রিয়া ভট্টাচার্য

|| সেই পূর্ণিমা রাতে ||
অন্ধকারের রং লেগেছে আকাশে। টিমটিম করে জ্বলছে অজস্র তারার প্রদীপ। ভাসমান সাদাটে মেঘের আস্তরণের নীচে উঁকি দিচ্ছে গোল থালার মতো ফ্যাকাশে চাঁদখানা। মৃদু শীতল বাতাস কোথা থেকে যেন ধুনোর গন্ধ বয়ে আনছে। পুজো পুজো ভাব গায়ে জড়িয়ে ঝিমোচ্ছে মফস্ সল শহরখানা।
এই শহরে সন্ধ্যার পরে লোক চলাচল কমে আসে। যে যার মতো কাজবাজ সেরে ফিরে যায় নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। রাত বাড়লে কয়েকটা পথকুকুর ছাড়া মানুষের আর চিহ্নমাত্র দেখতে পাওয়া যায় না। কিছু খারাপ মানুষ উত্যক্ত করে তাদের। তাদের করুণ কান্নার সুর অনেকদূর থেকে শোনা যায়। এক আধটা মাতাল উলটে পড়ে থাকে পয়ঃপ্রণালীর ধারে। তাদের খবর কেউ রাখে না।
মেয়েটার আজ ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছে বড্ড। ছোট্টখাট্টো গোলগাল চেহারাটা বয়ে এখন সে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। তার পায়ের নীচে শুয়ে রয়েছে ফাঁকা একটা বিষণ্ণ রাস্তা। মেয়েটা পা চালিয়ে হাঁটছে। হিল জুতোয় শব্দ হচ্ছে, খটখট খটখট।
চারটে লোক অনেকক্ষণ ধরে তার পেছনে আসছে। শ্বাপদের মতো পা টিপে টিপে হাঁটছে তারা, শিকারীর তীক্ষ্ণতায় মেপে নিচ্ছে তার পোশাকের ভেতরের মাংসপিণ্ড। এদের হাত থেকে বাঁচার জন্যই তড়িঘড়ি পা ফেলছে মেয়েটা। সে জানে, যতই চিৎকার করুক, রাতের শহরে একটা মানুষও তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে না।
লোকগুলো সে ভয় পেয়েছে বুঝতে পেরে খিক খিক করে হাসছে। লোভে লকলক করছে তাদের জিভ। নরম নারীদেহ তাদের নেশাগ্রস্ত মগজে পুলক সঞ্চার করছে। তারা শিস দিচ্ছে, ছুড়ে দিচ্ছে অসংলগ্ন সংলাপ।
“এই সুন্দরী... এত রাতে কোথায় যাও... এসো এসো, তোমার গরম চাটুতে একটু হাত সেঁকতে দাও...”
হো হো হাসিতে ফেটে পড়ে লোকগুলো।
ঘেন্নায় মুখ কুঁচকে ফেলে মেয়েটা। ইচ্ছে করে ঘুরে গিয়ে প্রত্যেকের গালে একটা করে থাপ্পড় কষায়। কিন্তু সেটা হবে মূর্খামি। কারণ চারজন পুরুষের সঙ্গে একা লড়ার সাধ্য তার নেই। সে দৌড়তে শুরু করে। ভয়ার্ত হরিণীর মতো এদিক ওদিক চোখ মেলে খুঁজে নিতে চায় নিরাপদ আশ্রয়। পায় না। গলা বেয়ে উঠে আসা প্রবল আর্তচিৎকারে খানখান হয়ে যায় রাতের শহরের নৈঃশব্দ্য।
সে সবকিছু দেখতে পায়। তার দৃষ্টি বড় প্রখর। অনেকদূর থেকেই দু’চোখ মেলে দেখে নেয় আর্তনাদের উৎসস্থল। মুচকি হাসে সে। আজ আরও একবার আরেকটা নারীদেহ তার কমনীয়তা হারাবে। হয়তো বা পরেরদিন সকালে তার ক্ষতবিক্ষত দেহ খুঁজে পাওয়া যাবে কোনও ঝোপের ধারে অথবা রেললাইনের পাতে। আজকাল এসব হামেশাই হয়। এসব মেয়েদের প্রতি তার বিশেষ মায়া দয়া নেই। যে মেয়েরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করতে পারে না, দৈহিক পবিত্রতাকেই জীবনের সারবত্তা ভেবে সাজসজ্জায় ডুবে থাকে, ভাবে কোনও একদিন কোনও অর্থবান পুরুষের নেকনজরে পড়লে ধন্য হবে তাদের জীবন... এদের সে ঘেন্না করে।
সে আরও একবার তাকায় চাঁদের দিকে। আজ অনেকগুলো বছর একটা অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়াচ্ছে সে। মৃত্যু তাকে দেখা দেয় না, মাত্রাতিরিক্ত সক্ষমতা তাকে জীবন সম্পর্কে উদাসীন করে তুলেছে। সে বাঁচতে চায় না, তবু বাঁচতে বাধ্য হয়। কারণ, তার পিতা তাকে বাঁচতে বাধ্য করেছেন। সে জানে, চাইলেও সে মরতে পারবে না এখনই, তার জীবন বাঁধা এক অদ্ভুত রহস্যে। তার কালো পোশাকে প্রতিফলিত হচ্ছে চাঁদের আলো, পাঁচফুট আটইঞ্চির মেদহীন ঋজু শরীর তার জাতির সকলের কাছে বিস্ময়। তারা তাকে বড্ড ভালোবাসে। সে নাকি ভয়ানক সুন্দরী!
ফস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। সে জানে না সে সুন্দরী কিনা, তবে ভয়ানক তো বটেই। তার সাদাটে ত্বকে বিদ্যুৎলতার মতো খেলা করে ভয়াবহতা, আর চোখের তারায় বাস করে অনন্ত অন্ধকার। সে অন্ধকারের জীব।
মেয়েটির চিৎকারে আরও একবার তার চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে যায়। ভ্রূ কুঁচকে আবার তাকায় সে শব্দের উৎসের দিকে। লোকগুলো এখন ঘিরে ধরেছে মেয়েটাকে, পাতা ছাড়ানোর মতো করে ছিঁড়ে নিতে চাইছে তার আবরণ। মেয়েটা হাউমাউ করে কাঁদছে, কিন্তু মিনতি করছে না।
মেয়েটির এই বিশেষত্বই তার চোখ টানে। শিকার যেমন জানে তার শিকারীর কাছে প্রাণভিক্ষা করে কোনও লাভ নেই, মেয়েটিও হয়তো জানে, সে যতই মিনতি করুক তাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না। আজই হয়তো তার শেষ রাত!
কান্না ধীরে ধীরে থেমে যায় মেয়েটার। স্থির ভঙ্গিতে প্রাণহীন চোখে চেয়ে থাকে লোকগুলোর দিকে। লোকগুলোও যেন একমুহূর্তের জন্য থমকে যায়। মেয়েটার পেছনে মুড়িয়ে রাখা হাতে চকচক করে একটি ধাতব বস্তু। ব্লেড কি!
বসে থাকা অবস্থা থেকে ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা উঠে দাঁড়ায় সে। বুঝতে পারে কী হতে চলেছে পরবর্তীতে। তার পিঠের দু’পাশে হাওয়ায় ভেসে ওঠে কালচে ডানা। বৃহৎ এবং অপূর্ব৷ হাওয়ায় চাবুকের মতো আন্দোলিত হয় তারা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে মেপে নেয় তার আর লোকগুলোর মাঝের দূরত্ব, তারপরেই রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে তার গলা চিরে বেরিয়ে আসে প্রাণ জল করা প্রবল আর্তচিৎকার। ঠিক তখনই, লোকগুলির অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে নিজের কবজিতে ব্লেড চালিয়ে দেয় মেয়েটা।
মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকা তার দেহটাকে একদৃষ্টে লক্ষ্য করে সে। তারপর হাড় হিম করা হুঙ্কারে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকগুলির ওপরে। বেশিক্ষণ সময় লাগে না, রক্তে ধোয়া রাস্তায় ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে চারটে দেহ। ছোট্টখাট্টো মেয়েটির প্রায় নিথর হয়ে আসা দেহটিকে অবলীলায় পাঁজকোলা করে তুলে ধরে প্রাণপণে ছোটে সে, পিঠের দু’পাশ থেকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় দু’খানা ডানা।
সে এখন বসে রয়েছে তার পুরানো জায়গায়। তার কোলের ওপরে পড়ে রয়েছে মেয়েটির দেহ। আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে আসছে দেহটি, প্রাণের স্পন্দন মুছে যাচ্ছে তার প্রায় ঘোলাটে হয়ে আসা দু’চোখ থেকে।
বাঁ-হাতে মেয়েটির কবজি তুলে নিজের মুখের কাছে ধরে সে। ইতস্তত করে বার দুয়েক। তার স্যালাইভায় রয়েছে রক্ত বন্ধ করার কীট, সে চাইলে এখনই নির্মূল হয়ে যেতে পারে মেয়েটির হাতের ক্ষত। কিন্তু তারপর!
তারপর তার কী হবে! সে যে বাঁধা পড়ে যাবে চিরতরে। রক্তের স্বাদ তাকে কিছুতেই মেয়েটির থেকে দূরে যেতে দেবে না, আবার সে কিছুতেই কোনও মানুষের কাছাকাছি হতে পারবে না। মানুষেরা বিশ্বাসঘাতক জীব, তারা বিশ্বাস রক্ষা করতে জানে না। নিজের ভবিষ্যৎ পরিণতির কথা মনে করে নিজের মনেই শিউরে ওঠে সে। আজকের সিদ্ধান্তের মূল্য তাকে হয়তো চোকাতে হবে নিজের জীবন দিয়ে। কিন্তু এছাড়া যে আর কোনও রাস্তা নেই!
বড় করে শ্বাস নিয়ে মেয়েটির ক্ষতস্থানে জিভ ছোঁয়ায় সে। তার রক্তের স্বাদ যেন আগুন লাগিয়ে দেয় তার ভেতরে৷ দাউদাউ করে পোড়ে সে, জমে পাথর হয়ে যায়। মেয়েটির স্বাদ-গন্ধ যেন ছড়িয়ে যায় তার প্রতিটি শিরা-ধমনিতে। থরথর করে কাঁপে সে। প্রাণপণে ক্ষতস্থানে জিভ বোলায়। ধীরে ধীরে মেয়েটির কবজির ক্ষত শুকিয়ে আসে, শরীর গরম হতে শুরু করে। তার কোলে শুয়ে বারকয়েক নড়েচড়ে ওঠে মেয়েটা। আর সে, তার বন্ধ চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা জল। তাদের সমাজে রক্তবন্ধনের গুরুত্ব অপরিসীম। একবার যার রক্ত তারা আস্বাদন করে চাইলেও তারা তাকে ভুলতে পারে না বরং তাদের জীবনটা পুতুল হয়ে আটকা পড়ে সংশ্লিষ্ট রক্তদাতার হাতের তালুতে। মুক্তির রাস্তা চিরতরে হয় বন্ধ। কী হয় যদি সেই রক্তদাতা তাদের অস্বীকার করে! ভাবলেও শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত নামে তার৷
মেয়েটি ধীরে ধীরে চোখ খোলে। পিটপিট করে চেয়ে থাকে মাথার ওপরে শামিয়ানার মতো বিছিয়ে থাকা আকাশটার দিকে। নিজের কবজিটা নাড়াচাড়া করে দেখে, কোনওরকম ক্ষতচিহ্ন বা ব্যথা খুঁজে পায় না। তবে কি সবকিছু স্বপ্ন ছিল!
মেয়েটি তার চারপাশে নজর বোলায়। তখনই দেখতে পায় তাকে। খোলা ছাদের ধার বরাবর বসে রয়েছে এক নারী, নরম হাওয়ায় উড়ছে তার এলোচুল। চোখ বন্ধ তার। যেন তলিয়ে গিয়েছে ধ্যানে। চারপাশ শব্দহীন।
“হ্যা-হ্যালো, আ-আমি পিয়ালি ঘোষাল। আ-আপনিই কি তবে আমায় বাঁচিয়েছেন! ও-ওই লোকগুলো...”
কথা শেষ করতে পারে না সে, ছাদের ধারে বসে থাকা কালো পোশাকের মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। একমুহূর্তের জন্য চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায় পিয়ালির। মানুষ এত সুন্দরও হয়!
মেয়েটির নীল চোখের তারায় যেন খেলা করে উপোষী বিদ্যুৎ, তার ফরসা মুখে রক্তিমাভা ফুটে ওঠে। চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে সে, “অশনায়া।”
“অ্যাঁ!”
পিয়ালি অবাক চোখে তাকায়।
“আমি অশনায়া।”
আবার ফিসফিস স্বরে উত্তর ভেসে আসে।
“ওহ, অদ্ভুত নাম। কখনও শুনিনি।”
মাথা চুলকে বলে পিয়ালি।
অশনায়া মুচকি হাসে। গোলগাল মেয়েটার দিকে নরমচোখে তাকায়। তারপরে আবার ফিসফিস করে বলে, “বাড়ি যাবে না! রাত অনেক হল তো!”
“ইয়ে মানে হ্যাঁ... মানে যাব তো! আসলে আজ কাজ থেকে বেরোতে দেরি হয়ে গিয়েছিল, ট্রেনটাও বড্ড লেট করল তাই। কিন্তু ওই লোকগুলো...!”
“ওরা আর আসবে না, চিন্তা নেই। নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও৷”
ফিসফিস স্বরে উত্তর ভেসে আসে।
“অ্যাঁ হ্যাঁ, অনেক ধন্যবাদ আমায় বাঁচানোর জন্য।”
আমতা আমতা করে বলে পিয়ালি।
“আচ্ছা ঠিক আছে, যাও!”
হাত নেড়ে তাকে চলে যেতে ইশারা করে অশনায়া। নিজে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোয় পিয়ালি। এটি একটি নির্মীয়মান বাড়ি, কনস্ট্রাকশন-এর কাজ থমকে গিয়েছে অজানা কারণে। কবে আবার শুরু হবে কোনও ঠিক নেই। সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায় পিয়ালি। পেছন ফিরে আরেকবার তাকায় অশনায়ার দিকে। কী বলবে ভাবতে ভাবতে মুখ ফসকে বলে ফেলে, “তুমি বড্ড সুন্দর... আকাশের মতো শান্ত, সমুদ্রের মতো গভীর, কিন্তু আবার সময় বিশেষে হয়তো মারমুখীও। বাকি মেয়েদের মতো নও।”
চমকে তাকায় অশনায়া। তার সামনেই সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে নেমে যায় পিয়ালি। অশনায়ার কানে বারবার ভেসে চলে পিয়ালির বলা কথা, “তুমি বড় সুন্দর... তুমি বড় সুন্দর...”
হঠাৎ করে এত ভালো লাগছে কেন তার!
নিজের বাড়ির রাস্তায় যেতে যেতে বারবার পেছন ফিরে তাকায় পিয়ালি। লোকগুলোর সঙ্গে যে রাস্তায় দেখা হয়েছিল তার সেখানে এখন কিচ্ছু নেই। রক্তের দাগটাও যেন কেউ চেঁছেপুঁছে সাফ করে দিয়েছে। পিয়ালির মনের পরদায় বারবার ভেসে ওঠে একজোড়া নীল চোখ। শান্ত কিন্তু ব্যথাতুর। যেন একঝাঁক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ওই দুটি চোখের তারায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন