কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
'এডওয়ার্ড লিয়ারের নাম শুনেছ ব্রাদার?'
চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই৷ না, আমাকে নয়, আমার ফটোগ্রাফার বন্ধু অরিন্দম রায়ের দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন মেজর মনজিৎ কাপুর৷ তাঁর ফ্রেঞ্চকাট গোঁফদাড়ির ফাঁকে খেলা করছে একটা চাপা কৌতুকের ঝিলিক৷
যাক, মেজর তাহলে তাঁর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছেন৷ এতক্ষণ বাদে যেন খানিকটা নিশ্চিন্ত হই৷
সেই যে কবেকার রদ্দিমার্কা তুলোট কাগজে লেখা, মাথামুণ্ডুহীন একটা পাঁচ লাইনের ছড়া নিয়ে এতক্ষণ বুঁদ হয়ে বসে ছিলেন তিনি, তাতে রীতিমতো বোর ফিল করছিলাম আমরা৷ অথচ বহুদিনের অভিজ্ঞতায় জানি যে, এরকম সময়ে মেজরকে একতিল ডিস্টার্ব করা যাবে না৷
অগত্যা গণশার এনে দেওয়া চিকেন পকোড়া আর চায়ের সঙ্গে আমরা যে-যার মতো সময় কাটাচ্ছিলাম৷ অরিন্দম বসে বসে একটা ফিল্মি ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল, আমি বাগানের সাদা মার্বেলের মূর্তিগুলো দেখতে ব্যস্ত ছিলাম, আর সুজয়বাবু বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে আকাশের শোভা দেখছিলেন৷
এখন তড়িঘড়ি বারান্দায় ছড়ানো বেতের চেয়ারগুলোতে মেজরকে ঘিরে বসে পড়ি আমরা৷ এতক্ষণ পরে মেজর যখন মুখ খুলেছেন, তার মানে নিশ্চয়ই তাঁর দুর্ধর্ষ মগজ এই জমিদারবাড়ির জোড়া রহস্য সমাধানের কোনো রাস্তা খুঁজে পেয়েছে৷
কিন্তু ততক্ষণে মেজরের হঠাৎ-প্রশ্নের ধাক্কায় বেচারা অরিন্দমের মুখটা হয়েছে দেখার মতো৷ রীতিমতো বিব্রত হয়ে সে একবার আমার দিকে তাকায় তো একবার সুজয়বাবুর দিকে৷ যেন ওই এডওয়ার্ড লিয়ারের পরিচয় আমাদের মুখেই লেখা আছে৷ তারপর কোনোরকমে স্মার্ট হবার চেষ্টায় বলে ওঠে, 'না . . . মানে . . . মেজর, এডওয়ার্ড জেনারের নাম তো শোনা, সেই যিনি বসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন৷ কিন্তু এডওয়ার্ড লিয়ার নামে কেউ . . .'
'হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ,' অট্টহাস্যে লনের গাছ থেকে পাঁচটা টিয়া আর দুটো শালিখ উড়িয়ে দিয়ে মাথা নেড়ে বলেন মেজর, 'রিয়্যালি ব্রাদার, য়্যু আর আ জিনিয়াস!'
অরিন্দম হতভম্বের মতো বলে, 'কেন? কী হল? আমি কি কিছু ভুল বললাম মেজর?'
মেজর হাসিমুখেই বলেন, 'নো নো, নট অ্যাট অল৷ নামের প্রথমে এডওয়ার্ড থাকলেই তো হল, কী বলো? হাঃ হাঃ হাঃ . . .'
হাসতে হাসতে মেজর নিমেষে সিরিয়াস, 'শোনো ব্রাদার৷ এডওয়ার্ড নামের অন্তত তিন ডজন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম সারা পৃথিবী জুড়ে৷ সে তোমার ডা: এডওয়ার্ড জেনারই হোক, বা লেখক এডওয়ার্ড কামিংস, অথবা শিল্পী এডওয়ার্ড হপার, কিংবা ধরো বংশপরম্পরায় এডওয়ার্ড নামে ইংল্যান্ডের রাজারা; কিন্তু এডওয়ার্ড লিয়ার একজনই৷ যিনি একাধারে ছবি-আঁকিয়ে, অলংকরণ শিল্পী, লেখক ও কবি৷ তবে তাঁর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব, লিমেরিক নামে পাঁচ লাইনের এক অদ্ভুত ননসেন্স ছড়ার সৃষ্টি, যা যুগে যুগে দেশে দেশে সমাদৃত হয়েছে এবং এখনও হয়ে চলেছে৷'
প্রবল উৎসাহে হাঁকপাঁক করে বলে উঠি, 'হ্যাঁ মেজর, বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লিমেরিক নামে ছড়া ছাপা হয় দেখেছি বটে৷'
'ইয়েস, ইউ আর রাইট,' চা শেষ করে কাপটা নামিয়ে রেখে মেজর বলতে থাকেন, '১৮৪৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম লিমেরিকের বই 'A Book of Nonsense', আর সেই থেকে আজও পৃথিবীর নানান ভাষায় কত অসংখ্য লিমেরিক যে লেখা হয় এবং কত বিভিন্ন বিষয়ে, তার হিসেব পাওয়া দুষ্কর৷ এবং এই যে দেখছ-'
হাতের পাকানো কাগজটা তুলে ধরেন মেজর, 'প্রায় সত্তর বছরের পুরোনো এই তুলোট কাগজের পাণ্ডুলিপি, এতে লেখা ছড়াটিও সেই ধারারই একটি উজ্জ্বল নিদর্শন৷'
আমরা সমস্বরে বলে উঠি, 'তাই নাকি?'
'ইয়েস ব্রাদার,' মাথা নাড়েন মেজর৷
যদিও অনেক আগেই কাগজের লেখাটা পড়েছি কয়েকবার এবং বারবার পড়েও কিছুই বুঝতে পারিনি, তবু মেজরের কথা শুনে আরও একবার তাতে চোখ বুলোই৷ প্রায় দশ ইঞ্চি লম্বা চার ইঞ্চি চওড়া চিরকুটটায় শুধু লেখা আছে পাঁচটি লাইন-
মাপ করী যেই তিন শূন্য তিরিশ,
এক পা গাছে দিব্যি নাচে গিরীশ;
ভূতে ভূতেই চলে
জননীটির কোলে
মুদ্রা বুঝে মুদ্রা খুঁজে ফিরিস৷
যথারীতি কিছুই না বুঝে চুপ করে থাকি৷ কিন্তু সুজয়বাবু হঠাৎ চোখ বড়ো বড়ো করে বলে ওঠেন, 'কিন্তু মেজর, এই ছড়া লেখা কাগজটাই তো চুরি হয়েছিল ঠাকুর্দার সিন্দুক থেকে, যা খুঁজে পাওয়া গেছে মৃত রাজশেখরের ড্রয়ারে, আর এরই জেরক্স করা কাগজটা আমরা পেয়েছি জঙ্গলের মধ্যে, তার মৃতদেহের হাতের মুঠোয়৷ তাহলে কি রাজশেখরের মৃত্যুর সঙ্গে এই ছড়াটার কোনোরকম যোগ আছে? আপনি কিছু বুঝতে পেরেছেন? আর ছড়াটায় আছেই বা কী? আমরা তো এতদিন ধরে চেষ্টা করেও একটা জব্বর হেঁয়ালি ছাড়া আর কিছুই বুঝিনি৷'
মেজর গম্ভীরমুখে বলে ওঠেন, 'মাই ডিয়ার সুজয়, ভুলে যেয়ো না, এই লেখাটা লিখেছেন তোমার শ্রদ্ধেয় পিতামহ মাণিক্যপ্রতাপ সিংহরায়, যাঁর বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে তোমাদের পরিবারে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি কখনো৷ কাজেই এটা যে শুধুই ছেলেভুলোনো একটা হেঁয়ালি, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই৷ এর সমাধান এখনও অনেক দূরের পথ, তবে একটা ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ৷ তোমার ঠাকুর্দার সিন্দুক থেকে চুরি যাওয়া এই সামান্য কাগজটা আর কিছুই নয়, লিমেরিকের মুখোশে একটি গুপ্তধনের সংকেত!'
শুনে আমরা হতবাক হয়ে যাই কিছুক্ষণের জন্য৷ এই একুশ শতাব্দীতে গুপ্তধন৷ মেজর বলছেন কী! কিন্তু এ কথায় সন্দেহ বা অবিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না৷ কারণ এই লোকটির চেহারা ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে একইসঙ্গে জ্ঞান, বুদ্ধি ও মনোবলের যে স্ফূরণ দেখা যায় প্রতিনিয়ত, তার কাছে মাথা নত না করে পারা যায় না৷
প্রায় কুড়ি বছর চুটিয়ে মিলিটারি জীবন যাপন করে মেজর মনজিৎ কাপুর তাঁর মাতৃভূমি কলকাতায় স্থায়ী হয়ে আছেন৷ পিতৃসূত্রে পাওয়া স্টাউট ফিগার আর প্রবল পরাক্রম সত্ত্বেও বাঙালি মায়ের সাহচর্যে গড়ে ওঠা তাঁর শিক্ষিত মনন তাঁকে প্রায় আদ্যোপান্ত বাঙালি করে রেখেছে৷ আর তাই আমি বা অরিন্দম প্রায় অনুগত শিষ্যের মতো মেজরের সঙ্গী হয়ে ঘুরে বেড়াই আর প্রতি মুহূর্তে শিক্ষিত হতে থাকি৷
আজও বোধ হয় তেমনই একটি দিন৷ মেজরের মগজের খেলায় হয়তো আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি আরও পূর্ণ হবে৷ তাই প্রাথমিক বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলে প্রশ্ন করি, 'কী করে মেজর, কী করে বুঝলেন?'
সুজয়বাবুর মুখেও যেন সেই প্রশ্ন খেলা করে৷
অরিন্দম বলে ওঠে, 'ফ্যানটাস্টিক৷ এ তো গল্পের মতো মনে হচ্ছে৷ আমরা কি গুপ্তধনের সন্ধানে যাব নাকি মেজর?'
মেজর ঠোঁটের কোণে হেসে বলে ওঠেন, 'হ্যাঁ৷ হয়তো সেটাই করতে হবে, যদি সুজয় আমাদের কোনো সাহায্য করতে পারে৷' এই বলে সুজয়বাবুর দিকে তাকান৷
সুজয়বাবু ভুরু কুঁচকে একটু যেন চিন্তিতভাবেই বলে ওঠেন, 'মেজর ওই ছড়াটার শেষ লাইনে মুদ্রা নিয়ে কিছু একটা বলা হয়েছে মনে হয়৷ আপনি কি সেই দিকেই ইঙ্গিত করছেন?'
'এগজ্যাক্টলি৷' চেয়ারের হাতলে একটা চাপড় মেরে বলে ওঠেন মেজর, 'যেখানে মুদ্রা খুঁজে ফেরার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে মুদ্রাই যে সেই গুপ্তধন, এ নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকে কি? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী সেই মুদ্রা? নিশ্চয়ই প্রাচীন কোনো মুদ্রা, যা লুকিয়ে রাখা হয়েছে কোথাও, আর সেই গোপন স্থানটির বিবরণ লিখে রাখা হয়েছে হেঁয়ালির মতো এই ছড়ার মাধ্যমে৷ এ তো বহুল প্রচলিত একটা খেলা, যা বহুদিন ধরে চলে আসছে, এ তো তোমরাও জানো, তাই না?'
মেজর এক মুহূর্ত থেমে আমাদের সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেন৷ তারপর আবার বলতে থাকেন, 'এখন এই ধাঁধাটি ধাপে ধাপে সমাধান করেই আমাদের এগোতে হবে লক্ষ্যস্থলের দিকে৷ তা সেটা খুব একটা শক্ত কাজ হবে না৷ কিন্তু তার আগে জানা দরকার এই মুদ্রার পরিচয়৷ সুজয় তোমাদের পারিবারিক ইতিহাস কী বলে? মুদ্রা সংক্রান্ত কোনো খবর কি তুমি দিতে পারবে?'
'না মেজর৷ সরাসরি মুদ্রা নিয়ে কিছু আমার জানা নেই৷ তবে আমি যেটুকু জানি, আমাদের বংশের এক প্রাচীন পূর্বপুরুষ নাকি নবাব মীরকাশিমের বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন৷ জীবনের প্রায় বেশিটাই উনি কাটান মীরকাশিমের সঙ্গে৷ আমাদের সেই পূর্বপুরুষ মারা যাবার পর তাঁর পুত্র নাকি উত্তরপ্রদেশ থেকে এই বাংলায় চলে এসে ব্যাবসা করতে থাকেন৷ তারপর ক্রমে ক্রমে এখানে জমিদারি কিনে বসবাস৷ তা সে তো প্রায় দু-আড়াইশো বছর আগেকার ঘটনা৷ আর এ সবই আমার শোনা কথা৷ কিন্তু এর মধ্যে মুদ্রার প্রসঙ্গ তো-'
'ব্যস ব্যস,' হাত তুলে সুজয়বাবুকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠেন মেজর, 'ওতেই হবে৷ বাকিটা আন্দাজ করে নিতে কোনো অসুবিধে নেই৷ কিন্তু সুজয়, তোমাকে যে আর একটু হেল্প করতে হবে৷ তোমার পিতামহ মাণিক্যপ্রতাপের তো লেখাপড়ার যথেষ্ট অভ্যেস ছিল, তাই না?'
সুজয়বাবুর চোখ হঠাৎ, উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, 'বুঝেছি মেজর৷ আমি খুঁজে দেখছি সেরকম কিছু পাওয়া যায় কি না৷ অ্যাকচুয়ালি রাজশেখর তো ওইজন্যেই এসেছিল৷ ওকে দাদা এনেছিল ঠাকুর্দার বইপত্র আর লেখালেখির পুরো ক্যাটালগ আর লিস্ট তৈরি করার জন্য৷ ও তো কাজ অনেকটা করেও ফেলেছিল৷ কম তো নয়, প্রায় চার মাস হতে চলল ও এখানে থেকে কাজগুলো করছিল৷ কিন্তু কী যে ব্যাপার ঘটল-'
হঠাৎ মেজর উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন, 'ঠিক আছে৷ তুমি তাহলে ওদিকটা খুঁজে দেখো৷ আমরা ততক্ষণ একটু চারপাশটা ঢুঁ মেরে আসি৷ কী বলো ব্রাদার?' আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইঙ্গিত করেন মেজর৷
চুপচাপ মেজরের পেছন পেছন বারান্দা থেকে সিঁড়ি বেয়ে ঘাসের চত্বরে নেমে আসি আমি আর অরিন্দম৷ গেটের ভেতরে বাঁ-দিকের দেয়াল ঘেঁষে একটা টিনের শেড৷ তারপাশেই মেজরের জিপটা দাঁড় করানো৷ জিপের সামনে লম্বা হয়ে শুয়ে ছিল মেজরের প্রিয় সঙ্গী গ্রে-হাউন্ড 'ক্যাপ্টেন'৷ আমাদের দূর থেকে দেখে সে উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙে৷ তারপর ছোট্ট একটা ডাক ছেড়ে আমাদের সঙ্গ নেয়৷ নুড়ি-বিছানো পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাই গেটের দিকে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন