অন্ধকারের উৎস হতে

রিয়া ভট্টাচার্য

|| অন্ধকারের উৎস হতে ||

নিজের নখরযুক্ত পাতলা আঙুলে এক নিরীহ সরীসৃপের লেজের ডগা ধরে তাকে খেলার ছলে দোল দিচ্ছে নোয়ি। মাঝে মাঝে নখ দিয়ে খোঁচা দিচ্ছে তার পাতলা চামড়াযুক্ত পেটে। ছটফট করছে প্রাণীটা। রং বদলাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। কখনও লাল, কখনও ঘন বেগুনী, কখনও বা ঘন সবুজ। রাগ-ভয়- বিস্ময় যেন চেপে বসেছে ছোট প্রাণীটার ওপরে, বাতাসে বারবার আছাড় খাচ্ছে তার চেরা জিভ।

খিলখিল করে হাসছে নোয়ি। মাঝেমধ্যে এই প্রাণীটাকে ধরে আনে সে। যথেচ্ছ অত্যাচার করে আগুনে পুড়িয়ে ছাল ছাড়িয়ে সেই ছাল শুঁকে নেশা করে সে। এভাবেই সে বদলা নেয় বেইমান মানুষদের প্রতি, অনিকার প্রতি। তার ভূতপূর্ব প্রেমিকা তার সত্য জানার পরেই ছেড়ে গিয়েছে তাকে। এখন ভিন শহরে বিয়ে করে দুই বাচ্চা নিয়ে বেজায় সুখী সে। নোয়ি চাইলেই প্রত্যাঘাত করতে পারত, কিন্তু করেনি... তারা যে মানুষ নয়! তাদের পশুপ্রবৃত্তি তাদের নিষ্ঠুর হতে শিখিয়েছে, কিন্তু তা শুধুমাত্র তাদের শত্রুদের প্রতি। এমনিতে তারা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে জানে, ভালোবাসার জন্য নিজেদের ছাইয়ে পরিণত করতে দ্বিধা করে না তারা। কিন্তু মানুষ!  তারা শুধুই সুযোগ নিতে পছন্দ করে। বেইমান মানুষ!

ফোঁৎ করে শ্বাস ছাড়ে নোয়ি। অনেক খেলাধুলো হয়েছে বেচারি প্রাণীটার সঙ্গে, এবার তাকে মুক্তি দেওয়া যাক! সামনে কাঠকুটো জ্বেলে তৈরি করা আগুনের ভেতরে সবে প্রাণীটাকে ফেলতে যাবে নোয়ি পেছন থেকে তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার ভেসে আসে, “থাম!”

বিব্রত মুখে ঘাড় ঘোরায় নোয়ি। অশনায়া দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে তার দিকে, বাতাসে উড়ছে তার এলোচুল। আঁটোসাটো কালো পোশাকটা তাকে দুর্দান্ত মানিয়েছে, গলায় ঝুলছে তার খুব প্রিয় লাল স্কার্ফখানা। তার মায়ের শেষ স্মৃতি।

“তুই আবার! কতবার বলেছি নেশা করার সময় জ্বালাতে আসবি না!”

বিরক্তস্বরে বলে নোয়ি৷

“প্রাণীটাকে ছাড়, এভাবে বেচারিদের মারা বন্ধ কর। এটা অন্যায়।”

নরম গলায় মন্তব্য করে অশনায়া।

“ন্যায় অন্যায়ের ভাষণ দিস না মানুষদের মতো। তারা ভাষণ দেয়, আবার নিজেরাই যথেচ্ছ অন্যায় করে। আমাদের দুনিয়ায় এসবের বালাই নেই।”

তিক্ত গলায় বলে নোয়ি।

“এটা একটা সামান্য গিরগিটি। একে মেরে তোর বিন্দুমাত্র যন্ত্রণা কমবে না বা এর চামড়া পুড়িয়ে খেলে তোর বিন্দুমাত্র নেশা হবে না৷ আমরা মানুষ নই, আমাদের নেশা হয় না। এসব বন্ধ কর নোয়ি। অনেক বছর হল।”

তিনফুট লম্বা নোয়ির কাঁধে সহমর্মিতার হাত রাখে অশনায়া।

“তুই কী জানিস যন্ত্রণার অ্যাঁ! কতটুকু জানিস! জানিস আমাদের সঙ্গী যখন আমাদের ছেড়ে যায় কী অবস্থা হয় আমাদের! তুই আজ পর্যন্ত সঙ্গী বাছিসনি, একা ঘুরে বেড়াচ্ছিস এসব বোঝার ক্ষমতা তোর নেই অশনায়া। আমাদের জন্য সঙ্গীর ছেড়ে যাওয়া মৃত্যুর চেয়ে ভয়ঙ্কর। প্রতিরাতে দগ্ধ হই আমি, মৃত্যুকামনা করি নিজের, কিন্তু মৃত্যু আসে না। ধুঁকে ধুঁকে টেনে চলি লম্বা জীবনটাকে। এমন জীবন কী আমি চেয়েছিলাম অশনায়া! কেন আমার এই অবস্থা আজ! কার জন্য? মানুষের জন্য৷ বেইমান মানুষের জন্য। কী হয়েছে তাতে যে আমি গিরগিটি পোড়াই! মানুষ পোড়াই না এটাই অনেক।”

ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে নোয়ি। হাপরের মতো ওঠানামা করে তার বুক। শুকনো চোখ ফেটে রক্ত বেরোতে চায়, পারে না...  অশনায়া তড়িঘড়ি তার পাশে বসে তার হাতের তালুতে আঙুল বোলায়। শান্ত করতে চায় স্পর্শ দিয়ে। যন্ত্রণাকাতর জন্তুর মতো গোঙানির শব্দ বেরোয় নোয়ির গলা চিরে। কোনও কথা না বলে অবলা প্রাণীটাকে দূরে মাঠের দিকে ছুড়ে দেয় সে।

“তুই নতুন সঙ্গী নির্বাচন করতে পারিস। এমন কেউ যে আমাদের স্বজাতি, মানুষ নয়। দেখবি, তুই ভালো থাকবি নোয়ি। চেষ্টা করে দেখ।”

ব্যথিত গলায় বলে অশনায়া।

“সঙ্গী! খুব সহজ তাই না! আমাদের সঙ্গী নির্বাচন আমাদের হৃদয় করে অশনায়া, আমাদের মস্তিষ্ক নয়। বাদ দে, আজ হঠাৎ আমার কাছে কী মনে করে!”

হালকা হাসির ছলে কথাগুলো বলে নোয়ি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় অশনায়া। চোখের সাদা অংশের চিহ্নমাত্র নেই নোয়ির চোখে, পুরোটাই কালো, মহাকাশীয় অন্ধকার! অশনায়া জানে, যখন তাদের হৃদয় রক্তক্ষরণ শেষে নীরব হয়ে পড়ে, যখন আর কোনওরকম আশা অবশিষ্ট থাকে না তাদের ভেতরে তখনই মুছে যায় তাদের চোখের সাদা অংশ। চোখকে যে মনের আয়না বলা হয়! তাদের চোখই বর্ণনা দেয় তাদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার। নোয়ি বদলে যাচ্ছে৷ ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটছে তার। অশনায়া জানে এরপর কী হতে চলেছে৷ চোখের পর ধীরে ধীরে নোয়ির সারা শরীর কালো হতে শুরু করবে, তারপরে শুরু হবে পচন। এভাবেই এক মহাযন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে নোয়ি। যদি না এর মাঝে সে কোনও সঙ্গী খুঁজে পায়।

“এখনও সময় আছে নোয়ি...”

“সময় নেই, সময় শেষ।”

“তুই যদি চাস আমি অনিকাকে নিয়ে আসতে পারি তোর জন্য, শুধু একবার বল!”

মিনতি করে অশনায়া।

“তুই কী ভাবিস আমি চাইলে সেটা পারি না! কিন্তু এটা করে কী হবে বলবি! সে কি ভালোবাসবে আর আমায়! ভয় পাবে, ঘৃণা করবে। আর তার ঘৃণা আমায় আরও দগ্ধ করবে। তার চেয়ে যা আছে তাই থাক।”

নিজের ছোট্ট মাথাটা নেড়ে মন্তব্য করে নোয়ি।

“কিন্তু তোর সুস্থ হওয়ার জন্য তোর সঙ্গীর রক্ত জরুরি।”

“আমার সুস্থ হওয়ার আর সুযোগ নেই অশনায়া। তাই ওসব ভেবে লাভ নেই। নিজের কথা বল।”

নোয়ির কথাগুলো কেমন যেন যান্ত্রিক শোনায়।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকায় অশনায়া। একফালি কাস্তের মতো বাঁকা চাঁদখানা চেয়ে রয়েছে পরিষ্কার আকাশে। তাকে ঘিরে জটলা করছে তারাদের দল। কত রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ওই অন্ধকার আকাশের কোলে, যার খবর কেউ রাখে না, রাখতে নেই।

“আমি একজনকে বাঁচিয়েছি, মানে একজন মানুষকে...”

দ্বিধা নিয়ে কথাগুলি বলে অশনায়া।

“শেষ পর্যন্ত তুইও! তুই এত বোকা হবি ভাবতে পারিনি, অন্তত আমায় দেখে শিক্ষা নিতে পারতি। মানুষ মারার জন্য, বাঁচাবার জন্য নয়।”

ব্যাঙ্গের হাসি হেসে বলে নোয়ি।

“আসলে, মেয়েটার সঙ্গে খুব খারাপ কাজ হচ্ছিল... তার চিৎকার শুনে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আর...”

অশনায়া কথা হাতড়ায়।

“আর কী?”

ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করে নোয়ি।

“আর, মেয়েটা লোকগুলোর হাত থেকে বাঁচতে হাতের শিরা কাটতে গিয়েছিল। ভাগ্যিস শিরা পর্যন্ত ব্লেড পৌঁছয়নি, চামড়াই কেটেছিল। তবে রক্ত বেরোচ্ছিল খুব, তাই...”

নিজের শ্বাস বন্ধ করে কথাগুলো বলে অশনায়া।

“তাই কী!”

নিজের কালো চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করে নোয়ি। ভয়ে-বিস্ময়ে মাথার চুল খাড়া হয়ে যায় তার।

“তাই... আমায় ওর কবজিতে জিভ বুলিয়ে... তুই তো জানিস আমাদের লালায় রক্ত বন্ধ করার উপাদান রয়েছে... এমনকি ক্ষতস্থানও পুরোপুরি সেরে যায়... তাই...”

“তুই ওর রক্তের স্বাদ নিয়েছিস!”

চিৎকার করে ওঠে নোয়ি।

“আসলে আমি কিচ্ছু ভেবে করিনি... মেয়েটাকে বাঁচাবার জন্য...”

থরথর করে কেঁপে ওঠে অশনায়া।

“তুই ওর রক্তের স্বাদ নিয়েছিস!”

থেমে থেমে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলি উচ্চারণ করে নোয়ি।

“হ্যাঁ।”

অখণ্ড নীরবতা। সময়ের কাঁটা এগিয়ে চলে টিকটিক টিকটিক। কেউই কোনও কথা বলে না৷ আকাশের দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। সামনে জ্বলন্ত আগুনের ভেতরে কাঠ ফাটার শব্দ হয়। দূরে কোথাও শেয়াল কেঁদে ওঠে।

“সবকিছু জানার পরেও! কেন অশনায়া!”

বহুক্ষণ পরে মুখ খোলে নোয়ি।

“আমি কিচ্ছু ভেবেচিন্তে করিনি বিশ্বাস কর! মেয়েটার মুখখানায় এত ব্যথা... নিজেকে সামলাতে পারিনি আমি।”

মাথা নিচু করে নিজের মনেই কথাগুলো বলে অশনায়া।

“তুই নিজের অজান্তেই সঙ্গী নির্বাচন করে বসে আছিস অশনায়া। চাইলেও ওর থেকে দূরে থাকতে পারবি না তুই। ওর রক্ত টানবে তোকে। এ টান সীমাহীন, সব বাধার ঊর্ধ্বে। কিন্তু...!”

উত্তর না দিয়ে নোয়ির মুখের দিকে তাকায় অশনায়া।

“তুই একজন মেয়ে হয়ে একজন মেয়েকে সঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করেছিস অশনায়া, তাও আবার মানুষ। তোর মনে হয় সে মেনে নেবে তোকে! সঙ্গীর অস্বীকারের ফল নিজের চোখের সামনে আমায় দিয়ে দেখছিস, তারপরেও!”

বিরক্তিতে ঘাড় ঘোরায় নোয়ি।

“আমি কোনও কিছুই জেনেবুঝে করিনি, মেয়েটার প্রেমেও পড়িনি। তাছাড়া আমি তুই নই যে কারও প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেব। রক্তের স্বাদ নেওয়ার জন্য যে টানটুকু তৈরি হয়েছে পরবর্তী পূর্নিমার মধ্যে কেটে যাবে তা। এরমধ্যে আর তার রক্তের স্বাদ না নিলেই হল।”

মাটির দিকে তাকিয়ে নিজেকেই যেন শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলি বলে অশনায়া।

“সেই, খুবই সোজা সবকিছু তাই না! অপেক্ষা কর, নিজেই জানতে পারবি৷ তা এতক্ষণ ছিলি কোথায়!”

হালকা হাসিতে অশনায়ার কথাগুলো উড়িয়ে দিয়ে বলে নোয়ি।

“মেয়েটা... মেয়েটা নিজেকে কাটছিল... আমার চোখের সামনে... ওর সারা শরীরে কাটা দাগ... ও খুব কষ্টে আছে... আমি চেয়েছিলাম ওর কাছে যেতে, কিন্তু যাইনি৷ পালিয়ে এসেছি এখানে। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারছিলাম না!”

নিজের মনেই বিড়বিড় করে অশনায়া।

“হয়ে গেছে। আর কিচ্ছু হওয়ার নেই তোর। আজ নয়তো কাল ওই মেয়ের পায়ের তলায় নিজেকে ফেলবি তুই, লাথি খাবি, তারপর এখানে বসে আমার সঙ্গে গিরগিটি পোড়াবি আর নিজের মৃত্যুর অপেক্ষা করবি। চল, একদিক দিয়ে ভালো। আমার একটা সাথি জুটল, একলা মরতে হবে না।”

নিজের দু’হাতে তালি বাজিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দে হাসে নোয়ি। তার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে অশনায়া। নীল চোখে খেলা করে বিদ্যুৎ।

“আমি এভাবে মরব না তোর মতো। অতটাও দুর্বল নই৷ ওই মেয়ের কী ক্ষমতা আমায় মারে! আমিও দেখে নেব রক্তের টান বড় নাকি আমার জেদ৷ ওই মেয়ের মুখদর্শন যদি আর করেছি তো আমার নাম অশনায়া নয়!”

ঝড়ের বেগে ধুপধাপ পা ফেলে স্থানত্যাগ করে সে।

খিলখিল করে হেসে ওঠে নোয়ি। সামনে পড়ে থাকা গাছের ডাল দিয়ে নিভে আসা আগুনটাকে আরেকটু খুঁচিয়ে দেয়। তারপর নিজের মনেই বলে, “এবার আর তোর জেদ খাটবে না অশনায়া। সঙ্গীর নেশা সবচেয়ে বড় নেশা, চাইলেও ওর থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে না তোর পক্ষে। তবে চিন্তা নেই, আমার ধরা গিরগিটির ছালের ভাগ তোকে আমি দেব। শত হলেও তুই আমার বন্ধু!”

ছোট্ট দুটো ধূসর ডানায় ভর করে কাছের বাবলা গাছখানার ডালে বসে নোয়ি, তারপর আপন মনে হুমহুম করে গান ভাঁজে। তীক্ষ্ণ স্বরের অমানুষিক গান, প্রেতের হাসির সঙ্গে যার বিশেষ পার্থক্য নেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%