অভিযান ও মহাদেব

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

আকাশটা একটু মেঘলা করে এসেছে৷ সকালের মতো অতটা চড়া রোদ আর নেই৷ তাই সুজয়বাবু গাড়ি বার করার প্রস্তাব দিলেও মেজর বারণ করে দিলেন৷ বললেন, 'গাড়ি দরকার নেই৷ বরং চলো হেঁটেই যাই৷ হাঁটলে শরীর ভালো থাকে ব্রাদার৷'

আমিও সায় দিলাম৷ বললাম, 'হ্যাঁ ঠিকই৷ আর তা ছাড়া বেশি দূর তো নয়৷ বড়োজোর মাইল দুয়েক হবে৷ তাই না সুজয়বাবু?'

সুজয়বাবু বললেন, 'বাপরে! আপনার আন্দাজ তো সাংঘাতিক! একদম ঠিক বলেছেন৷ আমাদের বাড়ির গেট থেকে টিলাটা ঠিক পৌনে দু-মাইল৷ কী করে বললেন বলুন তো?'

আমি স্মিত হাসি৷ অরিন্দমই আমার হয়ে সাফাই গেয়ে দেয়, 'আরে আকাশ বলতে পারবে না? সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বলে কথা৷'

সুজয়বাবু বলেন, 'ও হ্যাঁ তাও তো বটে৷ সরি সরি৷ আমার একদম খেয়াল ছিল না৷'

আমি বললাম, 'অবশ্য এখন আর কেউ মাইলের হিসেব করে না৷ সবই কিলোমিটারে ট্রান্সফার হয়ে গেছে৷ সেই হিসেবে ধরলে পৌনে দু-মাইল মানে হল . . .' মনে মনে একটু হিসেব করে বলি, 'পৌনে তিন কিমি৷ এ রাস্তাটা এমন কিছুই না৷ অনেকে তো রোজ মর্নিং ওয়াকই করে চার-পাঁচ কিলোমিটার৷'

সুজয়বাবু বললেন, 'তা ঠিক৷ তবে রোদ থাকলে এ সময়টায় হাঁটতে বেশ কষ্টই হত৷ মেঘলা আছে বলেই রক্ষে৷'

মেজর কোনো কথাই বলছেন না৷ চুপচাপ আমাদের আগে আগে হেঁটে চলেছেন৷ তাঁর গলা থেকে ঝোলানো বাইনোকুলারটা দুলছে একটা নির্দিষ্ট ছন্দে৷ এখানে আসার পর থেকে এই প্রথম ওটা মেজরের সঙ্গে দেখলাম৷

রাস্তাটা এই সকাল বেলাতেও বেশ নির্জন৷ আসলে জমিদারবাড়ির পর থেকে এই পূর্ব দিকটা পুরোটাই প্রায় ফাঁকা৷ লোকবসতিও নেই৷ মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে বিচ্ছিন্ন দু-একটা দোকানঘর ছাড়া আর কিছুই নেই বলা যায়৷ এই মফস্সল শহরটার যা-কিছু রমরমা সব পশ্চিম দিকটায়৷ সেদিক থেকে দেখলে সিংহরায় বাড়িটাই বর্ডার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয়৷

মেজরের চুপচাপ থাকা দেখে আমিই অগত্যা মেজরকে খোঁচাই, 'মেজর, কী এত ভাবছেন বলুন তো?'

মেজর অন্যমনস্কভাবে বলে ওঠেন, 'অ্যাঁ? কী বলছ ব্রাদার?'

'বলছি, তখন থেকে কী এত ভাবছেন?'

এবার যেন একটু সচেতন হয়ে মেজর উত্তর দেন, 'না . . . আসলে বুঝলে . . . সকালে ওই মাণিক্যপ্রতাপের ঘরে কিছু একটা দেখে মনের মধ্যে সামান্য খোঁচা লেগেছে৷ একটা কী যেন ব্যতিক্রম . . . একটা অস্বাভাবিক কিছু . . . অথচ সেটা যে ঠিক কী, সেটাই ধরতে পারছি না৷'

আমি বললাম, 'ওই জানলার পাল্লার ব্যাপারটা নাকি মেজর?'

মেজর বললেন, 'না না, তা নয়৷ ওটার ব্যাপারে তো কোনো সংশয় নেই৷ খড়খড়ি খোলা, জানলায় কাচের শার্সি৷ সেই অবস্থায় সিন্দুক খোলা হল, আর সেটা দিব্যি বাগানে দাঁড়িয়ে দেখা গেল৷ না না, অন্য কোথাও, অন্য কোনো খুঁটিনাটি . . .'

Cov7

বলতে বলতে মেজর চুপ করে গিয়ে আবার তাঁর ভাবনায় ডুবে যান৷ সেই সময় অরিন্দম হঠাৎ আমায় বলে, 'আচ্ছা আকাশ, আমরা যে ওই সাপখোপের রাজত্বে যাচ্ছি, সঙ্গে তো কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেওয়া হল না রে৷ এমনকী একটা লাঠি পর্যন্ত নেই৷ মেজর কি রিভলভারটা সঙ্গে নিয়েছেন, জানিস?'

মেজর বোধ হয় কথাটা শুনতে পেলেন৷ তাই আমি কিছু বলার আগেই পেছন ফিরে বললেন, 'আপাতত তার কোনো দরকার নেই ব্রাদার৷ আমাদের সঙ্গে একটি জীবন্ত অস্ত্র যাচ্ছে৷'

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই মেজর আঙুল তুলে সামনের দিকে দেখান৷ সেখানে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন৷ ওর শিকারি চেতনায় বোধ হয় ধরা পড়েছে আমাদের এই অভিযানের বিপজ্জনক সংকেত৷ তাই এখন থেকেই ওর হাঁটার ভঙ্গিতে একটা সতর্কতা৷

ক্যাপ্টেনের দিকে দেখতে গিয়েই চোখে পড়ল হরেনের চায়ের দোকানটা৷ সেই সঙ্গেই দূরে আকাশের গায়ে ফুটে উঠল শিউটিলার সেই মনোরম দৃশ্যপট৷ দূর থেকে কী ভালোই না দেখতে লাগে টিলাটাকে৷ অথচ ওখানে কী যে অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে, ভাবতে গেলেই গা-টা শিরশির করে ওঠে৷

অনেকক্ষণ হাঁটছি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, হরেনের দোকানে একটু বসে চা খেয়েই নেওয়া যাক৷ বেঞ্চিতে বসে এটা-সেটা কথা বলতে বলতে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে এনার্জি সঞ্চয় করে নিলাম৷

কিন্তু সমস্যা হল তারপরেই৷ হরেনকে চায়ের দাম দেওয়া গেল না কিছুতেই৷ ছোটোকর্তা আর তার বন্ধুদের চা খাইয়ে হরেন পয়সা নেয় কী করে?

সুজয়বাবু দু-একবার জোরাজুরি করার পরেই মেজর বললেন, 'থাক সুজয়, বেকার সময় নষ্ট হচ্ছে৷ পরে বরং পুষিয়ে দিয়ো৷ এবার চটপট পা চালাও দিকি৷'

অরিন্দম বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'ঠিক বলেছেন মেজর৷ চলো বন্ধু৷ চালাও পা৷' এই বলে বড়ো বড়ো পা ফেলে এগিয়ে যেতে যেতে জোর গলায় গান গেয়ে উঠল, 'কদম কদম বঢ়ায়ে যা/খুশিকে গীত গায়ে যা৷'

মেজর পা বাড়াতে গিয়ে থমকে গেলেন৷ তাঁর ভ্রূ কুঁচকে উঠল৷ মুখ থেকে যেন অজান্তেই বেরিয়ে এল, 'মাই গড!!'

আমরাও থমকে গেলাম৷ কী হল?

মেজর বিদ্যুতের মতো সুজয়বাবুর দিকে ফিরে বললেন, 'সুজয়, রাজশেখরের মৃত্যু একটা কদম গাছের তলায় হয়েছিল না?'

সুজয়বাবু একটু অবাক গলাতেই বললেন, 'হ্যাঁ৷ শিউটিলাতে ওই একটাই বিশাল কদম গাছ আছে৷ তার তলাতেই পাওয়া গিয়েছিল রাজশেখরের বডি৷ আমরা তো ওখানেই যাচ্ছি মেজর৷'

'মাই গড! মাই গড! একটাই কদম গাছ৷ তোমার ঠাকুর্দার আই-কিউয়ের পরিমাণটা বুঝতে পারছ ব্রাদার? কদম মানে পা-ও হয়, গাছ-ও হয়৷ তাই চিরকূটের ওই 'এক পা গাছে' কথাটায় তিনি অব্যর্থ লক্ষ্যে এই টিলার একটিমাত্র কদম গাছকে বুঝিয়েছেন৷ সত্যি, আপনাকে কুর্নিশ করি মাণিক্যপ্রতাপ সিংহরায়৷'

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চমৎকৃত হয়ে যাই৷ কোনো কথা না বলে মেজরের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করি টিলার দিকে৷ কিন্তু আমার মনে নতুন করে একটা প্রশ্ন জাগে৷ তাই জিজ্ঞেস করি, 'কিন্তু মেজর, তারপরের অংশটা? ওই যে, এক পা গাছে দিব্যি নাচে গিরীশ৷ তার মানে? গিরীশ মানে তো হিমালয়৷ সেটা নাচে কী করে?'

ঘুরে মুচকি হেসে মেজর বললেন, 'এখানেই তো বাংলা ভাষার মজা ব্রাদার৷ গিরীশ কথাটার একটা মানে হিমালয় ঠিকই৷ তবে ওর আরও একটা মানে আছে যে৷ আর সেটা হল মহাদেব বা শিব৷ আর সেই শিব যখন নাচেন, তখনই তিনি হয়ে যান . . .'

মেজর থেমে যান৷ আর আমরা সমস্বরে বলে উঠি, 'নটরাজ!!'

ক্যাপ্টেনও যেন আমাদের কথা বুঝতে পেরে উল্লাসের সঙ্গেই মুখটা আকাশের দিকে তুলে ডেকে ওঠে৷

টিলার নীচে পৌঁছে দেখা গেল, খুব অস্পষ্ট হলেও একটা আঁকাবাঁকা পায়ে চলা পথের রেখা যেন দেখা যাচ্ছে ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে৷ তার মানে এই পথেই লোকজনের যাতায়াত ছিল, এবং তা হয়তো ভালোরকমই৷ ইদানীং যাওয়া-আসা কমে যাওয়াতে পথটা অনেকটাই ঢেকে গেছে আগাছা আর ঘাসের আস্তরণে৷

আমরা উৎসাহ ভরে সেই পথে পা বাড়িয়েছি, তখন মেজর বললেন, 'দাঁড়াও ব্রাদার, টিলার ওপরে ওঠার আগে চলো তো, টিলাটার চারপাশে একবার ঘুরে আসি৷ আমার মন বলছে এ টিলার আশেপাশে এমন কিছু রহস্য আছে, যা আমাদের কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে পারে৷'

দলনেতার নির্দেশ অমান্য করার প্রশ্নই ওঠে না৷ টিলাটাকে বেড় দিয়ে আমরা দক্ষিণ দিকে যেতে শুরু করলাম৷

টিলার গায়ে গায়ে বেশ খানিকটা পর্যন্ত পিচরাস্তা আছে৷ তারপর যেন হঠাৎই পিচের রাস্তাটা শেষ হয়ে গিয়ে এলোমেলো জঙ্গলে পরিণত হয়েছে৷ রাস্তাটাও ঠিকমতো নেই৷ পিচ উঠে গিয়ে খোয়া আর কাঁকর বেরিয়ে পড়েছে অনেকটা জায়গা জুড়ে৷

রাস্তাটা যেখানে শেষ হয়েছে, আমরা সেখানে এসে দাঁড়ালাম৷ এলাকাটা রীতিমতো রুক্ষ৷ বড়ো বড়ো লালচে পাথর টিলার গায়ে৷ আর টিলাটা এখানে ঢালুও নয়, প্রায় খাড়া দেওয়ালের মতোই৷ অর্থাৎ এদিকটা দিয়ে টিলাতে ওঠার কোনো উপায় নেই৷

দূরের দিকে তাকালাম৷ রাস্তাটা শেষ হয়ে কিছুটা দূর পর্যন্ত হালকা গাছপালা, ঝোপঝাড়৷ তারপরেই শুরু হয়েছে ঘন জঙ্গল৷ স্পষ্ট বোঝা যায় এদিকে মানুষজনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে না৷ তবে একটা ভাঙা সাঁকো চোখে পড়ল৷ তার মানে কি ওই সাঁকোর নীচে কোনো খাল আছে? প্রশ্ন করতে সুজয়বাবু সেটাই বললেন৷ একসময় ছোট্ট একটা নদী শিউটিলার পিছন দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে বয়ে যেত৷ এখন সেটা একটা মজা খাল৷

বাঁ-দিকে আর এগোনোর উপায় নেই৷ ওদিকে টিলার ঠিক নীচে ঘন ঝোপঝাড়, তারপরেই খালটা৷ তাই আমরা সাঁকোর দিকেই এগিয়ে গেলাম৷

সাঁকোটা পুরোনো, নড়বড়ে৷ সাবধানে পার হয়ে আমরা ঘাসজমির প্রান্তে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখি৷ অরিন্দম ফটো তুলতে শুরু করেছে৷

মেজর বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে টিলাটা দেখছিলেন৷ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'এ কী? ওটা কী?'

আমরা সেদিকে তাকিয়ে দেখি, কিন্তু খালি চোখে কিছুই দেখতে পাই না৷ অরিন্দমও মেজরের কথা শুনে তৎক্ষণাৎ ওর ক্যামেরা তাক করেছিল ওদিকেই৷ ক্যামেরায় জুম লাগানো, তাই হয়তো ওর চোখেও কিছু পড়ে গেল, আর সঙ্গেসঙ্গেই সেও মেজরের মতো চেঁচিয়ে উঠল, 'হ্যাঁ তাই তো! সাদা রঙের কি একটা দেখা যাচ্ছে, গাছপালার আড়ালে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না৷ কী ওটা মেজর? সেই নটরাজের মন্দিরটা নাকি?'

মেজর চোখ থেকে বাইনোকুলার নামালেন৷ তারপর হাতের ঘড়িটা এক ঝলক দেখে নিয়ে গম্ভীরমুখে বললেন, 'আর সময় নেই ব্রাদার৷ আমাদের এখনই টিলার ওপর উঠতে হবে৷'

Cov8
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%