সেই দু’চোখের টানে

রিয়া ভট্টাচার্য

|| সেই দু’চোখের টানে ||

সময় বয়ে চলে।

তার গতি অনন্ত, থামার কারণ নেই, সুযোগও হয়তো নেই। ঘটনার পর থেকে কেটে গিয়েছে আটদিন। এই আটদিনে অশনায়ার ছায়াটুকুও দেখতে পায়নি পিয়ালি।

আসা যাওয়ার পথে তার কালচে চোখের তারা খুঁজে বেড়িয়েছে একজোড়া নীল চোখকে, অদ্ভুত মায়াভরা নীল চোখ। পিয়ালি জানে না কেন সে অশনায়াকে দেখার জন্য আকুল হয়ে রয়েছে, তা কী শুধুমাত্র তার প্রাণ বাঁচানোর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নাকি অন্য কোনও কারণ রয়েছে এর ভেতরে... জানা নেই তার।

শুধু সে জানে, সেই রাতে ওই নীলচে চোখদুটি তার ক্ষতবিক্ষত শরীরে এক অদ্ভুত মায়ার স্পর্শ বুলিয়ে দিয়েছে, তার সর্বদা জ্বলন্ত অন্তঃকরণ যেন শীতল হয়ে গিয়েছিল এক লহমায় ওই নীল চোখের অধিকারিণীর সামনে। ওই দৃষ্টি আরেকবার অনুভব করার জন্য বারবার ছটফট করেছে তার মন। পথ চলতে চলতে থেমে গিয়েছে সেই নির্মীয়মান বাড়ির সামনে, ঘাড় উঁচু করে দেখতে চেয়েছে কারও ছায়া দেখা যায় কিনা! কিন্তু না, কিচ্ছু না...

অশনায়া আসেনি।

তার এতটুকু ঝলকও সে’রাতের পরে দেখতে পায়নি পিয়ালি। যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে সে। বাতাস চিরে নেমে আসা তার রক্ষাকর্ত্রী যেন মিলিয়ে গিয়েছে বাতাসেই। তার সন্ধান আর কোনও কালেই পাওয়া যাবে না হয়তো।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে পার্লারের কাজে মন দেয় পিয়ালি। আজ বড্ড ভিড় পার্লারে, একমুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস ফেলার সময় পায়নি সে। একের পর এক কাস্টমার, তাদের অজস্র দাবিদাওয়া, মালকিনের মুখঝামটানি, সব মিলিয়ে এক অসহ্য পরিস্থিতি৷ এখন রাত সাড়ে আটটা। আরও দু’জন মহিলার রূপচর্চা করার পরে তার ছুটি। নিজের ক্লান্ত চোখদুটো হাতের তালুতে ঘষে নিয়ে কাজে মন দেয় পিয়ালি।

যে কোনও পুজোর আগে পার্লারগুলোর এই অবস্থা হয়। মানুষ পিঁপড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, রূপে শেষ তুলির টান দেওয়ার জন্য। আগামীকাল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো, সুন্দরী গৃহিণীগণ তাই নিজেকে আরও সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে আগ্রহী। সুন্দর হতে কে না চায়!

সুন্দরের কথা মনে হতেই অশনায়ার মুখটা মনে পড়ে যায় পিয়ালির। অমন আশ্চর্য রকমের সুন্দরী সে কমই দেখেছে নিজের জীবনে। কোনও বিখ্যাত চিত্রকরের ইজেলে ফুটে ওঠা এক জীবন্ত ছবির মতো সুন্দর অশনায়া, অথবা কোনও অখ্যাত কবির কবিতা... পাঠকের লোভ যাকে ছুঁতে পারেনি এখনও।

অশনায়া কী বড্ড বেশি রূপচর্চা করে! কিন্তু কই তাকে দেখলে তো ধনীঘরের সুন্দরী পুতুলদের মতো মনে হয় না! নিতান্ত সুগঠিত চেহারা তার, দেখে বোঝা যায় রোদ-বৃষ্টি-মেঘ ভালোই ছাপ ফেলেছে তার ওপরে। কিন্তু ওই অনন্ত সৌন্দর্য! তার কী ব্যখ্যা হতে পারে!

আচ্ছা, এই সৌন্দর্যের জন্যই কি অশনায়ার কথা বারবার মনে পড়ছে পিয়ালির! নিজের মনেই মাথা ঝাঁকায় সে, না না কখনওই নয়, তাকে টেনেছে স্রেফ ওই দুটি চোখ এবং তাতে ডুবে থাকা অনন্ত মায়া। আজীবন একটুকরো ভালোবাসার জন্য ভিক্ষা করে আসা পিয়ালির কাছে অশনায়া যেন এক অসীম সমুদ্র হয়ে এসেছে, যার কোনও কূলকিনারা খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু সে কোথায়! প্রবেশ করেছে কোন পাতালে!

রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে টানতে টানতে পার্লার থেকে বেরোয় পিয়ালি। স্টেশনের উদ্দেশে হাঁটতে হাঁটতে বারবার পেছন ফিরে তাকায়। রাস্তাঘাট বড্ড ফাঁকা, নিয়ন আলোর পথবাতির ওপরে ভনভন করছে শ্যামাপোকার ঝাঁক। আধো আলো, আধো অন্ধকার এই রাতগুলোতে একা পথ হাঁটতে বড্ড গা ছমছম করে পিয়ালির। কিন্তু উপায় নেই। সে বরাবরই একা, তার কথা শোনার বা তার সহযাত্রী হওয়ার জন্য কখনওই কেউ নেই।

তাদের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হয় না। মা ওসবের ধার ধারেন না কখনও। কিন্তু পিয়ালি নিজের ঘরে ছোট্ট একটা কুঠুরিতে লক্ষ্মীপুজো করে, নিজের মতো জল-বাতাসা দেয়। আগামীকাল পার্লার বন্ধ, সারাদিন বাড়িতে থাকতে হবে ভেবে এখন থেকেই দমবন্ধ হয়ে আসে তার, অস্বস্তি হয়। পিয়ালির কোনও বন্ধুবান্ধব নেই যে তার ঘরে কিছুক্ষণ সময় কাটাবে সে। কালকের দিনটা তার জীবনের অন্যতম বাজে দিন হতে চলেছে ভেবে এখন থেকেই মুখ তেতো মনে হয় তার। একরকম জেদের বশেই পা দুটো টেনে নিয়ে চলে সে।

“পিয়ালি ঘোষাল তাই না!”

মেয়েলি গলার গভীর স্বরে চমকে পেছন ফেরে পিয়ালি, তারপরে স্তব্ধ হয়ে যায়।

তার সামনে দৃঢ় পদক্ষেপে এসে দাঁড়িয়েছে অশনায়া। মৃদু বাতাসে উড়ছে তার গাঢ় কালো চুল। আঁটোসাটো কালো পোশাকটা যেন চামড়ার মতোই তার শরীরে মিশে রয়েছে, লাল স্কার্ফখানা শান্ত যোগসর্পের মতো শুয়ে রয়েছে তার গলা পেঁচিয়ে। পিয়ালির দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে সে, বড় বড় দু’খানা নীল চোখ যেন তার পাঁজর ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে হৃদয়ে।

“তু-তুমি! মানে আ-আপনি এখানে!”

অশনায়ার সামনে দাঁড়িয়ে কথা জড়িয়ে যায় পিয়ালির। যার সঙ্গে আর একবার দেখা হওয়ার জন্য সকাল সন্ধ্যা প্রার্থনা করেছে সে, যে চোখের দৃষ্টি নিজের ওপরে আরেকবার অনুভব করার জন্য করেছে কাতর প্রার্থনা, সেই দৃষ্টি যখন শেষমেশ হাজার তারার আলোর মতো আছড়ে পড়েছে তার ওপরে তখন কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছে পিয়ালি। কথা হাতড়াতে হচ্ছে তাকে।

“তুমিই ঠিক আছে, আপনি বলার প্রয়োজন নেই। এদিকে কিছু কাজে এসেছিলাম, ফেরার পথে দেখলাম তোমায়। ভাবলাম একটু আলাপ করা যাক। আজকেও এত রাত্রি করে ফিরছ বাড়িতে... একা রাস্তায় ভয় করে না তোমার!”

মিষ্টি হাসি হেসে মন্তব্য করে অশনায়া।

“আমায় বরাবরই একা ফিরতে হয়, দোকা কোথায় পাব!”

স্বভাববিরুদ্ধভাবেই খেঁকিয়ে ওঠে পিয়ালি। নিজের গলার স্বর নিজের কাছেই অপরিচিত লাগে তার। দাঁত দিয়ে অধর কামড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। কেন চ্যাঁচাতে গেল সে অশনায়ার ওপরে! এমন কী-ই বা বলে ফেলেছে সে! সাধারণ মানুষের সাধারণ জিজ্ঞাসাই তো করেছে সে, তবে পিয়ালি আহত হল কেন! কেনই বা তার কথাগুলো এত যন্ত্রণার সৃষ্টি করল তার হৃদয়ে! তবে কী সে চেয়েছিল অশনায়া বুঝে নিক তার না-বলা কথা! কিন্তু কেন!

“ইয়ে মানে আমি ওভাবে বলতে চাইনি... আসলে...”

ধীরে ধীরে কথাগুলি বলে পিয়ালি।

“কোনও ব্যাপার না, চলো।”

মুচকি হেসে কথাগুলি বলে পেছন ফেরে অশনায়া।

“কো-কোথায় যাব!”

চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে পিয়ালি।

“তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিই। এত রাতে একা বাড়ি ফেরা ঠিক নয়।”

নিতান্ত নিষ্পৃহভাবে কথাগুলি বলে হাঁটতে শুরু করে অশনায়া৷ পিয়ালি মাথা নিচু করে তার পাশে হাঁটে। এক অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে ওঠে তার মন। ঠোঁটের কোণে খেলা করে ঝকমকে হাসি, যা জ্যোৎস্নার মতোই উজ্জ্বল।

“তোমার আজ আর ট্রেন ধরে কাজ নেই, আমি ট্যাক্সি ডেকে নিচ্ছি। তোমায় তোমার বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেব।”

মৃদুগলায় কথাগুলি বলে রাস্তায় চলতে থাকা এক কালচে ট্যাক্সির দিকে হাত দেখায় অশনায়া, তাদের পেরিয়ে একটু দূরে গিয়ে ক্যাঁচ করে থেমে যায় ট্যাক্সি।

“চলো।”

নিজে ট্যাক্সির দিকে এগোতে এগোতে বলে অশনায়া।

“কিন্তু ভাড়া...”

ঢোঁক গিলে বলে পিয়ালি।

“তোমায় দিতে হবে না।”

অল্প কথায় জবাব দিয়ে ট্যাক্সির দরজা খুলে পিয়ালিকে ভেতরে বসতে ইশারা করে অশনায়া। ইতস্তত করে চেপে বসে সে। পিয়ালিকে অবাক করে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসতে বসতে হালকা গলায় বলে সে, “চলো।”

“তুমি ওখানে বসলে কেন?”

ঠোঁট ফুলিয়ে জানতে চায় পিয়ালি। কত কথা বলতে ইচ্ছা করে তার, ইচ্ছে করে এই দীর্ঘদেহী মেয়েটার লম্বা চুলের গন্ধ নিতে। এসব কী ভাবছে পিয়ালি! অশনায়ার সঙ্গে এই তার দ্বিতীয় দেখা! এই মেয়েটা একবার জীবন বাঁচিয়েছে তার, আর সে এসব ভাবছে! ছিঃ ছিঃ!

নিজের মনে নিজেকেই তিরস্কার করে পিয়ালি। তার যন্ত্রণাকাতর অসুস্থ মন অল্প স্নেহ, অল্প আশাতেই যেন সবুজ হয়ে ওঠে। আর ওই একবার পাতা মেলে বেঁচে উঠতে চায়। ধীরে ধীরে পার্সের ভেতর থেকে ব্লেডটা হাতে নেয় সে।

“থামো!”

এক তীক্ষ্ণ চিৎকারে হতভম্ব ড্রাইভার তড়িঘড়ি ব্রেক কষে, একটা লম্বা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায় ট্যাক্সি। পিয়ালির হাতের ব্লেড এই হঠাৎ চিৎকারে বেসামাল হয়, ফলতঃ ডানহাতের অনামিকা আঙুলটায় আড়াআড়ি আঁচড় লেগে রক্ত ঝরে। হঠাৎ ব্যথায় কেঁপে ওঠে সে। লাল চোখ মেলে দেখে ড্রাইভারের পাশের সিট ছেড়ে তার পাশে এসে বসেছে অশনায়া, হতভম্ব চোখে চেয়ে রয়েছে তার দিকে।

“আসলে... হাতটা পিছলে গেল... হঠাৎ...”

বিড়বিড় করে বলে পিয়ালি।

“ব্লেডটা দাও।”

ঠান্ডা গলায় বলে অশনায়া। তার গলার স্বরে অদ্ভুত কাঠিন্য নজর এড়ায় না পিয়ালির, নির্বিবাদে ব্লেড তুলে দেয় তার হাতে। ট্যাক্সির জানলা গলিয়ে ফাঁকা রাজপথে ব্লেডটা ছুঁড়ে দেয় অশনায়া। ড্রাইভারকে চোখের ইশারা করে। ট্যাক্সি আবার চলতে শুরু করে তার নিজের ছন্দে।

“কেন?”

“অ্যাঁ!”

“ব্লেড বের করেছিলে কেন!”

দাঁতে দাঁত চিপে প্রশ্ন করে অশনায়া।

“আসলে... আসলে... নখের একটা ভাঙা অংশ বড্ড জ্বালাচ্ছিল, সেটা কাটব বলেই...”

নিঃশ্বাস চেপে মিথ্যে বলে পিয়ালি।

“মিথ্যে বোলো না। আমি জানি ব্লেড দিয়ে তুমি কী করো।”

হিসহিসিয়ে বলে অশনায়া।

ভয়ার্ত চোখে তার দিকে তাকায় পিয়ালি। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি বদলে যায়। এক শীতল-নির্মম দৃষ্টি মেলে সে চেয়ে থাকে অশনায়ার দিকে। এই দৃষ্টি স্বাভাবিক মানুষের নয়, এক জটিল মানসিক রোগীর বলে ভ্রম হয়। কালো পোশাকের মেয়েটির শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত নামে।

“জানো যখন প্রশ্ন করছ কেন? আমি যখনই কোনও কিছু আশা করি এবং সেটা পূর্ণ হয় না তখন... তখন নিজেকে শাস্তি দিই। স্বপ্ন দেখার শাস্তি... আশা করার শাস্তি... বুঝতে পেরেছ?”

চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তর দেয় পিয়ালি।

অভিব্যক্তিহীন মুখ নিয়ে তার দিকে চেয়ে থাকে অশনায়া। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি নেমে আসে পিয়ালির আঙুলে, সেটি থেকে অল্প রক্তক্ষরণ হচ্ছে তখনও। তার নীল চোখের দৃষ্টিতে বিদ্যুৎ খেলা করে, অদ্ভুত তৃষ্ণায় শুকিয়ে আসে গলা।

“আঙুলটা দাও!”

পিয়ালির জবাবের অপেক্ষা না করেই তার ডান হাতটা নিজের হাতে নেয় অশনায়া। ধীরে ধীরে নিয়ে যায় নিজের ঠোঁটের কাছে। পিয়ালি প্রতিবাদ করার আগেই টের পায় তার সদ্যসৃষ্ট ক্ষতে আদর বোলাচ্ছে অশনায়ার গরম জিভ। শিহরিত হয়ে চোখ বন্ধ করে সে।

চোখ বন্ধ থাকায় পিয়ালি দেখতে পায় না অশনায়ার গভীর নীল চোখের তারা বদলে যাচ্ছে গাঢ় লালে, রক্ত লালে! হাওয়ার বেগে ছুটে চলেছে কালো ট্যাক্সিখানা, মিরর ভিউয়ে তাকিয়ে চকচকে সবুজ চোখে হাসছে ট্যাক্সির ড্রাইভার। আধো আলো আধো অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে তার শ্বদন্ত।

“নামো।”

অশনায়ার ঠান্ডা গলা শুনে চমকে চোখ মেলে তাকায় পিয়ালি। কতক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিল সে জানে না, তবে অনুভব করতে পারছিল তার আঙুলে চেপে বসেছে একজোড়া নরম ঠোঁট, যেন সব ব্যথা শুষে নিচ্ছে তার। ট্যাক্সি কখন থেমে গিয়েছে, অশনায়া তার হাত ছেড়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে কিছুই টের পায়নি সে। এখন ক’টা বাজে!

“আ-আমি কী ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! দুঃখিত!”

তড়িঘড়ি নামতে নামতে বলে পিয়ালি। লজ্জায় মাথা কাটা যায় তার। ট্যাক্সির ভেতরে আজ সে যা ঘটিয়েছে তারজন্য অশনায়ার দিকে তাকাতে পারে না সে। নীরবে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

“দাঁড়াও।”

আবার ঠান্ডা গলার ডাক ভেসে আসে। অজান্তেই পিয়ালির পদক্ষেপ থেমে যায়। কিন্তু পেছন ফেরে না সে, অশনায়ার মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করে না তার। স্থির হয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে সে৷ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে অশনায়ার পায়ের শব্দ। নিজের ঘাড়ের কাছে তার নরম নিঃশ্বাস টের পায় সে।

“ওসব কোরো না৷ ওসব করলে যন্ত্রণা কমে না, বাড়ে। তুমি অপরিণত নও, চাকরি করা একজন স্বাবলম্বী মানুষ। নিজেকে এতটাও নিচু কোরো না যে নিজের দিকে নিজেই তাকাতে অসুবিধে হয়। মনে রেখো।”

নরম গলায় কথাগুলি বলে অশনায়া।

মুহূর্তের মধ্যে পেছন ফিরে অশনায়ার মুখোমুখি হয় পিয়ালি, দু’হাতের মুঠোয় চেপে ধরে তার পোশাকের কলার, অস্বাভাবিক মানুষের মতো ঝাঁকুনি দেয় তাকে। অশনায়ার মুখে কোনও অভিব্যক্তি ধরা পড়ে না, একটুকরো পাথরের মতো স্থির চেয়ে থাকে সে।

“কতটুকু জানো তুমি আমার ব্যাপারে যে অপরিণত বলে দিলে! কী জানো তুমি আমার যন্ত্রণার কথা!"

গলা কেঁপে যায় তার।

“কিচ্ছু জানি না৷ শুধু এটুকু জানি এসবে কোনও লাভ হয় না, নিজেরই ক্ষতি হয়।”

স্থির ভঙ্গিতে বলে অশনায়া।

“হোক, হোক ক্ষতি। তোমার কী! কেন এত ভাবছ আমায় নিয়ে! কে আমি!”

অশনায়াকে ঝাঁকুনি দিয়ে প্রশ্ন করে পিয়ালি।

“এসব বন্ধ করলে বলবখন। এখন ঘরে যাও, অনেক রাত হয়েছে। আর হ্যাঁ...”

ট্যাক্সির ভেতর থেকে একটা খাবারের প্যাকেট বের করে পিয়ালির হাতে দেয় অশনায়া।

“খেয়ে নিয়ো, না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ভালো নয়।”

নরম চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে পিয়ালি, ঠোঁট কাঁপে তার, কোনও শব্দ বের হয় না গলা চিরে৷

ট্যাক্সিতে উঠে বসতে বসতে তার দিকে তাকিয়ে অল্প হাসে অশনায়া, হালকা হাত নাড়ে। কী মনে করে তার দিকে এগিয়ে যায় পিয়ালি, “কাল বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সন্ধ্যায় একটু আসবে?”

ঠোঁট কামড়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবে অশনায়া, তারপরে স্মিত হেসে বলে, “আসব।”

ট্যাক্সি চলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে পিয়ালির চোখের সামনে থেকে আরও একবার হারিয়ে যায় অশনায়া। তার চলার পথের দিকে চেয়ে ক্ষীণ হাসে পিয়ালি।

জীবন সুন্দর, হয়তো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%