রক্তের রং কালো

রিয়া ভট্টাচার্য

|| রক্তের রং কালো ||

মোমের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে পাথুরে দেওয়ালে, তৈরি করছে নাতিদীর্ঘ ছায়াশরীর। অপরিসীম নিঃস্তব্ধতা যেন হার মানাচ্ছে মর্গের শীতলতাকে, নিঃশ্বাসের শব্দটুকুও পাওয়া যাচ্ছে না।

দুর্গের ভেতরে এই ঘরটি অপেক্ষাকৃত ছোট, একনজরে দেখলেই বোঝা যায় এটি মন্ত্রনালয়। খসখসে পাথরের বৃহৎকায় টেবিল ও তার চারধারে পেতে রাখা পুরানো মেহগিনি কাঠের চেয়ার এই ঘরের প্রাচীনতা সম্পর্কে কোনও সন্দেহের উদ্রেক করে না মনে। কোনও জানলা নেই ঘরখানায়, আছে একটি সুউচ্চ কাঠের ভারী দরজা, অজস্র ধারালো পেরেক গাঁথা তাতে। মোমের আলো ঘরটির অন্ধকার পুরোপুরি মুঝে ফেলতে পারেনি, একোণ সেকোণে যেন ঘাপটি মেরে রয়েছে বিপদ, আর রয়েছে একটি ডিম্বাকৃতি হাতির দাঁতের কাজ করা বড় সিন্দুক। সিন্দুকের ভেতরে কী রয়েছে তা শুধুমাত্র এই ঘরে উপস্থিত অবয়বগুলিই জানে, তারা ছাড়া এই সিন্দুকের অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউই অবগত নয়৷ আপাতত এই ঘরে উপস্থিত রয়েছে জনা আটেক অন্ধকারের জীব, তাদের ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতি যে কোনও মানুষের হৃৎস্পন্দন বন্ধ করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। টেবিলের মাথার দিকে সবচেয়ে উঁচু চেয়ারখানায় উপবিষ্ট রয়েছেন অন্ধকারের প্রভু, মোমের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে তাঁর অর্ধেক মুখের ওপরে। তাঁর চোখদুখানি রক্তলাল, কোনও সাদা অংশের অস্তিত্ব নেই সেখানে। রাগে কাঁপছেন তিনি। মুখ থেকে মাঝে মাঝে ধ্বনিত হচ্ছে অমানুষিক গর্জন। টেবিলের ওপরে মানুষের চামড়া দিয়ে তৈরি করা এক অদ্ভুত নক্সা অবস্থান করছে, দু’খানি ছোট্ট হাড় আড়াআড়ি করে রাখা রয়েছে নক্সার ওপরে। প্রতিমুহূর্তে বদলে যাচ্ছে তাদের অবস্থান, যেন ইতস্তত ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় রয়েছে তারা। নক্সার কেন্দ্রস্থলে বাতাসে সৃষ্টি হচ্ছে স্বচ্ছ স্ফটিকগোলক, কালচে বিদ্যুৎ খেলা করছে গোলকের ভেতরে।

“আবার ফিরে এসেছে তারা! হামলা করতে চাইছে আমাদের ওপরে। আটকাতে হবে তাদের, নয়তো বেঘোরে মারা পড়বে অনেক সাধারণ মানুষ!”

কাটা কাটা স্বরে কথাগুলি বলেন অন্ধকারের প্রভু৷

“তারা কারা! আমাদের স্ফটিকগোলক এখনও পর্যন্ত তাদের চেহারা আমাদের কাছে স্পষ্ট করে তুলতে পারছে না কেন!”

অনুভূতিহীন গলায় বলে নোয়ি।

“তারা নিজেদের বেশ বদলানোয় বড্ড পটু, এছাড়াও ছায়াযুদ্ধে তাদের ধারেপাশে কেউ নেই। তারা গুপ্তঘাতক, অন্ধকারের ঐশ্বর্যসম্ভার তাদের একমাত্র কাম্য। সেটা পাওয়ার জন্য রক্তের হোলি খেলতেও দ্বিধা করবে না তারা।”

শান্ত গলায় বলেন অন্ধকারের প্রভু।

“রক্তপিশাচরা আবার জেগে উঠেছে! আপনি বলেছিলেন যে বিগত যুদ্ধের পরে তাদের শক্তি নিঃশেষিত, কোনওমতেই তারা আর নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে না, তাহলে!”

আশ্চর্য শোনায় অশনায়ার গলা।

“গত যুদ্ধে রক্তপিশাচের দল যে নিশ্চিহ্ন হয়নি তা নক্সার দিকে তাকালেই স্পষ্ট। তাদের গ্রাম আমরা ধ্বংস করে ফেলেছিলাম ঠিকই, তবে কিছু রক্তপিশাচ পালাতে সক্ষম হয়। তারাই দল বাড়িয়ে আজ আবার আমাদের শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা মানুষের কোনওরকম ক্ষতিসাধন করি না, কিন্তু তারা করে। নিজেদের রক্ত খাইয়ে তারা মানুষকে বাধ্য করে রক্তপিশাচে পরিণত হতে৷ এভাবেই শক্তিবৃদ্ধি করে তারা। যা অন্ধকারের নিয়মের পরিপন্থী। তাই শাস্তি তাদের পেতে হবে৷”

ঠান্ডা গলায় বলেন অন্ধকারের প্রভু।

“কিন্তু পিতা, রক্তপিশাচদের সঙ্গে যুদ্ধ আমাদের পক্ষে ক্ষতিহীন হয়নি কখনও, অনেক সতীর্থদের হারিয়েছি আমরা। দ্বিতীয়বার কি আমরা এই ক্ষতিস্বীকার করতে সক্ষম?”

উদ্বিগ্ন গলায় জানতে চায় এক মাঝারি আকৃতির অন্ধকারের জীব৷ তার সাদাটে চোখের মণি ও সর্পিল চেরা জিভ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার নাম বাটু।

“প্রতি যুদ্ধই কিছু না কিছু ক্ষতি বয়ে আনে, এই যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম হবে না৷ তবে এটুকু বলতে পারি, আমরা তৈরি! পিতা আদেশ দিলেই যুদ্ধ শুরু হবে।”

কঠিন গলায় বলে অশনায়া।

“অনুমতি দিলাম। তবে একটা কথা মাথায় রেখো অশনায়া, এই যুদ্ধ যেন তোমার কোনও ক্ষতি না করে! সঙ্গীহীন অবস্থায় দীর্ঘদিন কাটাবার জন্য তুমি দুর্বল, রক্তপিশাচরা দুর্বলদের শিকার করতে পছন্দ করে৷

“দুর্বলতা আমার জন্য নয় পিতা। যারা অন্যের ওপরে নিজের কাজের ভার অর্পণ করে মুহূর্তমাত্র স্বস্তিলাভে সক্ষম, তাদের জন্য দুর্বলতা শব্দটি খাটে। আর আমি! আমি তো আজ পর্যন্ত কখনও কাজহীন বাঁচতে শিখিনি। আর রক্তপিশাচরা জানে না এবার তারা কার সঙ্গে লড়তে চলেছে। আমার সঙ্গে মাত্র দু’জনকে দিন পিতা, কথা দিলাম সব সমস্যা মিটিয়ে ফিরব।”

শিরদাঁড়া সোজা করে বলে অশনায়া।

“বেশ। তোমার সঙ্গে নোয়ি ও জাভেদ যাবে। আশাকরি আর কোনও বক্তব্য নেই তোমার। সভা এখানেই শেষ হল।”

চামড়ার সুউচ্চ সিংহাসনের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলেন অন্ধকারের প্রভু।

তাঁর সিংহাসনটির একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সিংহাসনটির হাতল তৈরি হয়েছে পূর্ণবয়স্ক মানুষের হাতের হাড় দিয়ে এবং তার মাথার কাছে তিনটি অল্পবয়সী মেয়ের মাথার খুলি সোনা দিয়ে বাঁধানো। চেয়ারটি সম্পূর্ণভাবে চামড়ায় মোড়া। যে সে চামড়া নয়, মানুষের চামড়ায়। এই সিংহাসন অন্ধকারের ক্ষমতার প্রতীক। প্রতিটি বিশ্বাসঘাতকের দেহাংশ দিয়ে তৈরি এই আসন প্রত্যেকটি অন্ধকারের জীবকে মানুষের বেইমানির কথা মনে করায়।

“কিন্তু আমি কেন! আমি যুদ্ধ-টুদ্ধ একদম পছন্দ করি না।”

অন্ধকারের প্রভু আসন ছেড়ে অদৃশ্য হওয়ার পরে ঘ্যানঘ্যানে সুরে মন্তব্য করে নোয়ি।

“কাল পর্যন্ত তো মরতে চাইছিলি। মরার এমন সুবর্ণ সুযোগ ছাড়ছিস কেন? যুদ্ধ শুধু শত্রুকে মারতে নয়, নিজেকেও বলিপ্রদত্ত করতেও শেখায়। ভুলে গিয়েছিস?”

মুচকি হাসে অশনায়া।

“আমি মরলে তোকে মারবে কে? আমার ভালোবাসার মানুষকে হত্যা করেছিস তোরা। তোদের কীভাবে ক্ষমা করব বল!”

বিজাতীয় ভাষায় হিসহিসিয়ে ওঠে নোয়ি।

“ক্ষমা আমি চাইনি। বন্ধু হিসেবে তোকে বাঁচাবার জন্য যেটা আমার করার দরকার ছিল, করেছি। সেটা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নই।”

পাথুরে দেওয়ালে চলমান ছায়াদলের দিকে চেয়ে মন্তব্য করে অশনায়া।

“অনুতপ্ত হবি কী করে! হৃদয়হীন পাথরের দল কোনও কিছুতেই অনুতপ্ত হয় না। আমি তোদের ঘেন্না করি!”

ঠোঁট উলটে বলে নোয়ি।

“খুব ভালো। আমি চাই সকলে আমায় ঘেন্না করুক। ভালোবাসা দুর্বলতা, ঘেন্না কঠিন হতে শেখায়।”

টেবিলে পাতা নক্সাটি মনযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে বলে অশনায়া।

“তুইও একদিন ভালোবাসবি। সেদিন আমি তোর ভালোবাসার মানুষকে তোর চোখের সামনে মারব।”

নোয়ির মুখে অদ্ভুত তিক্ততা খেলা করে।

“লাভ নেই। আমি কাউকে ভালোবাসি না। তাই আমার দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল।”

মৃদু হাসে অশনায়া।

“পিয়ালি তবে কে?”

“একটি অসুস্থ মেয়ে যার মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন। এটুকুই।”

“তা শ্রীমতি অন্ধকারের রানি একটা ক্ষুদ্র মানুষকে সাহায্য করছেন কেন?”

ব্যাঙ্গের হাসি হাসে নোয়ি।

“কারণ মেয়েটির রক্ত খেয়েছি আমি। আমরা অন্ধকারের জীবরা আর যাই হই বেইমান নই। তাই মেয়েটিকে সাহায্য করা আমার কর্তব্য।”

কঠিন মুখে বলে অশনায়া।

“বেশ। দেখিস আবার কর্তব্য করতে গিয়ে ভালোবেসে ফেলিস না! মানুষ বড় বেইমান জাতি।”

ঘরের এককোণে রাখা সিন্দুকের দিকে এগোতে এগোতে বলে নোয়ি।

“মনে রাখব। এখন সিন্দুক থেকে যে অস্ত্র তুই চালাতে পারবি তা বেছে নে৷ আমি জাভেদকে ডেকে পাঠিয়েছি। আমাদের এখনই বেরোতে হবে৷”

অভিব্যক্তিহীন মুখে বলে অশনায়া।

ঘরের ভেতরে মৃদু কম্পন অনুভব করা যায়। যেন পায়ের তলার পাথুরে মেঝে ফুঁড়ে কিছু উঠে আসার চেষ্টা করে। অদ্ভুত লাল আলোয় ভরে যায় ঘরখানা। পাথুরে দেওয়ালে একটি ছোট্ট ফাটলের সৃষ্টি হয়। ক্রমে বাড়তে থাকে সেই ফাটল, সঙ্গে কান ফাটানো শোঁ শোঁ শব্দ যেন কানকে বধির করে দেয়।

একটা সবুজরঙা হিলহিলে প্রাণী ফাটল গলে বেরিয়ে আসে। দেখতে সাপের মতো মনে হলেও আদপে তা সাপ নয়। গিরগিটির মতো মাথা, চেরা জিভ ও দু’খানি হাত বিশিষ্ট প্রাণীটির বুকের নীচের অংশ সাপের মতো হিলহিলে মেরুদণ্ডহীন। সমস্ত শরীরটা তার কালচে সবুজ আঁশ দিয়ে ঢাকা।

বুকে ভর দিয়ে দেওয়াল বেয়ে নীচে নামে প্রাণীটা। চেরা জিভ বের করে একবার যেন ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা মেপে নেয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার আয়তন। সিন্দুকের সামনে ভয়ে গুটিয়ে যায় নোয়ি। অশনায়া স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।

লালচে আলোর তীব্র ঝলক দেখা যায় ঘরের ভেতরে। ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে আলো। দেখা যায় এক উনিশ কুড়ি বছরের সদ্য তরুণ দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘরে। অতি উৎসাহী দু’চোখ মেলে দেখে নিচ্ছে ঘরের চারপাশ।

“এসো জাভেদ। তোমার কথাই ভাবছিলাম এতক্ষণ। যদি কোনও অস্ত্রের প্রয়োজন হয় সিন্দুক থেকে নিয়ে নাও। রক্তপিশাচ সম্পর্কে পিতা তোমায় অবগত করেছেন নিশ্চয়ই!”

ঠান্ডা গলায় বলে অশনায়া।

“হ্যাঁ, অস্ত্র লাগবে না... কী করতে হবে!”

ভাঙা গলায় প্রশ্ন করে তরুণ।

“যুদ্ধ করতে হবে।”

বাঁকা সুরে বলে নোয়ি।

“রক্তপিশাচদের খুলিতে ঘিলু কেমন? চিবিয়ে খেতে মজা আছে?”

নিজের শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে জানতে চায় তরুণ।

“খেয়ে দেখিনি, তবে ভালোই হবে নিশ্চয়ই৷ তুমি খেয়ো।”

দু’চোখ ঘুরিয়ে বলে নোয়ি।

“হ্যাঁ... খাবো... খুব খিদে আমার…!”

সুড়ুৎ করে লালা টেনে মন্তব্য করে জাভেদ।

“বুঝেছি জাভেদ। আপাতত তৈরি হও, আমাদের বেরোতে হবে। নোয়ি তোর অস্ত্র বাছা হল?”

উদাসীন গলায় প্রশ্ন করে অশনায়া।

নিজের হাতের রুপোর বাঁটের ছুরিখানায় হাত বুলোতে বুলোতে মাথা নাড়ে নোয়ি। অশনায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে, “তুই?”

“আমার অস্ত্র আমার সঙ্গে সবসময় থাকে। একটা কথা মাথায় রাখবি, তুই বা আমি উড়তে পারলেও জাভেদ পারে না। তার গতিই তার প্রধান অস্ত্র। তাই ওকে দেখে রাখার দায়িত্ব তোর। আমি এগোলাম, তুই আর জাভেদ পেছনে আয়।”

কথাগুলি বলে আর অপেক্ষা করে না অশনায়া। ঘর থেকে বেরিয়ে পাথরের ব্যালকনির রেলিংয়ের সামনে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যে তার পিঠের দু’পাশে ঝলসে ওঠে কাজলকালো ডানা। ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দিয়ে রাতের অন্ধকার আকাশে তীব্রগতিতে অদৃশ্য হয়ে যায় সে।

“এই যে! ড্যাবড্যাব করে দেখার কিচ্ছু হয়নি৷ অশনায়ার মতো ডানা কোনও অন্ধকারের জীবের নেই। শক্ত করে আমায় ধরো, ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দেব।”

ব্যাঁকা সুরে কথাগুলি বলে ব্যালকনির রেলিংয়ের ওপরে উঠে দাঁড়ায় নোয়ি। রোগাপাতলা জাভেদ চোখ বড় বড় করে বাইরের আকাশ দেখে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লিলিপুট জীবটিকেও দেখে। তাকে ঘাড়ে নিয়ে এ উড়তে পারবে তো! ইতস্তত করে নোয়ির গলা জড়িয়ে ধরে সে।

নোয়ির প্রজাপতির মতো হলুদ ডানা বাতাসে পতপত করে শব্দ করে, জাভেদ কিছু বলার আগেই তাকে নিয়ে ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ দেয় নোয়ি।

“ফেলল রে!”

ভয়ে দু’চোখ বন্ধ করে ফেলে জাভেদ।

“না, ফেলিনি।”

ব্যাঁকা হাসে নোয়ি। তার গলায় সাপের মতো দাঁতে দাঁত চেপে ঝোলে জাভেদ।

“হতভাগা সবুজ সারগিটি!”

ক্ষীণস্বরে হাসে নোয়ি। আকাশের কোলে একটা তারা অজান্তেই খসে পড়ে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%