ঐন্দ্রিলা মুখার্জি
রাতের অন্ধকারে অঘোরী থানার দিকে হেঁটে চলেছে। থানায় পৌঁছে সে দরজায় পাহারারত আধো-ঘুমন্ত কনস্টেবলের দিকে হঠাৎ তর্জনী উঁচিয়ে বললো, “তাকাও আমার আঙুলের দিকে। একবার কাছে যাচ্ছে, একবার দূরে যাচ্ছে। এবার শুধু কাছেই যাচ্ছে। কাছে যাচ্ছে...” তারপর হঠাৎ করে আঙুলটা সামনে থেকে সরিয়ে বললো, “ঘুম যাও...”
কুকনুর ছোট্ট গ্রাম। অপরাধের হারও অনেক কম। তাই রাত্রে কোনোদিনই কড়া পাহারা থাকে না। বড়বাবুও রাত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমোন। তবে আজ এই সময়ে বোধহয় ওনার সতর্ক থাকা উচিত ছিল। অবশ্য উনি হয়তো ভেবে থাকতে পারেন যে, পার্থিব শক্তির বিরুদ্ধে লড়া যায়, কিন্তু অপার্থিব শক্তির বিরুদ্ধে কি আর লড়া যায়! ফলে নিদ্রা বর্জন করার কোন কারণ তাঁর ছিল না।
অঘোরীর সম্মেলনে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো কনস্টেবল। এরপর অঘোরী বললো, “চাবি যার কাছে, তার কাছে নিয়ে চল...”
কনস্টেবল মন্ত্রমুগ্ধের মতো হেঁটে চললো। আর এক কনস্টেবলের কাছে অঘোরীকে নিয়ে গিয়ে থামল সে। তাকেও চকিতে একই পদ্ধতিতে ঘুম পাড়ালো অঘোরী।
এরপর তার কোঁচড় থেকে চাবি বের করে একটা সেলের দরজা খুলে ঢুকল অঘোরী। সেই সেলের ছ'জনই ঘুমন্ত। সেখান থেকে পাঁচজনের ঘুম ভাঙিয়ে বললো, “চ, মহাকাল ডাক দিয়েছেন।”
তারা 'যে আজ্ঞে বাবা' বলে বেরোলো সেল থেকে। তারপর অঘোরীর পায়ে পায়ে হেঁটে চললো মহামায়া মন্দিরের দিকে।
এবারে ছ'জন পৌঁছলো সাইটে। সেখানে যে দু'জন গার্ড ছিল, তাদেরও একই অবস্থা করলো অঘোরী।
তারপর একটা ব্যারিকেডের উপর পাশাপাশি পাঁচ'জনের মাথা রেখে কোপ মারলো একজনের গলায়।
একটা…দু'টো… তিনটে কোপ! অবশিষ্ট যেটুকু মাথা লেগেছিল ঘাড়ে, সে'টুকু হাত দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেললো। তারপর তাড়িয়ে তাড়িয়ে মাথা এবং শরীরের কিছু অংশ ভক্ষণ করতে থাকলো। বাকি চারজন শিকার নিজেদের ভয়াবহ পরিণতির কথা জেনেও নির্বিকার রইল।
কিন্তু অঘোরী যেটা জানতো না, তা হলো, তার আগেই কেউ একজন সাইটে এসে পড়েছে। সে এসেছিল, রাতের অন্ধকারে মন্দির আবিষ্কারের অসমাপ্ত কাজ পূরণের আশায়। ভূগর্ভে নেমে সে আরও চমকপ্রদ কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যে সাক্ষাৎ শয়তানের সম্মুখীন হতে হবে, তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি।
রুচিরা গহ্বর থেকেই টের পেল যে সাইটে কোনো অনাহুত আগন্তুকের আগমন হয়েছে। সেই আগন্তুক এতক্ষণ হিসহিসে গলায় কথা বলছিল, এবং সম্ভবতঃ সে একা নয়। একাধিক লোকের পদধ্বনি রুচিরা শুনতে পেয়েছে।
রুচিরা মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল, বাইরে কী হচ্ছে! এমন সময় ভারী ধাতব অস্ত্র দিয়ে কিছু কাটার আওয়াজে রুচিরা সম্বিত ফিরে পেলো। কিছু একটা তাকে করতেই হবে। রুচিরা স্পষ্ট করে বুঝতে পারল না, কী কাটা হচ্ছে তবে হয়তো অনুমান করতে পারল। দু’টি ধাতব যন্ত্রের ঠোকাঠুকিতে রাত্রির নিস্তব্ধতা খান-খান করে ঘটাং করে খুব জোরে আওয়াজ হলো। এখন ভাবার সময় নয় যে দুর্বৃত্তরা ঐতিহাসিক সামগ্রী চুরি করতে এসেছে না কি সেই নরখাদক তার শিকারের সর্বনাশ করছে! যদি দুর্বৃত্তরা জানতে পারে, দু’ই ক্ষেত্রেই তার যথেষ্ট ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সে সময় নষ্ট না করে সুধাকরবাবুর নম্বর ডায়াল করলো।
তিন-চারবার ডায়াল করার পর সুধাকরবাবুর ফোনটা লাগলো বটে কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি ফোন ধরলেন না।
মধ্যরাত্রি পেরিয়ে গেছে। ঘড়িতে সময় এখন রাত দুটো। কুকনুরকে তার মায়াবী চাদরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে ঘুমের দেশের যাদুকর। এক-একটা মিনিট এক-এক ঘণ্টা মনে হচ্ছে। একবার তার ইচ্ছা হলো, পরিণতির চিন্তা না করেই উপরে উঠে দেখবে কী ঘটছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার দূরদর্শীর কথা মনে পড়লো। আর মনে পড়লো, অসীমের কথা। তারপর তার মা-বাবার মুখটা মনে পড়তেই সে মন দৃঢ় করে সঙ্কল্প নিলো, যে করেই হোক তাকে সুস্থ শরীরে ফিরতেই হবে।
কিন্তু শয়তানের তাণ্ডবকে তো আর প্রশ্রয় দেওয়া যায় না!
রুচিরা বুঝতে পারলো যে, পাহারাদারদের হয় অজ্ঞান করা হয়েছে বা মেরে ফেলা হয়েছে, বা পাহারাদাররাও দুর্বৃত্তদের সাথে হাত মিলিয়েছে।
পদধ্বনি অনেকক্ষণ হলো পাওয়া যাচ্ছে না। কখন থেকে শুধু খ্যাঁচখ্যাঁচ ঘিসঘিস করে শব্দ হয়ে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে চাপা গোঙানীর আওয়াজ। তবে এই গোঙানী বেদনার নয়, এই গোঙানী বিজয়ীর অহঙ্কারজাত। শিকার করার পর বাঘেরা তাড়িয়ে তাড়িয়ে বিজিত শত্রুর মাংসের স্বাদ নিলে যেমনটা শোনায়, অনেকটা সেইরকম!
একদিকে সাক্ষাৎ মৃত্যু, অন্যদিকে নরখাদকের সম্মুখীন হয়ে তার কাছ থেকে তার নারকীয় আচরণের কারণ জানার সুযোগ। উপরন্তু এও হতে পারে যে, কেউ হয়তো বিপদে রয়েছে! সাহায্য করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সাহায্য না করার মতো অমানবিক সিদ্ধান্ত― এই সব ভাবনা-চিন্তা রুচিরার মনকে অশান্ত করে তুললো।
সুধাকরবাবুর ফোন লাগছে না। এবার রুচিরা অম্বরীশবাবুর নম্বরে চেষ্টা করলো। কিন্তু ওনার ফোনটাই বাজলো না। ওপার থেকে যান্ত্রিক গলায় একজন শুধু বললো, ‘সার্ভার আনরিচেবেল’...
এবার রুচিরার মাথায় একটা কথা বিদ্যুৎগতিতে খেলে গেলো। বসুমিত্র বা সৌরসেনীকে তার অবস্থার কথা এবং ব্যবস্থার পরিকল্পনা জানানো যেতে পারে। তাদের হয়তো চোখের পাতা উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠায় এক হতে পারছে না! রুচিরা বসুমিত্রর ফোনে ডায়াল করলো। পরপর তিনবার করতেই তৃতীয়বারে ফোনটা লেগে গেলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন