ইতিবৃত্ত ও হরেন

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

বাঁকুড়ার এক প্রায়-প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সুপ্রাচীন জমিদারবাড়ি৷ এ বাড়ির বর্তমান ছোটোকর্তা সুজয়প্রতাপ সিংহরায় আমার অফিসের জয়ন্ত সেনের সহপাঠী৷ তাঁরই আমন্ত্রণে আমরা গতকাল বিকেলে এসে উঠেছি এই বিখ্যাত সিংহরায় বাড়ির আউটহাউসে৷

আসলে এই জমিদারবাড়িতে প্রায় মাস খানেক আগে একটি চুরির ঘটনা ঘটে৷ কী চুরি হয় প্রথমে বোঝা না গেলেও সিন্দুক খোলার ব্যাপারটা ধরা পড়ে৷

আর তার দিন দশেক পর চোরকে পাওয়া যায় সাপের কামড়ে মৃত অবস্থায়, জমিদারবাড়ি থেকে প্রায় দু-মাইল দূরে, টিলার ওপর জঙ্গলের মধ্যে৷ যদিও সে চোর আর কেউই নয়, সুজয়বাবুর দাদা দুর্জয়প্রতাপ সিংহরায়েরই এক অতিথিকর্মচারী, রাজশেখর প্রামাণিক৷

কিন্তু কেন? রাজশেখরের এই চিরকুট চুরির কারণ কী? টিলার জঙ্গলেই বা কী করতে গিয়েছিল রাজশেখর? আর গেলই যদি, সন্ধ্যের পর কেন? আর তার মৃত্যুটা? সেটা কি সত্যিই একটা দুর্ঘটনা, না কি এর পেছনে রয়েছে আরও বড়ো কোনো রহস্য?

এইসব সাংঘাতিক প্রশ্নের ঘুরপাকে জমিদারবাড়ির সকলের মতো সুজয়বাবুরও দিশেহারা অবস্থা৷ কাজেই সমস্ত রহস্যের জাল ভেদ করে এসব প্রশ্নের উত্তর আর কে খুঁজে বার করতে পারেন, মেজর মনজিৎ কাপুর ছাড়া? তাই মেজরকে ছুটে আসতেই হল৷ আর মেজর আসবেন, অথচ সঙ্গে ফ্রিলান্স ফটোগ্রাফার অরিন্দম রয় আর ইঞ্জিনিয়ার আকাশ মজুমদার নেই, তাও কি কখনো হয়?

তবে এসে যে লাভ ছাড়া লোকসান কিছুই হয়নি, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি৷ এখানকার ছবির মতো প্রাকৃতিক পরিবেশ, পাহাড়-জঙ্গলের নির্জন ভয়াবহতা, সঙ্গে রহস্যের একটা গা-ছমছমে আবহ, এ জিনিস এখানে না এলে টের পেতাম না৷ কলকাতায় বসে এরকম পরিবেশ কল্পনাও করা যায় না৷

কিন্তু মজা এই যে, এমন রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি আর জমিদারবাড়ির এই বনেদি আতিথেয়তা চুটিয়ে উপভোগ করায় বাদ সেধেছে ওই তুলোট কাগজের পাকানো চিরকুট৷ কাগজটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই মেজরের ধ্যান জ্ঞান সব ওই চিরকুটে গিয়ে ঠেকেছে৷

আজ দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর সুজয়বাবুই কাগজটা এনে মেজরের হাতে তুলে দেন৷ বলেন, 'মেজর, দেখুন, এই চিরকুটটাই চুরি গিয়েছিল ঠাকুর্দার সিন্দুক থেকে৷ আর চুরি করেছিল রাজশেখর৷ আসলে টিলার ওপরে ওর দেহটা খুঁজে পেয়ে যখন জমিদারবাড়িতে নিয়ে আসা হয়, তখন তার শক্ত হয়ে যাওয়া হাতের মুঠোয় একটা জেরক্স করা কাগজ পাওয়া যায়৷ আমরা বহুবার এই চিরকুটটা দেখেছি, কাজেই চিনতে কোনো ভুল হয়নি৷ তখন আমাদের টনক নড়ে৷ ঠাকুর্দার সিন্দুক খুলে সেখানে এই চিরকুট পাওয়া যায় না৷ তক্ষুনি রাজশেখরের ঘরে খোঁজা শুরু হয়৷ তার ড্রয়ার থেকে চিরকুটটা বেরোয়৷'

মেজর সব শুনে শুধু গম্ভীরমুখে মন্তব্য করেন, 'হুঁ৷' আর তারপরেই সেই যে কাগজটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন, তা থেকে আর তাঁকে বের করে আনা যায় না৷

এইভাবে সারা দুপুর কেটে যাবার পর এই গোধূলি বেলায় মেজরের এই আকস্মিক আবিষ্কার৷ যদিও তাঁর কথামতো এ ধাঁধার সমাধান এখনও হয়নি৷ কিন্তু এটা থেকে যে গুপ্তধনের ঠিকানা বোঝা যাবে, মেজরের সেই আশ্বাসেই আমরা খুশি৷ আর সেটা যে মেজর খুঁজে বের করবেনই, এ নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই৷ তাই আমি আর অরিন্দম বেশ খোশমেজাজেই আছি৷ তবে সুজয়বাবুর অবস্থাটা একটু অন্যরকম৷ অনেকটা ঢেঁকিগেলা গোছের৷ মেজরের আচার-আচরণে উনি অভ্যস্ত নন বলে তাঁর হতভম্ব অবস্থাটা যেন কাটতেই চাইছে না৷

জমিদারবাড়ির গেট থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে যেতে সেইসব কথা নিয়েই আলোচনা চলছিল৷ চওড়া পিচঢালা রাস্তাটা দু-দিকে ভাগ হয়ে গেছে৷ একটা রাস্তা গেছে পুব দিক ধরে, যেখানে মফস্সল শহরটা ক্রমে শেষ হয়ে উঁচু টিলা আর জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে৷ আর একটা রাস্তা গেছে পশ্চিম দিকে, যেখানে জমজমাট বাড়িঘর আর গঞ্জ৷ আমরা যাচ্ছিলাম অপেক্ষাকৃত নির্জন পুব দিকের রাস্তাটা ধরে৷

মেজর বলছিলেন, 'দেখো ব্রাদার, একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার৷ রাজশেখর প্রায় চার মাস হল এ বাড়িতে এসেছে৷ মাণিক্যপ্রতাপের বই আর কাগজপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার প্রচুর সুযোগ পেয়েছে৷ এখন সে যদি কোনোক্রমে এই গুপ্তধন সংক্রান্ত কিছু ব্যাপার অনুমান করে থাকে, যদি কেন, নিশ্চয়ই করেছে, আর তাই সিন্দুক থেকে ওই চিরকুটটা সে হাতিয়েছে৷ এখন প্রশ্ন একটাই, মুদ্রার ব্যাপারে সে কি আদৌ কিছু জানতে পেরেছিল?'

মেজর যে বার বার কেন মুদ্রা ব্যাপারটা নিয়ে এত উঠেপড়ে লেগেছেন, বুঝতে পারি না৷ ছড়াটার আর কোনো লাইন নিয়ে কিছুই বলছেন না বা ভাবছেন না, শুধু মুদ্রা নিয়েই পড়ে আছেন৷ দোনোমোনো করে কথাটা মেজরকে বলেই ফেলি৷

মেজর কৃপার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকান৷ তারপর মুচকি হেসে বলেন, 'ডিয়ার ব্রাদার, ছড়াটার ওই জায়গাটাতেই আমার খটকা৷ কারণ ওই মুদ্রা কথাটাই এ ছড়ার কী-ওয়ার্ড৷ বাকি লাইনগুলো সবই কিন্তু আসলে পথনির্দেশ৷ যদিও সেই পথটা লুকোনো আছে ঝোপঝাড়ের আড়ালে৷ তবু একটু ভালো করে খুঁজলেই সে পথ পাওয়া যাবে৷ কিন্তু তার আগে দরকার . . .'

বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়ে মেজর উত্তেজিত গলায় বলে ওঠেন, 'আরে, ওইটাই কি সেই টিলা? যেখানে রাজশেখর সাপের কামড়ে মারা গেছে?'

তাকিয়ে দেখি, হাঁটতে হাঁটতে আমরা অনেকদুর চলে এসেছি৷ আমাদের সামনে বেশ খানিকটা দূরে প্রেক্ষাপট জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে গায়ে গায়ে লাগানো ছোটো-বড়ো কয়েকটা টিলা৷ তাদের সমস্তটা জুড়ে বেশ ঘন জঙ্গল৷ উলটো দিকের অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে তার গায়ে৷ সব মিলিয়ে একটা রহস্যময় জলরঙের ছবির মতো দেখতে লাগছে তাকে৷

আমি বললাম, 'তাই তো মনে হচ্ছে মেজর৷ সুজয়বাবু যা বর্ণনা দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে তো বেশ মিলে যাচ্ছে৷'

মেজর বললেন, 'উঁহু, মনে হওয়া নয়, নিশ্চিত হওয়া দরকার৷' এই বলে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে একদিকে আঙুল তুলে দেখান, 'ওই যে, ওই চায়ের দোকানটায় জিজ্ঞেস করা যাক, চলো৷'

মেজরের সঙ্গে এগিয়ে যাই সেইদিকে৷ অরিন্দম যায় না৷ এমন অসাধারণ দৃশ্য দেখে ওর ফটোগ্রাফি শুরু হয়ে গেছে৷ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা তাক করেছে টিলার দিকে৷

চায়ের দোকানের লোকটা আমাদের প্রশ্ন শুনে আগে আমাদের ভালো করে মাপল৷ তারপর বলল, 'কুলকাতা থিক্যে আসছেন বুঝি?'

লোকটার কথায় কেমন অদ্ভুত একটা টান৷ সেই সঙ্গে ক্রমাগত একটা অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে আমাদের দেখে চলেছে৷

আমি রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করতে থাকি৷ দোকানের ভেতরে বাইরে মিলিয়ে তিনজন স্থানীয় লোক বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছে৷ একজন সিগারেট কিনতে এসেছে৷ তারা সবাই এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে৷

মেজরের কিন্তু কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই৷ উনি ধীরেসুস্থে পকেট থেকে পার্সটা বার করে ক্যাপ্টেনের জন্য এক প্যাকেট বিস্কুট কিনলেন৷ তারপর বললেন, 'হ্যাঁ৷ কলকাতা থেকেই আসছি৷ উঠেছি সিংহরায় বাড়িতে৷ ও বাড়ির সুজয় সিংহরায় আমাদের বন্ধু৷'

এবার লোকটার চোখে একটু সম্ভ্রমের দৃষ্টি দেখা গেল৷ দোকানের অন্য লোকগুলোও যেন একটু তটস্থ হয়ে উঠল৷ লোকটা বলল, 'ও তাই বুলেন৷ ছুটকর্তা আপনাদ্যের বন্ধু? নুমস্কার বাবু৷ আমার নাম হল্য হরেন৷ ছুটকর্তাকে বুলবেন, উনি আমায় ভালোই চিনেন৷ তা, কী যেন জিজ্ঞেস করছিলেন বাবু?'

মেজর হাত তুলে টিলাটা দেখিয়ে বললেন, 'ওই টিলাটার কথা জানতে চাইছিলাম৷ ওখানেই কি সাপের ছোবলে সিংহরায় বাড়ির গেস্ট . . .'

মেজরের কথা শেষ করতে দিল না হরেন৷ বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে বলে উঠল, 'কী বুলব্যো বাবু? ইকেই বল্যে নিয়তি৷ লুকটার ইতিউতি ঘুর্যা বেড়ানোর খুব ঝোঁক ছিল্য৷ তা ইদিকপানে এল্যেই আমার দুকানে চা খিতে আসত্যো৷ গল্প করত্যো৷'

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, 'ওই টিলার ওপরে কখনো উঠতে দেখেছ?'

হরেন তার দু-কানের লতিতে হাত ঠেকিয়ে বলল, 'মিথ্যা কথা কেনে বুলব্য বাবু? তা দেখ্যি নাই৷ কী গ্য, তুমরা দিখ্যেছো নাকি?'

প্রশ্নটা সে করে বেঞ্চিতে বসা লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে৷ তারা বেশ কৌতূহলের সঙ্গেই আমাদের কথাগুলো গিলছিল৷ এখন মাথা নেড়ে জানায় যে, না, ওরাও দেখেনি৷

মেজর এবার বেশ চিন্তিতভাবেই বলেন, 'আচ্ছা হরেন, যেদিন লোকটা মারা যায়, সেদিনও কি তোমার দোকানে চা খেয়ে গেছে?'

এবার হরেনকে খানিকটা উত্তেজিত মনে হয়৷ মেজরের প্রশ্নের উত্তরে সে মাথা নেড়ে বলে, 'হ, হ, তা বুট্যে৷ সেদিন ছিল্য গুরুবার৷ চারট্যের সময় দুকান খুলত্যেই উ লোকটা চা খিতে আস্যে৷ তারপর চা খিয়্যে উ শিউটিলার দিকে চল্যে যায়৷'

শিউটিলা? ওই টিলাটার নাম শিউটিলা? মেজরের মতোই আমিও অবাক৷ এমন ধরনের নাম এর আগে কখনোই শুনিনি৷ কোনো কথা প্রসঙ্গে সুজয়বাবুও বলেননি৷ তাই আমাদের মুখে স্বভাবতই সেই প্রশ্নচিহ্ন ফুটে ওঠে৷

এতক্ষণে হরেনের মুখে একটু হাসি দেখা যায়৷ বেশ গুরুজন-গুরুজন ভঙ্গিমায় সে বোঝাতে থাকে, 'হ বাবু, মুরা তো ই জন্মে দেখ্যি নাই, তবে শুন্যাছি, মুদের বাপ-পিতামোর কালে, কব্যে উ টিলার উপর নাকি শিউজির মন্দির ছিল্য৷ সেই থিক্যে উ টিলার নাম শিউটিলা৷'

মেজর বললেন, 'বাঃ! বেড়ে নাম তো! ও টিলা তো ক্রমশই আরও আকর্ষণ করছে দেখছি৷ তবে আজ বোধ হয় আর যাওয়া যাবে না৷ কী বলো ব্রাদার?'

আমি ঘড়ি দেখি৷ সাড়ে পাঁচটা৷ ওই টিলার কাছে পৌঁছোতে আরও মিনিট পনেরো৷ তার মানে টিলার নীচে পৌঁছোতে-না-পৌঁছোতেই অন্ধকার নেমে আসবে৷ সুতরাং এখন আর ওই সাপখোপের রাজত্বে আমাকে মেরেধরেও কেউ নিয়ে যেতে পারবে না৷

আমার মুখ দেখেই মেজর কথাটা আন্দাজ করলেন৷ তারপর তাঁর সেই অনবদ্য কৌতুকের হাসিটি হেসে বললেন, 'ভয় পাচ্ছ? ডোন্ট ওয়্যারি ব্রাদার৷ এই মুহূর্তে ওখানে গিয়েও কিছু লাভ হবে না, কারণ আমি যেটা চাইছি, সেটা এই সন্ধ্যের অন্ধকারে খুঁজে বার করা সম্ভব নয়৷ সুতরাং- আজ নয়, কাল সকালেই হবে আমাদের অপারেশন শিউটিলা৷'

কেন কে জানে, কথাটা শোনামাত্র রক্ত চনমন করে উঠল৷ মেজরের পা ঘেঁষে দাঁড়ানো ক্যাপ্টেনও ডেকে উঠল গম্ভীরস্বরে, যেন ওর নাকেও পৌঁছে গেছে আমাদের আগামী অভিযানের গন্ধ৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%