কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
শিউটিলা থেকে ফেরার সময়েই দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছিল৷ আমরা ফিরে আসার পর, শুরু হল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি৷ সেই সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া৷ পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল এক নিমেষে৷ আর এইরকম পরিবেশে মধ্যাহ্নভোজনটাও হল জব্বর৷ চনমনে খিদের মুখে আলু পোস্ত আর চিকেন কারি দিয়ে গরম ভাত, চালতার চাটনি, ওঃ, সে যে কী অমৃত!
কিন্তু এই অমৃতও যেন মন দিয়ে উপভোগ করতে পারছিলাম না৷ রহস্য সমাধানের খুব কাছে পৌঁছে গেছি, তাই কৌতূহল আর উদবেগ সমানভাবে কাজ করে চলেছে মনের মধ্যে৷ মেজরের মধ্যে কিন্তু এসবের কোনো প্রতিক্রিয়াই যেন নেই৷ সকালে মন্দিরটা খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই মেজর কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছেন৷ অথচ তাঁর মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, চিন্তার তোলপাড় চলছে তাঁর মনের মধ্যে৷
সুজয়বাবুও আমাদের সঙ্গেই লাঞ্চ করলেন আজ৷ সেটা যে শুধুই সৌজন্যবশত, তা নয়৷ আসলে মেজরের হাবভাবে উনিও যেন কীভাবে বুঝে ফেলেছেন যে, রহস্য সমাধানের বেশ কিছুটা কাছে এসে পড়েছি আমরা৷ তাই এখন আর উনি পারতপক্ষে আমাদের সঙ্গ ছাড়তে চাইছেন না৷ তাই খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা যখন সবাই মিলে বারান্দায় এসে জাঁকিয়ে বসলাম, তখন সুজয়বাবুও এসে বসলেন একটা চেয়ারে৷ তাঁরও অবস্থা আমাদের দু-বন্ধুর মতোই৷ কৌতূহলে জর্জর৷
বৃষ্টি এখনও ঝিরঝির করে পড়েই চলেছে৷ তাতে গাছের পাতাগুলো ধুয়ে গিয়ে বিভিন্ন রকমের সবুজ রঙের বাহার যেন আরও খোলতাই হয়েছে৷ কিন্তু সেসব দেখার মতো মনের অবস্থা এখন আমাদের নয়৷ এই মুহূর্তে আমাদের মনে একটাই প্রশ্ন, মেজর কী ভাবছেন? মন্দির আবিষ্কারের পর রহস্যের জট খুলতে কতটা সফল হলেন তিনি?
একমনে ধীরেসুস্থে তাঁর পাইপে তামাক ভরছিলেন মেজর৷ এবার সেটা ধরিয়ে নিয়ে সবার দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন৷ তারপর বলতে শুরু করলেন, 'ইয়েস মাই ডিয়ার ব্রাদার্স, তোমরা যা ভাবছ, তার কিছুটা সত্যি বটে৷ রহস্যের অনেকটাই এখন আমার কাছে পরিষ্কার৷ কিন্তু তবুও আমি বলব, রহস্যের কিছুই এখনও পরিষ্কার নয়৷'
আমরা অবাক৷ মেজরের মুখের দিকেই তাকিয়ে আছি৷
মেজর বললেন, 'কী হল? আমার কথাটা হেঁয়ালির মতোই শোনাচ্ছে, তাই না? তাহলে পরিষ্কার করেই বলি৷ দেখো, আসলে এখনও গোটা রহস্যের মূল ব্যাপারটাই আমরা ধরতে পারিনি৷ সেটা কী? একটা তুলোট কাগজে লেখা হেঁয়ালির মতো ছড়া, রাজশেখর নামে এক বাইরের লোকের জমিদারবাড়িতে আগমন, তার রহস্যময় আচরণ এবং মৃত্যু, মাণিক্যপ্রতাপের খাতায় আজব সব লেখা, এই সমস্ত কিছু মিলে একটা দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে-যার নাম গুপ্তধন৷ কিন্তু সেটা কী, আর সেটা কোথায়? প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, আমি গোড়া থেকেই নিঃসন্দেহ ছিলাম যে, সেই গুপ্তধন হল মুদ্রা; তবে তার পরিচয়টা জানা ছিল না৷ গতকাল রাত্রে মাণিক্যপ্রতাপের খাতা থেকেই সে পরিচয় আমার জানা হয়ে গেছে৷ কিন্তু ওই দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর এখনও আমাদের কাছে অধরা৷ কারণ এখনও পর্যন্ত এই গুপ্তধনের গুপ্ত স্থানটির হদিশ আমরা পাইনি৷ এখন প্রশ্ন এই যে, সেই সন্ধান কি রাজশেখর পেয়েছিল?'
প্রবল বিস্ময়ে সুজয়বাবু প্রায় চেঁচিয়ে ওঠেন, 'কী বলছেন মেজর? রাজশেখর? গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছিল রাজশেখর?'
মেজর বললেন, 'না৷ আমি নিশ্চিত নই৷ কিন্তু সে কেন সিন্দুক থেকে ওই চিরকুট চুরি করেছিল? কেন কাউকে না জানিয়ে টিলার ওপরে উঠেছিল সন্ধ্যের অন্ধকারে? কেন একটা শাবল লুকিয়ে রেখেছিল ঝোপের আড়ালে? তার মানে আগেই সে ওই গুহার সন্ধান পেয়ে গিয়েছিল, আর গুহামুখের পাথর সরিয়ে ভেতরে যাবে বলেই সে এ কাজটা করেছিল৷ কিন্তু গুহাটা তার লক্ষ্য কেন? তাহলে কি ওই গুহা বা মন্দিরে সেই গুপ্তধন আছে বলে সে নিশ্চিত হয়েছিল? কিন্তু কীভাবে সে নিশ্চিত হল?'
মেজর চুপ করেন৷ প্রশ্নগুলো আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়৷ আমরা সেই নিয়েই ভাবতে থাকি৷
আবার মুখ খুললেন মেজর, 'এই প্রশ্নটা আমি নিজের মনেই বারবার করছি, আর কেন যেন আমারও মনে হচ্ছে যে, রাজশেখরের অনুমান নিভুÍল৷ এই গুপ্তধন, আর ওই শিউটিলার নটরাজ মন্দির, দুয়ের মধ্যে একটা চরম যোগসূত্র আছে৷ নাহলে ওই চিরকুটে কদম গাছ আর নটরাজের উল্লেখ থাকবে কেন? কিন্তু কী সেই যোগসূত্র? এই জায়গাতেই আমার অঙ্ক মিলছে না ব্রাদার৷'
বলতে বলতে গভীর চিন্তায় ডুবে যান মেজর৷ আমি অধৈর্য স্বরে বলি, 'কিন্তু মেজর, ওই যে আপনি বললেন, খাতা থেকে মুদ্রার পরিচয় আপনার জানা হয়ে গেছে৷ কী জেনেছেন মেজর?'
মেজর আমার কথা শুনে যেন একটু উৎসাহিত হলেন৷ মনে হল মাথা থেকে চিন্তাটা আপাতত ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নড়েচড়ে বসলেন৷ তারপর বলতে শুরু করলেন, 'হ্যাঁ, মুদ্রা৷ গতকাল সুজয় যখন প্রথম চিরকুটটা আমার হাতে তুলে দেয়, তখন গোটা ছড়াটায় ওই মুদ্রা কথাটাই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশি৷ ছড়াটা বারবার পড়তে পড়তে আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে, গোটা রহস্যটাই গুপ্তধনসংক্রান্ত, আর সেই গুপ্তধন হল মুদ্রা বা কয়েন৷ এখন এরকম একটা প্রাচীন বংশে গুপ্তধনের গুজব, বিশেষত যে বংশে একটা ঐতিহাসিক যোগাযোগ রয়েছে, সেখানে ওই মুদ্রাটি কী? নিশ্চয়ই মোহর বা ওই জাতীয় কিছু৷ অবশেষে আমার এই বদ্ধমূল ধারণা সত্যি হল মাণিক্যপ্রতাপের খাতা থেকে৷ সেখানেই আমি জানতে পারলাম যে আমাদের লক্ষ্য এই গুপ্তধনটির নাম হল, নিসার৷'
'মানে? ওই যে খাতায় লেখা ছিল নিসার = অসার; সেই নিসারই হল গুপ্তধন?' আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি৷
'ইয়েস ব্রাদার, নিসার,' ঘাড় নেড়ে মেজর বললেন, 'এই নিসার হল একটি মুদ্রা, যা মুঘল আমলে বেশ কয়েক পুরুষ ধরে প্রচলিত ছিল৷ যেমন ধরো মোহর, কিংবা আশরফি, ঠিক তেমনি একধরনের মুদ্রা এই নিসার৷ তবে রুপোর নিসার সহজলভ্য হলেও সোনার নিসার ছিল দুর্লভ৷ এইরকমই কিছু নিসার পুরুষানুক্রমে হাত বদল হতে থাকে নবাবের পরিবারের মধ্যে৷ এইভাবে মালিকানা বদল হতে হতে, একসময় যখন মিরজাফরের জামাই মিরকাশিম এসে বসেন নবাবি মসনদে, সম্ভবত সেটা ১৭৬০ সাল, যথারীতি তাঁর দখলেই এসে যায় এই দুর্লভ বস্তু৷ কিন্তু মাত্র চার বছর রাজত্বের পর, বক্সার যুদ্ধের শেষে পলাতক মীরকাশিম সঙ্গে নিয়ে গেলেন এই নিসারগুলো, তারপর . . .'
মেজরকে কথা শেষ করতে দিই না৷ উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠি, 'বুঝেছি মেজর বুঝেছি৷ নবাব মিরকাশিমের দিক থেকেই ওই নিসার এল সুজয়বাবুর পূর্বপুরুষের হাতে, সেখান থেকে বাঁকুড়ার জমিদারবাড়িতে, আর তারপর জমিদার মাণিক্যপ্রতাপ সিংহরায়ের কারিকুরিতে সেটাই হয়ে উঠল গুপ্তধন৷ তাই না?'
মেজরের মুখে হাসি৷ চোখে একটা আলতো তারিফ করার ভঙ্গি৷ দেখে বেশ একটা গর্ব অনুভব করি৷
সুজয়বাবু বলে ওঠেন, 'বাব্বা! আমাদেরই বংশের মধ্যে এত গল্প, আর আমিই জানি না৷'
মেজর ঈষৎ বকুনির সুরে বলেন, 'তার জন্যে একটু পড়াশোনা করতে হয় সুজয়৷ আমিই কি এত কথা জানতাম? তোমার ঠাকুর্দার ওই খাতা থেকেই তো জেনেছি৷ অথচ দেখো, তোমার ঠাকুর্দার খাতা, আর তুমিই সেটা পড়ে দেখোনি৷'
সুজয়বাবু বিব্রতমুখে চুপ করে থাকেন৷ মেজর এবার খানিকটা সান্ত্বনার সুরে যোগ করেন, 'অবশ্য তোমার কোনো দোষ নেই সুজয়৷ তোমরা হলে জমিদার মানুষ, কতরকম ঝামেলা পোয়াতে হয়, সময় কোথায়?'
এবার লজ্জিতমুখেই সুজয়বাবু বলে ওঠেন, 'ছিঃ ছিঃ মেজর৷ ওসব বলে লজ্জা দেবেন না৷ জমিদার কোথায়? বড়োজোর ভূতপূর্ব জমিদার বলতে পারেন৷'
মেজর হেসে ওঠেন, 'হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ৷ তা যা বলেছ৷ ভূতপূর্ব . . .' কথাটা উচ্চারণ করেই মেজর আচমকা থেমে যান৷ ওঁর ভুরু কুঁচকে গেছে৷ মুখের পেশিগুলো দৃঢ়৷ যেন আচমকা বিদ্যুতের শক খেয়েছেন তিনি৷
জিজ্ঞেস করি, 'কী হল মেজর?'
মেজর আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, 'ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এই সহজ কথাটা মাথায় আসতে দু-দিন সময় লেগে গেল? ছিঃ!'
'কোন কথাটা মেজর?'
'আরে ভূতপূর্ব! আমরা ভাবছিলাম ভূত মানে অশরীরী, কিন্তু ভূত মানে তো পূর্ব, অথবা অতীতও হয়! সেই হিসেবে ভূতে ভূতেই চলে মানে তো অতি সহজ৷ পূর্ব দিকে চলতে হবে৷ আর সেটা কখন? সেটাও ভূতে, অর্থাৎ পূর্বে বা আগে৷ সবটা মিলিয়ে কী দাঁড়ায়? আগে তোমায় পূর্ব দিকে যেতে হবে৷ আর পূর্ব দিকে গেলে কী পাবে! শিউটিলা৷ যেখানে এক পা গাছে দিব্যি নাচে গিরীশ৷ অর্থাৎ একটি কদম গাছের নীচে নটরাজ মন্দির৷ সিম্পল৷'
আমরা রুদ্ধবাক! অতি সাধারণ কথার মধ্যে দিয়ে এমন সমাধান বেরিয়ে আসবে, এ তো আমরা ভাবতেই পারিনি৷
এদিকে মেজর তখনও আপনমনেই যেন বলে চলেছেন, 'তার মানে আর দুটো লাইন বাকি রইল৷ দুটো লাইন৷ মাপের ব্যাপারটা, আর জননীর কোল৷ কিন্তু এই জননীটি কে? শিউটিলার সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কী? নাঃ, ভাবতে হবে, ভাবতে হবে৷'
কথাগুলো বলতে বলতেই মেজরের মধ্যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে লক্ষ করি৷ হঠাৎ যেন একটা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে ওঁর শারীরিক ভঙ্গিতে৷
সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল তাঁর পরবর্তী কথায়৷ মাথাটা দ্রুত একবার ঝাঁকিয়ে মেজর বলে উঠলেন, 'ওয়েল ব্রাদার, তোমরা গল্প করো৷ আমার একটু মানসিক রিচার্জের প্রয়োজন৷ আকাশ, তোমার ল্যাপটপ আর ডঙ্গলটা একটু আমার ঘরে দিয়ে যাও তো, দরকার আছে৷ আর হ্যাঁ, সুজয়,' মেজর চলে যেতে গিয়ে সুজয়বাবুর দিকে ঘুরলেন, 'ডিকশনারিটা তুমি তো এনেই দিয়েছ৷ আর একটা কাজ তোমায় করতে হবে৷ সময় করে একবার গণেশকে আমার কাছে পাঠিয়ো৷ ওর সঙ্গে কিছু কথা বলা দরকার৷'
* * * *
সুজয়বাবু চলে যাবার পর সোজা ঘরে ঢুকেই বিছানায় শুয়েছিলাম৷ বাদলা আবহাওয়ায় ঘুমটা এসে গিয়েছিল খুব সহজেই৷ কিন্তু সেই চটকা ভেঙে গেল মেজরের হাঁকডাকে৷ ধড়মড় করে উঠে বসে দেখি, মেজর আমার কাঁধে ঝাঁকুনি দিচ্ছেন আর ডাকছেন, 'ওঠো ব্রাদার ওঠো৷ চটপট ওঠো৷ আর সময় নেই৷ অরিন্দমকে তোলো৷'
ঘোর কাটতে কিছুটা সময় লাগল৷ ততক্ষণে মেজরের ধাক্কায় অরিন্দমও ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে৷
আমি জিজ্ঞেস করি, 'কী হয়েছে মেজর? আপনাকে এত উত্তেজিত দেখাচ্ছে কেন?'
মেজর আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে অরিন্দমকে জিজ্ঞেস করলেন, 'অরিন্দম, তোমার ক্যামেরাটা কোথায়? ক্যামেরাটা? বার করো তো শিগগির!'
ক্যামেরাটা অরিন্দমের ব্যাকপ্যাকের ভেতর৷ সেটা বার করারও যেন তর সয় না মেজরের৷ তার আগেই মেজর অস্থির, ' আঃ! কী হল? চটপট করো৷'
আমরা দু-জনেই বেশ হতভম্ব৷ তারই মধ্যে অরিন্দম তড়িঘড়ি করে ক্যামেরা বার করতেই মেজর বললেন, 'এবার বলো, সকালে মন্দিরের ভেতর নটরাজ মূর্তির ছবি তুলেছিলে তো?'
অরিন্দম অবাক গলায় জবাব দেয়, 'হ্যাঁ সে তো তুলেইছি৷'
'দেখি সেই ছবিটা বার করো তো৷ কুইক!'
অরিন্দম ডিসপ্লেতে খুঁজে খুঁজে সেই নটরাজ মূর্তির ছবিটা বার করে ক্যামেরাটা মেজরের হাতে দেয়৷ মেজর এবার খাটে বসে সেই ছবিটা একমনে দেখতে থাকেন৷ দু-মিনিট, তিন মিনিট, চার মিনিট৷ জুম করে করে মূর্তির বিভিন্ন অংশ মেজর দেখছেন তো দেখছেন৷ তারপর যেন বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে বড়ো করে একটা শ্বাস ফেলে আমাদের দিকে ফেরেন৷ লক্ষ করি, এতক্ষণের উদবেগ কেটে গিয়ে মেজরের চোখে হঠাৎ যেন একটা অদ্ভুত উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে৷
দেখামাত্র বুকের মধ্যে রক্ত ছলাৎ করে উঠল৷ মেজরের মুখচোখের এই চেহারা তো বহুকাল ধরেই চেনা৷ তার মানে মেজর কি রহস্য সমাধান করে ফেলেছেন? গুপ্তধনের সন্ধান কি পেয়ে গেছেন? কীভাবে পেলেন? এই তো দুপুর পর্যন্তও কোনো খবর ছিল না, আর এর মধ্যেই . . .৷
কিন্তু কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ হল না৷ তার আগেই বাইরে থেকে সুজয়বাবুর গলা পাওয়া গেল, 'আসতে পারি?'
মেজর ত্বরিৎগতিতে দরজার দিকে ঘুরে বলে উঠলেন, 'মোস্ট ওয়েলকাম সুজয়৷ এসো এসো৷ তোমার কথাই ভাবছিলাম৷'
সুজয়বাবু ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, 'সে তো আমার পরম সৌভাগ্য৷ কিন্তু কেন মেজর?'
মেজর উত্তর দিলেন, 'আরে তুমি ছাড়া শাবল কোদাল পাব কোথায়? হান্টার টর্চ কে দেবে?'
সুজয়বাবু হাঁ করে মেজরের মুখের দিকে তাকালেন, 'মানে?'
'মানে এই যে, মানিকের খবরে, মায়ার যে কবরে৷ সেই কবর থেকে তাকে উদ্ধার করতে হবে না? আর সেজন্যেই একটু পরে আমরা দলবল সমেত বেরোচ্ছি যে! কারণ তোমার ঠাকুর্দার কাছে অসার হলেও আমাদের কাছে ও যে বিশাল দামি!'
মেজরের কথা শুনে যেন একটু একটু আলোর আভাস পাচ্ছিলাম মনে মনে, কিন্তু সুজয়বাবু যে দুর্বোধ্য ধাঁধার জালে জড়িয়ে পড়েছেন, সেটা ভালোই বুঝলাম৷ কারণ বেশ অসহায়ভাবে উনি বললেন, 'মেজর, আপনার কথাগুলো তো ঠাকুর্দার খাতার হেঁয়ালির থেকেও শক্ত লাগছে!'
হা-হা করে হেসে উঠে মেজর বললেন, 'চিন্তা কোরো না, ব্রাদার৷ চলো, চটপট শিউটিলায় যাবার আয়োজন করো৷ ওখানে যেতে যেতেই আমি সব বুঝিয়ে বলব তোমাদের৷ তার আগে আর কোনো কথা নয়!'
সুজয়বাবু অবাক হয়ে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন৷ তাঁকে থামিয়ে দিয়ে মেজর গম্ভীর গলায় কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, 'নাটকের সেকেন্ড বেল পড়ে গেছে ব্রাদার৷ এখনই ড্রপ সিন খুলে যাবে৷'
উত্তেজনা চেপে রেখে জিজ্ঞেস করি, 'তার মানে আপনার কাছে কি সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে নাকি মেজর?'
মেজর চকচকে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ইয়েস ব্রাদার৷ একটা জায়গা, গোটা গল্পের মাত্র একটা জায়গাই ঝাপসা লাগছিল, আর সেটা নিয়ে আমার একটা আন্দাজ ছিল৷ একটু আগে গণেশের সঙ্গে কথা বলে আমার সেই আন্দাজটা মিলে গেছে৷ আর এখন অরিন্দমের ক্যামেরার ছবি দেখে কাঁটায় কাঁটায় মিলে গেছে অঙ্কের প্রত্যেকটা ধাপ৷ অতএব . . .'
ছটফট করে উঠে অরিন্দম বলল, 'কিন্তু আমাদের কাছে তো কিছুই পরিষ্কার নয় মেজর৷ গোটা ব্যাপারটাই একটা মস্তবড়ো খটকা৷ দয়া করে আমাদের উদ্ধার করুন!'
মেজর হাসলেন৷ সেই কৌতুকের হাসি৷ তারপর যেন ছেলে-ভুলোনো স্বরে বললেন, 'তার আগে যে আরও বড়ো কিছু উদ্ধার করতে হবে ব্রাদার৷ সুজয়দের পারিবারিক সম্পত্তি৷'
প্রায় চিৎকার করে উঠি, 'তার মানে গুপ্তধন? অর্থাৎ আপনি সেই সন্ধান পেয়ে গেছেন? আর সেই গুপ্তধন তাহলে শিউটিলাতেই লুকোনো আছে?'
মেজর মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, 'ইয়েস ব্রাদার৷ শেষ পর্যন্ত ওই শিউটিলাই হল আমাদের লক্ষ্য৷ কিন্তু আর একটা কথাও নয়৷ এখনই প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে৷ দেরি করলে আরও মুশকিল হবে৷ যাবার পথেই একে একে তোমাদের সমস্ত খটকা আমি দূর করে দেব৷ এখন চলো, আধ ঘণ্টার মধ্যে রেডি হয়ে নাও৷ আর সুজয়, মন দিয়ে শোনো . . .'
মেজর সুজয়বাবুর সঙ্গে অভিযানের তোড়জোড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন৷ আমি মনে মনে উল্লসিত হয়ে উঠি৷ তাহলে প্রথম থেকে যে আন্দাজটা করেছিলাম, সেটাই মিলে গেল! ওই শিউটিলাতেই লুকোনো আছে সেই সাত রাজার ধন, থুড়ি, সাত নবাবের ধন!
অরিন্দমকে ডেকে বললাম, 'চলো৷ এবার তাহলে লাস্ট ওভারটা খেলতে নেমে পড়ি৷' অরিন্দম একটু হেসে উঠে পড়ে চেয়ার থেকে৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন