ঐন্দ্রিলা মুখার্জি
রুচিরা ১৫০ ফুটের এ্যালুমিনিয়ামের মই চড়তে শুরু করলো ১৫০ ফুট মই অতিক্রম করা বড়ো সহজ কথা নয়। যাতে শব্দ না হয় তাই সে জুতো খুলে হাতে নিয়ে নিয়েছে। জুতোর ফিতেগুলো বাঁহাতের কনুইতে বেঁধে ঝুলিয়েছে যাতে হাতটা অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়। মই দিয়ে চাপতে চাপতে তার বেশ ক্লান্ত লাগছিল। সন্ধ্যা থেকে পেটে বিস্কুট আর চা ছাড়া আর কিছু পড়েনি। কৌতূহল নিবারণ করতে এসে তাকে যে এরকম বিপদে পড়তে হতে পারে, তা সে কল্পনা করেনি। অবশ্য বিপদ যে হতে পারে তা কি রুচিরার একেবারে অজানা ছিল?
সকালে পাহাড়ের গায়ে উৎকীর্ণ চিত্রগুলো দেখে তার সন্দেহ হয়েছিল। যে ভাস্কর্য যত পুরোনো তা তত মসৃণ। হাত বোলালে পুরোনো ভাস্কর্যের মসৃণতা টের পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের আবিষ্কৃত ভাস্কর্যগুলি খুব একটা মসৃণ ছিল না। সেগুলোতে ছিল সদ্য সৃষ্ট ভাস্কর্যের মতো একটু অমসৃণতা। সময়ের সাথে সাথে ভাস্কর্যের গা ক্ষয়ে গিয়ে সীমাসূচক রেখাগুলি অনেক ভোঁতা হয়ে যায়। ফলে গলা ও কাঁধের মাঝের জায়গাটির তীক্ষ্ণতা, নাক ও গালের মাঝের খাঁজটির তীক্ষ্ণতা, ঠোঁট ও চোয়ালের মাঝের খাঁজগুলির তীক্ষ্ণতা ইত্যাদি হ্রাস পায়। ফলে সময়ের সাথে সাথে ভাস্কর্যের সীমাসূচক রেখাগুলির সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেলেও পরের দিকে তা এতই ভোঁতা হয়ে যায়, যে চোখ নাক ও মুখের তীক্ষ্ণতা নষ্ট হয়ে যায়। উপরন্তু বছরের পর বছর ধরে ভূগর্ভে অন্তর্নিহিত ভাস্কর্যে মাটি এই সংকীর্ণ জায়গাগুলিতে এমনভাবে আটকে যায় যে, তা সহজে সরানো যায় না। কিন্তু এই ভাস্কর্যগুলি থেকে মাটি অতি সহজে ঝেড়ে ফেলা গেছে। ভাস্কর্যগুলিতে প্রাচীন ভাবনা-চিন্তার ছোঁওয়া থাকলেও, রুচিরার চোখে কালের অনুপাতে তারা যথেষ্ট নবীন ঠেকেছিল।
তাই রুচিরা সন্ধ্যাবেলা জলখাবারের পরে সকলের চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল। তাকে বেরোতে দেখেছিল, একমাত্র সুধাকরবাবুর বাড়ির দারোয়ান। সে নেহাতই সান্ধ্য হাওয়া খাওয়ার নাম করে প্রথমে বাগানে দারোয়ানের সাথে কিছুক্ষণ খোসগল্প করলো। তারপর দারোয়ান সুধাকরবাবুর ডাকে ভেতরে গেলে সেও ভেতরে ঢোকে। সুধাকরবাবুকে সামনে দেখে ওনার সাথে কুশল বিনিময় করে নিজের ঘরে যায়। এবার কী করে বেরোবে যেই না ভাবছে, অমনই অকস্মাৎ সুযোগটা হাতে এসে যায়। সুধাকরবাবু দারোয়ানকে কিছু একটা আনতে পাঠিয়ে নিজের ঘরের দিকে ফিরে যান। রুচিরা ঘরের চাবি পকেটে পুরে ভেতর থেকে ডোরনবের লকটা চেপে দিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা টেনে দেয়। তবে এখানেই আসল ব্যাপার। রুচিরা একটা ঝুঁকি নিয়েছিল। সুধাকরবাবুর ঘরের দরজাটা খোলার আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে প্রহর গোনে। মোটামুটি চটজলদি হিসেব কষে সে সুধাকরবাবুর দরজা বন্ধ করার সাথে সাথেই নিজের দরজাটা বন্ধ করে। তার ঘরের দরজা বন্ধ করার আওয়াজের সাথে সুধাকরবাবুর দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ মিশে গিয়েছিল। বাকিটা সহজ ছিল। দারোয়ান সদর দরজা ভেজিয়ে রেখে গিয়েছিল। গেটও খোলা ছিল। এদিক-ওদিক তাকাতেই সে দেখতে পেলো যে, অনতিদূরের দোকান থেকে দারোয়ান মশা তাড়ানোর ওষুধ কিনছে। সে রুচিরার দিকে পেছন ফিরে ছিল। রুচিরা হনহন করে পা চালিয়ে রাস্তার বাঁক দিয়ে ঘুরে গেলো। চুপিসারে কাজ করাতে সে অভ্যস্ত নয়। তাই তার কাজটা যে এভাবে সমাধান হয়ে যাবে সে ভাবেনি।
বাকিটা আরও সহজ ছিল। স্বাভাবিক কারণেই সাইটের গার্ডরা তার কাছে কৈফিয়ত চায়নি।
জোরালো টর্চের আলোয় পাথরের গায়ে উৎকীর্ণ ভাস্কর্যগুলিকে সে পরীক্ষা করছিল। তার সন্দেহ নিশ্চিত করার কোনো উপায় আপাতত নেই। কিন্তু আজ যা ঘটেছে, তার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ থাকতে হবে। তারা তিনজনে মিলে এই ব্যাসের সমস্ত দৈর্ঘ্য আয়ত্তে আনতে পারেনি। তাই সে বাকি জায়গার মাটি সাইটে পড়ে থাকা একটা শাবল দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগল। নেহাতই পরিশ্রম ও মনের জোরের কাজ। কষ্ট হলেও রুচিরা কাজ চালিয়ে গেলো। সত্যান্বেষণের আনন্দের কাছে সব কষ্টই লাঘব ঠেকছিল তার।
যাই হোক, আগন্তুকের হানা টের পেয়ে একসময় রুচিরা গহ্বরের উপরে পৌঁছলো। একেবারে গহ্বর থেকে বেরিয়ে না এসে আগে সে এদিক-ওদিক দেখে নিলো। কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর চাঁদের ক্ষীণ আলোয় সে বুঝতে পারলো, ব্যারিকেডের ওপারে কিছু একটা হচ্ছে। একাধিক লোক দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। একজন মাটির উপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা কোনো বস্তুকে আঁচড়াচ্ছে, কামড়াচ্ছে আর চাপা গর্জন করছে। তার পাশে ধারালো কোনো অস্ত্র পড়ে রয়েছে, যা থেকে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। একটা অজানা আশঙ্কায় রুচিরার বুক কেঁপে উঠলো।
দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতন মহামায়ার মন্দিরের দিকে চেয়ে আছে। নরপিশাচটা না হয় তার শিকার নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু বাকিদের নজর তো এড়িয়ে যেতে হবে। আচ্ছা ওরা কেমন একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে না! কোমর থেকে পায়ের পাতা অবধি সোজা। কোমরের উপরের অংশটা এমনভাবে বেঁকে আছে যে, গলাটা ব্যারিকেডের উপর রয়েছে। সর্বনাশ! এরা সবাই নরখাদকের শিকার হতে চলেছে। তাই জূপকাষ্ঠে গলা রেখে তারা তৈরি। তারা যে এতক্ষণ এরকম অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যে কোনো সাধারণ মানুষের অসুবিধা হওয়ার কথা। কিন্তু ওদের হচ্ছে না। তবে কি ওরা সম্মোহিত?
এবার রুচিরার কাছে কারণটা স্পষ্ট হলো যে, কী করে নরপিশাচ এত নিঃশব্দে তার প্রথম শিকার ধরেছিল! সম্ভবতঃ সাইটের গার্ডদেরকেও সে তার অসামান্য সম্মোহন শক্তি দ্বারা নিদ্রিত রেখেছে।
যাই হোক, রুচিরা গহ্বর থেকে উঠে এসে গুটি গুটি পায়ে মন্দিরের দিকে এগোতে লাগলো। তার পরিকল্পনা, সে মন্দিরের সাইডের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকবে। তারপর কিছু একটা করা যাবে। মোট কথা এই লোকগুলোকে নরখাদকের হাত থেকে কোনো ভাবে বাঁচাতে হবে। নরখাদক রুচিরার দিকে পেছন ফিরে ছিল। তবে রুচিরা তার ঝলক দেখতে পেয়ে গেছে। কোমরে লাল বস্ত্রখণ্ড পরিহিত, বিভূতিভূষিত জটাধারী এক অঘোরী। রুচিরা তার কোমর সমান উঁচু ব্যারিকেডটা সহজেই পেরিয়ে গেলো। আটজোড়া চোখ তার দিকে চেয়ে থাকলেও কেউ তাকে আটকাতে এলো না।
রুচিরা আন্দাজ করেছিল, মহামায়া মন্দিরের কোনো না কোনো দরজা খোলা থাকবে। এটা নেহাতই আন্দাজ, কিন্তু তার পিছনেও যথেষ্ট কারণ আছে। রুচিরার সুধাকরবাবুকে সন্দেহ করার কারণটা এর সাথে জড়িত। আসলে সে গত রাত্রে এবং তার আগের রাত্রে সুধাকরবাবুকে রাত বারোটার সময় বাড়ি থেকে বেরোতে দেখেছিল। যেদিন থেকে তাদের কাজ শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তার ব্যস্ততা ও উত্তেজনায় রাত্রে ঘুম আসছে না। প্রথম দিন রাত ১টার সময় সে কারুর ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ পেয়েছিল। তারপর কারুর পদধ্বনি শুনেছিল তিনতলা থেকে দোতলায় নামতে। প্রত্যেকের ঘরেই এ্যাটাচড বাথ আছে। সুধাকরবাবু ও তাঁর স্ত্রী শুতে যাওয়ার আগে প্রত্যেকের ঘরে জলের বোতল ও গ্লাস ভর্তি করে দিয়ে যান। সুতরাং একান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কাউকেই ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে যেতে হবে না।
পদধ্বনি দোতলা থেকে একতলায় নামলে সে সজাগ হয়ে শুনতে থাকে। ক্রমে সে নিঝুম রাতে বাড়ির সদর দরজা ও সিংহদুয়ার খোলার আওয়াজ পায়। করিডোরে কেউ নেই বুঝে সে দরজা খুলে ঘর থেকে বেরোয়। খুব হালকা হলেও স্পষ্টত সে ঠাওর করতে পারে যে ধুপ ও ধুনোর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরেরদিন সকালে পুরোহিতের মৃত্যুর খবর শুনে যখন সে মন্দির চত্বরে আসে, তখন তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে মন্দিরে যেতে ঈঙ্গিত করেছিল। এবং সেখানে গিয়ে সে স্পষ্টত চড়া ধুনোর গন্ধ পেয়েছিল। বাকিরা হয়তো মন্দিরে ধুনোর গন্ধ অতি স্বাভাবিক ভেবে এই ঘটনাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু রুচিরা আগের রাতের ঘটনার সাথে এর যোগাযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারছিল না। পরের দিন রাত্রে সে আরও সজাগ ছিল। সে দরজা ভেজিয়ে রেখেছিল, যাতে এই রহস্যজনক পদশব্দের মালিক একতলায় নামলে সে দরজা খুলে তাকে শনাক্ত করতে পারে। তার সন্দেহ ছিল যে এই রহস্যময় ব্যক্তি সুধাকরবাবু স্বয়ং। কারণ ঘরের সদর দরজার চাবি তো তাঁকে ছাড়া আর কারুর কাছে নেই! তাই সে রাত্রে পরিকল্পনা মতো কাজ করলে যা দেখতে পায়, তাতে তার আর কোনো সন্দেহ থাকে না। রুচিরা দেখে সুধাকরবাবু সেদিন রাত্রেও ধুনোর হালকা গন্ধ ছড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আজ সকালে সে না কেবল মন্দিরে ধুনোর গন্ধ পেয়েছে, উপরন্তু মন্দিরের সাইডের দরজার সামনে সে যে পায়ের ছাপ দেখেছে, তা হুবহু সাইটে তৈরি সুধাকরবাবুর চটির ছাপের সাথে মিলে যাচ্ছে। কাজেই এই দরজা দিয়েই যে সুধাকরবাবু রাত্রে মন্দিরে প্রবেশ করেন তাতে তার কোন সন্দেহ থাকে না। আর আজ রাতে যখন সে গহ্বরের মধ্যে ছিল তখন পিছনের পাঁচিলের দিক থেকে সে মৃদু পদধ্বনি পেয়েছিল। কাজেই সুধাকরবাবু যে আজও তাঁর নৈশ অভিযানে এসেছেন সে বিষয়ে রুচিরা একপ্রকার নিশ্চিত ছিল বলা চলে।
রুচিরা আস্তে করে মন্দিরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। ঢুকতেই সে এক ভারী অদ্ভুত দৃশ্য দেখে। মহামায়ার বেদীর সামনে অনেকটা চৌকো মতো জায়গা হাঁ হয়ে আছে। যেন তা ভূগর্ভে অন্তর্নিহিত কোনো সুড়ঙ্গের শুরু। সে একটু দো-টানায় পড়ে গেলো, তার কি সুড়ঙ্গ বেয়ে নিচে যাওয়া উচিত, নাকি নরপিশাচের নারকীয় তাণ্ডব থামানো উচিত?
রুচিরার মাথায় একটা বুদ্ধি খেললো। জোরে শব্দ করলে সম্মোহনের প্রভাব অনেক সময় কেটে যায়। উপরন্তু নরপিশাচ ভয়ে পালাতেও পারে। যে শাবলটা দিয়ে সে এতক্ষণ খোঁড়াখুঁড়ি করছিল, সেটা দিয়ে সে জোরে আওয়াজ করবে বলে যেই না মন্দিরের দেওয়ালে মারতে যাবে অমনই একটা রুদ্রাক্ষ পরা হাত তার হাতটা চেপে ধরল। রুচিরা লোকটার দিকে তাকাতেই তার সারা শরীর হিম হয়ে গেলো। এ তো সেই অঘোরী!
অঘোরী কন্নড় ভাষায় যা বললেন, তার মানে বাংলায় করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, “ভুল করছিস মা। এ যজ্ঞ তোকে ছাড়া সম্পন্ন হবে না। তোর সত্যান্বেষণের ইচ্ছা তোকে যে পথে নিয়ে এসেছে তার শেষটা দেখবি না?”
রুচিরা মুখে কিছু বলতে পারলো না। কিন্তু তার অঘোরীকে বিশ্বাস করার এক অদম্য ইচ্ছা জেগেছে। সে শুধু আলতো করে ঘাড় নাড়লো। অঘোরী তার হাত ছেড়ে দিয়ে অন্ধকারে সুড়ঙ্গের দিকে হেঁটে চললো। রুচিরাও তাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করলো।
সুড়ঙ্গ কতটা গভীর তা রুচিরার ঠিক ঠাওর হলো না। কিন্তু সে সব ভয় ও ক্লান্তি ভুলে অঘোরীকে অনুসরণ করে চললো। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছে সে যা দেখলো, তাতে অন্য কারুর হয়তো হাড়হিম হয়ে যেত। কিন্তু রুচিরার মনে আনন্দের শিহরণ খেলে গেলো। তার সামনে অন্ততঃ ২০ ফুট উঁচু এক কালীমূর্তি! তাঁর চারটি হাত― এক হাতে খড়্গ, এক হাতে নরমুণ্ড, এক হাতে অভয়মুদ্রা ও আরেক হাতে মাটির সড়া, যেটাতে নরমুণ্ডের রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। তাঁর বাম পা মাটিতে শায়িত মহাদেবের বুকের উপর। তবে তাঁর মুখে আছে মাতৃসম স্নিগ্ধতা এবং যোদ্ধাসম দৃঢ়তা। তিনি বামাকালী― জ্ঞান ও মোক্ষের প্রতীক। বাঙালীরা যাঁকে ডেকে থাকে 'শ্মশান কালী' বলে।
“তার মানে মন্দির আছে, এবং সেখানে পুজোও হয়! কিন্তু এত বছর ধরে কেউ এর ব্যাপারে জানে না কেন?” রুচিরা বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞেস করলো।
“কারণ মন্দির আছেও, আবার নেইও...” অঘোরী কৌতুকের স্বরে উত্তর দিলো।
রুচিরা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকালে তিনি বললেন “সব বুঝিয়ে বলছি।”
আরেকটু এগোতে রুচিরা লক্ষ্য করলো, কালীমূর্তির সম্মুখে হোমাগ্নি জ্বলছে ও সেই জ্বলন্ত অগ্নির সামনে সুধাকরবাবু চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। রুচিরা তাঁকে ডাকতেই তিনি চোখ খুললেন, ও বিস্মিত হয়ে রুচিরাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি?”
রুচিরা সুধাকরবাবুকে বললো, “আপনি এই মন্দিরের কথা জানতেন? তাই আপনি ধুনো নিয়ে প্রতিদিন রাত্রে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই মন্দিরে আসতেন পুজো করতে! তাহলে আজ সকালে আমাদের মন্দির আবিষ্কারের প্রমাণ পাওয়াতে আপনি যে বিস্ময় প্রকাশ করলেন, তা কি নেহাতই নাটক ছিল?”
এবার সুধাকরবাবু বিচলিত হয়ে আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “না ম্যাডাম বিশ্বাস করুন, আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না এই মন্দিরের বাস্তবিকতা সম্বন্ধে। আমাকে অঘোরী বাবা যা বলেছেন, আমি তাই করেছি। আপনাদের আসার দু'দিন আগে উনি আমার বাড়িতে আসেন। ওনার মধুর হাস্য ও স্নিগ্ধতায় আমরা প্রভাবিত হয়েছিলাম। উনি আমায় বলেছিলেন, কালচক্রে দুষ্টবুদ্ধি পুনরায় জেগে উঠেছে। তবে তাকে দমন করার জন্য চন্দ্রহাসও আসবে। আর এই ঘটনাচক্রে আমার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুষ্টবুদ্ধি তার পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে। আমাদেরও তৈরি হতে হবে। যেদিন মন্দিরের খননকার্য শুরু হবে, সেইদিন রাত্রে ২টোর সময় আমি যেন পূজার সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত থাকি মহামায়া মন্দিরে।”
তারপর তিনি দম নিয়ে আবার বললেন, “প্রথম রাত্রে অঘোরীর সঙ্গে পুজো করে বেরিয়ে আমিই প্রথম প্রধান পুরোহিতের দেহ আবিষ্কার করেছিলাম! সে দৃশ্য আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। প্রধান পুরোহিতের নৃশংস পরিণতির পর আমার জেদ চেপে যায়। মনে হয়, যে অঘোরী আমার বাড়িতে এসেছিলেন হয় তিনি ধুরন্ধর শয়তান, যিনি এক নরখাদকের সাথে ষড়যন্ত্র করে আমাদের ঠকাচ্ছেন, বা তিনি একজন অসামান্য অন্তর্যামী! তাই আমি ওনার কথা মতো আবারও এসেছিলাম।”
অঘোরী মুচকি মুচকি হাসছেন। রুচিরা একটু অধৈর্য হয়ে বললো, “বাইরে কয়েকটা মানুষের প্রাণ যেতে বসেছে। আপনার যা বক্তব্য তাড়াতাড়ি রাখুন।”
“আমরা বৃথাই এই চিন্তা করি যে আমাদের হাতে সময় নেই। কিন্তু এই চিন্তা কি আমাদের মানায়? আসলে তো সময় আমাদের হাতেই নেই! আমরা সময়কে নিজেদের সুবিধার্থে সংখ্যায় বুঝতে শিখেছি। কিন্তু সংখ্যা কি সময়ের বিশ্লেষক, নাকি সময় সংখ্যার বিশ্লেষক? এসো, তাহলে তোমাদের একটা গল্প শোনাই। এক বালক ছোটো বেলায় মাতৃহারা হয়। মাতৃস্নেহ হতে বঞ্চিত সেই বালকের জীবন আরও দুর্বিষহ করে তোলে তার পিতা এবং অন্যান্য আত্মীয়দের অবহেলা। রাগে ও দুঃখে সেই বালক সংকল্প নেয় যে, তার জীবনে সে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে স্থান দেবে না। দিন দিন সে দাম্ভিক থেকে দাম্ভিকতর হয়ে ওঠে। বিদ্যা অর্জন করে সে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোয়। কিন্তু উন্নতির চরম শিখরে উঠেও তার বঞ্চনার ক্ষতগুলো টাটকা রয়ে যায়। এরপর কালক্রমে তার বিবাহ হয় ও তার একটি কন্যা সন্তান হয়। সে তার পরিবারের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে কারণ তার বঞ্চনার ক্ষতগুলো শুকোতে শুরু করেছিল। সেগুলো আর দাম্ভিকতার প্রলেপ দিয়ে ঢাকার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু মানুষ তার কর্ম দ্বারা কালচক্রে যে ঢেউগুলি তৈরি করে, সেগুলোর প্রভাব থেকে তার নিস্তার নেই। প্রথমে তার স্ত্রী ও পরে তার কন্যা কালচক্রের প্রভাবকে পিছনে ফেলে অমৃতলোকে পাড়ি দেয়। তার ক্ষতগুলো কীভাবে পূরণ করা সম্ভব, তা কিন্তু সে জানতো। কিন্তু তার দাম্ভিকতার নেশা তাকে বিপথে ঠেলে দেয়। সে তার কন্যার মৃতদেহ ভক্ষণ করে, কারণ তার দৃঢ় ধারণা হয়েছিল যে কাউকে ভক্ষণ করলে মৃত মানুষের আত্মার উপর তার অধিকার হয়ে যায়। নিজের নতুন ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হয়ে উঠলে সে একটি নরখাদকে পরিণত হয়। সে পরিকল্পনা করে তার অতীতের শত্রুদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার। সে অত্যন্ত নিপুণভাবে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যগুলি একে-একে করতে থাকে। কিন্তু ঠিক এইসময়ই মন্দিরের পুনর্জাগরণের সময় আসে এবং সেই সঙ্গে তাকে পাপ থেকে পুণ্যের দিকে, বন্ধন থেকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ খুলে যায়।”
অঘোরীর কথা শেষ হতেই ঘরে থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সেই অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা চিরে রুচিরার কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, “যাকে আমি সেদিন সুধীরবাবুর বাড়িতে দেখেছিলাম, সে তাহলে সত্যিই পৌলমী ছিল না! তার বাঁপায়ে ছ'টা আঙুল ছিল না, যেটা আমি পৌলমীর পায়ে আমাদের প্রথম আলাপেই লক্ষ্য করেছিলাম। আর মালতী মাসিও মোটেই কানে কম শোনেন না। তিনি রান্নাঘর থেকে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নকল পৌলমীর কথা শুনতে পেলেন, অথচ পাশে বসে থাকা সুধীরবাবুর কথা শুনতে পেলেন না! এর একটাই মানে, তিনি কিছুটা হলেও জানেন, সুধীরবাবু কী করছেন এবং সেটার জন্য তিনি তাঁর উপর অসন্তুষ্ট।”
অঘোরী একইভাবে হেসে বললেন, “তাহলে বুঝতে পারছিস তো মা, বাইরে যে নরমাংস ভক্ষণ করছে সে আসলে কে!”
“হ্যাঁ! এবং এই কারণেই তিনি আমাদের সাথে অভিযানে আসেননি, এবং ফোনে তাঁর কথাগুলো দূর থেকে আসা এবং অস্পষ্ট মনে হয়, ঠিক সেদিন যেমন দূরদর্শীরটা অসীমের ফোন থেকে শোনাচ্ছিল!” রুচিরা একইভাবে বললো।
“কিন্তু এবার কী করতে হবে?” সুধাকরবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন।
“মা, এই দায়িত্ব তোকেই নিতে হবে। একমাত্র তুই পারবি। তোরই সেই মনের জোর আছে যে তুই অমৃতলোকের পথ দিয়ে গিয়ে পৌলমীকে অতীত থেকে ফিরিয়ে এনে সুধীরকে বোঝাতে পারবি। এই পাথরটা হাতের তালুতে শক্ত করে চেপে ধরবি। পাথরটা হাতের মধ্যে ছটফট করবে, কিন্তু তুই এটাকে চেপে ধরে থাকবি। যখন তুই মনোজাভা রূপে কালচক্র দিয়ে যাবি, তখন অনেক কিছু তোকে বিচলিত করে তোর মনোযোগ নষ্ট করতে চাইবে, কিন্তু তোকে একমনে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র জপ করতে হবে। অতীতে পৌঁছে পৌলমীকে নিয়ে তোর আর ওর হাতের তালুর মাঝখানে পাথরটা রেখে মহামৃত্যুঞ্জয় জপ করলে তোরা এখানে পুনরায় ফিরে আসবি।”
অঘোরী রুচিরাকে একটা তিনকোনা ছোট্ট নীল পাথর দিয়ে এই কথাগুলো বললেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন