জমিদারবাড়ি ও মাণিক্যপ্রতাপ

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

সিংহরায় বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে বিশাল জায়গা নিয়ে৷ সেইসঙ্গে প্রাচীন ঐতিহ্যের ছাপ এ বাড়ির পরতে পরতে৷ মূল বাড়ির চারিদিকেই প্রচুর খোলা জায়গা৷ আর সীমানার পুরোটাই পাঁচিলে ঘেরা৷ যদিও পাঁচিলটা খুব উঁচু নয়৷

বাড়ির পেছনে সবচেয়ে বেশি জায়গা৷ সেখানে বড়োসড়ো একটা বাগান আছে, আর কলা গাছ ঘেরা একটা পুকুর, যাকে দিঘি বলাই ভালো৷ অর্থাৎ সবদিক থেকেই একটা সার্থক জমিদারবাড়ি৷

কাল সকালেই আমরা সুজয়বাবুর সঙ্গে বাড়ির চৌহদ্দিটা ঘুরে দেখে এসেছি৷ এক ঝলক দেখে মনে হয়েছে, প্রাচীন সব জমিদারবাড়ির মতো এ বাড়ি অবহেলিত নয়, মাঝে মাঝে সংস্কার করে মোটামুটি ভদ্রস্থ করেই রাখা হয় এ বাড়িটাকে৷

বাড়ির সামনের মূল গেটটা বেশ চওড়া আর উঁচু৷ রাজবাড়ির ফটকের মতো৷ মাথায় একটা গণেশের মূর্তি বসানো৷ গেট দিয়ে ঢুকলেই সোজা চওড়া নুড়ি-বিছানো রাস্তা চলে গেছে বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত৷ সে রাস্তার দু-দিকে সারি দেওয়া দেবদারু গাছের ছায়া৷ বাঁ-দিকে আউটহাউস, যেখানে আমরা আছি, আর ডান দিকে খোলা জায়গা৷ সেখানে দু-তিনটে টিনের শেড আছে, যা গ্যারেজ আর গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করা হয়৷ আর পাঁচিলের ধারে ধারে নাম-না-জানা কত বাহারি ফুলের গাছ৷ মধ্যিখানে একটা শান-বাঁধানো ফোয়ারা৷ ঠিক যেমনটি হয়ে থাকে৷

গেটের ভিতর থেকে সোজা তাকালে ছবির মতো দেখতে লাগে বাড়িটাকে৷ মনে হয় আধুনিক আকাশের প্রেক্ষাপটে একটা প্রাচীন জমিদারবাড়ি মূর্তিমান ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ অরিন্দম রাস্তার এপাশ-ওপাশ থেকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে এই ইতিহাসের ছবি তুলছিল ঘুরে ঘুরে৷

এর মধ্যেই বেশ চনমনে রোদ্দুর উঠে গেছে৷ আমরা একটু গাছের ছায়া খুঁজে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর সুজয়বাবুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে কথা বলছিলাম নিজেদের মধ্যে৷

মেজরের প্রিয় সঙ্গী দুর্ধর্ষ শিকারি গ্রে-হাউন্ডটি একটু দূরে ফোয়ারার চারিদিকে ঘুরে ঘুরে পাক খাচ্ছিল৷

মেজর সেদিকে তাকিয়ে বললেন, 'একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য পেলাম, বুঝলে ব্রাদার?'

কৌতূহলের চোখে মেজরের দিকে তাকালাম৷ মেজর বললেন, 'মাণিক্যপ্রতাপ ঘোড়ায় চড়তে খুব ভালোবাসতেন৷ আর ওঁর ঘোড়াটি ছিল ওঁর প্রিয় পোষ্য, নিজের প্রাণের থেকেও প্রিয়৷ আমার ক্যাপ্টেনের মতোই৷'

মেজরের গলায় নিজের নাম শুনে ক্যাপ্টেন এগিয়ে আসে৷ মেজর ওর গলায় আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, 'এক দুরারোগ্য অসুখে ঘোড়াটি হঠাৎ মারা যেতে মাণিক্যপ্রতাপ ভীষণভাবে শোকাহত হয়েছিলেন৷ সে শোক তিনি শেষ পর্যন্ত ভুলতে পারেননি৷ আর তাই বারবার তাঁর লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে সেই শোক৷ কিন্তু এর মধ্যে ইন্টারেস্টিং তথ্যটা কী জানো ব্রাদার?'

'কী মেজর? কী সেই তথ্য?' প্রশ্ন করে অরিন্দম৷ ও যে কখন গল্পের টানে ছবি তোলা ছেড়ে আমাদের কাছে এসে জুটেছে, বুঝতেই পারিনি৷

মেজর যেন ম্যাজিসিয়ানের তাস দেখানোর মতো করে বলেন, 'মাণিক্যপ্রতাপের সেই প্রিয় ঘোড়ার নাম ছিল চৈতক৷'

আমি চমকে উঠে বললাম, 'সে কি! চৈতক তো বিখ্যাত ঘোড়া৷ ইতিহাসে পড়েছি, রানা প্রতাপের ঘোড়ার নাম ছিল চৈতক৷'

মেজর হেসে বললেন, 'সেটাই তো মজা৷ এই ঘোড়ার নামকরণের মধ্যে দিয়েই সুজয়ের ঠাকুর্দা তাঁর প্রাজ্ঞতার আরেক পরিচয় দিয়েছেন৷ রানা প্রতাপ, আর মাণিক্যপ্রতাপ৷ নামের মিলটা লক্ষ করেছ ব্রাদার? অর্থাৎ সরাসরি না বলেও ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক খেলেছেন ঐতিহাসিক সাযুজ্যের এই মজার খেলা৷ কী ইন্টারেস্টিং না?'

মুগ্ধ হয়ে যাই৷ কোনো কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে৷

এমন সময় দূরে সুজয়বাবুকে দেখা যায়৷ বাড়ির সদর থেকে বেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসছেন৷ কাছে এসে বললেন, 'সরি মেজর, একটু দেরি হয়ে গেল৷ আসলে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা একটু দেখে এলাম আর কি৷ চলুন, চলুন৷'

আমরা কিছু না বলে সুজয়বাবুর পেছন পেছন জমিদারবাড়ির দিকে এগোই৷

দু-মহলা বাড়ি৷ কাল সকালে আমরা একবার ঢুকেছিলাম এ বাড়িতে৷ তাও বাহিরমহলে৷ সেখানে যে ঘরটায় রাজশেখর থাকত, সেটা দেখার জন্যে৷ তারপর আজ এই দ্বিতীয়বার যাচ্ছি৷ এবং বলাই বাহুল্য, এবার অন্দরমহলে যেতে পারব আমরা৷

রাস্তাটা চওড়া হতে হতে গিয়ে সদরের সামনের সিঁড়িতে মিশেছে৷ তার একটু আগেই রাস্তাটার দুটো প্রশাখা বাড়িটার দু-পাশ দিয়ে চলে গেছে পেছনের দিকে৷

সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই মস্ত মস্ত থামে ঘেরা চওড়া দালান৷ দু-পাশে বাইরের ঘর৷ বোঝাই যায় যে, এককালে এগুলোই ছিল কাছারি ঘর৷ মাঝের প্যাসেজ ধরে আমরা ভেতরের দিকে যেতে থাকি৷

হাঁটতে হাঁটতে সুজয়বাবু বলছিলেন, 'এই যে দেখছেন দেওয়ালে ঝোলানো অয়েল পেন্টিংগুলো, এগুলো প্রায় দু-শো বছর ধরে একটু একটু করে জমা হয়েছে৷ বাড়িটা রক্ষণাবেক্ষণের যা খরচ, তাতে একেকবার ভাবি যে, এগুলো কিছু কিছু করে বেচে দিলে সেই টাকাটা উঠে আসবে৷ তারপর আবার দাদার সঙ্গে পরামর্শ করে সেই চিন্তা ত্যাগ করতে হয়৷ আসলে দাদার একেবারেই তা ইচ্ছে নয়৷ বুঝতে পারি, দাদা বংশের ঐতিহ্যের কথাই ভাবছে৷'

আমি বললাম, 'তা ঠিক৷ এইসব অয়েল পেন্টিং কিন্তু এখন অমূল্য৷ টাকা দিয়ে এদের বিচার হয় না৷'

সুজয়বাবু মাথা নেড়ে সায় দিলেন৷ মেজর মাথা নীচু করে হাতদুটো পেছনে মুষ্ঠিবদ্ধ করে হাঁটছিলেন৷ এবার বললেন, 'তোমার ঠাকুর্দার ঘরটা কোনখানে সুজয়?'

সুজয়বাবু বললেন, 'ওই যে, একতলার শেষপ্রান্তে৷ ঠাকুর্দা প্রথমে ওপরেই থাকতেন, পরে বয়েস হয়ে যেতে ওঠা-নামার অসুবিধার জন্য তলার ঘরটাই বেছে নিয়েছিলেন৷ তাই ওপরের ঘরের সমস্ত কিছু নীচের ঘরে নিয়ে আসা হয়েছিল৷ অবশ্য এটা আমার শোনা কথা, আমি জন্ম থেকেই ঠাকুর্দাকে ওই ঘরেই থাকতে দেখেছি৷'

বাহিরমহল শেষ হতে একটা ফাঁকা উঠোন, তারপর অন্দরমহল শুরু হয়েছে৷ এখানেও প্রথমে একটা শক্তপোক্ত দরজা, তারপর লম্বা দালানের দু-পাশে ঘর৷ যথারীতি এখানেও দালানের দু-দিকে দেওয়ালে ঝোলানো বড়ো বড়ো ছবি, নানারকম বিদেশি মূর্তি দাঁড় করানো আছে, দেওয়ালে দেওয়ালগিরি, আর দালানের মাঝামাঝি একটা দুর্দান্ত ঝাড়লন্ঠন৷

ডান দিকে বাঁ-দিকে কোনো ঘরের দরজা ভেজানো, কোনো ঘরে তালা দেওয়া৷ দু-একটা ঘর থেকে লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে৷ শুনলাম, ঠাকুর-চাকররা একতলাতেই থাকে, রান্নাঘরটাও একতলারই একপাশে৷

আমরা হাঁটতে হাঁটতে দালানের শেষপ্রান্তে এসে দেখলাম, বাঁ-দিকে আর ডান দিকে মুখোমুখি দুটো ঘর, দুটোই তালা দেওয়া৷ সুজয়বাবু পকেট থেকে চাবি বার করে ডান দিকের ঘরটার তালা খুলতে খুলতে বললেন, 'আগে এ ঘরটা খোলাই থাকত, শুধু ভেতরের একটা দেওয়াল আলমারি আর সিন্দুকটা থাকত তালা দেওয়া৷ সিন্দুক খোলার খবর পাওয়ার পর থেকে ঘরটাতেও তালা দিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করেছি৷'

মেজর বললেন, 'ভালো করেছ৷ অন্তত যতদিন রহস্যের সমাধান না হয় তালা দেওয়া থাক৷'

বলতে বলতে তালা খুলে আমরা পরপর ঘরে ঢুকি৷ আর ঢুকেই হাঁ হয়ে যাই৷

কী বিশাল ঘর! আমাদের আউটহাউসের এক-একটা ঘরের প্রায় আড়াই গুণ৷ ঘরের পশ্চিম দিকের জানলা ঘেঁষে সুবিশাল এক পালঙ্ক৷ তার পাশেই কারুকার্যময় কাঠের একটা বেডসাইড টেবিল, ড্রয়ার দেওয়া৷ আরও দু-টি চেয়ার এবং একটি লেখার টেবিল৷ উত্তর দিকেও বড়ো বড়ো দু-টি জানলা, যার কাচের শার্সি দিয়ে পেছনের বাগান দেখা যাচ্ছে৷ তার মাঝখানের দেওয়ালেই সেই দেওয়াল আলমারি৷

ঘরে আছে আরও দু-টি বস্তু৷ একটি আরামকেদারা এবং একটি সিন্দুক৷ পূর্ব দিকের দেওয়ালের কোণে রাখা সেই ভারী সিন্দুকটা চারটে চ্যাপটা পায়ার ওপর বসানো৷

মেজর ঘরের চারিদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে সিন্দুকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ আমরাও ঘিরে দাঁড়াই তাঁর চারপাশে৷ একটা বিশাল কব্জায় বড়োসড়ো একটা তালা ঝুলছে৷ সুজয়বাবু ধীরেসুস্থে তালা খুলে সিন্দুকের ডালা তুলে ধরে দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখলেন৷

আর তখন সিন্দুকের ভেতরটা দেখেই চোখ ছানাবড়া! কী নেই সেখানে৷ তাড়া করে রাখা কাগজ, মোটা মোটা কয়েকটা বই, রোল করা কিছু হলদে কাগজ, অনেকটা জ্যোতিষীদের কোষ্ঠীর মতন দেখতে, একটা চামড়ার চাবুক, হার বা আংটি রাখার মতো কয়েকটা গয়নার বাক্স, গোটাকতক খাতা, এমনি একটা জমি মাপার ফিতে পর্যন্ত৷ এ ছাড়াও আরও নানারকম টুকিটাকি সব জিনিসপত্রে সিন্দুকটা জমজমাট৷

মেজর বলে উঠলেন, 'বাঃ! যোগ্য লোকের যোগ্য জিনিসটি খুঁজে পেয়েছি এতক্ষণে৷' এই বলে সিন্দুক ঘাঁটতে শুরু করলেন৷ প্রথমে হলদে কাগজগুলো দু-একটা খুলে দেখলেন, তারপর একে একে বইখাতা৷ প্রত্যেকটা বই আর খাতা যত্ন করে খুলে খুলে উলটেপালটে দেখলেন৷ তারপর দু-একটা গয়নার বাক্স খুলতেই দেখা গেল সেগুলো ফাঁকা৷

মেজর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সুজয়বাবু বলে উঠলেন, 'ওখানে কিছুই নেই মেজর৷ সবগুলোই ফাঁকা, বাবা বহুদিন আগেই গয়নাগুলো নিয়ে ব্যাঙ্কের লকারে রেখে দিয়েছেন৷'

মেজর আর কিছু না বলে আবার সিন্দুকে মনোযোগ দিলেন৷ তারপর অন্যান্য সমস্ত জিনিসপত্র একে একে নেড়েচেড়ে দেখে নিয়ে ডালা বন্ধ করে দিলেন৷

সুজয়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'তালা লাগিয়ে দেব নাকি মেজর?'

মেজর মাথা নেড়ে বললেন, 'ওহ সিয়োর৷ এবার আলমারিটা একবার খোলো৷' বলে উত্তর দিকের জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ আমিও গুটিগুটি তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াই৷ জানলার ভেতরে-বাইরে দুটো পাল্লা৷ ভেতরের পাল্লায় কাচের শার্সি লাগানো, তার বাইরে খড়খড়ির পাল্লা৷

মেজর বললেন, 'দেখেছ ব্রাদার, কোনো কারণে খড়খড়ির পাল্লা টানতে ভুলে গেলে বাগান থেকে যে কেউ ঘরের ভেতরটা দেখতে পাবে৷ বিশেষ করে সিন্দুকটা রয়েছে এই জানলার একদম সোজাসুজি৷ কাজেই খড়খড়ির খোলা থাকা অবস্থায় সিন্দুক খোলা হলে সিন্দুকের ভেতরে প্রায় সব জিনিসই বাইরের লোকের চোখে পড়বে৷ সুতরাং . . .'

আর কিছু না বলে মেজর চুপ করে যান৷ আবার অন্যমনস্ক৷ আর অন্যমনস্ক হলেই উনি গম্ভীর হয়ে নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে কপাল আর ভুরুতে হাতের বুড়ো আঙুল আর মধ্যমা ঘষতে থাকেন৷

এখনও তাই করছেন দেখে মেজরকে আর বিরক্ত করলাম না৷ এদিকে তাকিয়ে দেখি, ইতিমধ্যে সুজয়বাবু দেওয়াল আলমারির তালা খুলে পাল্লা দুটো মেলে ধরছেন আর অরিন্দম ঘরের বিভিন্ন অংশের ছবি তুলে যাচ্ছে৷

আলমারিটার সামনে এসে দাঁড়াই৷ ভেতরে চারটে তাক৷ সেখানে আছে কিছু বই, লাল কাপড়ে মোড়া কয়েকটা খেরোখাতা, দলিল-দস্তাবেজ গোছের কিছু কাগজপত্র, আর দোয়াত, কলম পেনসিল ইত্যাদি লেখালেখির সরঞ্জাম৷

আর বাকি যা আছে সেগুলো সবই শো-কেসে সাজিয়ে রাখার জিনিস৷ যেমন কাঠের তৈরি একটা পালতোলা নৌকা, একটা কালো পাথরের নটরাজের মূর্তি, দুটো টিয়াপাখি, শ্বেতপাথরের একটা গণেশের মূর্তি, এইসব৷ গণেশের মূর্তিটা দেখেই চিনতে পারলাম৷ বাড়ির ফটকের মাথায় বসানো মূর্তিটারই মিনিয়েচার এটি৷

জিনিসগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি, সেইসময় মেজর এসে দাঁড়ালেন আমার ঠিক পাশে৷ তাঁর চোখের দৃষ্টি তীব্র৷ একের পর এক তাকের জিনিসগুলি পর্যবেক্ষণ করছেন আর তাঁর মনে গাঁথা হয়ে যাচ্ছে তাদের ছবি৷

তিনি দলিলগুলো খুললেন একে একে, আবার যেমন ছিল রেখে দিলেন৷ তারপর খেরোখাতাগুলিও পরের পর উলটেপালটে দেখলেন আর রেখে দিলেন৷ কিছুতেই যেন তৃপ্তি হচ্ছে না তাঁর৷ যেন বারবার একটা হারানো জিনিস খুঁজে চলেছেন, অথচ পাচ্ছেন না৷

সেটাই জিজ্ঞেস করি মেজরকে, 'কী এত খুঁজছেন মেজর?'

মেজর যেন ছটফট করে উঠে জবাব দিলেন, 'জানি না৷ জানি না৷ বারবার মনে হচ্ছে এখানেই সব ধাঁধার উত্তর আছে, কিন্তু কোথায়? কিছুতেই পাচ্ছি না যে৷'

বলতে বলতে পেছনে হাত রেখে মেজর ঘরের ভেতর পায়চারি করতে থাকেন৷ তারপর হঠাৎ গিয়ে বসে পড়েন আরামকেদারাটায়৷ আমরাও গিয়ে দাঁড়াই মেজরের পাশে৷ মেজর মুখ তুলে সুজয়বাবুর দিকে তাকান৷ বলে ওঠেন, 'সুজয়, তোমার কাছে আমার আপাতত দু-টি জিজ্ঞাস্য আছে৷'

সুজয়বাবু বললেন, 'বলুন মেজর'৷

মেজর বললেন, 'প্রথম কথা, এই বাড়ি নিয়ে কি কোনোসময় ভূতসংক্রান্ত কিছু গুজব রটেছিল? ধরো, ভূতের উপদ্রব বা যেকোনো ভৌতিক বা অলৌকিক ঘটনা . . . তেমন কিছু তোমার জানা আছে?'

সুজয়বাবু এক মুহূর্তও সময় নিলেন না ভাবার জন্য৷ বললেন, 'না মেজর৷ জীবনে এমন কোনো কথা শুনিনি, অন্তত আমাদের বাড়ি নিয়ে৷ হ্যাঁ, গ্রামের পূর্বপ্রান্তের ওই টিলাটা নিয়ে একসময় . . .'

'শিউটিলা?'

সুজয়বাবু এক মুহূর্ত থেমে বললেন, 'ও! নামটা আপনি শুনেছেন? হ্যাঁ৷ ওই শিউটিলায় নাকি একসময় অলৌকিক কিছু দেখা বা শোনা যেত৷ যেমন হয়তো রাতের বেলা কেউ ওখানে আলো দেখতে পেত অথবা হঠাৎ কোনোদিন শোনা যেত বন্দুকের গুলির আওয়াজ৷ কিন্তু সে-ও বহুদিন আগে, আমার ঠাকুÍদার আমলে৷ তখন তো ওখানে গুহার ভেতর সেই নটরাজের মন্দিরটা ছিল, লোকেরাও যেত-টেত৷ তারপর একটা ছোট্ট ভূমিকম্পে সেই যে গুহা আর মন্দিরটা একসঙ্গেই কোথায় হারিয়ে গেল, সেই থেকে ওদিকে আর কেউ যায় না, আর কোনো গুজবও শোনা যায় না৷'

'ওয়েট! ওয়েট! কী বললে তুমি?' মেজর প্রায় চিৎকার করে উঠে বসেছেন আরামকেদারায়, 'ওই শিউটিলার মন্দিরটা ছিল নটরাজের মন্দির? গুহার ভেতর? তুমি ঠিক জানো?'

সুজয়বাবু একটু অবাক চোখেই মেজরকে দেখতে দেখতে বললেন, 'ঠিক জানব না কেন মেজর? ওটা তো আমাদেরই মন্দির ছিল৷ আমার প্রপিতামহ সূর্যপ্রতাপই তো ওটার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷'

সুজয়বাবুর কথা শেষ হতে-না-হতেই মেজর তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে পড়েছেন৷ গিয়ে দাঁড়িয়েছেন দেওয়াল আলমারিটার সামনে৷ তাক থেকে নটরাজের মূর্তিটা নামিয়ে হাতে করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকলেন, 'অভিনেতা রাজাতে, হবে সব সাজাতে৷ বুঝলে তো ব্রাদার, অভিনেতা হল 'নট', আর রাজা মানে 'রাজ', দুইয়ে মিলে নটরাজ৷ এবং এই নটরাজকে নিয়েই ছক সাজাবার প্ল্যান করেছিলেন মাণিক্যপ্রতাপ৷ নটরাজই হল শিবেরই রূপ, তাই এই মন্দির থেকেই স্থানীয় লোকের মুখে মুখে ওই টিলার নাম শিবের টিলা বা শিউটিলা৷ আবার ওই শিউটিলাতে গিয়েই সাপের কামড়ে প্রাণ গেল রাজশেখরের . . . মিলে যাচ্ছে, এবার একটু একটু করে মিলে যাচ্ছে ব্রাদার৷ শিউটিলার সঙ্গে এ রহস্যের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে৷ সুজয়, আমার একটা জিনিস চাই, দিতে পারবে?'

সুজয়বাবু বললেন, 'নিশ্চয়ই৷ কী জিনিস চাই বলুন?'

'একটা বাংলা ডিকশনারি৷ দুপুরের মধ্যেই আমার চাই৷'

সুজয়বাবু বললেন, 'ঠিক আছে মেজর৷ হয়ে যাবে৷'

অরিন্দম বলল, 'আর টিলা? ওখানে যাওয়া হবে না মেজর?'

মেজর হাসিমুখে বললেন, 'যাওয়া হবে না মানে? ওখানে না গেলে এ রহস্যের সমাধানই হবে না যে৷ আর সেই সঙ্গে ফটোগ্রাফার অরিন্দম রায়ের সাংঘাতিক কিছু ছবিও যে আমরা মিস করব ব্রাদার৷ চলো, চটপট স্নান-টান সেরে তৈরি হয়ে নিই৷ এখন সওয়া দশটা৷ পাক্কা এক ঘণ্টা পরে আমরা স্টার্ট করছি আমাদের-জার্নি টু দ্য মিস্ট্রি৷'

Cov6
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%