ঐন্দ্রিলা মুখার্জি
রুচিরারা আজ সকালেই কুকনুর পৌঁছেছে। প্রথমে প্লেনে করে হুবলি এয়ারপোর্ট, তারপর গাড়ি করে কুকনুর গ্রাম। ছোট্ট এই গ্রামে মাত্র ১৮,০০০ লোকের বসবাস। বেশ একটা পুরোনো দিনের ছোঁয়া আছে। আর রুচিরাদের এই অভিযান গ্রামটাকে আরও রহস্যময়ী করে তুলেছে।
মন্দিরে পৌঁছলে প্রধান পুরোহিত তাদের দেখে যে খুশি হলেন না, তা বলাই বাহুল্য। মধ্যস্থতা করার দক্ষ লোক, মিঃ অম্বরীশ জাটকর উপস্থিত ছিলেন। তিনি আগেই গ্রামের কয়েকটা লোককে রাজি করিয়েছেন। তারাই এখন গ্রামের প্রধান। সুতরাং তারাই বাকিদের বুঝিয়ে দেবে। প্রধান পুরোহিতকে তারা রাজি করিয়েছে, কিন্তু তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সুতরাং এবার রুচিরাদেরই এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।
রুচিরা বললো, “মহাশয়, আপনার চিন্তার কারণ আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা কথা বলুন, এই ভয়ের শিকার হয়ে কি ভারতের ঐতিহ্য অন্বেষণকে আটকে রাখা উচিত? বিদেহী আত্মাদের আটকে রাখার বা মুক্তি দেওয়ার তো বহু উপায় শাস্ত্রে বলা আছে। আমি আপনাকে কথা দিলাম, অঘটন যদি কিছু ঘটে, আমি দুষ্কৃতীকে তার সঠিক জায়গায় না পাঠিয়ে ছাড়বো না, তা সে সদেহী হোক বা বিদেহী।”
রুচিরার বলা কথাগুলো অম্বরীশ পুরোহিতকে কন্নড় ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন এবং এও বললেন যে, যারা এই ঐতিহ্য অন্বেষণে এসেছেন তাঁরা যে কেবল পাশ্চাত্য শিক্ষায় পারদর্শী তা নয়, তাঁদের শাস্ত্রজ্ঞানও প্রখর। পুরোহিত চাইলে তাঁদের পরীক্ষা নিতে পারেন।
পুরোহিতমশাই হেসে বললেন, “আমি পরীক্ষা নেওয়ার কে? আমার কাছে না হয় ওনারা নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করলেন, কিন্তু তাতে কি দৈবিক অঘটন ওনারা আটকাতে পারবেন? আপনারা ভাবছেন আমি অহংকারবশতঃ আপনাদের বাধা দিচ্ছি, কিন্তু তা নয়! এই গ্রামের ও দেশের হিতসাধনেই আমি এই কাজে বাধা দিচ্ছিলাম। তাই আপনাদের বিশ্বাস করে ও নিজের উদ্দেশ্য প্রমাণ করার স্বার্থে আমি সরে দাঁড়াচ্ছি। কিন্তু এই কাজে আপনাদের বাধা দিতে পারেন আরেকজন, অঘোরী বিভূতিচন্দ্। তিনি পঁচিশ বছর আগে এই কাজে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। কোনো দৈববলে তিনি আবারও কুকনুরে কাল ফিরে এসেছেন, ২৫ বছর পরে...”
রুচিরা কন্নড় বলতে না পারলেও মোটামুটি বুঝতে পারে। বিজয় বিট্ঠল নিয়ে গবেষণা করতে সে আগেও কর্নাটকের এসেছে। তাই পুরোহিতমশাইয়ের বলা কথাগুলো রুচিরাকে আর বুঝিয়ে দিতে হল না। রুচিরারা ওনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে কাজে হাত দিলো। পুরোহিতমশাইয়ের পুজো করতে কোনো বাধা নেই, তাও প্রতিশ্রুতি দিলো।
রুচিরারা খননকার্য শুরু করলো পরেরদিন ভোর ছ'টায়। রক টেস্টিংটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্যান্ডস্টোন বা গ্র্যানাইট পেলে কাজ কিছুটা অগ্রসর হবে। কারণ মহাভারতের যুগের মন্দির যখন, তখন পাহাড়ের গা কেটেই সম্ভবতঃ তৈরি হয়েছিল। আর পাহাড়ের দেওয়াল পাঁচিলের গা ঘেঁষে থাকবে, সেটা আন্দাজ করাই যায়।
সেই অনুযায়ী পাঁচিলের ধার ঘিরে খনন শুরু হলো। অনেকটা খুঁড়তে হবে মন্দির প্রাঙ্গন উদ্ধার করতে গেলে, অন্ততঃ ১৫০ ফিট, তার বেশি বই কম নয়।
খননকার্য চলাকালীন রুচিরার একটা কথা মনে হলো, মহামায়া মন্দিরের অনতিদূরে নবলিঙ্গ মন্দির অবস্থিত। সেখানকার শিবলিঙ্গগুলি উত্তরমুখী। এটা তো সম্ভব যে, সেই শিবলিঙ্গগুলি কালী মন্দিরের সম্মুখে অবস্থিত ছিল! তাই কালীমূর্তি ছিল দক্ষিণমুখী, আর সেই ইতিহাসকে রক্ষা করতেই বর্তমান মহামায়া মন্দিরের মূর্তিগুলি দক্ষিণমুখী!
শাস্ত্রমতে দক্ষিণমুখী মূর্তি বেশি শক্তিশালী হয়!
চিন্তায় ছেদ পড়লো নৈঋতের ডাকে, “ম্যাডাম, পাথরের দেওয়াল পাওয়া গেছে। সম্ভবতঃ গ্র্যানাইট।”
রুচিরা দৌড়ে গেলো দেখতে। ১০০ ফিট খোঁড়া হয়ে গেছে। রুচিরা ঘড়ি দেখে বুঝলো ন'ঘণ্টা হয়ে গেছে খননকার্য শুরু হয়েছে। পাথরটা ভালো করে পরীক্ষা করে রুচিরা বললো, “দেখে মনে হচ্ছে গ্র্যানাইট। ভেরি গুড নৈঋত। ছেনির দাগও আছে। ছবি তোলো সৌরসেনী। রক স্যাম্পল টেস্ট করতে পাঠাতে হবে। এগুলো ছেনির দাগ কিনা তাও নিশ্চিত করতে হবে...”
সাড়ে চারটে নাগাদ সবাই বাসায় ফিরে এলো। বাসা মানে হোম-স্টে। বিত্তশালী এক ব্যক্তির বাড়িতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁর নাম সুধাকর উপাধ্যায়। তিনতলা বাড়ি; উপরতলায় তিনি তাঁর পত্নী, ছ'বছরের পুত্রসন্তান ও মা-বাবার সঙ্গে থাকেন। মাঝের ও নীচের তলায় চারটে চারটে করে আটটা গেস্টরুম। সেখানেই কুড়িজন মিলে সুবিধা মতো আছে।
রাত্রে ফোনে রুচিরা সুধীরবাবুকে সমস্ত আপডেট দিলো।
কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে সাইট। 'প্রোফেশনল সিকিউরিটি গার্ড' রাখা হয়েছে এক নামী সংস্থা থেকে। কিন্তু এত কিছু করা সত্ত্বেও একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো।
সকালে একটা মর্মান্তিক খবর এলো। তখন পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ বাজে। রুচিরারা বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় একজন গার্ড ছুটতে ছুটতে এসে বললো, “ম্যাডাম, প্রধান পুরোহিতের দেহ...” তারপর দম নিয়ে বললো, বিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে...
সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে দেখলো, পুরোহিতের দেহ সাইটের চারদিকে দেওয়া ব্যারিকেডগুলোর মধ্যে একটার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। মুখ আর কী করে বলবে? মাথাটা ছিঁড়ে পড়ে রয়েছে পাশে। বাঁচোখটা ওপড়ানো। নাকটা খাওয়া। তলার ঠোঁট থেকে বাঁদিকের গাল পুরোটা খাওয়া। শরীরের নানা জায়গা খুবলে-খুবলে খাওয়া। লাল আধ-ছেঁড়া ধুতি রক্তে আরও রাঙা হয়ে রয়েছে। চুলের ধরণ আর গলার পৈতে দেখে ওনাকে শনাক্ত করা হয়েছে।
ডঃ রঞ্জন সেন অনর্গল বকে চলেছেন পাহারাদারদের, “আপনাদের নাকের ডগা দিয়ে কী করে হয়ে গেলো এত বড়ো সর্বনাশটা? একটা হিংস্র জন্তু এই কাজটা করে গেলো, আর আপনারা কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না? না গর্জন পেলেন, না আর্তনাদ! এই ঢপটা কি বিশ্বাসযোগ্য? একটা প্রাণ চলে গেলো। গ্রামের মানুষ আর আমাদের কাজ করতে দেবে, ভেবেছেন?”
রুচিরা এই সময় আশপাশটা খতিয়ে দেখছিল। এবার সে বললো, “এ'কাজ হিংস্র জন্তুর নয় রঞ্জনদা, এ'কাজ মানুষের। খুবলে খাওয়া জায়গাগুলো দেখুন! মাংসখেকো জীবের মধ্যে এত ছোটো দন্তপাটি কেবল মানুষেরই হতে পারে। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দেখুন, ব্যারিকেডের মাথাটা ব্যবহার করা হয়েছে জূপকাষ্ঠ হিসেবে। ব্যারিকেডের মাথায় শুকিয়ে যাওয়া রক্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে তৈরি হওয়া খাঁজগুলোতে আটকে রয়েছে। ব্যারিকেডের মাথায় একাধিক খাঁজ রয়েছে। মানে কোনো ভারী ধারালো অস্ত্র দিয়ে বারবার আঘাত করা হয়েছে; যাতে মনে হয়, কোনো জন্তু তার দাঁতের আর নখের সাহায্যে মাথাটাকে ছিঁড়েছে। এ যে কারুর পরিকল্পনা আমাদের গবেষণা বন্ধ করার জন্য! কিন্তু সে কি সুস্থ? সুস্থ মানুষ কি নরখাদক হতে পারে, তাও আবার কেবল একটা গবেষণা আটকানোর জন্য!”
সবাই স্তম্ভিত! এ যে নৃশংসতার চূড়ান্ত! অম্বরীশ ঢোক গিলে বললো, “পারে ম্যাডাম, যদি সে অঘোরী হয়...”
স্থানীয় পুলিশ থেকে কেস গিয়েছে উপর মহলে। পুরোহিতের নির্মম হত্যা, রহস্যময় খুনি এবং এ. এস. আই-এর ব্যাপারটাতে জড়িয়ে থাকা― একেবারে যাকে বলে হাই প্রোফাইল কেস।
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলো দু'দিন পরে, মানে অভিযানের পঞ্চম দিনে। তাতে রুচিরার কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। এছাড়াও রিপোর্ট বলছে, পুরোহিত মশাইয়ের মৃত্যু হয়েছে রাত বারোটা থেকে একটার মধ্যে।
গ্রামে তখন গভীর রাত। স্বভাবতই নরখাদককে কেউ দেখেনি। এমনকি, পুরোহিতকে ঘর ছেড়ে বেরোতেও দেখা যায়নি। পুরোহিত মশাইয়ের ছেলে সকালে উঠে দেখে, তিনি বাড়িতে নেই। তারপর খবর নিয়ে সে জানতে পারে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা। তারপর থেকেই প্রত্নতত্ত্ববিদদের প্রতি সে তার রাগ-ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছে। এই দু'দিনে গ্রামের বহু লোকই রুখে দাঁড়িয়েছে রুচিরাদের বিরুদ্ধে। তারা এখনও মুখে কিছু বলছে না কারণ গ্রামপ্রধানরা রুচিরাদের পক্ষেই রয়েছে। অন্দরে অন্দরে গুঞ্জন উঠেছে যে, গ্রামপ্রধানরা মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে চুপ করে রয়েছে।
অঘোরীর খোঁজ চলছে। কিন্তু সে যেন কর্পূরের মত উবে গিয়েছে! পুলিশ খোঁজ নিয়ে দেখেছে অঘোরী বিভূতিচন্দ্ কোথা থেকে এসেছেন, তা কেউ জানে না। কিন্তু গত পঁচিশ বছর ধরে তিনি কর্নাটকের গ্রামাঞ্চলেই ঘুরে বেরান। যদিও মানুষের সান্নিধ্যে তিনি খুব একটা থাকেন না। বেশিরভাগ সময়ই তিনি থাকেন জঙ্গল বা গিরিবর্ত্মের কোনো অজানা গুহায়। তাঁকে সবাই বেশ ভক্তি করে।
কিন্তু গত একমাস ধরে তাঁকে কেউ দেখেনি। তবে গত তিনদিন আগে তাঁকে কুকনুরে দেখা গিয়েছিল। এমনকি তিনি গ্রামের শেষপ্রান্তে যে বটগাছ― সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন আবার তাঁর কোনো হদিশ নেই।
যেদিন রুচিরাদের কাজ শুরু হয়েছে, সেদিন সন্ধ্যা থেকেই অঘোরী উধাও। উপরন্তু রুচিরার মনে আরও একটা প্রশ্ন দানা বেঁধেছে... তাদের আসার খবর গোটা গ্রাম জানতো, আর অঘোরীও তাদের আসার আগের দিনই এসেছিল। তাহলে সে একবারের জন্যও তাদের বাধা দিতে এলো না কেন!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন