ঐন্দ্রিলা মুখার্জি
রুচিরা সমস্ত কথাই সুধীরবাবুকে সবিস্তারে জানিয়েছে। সুধীরবাবু অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। একেই তিনি অসুস্থ ছিলেন, উপরন্তু এই খবরে অত্যন্ত বিধ্বস্ত হয়েছেন। ওনার গলাটা বড়ই আস্তে শোনালো। উনি বললেন, “আমি তো ভাবতেই পারছি না, পুরোহিত মহাশয় আর নেই। আমি গতবছর যখন ওখানে গিয়েছিলাম বার্ষিক জার্নালের আর্টিকলটা লেখার জন্য, তখন ভীষণ সহযোগিতা করেছিলেন। অত্যন্ত অমায়িক মানুষ। তোদের অভিযানটাও ভালোই চলছিল। যেটা পেয়েছিলি সেটা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়। তবে আর থাকাটা হয়তো নিরাপদ হবে না। আরও খুন হলে গ্রামের লোকেরা তোদের ছাড়বে না! আমি বরং অভিযান এখানেই বন্ধ করে দিচ্ছি।”
রুচিরা ওপারের কথা শুনে ফোনটা নামিয়ে রাখছিল। অভিযান রদ হলেও তাদের ফিরে যাওয়া এত সহজ হবে না। একটা খুন হয়েছে, আর রুচিরারা সবাই সেই খুনের সন্দেহভাজন। ফোনটা নামিয়ে রাখতে রাখতে মাঝপথে আবার সুধীরবাবুর কথা কানে এলো, “আরও দু'দিন সময় নে। ভেবে দেখ। আর একটা খুন হলে কিন্তু তোদের কোনো রকম ক্ষতি করতে ওরা পিছপা হবে না।”
রুচিরা তার নোটের ডায়েরিতে আজকের ঘটনা সবিস্তারে লিখলো। প্রতিটা তথ্য এখন গুরুত্বপূর্ণ, তা সে যতই ছোটো এবং বিচ্ছিন্ন মনে হোক।
এমনসময় রুচিরার ঘরের দরজায় মৃদু টোকা পড়লো। সৌরসেনী ভেজানো দরজাটা একটু ফাঁক করে মুখ বাড়িয়ে বললো, “ম্যাম, আমরা ভিতরে আসতে পারি?”
রুচিরা সশব্দে ডায়েরি বন্ধ করে বললো, “হ্যাঁ।”
তিনজনে ভিতরে ঢুকলে রুচিরা ঈশারায় তিনজনকে তার স্টাডি টেবিলের মুখোমুখি সোফাটায় বসতে বললো।
নৈঋত বললো, “ম্যাম, রক টেস্টিং-এর রিপোর্ট এসেছে। ওটা নিঃসন্দেহে গ্র্যানাইটের পাহাড়।”
―হুম্। এইটুকু বলতে নিশ্চয়ই আসোনি! রুচিরার মুখে এরকম সরাসরি প্রশ্ন শুনে তিনজনে একটু নড়েচড়ে বসলো।
সৌরসেনীই সাহস সঞ্চয় করে বললো, “ম্যাডাম, আমাদের গবেষণা কি আর হবে না? এটাই আমাদের প্রথম বড় প্রোজেক্ট...”
নৈঋত কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো, “হ্যাঁ ম্যাডাম, কালকের আবিষ্কারের পর কত এক্সাইটেড ছিলাম! ভেবেছিলাম, এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা হবে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হতে চলেছে!”
নৈঋতের এই অকপট স্বীকারোক্তি বাকি দু'জনের বড্ড রূঢ় ঠেকলো। সৌরসেনী নৈঋতকে তার ভুল বোঝাতে কনুই দিয়ে গুঁতো মারলো। গুঁতো খেয়ে নৈঋত ঢোক গিলে চুপ করে নীচের দিকে তাকিয়ে বসে রইলো।
রুচিরা বললো, “মর্মাহত হয়ো না নৈঋত। তোমার হতাশার কারণ আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি এত সহজে হাল ছাড়বো না। আমি পুরোহিত মশাইকে কথা দিয়েছিলাম বিপদ হলে তার শেষ দেখে ছাড়বো।”
রুচিরার এই দৃঢ় সঙ্কল্প বাণী শুনে তিনজনেরই তরুণ রক্ত টগবগিয়ে উঠলো। সৌরসেনী বললো, “আপনি যা বলবেন, আমরা করতে রাজি। প্রাচীন এই রহস্য ভেদ না করতে পারলে আমার মরেও শান্তি হবে না।”
বসুমিত্র বললো, “আমি একটা নোট বানিয়ে এনেছি ম্যাম― ‘অঘোরতন্ত্রে নরবলি ও নরখাদকতার গুরুত্ব’...”
―বেশ! তাহলে আমরা শুনি তুমি কী বলতে চাও!
রুচিরা গম্ভীর মুখে বললো।
বসুমিত্র ডায়েরি থেকে পড়তে আরম্ভ করলো, “অঘোরতন্ত্র অতি প্রাচীন কলা। ঋষিরাজ দত্তাত্রেয়কেই অঘোরীরা তাঁদের আদি গুরু বলে মানেন। ইতিহাসবিদ ব্যারেট বলেছেন, অঘোরতন্ত্রকে ১৭ থেকে ১৮ শতাব্দীর মধ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাবা কিনারাম। তিনি দীক্ষা পেয়েছিলেন ঋষিরাজ দত্তাত্রেয়র কাছে, যিনি তাঁর শরীর থেকে মাংসপিণ্ড কেটে বাবা কিনারামকে ভক্ষণ করতে দিয়েছিলেন। এভাবেই ঋষিরাজ দত্তাত্রেয় ও বাবা কিনারামের মধ্যে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল।
অঘোরীরা মৃতদেহ থেকে নরমাংস ভক্ষণ করে থাকেন। তার কারণ তাঁদের কাছে কিছুই ব্রাত্য নয়। তাঁরা অদ্বৈত তত্ত্বে বিশ্বাসী। তাই তাঁরা সমস্ত বাদ বিচারের ঊর্ধ্বে।
কাজেই আমরা দেখতে পাই, নরখাদকতা অঘোরতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু মোক্ষলাভের লোভে কারুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া অঘোরশাস্ত্রমতে অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। সুতরাং নরবলি আমরা অঘোরতন্ত্রের মূল ধারায় দেখতে পাই না।
নরবলি এক অতি প্রাচীন প্রথা, যার উৎপত্তি যজুর্বেদ থেকে। এই প্রথার আসল নাম ‘পুরুষমেধ’। কোনো ব্যক্তির উপর সমস্ত জাতির ‘পুরুষ’, অর্থৎ ধ্যান-ধারণা আরোপিত করে তাকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করাই ছিল পুরুষমেধ। তবে সেই ব্যক্তিকে সম্ভবতঃ তখন হত্যা করা হতো না। পুরুষমেধ-র উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো ধ্যান-ধারনা বিসর্জন দিয়ে নতুন ধ্যান ধারণাকে বরণ করা। পুরুষমেধ আজকের নরবলি-র রূপ ধারণ করেছে অনেক পরে...”
বসুমিত্রর কথা শেষ হলে সে ডায়েরি থেকে মুখ তুলে দেখলো, রুচিরার মুখ প্রসন্ন এবং তার চোখ চকচক করছে।
রুচিরা বললো, “অসাধারণ বসুমিত্র। আমাদের এই অন্তর্দৃষ্টিরই প্রয়োজন পুর্বপুরুষদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য। পুরুষ হলো 'পার্সেপ্শন' আর পরমপুরুষ হলো 'কন্স্যাসনেস্'! তাই পার্সেপ্শন অফ কন্স্যাসনেস্ থেকেই আসে 'এসেন্স অফ সেল্ফ'।”
রুচিরার উৎসাহ পেয়ে তাদের রোমাঞ্চ চরম পর্যায়ে পৌঁছলো। তারা পারলে সেই রাতের অন্ধকারেই খননকার্য করতে চলে যায়...
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন