মন্দির ও রহস্য

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

সিঁড়ির ধাপগুলো খুব বেশি চওড়া নয়৷ তার ওপরে একটু নীচে নামতেই ক্রমশ যেন নিকষ কালো অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছিল আমাদের৷ খুব সাবধানে মোবাইলের টর্চ জ্বেলে আমরা নীচে নামছিলাম একের পর এক৷

গা ছমছম করছে৷ প্রতিটা মুহূর্তেই যেন কী এক অজানা আতঙ্কের সম্ভাবনা৷ বহু বছর ধরে বদ্ধ এই গুহার ভেতরের বাতাসে যেন দম আটকে আসছে৷

প্রায় চল্লিশ ধাপ মতো নামার পর হঠাৎ একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে আসতে আমরা সবাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম৷ পোড়া তেল, ধূপ, ধুনো, সব মেশানো একটা অনেক পুরোনো গন্ধ যেন দমকা হাওয়ার মতো নাকে এসে লাগল৷

মেজর আগেই থমকে দাঁড়িয়েছেন৷ তাঁর দেখাদেখি আমরাও৷ এবার মোবাইল তুলে ধরে চারপাশটা দেখলাম৷

আমরা সিঁড়িপথের শেষে এসে দাঁড়িয়েছি৷ সামনে একটা বড়ো দালানের মতো বেশ প্রশস্ত জায়গা৷ পুরোটাই পাথর দিয়ে তৈরি৷ দালানটা আমাদের উলটোদিকে লম্বা হয়ে চলে গেছে৷ মোবাইলের টর্চের আলো তার শেষদিক পর্যন্ত পৌঁছোচ্ছে না৷ এই সংকীর্ণ গুহামুখের ভেতর এতখানি চওড়া একটা জায়গা দেখে আমরা রীতিমতো অবাক৷

কিন্তু ততক্ষণে একটা জিনিস আমরা সবাই লক্ষ করেছি৷ দালানমতো জায়গাটার দু-ধারে দেওয়ালের গায়ে খাঁজ কেটে তৈরি করা কুলুঙ্গি৷ সেগুলো প্রায় চার হাত অন্তর অন্তর পরপর চলে গেছে দালান বরাবর৷ আর প্রতি কুলুঙ্গিতেই একটা করে পাথরের প্রদীপ৷

ওই প্রদীপগুলো একসময় নিশ্চয়ই জ্বালিয়ে রাখা হত সবসময়ের জন্য, যাতে মন্দিরের দর্শনার্থীদের যাতায়াতে কোনো অসুবিধে না হয়৷ তার মানে আমাদের অনুমান সঠিক৷ এটাই সেই হারিয়ে যাওয়া মন্দিরের প্রবেশপথ, এবং মন্দিরটা আর খুব বেশি দূরেও নেই৷

সুজয়বাবুর থেকে এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত খবর পাওয়ার কথা, কিন্তু উনি হঠাৎ একদমই নিশ্চুপ হয়ে গেছেন৷ বোধ হয় তাঁর ছোট্টবেলার স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানটাকে মিলিয়ে নেবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ঠিকমতো মেলাতে পারছেন না৷

আমরা দেওয়ালের কাছে গিয়ে কুলুঙ্গির প্রদীপগুলো দেখলাম৷ সলতে আছে যদিও, কিন্তু শুকনো খটখটে৷ খুব স্বাভাবিক৷ এত বছর পরেও কি প্রদীপে তেল থাকবে? সলতেগুলো আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতেই ঝুরঝুর করে গুঁড়ো হয়ে যেতে লাগল৷

অগত্যা প্রদীপের জায়গাতে প্রদীপ রেখে দিয়ে আমরা দালানের অপর দিকে হাঁটা দিলাম৷

চারজনের হাতেই মোবাইল থেকে আলো বেরোচ্ছে৷ যেন এগুলোই আধুনিক মশাল৷ গভীর অন্ধকার কোনো অমাবস্যার রাতে প্রাচীনকালের দস্যুদলের মতো আমরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি কোনো গোপন অভিসন্ধি নিয়ে৷

সবাই চুপচাপ৷ কেউ কোনো কথা বলছি না৷ শুধু খুব সাবধানে চারপাশ দেখতে দেখতে একটা একটা করে পা ফেলছি৷

এইভাবে মিনিট পাঁচেক বোধ হয় হেঁটেছি৷ তারপরেই চোখে পড়ল একটা আবছা আলো৷ গুহার ভেতর দিক থেকে আসছে৷ অবাক হয়ে গেলাম৷ এই বদ্ধ গুহার ভেতরে কীসের আলো? যেন বেশ খানিকটা দূর থেকে আসছে আলোটা৷

বোঝবার জন্য মোবাইলগুলো তুলে ধরতেই চোখ পড়ে গেল দু-পাশের দেওয়ালে৷ পাথরের দেওয়াল কুঁদে তৈরি করা হয়েছে নানা কারুকাজ৷ ভালো করে আলো ফেলে দেখি-আরে! এ তো স্থাপত্যশৈলী! বিভিন্ন ধরনের মূর্তি আর নকশার কাজ এই গুহার ভেতরে!

ঠিক সেই মুহূর্তে মেজর হঠাৎ কীসে যেন হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তেও সামলে নিলেন নিজেকে৷ চমকে উঠে তৎক্ষণাৎ আমরা আলো ফেলি পায়ের কাছে৷

একটা পাথরের চৌকাঠ! এতক্ষণ সমান রাস্তা ধরে আমরা হাঁটছিলাম৷ কোথাও কোনো উঁচু-নীচু ছিল না৷ কিন্তু এখানে হঠাৎ দু-ইঞ্চি বাই দু-ইঞ্চি একটা চৌকাঠ গোটা রাস্তা জুড়ে৷ এমনকী সেই বরাবর দেওয়ালের দু-পাশে আর মাথার ওপরেও সমান সাইজের লম্বা টানা চৌকাঠ৷ ঠিক যেন একটা দরজার খোলা ফ্রেম, যাতে কোন পাল্লা নেই৷

ব্যাপারটা কী? পথের মধ্যে হঠাৎ এরকম একটা জিনিস থাকার মানে কী? অবাক হয়ে এইসব কথা ভাবছি, এমন সময় এতক্ষণের নিস্তব্ধতা ভেঙে মেজর কথা বলে উঠলেন৷ চারিদিকে চাপা এই গুহার ভেতরে যেন গমগম করে বেজে উঠল তাঁর গলা, 'নাউ দ্য সার্চিং ইজ ওভার৷ এই হল সেই হারিয়ে যাওয়া মন্দির৷ আর এটা হল সেই মন্দিরের দরজা৷'

মেজরের কথা শুনে চমকে উঠি৷ পুরো ছবিটা এবার যেন চোখের নিমেষে পরিষ্কার হয়ে যায় আমাদের কাছে৷ দেওয়ালের গায়ে অলংকরণ, দরজার মতো ফ্রেম, তার মানে আমরা পৌঁছে গেছি মন্দিরের দোরগোড়ায়৷ অর্থাৎ এই গুহার ভেতরে আলাদা করে কোনো মন্দির নেই, গুহাটাকেই কুঁদে কুঁদে মন্দিরের রূপ দেওয়া হয়েছে, এবং ওই মন্দিরই হল গুহার শেষপ্রান্ত, যার পরে আর যাবার কোনো জায়গা নেই৷

চমকপ্রদ! অভাবনীয়! এই পরিকল্পনার আবিষ্কর্তাকে মনে মনে স্যালুট করি৷ আর সবাই আবার অতি উৎসাহী হয়ে উঠি৷ যে মন্দিরের খোঁজে আমাদের এতক্ষণের এত পরিশ্রম, নিশ্চিতভাবে তার সন্ধান পেয়ে যেতেই আমাদের প্রাণশক্তি নতুন উদ্যমে ফিরে আসে আবার৷ দ্রুত পায়ে আমরা এগিয়ে যাই আরও ভেতরের দিকে৷

এখানেও দেওয়ালের গায়ে গায়ে বিভিন্ন অলংকরণ৷ খোদাই করা নানা ধরনের ছবি৷ দেবদেবী, পশুপাখি, মানুষ৷ আবছা আলোয় যদিও ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু সেগুলো যে নিপুণ হাতের শিল্প, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে৷ সুজয়বাবুর প্রপিতামহ সূর্যপ্রতাপের রুচিবোধ যে খুব উন্নত ছিল, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই৷

মুগ্ধ চোখে এগুলো দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম৷ কিন্তু সামান্য এগোনোর পরেই আবার আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল৷ মোবাইলের সামান্য আলোতেই যা দেখা গেল, তাতে বিস্ময়ে হতবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না৷

আমাদের সামনের পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে এক অপরূপ শ্বেতপাথরের মন্দির৷ সামনে এক ফুট উঁচু একটা ছোট্ট দালান, কয়েকটা স্তম্ভ দিয়ে ঘেরা৷ তারপর দু-দিকে টানা দেওয়ালের ঠিক মাঝখানে একটা দরজা, যার ভেতরে রহস্যময় অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে৷ মন্দিরের মাথার ওপর কারুকার্য করা খিলান, চারকোনা উঁচু তার শিখর উঠে গেছে সোজা ওপরের দিকে৷ আর সেই শিখরের মাথার কাছে গুহার ছাদ খানিকটা ভেঙে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে একটা বড়োসড়ো গর্ত, যেখান দিয়ে মুক্ত পৃথিবীর আলো ঢুকে পড়েছে এই অন্ধকার গুহার ভেতরে৷ সেই আলো-আঁধারিতে মন্দিরটা যেন এক মায়াময় স্বপ্ন জগতের সৃষ্টি করেছে৷

এই দৃশ্য দেখে আমরা সবাই চুপ৷ শুধু সুজয়বাবু চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, 'ওয়ান্ডারফুল! এই তো সেই মন্দির৷ কিন্তু এত সুন্দর ছিল সেটা?'

মেজর বললেন, 'কেন সুজয়? তোমার কি কোনো সন্দেহ হচ্ছে?'

'না মেজর৷ কিন্তু ছোটোবেলায় মন্দিরে এলেই গা ছমছম করত৷ তাই শুধু ভয়ের স্মৃতিটাই জেগে আছে৷ মন্দিরটা যে আসলে এত সুন্দর, তা জানতেই পারিনি কখনো৷'

মেজর ঘুরে অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'মাই ডিয়ার ব্রাদার, একটা জিনিস লক্ষ করেছ তো?'

অরিন্দম বলল, 'কী মেজর?'

'গুহার ছাদটা ভেঙে গিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে, তার মানে বাইরে থেকে দেখলে নিশ্চয়ই মন্দিরের চুড়াটা দেখা যায়, যেটা আমরা দেখতে পেয়েছিলাম টিলার পেছনে খালের ওপার থেকে৷'

উত্তেজিতভাবে অরিন্দম বলল, 'ইয়েস বস! ভাঙাচোরা মাটির ফাঁক দিয়ে চূড়ার একটা পাশ শুধু দেখা যাচ্ছিল৷ তাই সাদা রঙের একটা অজানা বস্তু ছাড়া আর কিছু বোঝা যায়নি৷'

মেজর বললেন, 'ঠিক তাই৷ কিন্তু সঠিক কিছু না বুঝলেও অজান্তেই তুমি এই মন্দিরের কথাটাই বলে ফেলেছিলে৷ আর তা থেকেই সম্ভাবনাটা আমার মাথাতেও খেলা করে যায়৷ কারণ ভূমিকম্পে গুহামুখটা হারিয়ে যাবার ফলে মন্দিরও অদৃশ্য, ফলে এদিকে আর কারুর আসার দরকার পড়ে না৷ বিশেষ করে খালের ওপারে তো কারুর যাতায়াতই নেই, কাজেই ওখান থেকে আমরা যেটা দেখেছি, তা এর আগে আর কারুরই চোখে পড়েনি৷'

মাথা নেড়ে সবাই সায় দিই মেজরের কথায়৷ আমি যদিও টিলার পেছন থেকে খালি চোখে কিছুই দেখতে পাইনি, কিন্তু ব্যাপারটা আন্দাজ করতে অসুবিধে হচ্ছিল না৷ সেইসঙ্গে আর একটা কথাও বুঝলাম, গুহার ভেতর দূর থেকে এই আলোটাকেই আবছাভাবে দেখে আমরা কী জানি কীসের আলো ভেবে শঙ্কিত হয়েছিলাম৷

এবার আমরা একের পর এক উঠে যাই দালানে৷ সুজয়বাবু এখন ফুল ফর্মে৷ সবচেয়ে আগে তিনিই লাফিয়ে উঠে পড়লেন, পেছন পেছন আমরা৷ দালানটা ফাঁকাই, শুধু বাঁ-দিকের কোণে একটা দামামার মতো বাদ্যযন্ত্র, আর তার পাশে একটা বড়ো পাথরের পাত্র৷ দালানের ঠিক মাঝখানে ভারী পাথরের দরজাটা, কিন্তু পাল্লা দুটো খোলা৷ আমরা একে একে সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকি, আর ঢুকেই অবাক হয়ে যাই৷ কী বিশাল এই ঘরের আকৃতি৷ অন্তত কুড়ি ফুট বাই কুড়ি ফুট! বাইরে থেকে একদমই বোঝা সম্ভব নয় ঘরের এই আয়তন৷ মাথার ওপরের ছাদটা আরও উঁচু, কমসে কম ত্রিশ ফুট৷ চারদিকের দেওয়াল থেকে ক্রমশ গোল হয়ে ছাদটা উঠে গেছে ওপরের দিকে৷ ঘরে ঢুকলেই যা সবার আগে দৃষ্টি কেড়ে নেয়, তা হল পেছনদিকের দেওয়াল ঘেঁষে হাঁটুসমান উঁচু বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘোর কালো পাথরের তৈরি নটরাজের মূর্তি! এই অন্ধকারেও যেন তাঁর পা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে৷ তাঁর নাচের ছন্দে যেন বিশ্বপ্রকৃতিকে লণ্ডভণ্ড করে দেবার একটা ভৈরব ছন্দ৷

প্রায় ছয় থেকে সাত ফুট উঁচু সেই মূর্তির দিকে বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বুঝতে পারলাম, এ মূর্তি আমার চেনা৷ খুবই চেনা৷ জমিদার মাণিক্যপ্রতাপ সিংহরায়ের ঘরে দেখা সেই ছোট্ট নটরাজেরই অবিকল প্রতিরূপ এই মন্দিরের দেবতা, শুধু আকারে তার থেকে অনেক, অনেক গুণ বড়ো৷

ঘরে আরও কয়েকটা জিনিস ছিল, যেমন কোণের একটা দেওয়াল আলমারিতে পুজোর বাসনকোসন, একটা তাকে কিছু কাপড়চোপড়, আসন, ঘণ্টা ইত্যাদি, দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে সেই পাথরের প্রদীপ রাখা, আর মূর্তির সামনে মেঝেতে সাজানো পুজোর উপাচার৷ ধূপদানি, পিতলের প্রদীপ, প্রসাদের থালাবাটি, সব নিয়মমতো রাখা আছে৷ যেন সবেমাত্র পুজো শেষ করে পূজারি উঠে গেছেন৷ অর্থাৎ আচম্বিতে সেই ভূমিকম্প ঘটার আগে পর্যন্ত নিয়মমতোই সব চলছিল৷ তারপর শুধু প্রকৃতির এক নিমেষের খেলায় সবকিছুর ওলোটপালট৷ যেন নটরাজের তাণ্ডব নৃত্য৷

মনটা ভার হয়ে গেল৷ আমার করারও আর কিছু ছিল না৷ তাই চারিদিকে একবার নজর বুলিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷ অরিন্দম মন্দিরের বাইরে ভেতরে ঘুরে ঘুরে ফ্ল্যাশ জ্বেলে ফটো তুলতে শুরু করেছে৷ আর মেজর মোবাইল টর্চেই যতটা সম্ভব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছেন ঘরের ভিতরটা৷

বাইরে এসে দেখি, সুজয়বাবু দালান থেকে নেমে মন্দিরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমি কিছু না বলে চুপটি করে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম৷

একটু পরেই মেজর আর অরিন্দম একসঙ্গে মন্দির থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এলেন আমাদের কাছে৷ আমি জিজ্ঞাসু চোখে মেজরের দিকে তাকাতেই মেজর গম্ভীর মুখে বললেন, 'চলো, এবার ফেরা যাক৷ এখানে আর কিছু দেখার নেই৷'

Cov11
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%