রিয়া ভট্টাচার্য

|| সে তুমি কেমন তুমি ||
The walls began to tumble down
And I can’t even see the ground
I’m falling into you
The dream could come true
And it feels so good falling into you.
Falling like a leaf, falling like a star
Finding a belief, falling where you are
Catch me, don’t let me drop
Love me, don’t ever stop!
(Falling into you ~ Celine Dion)
“আমি জানতাম তুমি আসবে না! আমি কে তোমার জন্য যে আমার ডাকে তুমি আসবে! শুধু প্রাণ বাঁচিয়েছ বলে তোমার ওপরে আমার অধিকার বর্তায় না, ঠিক যেমন শুধুমাত্র জন্ম দেওয়ার দোষে অধিকার বর্তায় না নিজের বাবা মায়ের ওপরে। আমি কত বড় পাগল বলো তো অশনায়া! তোমার দয়াকে তোমার ভালোবাসা ভেবে ভুল করেছি! তুমি আমায় কেন ভালোবাসবে! কে আমি! একটা দুর্বল পাগলকে দয়া করা যায়, ভালোবাসা যায় না! আর দয়াকে আমি বড্ড ঘেন্না করি জানো অশনায়া! বড্ড ঘেন্না করি!”
বিড়বিড় করে কথাগুলি বলছিল পিয়ালি। ঘড়ির কাঁটা এখন রাত বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। ঘরের এককোণ থেকে উঁকি দিচ্ছেন ছোট্ট আসনে উপবিষ্টা সদ্যপূজিতা লক্ষ্মীদেবী। ধূপের গন্ধ মিলিয়ে গিয়েছে সেই কখন! আলপনা আঁকা দুয়ারের সামনে পড়ে রয়েছে কিছু ছেঁড়া দোপাটির পাপড়ি, প্রসাদের থালি ঢাকা দেওয়া পড়ে রয়েছে একপাশে।
সারাসন্ধ্যা অশনায়ার জন্য অপেক্ষা করেছে পিয়ালি, সে আসেনি। নিত্যদিনের মতো আজও বাবার মারধোর খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন মা। একটু আগে পর্যন্ত বাবার জড়ানো গলায় অশ্লীল গালিগালাজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল, এখন সবই নিস্তব্ধ। চারপাশ যখন শব্দহীন হয়ে পড়ে তখন হৃদয় কথা বলে, কে যেন একদিন বলেছিল পিয়ালিকে। তার নাম এতদিন পরে আর মনে নেই তার। কিন্তু নিজের হৃদয়ের কথা শুনে নিজের গালেই ঠাঁটিয়ে একটা চড় মারতে ইচ্ছে করছে তার। কিকরে সে স্বপ্ন দেখার সাহস করেছিল আবার! কী করে ভেবেছিল তার ডাক শুনে নিজের সব কাজ ফেলে অশনায়া ছুটে আসবে তার কাছে! এতটা আশাবাদী হওয়া যে তার সাজে না!
চোখ ফেটে জল আসতে চায় তার। সারাদিন উপোসের পর পেট চুঁইচুঁই করছে খিদেয়, কিন্তু খাবার খেতে ইচ্ছে করছে না তার। একজন স্বল্পপরিচিতা মেয়ের প্রতি অভিমানে মন ভারী হয়ে আসছে তার, ইচ্ছে করছে সব কিছু ছুঁড়ে ফেলে দিতে। তীব্রস্বরে চিৎকার করে কাঁদতে, ঝগড়া করতে অশনায়ার সঙ্গে। কিন্তু কেন! অশনায়া তো কখনও তার প্রতি দুর্বলতা দেখায়নি! তাকে ভালোবাসার কথাও বলেনি কখনও! তবে কেন এই নির্ভরশীলতা! অশনায়া একজন মেয়ে, ডাকসাইটে সুন্দরী মেয়ে। সে কেন ভালোবাসবে পিয়ালির মতো একজনকে! এমন ভাবা যে পাপ! তবে কী অসুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতে নিজের মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলেছে পিয়ালি! নয়তো কেন একজন মেয়েকে...
ভাবতে ভাবতে ঘৃণায় মুখ কুঁচকে যায় পিয়ালির, শব্দ করে মেঝেতে থুতু ফেলে সে। নিজের প্রতি তীব্র ক্রোধ আবার ফিরে আসছে তার, মিলিয়ে যাচ্ছে অশনায়ার গতকালের বলা কথাগুলো। বিছানার নীচে লুকিয়ে রাখা নতুন ব্লেড তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, নিজের অসুস্থ মস্তিষ্ককে শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে ফিসফিস করে। এই নির্দেশকে অস্বীকার করার সাধ্য পিয়ালির নেই!
ধীরে ধীরে বিছানা তুলে ব্লেডটা হাতে নেয় পিয়ালি, আধো আলো আধো অন্ধকারে তার দু’চোখ চকচক করে।
“তুমি আমায় কোনও নির্দেশ দিতে পারো না অশনায়া, তোমার কথা শুনতে আমি বাধ্য নই। কারণ, আমি তোমার কেউ নই!”
হিসহিস করে বলে পিয়ালি, হাতে যত্ন করে ব্লেড গাঁথে, একটানে চিরে ফেলে অনেকটা অংশ। বিন্দু বিন্দু রক্ত ফুটে ওঠে ফ্যাকাশে চামড়ায়। আহ, কী শান্তি! নিজের রক্ত বড় ভালোবাসে পিয়ালি, বড্ড ভালোবাসে নিজেকে শাস্তি দিতে, যন্ত্রণা দিতে। আরেকবার হাতে ব্লেড ছোঁয়াবার আগেই দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়। কেউ অধৈর্যভাবে কড়া নাড়ছে দরজায়। কী মনে করে ফুলহাতা জামার হাতা নামিয়ে, রক্ত মুছে দরজা খুলতে যায় সে। এত রাতে বিরক্ত করতে কে এল!
দরজা খুলতেই হতভম্ব হয়ে যায় পিয়ালি। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে অশনায়া, আহত চোখে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। যেন বুঝে নিয়েছে তার কৃতকর্ম।
“তু-তুমি! এত রাতে!”
কোনওক্রমে প্রশ্ন করে পিয়ালি।
“আমি বলেছিলাম আমি আসব। অপেক্ষা করতে কী হয়েছিল! বারণ করেছিলাম না ব্লেড হাতে নিতে!”
পিয়ালিকে ঠেলে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে অশনায়া।
“তু-তুমি কী করে জানলে! আর তোমার আসার কথা কখন ছিল! এখন ক’টা বাজে?”
বড় বড় চোখ করে বলে পিয়ালি।
“আমি তো সময় নির্দিষ্ট করে দিইনি যে কখন আসব! বলেছিলাম, আসব। একটা কাজে আটকা পড়েছিলাম, দেরি হল তাই!”
পিয়ালির বিছানায় গুছিয়ে বসতে বসতে বলে অশনায়া।
“ওহহ, আচ্ছা দাঁড়াও, প্রসাদ দিই তোমায়।”
ঠাকুরের আসনের দিকে এগোতে এগোতে বলে পিয়ালি।
“আগে হাতটা দাও, কতখানি কেটেছ দেখি!”
হাত বাড়িয়ে পিয়ালিকে থামিয়ে বলে অশনায়া। বাম হাতের কবজি ধরে টান দেয়। অশনায়ার ঠান্ডা হাতের স্পর্শে কেঁপে ওঠে পিয়ালি। বাধ্য মেয়ের মতো জামার হাত গুটিয়ে দাঁড়ায়।
“ইসস!”
মুখ বিকৃত করে পিয়ালির মুখের দিকে তাকায় অশনায়া। রাগে গনগন করে তার মুখ, চোখ বেয়ে যেন আগুন ঝরে পড়ে।
“তোমার মানসিক চিকিৎসকের প্রয়োজন। এভাবে নিজের হাত কোনও স্বাভাবিক মানুষ কাটে না। তোমার কী যন্ত্রণাবোধ নেই!”
চিবিয়ে চিবিয়ে বলে অশনায়া৷
“আগে যন্ত্রণা করত খুব, এখন আর করে না। অদ্ভুত শান্তি পাই, মাথা ঠান্ডা হয়।”
নির্লিপ্তমুখে বলে পিয়ালি।
“ডাক্তার দেখাও। এরপরে কখনও নিজের মর্জিমাফিক কোনও কাজ না হলে নিজের গলা কাটতেও দ্বিধা করবে না তুমি। এটা সুস্থ মানুষের লক্ষণ নয়!”
“আমি জানি আমি সুস্থ নই। আমি এটাও জানি আজকের পরে হয়তো আর আমার মুখ দেখতে চাইবে না তুমি। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি অন্য কারও ক্ষতি করি না, কাউকে কষ্ট দিই না!”
“আমি জানি, সেইজন্যই তোমার ডাক্তার দেখানো আরও বেশি জরুরি। এভাবে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে শান্তি পাওয়া যায় না পিয়ালি। তুমি বড় হয়েছ, তোমার বাবা মা কিছুদিন পরে বিয়ে দেবেন তোমার। কী ভাববেন তোমার স্বামী এত কাটা দাগ দেখে! এত কম সহ্যশক্তি নিয়ে সংসার কীভাবে করবে তুমি!”
পিয়ালির কাঁধে হাত রেখে মায়াভরা গলায় বলে অশনায়া।
“সংসার! স্বামী! হা হা হা!”
হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে পিয়ালি।
“কেমন সংসার! যেমন আমার মা করে? কেমন স্বামী! আমার বাবার মতো? এমন সংসার, এমন স্বামী আমার চাই না অশনায়া, এমন জীবন আমার চাই না!”
রক্তজবার মতো লাল চোখ খটখট করে পিয়ালির, জোরে জোরে শ্বাস নেয় সে। দাঁতে দাঁত চিপে আটকাতে চায় আবেগ, পারে না। মুঠো করা হাতের নখ যেন চেপে বসতে চায় হাতের তালুতে, চামড়া ফেটে বেরিয়ে আসতে চায় টকটকে তাজা রক্ত!
“এই পিয়ালি! কী হয়েছে তোমার! অমন কাঁপছ কেন!”
তড়িঘড়ি পিয়ালিকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত রাখে অশনায়া। একহাত তার পিঠে আলতোভাবে স্পর্শ বোলায়। অশনায়ার বাহুডোরে হু হু করে কাঁপে পিয়ালি, চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে চায়।
“এই, আমি দুঃখিত। হয়তো কথাগুলো আমার বলা উচিত হয়নি। কিন্তু পিয়ালি, তোমায় নিজেকে কষ্ট দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তোমায় কষ্ট পেতে দেখলে যে আমার কষ্ট হয়!”
পিয়ালির ঘাড়ে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে অশনায়া।
“কেন! কেন কষ্ট হয় তোমার! আমি কে!”
অশনায়ার কালো কামিজ খামচে প্রশ্ন করে পিয়ালি। হাঁ করে মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়, পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে ডুকরে ওঠে ফুসফুস, ঝিমঝিম করে মাথা। প্যানিক অ্যাটাকের প্রাথমিক লক্ষণ।
“সব সম্পর্কের কী নাম হয় পিয়ালি! তোমার জন্য আমি ভাবি এটাই কী যথেষ্ট নয়! তোমার কষ্ট হলে আমায় ডেকো, আমার সঙ্গে কথা বোলো। কিন্তু এমনটা আর কোরো না কখনও কেমন! এখন শান্ত হও, আমি আছি তোমার জন্য সবসময়।”
পিয়ালির পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বলে অশনায়া।
“না, হব না শান্ত। যতক্ষণ না তুমি আমায় বলবে আমি তোমার কে! আর আমার কষ্ট হলে কী করে ডাকব তোমায়! যোগাযোগের নম্বর তুমি দাওনি আমায়, তুমি ব্যস্ত তো! সময় কোথায় তোমার!”
ধীরে ধীরে বলে পিয়ালি।
“পাগলি মেয়ে, তোমার জন্য আমি কখনওই ব্যস্ত নই। আর আমায় ডাকতে তোমার কোনও নম্বরের প্রয়োজন হবে না, নিজের মনে ডেকো, চলে আসব।”
পিয়ালির গাল টিপে আদর করে বলে অশনায়া।
ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে পিয়ালি। শরীরটা এখনও নিস্তেজ মনে হলেও আগের থেকে ভালো লাগছে তার, অশনায়ার নীল চোখে নিজের জন্য মায়া দেখে অদ্ভুত ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে সে। অশনায়ার চুলে কেমন যেন বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ!
“কথা দাও, আমি ডাকলেই তুমি আসবে!”
অশনায়ার নীল চোখে চোখ রেখে আদুরে গলায় বলে পিয়ালি।
“আসব। যখনই ডাকবে আসব। কিন্তু অপ্রয়োজনে ডেকো না, প্রয়োজনে ডেকো।”
শান্তস্বরে বলে অশনায়া।
“কিন্তু যদি আমার তোমায় এমনি দেখতে ইচ্ছে করে!”
“এমনি কাউকে কারও দেখতে ইচ্ছে করে না পিয়ালি। অপ্রয়োজনে কেউ কাউকে মনে রাখে না, রাখা উচিত নয়।”
“ওহহ, তার মানে আমি বিপদে না পড়লে বা নিজের ক্ষতি না করলে তুমি আসবে না তাই তো! আমি বুঝি বাধ্য করি তোমায় আমার সামনে আসতে! আমিটা বড্ড বেশি অপদার্থ তাই না!”
পিয়ালির চোখে আবার ক্ষিপ্ততা ফিরে আসে। তার আচরণ দেখে সতর্ক হয় অশনায়া, কিছু করার আগেই তার দুটো হাত ধরে ফেলে সে।
“আরে বাবা, আমি সে-কথা বলিনি। আচ্ছা, তুমি যা চাও তাই হবে। শান্ত হও।”
অশনায়াকে ঠেলে সরিয়ে দেয় পিয়ালি। তার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসে। তার হাসি লক্ষ্য করে শিউরে ওঠে অশনায়া। এই হাসিই সে কিছুক্ষণ আগে দেখেছিল নোয়ির মুখে, তার ভালোবাসার মানুষের হৃদয় তাকেই খেতে বাধ্য করার পরে।
“আমি তোমার বোঝা হতে চাই না অশনায়া। একবার জীবন বাঁচিয়েছ তুমি আমার, সেজন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। তবে আর আমার জন্য চিন্তা করার প্রয়োজন তোমার নেই। আমি নিজের খেয়াল নিজে রাখতে সক্ষম৷ ছোট থেকে একাই বেড়ে উঠেছি আমি, কারও প্রয়োজন আগে হয়নি, আগামীতেও হবে না। ধন্যবাদ, আমার কথা রেখে আজ আসার জন্য। আর দুঃখিত, আমার পাগলামি দেখার জন্য। দাঁড়াও, তোমার প্রসাদটা দিই, রাত অনেক হল!”
প্রায় টলতে টলতে ঠাকুরের আসনের দিকে এগোয় পিয়ালি। হতভম্ব অশনায়া একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
“আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি পিয়ালি। আমি...!”
অশনায়ার কথা শেষ করতে না দিয়ে হাত তুলে তাকে থামায় পিয়ালি, “আমি জানি। আসলে আমিই একটু বেশি আশা করে ফেলেছিলাম। আসলে তোমায় দেখার পর থেকে কেন জানি না মনে হচ্ছিল তোমার ওপরে আমি জোর খাটাতে পারি, বায়না করতে পারি, আবদার করতে পারি। তোমার একটু নজরে পড়ার জন্য ক্ষেপে উঠেছিলাম, তোমার ভালোবাসার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলাম বলতে পারো। আসলে অসুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠা তো! তোমার সহানুভূতিকে ভালোবাসা ভেবেছিলাম হয়তো। কিছু মনে কোরো না অশনায়া। আজকের পরে আমার বিকৃত মস্তিষ্কের শিকার হতে হবে না তোমায়। আমায় নিয়ে চিন্তাও করতে হবে না।”
চোখের পলক না ফেলে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে পেছন ফেরে পিয়ালি, দাঁত দিয়ে ঠোঁট চিপে রোধ করে উথলে ওঠা কান্না। অশনায়ার জীবনে বোঝা হয়ে কখনওই দাঁড়াবে না সে, নিজেকে কখনওই চাপিয়ে দেবে না তার ঘাড়ে।
স্থির চোখে পিয়ালির যাওয়া দেখে অশনায়া। মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে তার। ভালোবাসা! এ কী বলল পিয়ালি! সে তাকে ভালোবাসে! তাহলে দ্বিতীয়বার যে পিয়ালির রক্তের স্বাদ নিয়েছিল সে তা ভালোবাসার! নোয়ির পাগলাটে হাসি মনে পড়ে তার। নিজের কৃতকর্মের ফাঁদে নিজেই আটকা পড়েছে অশনায়া। ভালোবাসা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে খুঁজে নিয়েছে তাকে। তার আর মুক্তি নেই!
স্টিলের থালায় প্রসাদী ভোগ সাজাতে সাজাতে চোখ বেয়ে জল গড়ায় পিয়ালির। অশনায়াকে না দেখিয়ে ওড়নার খুঁটে চোখের জল মুছে নেয় সে। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য আজ তার এই অবস্থা। অশনায়া কখনওই কোনও আশা দেয়নি তাকে। সে নিজেই ভেবে নিয়েছে এতকিছু। সত্যিই সে পাগল, চিকিৎসা দরকার তার!
“দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন অশনায়া! বোসো। প্রসাদ খাও।”
অশনায়ার হাতে থালা ধরিয়ে শান্তস্বরে বলে পিয়ালি। হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে পাশে বসায় অশনায়া। পিয়ালি বসতে চায় না, ছটফট করে।
“তুমি সারাদিন কিছু খাওনি। আগে তুমি খাও।”
পিয়ালির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসে অশনায়া।
“আমার খিদে নেই, পরে খাবোখন! তুমি খেয়ে নাও৷”
মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে পিয়ালি।
“পাগলি মেয়ে, আমার ওপরে রাগ করে না খেয়ে থাকার কিচ্ছু হয়নি। আচ্ছা, তুমি যখন খুশি আমায় ডেকো। আমি আসব, কেমন! এবার খাও।”
“না, তোমায় আসতে হবে না। আমি আর কোনওদিন তোমায় ডাকব না।”
“উফফ, বাচ্চা মেয়ের রাগ কত! আচ্ছা, তোমায় ডাকতে হবে না। আমি নিজেই আসব। এবার দয়া করে মুখ খোলো, আমি খাবার হাতে অপেক্ষা করছি।”
কিছু বলার জন্য মুখ খোলে পিয়ালি, কিন্তু বলতে পারে না। তার আগেই তার মুখে প্রসাদী লুচি, সুজি গুঁজে দেয় অশনায়া। ভ্রূ কুঁচকে খাবার গালে নিয়েই মুখ খোলে পিয়ালি, “অ্যাই একদম খাবার মুখে নিয়ে কোনও কথা নয়। চিবোও!”
চোখ পাকিয়ে বলে অশনায়া। তার মুখের দিকে তাকিয়ে খচমচ করে খাবার চিবোয় পিয়ালি। থালার সব প্রসাদ একটু একটু করে তাকে খাইয়ে দেয় অশনায়া। অন্ধকারের জীবদের মানুষের খাবারের দরকার পড়ে না, ওসব তাদের শরীরে অস্বস্তি সৃষ্টি করে।
“এ কী, সব খাবার তো আমাকেই খাইয়ে দিলে, তুমি কিছু খাবে না!”
আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে পিয়ালি।
“উঁহু, তুমি খেয়েছ তাতেই আমার খাওয়া হয়ে গিয়েছে। এবার বলো ফার্স্ট এইড-এর বাক্সটা কোথায়!”
থালা নামিয়ে রাখতে রাখতে প্রশ্ন করে অশনায়া।
“ওসব কিছু নেই, আমার দরকার হয় না৷ কিন্তু তুমি না খেয়ে...”
“বললাম তো আমি খেয়েছি। তোমায় খাওয়াতে খাওয়াতে খেয়েছি বলে তুমি বুঝতে পারোনি। আর ফার্স্ট এইড-এর বাক্স ঘরে রাখতে হয়, কখন কোন প্রয়োজনে লাগে কে বলতে পারে! আচ্ছা আমি আগামীকাল রাতে এসে দিয়ে যাব। এখন কোনও অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বা লোশন পাওয়া যাবে কি!”
নীল চোখের মণি বারদুয়েক ঘুরিয়ে জানতে চায় অশনায়া।
“ইয়ে, মাথার দিকের তাকে বোরোলিন রয়েছে।”
মাথা নিচু করে বলে পিয়ালি।
“আচ্ছা বেশ, এসো।”
যত্ন করে পিয়ালির হাতের কাটা অংশে মলম লাগায় অশনায়া। পিয়ালির যন্ত্রণা যেন মর্মে মর্মে অনুভব করে সে। নিদারুণ অসহায়তায় কান্না পায় তার। পিয়ালির এই অবস্থার জন্য নিজেকেই দায়ী মনে করে সে। নাহ, যা হয়েছে হয়েছে। আর পিয়ালিকে কোনও কষ্ট পেতে দেবে না সে। অশনায়া থাকতে পিয়ালি আর কোনও সমস্যার সম্মুখীন হবে না৷ নিজের মনে নিজেকেই কথা দেয় সে।
“রাত অনেক হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো। কাল আবার কাজে যেতে হবে তোমায়। আমি আজ আসি।”
পিয়ালির মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে আদুরে গলায় বলে অশনায়া।
“আজ রাতটা থাকবে প্লিজ! জানি, তুমি অনেক শক্তিশালী, তোমার কোনও বিপদ হবে না, তবু... আজকের রাতটা...”
মিনতির সুরে বলে পিয়ালি।
“আছি।”
এককথায় উত্তর দিয়ে পিয়ালির বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে অশনায়া, নির্বাক চোখে তার দিকে চেয়ে থাকে পিয়ালি। নিজের পাশের ফাঁকা বিছানা দেখিয়ে পিয়ালিকে শুয়ে পড়তে বলে অশনায়া, নিজে দেওয়ালের দিকে পাশ ফিরে শোয়।
অশনায়ার পাশে শুয়ে ঘুম আসে না পিয়ালির, একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সে পাশে কাঠের মতো পড়ে থাকা লম্বা শরীরটার দিকে। ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরতে তাকে, বুকে মাথা রেখে শুষে নিতে উষ্ণতা। কিন্তু পিয়ালি জানে এ অধিকার তার নেই, অশনায়া হয়তো তার বন্ধু হতে পারে কিন্তু ভালোবাসা কখনওই নয়।
রাতচরা পাখির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঝিঁঝিঁপোকার দল তারস্বরে চিৎকার করে। ঘড়ির কাঁটায় শব্দ হয় টিকটিক। দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে একমনে পিয়ালির প্রতিটি কথা চিন্তা করে অশনায়া, ধীরে ধীরে অন্ধকার আকাশে কমলা রং লাগে। অন্ধকারের জীবনও তবে প্রতিদিন রঙিন হয়!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন