কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
আউটহাউসে দুটো ঘর৷ দুটোই ডাবল বেড৷ একটায় আছি আমি আর অরিন্দম, অন্যটায় মেজর৷ ঘরগুলো বেশ বড়ো বড়ো, সামনে চওড়া বারান্দা৷ শুধু ওই বারান্দায় বসেই সময় কেটে যায়, যেমন গতকাল আমাদের কেটেছে৷
অরিন্দমের ঘুমটা বেশ মোটাসোটা, ওর চেহারার সঙ্গে মানানসই৷ আমার আবার নতুন জায়গায় ঘুমের ব্যাপারটা বরাবরই সমস্যার৷
এখানেও যথারীতি তাই হল৷ সাতটার মধ্যেই উঠে পড়েছি৷ ঘরের সঙ্গেই বাথরুম৷ মুখচোখ ধুয়ে সবে বাইরে বেরোতে যাব, অরিন্দমের হাঁক, 'কী রে, বেরোচ্ছিস?'
অবাক হয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখি, বাবু আয়েশ করে পাশবালিশটা আঁকড়ে ধরে আবার ঘুমোবার তাল করছেন৷ আমি বলি, 'হ্যাঁ, তুই শুয়ে থাক৷ আমি একটু ঘুরে আসি৷'
ক্যাপ্টেন বারান্দায় শুয়েছিল৷ এখন নেই৷ তার মানে মেজরও ঘরে নেই৷ ঘরের দরজা ভেজানো৷
বারান্দা থেকে নুড়ি বিছানো রাস্তায় পা দিতেই দেখি মেজর গেট পার হয়ে বাইরে থেকে ঢুকছেন৷ পেছন পেছন ক্যাপ্টেন আসছে রাস্তা শুঁকতে শুঁকতে৷ আমায় দেখে হাত তুললেন মেজর৷ আমি দাঁড়িয়ে গেলাম৷

কাছে এসে মেজর বললেন, 'সাতসকালে বাড়ির চারপাশটা একটু সার্ভে করে এলাম ব্রাদার৷ কিন্তু আশাপ্রদ কিছু পাওয়া গেল না৷' বলে ঠোঁট ওলটালেন৷
আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী আশা করে গিয়েছিলেন মেজর?'
মেজর বললেন, 'তিরিশের খোঁজ পাবার আশা৷'
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, 'তিরিশের খোঁজ? মানে?'
মেজর বরাবরই লোককে অবাক করে দেওয়াটা বেশ উপভোগ করেন৷ মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন, 'বুঝলে না? ওই যে, ছড়ার প্রথম লাইনের তিন শূন্য তিরিশ! ওটাই তো রহস্যের প্রথম ধাপ৷ ছোটোবেলার পড়া মনে করো ব্রাদার-একে শূন্য দশ, দুইয়ে শূন্য কুড়ি, তিনে শূন্য তিরিশ৷ ওই তিরিশেরই তো মাপ করা হয়েছে প্রথমেই, তাই না? ওই যে লেখা ছিল- 'মাপ করী যেই তিন শূন্য তিরিশ'৷ তা এই তিরিশটা কী? আর কীভাবে মাপা হয়েছে? লক্ষ করার বিষয় এই যে, এখানে কিন্তু ইউনিটটা বলা হয়নি৷ তিরিশ পা, নাকি তিরিশ ফুট, অথবা তিরিশ হাত, কিছুই জানা যাচ্ছে না৷ আর সেই মাপটা শুরুই বা হবে কোথা থেকে?'
আমি বললাম, 'তাহলে আপনি এতক্ষণ কী সার্ভে করলেন?'
মেজর ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন, 'হ্যাঁ, এটা একটা জরুরি প্রশ্ন৷ তবে দেখো ব্রাদার, সাধারণত কোনো মূল্যবান জিনিস লুকিয়ে রাখতে গেলে সেটা মোটামুটি চোখের সামনেই কোথাও রাখা হয়৷ লোকে সেটাই পছন্দ করে৷ কাজেই এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই সেটা থাকা উচিত৷ যেমন ধরো পুকুর কিংবা বাগানের ধারে-কাছে কোথাও৷ এবং সেই হিসেবে সেটা তিরিশ পা কিংবা তিরিশ ফুটই হওয়া উচিত৷ এইসব কারণেই বাড়ির চারপাশটা একটু ঢুঁ মেরে দেখছিলাম, লক্ষণীয় কিছু চোখে পড়ে কি না৷ চা দিয়েছে?'
আমি বললাম, 'না, গণেশ এখনও আসেনি৷'
মেজর কবজি উলটে ঘড়ি দেখে বললেন, 'সওয়া সাতটা৷ তার মানে এবার এসে যাবে৷ চলো, বারান্দায় গিয়ে বসা যাক৷ অরিন্দম এখনও ঘুমোচ্ছে তো?'
আমি হাসিমুখে মাথা নাড়ি৷ তারপর ওনার সঙ্গে বারান্দায় বসি৷ রকমারি ফুলের মেলানো মেশানো একটা সুগন্ধ সকালের টাটকা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে৷ পাখিগুলোও যেন নির্ভয়ে কিচিরমিচির করে একরাশ কথা বলে চলেছে নিজেদের মধ্যে৷
মেজর বললেন, 'কাল রাত আড়াইটে পর্যন্ত জেগে খাতাটা মোটামুটি স্টাডি করলাম, বুঝলে?'
আমি উত্তর না দিয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইলাম মেজরের দিকে৷ জানি, কিছু বলার দরকার নেই৷ মেজর নিজেই বলবেন যতটুকু বলার৷
উনি বলতে শুরু করলেন, 'খাতাটা আগাপাশতলা ঘেঁটেঘুঁটে যা বুঝলাম, তাতে এই মাণিক্যপ্রতাপ সিংহরায়ের সম্পর্কে শ্রদ্ধা বেশ বেড়ে গেল৷ ভদ্রলোক যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন, সেইসঙ্গে অগাধ পড়াশোনা৷ ওনার সময়েও তো জমিদারি ঘরানাটা বেশ প্রকটই ছিল বলা যায়, কাজেই দাপটের সঙ্গেই দিন কাটিয়েছেন৷ তার পাশাপাশি এইরকম পড়াশোনা বা লেখাপত্রের বাতিক, এদের পরিবারের পক্ষে এটা একটা ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বল যায়৷'
আমি কৌতূহলের সঙ্গেই প্রশ্ন করি, 'তা ওই খাতা থেকে হেঁয়ালিগুলোর কোনো সমাধান করতে পারলেন?'
মেজর মুখ খুলতে যাবেন, এমন সময় গণেশকে আসতে দেখা গেল৷ মেজর উৎফুল্লমুখে বললেন, 'যাক, চা এসে গেছে৷ সকালে, চা মুখে না ওঠা পর্যন্ত মুডটা ঠিক খোলে না, বুঝলে তো ব্রাদার?'
আমি সায় দিই, বুঝব না আবার? আমার নিজেরও তো একই অবস্থা৷
ধোঁয়াওঠা গরম সিঙাড়া, ক্রিম-ক্র্যাকার বিস্কুট আর চা দিয়ে গণেশ টেবিল সাজাতে লাগল৷ আমি উঠে অরিন্দমকে একবার দেখতে গেলাম উঠেছে কি না৷ ও বাবা, চাদর মুড়ি দিয়ে দিব্যি জাঁকিয়ে ঘুমোচ্ছে৷
গণেশকে বললাম, 'ওই বাবুর চা ঢেলো না, আর খাবারটা ঢাকা দিয়ে রাখো৷'
গণেশ চলে গেলে একটা সিঙাড়া ভেঙে মুখে দিয়ে মেজরকে বলি, 'এবার বলুন মেজর৷'
চায়ে চুমুক দিতে দিতে মেজর অন্যমনস্কভাবে বাগানের পশ্চিমপ্রান্তে বুগেনভিলিয়া গাছটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ আমার প্রশ্নে চোখ ফিরিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, হেঁয়ালি৷ মাণিক্যপ্রতাপের হেঁয়ালি৷ তাই তো? তা ব্রাদার, একেবারে যে কিছু বুঝতে পারিনি, তা নয়৷ তবে না বোঝা অংশটা অনেক বেশি৷ আসলে কিছু কিছু ছোটোখাটো খটকা এসে বাধা দিচ্ছে, বুঝলে তো? যেমন ধরো, খাতার শেষ পাতার ওই দু-লাইনের ছড়া-পুতে শুরু, পিতায় শেষ/পুঁতে রাখা ভূতের রেশ; এখন পুত মানে পুত্র, অর্থাৎ পিতাপুত্রের একটা সম্পর্ক আছে, যেখানে পুত্র দিয়ে শুরু এবং পিতায় গিয়ে শেষ৷ এই পিতাপুত্রের পরিচয়টা কী? এটাই খটকা৷ আবার পরের লাইনটা ভাবো, সেটা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে আমাদের লক্ষ্য এই গুপ্তধনটি অবশ্যই কোথাও পুঁতে রাখা আছে৷ কিন্তু তার পরের এই ভূতের রেশ-টা কী?'
একনাগাড়ে এতখানি বলে দম নেওয়ার জন্যে চুপ করেন মেজর৷ সেই ফাঁকে আমি বলি, 'এই ভূতের ব্যাপারটা কিন্তু ওই চিরকুটের মধ্যেও লেখা ছিল, তাই না মেজর?'
'ইয়েস৷ ভূতে ভূতেই চলে/জননীটির কোলে . . . তার মানে . . . ভূতসংক্রান্ত একটা রহস্য কোথাও আছেই . . .'
বিড়বিড় করতে করতে হঠাৎ চুপ করে যান মেজর৷ কী যেন ভাবেন একবার, তারপরেই খুব দ্রুত বলে ওঠেন, 'রাইট৷ এইসব খুঁটিনাটি খটকার সমাধান করতে হলে যেটা সবচেয়ে আগে দরকার, তা হল মাণিক্যপ্রতাপের ঘরটা একবার দেখা৷ ক-টা বাজে এখন?'
বলে ঘড়ি দেখেন মেজর, 'পৌনে আটটা৷ সুতরাং এখন সুজয়কে ধরা যেতেই পারে৷ সো নাউ, গেট আপ ব্রাদার৷ এক্ষুনি একবার ওকে ফোন করো৷ বলো আমরা মাণিক্যপ্রতাপের ঘরটা একবার দেখতে চাই, ইমিডিয়েটলি৷'
'কিন্তু মেজর, আজ সকালে যে ওই টিলায় যাবার কথা ছিল?'
কী যেন চিন্তা করতে করতে বলে ওঠেন৷ 'ও সিয়োর৷ টিলায় তো যাবোই৷ কিন্তু এখন তার চেয়েও জরুরি হল মাণিক্যপ্রতাপের ঘর৷ ইয়েস৷ ওটা মাস্ট৷ যাও ব্রাদার, আর দেরি কোরো না৷ কুইক, কুইক৷'
মেজরের কথায় হঠাৎ রক্তের মধ্যে একটা চনমনে দোলা টের পাই৷ মেজরের নিজের মধ্যেও যেন উত্তেজনার আভাস৷ বুঝলাম, এইবার টেম্পো উঠছে একটু একটু করে৷ তাহলে কি এইবার আসল খেলা শুরু হতে চলেছে?
তড়িঘড়ি ঘরে গিয়ে মোবাইলটা নিয়ে আসি৷ তারপর সুজয়বাবুর নম্বরটায় রিং করে মেজরকে ধরিয়ে দিই৷ মেজর কথা বলেন, 'হ্যাঁ সুজয়! তোমার কখন সময় হবে বলো তো? আমরা একটু তোমার ঠাকুÍদার ঘরটা দেখতে যাব৷ . . . হ্যাঁ, টিলায় যাব একটু বেলা হলে, এই ধরো এগারোটা নাগাদ৷ তার আগে তোমার ঠাকুর্দার ঘরটা দেখে নিতে চাই৷ খুবই আর্জেন্ট৷ . . . হ্যাঁ, ঠিক আছে, সাড়ে আটটায় চলে এসো৷ আমরা রেডি থাকছি৷'
ফোন বন্ধ করে মেজর আমার দিকে তাকান৷ আমি বলি, 'ইয়েস বস৷ রেডি হয়ে নিচ্ছি৷ তার আগে অরিন্দমকে তুলে দিই গিয়ে৷'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন