কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ সুজয়বাবুর দাদা দুর্জয়বাবু এলেন আউটহাউসে, বোধ হয় একটা সৌজন্য সাক্ষাতের কথা ভেবেই৷
আমরা তখন বারান্দার নীচে ফুলগাছ দিয়ে ঘেরা বাগানের মধ্যে বসে আছি৷ বারান্দার বেতের চেয়ারগুলো গণশা এনে সেখানে পেতে দিয়েছিল যত্ন করে৷ সেইসঙ্গে টেবিলে রেখে গিয়েছিল বিরাট একটা ট্রে-ভরতি হিঙের কচুরি, আলুরদম আর চমচম৷
জমিয়ে সেগুলো শেষ করতে-না-করতেই দেখি দুর্জয়বাবু হাজির৷ আসার পর থেকে ওনার সঙ্গে এই দ্বিতীয়বার দেখা৷ ভদ্রলোক লম্বা-চওড়ায় প্রায় মেজরের মতোই৷ সেইসঙ্গে চেহারায় মিশে আছে বনেদি জমিদার পরিবারের সূক্ষ্ম একটা আভিজাত্য৷ সুজয়বাবুর চেহারা কিন্তু এর ঠিক বিপরীত৷ উনি একটু সুখী সুখী মানুষ৷ চেহারাতেও যেমন, হাবভাবেও তেমনি৷
আমাদের কাছাকাছি এসে দুর্জয়বাবু একটা সৌজন্যের হাসি হেসে মেজরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'গুড ইভনিং মেজর কাপুর৷ সব ঠিকঠাক তো? হ্যাভ এনি প্রবলেম?'
মেজরও হাসিমুখে বললেন, 'ওহ নো, থ্যাঙ্কস মি. সিংহরায়৷ জমিদারবাড়ির আতিথেয়তা, সেখানে প্রবলেম থাকার তো প্রশ্নই নেই৷ বিশেষ করে আপনাদের এই লোকটি, গণশা, ও তো মার্ভেলাস লোক! একেবারে নিজের বাড়ির মতোই রেখেছে আমাদের৷'
'ও, গজুর কথা বলছেন?'
'গজু? মানে?' ভ্রূ কুঁচকে তাকান মেজর৷
দুর্জয়বাবু হা হা করে হেসে বললেন, 'আরে, ওর আসল নাম হল গণেশ৷ সবাই তাই গণশা গণশা করে৷ শুধু ঠাকুর্দা ওকে আদর করে গজানন বলে ডাকতেন৷ একদম ছোট্ট থেকে মানুষ করেছেন তো৷ বয়েসে বাবার থেকেও দশ বছরের ছোটো৷ তা বাবা ওকে ডাকতেন গজু বলে৷ গজানন থেকে গজু৷ আমিও ছোটোবেলা থেকে সেই বদভ্যেসটাই পেয়ে গেছি আর কি!'
'আই সি! তা সে যাই হোক, লোকটি কিন্তু আমাদের খুব খেয়াল রাখে৷ ওই দেখুন না, ঠিক টাইমমতো চা নিয়ে এসে গেছে৷' মেজর আঙুল তুলে দেখালেন৷
তাকিয়ে দেখি, বাগানের পাশের রাস্তাটা ধরে চায়ের ট্রে নিয়ে গণেশ আমাদের দিকেই আসছে৷
দুর্জয়বাবু বললেন, 'ও ভালো কথা৷ রহস্যের কোনো কিনারা হল নাকি মেজর কাপুর?'
মেজর বললেন, 'সত্যি কথা বলতে . . . এখনও পর্যন্ত একটা বিগ জিরো৷ তবে আশা রাখি কাল দুপুরের মধ্যেই ছবিটা পালটে যাবে৷ শুধু . . .'
বলতে বলতে মেজর হঠাৎ চুপ করে গেলেন৷
দুর্জয়বাবু কৌতূহলী হয়ে বললেন, 'শুধু?'
'না, কিছু না৷ দেখা যাক৷'
মেজর এই মুহূর্তে আর কিছু বলতে চান না বুঝে দুর্জয়বাবু অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন৷ ততক্ষণে গণেশ কাপে কাপে চা ঢেলে দিয়ে খাবারের জায়গাগুলো নিয়ে চলে গেছে৷ দুর্জয়বাবু আমাদের সঙ্গে চা খেতে খেতে আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন৷
তখন হঠাৎ মেজর তাঁকে প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা মি. সিংহরায়, সুজয়বাবুর কাছে শুনেছি, রাজশেখরকে নাকি আপনিই এই বাড়িতে নিয়ে আসেন? তা ওনার সঙ্গে আপনার কতদিনের আলাপ ছিল? আর কীভাবেই বা এখানে নিয়ে এলেন ওনাকে?'
দুর্জয়বাবু এক মুহূর্ত স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন মেজরের দিকে৷ তারপর আবার চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, 'আপনি ঠিকই শুনেছেন৷ রাজশেখরকে আমিই এখানে নিয়ে এসেছিলাম৷ কলকাতায় আমার ইলেকট্রনিক গুডসের বিজনেস আছে শুনেছেন তো? আমার সেই দোকানের ম্যানেজার হল চ্যাটার্জি, শোভন চ্যাটার্জি৷ ওর মেয়ের প্রাইভেট টিউটর ছিল রাজশেখর৷'
এতটা বলে একটু চুপ করে রইলেন দুর্জয়বাবু৷ মনে হল পুরোনো স্মৃতি একটু ঝালিয়ে নিচ্ছেন৷ তারপর আবার ধীরে ধীরে বলা শুরু করলেন, 'একদিন সন্ধ্যের পরে আমার চেম্বারে চ্যাটার্জি নিয়ে এল রাজশেখরকে৷ বলল, ওর একটা কাজ দরকার৷ তা আমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখলাম, ছেলেটা বুদ্ধিমান, আর একটা সময় কিছুদিন সে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে কাজ করেছিল৷ তখনই দুম করে আইডিয়াটা আমার মাথায় আসে৷ বহুদিন ধরেই আমাদের মনে হচ্ছিল যে, ঠাকুর্দার কাজকর্মগুলো একটু গুছিয়ে রাখার খুব দরকার৷ তা ওকে বলার সঙ্গেসঙ্গে ও রাজিও হয়ে যায়৷ যদিও সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে চুক্তিটা হয়, কিন্তু টাকার চেয়েও কাজটার প্রতি ওর আগ্রহটাই বেশি ছিল দেখেছিলাম৷'
দুর্জয়বাবু চুপ করেন৷ মেজর এতক্ষণ একমনে কথাগুলো শুনছিলেন৷ এবার একটু যেন গম্ভীরভাবেই বলে ওঠেন, 'হুঁ৷ তা ওই ছেলেটি যে চার মাস ধরে এখানে ছিল, মাণিক্যপ্রতাপের ঘরেও নিশ্চয়ই তার যাতায়াত ছিল নিয়মিতভাবেই, তাই না?'
দুর্জয়বাবু বললেন, 'হ্যাঁ তা তো বটেই৷ সেটাই স্বাভাবিক!'
'সেক্ষেত্রে এক মাস আগে মাণিক্যপ্রতাপের ঘরের সিন্দুক খোলার ঘটনা জানাজানি হতে ওর ওপরে আপনাদের কোনো সন্দেহ হয়নি?'
'একদমই না৷ রাজশেখর ছেলেটার আচার-ব্যবহার যা ছিল, তাতে ছেলেটা যে অসৎ স্বভাবের হতে পারে, এটা আমাদের একবারও মনে হয়নি৷'
আর কিছু না বলে মেজর অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়তে থাকেন৷ দুর্জয়বাবুই আবার যোগ করেন, 'তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপার ছিল৷ ঠাকুর্দার সিন্দুকের দুটো চাবি৷ একটা থাকে আমার কাছে, আমার ঘরের আলমারিতে, আর একটা সুজয়ের কাছে৷ আমার ঘরটা তো সারা সপ্তাহ বন্ধই থাকে, শনি-রবিবার আমি বাড়ি এলে খোলা হয়৷ আর সুজয় চাবিটা কোথায় রাখে তা আমার জানা নেই৷ যেখানেই রাখুক, মোট কথা রাজশেখরের ওই চাবি পাবার তো কোনো সুযোগই ছিল না৷ ওকে সন্দেহটা করি কীসের ভিত্তিতে বলুন৷'
এরপর আর কিছু বলার থাকে না৷ কথাও এরপর আর এগোয় না৷ আগামীকাল দেখা হবে জানিয়ে দুর্জয়বাবু গুড নাইট বলে বিদায় নেন৷
আর তার ঠিক মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই এসে উপস্থিত হলেন সুজয়বাবু৷ তাঁর হাতে একটা চামড়া দিয়ে বাঁধানো জবরদস্ত খাতা৷
'নিন মেজর৷ আপনার কিছু কাজে লাগে কি না দেখুন৷' এই বলে খাতাটা মেজরের দিকে এগিয়ে দিলেন৷ তারপর টেবিলের দিকে তাকিয়েই বলে উঠলেন, 'যাঃ! আপনাদের চা খাওয়া হয়ে গেল?'
অরিন্দম বলল, 'তাতে কী হয়েছে? আর একবার হলেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই৷'
সুজয়বাবু হাসতে হাসতে বললেন, 'অবশ্যই৷ আমি দেখছি৷' বলে বাড়ির দিকে চলে গেলেন৷
মেজরের পাশেই আমি বসে ছিলাম৷ সুতরাং কৌতূহলী নজরটা স্বাভাবিকভাবেই চলে গেল মেজরের হাতের দিকে৷
খাতাটা মাণিক্যপ্রতাপের৷ মেজর এলোমেলোভাবে পাতা ওলটাচ্ছেন৷ ওপর-ওপর দেখে যা বুঝলাম, সেই যে কোথায় যেন পড়েছিলাম, বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার রায়ের একটা খাতা, যার বিভিন্ন রকম নাম ছিল-হিজিবিজি খাতা, এমনি খাতা, ফালতু খাতা ইত্যাদি৷ এও প্রায় সেইরকমই একটা খাতা৷ যাতে মনের নানারকম চিন্তাভাবনা লিখে রাখা হয়েছে৷
মেজর মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ভেরি মিস্টিরিয়াস৷ অ্যান্ড ইন্টারেস্টিং অলসো৷ আজ রাতের ঘুমটার বারোটা বাজল দেখছি৷ নাও দেখো৷'
খাতাটা নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে খুলে ধরি৷ অরিন্দমও ঝুঁকে পড়ে দেখার জন্য৷
ঠিক সেই সময়ে সুজয়বাবু ফিরে এলেন৷ ওনার পেছন পেছন গণেশ, হাতে চায়ের ট্রে৷ চা খেতে খেতে মেজর আর সুজয়বাবু গল্প করেন, আর আমরা দু-জনে মিলে খাতাটা উলটেপালটে দেখতে থাকি৷
দু-চারটে পাতা উলটাতেই বুঝতে পারি, এ বড়ো আজব খাতা৷ কত বিচিত্র কথা, মাথামুন্ডুহীন কত ছড়ার লাইন বা কত অজানা সব শব্দ যে লেখা রয়েছে, তার ঠিক নেই৷
যেমন একটা পাতায় লেখা আছে দেখলাম, নিসার = অসার৷
আবার একটা পাতায় লেখা একটা অঙ্ক-২.৭৭ = ১.৭২ = ৩০৩০
একটা পাতায় আবার অদ্ভুত এক ছড়া-
অভিনেতা রাজাতে
হবে সব সাজাতে
মানিকের খবরে
মায়ার যে কবরে৷
মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল৷ এসবের মানে কী? কিছুই তো বুঝছি না৷ অসার নাহয় বুঝলাম, তার মানে অর্থহীন, অর্থাৎ যার কোনো মানে নেই৷ কিন্তু নিসার মানে কী? এখানে দুটোই সমান দেখানো হয়েছে, তার মানে কি দুটো শব্দেরই মানে একই?
অথবা মায়াই বা কে, যে কবরে রয়েছে? সে কি মাণিক্যপ্রতাপের কোনো পোষা জন্তু ছিল? আর অঙ্কটারই বা কী অর্থ? এরকম ভুলভাল অঙ্ক লিখে রাখার কারণ কী?
আমি আর অরিন্দম মুখ চাওয়াচাওয়ি করি আর দু-জনেই একইসঙ্গে ঠোঁট ওলটাই৷ তার মানে দু-জনের কেউই কিছু বুঝিনি৷
মেজর সুজয়বাবুর সঙ্গে এখনও গল্পে মত্ত৷ অগত্যা খাতাটার আরও দু-চার পাতা উলটে দেখি আর ক্রমাগত হোঁচট খেতে থাকি৷ তবুও চোখ বুলিয়ে যাই আর দেখি, কোথাও লেখা আছে মানিক্যপ্রতাপের ছেলে রুদ্রপ্রতাপের সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব, কোথাও তিনি লিখছেন তাঁর প্রিয় ঘোড়াটির অসুস্থ হয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর মনখারাপের কথা৷
এগুলো তবু বোঝা যায়, কিন্তু তার মাঝে মাঝে এমন এক-একটা হেঁয়ালি ঢুকে আছে যে, তার মানে বোঝা দুষ্কর৷
দেখতে দেখতে খাতার প্রায় শেষ দিকে চলে গেলাম৷ সেখানে একটা পাতায় তিনি সোজাসাপ্টা ভাষায় লিখেছেন ডায়রির মতো করে কয়েকটা লাইন, তারপরের পাতাতেই শুধু একটা চৌকো ঘর কেটে তার মধ্যে লিখেছেন-
পুতে শুরু, পিতায় শেষ,
পুঁতে রাখা ভূতের রেশ৷৷
একটা মস্তবড়ো নিশ্বাস ফেলে সশব্দে খাতাটা বন্ধ করে দিলাম৷ এ খাতা উলটেপালটে আর কোনো লাভ নেই৷ এসব হেঁয়ালির মর্মোদ্ধার করা আমাদের কম্মো নয়৷
খাতা বন্ধ করার শব্দেই বোধ হয় মেজরের এতক্ষণে খেয়াল হল আমাদের কথা৷ আমাদের দিকে তাকিয়ে পলকেই বুঝে ফেললেন আমাদের দুরবস্থা৷ কৌতুকের সেই নিঃশব্দ হাসিটি ফুটে উঠল তাঁর ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়িগোঁফের আড়ালে৷ জানি, কোনো অনুকম্পা নয়, পরম স্নেহ মিশে আছে তার এ হাসিতে৷ আমরা জানি এবং মেজরও জানেন অচিরেই তিনি আমাদের জন্য এই হেঁয়ালির সমাধান করে দেবেন৷
রাত্রে খাবার পর বারান্দায় বসে গল্প করছিলাম অরিন্দমের সঙ্গে৷ মেজর চলে গেছেন তাঁর নিজের ঘরে, হাতে সেই মাণিক্যপ্রতাপের খাতা৷ রাত এগারোটা নাগাদ যখন শুতে যাব, তার আগে একবার মেজরের ঘরে উঁকি মেরে 'গুডনাইট' করতে গেলাম৷ দেখি মেজর তাঁর বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছেন বালিশে হেলান দিয়ে, দু-চোখ সেই খাতায় নিবদ্ধ৷
আমাদের ঘরে ঢুকতে দেখেও চোখ তুললেন না একবারও, শুধু ডানহাতটা একবার তুললেন বিদায় জানানোর ভঙ্গী করে৷ দেখে আরও একবার চমকে গেলাম যেন!
এই কি সেই মেজর মনজিৎ কাপুর, যিনি বেতলার জঙ্গলে দুর্ধর্ষ এক পাগলা বাইসনের সামনে দাঁড়িয়েও নিষ্কম্প হাতে ডাবল ব্যারেল রাইফেলের দু-খানা টোটা ফাঁকা করে দিতে পারেন? অথবা পরেশনাথ পাহাড়ে ভয়ংকর পাইথনের মুখোমুখি হয়েও নিভুÍল লক্ষ্যে তার চোখে বিঁধতে পারেন রিভলবারের গুলি?
একইসঙ্গে কী বিচিত্র সব রূপ এই একটা মানুষের! ঠিক যেমনভাবে কোনো দায়িত্বশীল মিলিটারি অফিসার নিবিষ্টমনে এলাকার ম্যাপ দেখতে দেখতে শত্রুপক্ষকে কবজা করার প্ল্যানিং করেন, তেমনভাবেই যেন মেজর পড়ে চলেছেন এই প্রাচীন খাতা৷ হয়তো এর ভেতর থেকে ভানুমতীর জাদুর মতোই উঠে আসবে কোনো অভাবিত ম্যাজিক, আর আমরা পেয়ে যাব এতদিনের লুকিয়ে রাখা সেই গুপ্তধনের সন্ধান৷
মনে মনে আরেক বার কুর্নিশ জানাই এই অসাধারণ মানুষটিকে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন