ্যাগ্রেসিভ বিহেভ করছিল বটে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি আর কিছু করতে পারেনি।”
“কিন্তু আর যে সময় নেই সুধীর। এবার তো তোকে এই পথ ছাড়তে হবে। আমার কথায় না হলেও তোর কন্যা এবং কন্যাসম শিষ্যার কথায় তোকে অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরতেই হবে!” রুচিরা, পৌলমী আর সুধীরবাবু চমকে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন অঘোরী ও সুধাকরবাবু এসে দাঁড়িয়েছেন।
সুধীরবাবু অবাক হয়ে বললেন, “অঘোরী! আমি তো তোমাকে হত্যা করেছিলাম। তুমি কী করে আসতে পারো?”
সুধীরবাবু জীবনে কখনও এত ভয় পাননি। বা হয়তো পেয়েছিলেন- যখন বুঝেছিলেন মা আর তেপান্তরের দেশ থেকে ফিরবে না, তাঁর বাবা তাঁর কাছে আছেন কিন্তু পাশে নেই, পিসি পিসেমশাই তাঁকে দেখেন কিন্তু নিজের ছেলের মতো নয়, নেহাতই অসন্তুষ্ট হয়ে মানবিকতার খাতিরে। তাঁর জীবনে একটিই জিনিস তাঁকে সমাজে মান্যতা এনে দিয়েছিল- তাঁর পড়াশুনা। পড়াশোনায় সাফল্যের দরুণই তিনি বঞ্চনার ক্ষত চেপে রেখে জীবনে সপ্রতিভ হতে পেরেছিলেন। তাই যখন কয়েকজন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ তাঁর ইতিহাস আবিষ্কারের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছিল তখন বছরের পর বছর ধরে তাঁর ক্ষতের উপর যে প্রলেপ পড়েছিল তা কি একটু হলেও পাতলা হয়ে যায়নি? তার কিছু মাস পরেই তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল আর এক বিপর্যয়- স্ত্রীর মৃত্যু। পত্নিবিয়োগে কাতর সুধীরবাবুকে তখন বাঁচিয়েছিল তাঁর আট বছরের ছোট্ট পৌলমী। কিন্তু সেই পৌলমীরই ল্যান্ডস্লাইডে ধ্বস্ত মৃতদেহ যখন ইন্দোনেশিয়া তিনি নিয়ে আসেন তখনই সংকল্প নেন যে তাঁর দুর্ভাগ্যের কারণগুলিকে শনাক্ত করে তাদের শাস্তি দিয়ে তিনি তাঁর দুর্ভাগ্যের ভাগীদারদের প্রতি সুবিচার করবেন। আর সেই মুহূর্তেই তিনি তাঁর মধ্যেকার সুপ্ত উইণ্ডিগোকে মুক্ত করে দেন। সেই নরখাদক মানসিকতাই তাঁকে পথ দেখায়। উইণ্ডিগোর মতো তাঁর বরফশীতল হৃদয় ও জিঘাংসা তাঁকে অনুপ্রেরণা দেয় সন্তানের মৃত শরীর ভক্ষণ করে তাকে নিজের মধ্যে আটকে রাখার। তাঁর সন্তান প্রত্যক্ষ করবে তাঁর জেদ ও নিয়তিকে অতিক্রম করার অসামান্য ক্ষমতা! কিন্তু আজ একি অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছেন তিনি?
“কালচক্রের যে মুহূর্তে তুই আমায় হত্যা করেছিস সেই মুহূর্তের পর থেকে আমি হয়তো আর নেই, কিন্তু আমি কালচক্রের অন্য মুহুর্ত থেকে উঠে আসতে পারি, ঠিক যেভাবে তোর মেয়ে এসেছে তার অতীত থেকে। রুচিরা, পৌলমী আর আমি অমৃতলোকের পথে যাতায়াত করেছি আমাদের মনোজাভা রূপে। আমরা আমাদের অসম্পূর্ণ কাজ পূরণ করতে এসেছিলাম। মহাকালীর আশীর্বাদে তা হয়েছে। এবার নিজেদের সময়কালে আমাদের ফিরে যেতে হবে।” অঘোরী বললেন।
সুধীরবাবু থতমত খেয়ে বললেন, “ফিরে যাবে? অসম্ভব! আমি আমার সন্তানকে কোথাও যেতে দেবো না।”
“যেতে আপনাকে দিতেই হবে। এই কালচক্রে আপনি দুষ্টবুদ্ধি, পৌলমী চন্দ্রহাস এবং আমি মদন। আমাকে মাধ্যম করে পৌলমী আপনাকে নবজীবন উপহার দিলো। আপনি কি এখনও বুঝতে পারলেন না সময়কে আমরা যেভাবে বুঝতে শিখেছি তা একটা প্রপঞ্চমাত্র? কালচক্র আসলে ‘স্পেস টাইম কন্টিনিউয়াম’? এই কন্টিনিউয়ামে আমরা যে জায়গাটা নিয়ে থাকি তার আশেপাশে খাঁজ বা ‘ডেন্ট’ সৃষ্টি হয়? এই ডেন্টই আমাদের কর্মফলকে আমাদের সামনে হাজির করে। গ্রহ-নক্ষত্ররাজি এই ডেন্টের ফলেই নিজেদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রকাশ করে।” রুচিরা সুধীরবাবুকে বোঝানোর চেষ্টা করলো।
এবার পৌলমী বললো, “হ্যাঁ বাবা, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি অমৃতলোকের পথ দিয়ে এসেছি। সেখানে মনে হয় ভয়, ক্ষুধা, জরা, ব্যাধি কিচ্ছু নেই। একটা সময় এসেছিল যখন আমার নিজেকে মনে হয়েছিল, সচ্চিদানন্দ! তুমি আমাকে যেতে দাও। তুমিই তো আমাকে সবসময় শিখিয়েছ ‘লিভ অন দ্য এজ’! রুচিরা যেটা বলছে, সেই অনুযায়ী তো আমি তাহলে খুবই কম জায়গা অধিকার করেছি! আমি কিন্তু তোমার কথা রেখেছি। আমি কখন'ই চাই না যে, আমায় ঘিরে কারুর খারাপ পরিণতি হোক।”
রুচিরা এই সুযোগে অঘোরীকে বললো, “আমি যখন গহ্বরে চিত্রগুলো আবিষ্কার করেছিলাম, সেগুলো আমার নতুন খোদাই করা মনে হয়েছিল। উপরন্তু আজ রাত্রে মাটি কেটে আমি যখন সরাই, তখন দেখেছিলাম দক্ষযজ্ঞের ভাস্কর্যের পাশে চন্দ্রহাসের সম্পূর্ণ কাহিনী খোদাই করা। এর তাৎপর্যই বা কী? আর এই ভাস্কর্যগুলো কি আপনারই করা? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে ওগুলো কীভাবে করলেন! আর ভূগর্ভে এই কালী মন্দিরের রহস্য আমার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার হলো না।”
অঘোরী বললেন, “এর রহস্য একদিন তুই নিজেই উদ্ঘাটন করবি। তবে হ্যাঁ, চিত্রগুলো আমারই করা। এবং আমি তা তৈরি করেছি শব্দশক্তি দিয়ে। আমার বিশ্বাস, তুই তারও মানে সময় মতো বুঝে যাবি। পৌলমীকে তার সময়কালে পৌঁছে দিতে হবে। তাড়াতাড়ি কর। মা আবার অজ্ঞাতবাসে ফিরে যাবেন। তিনি আবির্ভূত হবেন ফের দুষ্টবুদ্ধির উৎপত্তি হলে। মহাকালী রূপে তিনি কালচক্রের রক্ষক, আবার মহামায়া রূপে তিনিই কালচক্রের চালিকা। মহাকালী রূপে তিনি মানুষের শিরোশ্চছেদ ঘটিয়ে তার পুরুষের নাশ করেন, পুরুষমেধ ঘটান। তিনি মানুষের মনের সমস্ত ভ্রম ভক্ষণ করে তাকে চিরন্তন সত্যের পথ দেখান। আবার মহামায়া রূপে তিনি জীবাত্মাকে অনুভব করান যে, বিশ্বপুরুষ ও তার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। তাই মহামায়া মন্দিরে পরমাত্মা ও পুরুষোত্তম তথা শিব ও বিষ্ণু হরিহর রূপে বিরাজমান।”
পৌলমী শেষবারের মতো তার পিতাকে আলিঙ্গন করলো, আর তাঁর চোখের জল মুছিয়ে বললো, “আমি মৃত্যুর আগেই অমৃতলোক দেখেছি। পৃথিবীর মায়া আমাকে আর প্রভাবিত করে না। যখনই মনখারাপ করবে, আর তোমার ছোটো বেলার অবহেলার ও বড়ো বেলার নিঃস্বতার স্মৃতি ঘিরে ধরে তোমার মধ্যে পাশবিক প্রবৃত্তির সঞ্চার করবে, তখন আমার কথা ভাববে। আমি যখন আর থাকবো না,তখন রুচিরার মধ্যে আমাকে দেখবে।”
সুধীরবাবু শেষবারের মতো মেয়েকে দেখে নিয়ে তাকে বিদায় জানালেন। তাঁর সান্ত্বনা এটুকুই যে, পৌলমীর ও তাঁর মধ্যে মৃতুলোকে অনতিক্রম্য ব্যবধান তৈরি হলেও অমৃতলোকে তাঁদের মধ্যে যে সংযোগ, তা খণ্ডন করা যাবে না। তাঁর সন্তান বাঁচবে, যদিও সেটা তাঁর দৃষ্টির আড়ালে।
সুধীরবাবু অঘোরীকে বললেন, “আমি আপনাকে হত্যা করেছি। এই অপরাধের শাস্তি আমার প্রাপ্য।”
অঘোরী এক প্রাণখোলা আট্টহাসি দিয়ে বললেন, “কালচক্রে কতবার আমার মানবশরীরের মৃত্যু হয়েছে, তা তুই ভাবতেও পারবি না! তাছাড়া আমার মৃত্যু তোর কাছে এই বার্তার সতর্কবাণী হয়ে থাকবে যে, তুই কত নৃশংস হতে পারিস।”
সুধাকরবাবু সুধীরবাবুকে দায়িত্ব নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। তার আগে সুধীরবাবু ও সুধাকরবাবু প্রধান পুরোহিতমশাইকে সম্মোহিত অবস্থায় তাঁর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এলেন। সুধীরবাবু ম্লান হেসে সুধাকরবাবুকে বললেন, “আশা করি সম্মোহনের প্রভাবে আমি পুরোহিতমশাইকে ভয়াবহ এই রাতের কথা ভোলাতে পেরেছি।”
এদিকে রুচিরা, পৌলমী ও অঘোরী ঐ সুড়ঙ্গ দিয়ে ভূগর্ভে ফিরে এলো। তারপর একই পদ্ধতিতে পৌলমীকে তার সময়কালে পৌঁছে রুচিরা ফিরে এলো।
“তুই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যা। এই সুড়ঙ্গ আবার পরের চক্র শুরু হওয়া অবধি বন্ধ হয়ে যাবে।” অঘোরী বললো।
রুচিরা কিছুক্ষণ অঘোরীর দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কে?”
অঘোরী মুচকি হেসে বললো, “ব্রহ্মার চুলুকের জল থেকে উদ্ভূত হয়ে সপ্তমাতৃকার দ্বারা শিক্ষিত হয়ে আমি যে দায়িত্ব পেয়েছিলাম, তার থেকে এখনও মুক্ত হতে পারিনি। গহ্বরের ধারে পড়ে থাকা চালকিটা দেখে বুঝতে পারিসনি?”
রুচিরা বাকি পথটা কেমন একটা ঘোরের মধ্যে অতিক্রম করলো। সে সুড়ঙ্গ থেকে উঠে আসার পর মহামায়া মন্দিরের মেঝেতে সুড়ঙ্গের পথ এমনভাবে বন্ধ হলো, যেন ওখানে কিছুই ছিল না।
সুধাকরবাবু রুচিরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সুধাকরবাবুর বাড়িতে এসে সে তার ঘরে ঢুকে সেই যে ঘুমোলো, সকাল দশটার আগে তার চোখই খুললো না।
মুখ-হাত ধুয়ে নিচে আসতে সে দেখলো, সুধীরবাবু সবার সাথে গল্প করছেন। ডঃ রঞ্জন সেন রুচিরাকে দেখে বললো, “কী কাণ্ড দেখেছো! ডঃ বোস কাউকে কিছু না জানিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। তবে একটা খারাপ খবর আছে। এই প্রোজেক্টটা নিয়ে পরে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগ উঠতে পারে। তাছাড়া সুধীরবাবু বলছেন, তিনি সুধাকর ও অম্বরীশবাবুর কাছ থেকে কানাঘুষো শুনেছেন যে, ওই অঘোরী এসে কিছু মোড়লমার্কা লোকের সাথে আঁতাত করে রেখেছে আমাদের উপর নজর রাখার। কম সংখ্যায় আমাদের পেলে বা ওদের অগোচরে সাইটে গেলে যেন আমাদের উপর আক্রমণ করতে ওরা পিছপা না হয়।”
ইন্টার্ন তিনজন মনখারাপ করে বসে ছিল। তবে রুচিরা খুশি হলো দেখে যে, নৈঋতের কপালে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। সুধীরবাবু রুচিরার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সেই হাসিতে কৃতজ্ঞতা ও স্নেহ মেশানো ছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন