যবনিকা ও গুপ্তধন

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

'মিরকাশিম আলি৷ চলতি কথায় মিরকাশিম৷ কুখ্যাত মিরজাফরের জামাই হলেও মিরকাশিম ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন আর স্বাধীনচেতা৷ তাই ইংরেজরা তাঁকে মসনদে বসালেও তাদের অন্যায় দাবি তিনি মেনে নেননি৷ ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ও যুদ্ধ৷ শেষে বক্সার যুদ্ধে হেরে গিয়ে মিরকাশিম পালিয়ে গেলেন উত্তরপ্রদেশে, আর সেখানেই কয়েক বছর পর তাঁর মৃত্যু হল৷

'কিন্তু মারা যাবার আগেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কিছু নিসার তিনি দান করে গেলেন তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুচরকে, যে সুখে-দুঃখে সারাজীবন তাঁর পাশেই থেকেছে৷ সেই অনুচরই হল সুজয়দের প্রাচীন পূর্বপুরুষ, যাঁর হাত দিয়ে নবাবি সম্পত্তি চলে এল সিংহরায় পরিবারের দখলে৷

'তারপর উত্তরপ্রদেশ থেকে বাংলা৷ গোলামি থেকে জমিদারি৷ কয়েক পুরুষের ব্যবধানে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট গেল বদলে৷ বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত অংশে নতুন করে পর্দা উঠল, যখন বংশেরই এক বুদ্ধিমান ব্যক্তির লুকিয়ে রাখা সেই সম্পত্তির সন্ধান পেয়ে গেল একজন বাইরের লোক৷ আর তখনই দানা বাঁধল রহস্য, শুরু হল উত্তেজনা ভরা এক কাহিনি৷'

একটানা এতগুলো কথা বলে দম নেবার জন্য চুপ করলেন মেজর৷ ড্রাইভ করতে করতেই তিনি কথাগুলো বলছেন আর আমরা প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে তাঁর কথা শুনছি৷

একটু আগেই সিংহরায় বাড়ি থেকে আমরা যাত্রা শুরু করেছি শিউটিলার দিকে৷ বৃষ্টি বেশ কিছুক্ষণ আগে থেমে গেলেও রাস্তাঘাটে জলকাদা৷ আর সন্ধ্যের অন্ধকারও নেমে আসছে একটু একটু করে৷ তাই এবার আর হেঁটে নয়, মেজরের জিপেই যাচ্ছি৷ তবে এবার আমাদের চারজনের সঙ্গে আরও দু-জন লোক আছে৷ তারা সুজয়বাবুদের বাড়িরই কাজের লোক৷ মেজরের নির্দেশেই তারা আমাদের সঙ্গে চলেছে শাবল আর কোদাল নিয়ে৷ আমার আর সুজয়বাবুর হাতে দু-খানা হান্টার টর্চও ধরিয়ে দিয়েছেন মেজর৷ আর অবশ্যই আর একজনও আছে আমাদের সঙ্গে, সে হল ক্যাপ্টেন৷ জিপের পেছনে সিটের মাঝখানটায় বসে দিব্যি সে গোধূলিশেষের দৃশ্য দেখে চলেছে৷

মেজরের পাশে সুজয়বাবুকে রেখে বাঁ-দিকের জানলার ধারে বসে ছিল অরিন্দম৷ মেজরকে থামতে দেখে অসহিষ্ণু গলায় সে বলে ওঠে, 'এ তো ইতিহাসের গল্প মেজর! এ তো আমরা সবাই জানি৷ আপনি আসল রহস্যটা খোলসা করুন! রাজশেখর কেনই-বা মারা গেল, শিউটিলার ভৌতিক কাণ্ডটাই বা কী, অথবা কী থেকে আপনি অব্যর্থভাবে বুঝলেন যে শিউটিলাতেই লুকিয়ে রাখা আছে সেই গুপ্তধন? এগুলোই তো আসল রহস্য!'

'কারেক্ট! একদম ঠিক প্রশ্ন করেছ ব্রাদার,' জলে ভরা একটা গর্ত দক্ষ হাতে কাটিয়ে নিয়ে বললেন মেজর, 'তবে একটু একটু করে সব প্রশ্নেরই উত্তর তুমি পেয়ে যাবে৷ মুঘল ইতিহাস থেকে নবাবি আমল, সেখান থেকে বাংলার ইতিহাস, এমনকী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যন্ত সব এখানে একসূত্রে বাঁধা পড়েছে ব্রাদার৷'

'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস?' অবাক হয়ে বলি, 'এর মধ্যে সাহিত্য আসছে কোত্থেকে মেজর?'

'আসছে ব্রাদার আসছে৷ ওই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, বিশেষ করে বাংলার প্রাচীন সাহিত্য আছে আমাদের এই রহস্যের মূলে৷'

'বাংলার প্রাচীন সাহিত্য? মানে ওই চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, ব্রজবুলি এইসব?'

'হ্যাঁ সুজয়৷ তোমার ঠাকুর্দা মাণিক্যপ্রতাপ ছিলেন তোমাদের বংশের একজন ব্যতিক্রমী পুরুষ৷ জমিদারি রক্ত তাঁর শিরায় শিরায় বইলেও আসলে তিনি ছিলেন একজন বই-পাগল মানুষ৷ আর তাঁর প্রিয় বিষয় যে ছিল এই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, তা আমি তাঁর বইপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে টের পাই৷ আবার তার পাশাপাশি রহস্য বা হেঁয়ালি জিনিসটাও ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়৷ ফলে বাংলার প্রাচীন সাহিত্য চর্যাপদের দিকে তিনি যে আকৃষ্ট হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী? কারণ . . .'

আমি বলে উঠি, 'বুঝেছি মেজর৷ কারণ ওই চর্যাপদের মধ্যে হেঁয়ালি ভাষাই প্রয়োগ করা হত৷ যেমন সন্ধ্যাভাষা বা ব্যজস্তুতি বা . . .'

'রাইট ব্রাদার,' মেজর হাসিমুখে বলেন, 'এই চর্যাপদে সাধারণত তিন ধরনের হেঁয়ালি প্রয়োগ করা হত৷ সন্ধ্যাভাষা হল আলো-আঁধারি ভাষা, যা খানিকটা বোঝা যায়, খানিকটা যায় না৷ ব্যজস্তুতি হল মুখোশের আড়ালে কথা, অর্থাৎ শুনলে আপাতভাবে যা মনে হবে, আসলে বলা হচ্ছে ঠিক তার উলটো৷ আর তৃতীয় হল দ্ব্যর্থক ভাষা, অর্থাৎ একই বাক্য বা শব্দের দুটো অর্থ৷ বুদ্ধিমান মাণিক্যপ্রতাপ হয়তো বুঝেছিলেন যে এই নিসারগুলি প্রকাশ্যে রেখে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না, আর কোনোভাবে এর থেকে কোনো উপকার পাওয়ার আশু সম্ভাবনা নেই, তাই ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা, এই দুই কারণে তিনি এগুলো লুকিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করলেন৷ আর সেটা করলেন এমন এক গুপ্তস্থানে, যার ঠিকানা লেখা থাকল ওই তুলোট কাগজের চিরকুটে, আর তার ভাষা হল চর্যাপদের সেই দ্ব্যর্থক ভাষা৷'

'আচ্ছা! সেই জন্যেই ওইরকম লাইন লেখা হয়েছে?' অরিন্দম চমৎকৃত, 'ভূতে ভূতেই চলে, এই দু-বার ভূতের একটা মানে হল আগে, আর একটা মানে হল পূর্ব দিকে?'

'শুধু তাই না,' মেজর বললেন, 'ছড়াটির প্রথম থেকে শেষ লাইন পর্যন্তই এই দ্ব্যর্থক শব্দের দুর্দান্ত প্রয়োগ৷'

আমি বললাম, 'কিন্তু মেজর, ওই প্রথম লাইনটারই তো মানে এখনও জানি না আমরা৷ ওই যে, মাপ করী যেই তিন শূন্য তিরিশ?'

'হুঁ৷ সেটাই তো আসল মজা ব্রাদার৷ মাণিক্যপ্রতাপের দুর্ধর্ষ বুদ্ধির নমুনা৷ আচ্ছা, লক্ষ করেছ কি, ওই লাইনটাতে একটা বানান ভুল আছে?'

'হ্যাঁ মেজর,' উৎসাহের সঙ্গে বলি, 'করী বানানটা ভুল৷ কোনো কিছু করাকে আমরা লিখি হ্রস্ব-ই দিয়ে, যেমন খেলা করি, গান করি, কিন্তু এখানে আছে মাপ করী, অর্থাৎ দীর্ঘ-ঈ, তাই তো?'

মেজর উত্তর দিলেন, 'ইয়েস ব্রাদার, সাধারণ চোখে দেখলে তাই মনে হবে, কিন্তু এখানে ঠিক ওই বানানটাই লিখতে চাওয়া হয়েছে৷ কারণ মাপটাই যে করা হয়েছে 'করী' দিয়ে এবং 'করী' থেকে!'

মেজরের কথার কিছুই বুঝতে না পেরে হাঁ করে মেজরকে দেখি৷ মেজর একটু হাসেন৷ ততক্ষণে পুরো অন্ধকার নেমে গিয়ে রাস্তা দেখার অসুবিধে হচ্ছে৷ জিপের হেডলাইটটা জ্বেলে দেন মেজর৷ বাইরের দিকে দেখি৷ আমরা সেই হরেনের দোকানের কাছাকাছি চলে এসেছি৷

মেজর বলেন, 'এক্ষুনি আমরা পৌঁছে যাব টিলার নীচে৷ তার আগে তোমাদের ছড়ার ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে করে দিই৷ আচ্ছা সুজয়, তোমাদের গণেশকে তোমার ঠাকুর্দা গজানন বলে ডাকতেন, তাই না?'

সুজয়বাবু মাথা নেড়ে সায় দেন৷ মেজর বলেন, 'সেটা কেন বলো তো? কারণ গণেশঠাকুরের মুখটা হাতির মতো৷ সেই থেকেই গজানন৷ সেই একই কারণে তোমাদের মেইন গেটের মাথায় গণেশের মূর্তিটাকেও গজানন বলা যায়, তাই না? এইবার দেখো বাংলা ভাষার খেলা৷ যেটা আমরা বানান ভুল বলে ভাবছি, আসলে সেটা একটা অর্থবহ শব্দ৷ 'করী' কথাটার মানে হল হাতি, অর্থাৎ গজ, যা দিয়ে আবার দূরত্বও মাপা হয়৷ ওই যে, তিন ফুটে এক গজ৷ অর্থাৎ এখানে মাপটাও গজে, আর তার শুরুও গজ থেকে, মানে ওই গেটের গণেশ মূর্তি থেকে৷ এটাই হল সেই দ্ব্যর্থক শব্দের আরেক নমুনা৷'

অপূর্ব! অসাধারণ! মাণিক্যপ্রতাপ সিংহরায় যদি আজ জীবিত থাকতেন, তাঁর পায়ে একটা প্রণাম ঠুকে আসতাম৷

মেজর বলে চলেছেন, 'তাহলে কী দাঁড়াল? গেটের গণেশের মূর্তি থেকে তিন শূন্য তিরিশ গজ দূরত্বে আমাদের পৌঁছোতে হবে৷ এটাও একটা ধাঁধা৷ প্রথমে আমি নামতার কথা ভেবে তিরিশ ইউনিটই ভাবছিলাম৷ কিন্তু খাতার ওই অঙ্কটাই আমার ভুল ভাঙিয়ে দিল৷ ওখানে ছিল ২.৭৭ = ১.৭২ = ৩০৩০৷ এই অঙ্কটা দেখতে দেখতেই বিদ্যুতের মতো আসল ব্যাপারটা মাথায় এসে গেল৷ ওই তিন শূন্য তিরিশ আসলে তিন হাজার তিরিশ৷ অর্থাৎ ছড়া অনুযায়ী দূরত্বের মাপটা হবে ৩০৩০ গজ৷ সেক্ষেত্রে অঙ্কের ৩০৩০-টা যদি গজ হয়, তাহলে বাকি অঙ্ক দুটোর ইউনিট কী? খুব সহজ৷ নিশ্চয়ই দূরত্বেরই অন্য ইউনিট! এবার একটু হিসেব করতেই পুরো অঙ্কটা দাঁড়াল: ২.৭৭ কি.মি. = ১.৭২ মাইল = ৩০৩০ গজ৷ কিন্তু এই ৩০৩০ গজ দূরত্বের জায়গাটা তাহলে কোথায়? ভাবতে ভাবতে আবছাভাবে মনে পড়ল সকালে ওই টিলার দূরত্ব নিয়ে তোমাদের আলোচনা৷ পৌনে দু-মাইল, পৌনে তিন কিমি, এই সব বলছিলে না তোমরা? ব্যস, দুয়ে দুয়ে চার৷ অর্থাৎ আমাদের লক্ষ্যস্থল একটাই-শিউটিলা৷'

অরিন্দম বলল, 'বাঃ! চমৎকার! তার মানে গোড়া থেকে ছড়াটার মানে দাঁড়াচ্ছে, বাড়ির গেট থেকে ৩০৩০ গজ মাপ করে যেতে হবে, যেখানে কদম গাছের নীচে গিরীশ অর্থাৎ নটরাজ নাচছেন, তবে তার আগে চলতে হবে পূর্ব দিকে; বেশ, এই পর্যন্ত মিলল৷ কিন্তু তারপর? শেষ অংশটা? তার মানে কী মেজর?'

'বলব৷ সেটাও বলব৷ কিন্তু টিলায় উঠতে উঠতে৷' বলে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করেন মেজর৷ চমকে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি, উত্তেজনার মাথায় খেয়ালই করিনি কখন আমরা এসে পৌঁছে গেছি শিউটিলার নীচে৷ সেখানে সেই পায়ে চলা রাস্তাটার কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়েছেন মেজর৷

Cov13

একে একে আমরা জিপ থেকে নামি৷ ক্যাপ্টেন আগেই লাফ দিয়ে নেমে ছুটে যায় টিলার দিকে৷ মেজর সুজয়বাবুর থেকে টর্চটা নিয়ে সেটা জ্বেলে এগিয়ে যান৷ পেছন পেছন আমরা৷ আমার হাতেও হান্টার টর্চের তীব্র আলো৷

ভিজে মাটি৷ গাছপালা থেকে একটা বুনো গন্ধ ভেসে আসছে৷ সাবধানে পা ফেলে উঠতে থাকি আমরা৷ অন্ধকারের মধ্যে এই অভিযান, বনজঙ্গলের অজানা আতঙ্ক, তার সঙ্গে গুপ্তধন খুঁজে পাবার আশা, সব মিলিয়ে একটা গা ছমছমে ভাবের সঙ্গে রোমাঞ্চ মিলেমিশে অবর্ণনীয় মনের অবস্থা৷

চুপচাপ হেঁটে চলছিলাম৷ টিলার ওপরটায় উঠে মেজর নিজেই আবার কথা শুরু করেন, 'সুজয়, তোমার ঠাকুর্দা একটা সময় বেশ কিছুদিন রাত্রের দিকে একা একা এই টিলায় আসতেন, তুমি জানো?'

সুজয়বাবু অবাক হয়ে বললেন, 'কই না! সেরকম কিছু তো শুনিনি কখনো?'

মেজর বললেন, 'কেউ জানে না৷ জানার কথাও না৷ তবে আমি অনুমান করেছিলাম৷ অনেকগুলো কার্যকারণ থেকে আমার কেন জানি না এরকম একটা কথা মনে হয়েছিল৷ আর আমার সেই আন্দাজটাই মিলে গেল গণেশের কথা থেকে৷ তোমাদের বাড়িতে একমাত্র সে-ই ব্যাপারটা জানত, কিন্তু মাণিক্যপ্রতাপের বারণ ছিল বলেই এতদিন সে কাউকে কিছু বলেনি৷ আসলে তিনি আসতেন এই গুপ্তধন লুকিয়ে রাখারই ব্যবস্থা করতে৷ আর তাই শিউটিলায় লোকে আলো দেখতে পেত, এমনকী দু-একবার গুলির আওয়াজও যে শোনা গেছে, তা তাঁরই বন্দুকের৷ হয়তো কোনো বন্যজন্তু বা সাপখোপ মারার জন্য তিনি ফায়ার করতেন৷ আর এইসবই লোকে ভূতুড়ে কাণ্ড বলে মেনে নিয়েছিল৷'

এতক্ষণে আমাদের কাছে পরিষ্কার হল টিলার ভূতুড়ে রহস্য৷ ততক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছেছি সেই শাল গাছের সারির সামনে৷ হঠাৎ মনে পড়ল রাজশেখরের কথা৷ এরকমই এক সন্ধ্যায় এখানে এসে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল৷ কিন্তু তার পেছনেও কি কোনো রহস্য আছে? চলতে চলতে সে কথাই জিজ্ঞেস করি মেজরকে৷

উত্তরে মেজর বললেন, 'না ব্রাদার৷ রাজশেখরের মৃত্যু নিয়ে কোনো রহস্য নেই৷ যেমন নেই ওই সিন্দুকের চুরি নিয়ে৷ যদিও প্রথমে আমি অন্যরকমই ভেবেছিলাম৷ শুধু রাজশেখর নয়, তার পেছনে আর কারও মদত আছে বলে মনে হয়েছিল৷ এমনকী, কিছু মনে কোরো না সুজয়, তোমার দাদাও আমার সন্দেহের বাইরে ছিলেন না৷ তাই গতকাল কলকাতায় আমার এক বন্ধুকে ফোন করে তোমার দাদার ব্যাবসার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে বলি৷ মানে তাঁর ব্যাবসার হালচাল কীরকম, ঠিকমতো চলছে কি না, এইসব৷ আজ দুপুরে তার কাছ থেকে পজিটিভ রেজাল্ট পেয়ে আশ্বস্ত হই৷'

সুজয়বাবু নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, ' ওঃ! বাঁচালেন মেজর৷'

মেজর বললেন, 'খবরটা জানার পর আমি নিজেও কম আশ্বস্ত হইনি সুজয়৷ তারপর আরও নানা খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে অবশেষে সিদ্ধান্তে এলাম যে, রাজশেখরই হচ্ছে এ খেলার একমাত্র প্লেয়ার৷ মাণিক্যপ্রতাপের কাজকর্ম নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে তাঁর খাতা, আর ওই চিরকুটের লেখা, দুটোই তার নজরে পড়ে৷ খাতাটা স্টাডি করে সেও ওই পূর্ব ইতিহাস জানতে পারে, সেইসঙ্গে চিরকুটের লেখা, দুটোই তার নজরে পড়ে৷ চিরকুটের ওই ছড়া যে আসলে গুপ্তধনের ম্যাপ, সেটাও সে আন্দাজ করে৷ খাতাটা নিজের কাছে রাখতে পারলেও চিরকুটটার ব্যাপারে সন্দেহ হতে পারে ভেবে সেটা তাকে চুরি করতে হয়৷ না, তার জন্যে নকল চাবি তাকে করতে হয়নি৷ তার বদলে সহজ একটা কাজ করে সে৷ সিন্দুক থেকে চিরকুটটা নিয়ে সকলের অলক্ষ্যে পেছনের জানলা দিয়ে বাগানে ফেলে দেয়৷ তারপর বাড়ির পেছন দিয়ে বাগানে গিয়ে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে আসে৷ ভেরি সিম্পল৷'

অরিন্দম বলল, 'বুঝেছি৷ তারপর চিরকুট থেকে একটু একটু করে হেঁয়ালির মর্মোদ্ধার করে সে এখানে আসে গুপ্তধন উদ্ধারে, আর তখনই সাপের কামড়ে সে মারা যায়৷ ব্যস, গপ্পো শেষ৷ তাই তো মেজর?'

মেজর মাথা নাড়েন, 'রাইট৷ কিন্তু আর কথা নয়৷ ওই দেখো কদম গাছটা দেখা যাচ্ছে৷ আমরা এসে পড়েছি৷ এবার গুহার ভেতর ঢোকার জন্য তৈরি হও৷ আমি সামনে থাকছি৷ আকাশ, তুমি সবার পেছনে এসো৷ তাহলে সামনে পেছনে আলো দেখে সবাই ভালোভাবে হাঁটতে পারব৷'

দিনের বেলাতেই গুহায় ঢুকতে বেশ কষ্ট হয়েছিল৷ আর এখন তো রাতের অন্ধকার৷ তবু বুকের মধ্যে উত্তেজনার দপদপানি, পাশাপাশি দুঃসাহসের হাতছানি, এইসব মিলিয়ে মনের জোরে সব ভয় কাটিয়ে আমরা গুহার মধ্যে ঢুকে পড়ি৷

মিশমিশে কালো অন্ধকার৷ শুধু দুটো হান্টার টর্চের তীব্র আলো ঘোরাফেরা করছে৷ কারও মুখে কোনো কথা নেই৷ মাঝে মাঝে ক্যাপ্টেন শুধু ডেকে উঠছে গম্ভীর গলায়৷ আর আমার সামনে থাকা কাজের লোক দুটোর হাতে শাবল-কোদালের ঠং ঠং শব্দ উঠছে৷

ধীরে ধীরে সিঁড়ির ধাপগুলো অতিক্রম করে আমরা নেমে এলাম নীচে৷ তারপর খানিকটা হাঁটার পরে সেই মন্দিরের দরজার মতো ফ্রেমের গোড়ায় এসে মেজর দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ সুজয়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'সুজয়, শিশিটা বার করো৷'

সুজয়বাবু একটা হাফহাতা পাঞ্জাবি পরে ছিলেন৷ পকেট থেকে একটা ছিপি আঁটা শিশি বার করে তিনি মেজরের হাতে দিলেন৷ অন্য পকেট থেকে বার করলেন কয়েকটা লম্বা সাদা দড়ির মতো জিনিস৷

সেগুলো নিয়ে এবার মেজর প্যাসেজের ধারের কুলুঙ্গিতে রাখা প্রদীপগুলোর কাছে এগিয়ে যেতেই ব্যাপারটা বোঝা গেল৷ প্রদীপগুলো জ্বালাবেন বলে মেজর তেল আর সলতে নিয়ে এসেছেন৷

তেল ঢেলে সলতে দিয়ে গোটা চারেক প্রদীপ জ্বালতেই গুহার ভেতরটা আলোময় হয়ে উঠল৷ আমরা একেকজন একেকটা প্রদীপ হাতে নিয়ে এগিয়ে চললাম মন্দিরের দিকে৷

এতক্ষণ থম মেরে ছিলাম৷ এবার আলো দেখে বুকে সাহস ফিরে এসেছে৷ তাই মেজরকে প্রশ্ন করি, 'এবার তাহলে বাকি ধাঁধার উত্তরটা দিন মেজর৷'

মেজর বললেন, 'আর বাকি কোথায় রইল? সবই তো মিটে গেল৷ রাজশেখর মারা গেল, আমরা এলাম, ছড়ারও রহস্য ভেদ হল, এবার শুধু গুপ্তধনটা হাতে পাওয়ার অপেক্ষা৷'

'কিন্তু কোথায়? কোনখানে সেই গুপ্তধন?' অধৈর্য অরিন্দম৷

মেজর বললেন, 'ঠিক যেখানে থাকার কথা৷ ওইখানে৷'

বলে হাত তুলে দেখালেন৷ আমরা তাকালাম৷ আমাদের সামনে সেই নটরাজ মন্দির৷ আলো-আঁধারির মধ্যে এক অপরূপ সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে৷ আমাদের সঙ্গের লোক দু-টি মন্দিরটা দেখামাত্র মাটিতে উপুড় হয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল৷

আমরা ওখানেই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ সেই অবস্থায় মেজর মুখ খুললেন, 'তোমাদের শেষ চমকটা দেব বলেই এই পর্যন্ত আসার আগে আমি হেঁয়ালির শেষ উত্তরটা বলিনি৷ এবার শোনো৷ মাণিক্যপ্রতাপের খাতার সেই চার লাইনের হেঁয়ালি ছড়াটা মনে আছে? অভিনেতা রাজাতে/হবে সব সাজাতে/মানিকের খবরে/মায়ার যে কবরে? গুপ্তধনের প্ল্যানিংটা করার পর তিনি ওটা লিখেছিলেন৷ প্রথম দুটো লাইন তো সকালেই বোঝা গেছে, নটরাজেই সাজানো হবে ছক, আর তৃতীয় লাইনের মানিক যে মাণিক্যপ্রতাপ নিজে, সেটাও বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হয় না৷ কিন্তু মায়ার? এর মানে কী? এটাই হল মস্ত একটা বোকা বানানো ধাঁধা৷ আমি কিছুতেই সেটা ধরতে পারতাম না, যদি না ওই 'জননীটির কোলে মুদ্রা খোঁজার ব্যাপারটা বুঝতে পারতাম৷ এই জননীটি কে জানো?'

মেজর থেমে আমাদের সবার মুখের দিকে তাকান৷ আমরা যথারীতি নির্বাক৷ মেজর বললেন, 'চলো দেখাই৷'

এই বলে লোক দু-টিকে সঙ্গে আসতে নির্দেশ দিয়ে আমাদের নিয়ে উঠে পড়েন মন্দিরে৷ আমরা একে একে দালানে উঠে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করি৷ হাতের প্রদীপগুলোকে দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখা হয়৷ চারটে প্রদীপের আলোয় মন্দিরের ভেতরটা এখন অনেক উজ্জ্বল৷

চকচকে কালো তাণ্ডবরত মূর্তির দিকে তাকিয়ে মেজর বলতে থাকেন, 'তোমরা নটরাজ মূর্তি কখনো খুঁটিয়ে দেখেছ?'

আমরা তিনজনেই বিব্রত মুখে মাথা নাড়ি৷ মেজর বলেন, 'খুব স্বাভাবিক৷ আমরা কেউই দরকার না পড়লে খুব খুঁটিয়ে কিছু দেখি না৷ তবে আমার ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার কী ঘটে জানো, কোনো দেখা জিনিসে যদি কোনো অসংগতি থাকে, আমার মনে একটা খটকা লাগে৷ আজ সকালে মাণিক্যপ্রতাপের ঘরে তেমনই একটা খটকা লেগেছিল, কিন্তু কেন, সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না৷ দুপুরে ছড়াটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আর অভিধানটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে আচমকাই সেটা মাথায় এসে গেল৷ আর তারও মূলে একটা দ্ব্যর্থক শব্দ-মুদ্রা৷ ইয়েস৷ মুদ্রা মানে তো শুধুই কয়েন নয়, তার আরও একটা মানে আছে, ভঙ্গিমা বা আঙুলের বিন্যাস৷ সঙ্গেসঙ্গে নেট সার্ফিং করে বুঝলাম যে, প্রথামাফিক নটরাজের সঙ্গে এই নটরাজের মূর্তির একটি মুদ্রার পার্থক্য আছে৷ তাই সকালে সেই মিনিয়েচার মূর্তিটি দেখে আমার খটকা লেগেছিল৷'

অরিন্দম বলল, 'ও! তাই অমন ব্যস্ত হয়ে আমাদের কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে ফটো দেখতে চাইলেন?'

মেজর হেসে বললেন, 'তা ছাড়া উপায় কী বলো? ওই ফটো দেখেই তো নিশ্চিত হলাম আর বুঝলাম, এইজন্যেই ছড়ার শেষ লাইনে লেখা হয়েছে-মুদ্রা বুঝে মুদ্রা খুঁজে ফিরিস৷ সুতরাং এখন আমাদের একটাই কাজ, মুদ্রাটা বোঝা৷'

Cov14

সুজয়বাবু অধীর হয়ে বললেন, 'কিন্তু সেটা কোন মুদ্রা মেজর? তফাতটা কোথায়?'

মেজর বললেন, 'ওই যে, মূর্তির হাতগুলো লক্ষ করো৷ পেছনের দুটো হাত উপর দিকে উঠে আছে, তাতে একটায় ডমরু, আর একটায় আগুন৷ আর সামনে নাচের মুদ্রায় দুটো খালি হাত৷ ডান হাতে বরাভয়ের ভঙ্গি, আর বাঁ-হাত নীচে নামানো৷ তফাতটা ওই বাঁ-হাতেই৷ যে কোনো নটরাজ মূর্তির ওই হাতের সব আঙুলগুলো নীচে নামানো থাকে, কিন্তু এখানে শুধু তর্জনীটা উঠে আছে আর নির্দেশ করছে ঘরের বায়ু কোণের দিকে৷ সুতরাং মুদ্রাটা সঠিকভাবে বুঝলে সেই গুপ্তধন অবশ্যই থাকবে ওই বায়ু কোণে, জননীটির কোলে৷ এবার সেই ধাঁধা৷ এত গোলমেলে, অথচ কী সহজ! জননী মানে কী? মা৷ সুতরাং একসঙ্গে জননীটি বললে বোঝায় মাটি৷ অতএব গুপ্তধন ওখানেই, মাটির তলায়৷ এখন দেখা যাক, আমাদের অঙ্কটা মিলল কি না৷'

মেজর ইঙ্গিত করলেন, সেই লোক দু-টি এগিয়ে গেল৷ ঘরটার মেঝেতে চৌকো পাথর কেটে কেটে বসানো৷ মেজরের দেখানো জায়গা অনুযায়ী এবার শাবল আর কোদালের খেলা৷ দুটো বড়ো পাথর সরিয়ে ফেলা হয়৷ তারপর খানিকটা মাটি খুঁড়তেই একটা ধাতব আওয়াজ৷ দুটো জোরালো টর্চের আলোয় এবার মাটি থেকে উঠে আসে কারুকার্য করা একটা ধাতুর ছোটো বাক্স৷

মেজর সেটা তুলে দেন সুজয়বাবুর হাতে, 'তোমাদের সম্পত্তি, তুমিই খোলো সুজয়৷'

সুজয়বাবু একটু ইতস্তত করে ছোট্ট হুড়কোটা খুলে ডালা তুলে ধরেন৷ বাক্সের ভেতর থাকে থাকে সাজানো গোল গোল চাকতি, যার ওপরে ইতিহাস বইতে দেখা ছবির মতো অস্পষ্ট অক্ষর, আর যার গায়ের হলদে রং বেশ অস্পষ্ট বোঝা যায়৷

* * * *

রাত প্রায় ন-টা৷ মনের মধ্যে তুমুল তৃপ্তি নিয়ে ফেরার পথ ধরেছি আমরা৷ সুজয়বাবু রাজি হয়েছেন এই মন্দির আর গুহা সংস্কার করে আবার সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত করে দিতে৷ শালের সারির মধ্যে দিয়ে ফিরতে ফিরতে মেজরকে বললাম, 'তাহলে আর মাত্র দুটো খটকাই বাকি রয়ে গেল মেজর৷'

খোশমেজাজে পাইপ ধরিয়েছিলেন মেজর৷ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললাম, 'মায়ার যে কবরে কথাটার মানে বোঝা গেল না!'

'কেন, বললাম যে জননীটি বুঝে ফেললেই এটাও বোঝা যাবে! ওই তো, মায়া মানে মোহ৷ এবার একসঙ্গে লিখলে মায়ার, অর্থাৎ মোহর৷ তার মানে কবরে বা মাটির নীচে মোহর রইল, আর সেই খবরটা রইল মাণিক্যপ্রতাপের কাছে৷ সিম্পল৷ তোমার দ্বিতীয় খটকা?' মেজর জানতে চান৷

'সেটা ওই খাতার শেষ ছড়াটা নিয়ে৷ ওই যে, পুতে শুরু, পিতায় শেষ/পুঁতে রাখা ভূতের রেশ৷ এটা তো বোঝা গেল না!'

মেজর ভুরু কুঁচকে তাকালেন, 'সে কি? সেটা এখনও বোঝোনি? এখানে কীসের মূর্তি আছে?'

'নটরাজের৷'

'আর সুজয়দের বাড়ির গেটে?'

'গণেশ৷'

'তা এর মধ্যে কে বাবা, আর কে ছেলে?'

হাঁ করে তাকিয়ে থাকি৷ মেজর বলেন, 'এখনও বুঝলে না? নটরাজ মানে তো শিব৷ তাহলে শিব হল বাবা, আর তার বড়ো ছেলেই তো গণেশ, তাই না? এবার ভাবো, এই গুপ্তধনের যাত্রা শুরু কোনখান থেকে? গেটের গণেশ মূর্তি অর্থাৎ পুতে শুরু, আর শেষ হচ্ছে পিতায়, মানে নটরাজে৷ সেখানেই পুঁতে রাখা আছে ভূতের রেশ অর্থাৎ অতীতের স্মৃতি৷ বোঝা গেল?'

এই সহজ ব্যাপারটা না বোঝার জন্য বেশ লজ্জিত হয়ে পড়ি৷ আর ক্যাপ্টেনও যেন আমার নির্বুদ্ধিতায় বেশ মজা পেয়েই ডেকে ওঠে আকাশের দিকে মুখ তুলে৷ তাকিয়ে দেখি, এতক্ষণে আকাশের মেঘলা ভাব কেটে গিয়ে চাঁদ উঠেছে৷ সেই চাঁদের আলোয় জঙ্গলের ভয়ংকর রূপটা বদলে গিয়ে সে যেন হয়ে উঠেছে মায়াবতী রূপকন্যা৷

Cov15
অধ্যায় ১১ / ১১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%