রিয়া ভট্টাচার্য

|| ছায়াঘন সেই দিনে ||
তীক্ষ্ণ গম্ভীর স্বর অজানা ভাষায় পড়ে চলেছে কিছু মন্ত্র, দুর্গের পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে তা সৃষ্টি করছে অপূর্ব ধ্বনিব্যঞ্জনা।
এই দুর্গ ঠিক কোথায় তা জানে না কেউ, মানুষ কখনও তার ঠিকানা খুঁজে পায় না। এই চির অন্ধকার দুর্গ অন্ধকারের জীবদের আস্তানা, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না কখনও। প্রকৃতি এখানে বড্ড নির্মম, সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। আছে পাথরের ইমারত, শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত গড়িয়ে পড়ার মতো অতিরিক্ত ঠান্ডা, ধুলো আর... রক্তের গন্ধ!
একদল অন্ধকারের জীব বাস করে এখানে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাদের জীবনের মোহ নেই, আলোর প্রতি টান নেই, প্রকৃতির প্রতি উচ্ছ্বাস নেই। তারা অর্ধজীবিত-অর্ধমৃত এক অদ্ভুত সত্ত্বা, সবকিছু থেকেও যাদের কিচ্ছু নেই।
সেই কোন কালে, প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে সৃষ্ট হয়েছিল তারা, পাখি ও মানুষের মিলিত আকৃতি, শিকারী চিতার ক্ষিপ্রতা, পিট ভ্যাম্পারের নির্মমতা, অকুণ্ঠ রক্তপিপাসা তাদের পরিচয়। নিজেদের অনন্য সৌন্দর্য তাদের দিয়েছে শিকারকে আকৃষ্ট করার অতুলনীয় ক্ষমতা। এই ক্ষমতার ওপরে নির্ভর করে তারা বেঁচে থাকে, মানুষের থেকে বহুগুণ আয়ু বেশি তাদের৷ তাদের আরেকটি ক্ষমতা যা সম্পর্কে মানুষ অবগত নয় তা হল জাদুবিদ্যার ওপরে এদের অমোঘ দখল। পৃথিবীর বিবর্তনের সময় থেকেই জাদুবাস্তবতার জগতের সম্পূর্ণ দখল তাদের, তারাই এর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। তারা এমন অনেক কিছুই করতে পারে যা হয়তো কেউ ভাবতে পারেনি কখনও। এইজন্যই মাঝে মাঝে তাদের বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়৷ জাদুর দুনিয়ার অন্যান্য প্রাণীরা তাদের মেরে দখল করতে চায় সাম্রাজ্য। কিন্তু তা কখনওই হওয়ার নয়।
অন্ধকারের জীব রক্তবীজের মতো। নিজেদের রক্ত দিয়ে অন্য জীবন সৃষ্টি করতে পারে, আবার নিজেদের লালা দ্বারা বুজিয়ে ফেলতে পারে ক্ষত। তারা সদা পরিবর্তনশীল, তাই মানুষের মাঝে তাদের সহজ বিচরণ। তাদের চেনার ক্ষমতা কারও নেই, যদি না তারা নিজেরাই ধরা দিতে চায়।
তবে এই অন্ধকারের জীবদের মারতে পারে কে? তারা নিজেরাই। তারা ভালোবেসে মরে, সঙ্গীহীনতায় বাসী ফুলের মতো শুকিয়ে যায়। এই জীবরা তাদের সঙ্গীদের ওপরে চূড়ান্ত নির্ভরশীল, আর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফল পেতে হয় সকলকেই।
আপাতত তারা দুর্গের ভেতরে সুবিশাল দরবারগৃহে একত্রে জড় হয়েছে। লম্বা কালো আলখাল্লা আর মাথা-মুখ ঢাকা কালো কাপড়ে তাদের যেন ছায়াশরীর বোধ হচ্ছে। নিজেদের পানপাত্র মুখের কাছে এনে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছে তারা, রাতের আকাশের বুক চিরে ক্ষণে ক্ষণে চমকাচ্ছে বিদ্যুৎ। কালো আলখাল্লা আর সোনালি জরির কাজ করা মস্তকবন্ধনী পরিহিত এক ব্যক্তিত্বময় ছায়া দাঁড়িয়ে রয়েছেন সবার ওপরে, তাঁর পা মাটি স্পর্শ করছে না। মাটি থেকে কিছুটা ওপরে বাতাসে ভাসছে তারা, যেন অদৃশ্য কোনও স্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি৷
“Alea iacta est”!
গম্ভীরমুখে উচ্চারণ করে পানপাত্রে চুমুক দেন তিনি, দেখাদেখি বাকিরাও চুমুক দেয়। অনেকজোড়া লাল চোখ অনির্দিষ্টভাবে তাকিয়ে থাকে, প্রত্যেকের চোখের রং ধীরে ধীরে বদলে যায়, রক্তের নেশায় বুঁদ হয়ে ওঠে সকলে।
দু’জন প্রহরীগোছের অন্ধকারের জীব এক অর্ধঅচেতন মানবদেহ হিড়হিড় করে টেনে আনে। প্রভুর সামনে এসে থেমে যায় তারা, ঘাড় ঝুঁকিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে সরে দাঁড়ায়। শিকারের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে তিনি ডাক দেন, “অশনায়া!”
কালো ছায়াগুলি নড়েচড়ে ওঠে। আপাদমস্তক কালো পোশাকে মোড়া অশনায়া দীপ্ত পদক্ষেপে সামনে এসে দাঁড়ায়। একহাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে শ্রদ্ধা জানায় অন্ধকার জগতের সর্বময় অধিকর্তাকে। হাত বাড়িয়ে অশনায়ার হাতে কারুকার্যময় পাথরের হাতলযুক্ত চকচকে ছুরিখানি তুলে দেন তিনি। হাত নেড়ে ইশারা করেন।
অভিব্যক্তিহীন মুখে মেঝেতে পড়ে থাকা নারীদেহটিকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বিশাল ঘরটির মাঝে হাওয়ায় ঝুলে থাকা পাথরের বেদীর সামনে নিয়ে যায় অশনায়া। বিনা পরিশ্রমেই তাকে বেদীতে শুইয়ে দেয় সে। মানবশরীরটি ভারি হালকা!
কালো কাপড়ে মোড়া শরীরটির মুখ থেকে আলগোছে পরদা সরাতেই এই প্রথমবার ভয়ানকভাবে চমকে ওঠে সে৷ শরীরটি আর কারও নয়, নোয়ির ভূতপূর্ব প্রেমিকার, তার নির্বাচিত সঙ্গীর!
“পিতা!”
ব্যথিত গলায় বলে ওঠে সে। তার গলা কেঁপে যায় অজান্তেই।
“অন্ধকারের দুনিয়ায় বেইমানির জায়গা নেই অশনায়া, এই মেয়েটি যা করেছে তার শাস্তি তাকে পেতেই হবে।”
ঠান্ডা গলায় উত্তর দেন অন্ধকারের প্রভু।
“কিন্তু নোয়ি... ও যে সহ্য করতে পারবে না!”
“নোয়ি এমনিতেও মরবে, আজ নয়তো কাল। কিন্তু মরার আগে নিজের দোষীকে শাস্তি পেতে দেখে যাবে, আর কী চাই তার!”
“কিন্তু পিতা...!”
“আমার আদেশের ওপরে প্রশ্ন তুলো না অশনায়া!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কর্তব্যপালনে এগিয়ে যায় অশনায়া, মুখের ভাবে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয় না তার। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে শুরু করে সকলে, পূর্নিমাচাঁদের আলো দুর্গের জাফরির ফাঁক গলে সোজা এসে পড়ে বেদীতে। চাঁদের আলো মেখে নিঃস্পন্দ শুয়ে থাকে অশনায়ার শিকার, নোয়ির প্রেমিকা!
ধীরে ধীরে চেহারার পরিবর্তন হয় অশনায়ার। তীক্ষ্ণ নখর, ঠোঁটের দু’পাশ থেকে বেরিয়ে আসা শ্বদন্ত ও পিঠের দু’পাশে গজিয়ে ওঠা দু’খানি বিশাল পালকযুক্ত ডানা... চাঁদের আলোয় অশনায়াকে ভিনগ্রহী বলে ভ্রম হয়। তার দু’খানি ডানা বাতাসে তিরতির করে কাঁপে।
ধীরে ধীরে তীক্ষ্ণ ধারযুক্ত ছুরিখানি নিজের মাথার ওপরে উঁচু করে তুলে ধরে অশনায়া, চোখের পলকে সেটি নেমে এসে আঘাত করে শিকারের হৃদয়ে। ফিনকি দিয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে যায় রক্ত, অশনায়ার মুখে আঁকা হয় রক্তের আলপনা। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সে, তার শিকার বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রয়েছে তার দিকে। যন্ত্রণায় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে দেহ, কিন্তু মুখ থেকে কোনও শব্দ বের হচ্ছে না। পাতলা গোলাপি ঠোঁটদুটি কাঁপছে, শেষবারের মতো কিছু বলার চেষ্টা করছে সে, চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামছে অশ্রুধারা। অশনায়ার চোখে জল নেই, সে নির্লিপ্তভাবে শিকারের বুকে গেঁথে থাকা ছুরিটি ক্ষিপ্রহাতে ঘুরিয়ে চলেছে, জীবিত অবস্থায় শিকারের বুক থেকে তুলে আনছে তার হৃদপিণ্ড... স্তব্ধ হলঘরে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে হৃদয়ের লাবডুব শব্দ।
কাঁপতে কাঁপতে ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যায় দেহটা, নিস্পন্দ চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। জাগতিক মায়া ছিন্ন করে পরপারে পাড়ি দেয় নোয়ির প্রেমিকা, অন্ধকারের জীবরা বেইমানের শাস্তিদান সম্পন্ন করে সহর্ষ উল্লাস করে ওঠে। অশনায়া সেই উল্লাসে যোগ দেয় না। তখনও ধুকপুক করতে থাকা হৃদয়খানি পাথরের পাত্রে রেখে এগিয়ে দেয় প্রভুর দিকে। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়েন তিনি, মুঠো হাত খুলে ছিন্ন হৃদয়ের ওপরে ছড়িয়ে দেন অন্ধকারের গুঁড়ো। তারপরে গম্ভীর মুখে হুকুম দেন, “নোয়িকে দাও।”
নিস্তব্ধ পদক্ষেপে পাথরের পাত্র হাতে হলঘর থেকে বেরিয়ে যায় অশনায়া। পশ্চিম দিকের সরু গলিপথ বেয়ে চলতে চলতে এসে থামে এক বন্ধ লোহার দরজার সামনে। ওপার থেকে ভেসে আসা কাতর চিৎকার আর গোঙানির শব্দ বলে দেয়, এই ঘরেই রয়েছে নোয়ি। তার সঙ্গীর অকাল নিধন তাকে ঠেলে দিয়েছে ব্যথাতুর অন্ধকারে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে সে, কিন্তু কিচ্ছু করতে পারছে না। অন্ধকারের প্রভুর মন্ত্রপূত শৃঙ্খল পাকে পাকে জড়িয়ে রেখেছে তাকে। নড়াচড়া করার সাধ্য নেই তার।
ধীরে ধীরে দরজাটি ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে অশনায়া। এই ঘরে অন্ধকার আরও গভীর, আরও নৃশংস। সেইসঙ্গে চারিদিক বড্ড বেশি ঠান্ডা। ঘরে পা দিয়েই শিউরে ওঠে সে। পাথুরে মেঝের ওপরে হাঁটু মুড়ে বসে রয়েছে নোয়ি, তার দুই হাত ও দুই পা শেকল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। ধুঁকছে সে, জোরে শ্বাস নিচ্ছে। তার শরীর এখন আগের চেয়েও শীর্ণ, কালো হয়ে গিয়েছে চামড়া। তার পিঠের অংশে গভীর ক্ষত, পুড়ে গিয়েছে তার ডানা। অশনায়া জানে এসবই নোয়ির কীর্তি। প্রেমিকাকে বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করেছিল সে, পারেনি। অন্ধকারের প্রভুর চেয়ে বেশি শক্তিশালী তারা কেউ নয়।
পায়ে পায়ে নোয়ির দিকে এগিয়ে যায় অশনায়া, তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে। বিনা বাক্যব্যয়ে পাথরের পাত্রটি এগিয়ে দেয় তার দিকে। গুঙিয়ে ওঠে নোয়ি। শেকল ছেঁড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে বার কয়েক, তারপরে এলিয়ে পড়ে সামনে। থেমে থেমে বলে, “কী করে পারলি! তুই আমার বন্ধু!”
“পিতার কথা অমান্য করার সাধ্য কারও নেই। তাছাড়া মেয়েটি নিজের দোষে শাস্তি পেয়েছে।”
নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দেয় অশনায়া।
“সে যা করেছে আমার সঙ্গে করেছে, শাস্তি দেওয়ার তোরা কে! আমি তো বিচার চাইনি!”
কেঁদে ফেলে নোয়ি।
“পিতা আমাদের সকলের অভিভাবক, তাঁর সিদ্ধান্তের ওপরে আমরা প্রশ্ন তুলতে পারি না। তিনি বলেছেন, এই হৃদয় খেয়ে ফেললেই আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে যাবি তুই।”
মাথা নিচু করে বলে অশনায়া।
ক্ষীণ হাসির শব্দ পাওয়া যায়। নোয়ির ছোট্ট শরীরটা বারকয়েক দুলে ওঠে হাসির দমকে। পাথরের পাত্রে রাখা কালচে হৃদয়খানা দেখে ডুকরে ওঠে সে।
“এভাবে কাউকে ভালো করা যায় না অশনায়া, অন্তত তোর এটা বোঝা উচিত। যাকে ভালোবাসিস, তার মৃত্যুর পর তার হৃদয়ের বিনিময়ে সুস্থ হওয়াটাকে মেনে নিতে পারবি তুই! কখনওই পারবি না। আমিও পারব না রে। ক্ষমা কর আমায়।”
নোয়ির কন্ঠস্বর বড্ড ক্লান্ত শোনায়।
“আমি জানি না আমার ঠিক কী বলা উচিত। ভালোবাসা শব্দটার প্রতি আমার ঠিক বিশ্বাস নেই নোয়ি, কিন্তু বন্ধুত্বের প্রতি রয়েছে। তুই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, আমি তোকে হারাতে চাই না।”
মাথা নিচু করে বলে অশনায়া।
“যদি সত্যিই আমায় বন্ধু ভাবিস আমায় মুক্তি দে অশনায়া। ওকে ছাড়া জীবনটা বড্ড যন্ত্রণাদায়ক হবে রে, এই জীবন আমার কাম্য নয়। হয়তো পরের জন্মে সে আমায় প্রকৃত ভালোবাসবে... হয়তো পরের জন্মে আমি অন্ধকারের জীব না হয়ে কোনও সাধারণ মানুষ হয়ে জন্মাব। সেদিন আমায় সে ফিরিয়ে দিতে পারবে না দেখিস! এখন আমায় যেতে দে...!”
“আমি পারব না নোয়ি। তুই আমায় স্বার্থপর ভাবতে পারিস, কিন্তু তোকে আমি যেতে দেব না। আজ পর্যন্ত পিতার আদেশ পালন করতে হাত কাঁপেনি আমার, রক্ত আমার কাছে নতুন নয়। কিন্তু আজ প্রথমবার আমার হাত কেঁপেছে নোয়ি, একটা দুর্বল মানুষকে মারতে অশনায়ার হাত কেঁপেছে। কারণ, সেই মানুষটা তোর প্রিয়, তোর একান্ত কাছের। আজ প্রথমবার পিতার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছি আমি, কিন্তু পরবর্তীতে পালন করেছি তা। কারণ এছাড়া তোকে বাঁচাবার আর কোনও রাস্তা নেই। তুই না চাইলেও এই হৃদয় আমি তোকে খেতে বাধ্য করব, কারণ তোকে নিজের চোখের সামনে মরতে দেখার ক্ষমতা আমার নেই। তোর বন্ধুত্বকে হারাবার সাধ্য আমার নেই, জীবনে একবার স্বার্থপর হতে চাই। ক্ষমা করিস নোয়ি, আমি প্রমাণ করে দিলাম তোর দুর্বল মানুষী ভালোবাসার চেয়ে একজন অন্ধকারের জীবের বন্ধুত্ব কতটা বেশি শক্তিশালী!”
ম্লান স্বরে কথাগুলি বলে একহাতে নোয়ির মুখ শক্ত করে চেপে ধরে অশনায়া। দুর্বল নোয়ির প্রতিবাদ হারিয়ে যায় অন্ধকার জগতের দ্বিতীয় শক্তিশালী সত্ত্বার দৃঢ়সংকল্পের কাছে। জোর করে নোয়ির মুখে কালচে হৃদয়খানি ঠেসে দেয় দে, মুখ চেপে ধরে বাধ্য করে সেটি চিবিয়ে গিলে ফেলতে। নোয়ির কষ বেয়ে গড়িয়ে নামা কালচে রক্ত তার ভেতরে বিবমিষা উদ্রেক করে না, বরং তাকে আরও কঠিন করে তোলে। নোয়ির প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে সে ঠান্ডা চোখে চেয়ে থাকে তার দিকে, যে দৃষ্টিকে ভয় পায় সমগ্র অন্ধকার জগত। অশনায়া অন্ধকার জগতের ভাবি রানি, প্রভুর পরে তার কথাই অন্ধকার জগতের শেষকথা। নোয়ি টের পায় কেন তাঁর পরে ভাবি উত্তরাধিকারী হিসাবে অশনায়াকে বেছে নিয়েছেন পিতা। সে যেমন নিজের সতীর্থদের রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ঠিক তেমনই অপরের প্রতি নৃশংসতার অপর নাম। মারতে যেমন হাত কাঁপে না তার তেমনি পিতার আদেশে মরতেও ভয় পায় না সে। নিজের প্রিয়তম বন্ধুর আরেক রূপ দেখে শিউরে ওঠে নোয়ি, বাধ্য হয় গিলে ফেলতে নিজের ভালোবাসার মানুষের হৃদয়।
“এটা তুই ঠিক করলি না অশনায়া। এভাবে আমায় বাঁচিয়ে, আজীবনের জন্য যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিয়ে ঠিক করলি না তুই। একদিন তুইও ভালোবাসবি, সেদিন আমি দেখব কী বেছে নিস তুই। ভালোবাসা নাকি পিতার আদেশ!”
হাঁফাতে হাঁফাতে বলে নোয়ি।
“তুই জানিস আমি ভালোবাসতে জানি না নোয়ি। হয়তো সেইজন্যই উত্তরাধিকারী হিসেবে আমায় বেছে নিয়েছেন পিতা।”
স্তিমিত স্বরে বলে অশনায়া, তাকিয়ে থাকে পাথুরে মেঝের দিকে।
হো হো শব্দে হাসে নোয়ি। তার হাসির দমকে ঝনঝন শব্দে বেজে ওঠে তাকে বেঁধে রাখার শেকল।
“ভুলে যাস না তার রক্ত খেয়েছিস তুই! নিজের রক্ত দিয়ে তোকে বেঁধেছে সে! তুই ভাবছিস তুই পালাতে পারবি? পারবি না। তোকে ছুটে যেতে হবে তার কাছে, নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও। আমরা রক্তের টানকে অস্বীকার করতে পারি না যে!”
হাসতে হাসতে বলে নোয়ি।
“সে একটা মেয়ে! পুরুষ নয়, যে আমি তাকে ভালোবাসব। তাছাড়া একটা দুর্বল মানুষকে আর যে হোক অশনায়া ভালোবাসতে পারে না। কী হয়েছে তার রক্ত খেয়েছি আমি! রক্তবন্ধন অত সোজা নয়। সে আমায় ভালোবাসে না, নিজের ইচ্ছেয় রক্ত দেয়নি সে আমায়। তাই বন্ধনের প্রশ্নই নেই!”
চেঁচিয়ে ওঠে অশনায়া।
“সে ভালোবাসে তোকে, তুই বুঝিসনি। দ্বিতীয়বার রক্ত সে তোকে নিজের ইচ্ছেয় দিয়েছে, তোর স্পর্শ পাওয়ার নেশায়। তুই অজান্তেই রক্তবন্ধনে বাঁধা পড়েছিস অশনায়া, এই বন্ধন থেকে তোর মুক্তি নেই!”
“কী... কী করে জানলি তুই!”
বিস্ময়ে দু’চোখ বিস্ফারিত হয় অশনায়ার।
“কালো অ্যাম্বাসাডার গাড়িতে ড্রাইভারের আসনে বেশ বদলে আমিই ছিলাম। মেয়েটির প্রতি এতটাই মনোযোগ দিয়ে ফেলেছিলি তুই যে চিনতে পারিসনি আমায়। সে মেয়ে হলে কী হয়েছে, সে অন্ধকার জগতের ভাবি রানিকে বশ করতে জানে। আমি ওই দিনটার অপেক্ষায় রয়েছি যেদিন তার জন্য নিজের ইগোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবি তুই, নিজের সব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াবি।”
পাগলের মতো হাসতে হাসতে বলে নোয়ি।
স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে অশনায়া। মনে পড়ে যায় পিয়ালির ব্যগ্র চাউনি, তার প্রতি অভিমানে ছলছল করা দুটি চোখ। তবে কি সত্যিই পিয়ালি ভালোবেসে ফেলেছে তাকে! কিন্তু তা কী করে সম্ভব! সে যে একটি মেয়ে! একজন মেয়ে কি আরেকজন মেয়েকে ভালোবাসতে পারে! আদপে কি তা সম্ভব!
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিয়ালির আশাবাদী মুখখানা। নিজের বাড়ির কোন পুজোয় যেন তাকে ডেকেছিল সে আজ! কিন্তু সে তো যেতে পারেনি। তবে কি পিয়ালি সেদিনের মতো আবার!
ভাবতেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডাস্রোত নামে তার। তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে মুচকি হাসে নোয়ি। তীক্ষ্ণস্বরে বলে, “ইতিহাস নিজেকে বারবার পুনরাবৃত্তি করতে ভালোবাসে। তোর পিয়ালি যদি কোনওদিন তোকে ছেড়ে যায় বা অস্বীকার করে সেদিন কিন্তু তোকে মরতে দেব না আমি। বাধ্য করব বাঁচতে যেমন আজ তুই আমায় করেছিস। সেদিন তোর ভালোবাসার মানুষের হৃদয় তোকে খেতে বাধ্য করব আমি, বাধ্য করব মৃত্যুর চেয়ে কঠিন জীবন বাঁচতে। অপেক্ষা কর বন্ধু!”
বন্ধু শব্দটির ব্যঙ্গাত্মক উচ্চারণে আহত চোখে নোয়ির দিকে তাকায় অশনায়া। কোনও কথা না বলে পায়ে পায়ে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। বন্ধ দরজার ওপারে বন্দি নোয়ির কান্নার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পায়। ইচ্ছে করে তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু অশনায়া জানে, এখন আর এসবের কোনও মূল্য নেই। নোয়ির জীবন রক্ষার সংকল্পে সে হারিয়ে ফেলেছে তার বন্ধুত্বকে। তার এখন আর কিচ্ছু করার নেই। অনেকদূরে মফস্ সলের এক ব্যস্ত গলির এককোণে একটা ছোট্ট ঘর এখন ডাকছে তাকে, ডাকছে সেই ঘরের অধিবাসী পিয়ালি নামের এক দুঃখবিলাসী মেয়ে। এটা ভালোবাসা নাকি শুধুই টান জানে না অশনায়া, শুধু জানে তাকে যেতে হবে। অন্ধকার জগতের দ্বিতীয় শক্তিশালী সত্ত্বাকে হাঁটু মুড়ে বসতে হবে এক মরণশীল দুর্বল মানুষের সামনে। এছাড়া তার শান্তি নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন