শিউটিলা ও অরিন্দম

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

অজস্র গাছ৷ বট, অশ্বত্থ, শাল, পলাশ, এগুলো চিনি৷ কিন্তু আরও অনেক নাম-না-জানা গাছ টিলার ওপরটাকে ঘন জঙ্গলের রূপ দিয়েছে৷ সেইসব জানা-অজানা গাছের মধ্যে দিয়েই আমরা সেই কদম গাছের সন্ধানে হাঁটছিলাম৷

টিলার পশ্চিমপ্রান্তের সেই পায়ে চলা রাস্তাটা দিয়েই আমরা টিলায় উঠেছি৷ এদিকটা অনেকটাই ঢালু, ওপরে ওঠার পক্ষে বেশ সুবিধের, তাই হয়তো এদিকটাই লোকেরা বেছে নিয়েছিল ওঠা-নামার জন্যে৷ তবে উপলক্ষ্য যে সেই মন্দিরটাই ছিল, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷ আর যেহেতু মন্দিরটা ছিল গুহার ভেতর, সুতরাং সেই গুহার প্রবেশপথও নিশ্চয়ই এই টিলার ওপরেই ছিল৷ তারপর একদিন ভূমিকম্পে গুহামুখটা হারিয়ে গেল, সেই সঙ্গে মন্দিরটাও, তাই আর কেউ এদিকে না আসায় ক্রমে ক্রমে টিলাটাও অগম্য হয়ে উঠেছে৷

টিলায় ওঠার পরই সুজয়বাবু বললেন, 'দেখুন মেজর, রাজশেখরের ডেডবডি পাওয়ার সময় আমি এখানে আসতে পারিনি৷ তবে খুব ছোটোবেলায় তো আমিও কয়েকবার এই মন্দিরে এসেছি৷ তাই আবছা মনে আছে যে, ওপরে উঠে আমরা টিলার উত্তর দিক লক্ষ করেই হাঁটতাম৷'

সুজয়বাবুর কথার ভিত্তিতেই আমরা উত্তর দিক লক্ষ করে হাঁটছিলাম৷

আমাদের উদ্দেশ্য এখন দুটো৷ এক, সেই কদম গাছটার কাছে পৌঁছোনো, যেখানে রাজশেখরের ডেডবডি খুঁজে পাওয়া যায়৷ দ্বিতীয়ত, হারিয়ে যাওয়া সেই গুহা কিংবা নটরাজ মন্দিরের কোনো সন্ধান পাওয়া যায় কি না দেখা৷ মেজরের ধারণা, ওই কদম গাছ আর ওই মন্দির, দুটোর মধ্যে কোনো-না-কোনো যোগসূত্র আছেই৷ এই ধারণার ভিত্তি হল ওই হেঁয়ালি ছড়ার দ্বিতীয় লাইন৷

ক্যাপ্টেন আমাদের আগে আগে যাচ্ছিল এদিক-ওদিক গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে, আমরা পেছনে পেছনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম তারই সতর্ক পাহারায়৷ পায়ে চলা পথের চিহ্নটা অস্পষ্ট হতে হতে কখন যেন হারিয়ে গেছে ঘাসের আস্তরণের মাঝে৷ এখন চারিদিকে শুধু ছোটো ছোটো ঝোপঝাড় আর বড়ো বড়ো গাছের মানচিত্র৷

এইভাবে চলতে চলতেই আমরা একটা বড়ো পাকুড় গাছের কাছে এসে পড়লাম, তার ঠিক পেছনেই দেখা গেল সারিবদ্ধ কয়েকটা লম্বা লম্বা শাল গাছ৷

সুজয়বাবু হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ তারপরেই উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, 'আরে! এই তো! এই তো সেই রাস্তা! মেজর, মনে পড়ে গেছে৷'

'কী? কী মনে পড়েছে সুজয়?' মেজরের গলাতেও উত্তেজনার ছোঁয়া৷ কৌতূহল আমাদের মনেও৷

সুজয়বাবু বললেন, 'এই তো, ছোটোবেলায় এই শাল গাছের সারির পাশ দিয়েই আমরা মন্দিরে যেতাম৷ এই যে গাছগুলো পরপর লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে, আমরা এগুলোর ফাঁক দিয়ে গলে গলে জিগজ্যাগ করে দৌড়োতাম৷ আমার আর দাদার প্রিয় খেলা ছিল এটা৷ . . . না, কোনো ভুল নেই৷ এই সেই রাস্তা৷ চলুন মেজর, আর কোনো চিন্তা নেই৷'

সুজয়বাবুর গলায় আত্মপ্রত্যয়ের সুর৷ তাই আমরাও খানিকটা নিশ্চিন্তে এগিয়ে যাই সেই শাল গাছের সারির পাশ দিয়ে৷

প্রায় মিনিট পাঁচেক৷ তারপর দূর থেকেই দেখা গেল, খানিকটা ফাঁকা জায়গার মধ্যে রাজার মতো দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল কদম গাছ৷ চারপাশে মাটির ওপর ছড়ানো আছে তার মোটা মোটা শিকড়৷ লম্বা লম্বা পাতার ফাঁক দিয়ে ঝুলছে গোল গোল কদম ফুল৷

দেখেই বোঝা যায়, বহু বছর ধরে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, বিদ্যুৎ মাথায় নিয়ে বেঁচে আছে এই গাছ৷ প্রকৃতির বিপুল বাধার সঙ্গে লড়াই করেও কীভাবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে হয়, তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সে৷ এদেরই বোধ হয় মহীরূহ বলা যায়৷

এদিকে মেজরের আর তর সয় না৷ হাত নেড়ে তিনি বলেন, 'এগিয়ে চলো ব্রাদার৷ কুইক৷'

বলেই তিনি দ্রুত পা চালান ওই দিকে৷ পেছন পেছন আমরাও এগোতে যাই আর পরক্ষণেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি৷ ক্যাপ্টেন হঠাৎ একটা ছোট্ট ডাক ছেড়ে ছুটে গেছে সামনের দিকে৷ একটু দূরেই রাস্তার পাশে একটা আকন্দ ফুলের ঝোপ৷ সেই ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে চাপাস্বরে গর্জন করতে করতে সামনের পা দিয়ে মাটি আঁচড়াতে থাকল ক্যাপ্টেন৷

ইঙ্গিতটা স্পষ্ট৷ আমরা সবাই সেদিকে এগিয়ে যাই৷ তারপর একটু খুঁজেই মেজর ওই আকন্দ ঝোপের ভেতর থেকে ছোটো শাবল বার করে আনেন৷ ফুট দেড়েক লম্বা৷ খুব বেশি হলে একটা জানলার শিকের মতো ডায়ামিটার৷

সবাই অবাক৷ এখানে এই শাবলটা কেন? কে-ই বা লুকিয়ে রাখল এটা? কী উদ্দেশ্যে?

মেজরের দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার ভুরু কুঁচকানো৷ অর্থাৎ একই প্রশ্ন তাঁর মনেও জেগেছে৷ কিন্তু সেটা এক মূহূর্তের জন্য মাত্র৷ পরক্ষণেই চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তিনি বললেন, 'চলো, যাওয়া যাক৷' যেন এটা এমন কিছুই নয়, আসল বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে ওইখানে, ওই কদম গাছের তলায়৷ অগত্যা কৌতূহল চেপে রেখে এগিয়ে যাই৷

গাছের কাছে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিন্তু দেখবার মতো কিছুই পাই না৷ মেজর যথারীতি পিছনে হাত রেখে গাছের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন৷ অরিন্দমও তার ক্যামেরা বার করে মনের সুখে ছবি তুলে যাচ্ছে৷

একপাশে দাঁড়িয়ে আমি আর সুজয়বাবু কথা বলছিলাম৷ হঠাৎ মেজরের ডাক শুনে তাকাই৷ কদম গাছটার নীচে একজায়গায় মাটির দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে মেজর দাঁড়িয়ে আছেন৷ কাছে যেতেই আঙুল দেখিয়ে বললেন, 'দেখো তো ব্রাদার, এই শেকড়ের পাশে মাটিটা কেমন বসে গেছে না?'

ভালো করে লক্ষ করতেই বুঝলাম, মেজরের কথা একেবারে ঠিক৷ ওখানে পড়ে থাকা কদম ফুলগুলোও থেঁতলে বসে গেছে মাটিতে৷

মেজর বললেন, 'তার মানে রাজশেখরের মৃত্যু হয়েছে এখানেই৷ অন্ধকারের মধ্যে গাছে ঠেসান দিয়ে বসেছিল, আর তখনই সেই রাজগোখরোর ছোবল৷'

দৃশ্যটা কল্পনা করেই কেমন যেন শিউরে উঠি৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তে . . . একটা চিৎকার৷ আতঙ্ক আর বিস্ময়-মেশানো একটা আচমকা চিৎকার৷ নিমেষে একটা হিমশীতল স্রোত যেন নেমে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে৷

অরিন্দমের গলা৷ কিন্তু কোথায় অরিন্দম? দেখা যাচ্ছে না তো? চিৎকারটা যেন কদম গাছের পেছন দিকটা থেকে এল না?

তক্ষুনি নিজেদের সামলে নিয়ে দৌড়ে গেলাম গাছের পেছন দিকে৷ পেছনে একটু ফাঁকা জায়গা৷ তারপরেই আবার জঙ্গল ঘনীভূত হয়েছে৷ সেখানে ঝোপঝাড় আর গাছের ফাঁকে একটা পাথরের স্তূপ৷ সেই স্তূপের গোড়ায় পড়ে আছে অরিন্দম৷ আর ওর প্রায় ফুটদুয়েক দূরে মাটির ওপর ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটা সাপ৷ তার গায়ের চিত্রবিচিত্র রঙের ওপর আলো ছায়া পড়ে এক ভয়ংকর রূপ তৈরি হয়েছে৷

আমরা স্থবিরের মতো যে-যার জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা যুগ বলে মনে হচ্ছিল৷ তার মধ্যেই আচম্বিতে একটা তীব্র ডাক ছেড়ে ক্যাপ্টেন ছুটে গেল বিদ্যুতের মতো৷ আর তাই শুনেই ম্যাজিকের মতো এক পলকে সাপটা অদৃশ্য হয়ে গেল ঝোপঝাড়ের আড়ালে৷

ছুটে গিয়ে অরিন্দমকে তুলে দাঁড় করালাম৷ ও তখনও হাঁফাচ্ছে৷ মুখচোখ ঘামে ভিজে গেছে৷ অব্যক্ত একটা বিস্ময় আর আতঙ্ক তখনও ঘিরে রয়েছে ওকে৷ কোনো প্রশ্ন করার আগেই সে বলল, 'আচমকা পড়ে গিয়েছিলাম৷ উঠতে যেতেই দেখি সাপটা মুখের সামনে ফণা দোলাচ্ছে৷ দেখে আপনা থেকেই ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম৷ আজ ক্যাপ্টেন না থাকলে . . .' ক্যাপ্টেনের দিকে তাকায় অরিন্দম৷

Cov9

মেজর জিজ্ঞেস করেন, 'কিন্তু তুমি পড়ে গেলে কী করে?'

অরিন্দম লজ্জিতমুখে বলে, 'আসলে একটা ভালো ভিউ পাওয়া যাচ্ছিল, তাই ওই পাথরগুলোর ওপর উঠে . . .'

বলতে বলতে পাথরের স্তূপটার দিকে তাকাতেই ওর মুখে কথা আটকে যায়৷ সঙ্গেসঙ্গেই আমরা সকলেই সেদিকে ঘুরে তাকাই আর বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই৷ অরিন্দম পাথরের ওপর থেকে পা পিছলে পড়ার সঙ্গেসঙ্গেই বড়ো বড়ো তিন-চারটি পাথর গড়িয়ে পড়েছে এপাশে-ওপাশে, আর তার তলার দিকে মাটির ভেতর থেকে উঁকি মারছে একটা গর্ত!

কিছুক্ষণের জন্য আমরা চুপ৷ হঠাৎ একটা অভাবিত প্রাপ্তির সম্ভাবনা যেন নিমেষে আমাদের স্থবির করে দিয়েছে৷ কিন্তু ধন্য মেজর মনজিৎ কাপুর আর তাঁর সামরিক শিক্ষা৷ পলকের মধ্যে গলা থেকে বাইনোকুলারটা খুলে পকেটে ভরেছেন তিনি, তারপর এক লাফে এগিয়ে গিয়ে পাথরগুলো দু-হাতে সরাতে শুরু করেছেন৷

আমরাও দুদ্দাড় করে ছুটে যাই আর মেজরের সঙ্গে হাত লাগাই৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপরের আলগা পাথরগুলো সরানো হয়ে গেল৷ গর্তের মুখটা আর একটু বড়ো হল৷ কিন্তু মস্ত মস্ত কয়েকটা পাথর মাটিতে এমনভাবে চেপে বসে আছে, যা হাত দিয়ে নড়ানো অসম্ভব৷

মেজর অস্থির হয়ে বললেন, 'শাবলটা? শাবলটা কোথায়?'

আকন্দঝোপে খুঁজে পাওয়া শাবলটা মেজর রেখেছিলেন কদম গাছটার গোড়ায়৷ দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসি৷ তারপর সেই শাবলের চাড়ে আর হাতের ঠেলায় একে একে বড়ো বড়ো পাথরগুলো মাটি থেকে উপড়ে তুলে নিতেই একটা বড়োসড়ো গুহার মুখ খুলে যায়, যার ভেতরে তাকাতেই দেখতে পাই, চওড়া পাথরের একসার সিঁড়ি ধাপের পর ধাপ নেমে গিয়ে মিশে গেছে অন্ধকারে৷

উত্তেজনা আর পরিশ্রমে শ্রান্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাটির ওপর যে যেখানে পারি বসে পড়ি৷ মেজরও ধপ করে মাটিতেই বসে পড়েন৷ তারপর কপাল থেকে ঘাম মুছে নিতে নিতে বলেন, 'মাই ডিয়ার সুজয়, তোমাদের ওই রাজশেখর ছেলেটি ছিল অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট! অনেক আগেই সে আবিষ্কার করে ফেলেছিল তোমাদের এই হারিয়ে যাওয়া গুহা৷ কিন্তু সেই আবিষ্কার সে আর কাজে লাগাতে পারল না৷ সেই অসমাপ্ত কাজই আজ সম্পন্ন করতে হবে আমাদের৷ চলো, গুহার ভেতরটা এবার অনুসন্ধান করা যাক৷'

Cov10
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%