স্বীকারোক্তির রং লাল

রিয়া ভট্টাচার্য

|| স্বীকারোক্তির রং লাল ||

“পিয়ালি!”

পেছন থেকে নরম গলার ডাক শুনে থতমত খেয়ে পেছন ফেরে পিয়ালি। তার কাজের জায়গায় সাধারণত কেউ আসে না, তার কোনও বন্ধু নেই, যারা পরিচিত তারা প্রয়োজন ব্যতিরেকে যোগাযোগ করে না তার সঙ্গে। তাই আজ হঠাৎ ডাক তাকে অবাক করেছে বৈকি! অশনায়া কী করছে এখানে!

“তুমি! কী ব্যাপার! কিছু হয়েছে! এইসময়ে তো আসো না তুমি!”

উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চায় পিয়ালি। তার বুক ঢিপঢিপ করে।

“একটা জরুরি কাজে যেতে হচ্ছে বাইরে, তাই তার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। একটু বাইরে আসতে পারবে?”

ইতস্তত করে ডাক দেয় অশনায়া।

“আসছি। এক মিনিট!”

পাশে দাঁড়ানো এক সহকর্মীকে ফেসিয়ালটা করতে বলে তড়িঘড়ি হাত ধুয়ে পার্লারের বাইরে বেরিয়ে আসে পিয়ালি। তাকে আশ্চর্য করে সে বেরিয়ে আসা মাত্র তাকে জড়িয়ে ধরে অশনায়া, ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নেয়। পিয়ালির গায়ে কমলালেবু ও মধুর গন্ধ, বড্ড বেশি নেশা ধরানো, বড় বেশিই স্নিগ্ধ।

“কী হয়েছে তোমার একটু বলবে! ভয় করছে আমার।”

অশনায়ার পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে কম্পিত স্বরে জানতে চায় পিয়ালি। অশনায়া এমন নয়, জানে সে। এর আগে সেই উদ্যোগ নিয়ে স্পর্শ করেছে তাকে, অশনায়া চেষ্টা মাত্র করেনি। আজ কী হল তার!

“আমায় কথা দাও, আমি যাওয়ার পরে নিজের খেয়াল রাখবে তুমি! নিজের ক্ষতি করবে না! সময়মতো খাবে ও ঘুমোবে!”

পিয়ালির মুখ নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে অনুরোধ জানায় অশনায়া। তার কণ্ঠস্বর যেন বেদনার্ত মনে হয়। তার সমুদ্রনীল চোখে যেন অশ্রুঢেউ খেলে, মুগ্ধদৃষ্টিতে ওই দুই চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে পিয়ালি৷ ফিসফিস করে বলে, “কতদিনে ফিরবে তুমি!”

“আমি জানি না। চেষ্টা করব তাড়াতাড়ি ফেরার, তবে কথা দিতে পারছি না কোনও৷ তুমি সাবধানে থেকো। তোমার সুস্থ থাকাটা আমার জন্য বড্ড দরকার।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে অশনায়া। তার সহসা এই স্বীকারোক্তি যেন ঝড় তোলে পিয়ালির বুকে, তার হাতের আঙুল থিরথির করে কাঁপে, শব্দ হারিয়ে যায় তার৷

“আমি জানি তোমার বাবা মায়ের কথা পিয়ালি, জানি জীবনধারণের জন্য প্রতিদিন তোমায় ঠিক কতখানি সংঘর্ষ করতে হয়। তোমার এই হার না মানা মানসিকতার জন্যই তোমায় বড্ড সম্মান করি আমি৷ আর তোমার পাগলামির জন্য ভালোবাসি তোমাকে৷ তবে মনে রেখো, তোমার পাগলামি একান্ত আমার, আর কারও কোনও কথাতেই যেন এই পাগলামি প্রকাশ না পায়! কারণ, যা আমার, তা কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে পছন্দ করি না আমি। তাই তোমার বাবা মা যা-ই বলুন, নিজের কোনও ক্ষতি করবে না তুমি। অপেক্ষা করবে আমার ফিরে আসার। কথা দিলাম, যদি ফিরে আসতে পারি সবকিছু ভালো করে দেব। আর এটা রাখো!”

পকেট থেকে দু’খানি টাকার বাণ্ডিল বের করে পিয়ালির হাতে দেয় অশনায়া, পিয়ালি হাঁ করে তাকিয়ে থাকে নিজের হাতের দিকে। এতগুলো টাকা!

“আমার টাকার প্রয়োজন নেই। তুমি শুধু আমার সঙ্গে থেকো, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো আমার কাছে৷”

অশ্রুসিক্ত চোখে কথাগুলি বলে পিয়ালি৷

“যদি অন্ধকারের প্রভু চান, নিশ্চয়ই ফিরব৷ তবে এই টাকা আমি তোমার প্রয়োজন বলে দিচ্ছি না। দিচ্ছি, যাতে নিজের খুশিমতো কিছু কিনে নিতে পারো তুমি।”

পিয়ালির কপাল থেকে চুল সরাতে সরাতে হেসে বলে অশনায়া।

“ভালোবাসি।”

ফস করে শব্দটি বলে ফেলেই জিভ কাটে পিয়ালি৷ এ কী বলে ফেলল সে! অশনায়া তার মুখ আর দেখবে তো! তাকে অসুস্থ ভেবে ঘৃণায় ছুড়ে ফেলে দেবে না তো! তাকে দেখতে আর আসবে তো! বুকের খাঁচার ভেতরে থাকা শান্ত হৃদয়খানা যেন ঝাঁপাঝাপি করে উত্তেজনায়, লাবডুব শব্দটা নিজের কানেই শুনতে পায় সে। অশনায়া স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। চোয়াল শক্ত, চোখ শীতল৷ তীক্ষ্ণ প্রত্যাখ্যান আশা করে চোখ বোজে পিয়ালি।

তাকে অবাক করে কোনও কঠিন বাক্য ধেয়ে আসে না, ধেয়ে আসে না কোনও অপ্রত্যাশিত আঘাত, তার বদলে নরম ঠোঁট স্পর্শ করে তার গাল। চমকে চোখ খোলে পিয়ালি। গভীর নীল দুইখানি চোখ আদরমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। অশনায়ার ঠোঁটের কোণে খেলা করছে অপার্থিব হাসি। এই হাসি সহসা বৃষ্টির জল পাওয়া চাতকের হাসি, মরুভূমিতে হঠাৎ মরূদ্যান দেখতে পাওয়া পথিকের হাসি৷ বড় মধুর, বড় শান্ত, অনেকখানি স্বস্তির।

পিয়ালির বাম হাত নিজের হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে তার হাতের পাতায় ঠোঁট ছোঁওয়ায় অশনায়া, আঙুলগুলির ডগাতেও চুম্বন আঁকে অদমনীয় আদরে। কনিষ্ঠা আঙুলে কামড় অনুভব করে পিয়ালি, বড্ড তীক্ষ্ণ সেই কামড়। যেন কেউ ছুঁচ ফুটিয়েছে আঙুলের ডগায়৷ চোখ বড়বড় করে দেখে সে, তার আঙুল বেয়ে গড়িয়ে নামা রক্ত প্রাণপণে চুষছে অশনায়া, ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে তার চোখের রং। নীল পরিবর্তিত হচ্ছে টকটকে লালে। সমস্ত শরীর হিস্টিরিয়া আক্রান্তের মতো ঝাঁকুনি দিচ্ছে পিয়ালির, ভয়ে নয়, সীমাহীন উত্তেজনায়।

“তু-তুমি কে?”

কোনওক্রমে বলে পিয়ালি।

“মানুষ নই, এক অন্ধকারের জীব। তবে তোমার কোনও ক্ষতি করব না আমি। এক বীভৎস যুদ্ধে যাওয়ার আগে তোমায় দেখতে এসেছিলাম, অনুভব করতে এসেছিলাম। হয়তো শেষবারের মতো। আমায় ঘেন্না কোরো না পিয়ালি। তোমার রক্ত আমার ভেতরে অদ্ভুত নেশা জাগিয়ে তুলেছে, যা অস্বীকার করতে পারিনি আমি।”

তড়িঘড়ি পিয়ালির হাত ছেড়ে দুই পা পিছিয়ে দাঁড়ায় অশনায়া। তার দৃষ্টি মাটির দিকে স্থির। এত বড় ভুল কী করে করল সে! কী করে হারাল নিজের নিয়ন্ত্রণ! নিজের এত বড় সত্য প্রকাশ করে ফেলল এক মানুষের কাছে! কী হবে, যদি নোয়ির প্রেমিকার মতো তাকেও অস্বীকার করে পিয়ালি! সেও কী তবে নোয়ির মতো হারিয়ে ফেলবে নিজেকে! এক মানুষের প্রত্যাখ্যানে শেষ হয়ে যাবে অন্ধকারের রানি!

না না! এ হতে পারে না!

নোয়ির কথাগুলো যেন বিদ্রুপের মতো কানে বাজে তার, ‘মানুষ বড় বেইমান জাতি!’

পায়ে পায়ে পেছনে সরে অশনায়া, তার কান মাথা ঝিমঝিম করে। তার সামনে বিশাল যুদ্ধ, তার আগে পিয়ালির প্রত্যাখ্যান সইতে পারবে না সে৷ তাকে চলে যেতে হবে। এখুনি এখান থেকে চলে যেতে হবে৷

“অশনায়া!”

নরম গলায় ডাক দেয় পিয়ালি। শঙ্কিত হয়ে তার দিকে তাকায় অশনায়া, তার হাত দুইখানি মুঠি পাকায় দেহের দুইপাশে। দমবন্ধ করে তার কথার চাবুকের ঘায়ের অপেক্ষা করে সে।

“আমি জানি না তুমি মানুষ কি না! আমি জানি না অন্ধকারের জীব বলতে তুমি কি বোঝাতে চেয়েছ! আমি জানি না আমার রক্তের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কি! আমি শুধু এটুকু জানি যে, তুমিই আমার জীবন বাঁচিয়েছিলে সেইদিন রাতে, তুমি আমার জন্য যতটা ভেবেছ ততটা কেউ কখনও ভাবেনি৷ আমায় যারা জন্ম দিয়েছে তারাও না৷ তাই আমি চাই তোমার সঙ্গে থাকতে। আমি জানি না, আমি তোমার যোগ্য কি না! তবে তোমায় পেয়ে আমি আবার স্বাভাবিকভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখি। থেকে যেও অশনায়া, আর কখনও কিচ্ছু চাইব না আমি।”

ধীর গলায় বলে পিয়ালি।

লম্বা পা ফেলে তার দিকে এগিয়ে যায় অশনায়া, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে বুকে। চুম্বন আঁকে তার মাথায়।

“আমি আছি, আমি থাকব পিয়াল। কোথাও যাব না আমি৷”

অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলে সে।

“পিয়াল! আমার নাম তো পিয়ালি!"

অবাক হয়ে বলে পিয়ালি।

“তুমি আমার পিয়াল। অপেক্ষা কোরো কেমন! খেয়াল রেখো নিজের!”

পিয়ালির ঘ্রাণ প্রাণভরে ফুসফুসে ভরে নিয়ে তাকে ছেড়ে পিছিয়ে দাঁড়ায় অশনায়া। চাঁদের আলোয় তার পিঠের দুইপাশে ভেসে ওঠে বিশালাকার দুইখানি কালো ডানা। মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পিয়ালি। তার মুগ্ধতা লক্ষ্য করে স্মিত হাসে অশনায়া৷

“ফিরে এসে একদিন আকাশ ভ্রমণে নিয়ে যাব তোমায়। যাবে তো!”

অশনায়ার প্রশ্নের উত্তরে কেবল মাথা নাড়ে বিস্মিত পিয়ালি, শব্দ করতে ভুলে যায় সে।

অন্ধকার আকাশে ডানা মেলে উড়ে যায় পরিতৃপ্ত অশনায়া। পিয়ালির রক্ত তার শক্তি বৃদ্ধি করেছে অনেকখানি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%